‘মুসলিম বাহিনী এসে পড়লে কি করবে?’ জিম বলল।
‘আমরা উভয়ে মুসলমান হয়ে যাব।’ মেরী বলল। শুনেছি, যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলিম বাহিনী তাদের সাথে খুব ভালো ব্যবহার করে।
জিম তো কোন ফেরেশতা ছিল না যে, সম্পদের লালসা তার মাঝে কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে না। বিপুল সম্পদ ছাড়াও মেরীর প্রেম তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। মেরী তাকে এমন এক সুখের সন্ধান দিয়েছিল যে কারণে সে টলেডো ফিরে যেতে প্রস্তুত হয়ে গেল।
কাফেলা গভীর ন্দ্রিীয় নিমজ্জিত। জিম ধীরপদে তার ঘোড়র নিকট গেল এবং বাঁধন খোলে ঘোড়র উপর জিন লাগিয়ে মেরীর কাছে চলে এলো। মেরী ঘোড়ায় উঠার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলে জিম কুঁকে তার হাত ধরে টেনে ঘোড়ায় উঠিয়ে নিল। তারপর সুতীব্র বেগে টলেডোর উদ্দেশ্যে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
ঘুমন্ত কাফেলার কেউ জানতে পারল না যে, একটি ঘোড়া দুজন সওয়ারীকে নিয়ে কাফেলা ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
***
রাত শেষ হয়ে ভোরের আলো ফুটার সাথে সাথে কাফেলা রওনা হবার জন্য তৈরী হয়ে গেল। মেরী ও জিমকে দেখতে না পেয়ে বড় পাদ্রি হৈচৈ শুরু করে দিল। তার সঙ্গী পাদ্রিরা তাকে তিরস্কার করে বলল,
‘ঐ মেয়ে তোমার স্ত্রী নয়, সে তোমার মেয়ে বা বোনও নয়। সুতরাং সে চলে গেছে বলে এতো হৈচৈ করার কি আছে? সে যদি তার পছন্দের কারো সাথে চলে গিয়ে থাকে তাহলে তাকে চলে যেতে দাও। ভালোই হয়েছে, ওর মতো একটি রূপসী মেয়ে চলে গেছে। এমন অনিশ্চিত সফরে ওর মতো রূপসী মেয়ে থাকলে যে কোন ধরনের বিপদ হতে পারে। আমাদের কাফেলায় আরও অনেক মেয়ে আছে, তারাও যদি ভেগে যায় তাহলে মন্দ হয় না।‘
অন্যান্য পাদ্রিদের এসব কথা শুনে বড় পাদ্রি চুপ হয়ে গেল। কাফেলা রওনা হয়ে গেল। ঐতিহাসিকগণের মত অনুযায়ী এসকল পাদ্রিরা রোমের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। রোমে রয়েছে বিশ্বের কেন্দ্রিয় গির্জা ও পোপদের হেড কোয়ার্টার ভ্যাটিক্যানসিটি।
কাফেলা যখন সামনের দিকে অগ্রসর হল, ঠিক সেই সময় মেরী ও জিম টলেডের প্রধান ফটক খোলর অপেক্ষা করছিল। রাতের অন্ধকার থাকতেই তারা তের-চৌদ্দ মাইলের মধ্যে দূরত্ব অতিক্রম করে শহর রক্ষাপ্রাচীরের নিকট এসে। পৌঁছল। ফটক খোলার সাথে সাথে তারা শহরে প্রবেশ করল।
মেরী জিমকে নিয়ে তার নিজ বাড়ীতে উঠল। তারা ঘরে প্রবেশ করে দেখল, ঘরের আসবাবপত্র, খাট-পালঙ্ক, বিছানাপত্র এমনভাবে রাখা আছে, যেন ঘরের লোকজন কিছুক্ষণের জন্য বাইরে গেছে। এখনই ফিরে আসবে।
সারাদিন উভয়ে ঘরের মধ্যেই কাটাল। লোকজন একে একে শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছিল। বাড়ী-ঘর লোকশূন্য হয়ে যাচ্ছিল। কারো খালি ঘরে যদি কেউ প্রবেশ করত তাহলে বলার কেউ ছিল না। জিম ও আইনামেরীর এমন কোন আশঙ্কা ছিল যে, কেউ তাদেরকে জিজ্ঞেস করবে, এই ঘরে তোমরা কি করছ?
তখনও রাতের অর্ধ প্রহর শেষ হয়নি। মেরী ও জিম ঘর থেকে বের হয়ে প্রধান গির্জার দিকে চলতে শুরু করল। জিমের হাতে ছিল ঘোড়ার লাগাম। তারা। উভয়ে পায়ে হেঁটে পথ চলছিল। তাদের ধারণা ছিল, গির্জার গেইটে তালা লাগান থাকবে। কিন্তু তারা গেইট উন্মুক্ত দেখতে পেল। গির্জার ভিতর ছিল ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। এর চেয়ে বেশি অন্ধকার হলেও জিম আর মেরীর জন্য গির্জার আনাচে-কানাচে পৌঁছা অসম্ভব ছিল না। কারণ, গির্জার প্রতিটি ইট-পাথর সম্পর্কে তারা অবগত।
তাদের হাতে একটি মশাল। ভূ-গর্ভস্থ ঘরে মশালের প্রয়োজন হতে পারে ভেবে তারা তা সাথে করে নিয়ে এসেছে। তারা উভয়ে গির্জায় প্রবেশ করল। তারা সে স্থানে গিয়ে পৌঁছল যেখানে ভূ-গর্ভস্থ ঘরের ঢাকনা ছিল। জিম আইনামেরীর ঘর থেকে একটি কোদাল নিয়ে এসেছিল। জিমের সাথে ছিল একটি তলোয়ার ও একটি খর। আর মেরীর সাথে ছিল একটি খঞ্জর।
মেরী ও জিম ভূগর্ভস্থ ঘরের ঢাকনার উপর এসে দাঁড়াল। জিম সতর্কতার সাথে মশাল জ্বালাচ্ছিল, আর মেরী দ্রুতহাতে ঢাকনার উপর বিছানো কালিনের উপর থেকে সবকিছু সরিয়ে ফেলল। মেরী জানত, কীভাবে ভূ-গর্ভস্থ ঘরে প্রবেশ করতে হয়। জিম ও মেরী উভয়ে মিলে ঢাকনা উঠিয়ে ভূ-গর্ভস্থ ঘরে প্রবেশ করল।
ভূ-গর্ভস্থ ঘরে খোঁড়াখুঁড়ির ফলে মাটি এদিক-সেদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। এক স্থানে পাকারে মাটি রাখাছিল। মেরী এক দিকে ইঙ্গিত করে বলল,
‘এখানেই গুপ্তধন আছে। জিম! আমরা অনেক সহজেই আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌঁছতে পেরেছি।’
‘কিন্তু আমরা তো খুব বেশি সম্পদ নিতে পারব না।’ জিম বলল।
‘যা পারব তাই নিয়ে যাব। মেরী বলল।
‘আমি এখানে কিছুই রেখে যাব না।’ জিম খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলে উঠল। ‘একবারে যা পারব, তা নিয়ে তোমাদের ঘরে রেখে আবার আসব। তারপর আবার আসব। এভাবে কয়েকবারে সমস্ত সম্পদ নিয়ে গিয়ে তোমাদের ঘরে পুঁতে রাখব। মুসলিম বাহিনী যদি এসে পরে তাহলে আমরা এই সম্পদ বাঁচানোর জন্য মুসলমান হয়ে যাব। তখন মুসলিম বাহিনী আমাদের ঘর লুণ্ঠন করবে না। বাড়ীতে আমরা খ্রিস্টধর্ম পালন করব এবং নিজেদের ইবাদত করব।’
‘ধর্মের প্রতি আমার তেমন কোন আগ্রহ নেই।’ মেরী বলল। মুসলমান হোক বা খ্রিস্টান–সকলেই আমার কাছে সমান।
***
মাটি খোঁড়ার কোন প্রয়োজন ছিল না। আলগা মাটিগুলো সরিয়ে ফেললেই চলত। জিম অতি দ্রুত মাটি সরাতে লাগল। খুব অল্প সময়ের মধ্যে সে একটি গর্ত থেকে প্রায় তিন ভাগ মাটি সরিয়ে ফেলল। মাটি সরাতে সরাতে সে হঠাৎ লাফিয়ে পিছু হটে এলো। মনে হল, কোন ফনাতুলা সাপ তার উপর হামলা করেছে।
