কুবলা বেলালের কাছে জানতে চাইলো “বলল, আলাফীর সাথে তোর কি কথা হয়েছিল?”
বেলাল বলল, “আমার তিন সঙ্গী ছাড়া আমার সাথে আর কেউ ছিল না। যারা আমার সাথে ছিল তারা সবাই মারা গেছে। আমি জীবনে কখনো মাকরান যাইনি। আমার অভিযানের কথা আর কেউ জানে না।” কুবলা যতোবার বেলালকে জিজ্ঞেস করল, ততোবার একই জবাব দিলো বেলাল।
আসল কথা বলছে না ভেবে কুবলা শাস্তির মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিলো। এভাবে চললো সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত।
দুপুরের দিকে বেলাল জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। দুপুরের পর বাঁধন খুলে দিলে বেলালের শরীর অসাড় হয়ে গেল। ওকে টেনে-হেঁচড়ে সেই পুঁতিদুর্গন্ধময় কক্ষে রেখে তালাবদ্ধ করে দিলো প্রহরীরা। কষ্ট যন্ত্রণায় বারবার বেলাল পানি পান করতে চাচ্ছিল কিন্তু পানির পেয়ালা তার মুখের কাছে নিয়ে ফিরিয়ে আনা হলো, পানি পান করতে দেয়া হলো না। ক্ষুধা তৃষ্ণায় বেলালের মুখ ব্যাদান হয়ে গেল।
দুপুরের পর আবারো একটি খাড়া তক্তার সাথে বেলালকে বেঁধে চার হাত পা ওজনী পাথর দিয়ে চাপা দিয়ে রাখলো, আর দারোগা কুবলার জিজ্ঞাসাবাদ চলতে থাকল। কিন্তু বেলালের মুখ থেকে নতুন কোন কথাই বের হলো না। রাতের বেলায় আবারো সেই অন্ধকার দুর্গন্ধময় কক্ষে তাকে ফেলে রাখলো। কক্ষের দুর্গন্ধ আর নিজের শরীরের ঘামের দুর্গন্ধ মিলে আরো দুর্বিসহ হয়ে উঠল। রাত নামার সাথে সাথে পোকা-মাকড়, বিচ্ছু বেলালের অসাড় দেহটাকে ঘিরে ধরল। নাকে মুখে, সারা শরীরে বিষাক্ত পোকা-মাকড়ের কামড়ে জ্বালা বিষের যন্ত্রণায় বেলালকে মৃতপ্রায় করে তুলল। উহ্ করার বোধটুকুও বেলালের অবশিষ্ট রইল না।
মধ্য রাতে সেই কক্ষের দরজা খুলে বেলালকে টেনে-হেঁচড়ে আবার শাস্তির জায়গায় নিয়ে গেল প্রহরীরা। এবার পা দুটো ছাদের সাথে রশি বেধে উল্টো করে ঝুলিয়ে দেয়া হলো। বেলালের ঝুলন্ত হাত দুটো মাটি থেকে আধা হাত উঁচুতে ঝুলে রইল। হাত ওপরে উঠানোর শক্তি নেই। এবার শুরু হলো চাবুক। এক একটি চাবুকের আঘাতে বেলালের শরীরের চামড়া উঠে আসতে লাগল, সেই সাথে ফিনকি দিয়ে ঝরতে থাকল রক্ত। আর চলল কুবলার
জিজ্ঞাসাবাদ। বল? তোর সাথে কি কথা হয়েছিল আলাফীর? মাকরানের কে কে তোর সহযোগী ছিল? কারা ছিল এই পরিকল্পনায়?
কিন্তু বেলালের মুখে না শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ বের হলো না।
বেলাল বলল, আমার সাথে যারা ছিল, তারা সবাই মারা গেছে। অবশেষে আফসোস করে কুবলা বেলালের উদ্দেশ্যে বলল, “আরে হতভাগা! এভাবে কেন মরছো? বলে ফেলো এবং ভালোভাবে বেঁচে থাকো। বলল, এই তিন ব্যক্তি ছাড়া তোমার সহযোগিতায় আর কে কে ছিল?”
“বেলালের কণ্ঠে কথা উচ্চারিত হচ্ছিল না। কথা বলার মতো শক্তি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল বেলালের। বহু চেষ্টা করে শুধু এতটুকু বলল, ছিল একজন।” “ছিল!” স্বীকারোক্তি শুনে কুবলা চাবুক মারা বন্ধ করে দিলো এবং ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নামিয়ে আনতে নির্দেশ দিলো। এরপর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো “বলো, কে সে? তিনজন ছাড়া আর কে ছিল তোমার সাথে?”
“আল্লাহ! আমার আল্লাহ্ ছিল আমার সাথে।” এ কথা শুনে রেগে গিয়ে আবারো কয়েক ঘা চাবুক লাগিয়ে দিলো কুবলা। বলল, ডাক তোর আল্লাহকে। এখান থেকে তোকে আর তোদের সাথীদের মুক্ত করে নিক।”
“হ্যাঁ, আল্লাহ্ সবাইকে মুক্ত করবেন। আমার আল্লাহ্ আসছেন। আসলেই টের পাবে।” এভাবেই কেটে গেল রাত। সকাল বেলায় শাস্তির কক্ষ থেকে বেলালের অসাড় দেহটি জল্লাদের গারদে রেখে তালাবদ্ধ করতে নির্দেশ দিলো জেল দারোগা কুবলা। আজো বেলালকে খানাপানি কিছু দেয়া হয়নি। দিনের বেলায় শুরু হলো নতুন ধরনের শাস্তি। সারা দিন ভয়ংকর শাস্তি দেয়ার পর রাতের বেলায় আবারো ফেলে রাখা হলো জল্লাদের গারদে। এখন আর বেলালের কোন হুঁশ জ্ঞান নেই। নিথর অসার মৃতপ্রায় বেলাল পড়ে রইল মেঝেতে। বোধশক্তি আছে কি-না তাকে দেখে কারো পক্ষে বলা মুশকিল। খুবই হাল্কাভাবে নাকের কাছে হাত রাখলে নিঃশ্বাস অনুভব করা যায়। চাবুকের আঘাত পোকায় কামড়ানো ফোলা ক্ষতবিক্ষত শরীরে নিঃশ্বাসের ওঠানামা বোঝা যায় না। তৃতীয় দিন সকাল বেলায় রাজা দাহিরকে বলা হলো, তিনদিন বিরামহীন চেষ্টার পরও বেলাল কারো নাম উচ্চারণ করেনি। জ্ঞাত অজ্ঞাত কারো
সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেনি। বেলালকে যেসব শাস্তি দেয়া হয়েছে সবিস্তারে জেল দারোগা কুবলা সবই জানালো রাজাকে। সেই সাথে বেলাল কি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তাও ব্যক্ত করল সবিস্তারে। অবশেষে কুবলা বলল, “আমার মনে হয় সঙ্গী তিনজন ছাড়া এর সাথে আর কারো যোগসূত্র ছিল না। থাকলে নিশ্চয়ই স্বীকার করতো। মাকরানের আরবদের সম্পর্কে তাকে অজ্ঞাতই মনে হয়েছে।”
“ঠিক আছে, জল্লাদের হাতে দিয়ে দাও ওকে। আর হ্যাঁ, বধ করার আগে খাবার দিও। অনাহারে কাউকে বধ করা ঠিক নয়।”
“রাজার নির্দেশে খাবার ও পানি দেয়া হলো বেলালকে। পানি পান করে বেলালের প্রাণ ফিরে এলো এবং কিছুটা বোধশক্তি ফিরে পেল। সন্ধ্যায় কুবলা তাকে বলল, “আজ রাত তোমার জীবনের শেষ রাত। যদি কোন শেষ ইচ্ছ বা কথা থাকে তাহলে ব্যক্ত করতে পারো।”
“একটাই আমার ইচ্ছা, একটাই আমার শেষ কথা, নিরপরাধ আরব নারী শিশুদের মুক্ত করে দাও।”
