“তরবারী ফেলে নিরস্ত্র হয়ে ওপরে উঠে এসো। নয়তো নিক্ষিপ্ত বর্শায় তোমাদের পেট এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়া হবে।” নির্দেশের কণ্ঠে বলল এক অফিসার ধরনের লোক।
অবস্থা বেগতিক দেখে বেলাল সাথীদের উদ্দেশ্যে অনুচ্চ আওয়াজে বলল, “বন্ধুরা! এরা আমাদের জীবিত রাখবে না। এসো লড়াই করেই মরি।” বেলাল ও সাথীদের হাতে ছিল উন্মুক্ত তরবারী। এরা বিজলীর মতো উন্মুক্ত তরবারী উঁচিয়ে সিড়ি টপকে ওপরে উঠে এলো। কিন্তু ওপরে দাঁড়ানো জেল প্রহরীরা প্রস্তুত ছিল এমনটির জন্যেই। তারা দূর নিক্ষেপণযোগ্য বর্শা তাক করে রেখেছিল এদের দিকে। বেলালের এক সাথী ওপরে উঠে আঘাত হানার আগেই তার পেট বিদ্ধ করলো প্রহরীদের নিক্ষিপ্ত বর্শা। সে সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়ল আর অসাড় দেহ গড়িয়ে নীচে পড়তে লাগল। বেলালও তার
অপর এক সঙ্গীর তরবারী এক প্রহরীর পেট বিদ্ধ করল বটে। কিন্তু তরবারী টেনে আর দ্বিতীয় আঘাতের সুযোগ পেল না। প্রহরীদের আঘাতে পড়ে গেল বেলালের সঙ্গী। একই সঙ্গে তিনটি বর্শা বিদ্ধ করল বেলালের সেই সঙ্গীকে। আর বেলাল পা পিছলে কয়েক ধাপ নীচে পড়ে গেল। এমতাবস্থায় কয়েকজন প্রহরী তাকে ঝাপটে ধরে ওপরে টেনে নিয়ে সুরক্ষিত একটি লোহার গারদে ভরে তালা লাগিয়ে দিলো। এ ঘরটিতে তাজা ও পঁচা মানুষের রক্তের দুর্গন্ধ। বেলালের মনে হলো, এখানে প্রতিদিনই হয়তো কোন না কোন মানুষকে জবাই করা হয়। ঘরের দেয়ালেও ছিটা-ফোটা রক্তের দাগ।
বেলা একটু বেড়ে ওঠার পর রাজা দাহির তার খাস কামরায় লম্বা লম্বা পা ফেলে ঘরের এপাশ থেকে ওপাশে, ওপাশ থেকে এপাশে পায়চারী করছিল। আর রাগে ক্ষোভে ফুঁসছিল। অধোবদনে তার সামনে দণ্ডায়মান মায়ারাণী। “ক্ষুব্ধ কণ্ঠে রাজা বলল, “তোমার কথায় আমি ওদেরকে প্রাসাদে রাখতে অনুমতি দিয়েছিলাম। অথচ তুমি খোজ নিয়ে দেখো, মহাভারতের কোন রাজা দুরের কথা কিংবা কোন প্রজাও মুসলমানকে বিশ্বাস করে না। তোমার কথায় আজ আমাকে এতোটা মূল্য দিতে হলো। যারা গো-মাতাকে হত্যা করে, তাদেরকে কোনভাবেই বিশ্বাস করা যায় না। তুমি বলতে পারো, আমি চার পাচশ আরবকে আশ্রয় দিয়েছি। তুমি কি দেখনি আমি ওদের কতোটা নিরাপদ দূরে রেখেছি। তাছাড়া ওদেরকে আমি স্বাধীন ছেড়ে দেইনি। ওদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার জন্য বেদুঈনের ছদ্মবেশে বহু সংখ্যক সেনাকে আমি ওদের এলাকায় ছড়িয়ে রেখেছি। মাকরানে মুসলমান বসতির চারপাশে যেসব বেদুঈন পরিবার রয়েছে এরা সবাই আমার সেনাবাহিনীর লোক। কারণ আমি জানি, আরবরা প্রতি আক্রমণ করতে পারে, আর এরা তাদের সগোত্রীয় ভাইদের সহযোগিতা করতে পারে এ আশঙ্কা আমি উড়িয়ে দিতে পারি না। এজন্য ওদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনে প্রতিরোধ করার জন্য আমি ছদ্মবেশে সেনা মোতায়েন করে রেখেছি।
“ওদেরকে বিশ্বস্ত ও সৎ ভেবে আমি নিরাপত্তা বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছিলাম।” বলল মায়ারাণী। এটাকে আমার অভিজ্ঞতা বলতে পারো। ওরা যে অপরাধ করেছে-এর শাস্তি তো ওরা পেয়েই গেছে। আর যে ধরা পড়েছে; ওকে তুমি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড …..।”
“এমন নিমক হারামকে আমি বেঁচে থাকতে দেবো না। গজরাতে গজরাতে বলল রাজা দাহির। আমি জেল দারোগাকে নির্দেশ দিয়ে দিয়েছি ওকে জল্লাদের হাতে সোপর্দ করার আগে ওর কাছ থেকে এটা বের করতে চেষ্টা করতে যে, ওর সাথে আর কারা ছিল? কারা ছিল ওদের সহযোগিতায়? অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় আরব সর্দার আলাফীর সাথে ওদের যোগাযোগ ছিল কিংবা ওদের কেউ এদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে থাকবে। কয়েদখানার দারোগা ওর পেট থেকে এসব কথা বের করেই ছাড়বে। যদি কিছুই না বলে তাহলে বলে দিয়েছি ওকে জল্লাদের হাতে দিয়ে দিতে।
“বেলালের ব্যাপারে এমন কঠোর ফয়সালা শোনার পরও রাণীর চেহারায় কোন ভাবান্তর দেখা গেল না। যে বেলালের প্রতি আসক্ত হয়ে সার্বক্ষণিকভাবে সঙ্গ পাওয়ার জন্য রাণী ওকে রাজমহলে নিয়ে এসেছিল। বেলাল যাতে রাণীকে ছেড়ে চলে না যায় এজন্য কৌশলে বেলালের সঙ্গীদেরকে মহলের নিরাপত্তা বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করিয়ে নিয়েছিল রাণী। বেলালের প্রেমের পরশে দীর্ঘ দু’দশকের মতো সময় পার করে দিয়েছে রাণী। আর আজ প্রাণের লোকটি মৃত্যুর মুখোমুখী। তাও এমন কঠিন মৃত্যু যা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে। অতি প্রত্যুষেই জেলখানার দারোগা নিজে এসে রাজা দাহিরকে সংবাদ দিয়ে গেছে গতরাতে জেলখানায় সংঘটিত ঘটনা সম্পর্কে। তখনই রাজা দাহির ধূত বেলাল বিন উসমানের ব্যাপারে করণীয় সম্পর্কে নির্দেশ দিয়ে দিয়েছিল। রাজা বেলালকে মৃত্যুদন্ত্রে নির্দেশ দিয়েছে। বলেছে, বেলালের তিনসঙ্গীর মরদেহকে দাফন কিংবা সকার না করে জেলখানার বাইরে ফেলে দিতে। রাজার নির্দেশে বেলালকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দিয়েছিল জেলখানার দারোগা কুবলা। বেলালকে একটি শক্ত তক্তার মধ্যে দুইয়ে দু’পা রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে উপুড় করে রাখলো। দু’হাতের কজিতে রশি বেঁধে দু’দিক থেকে দু’দল লোক চিক্কার দিয়ে টানতে লাগল আর কুবলা জিজ্ঞেস করতে লাগল, বল তোর সাথে আর কে কে ছিল? বেলালের মনে হচ্ছিল তার হাত দুটো শরীর থেকে ছিড়ে যাচ্ছে। কুবলা বেলালকে বারবার জিজ্ঞেস করছিল “বল মাকরানের কোন মুসলমান তোর এই অভিযানের কথা জানে?” বেলালের শরীর থেকে ঘাম বেরিয়ে গেল। কষ্ট যন্ত্রণায় চেহারা নীল হয়ে গেল।
