কিন্তু সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যে আত্মসমর্পণকারী সুদানী সৈন্য ও কমাণ্ডারদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, বালিয়ান তা জানে না। বালিয়ান পালাচ্ছে দুটি কারণে। প্রথমত তার আশঙ্কা, ধরা পড়লে সুলতান আইউবী তাকে খুন করে ফেলবেন। দ্বিতীয়ত মুবীর ন্যায় রূপসী মেয়েকে হাতছাড়া করতে চাইছে না সে। যে কোন মূল্যে নিজের জীবন রক্ষা করতে হবে এবং মুবীকেও হাতে রাখতে হবে, এই তার প্রত্যয়। বালিয়ান মনে করতো, জগতের রূপসী মেয়েরা শুধু মিসর আর সুদানে-ই জন্মায়। কিন্তু ইতালীর এই ফিরিঙ্গী মেয়েটির চোখ-ধাঁধানো রূপ তাকে অন্ধ করে দিয়েছিলো। মুবীর জন্য নিজের মান-সম্মান, দ্বীন-ধর্ম ও দেশ-জাতি সব বিসর্জন দিয়েছে বালিয়ান। কিন্তু এখন মুবী যে তার থেকে মুক্তি লাভ করার চেষ্টা করছে, তা বালিয়ানের অজানা। যে উদ্দেশ্যে মুবীর এ দেশে আগমন, তা নস্যাৎ হয়ে গেছে সব। তবে মুবী তার কর্তব্য পালনে ত্রুটি করেনি বিন্দুমাত্র। লক্ষ্য অর্জনে নিজের দেহ ও সম্ভ্রম বিলিয়ে দিয়েছে মেয়েটি। এখনো নিজের দ্বিগুণ বয়সী এক পুরুষের ভোগের সামগ্রী হয়ে আছে সে।
বালিয়ান এই আত্মতৃপ্তিতে বিভোর যে, মুবী তাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে তার প্রতি মুবীর প্রচণ্ড ঘৃণা। একাকী পালাতে পারছে না বলে বাধ্য হয়ে এখনো বালিয়ানের সঙ্গ দিচ্ছে মুবী। মনে তার একটি-ই ভাবনা, কী করে রোম উপসাগর পার হওয়া যায় কিংবা কিভাবে রবিনের নিকটে পৌঁছে যাওয়া যায়।
মুবী জানে না, রবিন এবং তার বণিকবেশী সঙ্গীরা এখন সুলতান আইউবীর হাতে বন্দী। মুবী বারবার বালিয়ানকে বলছে, দ্রুত চলো, পথে অবস্থান কম করো, অন্যথায় ধরা পড়ে যাবে। কিন্তু বে-ঈমান নারীলোলুপ বালিয়ান কোথাও ছায়াঘেরা একটু জায়গা পেলে-ই থেমে যায়, বিশ্রামের নামে বসে পড়ে। তারপর মেতে উঠে মদ আর মুবীকে নিয়ে।
এক রাতে একটি কৌশল আঁটে মুবী। অতিরিক্ত মদপান করিয়ে অচেতন করে শুইয়ে রাখে বালিয়ানকে। রক্ষীরা শুয়ে পড়ে খানিকটা দূরে একটি গাছের আড়ালে। রক্ষীদের একজন বেশ টগবগে, সুঠাম সুদেহী এক বলিষ্ঠ যুবক। অত্যন্ত বিচক্ষণও বটে। পা টিপে টিপে ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে তাকে জাগিয়ে তুলে মুবী। হাতের ইশারায় নিয়ে যায় খানিক দূরে অন্য একটি গাছের আড়ালে। বলে, তুমি ভালো করেই জান, আমি কে, কোত্থেকে এসেছি, কেন এসেছি। আমি তোমাদের জন্য সাহায্য নিয়ে এসেছিলাম, যাতে তোমরা সালাহুদ্দীন আইউবীর মতো একজন ভিনদেশী শাসকের কবল থেকে মুক্তি পেতে পারো। কিন্তু তোমাদের এই কমাণ্ডার বালিয়ান এত বিলাস-প্রিয় লোক যে, মদপান করে মাতাল হয়ে সর্বক্ষণ আমার দেহটা নিয়েই খেলা করতে ভালবাসে। আমার সহযোগিতায় বুদ্ধিমত্তার সাথে বিদ্রোহের পরিকল্পনা প্রস্তুত করে বিজয় অর্জনের চেষ্টা করার পরিবর্তে লোকটি আমাকে হেরেমের দাসী বানিয়ে রেখেছিলো। তারপর নির্বোধের মতো বাহিনীটিকে দুভাগে বিভক্ত করে এমন বেপরোয়াভাবে আক্রমণ করালো যে, এক রাতে-ই তোমাদের এত বিশাল বাহিনীটি সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেলো!
তোমরা হয়তো জানো না, তোমাদের পরাজয়ের জন্য এ লেকটি-ই দায়ী। এখন আমাকে নিয়ে যাচ্ছে শুধু-ই ফুর্তি করার জন্য। আমাকে সে বলছে, আমি যেন তাকে সমুদ্রের ওপারে নিয়ে গিয়ে আমাদের সেনাবাহিনীতে মর্যাদাসম্পন্ন একটি পদ দিই আর আমি তাকে বিয়ে করি। কিন্তু ওসব হবে না; আমি ওকে মনে-প্রাণে ঘৃণা করি। আমি স্থির করেছি, আমার যদি বিয়ে করতেই হয়, নিজের দেশে নিয়ে যদি কাউকে দেশের সেনাবাহিনীতে মর্যাদাসম্পন্ন স্থান দিতেই হয়, তবে তার জন্য আমার মনেঃপূত একজন লোক বেছে নিতে হবে। আর সে হলে তুমি। তুমি যুবক, সাহসী ও বুদ্ধিমান। প্রথমবার যখন আমি তোমাকে দেখেছি, তখন থেকেই আমার হৃদয়ে তোমার ভালোবাসা সৃষ্টি হয়ে আছে। তুমি এ বৃদ্ধের কবল থেকে আমাকে রক্ষা করো। আমি এখন তোমার। সমুদ্রের ওপারে চলো, মর্যাদা, ধনৈশ্বর্য আর আমি সব তোমার পদচুম্বন করবে। কিন্তু তার জন্য আগে এ লোকটিকে এখানেই শেষ করে যেতে হবে। লোকটি অচেতন ঘুমিয়ে আছে; তুমি যাও, ওকে খুন করে আসে। তারপর চলো, রওনা হই।
রক্ষীর ঘাড়ে হাত রাখে মুবী। মুবীর রূপের মোহ-জালে আটকা পড়ে যায় রক্ষী। দুবাহু দ্বারা জড়িয়ে ধরে মেয়েটিকে। প্রেমের যাদু দিয়ে পুরুষ বশ করায় অভিজ্ঞ মুবী। পূর্বের অবস্থান থেকে সরে একটু আড়ালে গিয়ে দাঁড়ায় মেয়েটি। রক্ষীও অগ্রসর হয়ে হাত বাড়ায় তার প্রতি।
এমন সময়ে হঠাৎ পিছন থেকে একটি বর্শা ছুটে এসে বিদ্ধ হয় রক্ষীর পিঠে। আহ! বলে চীৎকার করে ওঠে লোকটি। সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। দূর থেকে ছুটে আসে একজন। রক্ষীর পিঠ থেকে বর্শাটি টেনে বের করতে করতে বলে বেটা নিমকহারাম, তোর বেঁচে থাকার অধিকার নেই।
চীৎকার দেয় মুবী। বলে, লোকটিকে তুমি খুন ……..। এর বেশী বলতে পারলো না সে। পিছন থেকে অপর একজন তার বাহু ধরে ঝটকা এক টান দিয়ে ছুঁড়ে মারে বালিয়ানের দিকে। বলে, আমরা তার পোষ্য বন্ধু। আমাদের জীবন তার উপর নির্ভরশীল। তোমরা আমাদের কাউকে তার বিরুদ্ধে বিভ্রান্ত করতে পারবে না। বিভ্রান্ত যে হয়েছে, সে তার প্রায়শ্চিত্ত পেয়ে গেছে।
