মহামান্য সুলতান! আমার তো মনে হয়, আমাদের গুপ্তচরদেরকে নিজেদের-ই দেশে ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন। পরামর্শ দেন সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গীর প্রেরিত বাহিনীর সালার। তিনি আরো বললেন–
খৃষ্টানদের দিক থেকে আমাদের ততো আশঙ্কা নেই, যতো আশঙ্কা আমাদের-ই মুসলিম আমীরদের পক্ষ থেকে। আমাদের গুপ্তচরদেরকে তাদের হেরেমে ঢুকিয়ে দিন, দেখবেন, বহু অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে, ফাঁস হয়ে যাবে অনেক ষড়যন্ত্র। এ বলে তিনি এই স্বঘোষিত শাসকরা কিভাবে খৃষ্টানদের হাতে ক্রীড়নকের ভূমিকা পালন করছে, তার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন এবং বলেন, সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গী অনেক সময় ভেবে অস্থির হয়ে যান–কোষ্টা করবো? বাইরের আক্রমণ প্রতিরোধ করবো, নাকি নিজ গৃহকে নিজের-ই প্রদীপের আগুন থেকে রক্ষা করবো!
জঙ্গীর প্রেরিত বাহিনীর এ সালারের বক্তব্য গভীর মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করেন আইউবী। বললেন–যদি তোমরা অর্থাৎ যাদের কাছে অস্ত্র আছে, যদি তারা দ্বীন-ধর্মের ব্যাপারে নিষ্ঠাবান থাকতে পারো, একনিষ্ঠভাবে যদি তোমরা ইসলাম, দেশ ও জাতির জন্য কাজ করে যাও, তাহলে বাইরের আক্রমণ আর ভিতরের ষড়যন্ত্র কোনটি-ই জাতির এতটুকু ক্ষতি করতে পারবে না। তোমরা দৃষ্টিকে প্রসারিত করো, সীমান্ত ছাড়িয়ে দৃষ্টিকে নিয়ে যাও আরো অনেক দূরে বহু দূরে। মনে রেখো, সালতানাতে ইসলামিয়ার কোন সীমান্ত নেই। যেদিন তোমরা নিজেদেরকে এবং আল্লাহর একমাত্র মনোনীত দ্বীন ইসলামকে সীমান্তের বেড়ায় আটকে ফেলবে, সেদিন থেকেই তোমরা নিজেদের-ই কারাগারে বন্দী হয়ে যাবে। আর ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকবে তোমাদের তুনীরের সীমানা। রোম উপসাগর অতিক্রম করে তোমরা আরো দূরে দৃষ্টি ফেলো। সমুদ্র রোধ করতে পারবে না তোমাদের পথ। আর ঘরের আগুনকে ভয় করো না। আমাদের এক ফুৎকারে নিভে যাবে ষড়যন্ত্রের সব মশাল তার স্থানে আমরা ঈমানের আলোকোজ্জ্বল প্রদীপ প্রজ্বলিত করবো।
আমরা আশাবাদী যে, আমরা বেঈমানদের প্রতিহত করতে পারবো মুহতারাম সুলতান! আমরা নিরাশ নই। বললেন সালার।
মাত্র দুটি অভিশাপ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করো আমার প্রিয় বন্ধুগণ! এক. নৈরাশ্য। দুই, বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতা। মানুষ প্রথমে নিরাশ হয়। তারপর বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতার আশ্রয়ে পালাবার পথ খুঁজে। বললেন সুলতান আইউবী।
ইতিমধ্যে বেরিয়ে গেছেন আলী বিন সুফিয়ান। তৎক্ষণাৎ তিনি নোম উপসাগরের ক্যাম্প অভিমুখে এ পয়গাম দিয়ে দূতকে রওয়া করিয়ে দেন যে, রবিন, তার চার সহযোগী এবং মেয়েদেরকে ঘোড়া কিংবা উটের পিঠে চড়িয়ে বিশজন রক্ষীর প্রহরায় রাজধানীতে পাঠিয়ে দাও।
দূতকে রওনা করিয়ে-ই আলী বিন সুফিয়ান ছয়-সাতজন সিপাহী নিয়ে কমান্ডার বালিয়ানের অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। তার আগে বাইরে দণ্ডায়মান সুদানী কমাণ্ডারদের নিকট বালিয়ান সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা জানিয়েছিলো, লড়াইয়ের সময় তাকে কোথাও দেখা যায়নি এবং সুলতানের বাহিনীর উপর আক্রমণ করার জন্য যে বাহিনীটিকে রোম উপসাগরের দিকে প্রেরণ করা হয়েছিলো, বালিয়ান তাদের সঙ্গেও যায়নি।
বালিয়ানের ঘরে যান আলী বিন সুফিয়ান। দুজন বৃদ্ধা চাকরানী ছাড়া আর কাউকে পেলেন না সেখানে। চাকরানীরা জানায়, বালিয়ানের ঘরে পাঁচটি মেয়ে ছিলো। তার নিয়ম ছিলো, যখন-ই কোন মেয়ের বয়স একটু বেড়ে যেতো, তাকে হাওয়া করে ফেলতো এবং তার স্থলে আসতো নতুন এক টগবগে যুবতী। তারা আরো জানায়, বিদ্রোহের আগে বালিয়ানের ঘরে একটি ফিরিঙ্গী মেয়ে এসেছিলো। মেয়েটি যেমন সুন্দরী, তেমনি বিচক্ষণ। দুদিন যেতে না যেতে বালিয়ান মেয়েটির গোলাম হয়ে গিয়েছিলো। বিদ্রোহের একদিন পরে যেদিন সুদানীরা অস্ত্রসমর্পণ করে, সেদিন রাতে বালিয়ান নিজে একটি ঘোড়ায় চড়ে এবং সেই ফিরিঙ্গী মেয়েটিকে অপর একটি ঘোড়ায় চড়িয়ে অজানার উদ্দেশ্যে উধাও হয়ে যায়। সাতজন অশ্বারোহীও ছিলো তার সঙ্গে। হেরেমের মেয়েদের ব্যাপারে বৃদ্ধারা জানায়, যে যা হাতে পেয়েছে, তুলে নিয়ে সবাই চলে গেছে।
ফিরে আসেন আলী বিন সুফিয়ান। হঠাৎ একটি ঘোড়া দ্রুত ছুটে এসে থেমে যায় তার সামনে। ফখরুল মিসরী তার আরোহী। ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে নীচে নামে সে। হাঁফাতে হাঁফাতে কম্পিত কণ্ঠে বললো, আমিও আপনার-ই ন্যায় নরাধম বালিয়ান ও কাফির মেয়েটিকে খুঁজছি। আমি তার থেকে প্রতিশোেধ নেবো। এদের দুজনকে হত্যা না করা পর্যন্ত আমার মনে শান্তি আসবে না। আমি জানি, সে কোন দিক গেছে। আমি তাকে ধাওয়াও করেছি। কিন্তু সঙ্গে তার সাতজন সশস্ত্র রক্ষী। আমি ছিলাম একা। রোম উপসাগরের দিকে যাচ্ছে লোকটা। কিন্তু যাচ্ছে সে সোজা পথ ছেড়ে বাঁকা পথে।
আলী বিন সুফিয়ানের হাত চেপে ধরে ফখরুল মিসরী বললো, আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি আমায় চারজন সিপাহী দিন; ধাওয়া করে আমি ওকে শেষ করে আসি।
আলী বিন সুফিয়ান তাকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, চারজন নয়, আমি তোমাকে বিশজন সিপাহী দেবো। এখনো সে উপকূল অতিক্রম করতে পারেনি। তুমি আমার সঙ্গে চলো। বালিয়ান কোনদিক গেলো সে ব্যাপারে নিশ্চিত হন আলী বিন সুফিয়ান।
***
মুবীকে নিয়ে বালিয়ান উপকূল অভিমুখে বহুদূর এগিয়ে গেছে। উপকূলগামী সাধারণ পথ ছেড়ে অন্য পথে এগুচ্ছে সে। এসব অঞ্চল-পথ-ঘাট বালিয়ানের চেনা। তাই নির্বিঘ্নে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে সে।
