এমনও হতে পারে, মুসলমানরা মেয়েগুলোর সঙ্গে ভাল আচরণ দেখিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তিতে ব্যবহার করবে। তখন আমাদের মারাত্মক, সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। এ কারণে ওদেরকে মুক্ত করে আনা একান্ত আবশ্যক। এর জন্য আমি আমার ভাণ্ডারের অর্ধেক সম্পদও উজাড় করতে প্রস্তুত আছি। বললেন রবার্ট।
আমাদের এ মেয়েগুলো শুধু এ কারণেই মূল্যবান নয় যে, এরা নারী। এরা প্রশিক্ষিত গুপ্তচর। এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে এদের মত মেয়ে আর পাবো কোথায়? . এমন মেয়ে আমরা কোথায় পাবো, যারা জাতি ও ধর্মের স্বার্থে–ক্রুশের স্বার্থে নিজেকে দুশমনের হাতে তুলে দেবে, দুশমনের ভোগ-বিলাসিতার উপকরণে পরিণত হবে এবং গুপ্তচরবৃত্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি করতে থাকবে। এ মিশনে তাদের সর্বপ্রথম বিলাতে হয় সম্ভ্রম। তদুপরি গুপ্তচর হিসেবে ধরা পড়ে গেলে কঠোর নির্যাতনের শিকার হয়ে জীবন হারাবার ভয় থাকে পদে পদে। এ মেয়েগুলোকে আমাদের বিপুল অর্থের বিনিময়ে অর্জন করতে হয়েছে। তারপর প্রশিক্ষণ দিয়ে বড় কষ্টে মিসর ও আরবের ভাষা শেখানো হয়েছে। আমি মনে করি, এভাবে একত্রে সাতটি মেয়ে হাতছাড়া করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বললো আগন্তুক গোয়েন্দা।
আচ্ছা, তুমি কি নিশ্চয়তা দিতে পারো, মেয়েগুলোকে আইউবীর ক্যাম্প থেকে বের করে আনা যাবে? জিজ্ঞেস করেন অগাস্টাস।
যাবে। এর জন্য প্রয়োজন বেশ কজন দুঃসাহসী সৈন্য। তবে হয়ত দু-একদিনের মধ্যে রবিন এবং তার সহকর্মী পুরুষ ও মেয়েদেরকে কায়রো নিয়ে যাওয়া হবে। তা-ই যদি হয়, তবে সেখান থেকে তাদেরকে বের করে আনা কঠিন হবে। সময় নষ্ট না করে উপকূলীয় ক্যাম্প থেকে-ই তাদেরকে মুক্ত করে আনা দরকার। আপনি বিশজন লোক দিন; আমি তাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবো। কিন্তু তারা হতে হবে এমন লোক, যারা জীবন নিয়ে খেলতে জানে। বললো গোয়েন্দা।
যে কোন মূল্যে মেয়েগুলোকে উদ্ধার করে আনা দরকার। গর্জে উঠে বললো এম্লার্ক।
খৃষ্টান বাহিনী রোম উপসাগরে যে শোচনীয় পরাজয় ও মর্মান্তিক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছিলো, তার প্রতিশোধ-স্পৃহায় পাগলের মতো হয়ে গেছে এশ্লার্ক। লোকটি ক্রুসেডারদের সম্মিলিত নৌ-বহর এবং তার আরোহী সৈন্যদের সুপ্রীম কমাণ্ডার হয়ে এ আশা বুকে নিয়ে অভিযানে বেরিয়েছিলো যে, মিসর দখলের পর জয়-মাল্য তার-ই গলায় ঝুলবে। কিন্তু সালাহুদ্দীন আইউবী মিসরের তীরে-ই ঘেঁষতে দিলেন না তাকে। বেচারা জ্বলন্ত জাহাজে জীবন্ত পুড়ে মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেয়েও পড়ে গেলো ঝড়ের কবলে। সেখান থেকে বেঁচে এসেছে মরতে মরতে। এখন কথা বলতে ঠোঁট কাঁপছে তার। কথায় কথায় টেবিল চাপড়িয়ে, নিজের উরুতে হাত মেরে মনের জ্বালা প্রশমিত করছে লোকটি। অবশেষে বললো
আমি মেয়েগুলোকেও মুক্ত করে আনবো, আইউবীকেও হত্যা করাবো। উদ্ধার করে এনে এ মেয়েগুলোকে মুসলমানদের সাম্রাজ্যের মূলোৎপাটনে ব্যবহার করবো।
আমি মনে-প্রাণে তোমাকে সমর্থন করি এম্লার্ক! এমন সুশিক্ষিত মেয়েদেরকে আমিও এত সহজে নষ্ট হতে দিতে চাই না। আপনাদের সকলেরই জানা আছে, সিরিয়ার হেরেমগুলোতে আমরা কি পরিমাণ মেয়ে ঢুকিয়ে রেখেছি। বেশ কজন মুসলমান গভর্নর ও আমীর তাদের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করছে। বাগদাদে আমাদের মেয়েরা আমীরদের হাতে এমন বেশ কজন লোককে হত্যা করিয়েছে, যারা ক্রুসেডের বিরুদ্ধে শ্লোগান তুলেছিলো। নারী আর মদ দিয়ে মুসলমানদের খেলাফতকে আমরা তিন ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছি, তাদের ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছি। খেলাফত এখন ত্রিধাবিভক্ত। আমোদ-বিলাসিতায় ডুবে যেতে শুরু করেছেন খলীফারা। অবশিষ্ট আছে শুধু দুটি লোক। যদি তারা দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকে, তাহলে তারা আমাদের জন্য স্বতন্ত্র এক বিপদ হয়ে থাকবে। একজন সালাহুদ্দীন আইউবী, অপরজন নুরুদ্দীন জঙ্গী। এদের একজনও যদি বেঁচে থাকে, তাহলে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করা আমাদের পক্ষে কঠিন হবে। সালাহুদ্দীন আইউবী যদি সুদানীদের বিদ্রোহ দমন করে-ই থাকে, তাহলে তার অর্থ হলো, লোকটি আমাদের ধারণা অপেক্ষাও বেশী ভয়ঙ্কর। তার বিরুদ্ধে ময়দানে মোকাবেলা করার পাশাপাশি নাশকতামূলক কার্যক্রমও আমাদের চালু করতে হবে। মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ-দলাদলি এবং অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য এ মেয়েগুলোকে আমাদের একান্ত প্রয়োজন। বললেন রেমন্ড।
আমাদের সকল অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। আমরা আরবে মুসলমানদের দুর্বলতা থেকে স্বার্থ উদ্ধার করেছি। মুসলমান নারী, মদ আর ঐশ্বর্য পেলে অন্ধ হয়ে যায়। মুসলমানদের নিঃশেষ করার উত্তম পন্থা হলো, এক মুসলমান দিয়ে আরেক মুসলমানকে হত্যা করানো। হাতে কটি টাকা গুঁজে দাও, দেখবে, অর্থের লোভে তারা তাদের সাধের দ্বীন ও ঈমান ত্যাগ করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হবে না। চেষ্টা করলে তোমরা অতি অনায়াসে মুসলমানের ঈমান ক্রয় করতে পারো। বললেন রবার্ট।
মুসলমানদের দুর্বলতা নিয়ে আলাপ চলে দীর্ঘক্ষণ। তারপর বন্দী মেয়েদের মুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে কথা ওঠে। শেষে সিদ্ধান্ত হয়, বিশজন দুঃসাহসী সেনা প্রেরণ করা হবে এ কাজে। আগামীকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত রওনা হয়ে যাবে তারা।
তৎক্ষণাৎ তলব করা হয় চারজন কমাণ্ডার। দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে তাদের বলা হলো, তোমাদের সহযোগিতার জন্য বিশজন সৈনিক বেছে নাও।
