এক সময়ে দিক-চক্ৰবাল আচ্ছন্ন করে আকাশে জেগে উঠে ঘোর কালো মেঘ। শুরু হয় প্রবল ঝড়। ঝড়ের কবলে পড়ে অসংখ্য শিশু-কিশোর-নারীসহ পানির নীচে তলিয়ে যায় এম্লার্কের জাহাজটি। অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় এম্লার্ক। প্রাণ নিয়ে পৌঁছে যায় ইটালীর তীরে।
বৈঠক চলছে। প্রশ্ন উঠেছে, খৃষ্টান বাহিনীকে এত বড় ধোঁকা কে দিলো? কার প্রতারণার ফাঁদে পড়ে এত শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হলো তাদের? সংশয় ব্যক্ত করা হয় সুদানী সালার নাজির উপর। তার-ই পত্রের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছিলো এ নৌ-অভিযান। নাজির সঙ্গে খৃষ্টানদের পত্ৰ-যোগাযোগ চলছিলো পূর্ব থেকেই। এ যাবৎ বেশ কটি পত্র দিয়েছে সে খৃষ্টানদের। খৃষ্টানরা নাজির সর্বশেষ যে পত্রটির উপর ভিত্তি করে এ অভিযানে নেমেছিলো, পূর্বের পত্রগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলো সেটি। কিছুটা অমিল পাওয়া গেলো। নাজির প্রতি সন্দেহ আরো গাঢ় হলো। কায়রোতে গুপ্তচরও ঢুকিয়ে রেখেছিলো তারা। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকেও কোন সংবাদ পায়নি খৃষ্টানরা। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যে বিশ্বাসঘাতক নাজি ও কুচক্রী সালারদের গোপনে হত্যা করে রাতের আঁধারে মাটিচাপা দিয়ে রেখেছেন, সে সংবাদ খৃষ্টানদের কানে পৌঁছানোর ছিলো না কেউ। খৃষ্টানদের সম্রাট-কর্মকর্তাগণ কল্পনাও করতে পারেননি, যে পত্রের উপর ভিত্তি করে তারা মিসর অভিমুখে নৌ-বহর প্রেরণ করেছিলেন, সে পত্রখানা নাজিরই ছিলো বটে; কিন্তু তার আক্রমণের তারিখ পরিবর্তন করে অন্য তারিখ লিখে দিয়েছিলেন সুলতান আইউবী। এসব তথ্য সংগ্রহ করা ছিলো খৃষ্টান গোয়েন্দাদের সাধ্যের বাইরে।
দীর্ঘ আলাপ-পর্যালোচনার পরেও কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারলো না এ. বৈঠক। কথা সরছে না এম্লার্কের মুখ থেকে। পরাজয়ের গ্লানিতে লোকটি যেমন ক্ষুব্ধ, তেমনি ক্লান্ত। পরদিনের জন্য মুলতবী করে দেয়া হয় বৈঠক।
রাতের বেলা। মদের আসর জমে উঠেছে খৃষ্টান কর্মকর্তাদের। নেশায় বুঁদ হয়ে পরাজয়ের গ্লানি মুছে ফেলতে চাইছে তারা। হঠাৎ সে আসরে আগমন ঘটে এক ব্যক্তির। রেমন্ড ছাড়া কেউ চেনে না তাকে।
লোকটি রেমন্ডের নির্ভরযোগ্য গুপ্তচর। হামলার দিন সন্ধ্যায় মিসরের তীরে এসে নেমেছিলো সে। তার-ই খানিক পর এসে পৌঁছে ক্রুসেডারদের নৌ-বহর। বহরটি সালাহুদ্দীন আইউবীর ক্ষুদ্র বাহিনীর হাতে ধ্বংস হয়েছিলো তার-ই চোখের সামনে।
বেশ কিছু তথ্য নিয়ে এসেছে লোকটি। রেমন্ড সকলের নিকট পরিচয় করিয়ে দেয় তাকে। রিপোর্ট জানবার জন্য তাকে ঘিরে ধরে সবাই। খৃষ্টান কর্মকর্তাগণ সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার জন্য রবিন নামক এক সুশিক্ষিত অভিজ্ঞ গুপ্তচরকে সমুদ্রোপকূলে প্রেরণ করেছিলো এবং তার সঙ্গে পাঁচজন পুরুষ ও সাতটি রূপসী যুবতাঁকে প্রেরণ করেছিলো, এ গুপ্তচর তাদের সম্পর্কে অবহিত।
আগন্তুক জানায়–রবিন জখমের বাহানা দেখিয়ে আহতদের সঙ্গে সালাহুদ্দীন আইউবীর ক্যাম্পে পৌঁছে গিয়েছিলো। তার পাঁচ পুরুষ সঙ্গী ছিলো বণিকের বেশে। তাদের একজন ক্রিস্টোফর যার নাম–নেপথ্য থেকে তীর ছুঁড়ে আইউবীর গায়ে। কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় তার তীর। ধরা পড়ে যায় পাঁচজনের সকলে। মেয়ে সাতটিকেও ধরে ফেলেন আইউবী। বেশ চমৎকার কাহিনী গড়ে নিয়েছিলো মেয়েরা। আইউবীকে শোনায় সে কাহিনী। মেয়েগুলোকে আশ্রয়ে রেখে পুরুষ পাঁচজনকে ছেড়ে দিয়েছিলেন আইউবী। কিন্তু তাঁর গোয়েন্দা প্রধান আলী বিন সুফিয়ান হঠাৎ এসে পড়ে গ্রেফতার করে ফেলেন তাদেরকে। পাঁচজনের একজনকে সকলের সামনে হত্যা করে অন্যদের থেকে কথা আদায় করেন তিনি।
গোয়েন্দা আরো জানায়, ধরা পড়ি আমিও। আইউবীর নিকট আমি নিজেকে ডাক্তার বলে পরিচয় দেই। তাই তিনি আমার উপর আহতদের ব্যাণ্ডেজ চিকিৎসার দায়িত্ব অর্পণ করেন। সেই সুযোগে আমি জানতে পারলাম, সুদানীরা বিদ্রোহ করেছিলো বটে; কিন্তু সালাহুদ্দীন আইউবী সে বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন করে ফেলেন। তিনি বিদ্রোহী অফিসার ও নেতাদের গ্রেফতার করেন।
রবিন, তার সহযোগী চার পুরুষ ও মেয়ে ছয়টি এখন আইউবীর হাতে বন্দী। তবে সপ্তম মেয়েটির–যে ছিলো সবচেয়ে বেশী বিচক্ষণ–তার কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এই নিখোঁজ মেয়েটির নাম মুবিনা এরতেলাস, সংক্ষেপে মুবী।
গোয়েন্দা জানায়, বন্দী রবিন ও তার সহকর্মীরা এখনো উপকূলীয় শিবিরেই রয়েছে। আইউবী ক্যাম্পে নেই। তার গোয়েন্দা প্রধান আলী বিন সুফিয়ানও অনুপস্থিত। আমি বড় কষ্টে ওখান থেকে বের হয়ে এসেছি। ঘাটে এসে একটি নৌকা পেয়ে গেলাম। দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে দ্রুত নদী পার হয়ে চলে আসি। রবিন ও তার সহকর্মী পুরুষ ও মেয়েরা মৃত্যুমুখে পতিত। পুরুষদের চিন্তা না হয় না-ই করলাম; কিন্তু মেয়েগুলোকে উদ্ধার করা তো একান্ত আবশ্যক। ওরা সকলেই যুবতী এবং আমাদের বাছা বাছা রূপসী মেয়ে। উদ্ধার করতে না পারলে মুসলমানরা ওদের কী দশা ঘটাবে, তাতে আপনারা বুঝতেই পারছেন।
এ ত্যাগ আমাদের দিতেই হবে। বললেন অগাস্টাস।
আপনি যদি আমাকে এ নিশ্চয়তা দিতে পারেন যে, সালাহুদ্দীন আইউবী আমাদের মেয়েদেরকে প্রাণে শেষ করেই ক্ষান্ত হবে; অন্য কোন নির্যাতনের শিকার তাদের হতে হবে না, তাহলে এ ত্যাগ স্বীকার করতে আমিও প্রস্তুত। কিন্তু এমনটি আশা করা বৃথা; মুসলমানরা ওদের সঙ্গে পশুর মত আচরণ করবে আর তাদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মেয়েগুলো আমাদেরকে অভিসম্পাত করবে। আমি তাদেরকে মুক্ত করে আনার চেষ্টা করবো। বললেন রেমন্ড।
