মেয়েরা পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। মাথা নাড়ে। আলী বিন সুফিয়ান বললেন–তোমরা কি আমার ভাষা বুঝছো?
মেয়েরা বিস্ময়ের সাথে আলীর প্রতি তাকিয়ে থাকে। আলী তাদের চেহারা ও হাবভাব দেখে সন্দেহে পড়ে যান। তিনি মেয়েগুলোর পিছনে গিয়ে দাঁড়ান। আরবীতে বলেন, পরনের পোশাক খুলে এদের উলঙ্গ করে ফেলো, চারজন হায়েনা চরিত্রের সেপাই ডেকে আনন।
চমকে উঠে মেয়েরা মোড় ঘুরে পিছন দিকে তাকায়। সমস্বরে কথা বলতে শুরু করে দু তিনজন। নিজেদের অলক্ষ্যে আরবীতেই বলছে তারা আমাদের সঙ্গে তোমরা এরূপ আচরণ করতে পারো না। একজন বললো–আমরা তো আর তোমাদের বিরুদ্ধে লড়ছি না।
মুখ থেকে হাসি বেরিয়ে আসে আলী বিন সুফিয়ানের। বললেন–আমি তোমাদের সঙ্গে অনেক ভালো ব্যবহার করবো। এক ধমকে-ই আরবী বুঝাতে ও বলতে শুরু করেছে। বড় ভালো মেয়ে তোমরা। এবার ধমক ছাড়াই বলে দাও, সপ্তম মেয়েটি কোথায়।
সকলেই অজ্ঞতা প্রকাশ করে। আলী বললেন–এ প্রশ্নের যথাযথ জবাব আমি তোমাদের থেকে নিয়েই ছাড়বো। সুলতানকে বলেছিলে, তোমরা আরবী জানো না। আর এখন কিনা আমাদের মতোই আরবী বলছে। আমি কি তোমাদের এমনিতেই ছেড়ে দেবো? আলী বিন সুফিয়ান সান্ত্রীকে বললেন–এদেরকে তাঁবুর ভেতরে বসিয়ে রাখে।
রাতের প্রহরী এসে গেছে। আলী বিন সুফিয়ান ফখরুল মিসরীর ডিউটির সময়কার প্রহরীদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। মেয়েদের তাঁবুর প্রহরী জানায়, ফখরুল রাতে তাকে, এখানে দাঁড় করিয়ে রেখে জখমীদের তাঁবু দিকে গিয়েছিলো। খানিক পর আমি তার কণ্ঠ শুনতে পাই–কে তুমি? নীচে নেমে আসো। আমি সেদিকে দৃষ্টিপাত করে অন্ধকারে কিছুই দেখলাম না। সম্মুখে মাটির টিলার উপর ছায়ার মতো কী যেন দেখলাম। পরক্ষণেই ছায়াটি অদৃশ্য হয়ে গেলো।
তৎক্ষণাৎ আলী বিন সুফিয়ান ছুটে গেলেন সেখানে। টিলাটি উপকূলের সন্নিকটে। বালুকাময় মাটি। একস্থানে দু মাপের দুটি পায়ের ছাপ পাওয়া গেলো। একটি সামরিক বুট পরিহিত পুরুষের। অপরটি ছোট জুতার ছাপ মেয়েলি বলে মনে হলো। মেয়েলি চিহ্নটি যেদিক থেকে এসেছে, আলী বিন সুফিয়ান ছুটে যান সেদিকে। এই চিহ্নটি তাকে নিয়ে যায় সেই তাঁবুর কাছে, যেখানে মুবী মিলিত হয়েছিলো রবিনের সঙ্গে। আলী বিন সুফিয়ান তাঁবুর পর্দা তুলে ভেতরে ঢুকে যান।
এক এক করে জখমী কয়েদীদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন আলী বিন সুফিয়ান। সকলের চেহারা পরিমাপ করেন তিনি। রবিন বসে আছে। আলী বিন সুফিয়ানকে দেখামাত্র কোকাতে শুরু করে সে। হঠাৎ ব্যথা উঠেছে তার। আলী বিন সুফিয়ান কাঁধে ধরে দাঁড় করিয়ে তাঁবুর বাইরে নিয়ে যান তাকে। জিজ্ঞেস করেন–রাতে তোমার তাঁবুতে একটি কয়েদী মেয়ে এসেছিলো। কেন এসেছিলো? রবিন কোন জবাব না দিয়ে আলীর প্রতি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, যেন সে কিছুই বুঝছে না। আলী বিন সুফিয়ান ক্ষীণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন–তুমি কি আমার ভাষা বুঝ দোস্ত! আমি কিন্তু তোমার ভাষা বুঝি এবং বলতেও পারি। তোমাকেও আমার ভাষায়-ই জবাব দিতে হবে। কিন্তু রবিন অপলক চোখে তাকিয়ে-ই আছে, আলীর প্রতি। আলী বিন সুফিয়ান সান্ত্রীকে বললেন–একে তাঁবুর বাইরে রাখো।
আলী বিন সুফিয়ান তাঁবুতে প্রবেশ করেন। অন্যান্য কয়েদীদের তাদের ভাষায় জিজ্ঞেস করেন–রাতে মেয়েটি এ তাঁবুতে কতক্ষণ ছিলো? সত্য কথা বলো, অযথা নিজেদের কষ্টে ফেলো না।
কথা বলছে না কেউ । ধমকি দেন আলী বিন সুফিয়ান। এবার এক জখমী বললো, একটি মেয়ে রাতে তাঁবুতে এসেছিলো এবং রবিনের শয্যায় বসে বা শুয়ে ছিলো।
এ লোকটি জ্বলন্ত জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছিলো। আগুন এবং পানি দুয়ের-ই লীলা দেখে এসেছে লোকটি। যত ভীত ততটা আহত নয়। তবে তৃতীয় আর কোন বিপদে পড়তে প্রস্তুত নয় সে। সে জানায়, রবিন ও আগত মেয়েটির মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছে, তা তার জানা নেই। মেয়েটি কে, তা-ও সে বলতে পারে না। রবিনের পদ কি, তাও তার অজানা। সে জানায়, ক্যাম্পে আসার পূর্ব পর্যন্ত লোকটি সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলো। এখানে আসার পর-ই সে এভাবে কোঁকাতে শুরু করেছে।
এক প্রহরীর দিক-নির্দেশনায় আলী বিন সুফিয়ান সেই পাঁচ ব্যক্তিকে দেখার জন্য চলে যান, যারা বণিক বেশে কিছু দূরে তাঁবু ফেলে অবস্থান করছে। আলীর রক্ষীরা আলাদাভাবে এক স্থানে বসিয়ে রেখেছে তাদের। রক্ষীরা আলী বিন সুফিয়ানকে তথ্য প্রদান করে, কাল এদের নিকট দুটি উট ছিলো; আজ আছে একটি। বিচক্ষণ গোয়েন্দা প্রধান আলীর জন্য এতটুকু ইঙ্গিতই যথেষ্ট। অপর উটটি কোথায় গেলো, বণিকদের কাছে তার সন্তোষজনক কোন জবাব পাওয়া গেলো না। অনুসন্ধানে নেমে পড়েন আলী বিন সুফিয়ান। উধাও হওয়া উটের পদচিহ্ন পেয়ে গেলেন তিনি। বণিকদের বললেন–তোমরা সাধারণ কোন অপরাধে অপরাধী নও। অন্যায় তোমাদের গুরুতর। তোমরা গোটা একটি সাম্রাজ্য এবং তার সকল নাগরিকের জন্য বিপজ্জনক। তাই তোমাদের প্রতি আমি এতটুকু সহানুভূতি প্রদর্শন করতে পারি না। বলো তো, তোমরা কি ব্যবসায়ী?
হ্যাঁ, আমরা ব্যবসায়ী জনাব! আমরা নিরপরাধ। মাথা লেড়ে জবাব দেয় সকলে।
আলী বিন সুফিয়ান বললেন–তোমাদের সকলের হাতের উল্টা দিকটা একটু দেখাও দেখি। সকলে নিজ নিজ হাত উল্টো করে আলী বিন সুফিয়ানের সামনে এগিয়ে ধরে। আলী সকলের বাঁ হাতের বৃদ্ধা ও তর্জনী আঙ্গুলের মাঝখানটা দেখেন এবং একজনের বাহু ধরে সামনে নিয়ে আসেন। বললেন–ধনুক-তূনীর কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস বল!
