আমি সব সময় এদেরকে-ই ভয় পাই। আল্লাহ না করুন, ইসলামের নাম যদি কখনো ডুবে যায়, ডুববে মুসলমানদের-ই হাতে। আমাদের ইতিহাস গাদ্দারদের ইতিহাসে পরিণত হতে যাচ্ছে। আমার মন বলছে, একদিন মুসলমানরা নিজেদের ভিটেমাটি কাফিরদের হাতে তুলে দেবে। মুসলমান যদি কোথাও বেঁচে থাকে, সেখানে মসজিদ থাকবে কম, গান-বাজনা ও বেশ্যালয় থাকবে বেশী। আমাদের মুসলিম পুরুষরা বুকে ক্রুশ ঝুলিয়ে গর্ববোধ করবে আর মেয়েরা আধুনিকতা-স্বাধীনতার নামে বেহায়ার মত রাস্তায় চলাচল করবে। আমি মুসলিম মিল্লাতের পতনের ঘনঘটা শুনতে পাচ্ছি আলী! তবে হাল ছাড়া যাবে না। তুমি তোমার বিভাগকে আরো সুসংহত, শক্তিশালী করো। দুশমনের এলাকায় গিয়ে কমাণ্ডে আক্রমণ এবং তথ্য সংগ্রহের জন্য শক্ত-সামর্থ ও বিচক্ষণ যুবকদের খুঁজে বের করো। খৃষ্টানরা দিন দিন শক্তিশালী ও সক্রিয় হচ্ছে। তোমাকে এক্ষুণি যে কাজটি করতে হবে, তা হলো, সমুদ্র থেকে যেসব খৃষ্টান সেনা জীবনে রক্ষা পেয়েছে, তাদের অধিকাংশ আহত। যারা আহত নয়, তারাও দিনের পর দিন সমুদ্রে সাঁতার কাটার ফলে আহতদের অপেক্ষাও বেশী বিপর্যস্ত। তাদের সকলের চিকিৎসা চলছে। আমি তাদের সকলকে দেখেছি। তুমি তাদের এক নজর দেখে নাও এবং জরুরী তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করো। বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।
দারোয়ানকে ডেকে নাস্তা আনতে বললেন সুলতান আইউবী। তারপর আলী বিন সুফিয়ানের প্রতি মুখ ফিরিয়ে বলতে শুরু করলেন–গতকাল কয়েকজন আহত পুরুষ ও কয়েকটি মেয়েকে আমার সামনে হাজির করা হয়েছিলো। ছয়জন সমুদ্র থেকে উদ্ধার পাওয়া কয়েদী। তাদের একজনের প্রতি আমাদের সন্দেহ হয়, লোকটা সাধারণ সেপাই নয়। পদস্থ কোন অফিসার বোধ হয়। তুমি সর্বাগ্রে তার সাথে কথা বলো। আর পাঁচজন ব্যবসায়ী সাতটি খৃষ্টান মেয়েকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলো।
ব্যবসায়ীরা সুলতান আইউবীকে যা বলেছিলো, তিনি আলী বিন সুফিয়ানকে তা শোনান। তিনি বললেন, আমি মেয়েগুলোকে মূলত বন্দী করেছি, যদিও তাদেরকে আশ্রয় দেয়ার কথা বলেছি। এই যে মেয়েগুলো বললো, তারা গরীব পরিবারের সন্তান, জ্বলন্ত জাহাজ থেকে নামিয়ে একটি নৌকায় বসিয়ে তাদের ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে এবং নৌকা তাদেরকে কূলে এনে ফেলেছে, এসব বক্তব্য আমাকে সন্দেহে ফেলে দিয়েছে। আমি তাদেরকে একটি পৃথক তাঁবুতে রেখেছি এবং প্রহরার জন্য একজন সান্ত্রী দাঁড় করিয়ে রেখেছি। নাস্তাটা খেয়ে-ই তুমি ঐ কয়েদি আর মেয়েগুলোর কাছে চলে যাও।
অবশেষে সুলতান আইউবী মুখে মুচকি হাসি টেনে বললেন–গতকাল দিনের বেলা আমি উপকূলে টহল দিচ্ছিলাম। হঠাৎ আমার প্রতি কোন দিক থেকে যেন একটা তীর ছুটে আসে। তীরটি আমার দু পায়ের মাঝে বালিতে এসে বিদ্ধ হয়।
সালাহুদ্দীন আইউবী তীরটি আলী বিন সুফিয়ানকে দেখিয়ে বললেন, এলাকাটা ছিলো পর্বতময়। রক্ষীরা চারদিকে খোঁজাখুঁজি করেও কোন তীরান্দাজের দেখা পায়নি। পাওয়া গেছে এই পাঁচজন ব্যবসায়ী। রক্ষীরা তাদেরকে আমার কাছে ধরে নিয়ে আসে। এই সাতটি মেয়েকে তারা আমার হাতে তুলে দিয়ে চলে গেছে।
কী বললেন, তারা চলে গেছে! আপনি তাদের যেতে দিলেন! বিস্মিত কণ্ঠে বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
রক্ষীরা তাদের তল্লাশী নিয়েছিলো, তাদের কাছে সন্দেহজনক কিছুই পাওয়া যায়নি। বললেন সুলতান আইউবী।
তীরটি হাতে নিয়ে নিরীক্ষা করে দেখেন আলী বিন সুফিয়ান। বললেন, সুলতান আর গুপ্তচরের দৃষ্টিতে অনেক পার্থক্য। সর্বাগ্রে আমি ঐ ব্যবসায়ীদের ধরার চেষ্টা করবো।
আলী বিন সুফিয়ান সুলতান আইউবীর তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসলে দারোয়ান বললো, এই কমাণ্ডার সংবাদ নিয়ে এসেছেন, কাল যে সাতটি মেয়েকে আটকে রাখা হয়েছিলো, তাদের একজনের খোঁজ নেই। সুলতানকে সংবাদটা জানানোর প্রয়োজন আছে কি?
গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন আলী বিন সুফিয়ান। সংবাদদাতা কমাণ্ডার আলীর নিকটে এসে বললো–একটি খৃষ্টান মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা, অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ হলো, ফখরুল মিসরী নামক কমাণ্ডার রাত থেকে উধাও। রাতের সান্ত্রীরা জানিয়েছে, ফখরুল মিসরী মেয়েদের তাঁবুর নিকট গিয়েছিলো। সেখান থেকে গেছে জখমীদের তাঁবুর দিকে। তারপর আর তাকে দেখা যায়নি। রাতে সে টহল দিতে বেরিয়েছিলো।
খানিকটা চিন্তা করে আলী বিন সুফিয়ান বললেন, এ সংবাদ সুলতানকে এখনই দিও না। ফখরুল মিসরী রাতের যে সময়ে ডিউটিতে গিয়েছিলো, তখনকার সব সান্ত্রীকে সমবেত করো। আলী সুলতান আইউবীর রক্ষী বাহিনীর কমাণ্ডারকে বললেন, গতকাল যে রক্ষী ইউনিটটি সুলতানের সঙ্গে উপকূল পর্যন্ত গিয়েছিলো, তাদেরও আসতে বললো।
রক্ষীরা সেখানেই উপস্থিত ছিলো। সামনে এগিয়ে আসে চারজন। আলী বিন সুফিয়ান বললেন–কাল যেখানে তোমরা ব্যবসায়ী ও মেয়েদের দেখেছিলে, এক্ষুণি সেখানে চলে যাও। ব্যবসায়ীরা যদি এখনো সেখানে থাকে, তাহলে তাদের আটক করে ফেলল। আর যদি না পাও, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এসো।
রক্ষীরা রওনা হয়ে যায়। আলী বিন সুফিয়ান মেয়েদের তাঁবুর নিকট চলে যান। ছয়টি মেয়ে তাঁবুর বাইরে বসে আছে। সান্ত্রী দাঁড়িয়ে। মেয়েদের এক সারিতে দাঁড় করান আলী বিন সুফিয়ান। আরবীতে জিজ্ঞেস করেন–সপ্তম মেয়েটি কোথায়?
