আনন্দের আতিশয্যে নাজি বাহুবন্ধনে জড়িয়ে ধরলো মেয়েটিকে। নাজি ও জোকিকে মোবারকবাদ জানিয়ে ঈদরৌস বেরিয়ে যায় তাঁবু থেকে।
***
মরুর রহস্যময় রাতের উদর থেকে জন্ম নিলো যে প্রভাত, তা অন্য কোন প্রভাতের চেয়ে ব্যতিক্রম ছিলো না। তবে প্রভাত-কিরণ তার আঁধার বক্ষে লুকিয়ে রেখেছিলো এমন একটি গোপন রহস্য, যার দাম সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর স্বপ্নের সালতানাতে ইসলামিয়ার মূল্যের সমান, যে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে যৌবন লাভ করেছেন সুলতান আইউবী।
গত রাতে এ মরুদ্যানে যে ঘটনাটি ঘটলো, তার দিক ছিলো দুটি। একটি দিক সম্পর্কে অবগত ছিলেন শুধু নাজি আর ঈদরৌস। অপর দিক সম্পর্কে অবহিত ছিলো সুলতান আইউবীর রক্ষী বাহিনী। আর সুলতান আইউবী, গোয়েন্দা প্রধান আলী বিন সুফিয়ান ও জোকীর জানা ছিলো ঘটনার উভয় দিক।
সুলতান আইউবী ও তাঁর সহকর্মীদের মর্যাদার সাথে বিদায় জানান নাজি। পথের দু ধারে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে সুলতান আইউবী জিন্দাবাদ স্লোগান দিচ্ছে সুদামী ফৌজ। কিন্তু এই শ্লোগানের কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন না সুলতান। সামান্য একটু হাসির রেখাও দেখা গেলো না তার দু ঠোঁটের ফাঁকে। ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসেন সুলতান। অত্যন্ত গম্ভীর মুখে নাজির সঙ্গে করমর্দন করে ছুটে চলেন তিনি।
হেড কোয়ার্টারে পৌঁছে সুলতান আইউবী আলী বিন সুফিয়ান ও এক নায়েবকে সঙ্গে করে কক্ষে প্রবেশ করেন। বন্ধ হয়ে যায়, কক্ষের দরজা। বেলা শেষে রাত নামে। আঁধারে ছেয়ে যায় প্রকৃতি। বাইরের সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই কক্ষের এই তিনটি প্রাণীর। খাবার তো দূরের কথা, এত সময়ে এক ফোঁটা পানিও ঢুকলো না কক্ষে। কক্ষের দরজা খুলে যখন তিনজন বাইরে বের হন, রাত তখন দ্বি-প্রহর।
কক্ষ থেকে বেরিয়ে চলে যান আইউবী। রক্ষী বাহিনীর এক কমাণ্ডার আলী বিন সুফিয়ানের কাছে এগিয়ে এসে বিনীত সুরে বললো–মোহতারাম! বিনা বাক্যব্যয়ে আপনাদের আদেশ মান্য করে চলা আমাদের কর্তব্য। তথাপি একটি কথা না বলে পারছি না। আমার ইউনিটে এক রকম হতাশা ও অনাস্থা সৃষ্টি হয়ে গেছে। আমি নিজেও তার শিকার হতে চলেছি।
কেমন হতাশ? জানতে চান আলী বিন সুফিয়ান।
আমার অভিযোগকে যদি আপনি গোস্তাখী মনে না করেন, তবেই বলবো। আমাদের মহামান্য গভর্নরকে আমরা আল্লাহর প্রিয় বান্দা মনে করতাম এবং সর্বান্তকরণে তার প্রতি ছিলাম উৎসর্গিত। কিন্তু রাতে ………। বললো কমাণ্ডার।
রাতে সুলতান আইউবীর তাঁবুতে একটি নর্তকী গিয়েছিলো, তা-ই তো? তুমি কোন গোস্তাখী করোনি। অরাধ গভর্নর করুন কিংবা ভূত্য করুক, শাস্তি। দুজনের-ই সমান। পাপ সর্বাবস্থায়-ই পাপ । তবে আমি তোমাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, আমীরে মেসের ও নর্তকীর নির্জন মিলনের সঙ্গে পাপের কোন সংশ্রব ছিলো না। বিষয়টা কী ছিলো, তা এখনই বলবো না; সময়ে তোমরা সবই জানতে পারবে। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
আলী বিন সুফিয়ান কমাণ্ডারের কাঁধে হাত রেখে বললেন, মন দিয়ে আমার কথাগুলো শোন আমের বিন সালেহ! তুমি একজন প্রবীণ সৈনিক। তোমার ভালো করেই জানা আছে, সেনাবাহিনী ও সেনা কর্মকর্তাদের এমন কিছু গোপন–রহস্য থাকে, যার সংরক্ষণ আমাদের সকলের কর্তব্য। নর্তকীর আমীরে মেসেরের তাঁবুতে রাত কাটানোও তেমনি এক রহস্য। তুমি তোমাদের জানবাজদের কোন সংশয়ে পড়তে দিও না। রাতে সুলতানের তাঁবুতে কী ঘটেছিলো, তা নিয়ে কাউকে ভুল বুঝবার সুযোগ দিও না।
আলী বিন সুফিয়ানের বক্তব্যে কমাণ্ডার নিশ্চিত হয়ে যায়। দূর হয়ে যায় তার মনের সব সন্দেহ। বাহিনীর অন্য সকলের মনের খটকাও দূর করে ফেলে সে।
পরদিন দুপুর বেলা। আহার করছেন সুলতান আইউবী। ইত্যবসরে সংবাদ আসে, নাজি আপনার সাক্ষাৎ প্রার্থনা করছে। সুলতানের খাওয়া শেষ হলে কক্ষে প্রবেশ করেন নাজি। তার চেহারা বলছে, লোকটা সন্ত্রস্ত ও ক্ষুব্ধ। খানিকটা চড়া গলায় বললো, মহামান্য আমীর! এ-কি আদেশ জারি করলেন আপনি! পঞ্চাশ হাজার অভিজ্ঞ সুদানী ফৌজকে মিসরের এই আনাড়ী বাহিনীর মধ্যে একাকার করে দিলেন!
হ্যাঁ, নাজি! আমি গতকাল সারাটা দিন এবং আধা রাত ব্যয় করে এবং গভীরভাবে ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তুমি যে বাহিনীটির সালার, তাকে মিসরী বাহিনীর সঙ্গে এমনভাবে একাকার করে ফেলবো যে, প্রতিটি ইউনিটে সুদানী সৈন্যের সংখ্যা থাকবে মাত্র দশ শতাংশ। আর এতক্ষণে তুমিও নির্দেশ পেয়ে গেছো, তুমি আর এখন সে বাহিনীর সালার নও, তুমি সেনা হেডকোয়ার্টারে চলে আসবে।
মহারাজ! আপনি আমাকে এ কোন্ পাপের শাস্তি দিচ্ছেন? বললেন নাজি।
আমার এ সিদ্ধান্ত যদি তোমার মনঃপূত না হয়ে থাকে, তাহলে তুমি আমার সেনাবাহিনী থেকে সরে দাঁড়াও। বললেন সুলতান আইউবী।
আমি বোধ হয় ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছি। আমি, আপনার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন মনে করি। হেডকোয়ার্টারে আমার অনেক শত্রু আছে।
শোন! প্রশাসন ও সেনাবাহিনী থেকে ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা যেন চিরতরে দূর হয়ে যায়, তার জন্যই আমার এ সিদ্ধান্ত। আরেকটি কারণ, আমি চাই সেনাবাহিনীতে যার পদমর্যাদা যত উঁচু হোক কিংবা যত নিচু, যেন কেউ মদপান ও ব্যভিচার না করে এবং কোন সামরিক মহড়ায় নাচ-গান না হয়। বললেন, সুলতান আইউবী।
