কম্পিত কণ্ঠে বললো–বাইরে এক নর্তকী দাঁড়িয়ে আছে। ও বলছে হুজুর জাঁহাপনা নাকি তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন?
হ্যাঁ, পাঠিয়ে দাও। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন আইউবী।
বেরিয়ে এলো কমাণ্ডার।
আইউবীর তাঁবুতে প্রবেশ করলো জোকি। প্রহরীদের ধারণা, এক্ষুণি সালাহুদ্দীন আইউবী নর্তকীকে তাঁবু থেকে বের করে দেবেন। তারা আমীরের সে নির্দেশের জন্যে তাঁবুর কাছেই অপেক্ষা করছিলো। কিন্তু না। এমন কোন আওয়াজ ভিতর থেকে এলো না।
রাত বাড়ছে। ভিতর থেকে ভেসে আসছে ফিসফিস কণ্ঠস্বর। অস্থির পায়চারী করছে দেহরক্ষী কমাণ্ডার। তাঁর মাথায় তোলপাড় করছে আকাশ-পাতাল ভাবনা। এক প্রহরী কমাণ্ডারকে বলেই বসলো–ও….. যত আইন শুধু আমাদের বেলায়
হ্যাঁ, আইন আর শাসন অধীনদেরই জন্য। শাস্তির যত খড়গ প্রজাদের জন্যে। বললো এক সিপাই।
মিসরের আমীরের জন্যে কি দোররার শাস্তি প্রযোজ্য নয়? বললো অন্য এক সিপাই।
না, রাজা-বাদশার কোন শাস্তি হয় না–ঝাঝের কণ্ঠে বললো কমাণ্ডার হয়ত সালাহুদ্দীন আইউবী মদও পান করেন। আমাদের উপর কঠোর শাসনের দণ্ড ঠিক রাখতে প্রকাশ্যে একটা পবিত্রতার ভান করেন মাত্র।
একটি মাত্র ঘটনায় সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রতি সৈনিকদের এত দিনের বিশ্বাস কপুরের মত উড়ে গেলো। এতদিন যাদের কাছে সালাহুদ্দীন ছিলেন একজন ইসলামী আদর্শের মূর্তপ্রতীক, সে স্থলে তাদের কাছে এখন তিনি ভালো মানুষীর ছদ্মাবরণে পাপাচারে আকণ্ঠ নিমজ্জিত বিলাসী চরিত্রহীন এক আরব শাহজাদা।
নাজি আজ পরম উফুল্ল। সালাহুদ্দীন আইউবীকে ঘায়েল করার সাফল্যে আজ মদ স্পর্শ করেনি সে। আনন্দে দুলছে লোকটা। সহকারী ঈদরৌসও নাজির তাঁবুতে বসা।
গেলো তো অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। মনে হয় আমাদের তীর সালাহুদ্দীন আইউবীর অন্তর ভেদ করেছে। মন্তব্য করলো ঈদরৌস।
আমার নিক্ষিপ্ত তীর কবে আবার ব্যর্থ হলো?
বলতে বলতে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো নাজি। ব্যর্থ হলে দেখতে, আমাদের ছোঁড়া তীর সাথে সাথে আমাদের দিকেই ফিরে আসতো।
আপনি ঠিকই বলেছেন। মানবরূপী একটা যাদুর কাঠি জোকি। বললো ঈদরৌস। মনে হয় ও হাশীশীদের সাথে কখনো থেকে থাকবে। না হয় মেয়েটা আইউবীর এমন পাথরের মূর্তি ভাঙ্গল কী করে।
আমি ওকে যে প্রশিক্ষণ দিয়েছি, হাশীশীরা তা কল্পনাও করতে পারবে না। সাফল্যের ভঙ্গিতে বললেন নাজি। এখন আইউবীর গলা দিয়ে মদ ঢুকানোর কাজটি শুধু বাকি।
কারো পায়ের শব্দে লাফিয়ে উঠে তাঁবুর বাইরের এলেন নাজি। না, জোকি নয়। এক প্রহরী স্থান বদল করতে হেঁটে যাচ্ছে। নাজি আইউবীর তাঁবুর দিকে তাকালেন। দরজায় পর্দা ঝুলানো। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে প্রহরী।
বিজয়ের হাসিমাখা কণ্ঠে তাঁবুর ভিতরে বসতে বসতে নাজি বললেন এখন আমি নিশ্চিত বলতে পারি, আমার জোকি এতক্ষণে পাথর গলিয়ে পানি করে ফেলেছে।
***
রাতের শেষ প্রহর। আইউবীর তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলো জোকি। নাজির তাঁবুতে না গিয়ে উল্টা দিকে রওনা দিলো ও। পথেই আপাদমস্তক কাপড়ে আবৃত এক ব্যক্তি দাঁড়ানো। ক্ষীণ আওয়াজে ডাকলেন জোকি! দ্রুত পায়ে জোকি চলে গেলো লোকটির কাছে। লোকটি জোকিকে নিয়ে একটি তাঁবুতে প্রবেশ করলো।
জোকি অনেকক্ষণ কাটালো ওই তাঁবুতে। তারপর বেরিয়ে সোজা হাঁটা দিলো নাজির তাঁবুর দিকে।
নাজি তখনও জাগ্রত। বারকয়েক তাকিয়ে দেখেছে আইউবীর তাঁবুর দিকে। সে জোকির আগমনের প্রতীক্ষায়। কিন্তু জোকিকে আসতে দেখেনি। তার ধারণা, জোকি সালাহুদ্দীন আইউবীকে রূপের মায়াজালে আবদ্ধ করেছে। আসমানের সুউচ্চ অবস্থান থেকে বিচ্যুত করে জোকি তার মর্যাদাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে।
ঈদরৌস! রাত তো প্রায় শেষ। ও-তে এখনো এলো না!
ও আর আসবেও না–বললো ঈদরৌস–আমীর তাকে সাথে নিয়ে যাবে। এমন হীরের টুকরোকে শাহজাদারা কখনো ফিরিয়ে দেয় না–এ কথাটি কখনো আপনি ভেবেছেন কি মাননীয় সেনাপতি?.
না তো! এ দিকটি আমি মোটেও ভাবিনি।
এমনও হতে পারে যে, আমীর জোকিকে বিয়ে করে ফেলবেন–বললো ঈদরৌস–তখন আর মেয়েটি আমাদের কাজের থাকবে না।
ও খুব সতর্ক মেয়ে। অবশ্য নর্তকীদের উপর ভরসা করা যায় না। তাছাড়া জোকি পেশাদার নর্তকী মেয়ে। এ ধরনের কাজে সে অভিজ্ঞ। ধোকা দেয়াটা অস্বাভাবিক নয়। বললেন নাজি।
গভীর চিন্তায় ডুবে গেছে নাজি। তার এতক্ষণের সাফল্যের ঝিলিককে ঘন মেঘমালার আড়ালে হারিয়ে দিয়েছে বিপরীত চিত্তা। এমন সময় পর্দা ফাঁক করে তাঁবুতে প্রবেশ করলো জোকি। হাসতে হাসতে বললো, এবার আমায় ওজন করুন আর পাওনা চুকিয়ে দিন।
আগে বল কী করে এলে? পরম আগ্রহে জিজ্ঞেস করলেন নাজি।
আপনি যা চাচ্ছিলেন, তা-ই করেছি। কে বললো, আপনাদের সালাহুদ্দীন আইউবী পাথর? আবার উনি নাকি ইস্পাতের মত ধারালো, মুসলমানদের জন্যে আল্লাহর রহমতের ছায়া?
পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলীর নখ দিয়ে মাটি খুঁড়তে খুড়তে জোকি বললো, সে এখন এই বালু কণার চেয়েও হালকা। এখন সামান্য বাতাসই উড়িয়ে নিয়ে যাবে তাঁকে।
তোমার রূপের যাদু আর কথার মন্ত্র তাকে বালুতে পরিণত করেছে বললো ঈদরৌস–নয়তো হতভাগা পাথুরে পর্বতই ছিলো।
ছিলো বটে, তবে এখন বালিয়াড়িও নয়।
আমার সম্পর্কে কোন কথা হয়েছে কি? জিজ্ঞেস করেন নাজি।
হ্যাঁ, হয়েছে। সালাহুদ্দীন আইউবী জিজ্ঞেস করেছেন, নাজি কেমন মানুষ। আমি বলেছি, মিসরে যদি আপনার কারো উপরনির্ভর করতে হয়, সেই লোকটি একমাত্র নাজি। তিনি জানতে চেয়েছেন, আমি আপনাকে কিভাবে চিনি? বলেছি, নাজি আমার পিতার অন্তরঙ্গ বন্ধু। তিনি আমাদের বাড়িতে যেতেন এবং আমার পিতাকে বলতেন, আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর গোলাম। তিনি যদি আমাকে উত্তাল সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলেন, নির্ধিধায় আমি তা করতে প্রস্তুত। তারপর তিনি বললেন, তুমি তো সতী-সাধ্বী মেয়ে। বললাম, আমি আপনার দাসী; আপনার যে কোন আদেশ আমার শিরোধার্য। তিনি বললেন, কিছু সময় তুমি আমার কাছে বসে থাক। আমি তার পার্শ্বে গা ঘেষে বসে পড়লাম। মুহূর্ত মধ্যে তিনি মোম হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণের জন্য আমরা দুজন প্রেমের অতল সমুদ্রে হারিয়ে গেলাম। পরে তিনি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বললেন, জীবনে আমি এই প্রথমবার পাপ করলাম; তুমি আমায় ক্ষমা করে দিও। আমি বললাম, না, আপনি কোন পাপ করেননি। আমার সঙ্গে আপনি প্রতারণাও করেননি, জোর-জবরদস্তিও নয়। রাজা-বাদশাহদের ন্যায় আদেশ দিয়ে আপনি আমায় ডেকে আনেননি। আমি নিজেই এসে স্বেচ্ছায় আপনার হাতে ধরা দিয়েছি। আসবো আবারো। বললো জোকি।
