কিন্তু সে অদ্ভুত সব কাজ করতো। কখনো আলগা দাড়ি ও শিখদের পাগড়ি লাগিয়ে শিখ পণ্ডিত সেজে শহরে ঘুরে বেড়াতো। কখনো চৌধুরী জমিদারদের মতো কলিদার জামা-সেলওয়ার ও পাগড়ি মাথায় দিয়ে কয়েক দিন শহরে শহরে ঘুরে বেড়াতো।
আবার একবার জটধারী হিন্দু সন্যাসী সেজে বিভিন্ন জায়গার হিন্দুদের ঘর থেকে বেশ পয়সা কামিয়ে নেয়। সেগুলো দিয়ে বন্ধু বান্ধবদের কয়েক দিন মৌজ করে। গলার সুর ছিলো তার অসাধারণ। যে কোন লোককে পাগল করে দেয়ার মতো। এছাড়া তার বিরুদ্ধে থানায় কোন রিপোর্ট নেই। কেউ তার বিরুদ্ধে কোন নালিশও জানায়নি কোন দিন।
আই.এস.আই, সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট দিয়ে আসামীকে আমার সামনে হাজির করলো।
আশ্চর্য। আসামীর মুখে মুচকি মুচকি হাসি। যেন আমাকে বিদ্রূপ করছে। তার চোখ দুটিও সুস্থ-উজ্জল দৃষ্টি।
তার মৃদু হাসির প্রভাবেই না অন্যকোন কারণে জানি না। আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেলো
ওর হাত কড়া খুলে দাও……… আর তুমি বসো সারমুদ।
তার হাতকড়া খুলে দেয়া হলো, আমার সামনের চেয়ারে সে সহজ হয়ে বসে পড়লো।
এটা কেমন ড্রামা খেললে সমুদ?- আমি জিজ্ঞেস করলাম।
আপনিই বলুন, এখনও কি ড্রামা রয়েছে?- সে হাসিমুখে বললো।
ওর যেন এই অনুভূতিটুকুও নেই যে, তার এই নাটক খেলা কোন পরিণতিতে নিয়ে যাবে।
নাটক আর ড্রামা খেলা তো ছিলো চমৎকার। আমি বললাম- আচ্ছা! এসব কি তুমি টাকা পয়সার লোভে করেছো না নারী শিকারের জন্য?
শিকার তো অনেক খেলেছি- এমনভাবে বললো যেন সে আমার বন্ধু পয়সার কোন লোভ নেই আমার। মারদান শাহ ও তার এক চ্যলাকে হাজতে দেখেছি আমি। তাদেরকে এখানে নিয়ে আসুন। যত টাকা পয়সা কামিয়েছি আমি সব দিয়ে দিয়েছে মারদান শাহকে।
আসামী শাহের নাম মারদান। মারদান শাহ বলে ডাকে তাকে তার চ্যলারা।
সারমুদ! মনে হচ্ছে তুমি জানো না যে, জেল খানায় যাচ্ছো তুমি?
ফাঁসি তো আর দেবেন না। কাউকে আমি হত্যা করিনি। চুরি ডাকাতিও করিনি। কারো পকেটও কাটিনি। লোকেরা নিজেরা এসে পয়সা দিয়ে যায় কণ্ঠে তার নির্বিকার ভাব।
আর যেসব মেয়েদের তুমি নষ্ট করেছো?
এমন একজন মেয়েকে আমার সামনে নিয়ে আসুন, যে নালিশ করবে তার ওপর আমি জোর খাঁটিয়েছি। তার হাসি আরো বিস্তৃত এলো- আমি আপনাকে অসন্তুষ্ট করবো না। যা জানতে চাইবেন সব বলে দেবো। এতে আপনার পেশাগত দায়িত্ব …….
আমি একজন মুসাফিরের মতো ছিলাম হুজুর! এই দুনিয়ায় ঘুরে ফিরে বিদায় নিতে এসেছি। আমাকে শাস্তি দিয়ে যদি আপনি খুশী হন তাহলে শাস্তি দেন। আমি আপনার মন খুশি করে দেবো।
আমার দীর্ঘ পুলিশি জীবনে এ ধরনের আসামী এই প্রথম এবং শেষ দেখলাম।
তোমার নাকি মাথায় গণ্ডগোল আছে? আমি বললাম- তুমি কি নিজেকে সুস্থ মনে করো?
এ ব্যপারে আপনার কি ধারণা?
আমি তোমাকে সুস্থ বুদ্ধিমানই মনে করি। তুমি যে দারুন সফলতায় মানুষকে ধোকা দিয়েছে। অসুস্থ মাথার কেউ এমনটি করতে পারতো না।
আমি হয়রান হয়ে গেলাম, তার হাসি হঠাৎ করেই মুছে গেলো। উজ্জ্বল মুখটি বিবর্ণ হয়ে গেলো। চোখ দুটো লাল হয়ে গেলো।
আমি কাউকে থোকা দেয়নি- বেদনাহত কণ্ঠে বললো- আমি নিজেকে নিজে থোকা দিয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে নিজের সঙ্গে নিজে প্রতারণা করেছি- বিমর্ষ হেসে বললো
আপনি থানার পুলিশ অফিসার। আমার ব্যপারে আপনার সহমর্মী হওয়া উচিত হবে না। আমি মানুষকে ধোকা দিয়েছি বলেই তো আমাকে পাকড়াও করেছেন……… শুধু একটা কথা বলবো। মানুষ আসলে অসহায়, কিছুই বুঝে না। প্রতারিত হলে তারা খুশি হয়ে যায়। আমার মতো বা মারদান শাহের মতো ছদ্মবেশী পীর যখন কাগজে কিছু এঁকে তাবিজ হিসেবে তাদেরকে দেয়, আশায় তাদের বুক ভরে যায়……..
আমার ব্যপারে আপনি কি কি রিপোর্ট পেয়েছেন জানি না। দেখুন যে বাড়ি থেকে আমি পালিয়েছি সে বাড়ির এত সুন্দরী যুবতী বধূকে আমার সঙ্গে রাত কাটাতে পাঠিয়ে দিয়েছে, গুপ্তধন আর সন্তানের আশায়। অথচ এদের আত্মমর্যাদাবোধ এত টনটনে যে, কেউ তাদের মেয়েদের দিকে চোখ তুলে তাকালে তাকে কতল পর্যন্ত করে দেয়।
কিন্তু তুমি নিজেকে নিজে থোকা দিয়েছে। এ কথার অর্থ কি? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
শুনবেন সব?- তার গলায় আকুতি।
সারমুদ! সারা রাত সামনে পড়ে আছে। আগ্রহভরে শুনবো। তবে মনে রেখো, এ থেকে আমাকে কেসও তৈরী করতে হবে। আমি তোমাকে চাপাচাপি করবো না। তুমিও আমাকে পেরেশান করবে না।
মিথ্যা বলবো না আমি একটা কথাও। তবে আপনি কোন অপ্রয়োজনীয় কথা জানতে চাইলেও আমি বলবো।
***
সারমুদের পূর্ণ কাহিনী শোনাতে গেলে সেটা একটা বিশাল বই হয়ে যাবে। কাহিনীর বিরাটাংশ এই মামলার সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিলো না। তবুও মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে তার কাহিনী শুনেছি আমি। এখানে সংক্ষেপ করা ছাড়া তাই উপায়ও নেই।
সারমুদ এক আমীর ঘরনার পিতার ছেলে। তার চার বছর বয়সের সময় তার তের চৌদ্দ বছরের বড় বোন মারা যায়। এর দুবছর পর সারমুদের আরেক বোন মারা যায়। বোন হারানোর দুঃখ সারমুদকে খুব কষ্ট দেয়। তার বয়স ১৩ কি ১৪ যখন হয় তখন মারা যায় তার মা। সারমুদের জন্য তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন নি। সারমুদের আঠারো বছর বয়সে তার বাপও মারা যায়।
শোক তাকে এমনভাবে ক্ষত বিক্ষত করে যে, তার বাবার মৃত্যুর এক বছরের মাথায় সে প্রায় পাগল হয়ে যায়। কান্না ছাড়া সে আর কিছুই ভাবতে পারতো না। ঘুম আর ক্ষুধার অনুভূতি খতম হয়ে গিয়েছিলো। ঘরের ভেতর ভয়ের জমকালো মূর্তি তাকে তাড়িয়ে বেড়াতো। আত্মীয় স্বজনদের নিয়মিত সঙ্গও তাকে স্বাভাবিক করতে পারলো না।
