অবশেষে তার বন্ধুরা দিন রাত পালা করে তাকে সঙ্গ দিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে।
তার এক বন্ধুর এক হিন্দু মেয়ের সঙ্গে প্রেম ছিলো। তাদের মিলনের নিরাপদ কোন জায়গা ছিলো না। সারমুদের বাড়িই হয়ে উঠে তাদের প্রেম কানন।
সারমুদের মনোযোগ তখনো প্রেম ভালোবাসার দিকে যায়নি। যাহোক ওদের প্রেমে কোন ধরনের অশ্লীলতা ছিলো না। অত্যন্ত পবিত্র ছিলো। মেয়েটি মুসলমান হয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিয়ে ফেললো।
এর মধ্যে সারমুদের সেই বন্ধুর কয়েকশ মাইল দূরে এক সরকারি চাকুরি হয়ে যায়। বন্ধু চাকুরিতে চলে যায়। চার পাঁচ দিন পর সেই হিন্দু মেয়ে এক রাতে সারমুদের বাড়ি এসে উপস্থিত হয়। এসে সরাসরি সারমুদকে প্রেম নিবেদন করে। সারমুদের ভেতরটা তখনো পর্যন্ত পরিষ্কার ছিলো। কিন্তু মেয়েটি পবিত্র থাকতে দিলো না।
সে রাত থেকেই সারমুদের জীবন সফর পাল্টে গেলো। যে সফরের শেষ মনযিল হলো থানা পুলিশ।
মেয়েটির অন্য এক ছেলের সঙ্গে আট মাস পর বিয়ে হয়। এই আট মাস সে সারমুদের ঘরে অনেক রাত কাটিয়েছে। তার চলে যাওয়ার পর আরো মেয়ে আসে তার জীবনে। তার জীবন বড়ই আমোদে হয়ে উঠে।
এরপর শুরু হয় তার বিয়ের পালা বা কনে পক্ষদের তাকে নিয়ে টানাটানি। তার এক মামা তার মেয়ের জন্য প্রস্তাব দেয় তাকে এবং তাকে বিয়ের কাজ দ্রুত সেরে ফেলার জন্য চাপ দিতে থাকে।
সারমুদ অসহায়বোধ করতে থাকে। এ অবস্থা দেখে আরো দুই মেয়ের মা তার সমব্যাথী হয়ে তার পাশে এসে দাঁড়ায়। এটা ওটা পাকিয়ে তার ঘরে পাঠাতে থাকে। ওদিকে আরেক মেয়ের বাপও তার হামদর্দ বনে যায়। কখনো কখনো তাকে টেনে হেচড়ে তাদের ঘরে নিয়ে যায়।
এভাবে সারমুদের বিয়ের জন্য চার পাত্রীর মা বাব উঠে পড়ে লাগে। প্রতিদিনই কোন না কোন এক পাত্রীর মা বা বাবা এসে তার বাড়িতে হানা দিতো। আর গল্পে গল্পে বাকী তিনজনের বদনাম রটাতো। এসব বদনামের সারংশ একটাই। কেউ সারমুদকে আসলে চায় না। চায় তার সম্পত্তি। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তার মন তাদের প্রতি চরমভাবে বিঘিয়ে উঠে।
আমার মার এক পুরনো বান্ধবী একদিন আমাকে সতর্ক করে দেয় সারমুদ আমাকে জানায়- অমুক অমুক মেয়ের মা মহিলাদের বৈঠকে স্বীকার করেছে যে, সারমুদ ভদ্র ছেলে না হলে কি হবে, আল্লাহ তো তাকে সম্পত্তি দিয়েছে…….
এক মেয়ের মার বক্তব্য হলো। সে আমাকে মেয়ে দিচ্ছে শুধু এ কারণে যে, তার মেয়ের কোন শাশুড়িও হবে না; ননদও থাকবে না। ঘরের একলা মালিক তার মেয়েই হবে …..
আমার মায়ের সেই বান্ধবী শৈশব থেকেই আমাকে আদর যত্ন করতেন এবং তার কোন মেয়ে ছিলো না। সব সময় তিনি আমার মঙ্গল চাইতেন। এজন্য তার কথা আমি শুধু বিশ্বাসই করলাম না; ঐ পাত্রীদের মায়েদের প্রতি আমার এমন ঘৃণার সৃষ্টি হলো যে, বিয়ের ইচ্ছেই মন থেকে মুছে ফেললাম।
বিয়ের চিন্তা বাদ দিলেও নিজের ভেতরে সবসময় এক ধরনের তৃষ্ণা অনুভব করতো সারমুদ। এই তৃষ্ণা চেপে রাখার জন্য প্রতিদিনই নিজের ঘরে বন্ধুদের আড্ডা জমাতো। ধুমধাম করে রান্না বান্না খাওয়া দাওয়া চলতো। এক এক দিন এক এক বন্ধু এর খরচ যোগাতো।
তার চমৎকার গান গাওয়ার গলা। স্বভাবগত অভিনয় ক্ষমতা। কৌতুক প্রবণতা এসব গুনের কারণে তার বন্ধু মহল দিন দিন বিস্তৃত হলো।
***
এক সময় তালিকাভূক্ত অপরাধীদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা বেড়ে গেলো। অবশ্য সে জুয়া খেলা ছাড়া আর কোন অপরাধে জড়াতো না। তার এই দ্বিতীয় শ্রেনীর বন্ধুরা তাকে এক সময় মারদান শাহের ডেরায় নিয়ে গেলো। সেখানেও জুয়ার আড্ডা চলতো। মদের আসর বসতো। মারদান শাহের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠলো।
ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
সারমুদ শখের বসে দাড়ি আর বাবরি রেখেছিলো। মারদান শাহ তার লম্বা দাড়ি চুলকে কাজে লাগাতে চাইলো। মারদান শাহ তাকে একদিন বললো, গ্রামের যেসব ঘরের ছেলেরা ফৌজে যোগ দিয়েছে তাদের মা বাবার একটাই মাকসাদ- তাদের সন্তান যেন সেনা ছাউনিতে থাকে, যুদ্ধে তাদেরকে পাঠানো না হয়। তাহলে যেকোন সময় আহত বা নিহত হওয়ার খবর আসতে পারে।
মজার কারবার হলো এসব ঘরে যদি কোন ফালতু লোকও গিয়ে বলে, তার কাছে এমন বিদ্যা আছে যা তাদের সন্তানদের বা বন্ধুদের গুলির আচর থেকে মুক্ত রাখবে; তারা তখন তার পায়ে সিজদায় পড়ে যেতে প্রস্তুত হয়ে যায়।
মারদান শাহ সারমুদকে পীর বানিয়ে দিলো। মানুষকে আকর্ষণ করার মতো কিছু বুলি শিখিয়ে দিলো। নিজের একজন চ্যলাও দিয়ে দিলো তাকে। ওদিকে সারমুদও তার এলাকার এক ফ্রডকে শিখিয়ে পরিয়ে নিলো। মারদান শাহ এভাবে মোট চারজনকে নকল পীর বানিয়ে বিভিন্ন এলাকায় পাঠিয়ে দিলো।
সারমুদ নিজের বাড়ি থেকে তিন মাস গা ঢাকা দিয়ে থাকে। মারদান শাহের আস্তানায় থেকে এর মধ্যে ফ্রডবাজির চূড়ান্ত সবক নেয়।
তার চুল দাড়িও ইতিমধ্যে বিশেষ লম্বা হয়ে যায়। সেই বৃদ্ধ নাপিতও তার চুল দাড়িতে কিছু অদলবদল করে দেয়। তাকে যেন চেনা না যায় এজন্য তার বাম চোখে পট্টি বেঁধে দেয় মারদান শাহ।
সারমুদ যেদিকেই যেতো তার চ্যলারা এগিয়ে গিয়ে তার নামে গুজব ছড়াতো যে, এক গায়েবি পীর এখান দিয়ে যাবে। অমুক গ্রামে তার মোবারক কদম পড়তে পারে। বানিয়ে বানিয়ে তার অনেক আজব কারামত শোনাতো। যে গ্রামেই হানা দিতো সে গ্রামের কয়েক বাড়ির ভেতরের অবস্থা তার চ্যলারা আগ থেকেই জেনে নিতো। সারমুদ সেসব ঘরেই যেতো।
