আমি আপনাকে বলেছি আমার হাতে আপনার বেইজ্জতি করাবেন না। গার্ড নিয়ে এসেছি আমি। পুরো বাড়ি তল্লাশি হবে। আর জনাবকে হাত কড়া পরিয়ে থানায় নিয়ে যাওয়া হবে।
তারপরও সে আমাকে বেকুব বানানোর চেষ্টা করলো।
তার নাম ঠিকানা বলে দাও আমার সুর ভয়ংকর করে বললাম- আর তার চুল দাড়ি যেখানে চাপা দিয়ে রেখেছিলে নিজেই তা বের করে দাও……… এখনি……. আর সময় দেবো না আমি।
তার মাথা দুলে উঠলো।
কোন সুযোগ কি দেয়া যায় না? সে মাথা ওভাবে রেখেই জিজ্ঞেস করলো।
যেটা জানতে চেয়েছি আগে সেটা বলে নাও- আমি বললাম আগের সুরে সে কে?
আমার মান সম্মানের দিকে লক্ষ্য রাখবেন- মিনতি করলো শাহ- আমি সবকিছু বলে দেবে এবং আপনার খেদমতও করবো। আল্লাহকে বহুত ইয়াদ করেছি।
আরো কিছু বক বক করে সে এক গ্রামের কথা বললো, এখান থেকে আট নয় মাইল দূরে। তার বাড়ি সেখানেই।
তাকে ভণ্ড পীর কি তুমিই বানিয়েছো?
শাহ মাথা দোলালো। তার নাম বললো, সারমুদ।
***
তার অপরাধের স্বীকারোক্তিমূলক বর্ণনা শোনার আগে বললাম, তার বাড়ির ভেতর সার্চ করবো আমি। সে মিনতি করলো যে, তার জবানবন্দি নিয়েই যেন আমি তাকে ছেড়ে দিই। এতে আমার সন্দেহ আরো বেড়ে গেলো।
আমার লোকদের ডেকে বললাম, বাড়ি তল্লাশি শুরু করে দাও। শাহ হাতজোড় করে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো, তল্লাশি চালাবেন না। আমি তাকে বললাম, সারমুদের চুল দাড়ি দিয়ে দাও এবং তার বাম চোখে যে কাপড় বাঁধতে সেটা যদি নকল হয় সেটা এখন কার কাছে? তোমার কাছে হলে আমাকে দিয়ে দাও।
আমার জানা ছিলো, এই শাহ অভিজ্ঞ এক ফ্রড। ঐ নফল পীরও আনাড়ি নয়। তাই এত লম্বা চুল ও দাড়ির স্তূপ কোন ডাস্টবিনে ফেলে দেয়ার মতো বেকুব নয় এরা।
শাহ এক কামরায় নিয়ে গেলো আমাকে। একটা বাক্স থেকে সবুজ এক টুকরো কাপড় বের করলো। সারমুদ এটা তার বাম চোখে বাধতো।
এ সময় হেড কনস্টেবল এসে বললো, এক কামরা থেকে দুই লোক গ্রেফতার করা হয়েছে। এরা পালানোর পায়তারা করছিলো।
শাহ জানালো, এরা তার চ্যলা। শাহ আমাকে বাইরে নিয়ে একটা জায়গা দেখিয়ে বললো, এখানে দাবানো হয়েছিলো চুল দাড়ি। তাকে মাটি খুড়ে বের করতে বললাম।
কয়েকজন সাক্ষীর সামনে সে চুল ও দাড়ি বের করলো। তারপর সারা বাড়ি তল্লাশি চালালাম। দুটি খঞ্জর ও একটা সুটকেসের ভেতর থেকে পাঁচ হাজার টাকা পাওয়া গেলো। আজকের হিসেবে কয়েক লাখ টাকারও বেশি। শাহ এবং তার দুই চ্যলা ও বুড়ো নাপিতসহ থানায় ফিরে এলাম।
থানায় পৌঁছতে পৌঁছতে রাত প্রায় শেষ প্রহরে গিয়ে পৌঁছলো।
শাস্তির দাগা দেয়ার লোহার শিক উত্তপ্ত ছিলো তখন। এজন্য কয়েক ঘা লাগিয়ে দেয়াটা সমীচিন মনে করলাম। প্রথমে দুই চ্যালাকে মুখোমুখি করলাম। জিজ্ঞেস করলাম, শাহের ঘরে কি করছিলে?
হুজুর! সে বললো- জানি আপনি শাহজি ও আমাদেরকে কেন পাকড়াও করেছেন। কিন্তু আমি এ অপরাধে জড়িত ছিলাম না। আমার সঙ্গের ঐ লোকটা সারমুদের সঙ্গে গিয়েছিলো। সে ওখান থেকে পালিয়ে আবার শাহের কাছে ফিরে আসে। সারমুদের সঙ্গে যে আরেকজন ছিলো, সে সারমুদের এলাকাতেই থাকে।
তাকে যা জিজ্ঞেস করলাম সে সব বলে দিলো।
আরেক চ্যালাকে ডেকে বললাম, মিথ্যা বলার মতো বেকুবি করবে না। যা জিজ্ঞেস করবো, সঠিক উত্তর দিবে।
সেও সিয়ানা লোক। স্বীকার করলো, সে সারমুদের সঙ্গে ছিলো। আমি বললাম, তাকে রাজসাক্ষী বানানো হবে। সব বলে দিলে এবং আসামীরা ধরা পড়লে তাকে ক্ষমা করে দেয়ার জন্য সুপারিশ করবো। সে জবানবন্দি দিয়ে দিলো।
তারপর শাহকে ডাকলাম। সে ঘুষ দিতে চাইলো। তবে জবানবন্দিও দিলো। সারমুদ ও তার দুই সঙ্গীর অপরজনের ঠিকানা বলে দিলো। তখনই আইএসআইকে তিনজন কনস্টেবল দিয়ে তাদের দুজনকে গ্রেপ্তারের জন্য শহরে পাঠিয়ে দিলাম।
এরপর শাহ ও তার এক চলা যে সারমুদের সঙ্গী ছিলো তাদেরকে বন্দি করে হাজতে বন্দি করে রাখলাম।
অন্য চ্যলাকে সন্দেহ ভাজনের তালিকায় রাখলাম। সারা রাত নিঘুম কাটিয়েছি। কিন্তু থানা থেকেও অনুপস্থিত থাকা সম্ভব নয়। তাই থানার কনস্টেবল ব্যারাকে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
***
শহর থেকে নকল পীর সারমুদ ও তার অপর সঙ্গীকে গ্রেপ্তার করতে তেমন বেগ পেতে হলো না। সেখানকার থানাদার (ওসি) আমার আই.আস.আই এর কাজ সহজ করে দিয়েছেন। তিনি থানার রেকর্ড কোট দেখেছেন। সামুদের নাম নেই কোথাও। তার সঙ্গীরা শহরের মন্দ লোকদের সঙ্গে চলাফেরা করলেও চুরি চামারি করার মতো বদমায়েশ ছিলো না।
সেখানকার থানা অফিসার সারমুদের পরিচিতি দুজন লোককে ডেকে তার সম্পর্কে খুটি নাটি জেনে রিপোর্ট লিপিবদ্ধ করেন।
তারা জানালো, সারমুদের মাথায় কোন গণ্ডগোল থাকতে পারে। তার নিকটাত্মীয়রা শহরে গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কিন্তু সারমুদ নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে করে। বয়স একত্রিশ বত্রিশ। এখনো বিয়ে করেনি। ছ ফিটের ওপর লম্বা দেখতে দারুন সুদর্শন। অনেক অভিজাত ঘর থেকে বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু সম্মতি দেয়নি কোথাও। তবে চালচলনে দুর্নামও ছিলো কিছু।
তার বাবার বিশাল সম্পত্তির সেই একমাত্র ওয়ারিশ। মা বাবা মারা গেছে অনেক আগেই। শহরে বড় বড় তিনটি বাড়ি রেখে যায় তার বাবা। শহরের প্রান্তে শত বিঘা ধানি জমিও আছে তার। একটি বাড়ি তো অনেক বড়। হিন্দু জমিদাররা ভাড়া নিয়ে সেখানে বড়সড় এক স্কুল খুলেছে। তার যমিনের আয়ও বেশ ভালো।
