হ্যাঁ, হ্যাঁ পারভীন মাথা ঝাঁকিয়ে বললো- জানিনা সে কে? নাপিত তখন তার চুল কেটে আপনার চুলের সমান করে দিয়েছে। নাপিত তার দাড়ি কামাচ্ছিলো। এত দিনের দাড়ি পরিষ্কার করে ফেলছিলো।
তার এক চোখ কি কোন কাপড় দিয়ে বাঁধা ছিলো?
এত সুক্ষ্মভাবে দেখতে পারিনি। কেন সে কি বিশেষ কেউ ছিলো?
জবাব না দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কতদিন আগের ঘটনা এটা? সে হিসাব করে বললো, এক মাসের চেয়ে তিন চারদিন বেশি হয়ে গেছে।
আমি হিসাব করে দেখলাম, ঐ ভণ্ডপীর ক্যপ্টেনের ভাই আদালতের বাড়ি থেকে তখনই পালিয়েছিলো।
এরপর আর পারভীনের কথার প্রতি মনোযোগ রাখতে পারলাম না। শুধু এতটুকু মনে আছে, পরে তার স্বামী ও শাশুড়ীকে শাহ নালিশ করলো এবং তারা পারভীনের ওপর অত্যাচার শুরু করে দিলো। বাধ্য হয়ে পারভীন শাহের কথা, তার স্বামী ও শাশুড়ির শাহের প্রতি অন্ধ ভক্তির কথা জানিয়ে দিলো।
পারভীনের ভাই তখনই তার ভগ্নিপতিকে ধরলো। কথায় কথায় তাকে কাপুরুষও বলে ফেললো। আর যায় কোথায়? হাতাহাতি হয়ে গেলো এবং তা বড় ধরনের মারামারি রূপ নিলো।
যা হোক তাদের মধ্যে আমি রাজীনামা করিয়ে দিলাম। পারভীনের স্বামী অন্যদের চেয়ে বেশি যখমী হয়েছিলো। তাকে ডেকে কিছু কটু কথা বলে লজ্জা দিলাম। আর বললাম ঐ ভণ্ড শাহের আসল রূপ তোমাদেরকে দেখিয়ে ছাড়বো।
তার পরদিন আসার কথা বলে সবাইকে বিদায় করে দিলাম।
***
রাত তখন সাড়ে দশটা। আমার মাথায় ঘুরছিলো একটা কথাই, ঐ প্রতারক পীরের চুলও মেয়েদের মতো কাঁধ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো এবং দীর্ঘ দাড়ি ছিলো। শাহের এক কামরায় রাতের বেলা আগুন বাতি জ্বালিয়ে চুল দাড়ি কাটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিলো না। আর দিনটাও ছিলো পীরের পালানোর দিন।
ঐ বৃদ্ধ নাপিতের নাম জেনে নিয়েছিলাম পারভীনের কাছ থেকে। হেড কনস্টেবলসহ আরো চারজন কনস্টেবল নিয়ে ঘোড়ায় সওয়ার হলাম। রওয়ানা দিলাম শাহের গ্রামের দিকে। এক মাসের চেয়েও অধিক সময় কেটে গেছে। তাকে যে পাওয়া যাবে না জানতাম আমি। তাছাড়া তাকে ধরার যে আলামত (একটি চোখ নষ্ট) সেটাও পারভীন দেখেনি। তারপরও আমার অন্তর থেকে আওয়াজ উঠছিলো, এই-ই লোকই সেই প্রতারক পীর।
শাহের গ্রাম বেশি দূরে নয়। সেখানে পৌঁছলে রাত জাগা কুকুর আমাদেরকে স্বাগত জানালো। আমি চৌকিদারকে ডেকে নাপিতের নাম বলে বললাম, তাকে জাগিয়ে নিয়ে এসো। আমাদের পেছন পেছন ততক্ষণে মারপিট ওয়ালা মামলাকারী দলও গ্রামে পৌঁছলো।
এক বৃদ্ধ নাপিত চৌকিদারের সঙ্গে দৌড়ে এসে হাত জোর সালাম করলো আমাকে। তাকে বললাম, এক মাস আগে যে এক রাতে তুমি শাহের আস্তানায় এক লোকের চুল দাড়ি কামিয়ে ছিলে তার নাম কি?
না হুজুর! আমি তো কারো চুল…….
আমার আচমকা এক চড় বুডোর মিথ্যে কথা কেড়ে নিলো। সে একদিকে গড়িয়ে পড়লো। চৌকিদারও আমাকে খুশি করার জন্য কয়েকটি ঘা লগিয়ে বললো,
মিথ্যা কেন বলছিস অ্যাঁ?
ওকে উঠাও, আমার সামনে দাঁড় করিয়ে দাও- আমি বললাম।
তাকে আমার সামনে দাঁড় করানো হলো।
প্রথমে বল্ আমার সঙ্গে মিথ্যা বললি কেন? দেখ আমি এখন কিভাবে তোর হাড় গুড়ো করি।
হুজুর! নাপিত হাত জোড় করে কাঁদতে কাঁদতে বললো- শাহজি আমার মুরশিদ। আমি উনার বদ দুআকে ভয় পাই। আমাকে এক রুপিয়া দিয়া বলেছিলেন কাউকে বলবে না যে, আমার বাড়িতে তুমি কারো চুল কেটেছিলে। তিনি আমার ঘর থেকে আমাকে ডেকে এনেছিলেন। আমার তো অস্বীকার করার শক্তি ছিলো না।
নাপিতকে জিজ্ঞেস করে জানা গেলো, ঐ লোকের দুচোখই সুস্থ। পরনে তার ছিলো সাদা কাপড়।
তুমি যখন তার চুল কাটছিলে তখন তার ও শাহের মধ্যে কি কথা হয়েছিলো?
বেশির ভাগ সময়ই তো সে চুপ ছিলো- বুড়ো জবাব দিলো, কথা বললেও এমন ইংগিতে বলেছিলো যে, আমি এর মাথামুণ্ড কিছুই বুঝতে পারিনি। শাহজি তাকে বলেছিলেন, ফজরের আযানের আগে বেরিয়ে পড়বে। সে তোক বলেছিলো, বিপদ কেটে গেছে। এখন আর কোন চিন্তা নেই।
তার চুল ও দাড়ি কোথায় ফেলেছিলে?
আমি সেগুলো একটি কাপড়ে জমিয়ে রেখেছিলাম, শাহজি বললেন, কাপড়টি বেঁধে আমাকে দিয়ে দাও।
বুড়ো বললো- আমি চুল শুদ্ধ পুটলিটা তাঁকে দিয়ে দিলোম। শাহজি তখন আমার কাছ থেকে কসম নিলেন। আমি যেন কখনো একথা কাউকে না বলি।
আমি আমার লোকজনসহ শাহ-এর আস্তানায় গিয়ে হাজির হলাম। চৌকিদারকে বললাম, দরজা টোকা দাও। দরজায় টোকা দেয়ার পর শাহ নিজে দরজা খুলে দিলো। রাগে গজর গজর করতে লাগলো। কারণ, তাকে ঘুম থেকে জাগানো হয়েছে।
চৌকিদার শাহকে হাত ধরে বাইরে টেনে নিয়ে এলো। আমি তখন এগিয়ে গিয়ে সালাম দিয়ে শাহের সঙ্গে হাত মেলালাম। আমার হাত ধরে সে ভেতরে নিয়ে গেলো আমাকে। ভেতরে গেলাম আমি একলাই।
শাহজি! আমি বললাম মৃদু স্বরে চেষ্টা করবেন আমার হাতে যেন আপনার বেইজ্জতি না হয়। প্রায় মাসাধিক আগে যে আপনার আস্তানায় এক লোকের চুল দাড়ি কাটানো হয়েছিলো সে কে ছিলো? সে এখন কোথায় আছে?
শাহ আমার দিকে এমনভাবে তাকালো যেন তার সঙ্গে আমি মশকরা করছি।
তাড়াতাড়ি বলুন শাহজি
আপনি কি বলছেন আমি বুঝতে পারছি না- বিস্ময়ের ভাব তার কণ্ঠে আমার বাড়িতে কারোই চুল কাটানো হয়নি।
ভেবে চিন্তে জবাব দেবেন শাহজি!- শান্ত সুরে বললাম- এই মাঝ রাতে আপনার এখানে এমনি আসিনি। যে চুল কেটেছিলো তাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি। আর যে চুল কাটতে দেখেছে সেও আমার হাতে..
