পারভীনের হৃদয়টা ছুরি দিয়ে ফালা ফালা করে কাটা হয়ে গেলো। সব স্বপ্ন রক্তাক্ত হয়ে গেলো। শাহের প্রতি ঘৃণায় ভরে উঠলো তার মন।
আমার স্বামীর আমানতের খেয়ানত করতে পারবো না কখনো- পারভীন ঘৃণায় উছলে উঠা কণ্ঠে বললো।
যে মেয়েরা বলে, অমুক পীরের তাবিজ তাকে বাচ্চা দিয়েছে মনে রেখো, সেটা পীরের ঔরষের বাচ্চা! শাহ বললো।
বিষ খেয়ে মরে যাবো আমি তবুও আমার দেহ নাপাক হতে দিব না।
আমার কথা না মানলে তোমার স্বামী ও শাশুড়িকে বলব, কোন গায়েবী পীরের বদ দুআ আছে এই মেয়ের ওপর। এজন্য পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
পাবীনের আত্মসম্মান বোধ জেগে উঠলো। সে ঘরে ফিরে এলো। এরপর শাহের কাছে যাওয়া বন্ধ করে দিলো।
তার স্বামী ও শাশুড়ি নিয়মিতই আসা যাওয়া করতে শাহের কাছে। পারভীনকে যাওয়ার জন্য দুজন চাপও দিতো। কিন্তু পারভীন পীরের আসল রূপ এ কারণে প্রকাশ করতে চাইতো না যে, তারা কেউ এ কথা বিশ্বাস করবে না। সে এমনিই মুখ বুজে চুপ করে রইলো।
এর ফলে তারা নানান অপবাদ কুৎসা রটাতে লাগলো তার নামে। তালাক দেয়ার হুমকিও দিলো। স্বামীও জোর জবস্তি শুরু করে দিলো।
একদিন পারভীন তার স্বামীকে পীরের আসল রূপের কথা জানিয়ে দিলো। প্রতি উত্তরে পারভীন স্বামীর হাতের প্রচণ্ড একটি চড় খেলো।
বললো, শাহজী ঠিকই বলেন, এই মেয়ের ওপর বদ দুআ আছে। স্বামী হুকুম দিলো আজই শাহের কাছে যেতে হবে।
পারভীনের ভেতর আগুন জ্বলে উঠলো। সে পাগলের মতো হয়ে গলো। সিদ্ধান্ত নিলো, আজ রাতেই শাহের কাছে গিয়ে বলবে, তার পেটে বাচ্চা জন্ম দিতে।
স্বামীকে জানলো, সে রাতে শাহের কাছে যাবে। স্বামী জিজ্ঞেস করলো, রাতে কেন? দিনে যাও।
পারভীন বললো, এখন আমার ওপর যে আমল করবে সেটা রাতেই করতে হবে। দিনে কোন কাজ করবে না।
স্বামী সানন্দে তাকে অনুমতি দিয়ে দিলো।
***
শাহের বাড়ি বা আস্তানা বেশি দুরে ছিলো না- পারভীন আমাকে শোনাচ্ছিলো- কাঁদতে কাঁদতে আমি যাচ্ছিলাম। না, তালাকের ভয়ে শাহের খাহেশ পূরণ করতে নয়, আমার মনের প্রতিশোধের আগুন নেভাতে। আমার স্বামী যদি তার স্ত্রীর সতীত্বের পরিবর্তে সন্তান চায় আমি সন্তান দেবো।
যদি নিজ ইচ্ছায় এই পাপ করতে যেতাম তাহলে এমন কারো কাছে যেতাম যাকে আমার পছন্দ হবে। শাহ বদকার এক লোক- এটা তো আমার স্বামী মানতেই চাচ্ছিলো না…….
তাকে আমি বলেছিলাম, আমরা একে অপরকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। সন্তান হয় না, এতে আমার বা তোমার কোন দোষ নয়। এটা আল্লাহর ইচ্ছা। আমি স্বামীকে বলেছিলাম, যে পুরুষ বাপ হতে না পারে তার মধ্যে পৌরুষের সম্মান থাকে না……
শাহের আস্তানার কাছে গিয়ে আমার পা আটকে গেলো। আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকালাম আমি। অশ্রুতে ভরে গেলো আমার চোখ দুটি। ফরিয়াদ। বের হয়ে এলো আমার মুখ থেকে
হে নীল আকাশের মালিক! আমার ভাগ্যে তুমি এ কি লিখে রেখেলে? তোমার গুনাহগার বান্দি কি করছে? ক্ষমা করো গো খোদা! জানো, আমি কেমন বাধ্য হয়ে এই পাপের জগতে যাচ্ছি…
বলতে বলতে শাহের দরজায় গিয়ে পৌঁছলাম। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ ছিলো, আস্তে আস্তে দুবার টোকা দিলাম। দরজা খুলে গেলো।
কে? এসময় কি নিতে এসেছো?- শাহের রাগত স্বর।
শাহজী! আমি এসেছি- আমি বললাম।
আমি জানতাম তুমি অবশ্যই আসবে- আমাকে দেখে শাহ বেশ খুশি হলো।
সে আমার হাত ধরে ভেতরে গেলো এবং উঁচু আওয়াজে বললো, আমারই এক বান্দা। ভেতরে একটি খোলা কামরা থেকে আগুন বাতির আলো আসছিলো। শাহ আমাকে সেখানেই দাঁড় করিয়ে বললো, তোমাকে একটি কামরায় এখন বসাবো। সেখানে একটু অপেক্ষা করতে হবে ……
শাহ বাইরের দরজার শিকল চড়াচ্ছিলো, এই ফাঁকে আমি সেই আলোকিত কামরার দিকে তাকালাম। এক লোক মাটিতে বসা ছিলো। আর এক বৃদ্ধ নাপিত আমাদের গ্রামের তার চুল কাটছিলো। প্রথমে লোকটিকে মহিলা ভেবেছিলাম। কারণ তার চুল মহিলাদের মতো লম্বা। আবার লম্বা দাড়িও আছে…..
শাহ আমাকে ভেতরের আরেকটি কামরায় নিয়ে গেলো। ম্যাচ দিয়ে আগুন বাতি জ্বালালো। কামরায় একটি খাট সাজানো ছিলো। আমাকে খাটে বসিয়ে বললো, নির্ভয়ে বসে থাকো। আমি আসছি। কামরা থেকে এই বলে বেরিয়ে গেলো।
একলা ঘরে মনে হলো, আমার নিঃশ্বাস এমনভাবে চেপে আসছে যেন আমার স্বামী কোন অন্ধকার কূপে আমাকে ফেলে দিয়েছে। একবার মনে হলো, শাহ আমাকে আমাদের বাড়ি থেকে উঠিয়ে এনেছে…..
আমি আরেকবার আল্লাহকে স্মরণ করলাম। কাঁদতে থাকলাম। তারপর হঠাৎ আমার আত্মার ভেতর আলো জ্বলে উঠলো। কে যেন ধাক্কিয়ে আমাকে খাট থেকে নামিয়ে দিলো। আমি বাইরে বের হয়ে এলাম। বাইরের কামরাটি তখন বন্ধ। আমি দেউরীর দরজার শিখল খুলছিলাম।
এ সময় ঐ কামরাটি খুলে গেলো। শাহ বেরিয়ে এলো। আমাকে দেখে হয়রান হয়ে জিজ্ঞেস করলো, কোথায় যাও? আমি হালকা সুরে বললাম, এই একটু আসছি, দরজা খোলা রাখবেন। শাহ আমাকে বিশ্বাস করে কাঁধ ঝাঁকালো। আমি পথে নেমে পড়লাম।
পারভীনের ভেতর যেমন খোদাতাআলা আলো জালিয়ে দিয়েছেন, আমার ভেতরও পারভীন আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমার মনোযোগ পারভীনের গল্পের এক জায়গায় এসে স্থির হয়ে গেলো।
পারভীন! আমি জিজ্ঞেস করলাম তখনই- বলো তো, তুমি যখন দেউরী থেকে বের হচ্ছিলে এবং শাহ দরজা খুলেছিলো তখন কি ঐ লোকটিকে দেখেছিলে, নাপিত যার চুল কাটছিলো?
