ঝগড়া ছিলো পারিবারিক। এক মেয়ের বাচ্চা হচ্ছে না বলে শ্বশুর বাড়ির লোকেরা তাকে সব সময় যন্ত্রণা দিতো। মেয়ে তার ভাইকে সব বলে দেয়। ভাই বোনের স্বামীর ওপর চড়াও হয়। এভাবে উভয় পক্ষ লাঠি বল্লম নিয়ে হামলে পড়ে নিজেদের ওপরেই।
তাদেরকে জানিয়ে দিলাম, যে মেয়েকে নিয়ে ঝগড়া সে মেয়ে, তার মা ও শাশুড়ীকে থানায় হাজির করতে হবে। তাদেরকে জেরা করতে হবে।
এ ধরনের মামলা আমাদের জন্য কোন মামলাই নয়। আমাদের এলাকায় এসব কেসের হিড়িক বলা যায়।
ভোজন রসিক থানাদাররা এসব কেস পেলে খুশিই হয়। কারণ উভয় পক্ষই খায় খাতিরও করে প্রতিযোগিতা লাগিয়ে। কিন্তু আমি এ বিষয়টা মামলার রূপ দিতে চাইনি। মেয়েদের থানায় ডাকাও একটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।
কিন্তু আমার জানার ছিলো না, এ কেস আমার আরেক অতি গুরুত্বপূর্ণ কেসের জটবদ্ধতা খুলে দেবে।
সন্ধ্যার দিকে মেয়েদেরকে থানায় আনা হলো। ইচ্ছে করেই ওদেরকে অনেক্ষণ বসিয়ে রাখলাম। যাতে থানায় মামলা করার ঝামেলা বুঝতে পারে।
রাত আটটার দিকে প্রথমেই ডাকলাম ঐ মেয়েকে, যাকে নিয়ে এই ঝগড়ার সূত্রপাত। মেয়ের নাম পারভীন। অতি সুন্দরী না হলেও দৈহিক গঠন তার চমৎকার।
এই লড়াইয়ের কারণ কি পারভীন! আমি অলস গলায় জিজ্ঞেস করলাম তোমার শ্বশুর এতই যন্ত্রণা দেয় তোমাকে যে, রক্ত ঝরার ঘটনা ঘটে গেলো?
না জনাব! পারভীন বললো- শ্বশুর নয়, শাশুড়ী, পুত্রবধূকে অযথাই বিরক্ত করে। আমার সতের বছরের সময় বিয়ে হয়েছে। পাঁচ বছর হয়ে গেলো সন্তানের মুখ দেখিনি এখনো।
স্বামীর কোন রোগ টোগ?
না না। এটা ভাগ্যের দোষ। স্বামীর বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই। সবদিক থেকেই আমি তার প্রতি সন্তুষ্ট। এক বছল ধরে পীর ফকিরদের কাছে আমার মা শাশুড়িরা দৌড়ঝাঁপ করছে। আমাকে মাজার ও কবরস্থানের মাটি খাওয়াচ্ছে ….
আমাদের গ্রামের কাছে এক শাহ থাকেন। প্রথম তো ঐ শাহ মামুলি কিছু ঝাড়ফুক করতো। সাপ বিচ্ছুতে কাটলে চিকিৎসা করতেন। রোগ ব্যথায় দম করতেন, তাবিজ দিতেন। কয়েক মাসের মধ্যে তার নাম ছড়িয়ে পড়লো। তখনই তার কব্জায় জিন এসে গেলো। তারপর এ খবর ছড়িয়ে পড়লো যে, তার দম ও তাবিজে ত্রিশোর্ধ সন্তানহীন মেয়েরাও সন্তান লাভ করে…..
ঐ শাহকে প্রথম দেখাতেই আমার ভালো লাগেনি। কারণ জানি না। তিন মাস আগে আমার শাশুড়ি শাহের কাছে নিয়ে গেলো আমাকে। তাকে এক টাকা নজরানা দিয়ে বললো এর বাচ্চা হয় না।
শাহ দুহাতে আমার চেহারা ঝাপটে ধরে তার মুখের কাছে নিয়ে গেলেন। তার মুখ থেকে এমন পঁচা দুর্গন্ধ এলো যে, আমার মাথা ঘুরে উঠলো…….
সেদিন শাহ-এর চেয়ে বেশি আর কিছুই করলেন না। একটি তাবিজ দিয়ে বললেন, পানিতে মিলিয়ে খাবে। আর দুদিন পর আসবে। …..
তিন দিন পর শাশুড়ি আমাকে শাহের কাছে নিয়ে গেলো। আশ্চর্য, প্রথম দেখায় শাহকে যেমন খারাপ লেগেছিলো আজ ভালো লাগতে শুরু করলো। সন্তানের তীব্র বাসনা তো আমার ছিলো। এজন্য শাহের তাবিজ স্বপ্ন জাগিয়ে দিলো যে, আল্লাহ এর বরকতে আমাকে সন্তান দেবে……..
এবার শাহ আমার চেহারা ধরে আমার চোখে ফুক দিয়ে বললেন, এই মেয়ের ওপর এক ছায়া ঘুরছে। এবার দুটি তাবিজ দিলেন, একটা গলায় ঝুলানোর জন্য আরেকটা পান করার জন্য।
***
এত কাঁচা বয়সেও পারভীনের কথায় দারুন আস্থা ছিলো। আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বলে, মনে অসত্য, অপবিত্র কোন প্রবণতা না থাকলে, নির্মল আর পবিত্রতায় সজীবতা থাকলে আস্থা ও দৃঢ়তা জেগে উঠে এমনিই।
পারভীনের মধ্যেও দৃঢ়তার এই উচ্চারণ আমাকে মুগ্ধ করেছে। সে কথা বলছিলো অসংকোচে। তার বর্ণনা ছিলো দীর্ঘ। পুলিশ অফিসারের এত দীর্ঘ বয়ান শোনার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমি আগ্রহ নিয়ে শুনেছি তার কথা। যদিও এখানে এত লম্বা কথার প্রয়োজন নেই।
ওর স্বামী শাহকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মানতো। ওকে সবসময় শাহের কাছে যাওয়ার জন্য তাগিদ করতে থাকে। প্রথমে প্রথমে শাহের কাছে পারভীনকে নিয়ে যেতো শাশুড়ি। কিন্তু শাহের বলার পর পারভীন একাই যেতো। শাহ তার ওপর নানান আমল করতো।
এক মাসেরও অধিক হয়ে গেলো এভাবে। এমনিতেই শাহ হাসিখুশি মানুষ ছিলো। পারভীনের সঙ্গেও তার সম্পর্ক সহজ হয়ে গেলো। একদিন পারভীন শাহকে জিজ্ঞেস করলো,
তার আশা কবে পূরণ হবে?
আমি তোমাকে পরিস্কার বলে দিচ্ছি- শাহ উত্তরে বললো- তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে। এজন্য তোমাকে আমি ধোকার মধ্যে রাখতে চাই না। এমন কোন পীর নেই, যে ঝারফুক আর তাবিজ দিয়ে সন্তান দিতে পারে। এমন খোদায়ী কারবার কারোই নেই।
তোমার স্বামী তোমাকে দৈহিক আনন্দ দিতে পারে ঠিক, কিন্তু বাচ্চা দিতে পারবে না। আর বাচ্চা না হলে তোমার শাশুড়ি তোমাকে তালাক দেয়াবে। সন্তান না হওয়ার অপরাধ মেয়েদেরই হয়ে থাকে……..
পুরুষ কখনো মানতে চাইবে না তার মধ্যে কোন দোষ আছে। আর তোমাকে তালাক দিলে কেউ বিয়েও করবে না তোমাকে। বয়স দেখো তোমার। সেই কচি যৌবনও তো নেই তোমার।
শাহজী! পারভীন বললো- আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন। অথচ আপনি আমার পীর ও উস্তাদ। বিশেষ কিছু কি বলতে চাচ্ছেন?
হ্যাঁ পারভীন! শাহ বললো- কিছুই বলতে চাই। সেটা হলো, আমি তোমাকে সন্তান দেবো। সে সন্তান হবে আমার। তোমার স্বামী একে নিজের সন্তান মনে করবে।
