***
আমার একটা সন্দেহ তো ঠিক হলো। পীরকে ফেরার করা হয়েছে। আমার মনে সন্দেহ আরেকটা জাগলো, তাজ হয়তো আগ থেকেই জানতো, আসামী নকল পীর। তার যৌন ক্ষুধা মেটানোর জন্য সে এই নাটকের ব্যবস্থা করেছে। আমি এ সন্দেহটা উল্টে পাল্টে দেখলাম। কিন্তু এ সন্দেহের কোন সন্তোষজনক ভিত্তি না পেয়ে মন থেকে তা তাড়িয়ে দিলাম।
সেদিনও আমি গ্রামে কাটালাম। আরো যেসব ঘরে পীর হানা দিয়েছিলো তাদের কাহিনী শোনলাম। কাহিনী একেকটার চেয়ে একেকটা চমপ্রমদ। সেটা অন্য আরেক সময় বলবো।
রাতে থানায় চলে এলাম।
পরদিন চৌকিদার থেকে জানতে পারলাম, পীর সাত আটটি গ্রামে তার পীরগিরি খাঁটিয়েছে। প্রত্যেক গ্রামের তিন চার বাড়িতে হানা দিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, এসব বাড়ি থেকে দুএকজন সদস্য ফৌজে যোগ দিয়েছে।
আমার এখন জানার ছিলো, এসব এলাকার গুণ্ডা বদমায়েশরা কি পীরের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলো কিনা। এ ধরনের কোন ইংগিত পাচ্ছিলাম না। অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠছিলো এই মামলা। এলাকার রেজিষ্টার্ড গুণ্ডা-সন্ত্রাসীদের থানায় ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলাম। কিন্তু জানা গেলো না কিছুই।
এসময় চৌকিদার এমন কয়েকজনকে ধরে নিয়ে এলো, যারা পীরের প্রতারণা সম্পর্কে এক একটি কাহিনী শুনিয়ে গেলো। আরো অনেকে প্রতারণার শিকার হয়েছে ঠিক; কিন্তু লজ্জার কারণে তারা থানায় আসছে না।
এসব শুনতে শুনতে বিরক্তি এসে গেলো আমার। চৌকিদারকে বলে দিলাম, প্রতারণার শিকার হয়েছে এ ধরনের কোন বেকুবকে আর থানায় আনবে না। কেউ পীরের কোন খোঁজ দিতে পারলে তাকে নিয়ে এসো।
তখনকার পুলিশি গোয়েন্দা মাধ্যম এত তৎপর ছিলো যে, মাটির নিচের ভেদও গোয়েন্দা চোখে পর্যবেক্ষণ করতো। আর তখন আজকের মতো অপরাধমূলক কাজ এত বেশি সংঘটিত হতো না। এ কারণে গুপ্তচরা বৃত্তির কাজ শান্ত মাথায় করা যেতো। তাছাড়া হুকুমত ছিলে ইংরেজদের। ইংরেজরা পুলিশদের দায়িত্বে অবহেলা সহ্য করতে পারতো না।
তারপরও আসামী ও তার সঙ্গীদের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিলো না। আমার মনে হলো আসামী অনেক দূরের কোন এলাকার। আমার কাছে শুধু একটাই আলামত আছে, আসামীর এক চোখ নষ্ট। সে তার বেশ-ভূষা যতই পরিবর্তন করুক, নষ্ট চোখ বদলাতে পারবে না। ঠিক করলাম, এই কেসকে লাপাত্তা রিপোর্ট করে খতম করে দেবো।
ক্যাপ্টেনের ছুটি শেষ হওয়ায় একদিন আগে তিনি থানায় এলেন। এর আগে আরো দুবার এসে জানতে চেয়েছিলেন, আসামীর খোঁজ পাওয়া গেছে কিনা। কিন্তু এবার এলো জবাবদিহি তলব করতে।
এখনো কেন আসামীকে খুঁজে পাওয়া গেলো না? ক্যপ্টেন জানতে চাইলেন।
এ ধরনের আসামীদের খুঁজে পাওয়া সহজ কাজ নয়- সৌজন্যতা দেখিয়ে বললাম।
তাহলে আপনারা বেতন নেন কি দিয়ে? খোঁজ পাওয়া সহজ নয় কেন? ফৌজি দাপট দেখিয়ে বললেন কাপ্তান।
এজন্য সহজ নয় যে, এ ধরনের আসামীকে আপনারা নিজ ঘরে রেখে খোদাকে ভুলে তাদের ইবাদত করেন- শ্লেষাত্মক কণ্ঠে বললাম- তাদেরকে খুশি করার জন্য নিজেদের মা বোনদের তাদের কাছে বসিয়ে রাখেন। তারপর লজ্জার মুখে পুলিশের কাছে আসল কথা এড়িয়ে যান। আপনি কি আপনার ভাইয়ের ঘরে খোঁজ নিয়েছেন, ঐ পীরকে কে ঘর থেকে ফেরার করেছে?
তার ফৌজি দাপট- দম্ভ এক নিমিষেই উড়ে গেলো। তারপরও যখন তার ভাঙ্গা অহংকার নিয়ে আবার ফুঁসে উঠতে চাইলো আমি আরেকটি অস্ত্র ব্যবহার করলাম।
আপনারা সবাই এই অপরাধীদের সঙ্গে ছিলেন- আমি বললাম- হিন্দু মালাউনদের মতো যাকেই দেখেন মনে করেন তার কাছে বুঝি গায়েবি শক্তি আছে। তাকে নবীর মতো মানতে শুরু করেন।
কাপ্তানের ঘাড় বাকা করে দিয়েছি ঠিক। কিন্তু এ কেসকে লাপাত্তা হিসেবে মুলতবি করার জন্যও মজবুত ও উপযুক্ত কারণ হাজির করতে হবে। এটা আমার জন্য কঠিন কাজ ছিলো।
***
এক মাস হয়ে গেলো। থানায় প্রতিদিন আরো কত মামলা আসে। ধীরে ধীরে পীরের বিষয়ে আমার আগ্রহ কমে গেলো।
একটা ব্যাপারে আমি খুব বিস্মিত হলাম যে, বড় বড় ডাকাত সন্ত্রাসীরা যেভাবে পরস্পরে বিভিন্ন এলাকা বন্টন করে নেয়, তেমনিভাবে পীরদের হালকা বা গ্রুপও বিভিন্ন গ্রামে শহরে ভাগ ভাগ হয়ে যদি কায়েম করতো।
নিজের এলাকাকে পীরেরা বলতো ওলায়েত। এক পীর আরেক পীরের ওলায়েতে বা অধীনে যেতো না।
আমি হয়রান হয়ে গিয়েছিলাম, এক ভণ্ড পীর যখন কোন এলাকায় এভাবে যা ইচ্ছে তাই করে বেড়ায় অন্য পীরেরা তার বিরুদ্ধে কিছুই বলে না।
আমাকে জানো হয়েছিলো, আসামী যে গ্রামে গিয়েছিলো সে গ্রামের কাছে বড় কোন পীর নেই। তবে ছোট ছোট শাহ্ আছে।
দশ বার দিন পর আমার এলাকার এক গ্রামে একটি পারিবারিক লড়াই ঝগড়া হলো। দুজন খুব বেশি যখমী ছিলো। আর তিন চারজন মামুলি যখমী ছিলো। উভয় পক্ষই নিকটাত্মীয়। দুপক্ষই থানায় এসে মামলা করলো।
এসব ক্ষেত্রে থানাদাররা উভয় পক্ষের মধ্যে রাজিনামা করে দেয়। এদেরকেও সেভাবে বোঝাতে চেষ্টা করলাম। কাজ হলো না। পরস্পরের বিরুদ্ধে এরা মামলা করবেই।
আমি যখমীদেরকে হাসপাতাল পাঠিয়ে দিলাম। সেখান থেকে ডাক্তারি রিপোর্টও তলব করলাম।
এরা হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার পর আবার ওদেরকে বোঝালাম। তাদের ক্রোধ তখনো ঠাণ্ডা হয়নি। তারা আগের মতেই অটল রইলো। আমি তাদেরকে বললাম, একে অপরের বিরুদ্ধে মামলা করতে চাইলে ঘরের মেয়েদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় থাকতে হবে।
