তবে আসামীকে গ্রেফতার করার পর যদি সে জানিয়ে দেয় এ বাড়ির অমুকে তাকে পালাতে সাহায্য করেছে তাহলে তাকে এ সন্দেহে গ্রেফতার করা হবে যে, পীরের ধোকাবাজি ও বদমায়েশী কাজে এও জড়িত। তোমার কথায় মনে হচ্ছে, তুমি কিছু একটা বলতে চাও। কিন্তু ভয় পাচ্ছো, তোমার ভেতর যে কথাটা গুমরে মরছে সেটা খোলাসা করো। আমি তোমার কাছ থেকে কিছুই নেবো না।
তখন তো আমি ভরা যৌবনের যুবক। লোকে আমাকে সুপুরুষও বলতো। তাজ আমার কথা শুনে আমার দিকে যে দৃষ্টিতে তাকালো আমি এর অর্থ না বোঝার মতো বোকা ছিলাম না।
আমার যৌবনকে সে আমার দূর্বলতা মনে করতে লাগলো, এমনকি আমার একটি হাত সে গাঢ়ভাবে চেপে ধরলো। আমি হাত সরালাম না। তার চোখ আমার অশ্রুপূর্ণ হয়ে উঠলো। বুঝলাম, বেচারী বড় অসহায় বোধ করছে। আমারও একটি হাত তখন তার হাতের ওপর মৃদুভাবে রাখলাম।
তাজ! তার চোখে চোখ রেখে বললাম- আমি নকল পীরও নয়, ধোকাবাজও নয়। আমি সম্মানিত এক ব্যক্তি। সম্মান প্রাপ্যকে আমি সম্মান করি। আমি আমার প্রতিশ্রুতি রাখবো। তোমার মনের কথা নিঃসন্দেহে বলে যাও।
তাকে আমিই ঘরে থেকে বের করেছি- তাজ খুব চাপা গলায় বললো।
কেন?
আপনার হাতে আমার ইযযত- সে বললো- আপনি তো জানেন, তার সঙ্গে আমি রাত কাটিয়েছি। এও জানেন, কিসের লোভে কিসের আশায় আমি আমার ইযযত দিয়েছি
তারপর যখন তাকে এক গ্রাম থেকে ধরে নিয়ে এলো, তখন আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। তাকে মারপিট করে পুলিশের কাছে হাওলা করা হবে তখন তো সে বলবে, তোমরা কোথাকার এত ভদ্রলোক হলে? তোমাদের ঘরের অমুক মেয়ে রাতে আমার কাছে আসতো। আসলে আমার স্বামী আদালতকে ভীষণ ভয় পাই আমি।
তোমার স্বামী মান ইযযত আর ভদ্রলোকি তখন কোথায় গিয়েছিলো যখন তোমাকে সেই ভণ্ডপীরের কাছে এক বদ্ধ কামরায় পাঠিয়েছিলো?
কিন্তু দোষ তো সব মেয়েদের মুখে মলে দেয়া হয়। আমার স্বামী না বললে আমি হয়তো এ কাজ করতাম না।
আমি তোমার স্বামীর মতো কাপুরুষ নই। তোমার ইযযত নিয়ে খেলতে দেবো না কাউকে- গলাটা কিছুটা আবেগী হয়ে গেলো আমার।
আমি সারা জীবন আপনার অনুগ্রহ শোধ করতে পারবো না- তাজ ধরা গলায় বললো- আমি আমার ইযযত বাঁচানোর জন্যই একাজ করেছি। ওরা তো পীরকে ঐ কুঠরীতে বন্দী করে রাখলো। আমি মাঝ রাতে উঠলাম। আমার স্বামী গভীর ঘুমে অচেতন। আমার শাশুড়ী ও ননদ অন্য আরেক কামরায় ঘুমিয়ে। আমার জানা ছিলো, অনেক বড় ঝুঁকি নিচ্ছি আমি। ধরা পড়লে চৌধুরী আমাকে কতল করে দেবে। কিন্তু আমার ওপর কি যেন ভর করেছিলো। চোরের মতো খালি পায়ে প্রথমে দেউরীর প্রধান দরজার কাছে গেলোম এবং দেউরীর শিকল। আলগা করে দিলাম………
তারপর আমি ঐ কামরার দরজা খুললাম যার সঙ্গে কুঠুরী আছে। কুঠুরীর বাইরে কোন দরজা নেই। বড় কামরা ও কুঠুরীর মাঝখানে শুধু একটি দরজাই আছে। আমি ভেতরে গেলাম। ঘোর অন্ধকারে নিঃশব্দ পায়ে মাঝখানের দরজায় গিয়ে দরজার শিকল খুললাম। আমি ওকে আওয়াজ দিলাম। সে আমার কাছে ছুটে এলো। তাকে বললাম, দেউরীর দরজার শিকল খুলে এসেছি। কোন শব্দ না করে বেরিয়ে পড়ো……..
সে কৃতজ্ঞতায় কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, আমি বেঁচে থাকলে তোমার ঐই ঋণ আমি শোধ করবো।
আমি বললাম, তুমি শুধু এতটুকু করো আমার জন্য যে, কখনো ধরা পড়লে আমার নামে বদনাম দিয়ো না। তোমার মুখ থেকে যেন এ শব্দ বের না হয় যে, তোমার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক আছে। সে বললো, সারা জীবন তোমাকে মনে রাখব আমি। তোমার দুর্নাম হতে দেবো না আমি,
সে চলে গেলো। আমার কাছে মনে হলো, দম আটকে আমি মারা যাবো। ভয়ে আমার পা জমে গিয়েছিলো। আমি কুঠরীর সঙ্গের দরজা খুলে সে কামরার জানালাটি খুলে দিলাম। তারপর অন্য কামরায় গিয়ে দরজার শিকল তুলে দিলাম। তারপর বাইরে এসে বড় কামরার দরজাও লাগিয়ে দিলাম। এরপর কোন ক্রমে দেউরীর দরজা বন্ধ করে দিলাম। যখন আমি আমার খাটে ফিরে এলাম তখন দু চোখ জুড়ে শান্তির ঘুম নেমে এলো। কিন্তু আমি কেঁদে ফেললাম……
সকালে সর্বপ্রথম চৌধুরী বললো, কাফেরটা পালিয়ে গেছে। আমি দৌড়ে গেলাম। বললাম, কোন জায়গা দিয়ে পালিয়েছে। খাটের নিচে বা এদিক ওদিক দেখো। কোথাও লুকিয়ে আছে হয়তো। ওদিক থেকে ক্যপ্টেন সাহেবও এসে গেলেন। তিনি যখন দেখলেন, জানালার পাট খোলা তখন ঘোষণা করলেন, এই জানালা খুলে পালিয়েছে।……….
খোদা আমার স্বামী ও কাপ্তান সাহেবের চোখে এমন পর্দা ফেলে দিলেন যে, তার মনে এই খেয়ালই এলো না যে, ঐ দিকের দরজা সকালে খোলা ছিলো, না বন্ধ ছিলো….. আমি স্বস্তি পেলাম যে, আমার সব গোপনীয়তা ঐ লোকের সঙ্গে চলে গিয়েছে। কিন্তু এখন আমার ইযযত আপনার হাতে।
চিন্তা করো না তাজ!- অভয় দিলাম আমি।
আপনি কি আমার একটি অনুরোধ রাখবেন? তাকে আপনি গ্রেপ্তার করবেন না। আল্লাহ তাআলা তো তাকে অবশ্যই শাস্তি দেবেন। সে যদি ধরা পড়ে আমার দুর্নাম করে ছাড়বে।
সে কত জনের দুর্নাম করবে? এ ধরনের পীর তাদের জাদুর ভেল্কি সেসব ঘরে চালায় যে ঘরে পয়সা আছে বা সুন্দরী মেয়ে আছে। জানি না এ পর্যন্ত কতজনকে সে নাপাক করেছে। তোমার সঙ্গে তো ওর শত্রুতা ছিলো না….. সে ধরা পড়লে কি পড়লো না- এটা তোমার ভাবনার বিষয় নয়। তবে আমি তোমার দুর্নাম হতে দেবো না।
