এক হাজার টাকারও বেশি জনাব; সে বললো- ভাইকে সবচেয়ে বড় থোকা তো দেয় সে। ভাবী তাজকে পীরকে নিজের সঙ্গে রাখতে দেয় ভাই পীরের কথায় থোকায় পড়ে। আপনাকে আমি আর কি বলবো? এক মেয়ে আরেক মেয়ের মুখ দেখেই তার মনের কথা পড়ে নিতে পারে।
তুমি তাকে বাধা দিলে না?
সে তো আমাকে এমনিই ভালো চোখে দেখে না- সে বললো- এ ধরনের কিছু আমি তাকে বলতে গেলে ঘর থেকেই বের করে দিতো আমাকে সে।
একটা কথা আমাকে ভেবে চিন্তে বলো তো- আমি বললাম- তোমার ভাইয়েরা যে বলে পীর জানালা পথে পালিয়েছে, তোমার কাছে কি সেটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়?
এ ব্যাপারে মোটেও ভাবিনি আমি। ঐ কাফের ভণ্ড ধরা পড়েছে। তাকে আচ্ছামতো শায়েস্তা করা হচ্ছে–এই আনন্দেই তো ডুবেছিলাম আমি।
তাজও কি খুশি ছিলো? প্রশ্নটি মাথায় আচমকা আসলো।
তার অবস্থা তো প্রায় মরে যাওয়ার মতো হলো- সে জবাব দিলো- চোখ মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিলো। মনে হচ্ছিলো, শুধু ঐ ভণ্ডকেই নয় তাকেও তার সঙ্গে পাকড়াও করা হয়েছে। তবে খুশি হয়েছিল ভাইজান।
আদালতের বোনকে বিদায় করে দিলাম। এলাকার চৌকিদারকে ডাকলাম। চৌকিদার এই বংশেরই লোক। এজন্য আমি আশাও করিনি সে এদের বিরুদ্ধে কিছু বলবে। চৌকিদার নিজেকে বাঁচানোর জন্য অনেক কিছুই বললো। ফাঁকে ফাঁকে দু চারটা মিথ্যাও বললো। বুঝতে পারলাম সেও পীরের জাদুতে আক্রান্ত হয়েছিলো।
আজ হোক কাল হোক আমাকে একটা কথা বলতে হবে তোমার- কঠিন সুরে বললাম চৌকিদারকে আসামী যখন এ গ্রামে পীর হয়ে আসে অন্য গ্রামের লোকেরাও প্রতিদিন এখানে আসা যাওয়া করতো। তুমি কি তাদের মধ্যে পেশাদার অপরাধীদের দেখেছো? যারা আসামীর সঙ্গে বা তার লোকের সঙ্গে কথা বলছিলো বা বসেছিলো?
সে চিন্তায় পড়ে গেলো। কোন উত্তর দিতে পারলো না। তাকে আমি বললাম, ভালো করে মনে করে দেখো। দরকার হলে গ্রামবাসীকে জিজ্ঞেস করে আমাকে জানাবে।
অর্ধ রাত হয়ে গিয়েছিলো। আমি শুয়ে পড়লাম।
***
খুব সকালেই আদালতের স্ত্রী তাজকে ডাকলাম। আমি তার ভীত অবস্থা দূর করার চেষ্টা করলাম না। নিশ্চিত ছিলাম, আসামীর সঙ্গে এ রাত কাটিয়েছে এবং সে পবিত্র মেয়ে নয়। এরপরও সে আসামীকে সত্য পীর মনে করে।
তোমাকে একটি কথা বলে দিচ্ছি তাজ!- গম্ভীর কণ্ঠে বললাম- তুমি আমার কাছে কিছুই লুকোতে পারবে না। ঐ পীর অনেক বড় অপরাধী আর শয়তান ছিলো। আর আমি সব অপরাধীর পীর। সবচেয়ে বেশি থোকা দিয়েছে সে তোমাকে। কিন্তু যা হওয়ার হয়ে গেছে।……….
তোমার গোপন কথা আমার ভেতর গোপন থাকবে। তোমার স্বামী তোমাকে পবিত্র মনে করে। আমি ওকে একথাই বলবো যে, তুমি পবিত্র। কিন্তু আমার কাছে মিথ্যা বলবে না। তোমার বিরুদ্ধে আমি কিছুই করবো না। কিন্তু আমাকে উল্টো বুঝানোর চেষ্টা করলে তোমার কপালে দুঃখ আছে।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখের বর্ণের নানা ধরনের রূপান্তর ঘটলো। তারপর তার মাথা নুয়ে পড়লো। না, অভিযোগ ও তিরষ্কারের ভয় দেখিয়ে তার সঙ্গে কথা বললাম না। তবে তার ভয়ও দূর করলাম না। যাতে সে পায়ের তলায় মাটি খুঁজে না পায়।
হ্যাঁ, এবার সে ভেঙ্গে পড়লো। চোখ ভরে পানি এলো। আমার কথার সুর ধীরে ধীরে মমতার সুরে রূপান্তর করতে লাগলাম।
আমার শুধু একটি কথা শুনুন- কান্নাভারী গলায় মিনতি করলো।
শুধু একটা নয়, তোমার সব কথা শুনবো। তুমি তো আসামী নয়। তোমার সামান্য অপরাধ থাকলেও আমি এর ওপর পর্দা চড়িয়ে দেবো।
হ্যাঁ, আমি এটাই বলতে চাচ্ছিলাম যে, আমার সব কথা আমানত হিসেবে গোপন রাখবেন। আমি ধোকায় পড়ে গিয়েছিলাম। একটা ছিলো সন্তানের লোভ, আরেকটা ছিলো খানার প্রলোভন। আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিলো এ দুটো।
নকল পীরকে আমি সত্য পীর বলে মনে করলাম এবং আমাকে সে যে খেদমতের কথাই বললো, আমি বিনা বাক্যে করে দিলাম। হায় আমার স্বামী যদি এটা জানতে পারে আমাকে জীবিত রাখবে না। আর যদি আমার প্রতি দয়া করে তাহলে তালাক দিয়ে দেবে।
আমি ওয়াদা করেছি আগেই, সব আমার ভেতর গোপন থাকবে, বরং আমার মনে সব দাফন হয়ে যাচ্ছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, পীরকে ঘরেরই কেউ না কেউ পালাতে সাহায্য করেছে। সেটা কে হতে পারে?……. তোমাদের নওকর কেমন?
নওকরের এত সাহস নেই- তাজ জবাব দিয়ে জিজ্ঞেস করলো- আপনার কার প্রতি সন্দেহ হয়?
সন্দেহ নয়, আমি নিশ্চিত, আসামীকে ফেরার করানো হয়েছে, ……. তোমার ননদ সম্পর্কে তোমার ধারণা কি? পীরের সঙ্গে কি ওর সখ্যতা হয়েছিলো?…..
আমার প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগে মাথায় এটা রেখে নাও। এ ব্যাপারে আমি আরো অসংখ্য নারী পুরুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করবো। আমি সব জেনে নেবো। তারপর আসামী পাকড়াও করা হবে। তখন কিন্তু সব স্বীকার করবে। আর তোমার কোন কথা মিথ্যা প্রমাণিত হলে বড় বেইযযতী হবে তোমার। এখনও সময় আছে, সত্য বলে দাও আমাকে অত্যন্ত ঠাণ্ডা গলায় বললাম আমি।
আপনি যা চাইবেন আমি তা দেবো….. শুধু বলুন, যদি এটা জানা যায় তাহলে কি তাকে আপনি গ্রেপ্তার করবেন? ভয় ও আশার মিশ্রিত সুর তার কণ্ঠে।
না, যে ফেরার করেছে সে নিজের ঘর থেকে ফেরার করিয়েছে। তাই তার জন্য এটা অপরাধ নয়। কারণ এ ঘর বা বাড়ি থানার জেলখানা নয়। জেলখানা থেকে পালানো এবং পালাতে সাহায্য করা অনেক বড় অপরাধ।……
