সে আমাকে দুদন্তও এগুতে দিলো না। নিজের স্বামীর প্রশংসা শুরু করে দিলো। যত আপত্তি তার শাশুড়িকে নিয়ে। আদালতের বোনের দাবী, তার শাশুড়ি হলো সারাক্ষণ ঝগড়া বিবাদ লাগিয়ে আনন্দ পাওয়া এক বিকৃতি রুচির মহিলা।
আমার চোখে মুখে সহমর্মিতা, আগ্রহ ফুটিয়ে তুলে তার কথা শুনতে লাগলাম। সেও সহজ ভঙ্গিতে অসংকোচে তার ভেতরে জমে থাকা কথার স্তূপ উগড়ে দিতে লাগলো। আশা করছিলাম, কথায় কথায় সে পীর সম্পর্কে এমন কিছু কিছু বলে বসবে, যা আমার জন্য বেশ কাজের হবে।
স্বামীর ব্যপারে ও আজো অন্ত-প্রাণ। দুজনে দুজনকে তীব্রভাবে চায়। একবছর হলো সে বাপের বাড়ি আছে। এর মধ্যে স্বামী স্ত্রীর সাত আটবার মিলন হয়ে গেছে। তবে স্বামী স্ত্রীর মতো নয়। গোপন প্রেমিক প্রেমিকার মতো। যেন অভিসারিকায় পাওয়া দুই নারী পুরুষ।
রাতের অন্ধকার গ্রামের বাইরে ঘন বন বৃক্ষ এলাকায় ওদের অভিসার হয়েছে। এ থেকেই আমি বুঝতে পারি যে, তার স্বামী নিজের মায়ের ঝগড়াটে স্বভাবকে ভীষণ ভয় পায়। নিজের স্ত্রীকে এত ভালোবেসেও মুখ ফোটে মাকে বলতে পারে না।
তোমাদের ঘরে যে পীর এসেছিলো তাকে নিশ্চয় তোমার শাশুড়ির কথা বলেছে- আমি বললাম।
পীর নিজেই একথা বলে দিয়েছিলো- সে বললো- আমি তো হয়রান হয়ে গিয়েছিলাম। আমার মুখ দেখেই আমার মনের কথা বুঝে নিয়েছিলো। গায়েব সম্পর্কে জানতো কিভাবে? বলেছিলো তাবিজ দেবে আমাকে।
তাবিজ দিয়েছিলো?
না এখন তো সবাই জেনে ফেলেছে পীর আসলে ধোকাবাজ ছিলো। প্রথমেই আমার সন্দেহ হয়েছিলো- সে থেমে গেলো এবং তার মাথা আনত হয়ে গেলো।
এ এলাকায় পীরদের পীরানীর ঘটনা ও মামলা আমার হাতে আরো কয়েকটি পড়েছিলো। আমার মনে আছে, তাদের মুরিদদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় একটা পর্যায়ে এসে মুরিদের মাথা এভাবে ঝুঁকে পড়তে দেখেছি।
মমতাময়ী হাতে আমি তখন তাদের পড়ন্ত মাথাটি উঠিয়েছি এবং মুখ থেকে সে কথা বের করে এনেছি যা তাদের মাথা নত করে দিয়েছে। আদালতের বোনের তমুখী অবস্থা তাই আমার জন্য নিরর্থক বিষয় ছিলো না।
আমার কাছে কিছু লুকিয়ো না বিবি- আমি তার মাথাটি উঁচু করে নরম গলায় বললাম- আমি জানি, কোন কথাটা মুখে উচ্চরণ করতে তুমি লজ্জা পাচ্ছো। আমাকে ভাই বন্ধু যা ইচ্ছে তাই ভাবতে পারো। পুলিশ অফিসার মনে করো না। এসব কথা আমার রিপোর্টে যাবে না। আমার অন্তরে লিপিবদ্ধ থাকবে।
আমি সে পর্যন্ত যেতে দেয়নি- সে ফিস ফিস করে বললো- সে আমাকে একলা নিয়ে বসেছিলো এবং আমার মাথায় হাত রেখে পুরো শরীরে হাত বুলিয়েছিলো।
পীরের কাছে বসার দুদিন আগেও নাকি তার স্বামীর সঙ্গে গোপনে সাক্ষাত হয়েছিলো। সেদিন বাকি রাত সে কেঁদে কেঁদে কাটায়। তার মাথায় পেরেকের মতো একটা বিদ্ধ হতে থাকে, তুমি তোমার স্বামী ও নিঃস্পাপ সন্তানের ইযযত।
আমি পীরকে বললাম, আপনি তো গায়েবী শক্তির অধিকারী, আল্লাহর ওলী। এক মিহলার ব্যপারে আপনার এমন অপবিত্র মনোভাব থাকা উচিত নয় আদালতের বোন আমাকে বলল- আমি পীরকে এ কথাও বলেছি।
আপনার যদি দুনিয়ার প্রতি এতই লোভ থাকে তাহলে আমার কাছে পয়সা চান, অলংকার চান। আপনি আমার ইযযত নিতে চান, এতো আমার স্বামীর সংরক্ষিত ইযযত। যান আপনি তার কাছে চান।
আচ্ছা! আমাকে একটা কথা বলো তো, আমি বললাম- পীরকে মানুষ এমনভাবে ভক্তি শ্রদ্ধা করে যে, মহিলারা নিজেদের ইযযত ন্যরানা দেয়াটাও পাপ মনে করে না। তাহলে তোমার মনে কি করে আসলো যে, পীরের চেয়ে তোমার স্বামীই অনেক ভালো?
আপনি ভালো মন্দের কথা বলছেন- সে বললো- আমার তো একটা কথা বুঝে আসে না। যিনিই পীর হবেন তার সম্পর্ক সবসময় আল্লাহর সঙ্গে থাকবে। খোদার নিকটজন হলো পীরেরা।
যদি একথা ঠিক হয়ে থাকে তাহলে নারীদের প্রতি পীরদের অবৈধ দৃষ্টি কিভাবে পড়ে? অন্য কেউ নারীদের ওপর নজর দিলে সবাই তাকে বদ চরিত্র বলে; কিন্তু পীরের বেলায় কেন তা সচ্চরিত্র হয়ে যায়?
গ্রাম্য নিরক্ষর এক মেয়ে, শিক্ষার কোন শব্দ ছিলো না তার কাছে। এজন্য সে গুছিয়ে বলতে পারছিলো না যে, পীরকে কেন সে প্রত্যাখ্যান করেছে। তার সাফ কথা হলো, তার ভেতর থেকে এক আওয়াজ আসে, এ লোক কমপক্ষে এ মুহূর্তে ওয়ালি জাতীয় কোন কিছু না; যৌন লিপসায় আক্রান্ত এক ব্যক্তি।
পীরকে সে আর কিছু বললো না। কামরা থেকে বের হয়ে এলো।
এবার আমার ভাইকে বলতে চেয়েছিলাম- সে বললো- কিন্তু আমার ভাই, ভাবী ও আমার মার ওপর পীরের জাদু বিদ্যা এমনভাবে চেপে বসেছিলো যে, তারা আল্লাহ ও রাসূলকেও ভুলে গিয়েছিলো। পীর গুপ্তধনের কথা তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে পাগল করে দিয়েছিলো। যদি নালিশ করতাম, পীর বদকার লোক, ভাই আমাকে মেরেই ফেলতো।
অন্যরা আমাকে অভিশাপ দিতো, পীরের কৃপা দৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়ে গেছি। আমি তাই মুখ বুঝে দেখতে থাকলাম কি হয় না হয়। তারপর তো দুধ থেকে পানি পৃথকই হয়ে গেলো।
***
আদালতের বোনটিকে এক কথায় সুন্দরী বলা যায়। কিন্তু এ মুহূর্তে আমার কাছে মনে হলো, এই মেয়ের ভেতর আল্লাহর গায়েবী নূর আছে। যার কদীপ্তিত্তে তার চোখে মুখে উজ্জ্বল হয়ে আছে। তার কথাগুলো আমার গভীরে গেঁথে যাচ্ছিলো।
তোমার ভাই আদালত বলেছে, তার স্ত্রী পীরের খেদমতের জন্য রতে পীরের সঙ্গে থাকতো- আমি বললাম- এ ব্যাপারে তুমি কিছু বলতে পারো?…… তোমাকে আরেকবার বলছি, তুমি আমাকে যা বলবে তা আমার অন্তরেই থাকবে। এটাও শুনে রেখো, তোমার ভাইয়ের সঙ্গে সে প্রতারণা করেছে। তার পাঁচশ টাকারও বেশি মেরে দিয়েছে।
