সকালে উঠে বড় দরজার দিকে গিয়ে কি দরজা খোলা দেখেছে তারা? নাকি নওকারকে এ ব্যপারে জিজ্ঞেস করেছে যে, সকালে উঠে সে দরজার শিকল খোলা পেয়েছে না বন্ধ পেয়েছে?
এক ভাই আরেক ভাইয়ের মুখের দিকে তাকালো। তারা হয়রান হয়ে উঠলো।
শিকল লাগানো ছিলো, নওকর কি আপনাদেরকে একথা বলেছে?- আমি জিজ্ঞেস করলাম।
হ্যাঁ জনাব!- আদালত বললো।
আচ্ছা আপনাদের নওকার কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য?
ষোলআনা জনাব! কেন সে কি কিছু করেছে?- আদালত পেরেশান হয়ে গেলো।
এটা সময়মতো জানা যাবে। সে কিছু করে থাকলেও সেটা জরুরী কিছু হবে না। আমি শুধু বলতে চাই আসামী ঐ জানালা পথে বের হয়নি। সে তো পেছনের উঠোনেই যায়নি।
জনাব; সকালে তো আমরা জানালা খোলা দেখেছি। সবসময় তো সেটা বন্ধই থাকতো- আদালত বললো।
এছাড়া তো অন্যকোন পথও ছিলো না ইনস্পেক্টর সাহেব!- ক্যাপ্টেন বললো- বড় কামরার দরজা বাইরে থেকে বন্ধ ছিলো। আর বাইরের দরজা ভেতর থেকে ছিলো বন্ধ। সে জানালা দিয়েই পালিয়েছে।
আসামীর শারীরিক আকৃতি আপনাদের দুজনের মধ্যে কার সঙ্গে মিলে? আমি অযথা তর্কে না জড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
আমার সঙ্গে মিলে সে আমার চেয়ে একটু মোটাও বেশি হবে। কম হবে না- আদালত বললো।
দুজনকে জানালাওয়ালা কামরায় নিয়ে গেলাম। দেখলাম, জানালার ফ্রেম জুড়ে ঝোল কালি লেগে আছে। তারপর আদালতকে বললাম, জানালা দিয়ে সে যেন ঘর থেকে বের হয়ে যায়।
আদালত মাথাটুকুই কেবল ঢোকাতে পারলো, কাঁধ জানালার ফাঁকে ফেসে গেলো। সে কাঁধ ওপর নিচ করলো। বহু কষ্টে কাঁধ বেরও হয়ে গেলো, কিন্তু শরীর? কেটে বের করতে হবে। আদালতকে নেমে আসতে বললাম। সে অনেক কসরত করে জানালা থেকে নেমে এলো।
এখন দেখুন, জানালার আশেপাশের ঝোল ময়লা দেখিয়ে বললাম- দেখুন তো ময়লাগুলো আছে কি? আপনার জামা দেখুন….. আসামী এদিক দিয়ে গেলে ধুল ঝোল পরিষ্কর হয়ে যেতো। আপনার কাপড় নোংরা হতো না। কাপ্তান সাহেব! সে এদিক দিয়ে যায়নি। এজন্য আপনার নওকরের ওপরও সন্দেহ জাগে না যে, সে আসামীকে এদিক দিয়ে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
আমাদের তো জনাব সৈনিকের মাথা!- ক্যপ্টেন বললো- এত সুক্ষ্ম বিষয় ভাই আমরা বুঝবো কি করে।
কিন্তু আদালত ও ঘরের মহিলাদেরও বক্তব্য, বড় কামরার দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ ছিলো। তাহলে সে গেলে কোন দিক দিয়ে?
আমাদের ব্যবস্থা এত পাকা ছিলো যে, রশি দিয়ে তার হাত পা বাধার প্রয়োজন বোধ করিনি- আদালত বললো।
সোজা কথা হলো- ক্যপ্টেন বললো- রশি দিয়ে হাত পা বাধার কথা মনেই আসেনি। এমন রাগ ছিলো যে, মাথা বিগড়ে যাবার মত অবস্থা। আদালত তো চেয়েছিলে ওকে হত্যা করে লাশ দাফন করে আসবে কোথাও। আমি ওকে এথেকে বাধা দিই যে, একাজ করলে তোমারও ফাঁসি হয়ে যাবে।
জনাব, আদালত অন্য সুরে বললো- পীর আমাদেরকে অনেক বড় ধোকা দিয়েছে ঠিক, কিন্তু আমার সন্দেহ হচ্ছে তার কাছে এমন কোন বিদ্যা আছে, যার জোরে সে এখান থেকে অনায়াসেই বের হয়ে গিয়েছে। আমরা তাকে বেঁধে ফেললেও সে বাঁধন খুলে ফেলতো।
হ্যাঁ, এছাড়া তো তার পলানোর আর কোন পথ নেই- ক্যপ্টেনও সায় দিলো।
তার কাছে কোন বিদ্যা আছে কিনা, এটা আবার এখন জানার বিষয় নয়, পরে দেখার দরকার হতে পারে। একথা বলে আমি আমার নওকরের কাছে গেলাম।
আমি নওকরকে আরো অনেক কথা জিজ্ঞেস করলাম। তবে তার কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারলাম, বাড়ির ভেতরগত কথা তার খুব একটা জানা নেই। তাকে এটাও জিজ্ঞেস করলাম। আদালতের বোনের তার স্বামীর সঙ্গে কিসের ঝগড়া?
আমরা চাকর নওকররা তো এটাই জানি যে, বিবি সাহেব নিজের দেমাগ দেখিয়ে চলতো, কিন্তু তার শ্বশুর বাড়ির লোকেরা বলতো, তাদের দেমাগই উঁচু। অন্যকান কারণ নেই- নওকর বললো।
ওর চালচলনে ওর স্বামীর সন্দেহ ছিলো?
হুজুর! আমরা এখনো এমন কোন কথা শুনতে পাইনি। উনার স্বামী উনাকে মনে প্রাণে চান। আমার মা আমাকে বলেছে, উনার শাশুড়ি সুবিধার মহিলা নয়। গ্রামের গরীব লোকদের ওপর এমন জোরজবস্তি করে যেন সেই দেশের রানী-নওকর বললো।
তুমি এত নিশ্চিত করে কি ভাবে বলছো যে, চৌধুরীর বোনের চালচলন ঠিক আছে?
খারাপ হলে তো জানতেই পারতাম- নওকর বললো- বিবি তো কখনো বেরই হয় না।
আর ঘরেও তো ভিন্ন পুরুষের আসা যাওয়া নেই।
চৌধুরী (আদালত) সাহেবের স্ত্রী কেমন?
জ্বি হুজুর! ইনিও ঠিক আছেন।
আসামী সম্পর্কেও কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু নওকর কিছুই বলতে পারলো না। তার সেখানে যাওয়ার অনুমতি ছিলো না। অন্য নওকরও কোন কিছু বলতে পারলো না?
***
রাত হয়ে গিয়েছিলো। গ্রামেই রয়ে গেলাম। তবে ঘুমুনোর সুযোগ হয়নি। এ ধরনের কেসে পুলিশের নিজস্ব ঝামেলাও মেলা। অন্যান্য থানায় আসামীর সনাক্তকরণ রিপোর্ট পাঠাতে হয়। যাতে যেকোন এলাকা থেকে আসামীকে সহজে ধরা যায়। আমি আই.এস.আই-কে থানায় খবর পাঠিয়ে দিলাম। এ কাজগুলো যেন দ্রুত সম্পন্ন করা হয়।
রাতে বাড়ির বৈঠকখানায় আদালতের বোনকে নিয়ে বসলাম। আদালতের বোনকে বললাম,
তুমি আমাকে থানাদার মনে করো না। ওর ভয় দূর করার জন্য বেশ সহানুভূতির গলায় তার স্বামী ও সংসারের খুটিনাটি নিয়ে কথা বলতে শুরু করলাম। ইচ্ছে করেই তার স্বামীর বিরুদ্ধে বলতে লাগলাম।
