এ ভেদ তুমি সহ্য করতে পারবে না- পীর চোখ বড় বড় করে বললো আমি যা দেখতে পাই তুমি তো তা দেখতে পারো না। এ বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস না করাই ভালো। আগামীকাল সন্ধ্যায় তোমাদের কাছে চলে আসবো- পীর এমনভাবে কথা বলছিলো যেন স্বপ্নের ঘোরে কথা বলছে।
পীর বলতে লাগলো, এই খানার ব্যপারে আমার কোন আগ্রহ নেই। আল্লাহ তাআলা আমাকে যে খাযানা দিয়েছেন তোমরা কখনো তা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারবে না। তোমাদের খানার দরকার ছিলো আমি তা বের করে দিয়েছি…… এখন তা বের করে ভোগ করো।
পীর চলে গেলো। আদালত তখনই সে ঘরে একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে দিলো…. সে দিনটি এবং রাতটিও কেটে গেলো। পরদিনও চলে গেলো। পীর ফিরে এলো না। তার দুই শাগরেদ পীরের সঙ্গেই চলে গিয়েছিলো।
সেদিন সন্ধ্যায়ই আদালতের ক্যাপ্টন ভাই ছুটিতে বাড়িতে আসলো। বাড়ি এক হলেও ক্যাপ্টনের হিসসা প্রাচীর দিয়ে পৃথক করা। আদালত খবর পেয়ে ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলো। এর আগেই ক্যাপ্টেনের স্ত্রী ক্যাপ্টেনকে পীরের কহিনী যতটুকু জানে বলে দিয়েছিলো।
ক্যপ্টেন আদালতকে দেখে পীর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো। আদালত পীরের কারামতের কিছু কাহিনী শুনিয়ে বললো, পীর তো তার ঘরে গুপ্ত ধনের মুখ খুলে দিয়ে গেছে। আজ রাতে গুপ্তধন বের করা হবে।
রাতে ক্যাপ্টেনও আদালতের ঘরে গেলো। আদালত তাকে খাযানার ঘরে নিয়ে গেলো। ক্যাপ্টেন আদালতকে খনন কাজ শুরু করতে বললো। আদালত ঢাকনার ওপর থেকে মাটি সরালো এবং ঢাকানাও উঠিয়ে নিলো। কিন্তু এর নিচে কিছুই ছিলো না। আদালত পাগলের মতো কোদাল চালাতে লাগলো। কিন্তু কাদা মাটি ছাড়া আর কিছুই বের হলো না।
ক্যপ্টেন বুঝে ফেললো, তার ছোট ভাই প্রতারণার শিকার হয়েছে। ঢাকনাটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখে সবাইকে বললো, এতো এ যুগের বানানো হলে বা ঢাকনা।
আদালতের মায়ের হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়লো। ঘরের এক দিকে রাখা বড় একটি ডেগচি দেখিয়ে বললো, এই ঢাকনা তো ঐ ডেগচির।
আদালতের বোন ও স্ত্রীও থালাটা চিনতে পারলো। কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারলো না। পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে ছাড়া কিছুই করার ছিলো না তাদের।
***
আমার মাথায় একটা সম্ভাবনা উদয় হলো যে, আদালতের গ্রামে নিশ্চয় পীরের সহমর্মী কেউ আছে। কিন্তু এ সন্দেহটা পোষণ করতে মনে সায় দিচ্ছিলো না। কারণ এ পরিবার প্রতারণার শিকার হয়েছে। তবে চাকর বাকর হয়তো পীরকে পালাতে সাহায্য করেছে।
ক্যাপ্টেন সাহেব! আদালতের বড় ভাইকে বললাম- আসামী মনে হচ্ছে অত্যন্ত ভয়ংকর। একে তাড়াতাড়ি ধরতে না পারলে এ এলাকায় প্রতরণাসহ আরো অনেক বিপদজনক অপরাধকৰ্ম সংঘটিত হতে পারে। শুধু আপনার ভাই-ই নয় পুরো এলাকার প্রতি আমি সহমর্মী। আমার দায়িত্ব পালন করার জন্য আপনার ভাইয়ের পরিবারের মেয়েদেরও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন পড়বে। এরা সবাই আমার মা বোনের মতোই। এটা আমার পেশা ও আত্ম মর্যাদাবোধের প্রশ্ন। আপনি সেনা অফিসার। পেশাগত দায়িত্ব কি জিনিস আপনি সেটা জানেন।
জনাব, আপনার জন্য সম্পূর্ণ অনুমতি আছে- ক্যপ্টেন বললো- শুধু অনুরোধ করবো, জিজ্ঞাসাবাদ আমার ঘরে বা আমার ভাইয়ের ঘরে করবেন। আরেকটা অনুরোধ, খাবার খেতে হবে কিন্তু আমার ঘরে।
ঘরের চাকর নওকরদের আমার কাছে সোপর্দ করুন।
দুই নওকরকে পাঠানো হলো আমার কাছে। রাতে ওরা কোথায় ঘুমোয় ওদেরকে জিজ্ঞেস করলাম। একজন বললো, নিজের বাড়িতে ঘুমোয়। আরেকজন এ বাড়ির উঠোনের মথায় ছোট একটি ঠাকুরীতে ঘুমোয়। যে রাতে পীর পালিয়েছে সে রাতেও সে ওখানেই শুয়েছিলো।
নওকরকে নিয়ে আমি তার থাকার জায়গাটি দেখতে গেলাম। গরু মহিষের গোয়ালের কাছে একটি নিম গাছের তলায় তার ঘর। তার ঘর থেকে বাড়ির প্রধান দরজা আট কদম দূর। সে প্রতিদিন ফজরের আযানের আওয়াজ শুনে জেগে উঠে এবং মহিষগুলোকে দানা পানি দেয়।
প্রধান দরজা রাতে ভেতর থেকে বন্ধ থাকে। সকাল বেলা সেই দরজা খুলে দেয়।
প্রধান দরজাটি বেশ প্রশস্ত ও অনেক উঁচু। বড় মোটা শিকল দিয়ে লাগানো হয়। ক্যাপ্টেন বলেছিলেন, সকাল বেলা উঠে দেখেন ঐ জানালা এবং দরজার শিকল খোলা।
ভালো করে মনে করে দেখো- নওকরকে বললাম- আজ সকালে কি দরজা তুমি খুলে ছিলে না নাকি জেগে উঠে দেখেছো দরজার শিকল খোলা?
আমার ভালো করেই মনে আছে হুজুর! শিকল আমি নিজ হাতে খুলেছি।
এ বাড়িতে একজন পীর এসেছিলো সেটা কি জানো তুমি?
জানি হুজুর! অনেক দিন ছিলেন এখানে। কাল উনাকে এখানে ধরে এনেছিলো। তাকে নিয়ে অনেক হৈচৈ হয়েছে গ্রামে। কাপ্তান সাব ও তার ভাই সাব আরো অনেকে মিলে উনাকে অনেক মারপিট করেছিলো। আজ সকালে মহিষগুলোকে দানা পানি দিচ্ছিলাম। তখন চৌধুরী সাব (আদালত) এদিকে এলেন।
আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কাল রাতে আমি কোথায় শুয়েছিলাম। আমি বললাম এখানেই। আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না আমাকে। তবে কয়েকটি গাল দিয় চলে গেলেন। এরপর কাপ্তান সাবও এলেন। আমি তাকে বললাম, দরজার শিকল তো লাগানো ছিলো, পীর এখান দিয়ে কি করে যাবে……. হুজুর! আমরা গরীব আদমী! গালি খাওয়াই আমাদের কাজ। আমি উনাকে আর কিছু বললাম না। তিনি চলে গেলেন।
***
নওকরকে ওখানেই রেখে বাইরে এসে ক্যপ্টেন ও আদালতকে একদিকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
