একথা বলে পীর ধ্যান করে কি একটা হিসাব নিকাশ করলো। তারপর বললো, এ বাড়িতে যার নাম তা অক্ষ্যর দিয়ে শুরু সেই ভেতরে আসতে পারবে।
আদালনের স্ত্রীর নাম ছিলো তাজ বেগম। তাজ দরুণ খুশি হলো। এত বড় আল্লাহর পিয়ারা বুযুর্গের খেদমতের জন্য তাকে সুযোগ দেয়া হচ্ছে। সে রাতেই চিল্লা শুরু হয়ে গেলো। তাজকে পাশের কামরার দরজায় পৌঁছে দেয়া হলো।
আদালতকে আমি জিজ্ঞেস করলাম। পীর সাহেব তাজকে প্রতি রাতে কতবার করে ডাকতো। আদালত জানালো, সে শুয়ে পড়তো, সকালে তাজ তাকে বলতো, পীর ওকে রাতে দুতিনবার ডেকেছিলো।
পীর ঘোষণা করে দিয়েছিলো, চিল্লা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন সাক্ষাপ্রার্থী কোন উদ্দেশ্যে হাসিলের জন্য তার কাছে আসতে পারবে না। দিনের বেলা তার শাগরেদ দুজন কেবল ভেতরে আসতে পারতো। রাতে ওদেরও ভেতরে যাওয়ার অনুমতি ছিলো না।
এভাবে চলতে লাগলো। পীর ও দুই শাগরেদকে প্রতিদিন রসালো খাবার দেয়া হতে লাগলো। প্রতিদিন তিন কেজি দুধ, ঘিয়ে ডুবিয়ে পরটা ভাজা এবং আস্ত একটা মুরগি পীরকে খাওয়ানো হতো।
ঐ বাড়ির সামনে বহু সাক্ষাতপ্রার্থী প্রতিদিন ভিড় করতো। পীরের সাক্ষাতের জন্য আদালত ও পীরের শাগরেদের কাছে মিনতি করতো। শিশু বাচ্চা নিয়ে অনেক মহিলাও বাড়ির বাইরে সারাদিন কাটিয়ে দিতো। কিন্তু পীরের দৃষ্টি কারো ভাগ্যে জুটলো না।
পুরো আটটি রাত সে চিল্লা করলো- আদালত জানালো- সত্য কথা বলতে কি আমিও খুব উফুল্ল ছিলাম যে, আমার বাড়ি থেকে গুপ্তধন উদ্ধার করা হচ্ছে। চিল্লা শেষ করে পীর আমাকে বললো, সে গুপ্তধনে হাত দিতে সাহস পাচ্ছে না। কারণ, শাহ সুলাময়ানের এক জিন গুপ্তধন পাহারা দিচ্ছে।
আদালত তখন পীরের হাতে পায়ে ধরে অনুনয় বিনয় করলো, যেভাবেই হোক তাকে এই খানা উদ্ধার করে দিতে হবে। সে তাকে হাতভরে ন্যরানা দিবে। যে করেই হোক জিন এখান থেকে হটিয়ে দিন।
জিন আমাকে সাবধান করে দিয়েছে, খাযানার কাছে না যেতে- পীর আদালতেক বলে- আমি তাকে রাজি করতে অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু তাকে রাজী করা এত সোজা নয়। আমি তাকে অন্ধ করতে পারি, শাস্তি দিতে পারি। কিন্তু এতে আমাদের প্রাণের আশংকা রয়েছে- একথা বলে সে দুবার বললো–আমি অবশ্যই পারবো, পারতেই হবে আমাকে।
যা হোক আদালত ও তার স্ত্রী তাজ, পীরকে খানা উদ্ধারের ব্যপারে বাজী ধরলো পাঁচশ টাকার বিনিময়ে। তখনকার পাঁচশ এখনকার বিশ হাজার টাকার চেয়ে বেশি। সঙ্গে ছিলো দুটি ঘোড়া, আরো দামী দামী কাপড় ও সোনার জরি দিয়ে তৈরী নাগরা জুতো।
পীর জানালো, আরো কয়েক রাত চিল্লা করতে হবে। আদালতের কাছ থেকে সে আরো শখানেক টাকা নিয়ে তার দুই শাগরেদকে দিয়ে শহরে পাঠালো। তারা প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস পত্র আনবে। তারা তখনই রওয়ানা হয়ে গেলো এবং সন্ধ্যার দিকে ফিরে এলো।
আদালত জানলোও না তারা কি কিনে নিয়ে এসেছে।
পীর আদালতকে নির্দেশ দিলো, সন্ধ্যায় তার স্ত্রীকে গোসল করিয়ে লালপাড়ের লাল কাপড় পরিয়ে তার কামরায় পাঠিয়ে দেবে। তবে সমসময় তাকে অযু অবস্থায় থাকতে হবে।
এই মহিলা আমার কাছ থেকে সাত কদম দূরে বসে থাকবে। আর তার মনে শুধু আল্লাহর নামই থাকবে- পীর বলেছিলো।
***
আদালত বড় আগ্রহ ও উৎসাহ নিয়ে তার স্ত্রীকে পীরের কামরায় পাঠিয়ে দিলো। পীর তাকে সঙ্গে নিয়ে তিন রাত চিল্লা করলো। সকালের সূর্যোদয়ের আগেই তাজ তার কামরা থেকে বের হয়ে যেতো।
চতুর্থ দিন পীর কোদাল চাইলো। আদালত ঘটনা বর্ণনার সময় জানালো, ভেতর থেকে কোদাল চালানোর আওয়াজ আসতে লাগলো। তারপর এই আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেলো। প্রায় এক ঘন্টা পর দরজা খুললো। ঘরের সবাইকে সে কামরায় ডেকে আনলো। এক জায়গায় মাটি খোদাই করা দেখা গেলো। আদালতকে বললো, এখানে আরা কোদাল চালাও।
আদালত তিনবার কোদাল মারলো। চতুর্থবার এমন আওয়াজ পাওয়া গেলো যেন কোন ধাতব কিছুর ওপর কোদাল পড়েছে।
থামো!- পীর বললো তখন- এখন হাতে মাটি সরাও।
আদালত হাতে মাটি সরালে ইস্পাত বা লোহার চকচকে কিছু দেখতে পেলো। আদালত হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো বিস্ময়ে এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে গিয়ে বললো
ইয়া সরকার! এতো কোন বাক্সের তালা মনে হচ্ছে!
ভালো করে দেখো, পীর বললো।
আদালত আরো মাটি সারালো।
এটা একটা ঢাকনা- পীর বললো- একটা ডেকের ওপর রাখা আছে। এটা……. সবাই ভালো করে দেখো।
আদালতের মা বোন স্ত্রী সবাই ঝুঁলে দেখলো। ডেগের ঢাকনা মাটির সাথে আটকে আছে। পীর কোদাল নিয়ে তার ওপর আস্তে আস্তে টোকা দিলো। শব্দ শুনে বোঝা যাচ্ছিলো, এর নিচে কিছু এটা আছে।
এখন আর এর চেয়ে বেশি খনন করতে পারবে না- পীর বললো আগামীকাল রাতে গ্রামের সবাই যখন শুয়ে পড়বে তখন তোমরা খনন শুরু করবে। আজ রাতে ঐ ঘরে প্রদীপ জালিয়ে রাখো। আজ রাতে আমি এখানে থাকবো না। শাহে সুলাইমানের দরবারে আমাকে হাজিরা দিতে হবে। তোমরা আমাকে দিয়ে একটি পাপ করিয়েছে। খানায় যে জিন প্রহরায় ছিলো তাকে এখান থেকে তাড়িয়ে দিয়েছি। এখন আমার জন্য জরুরী কাজ হলো, শাহে সুলাইমানের দরবারে গিয়ে মাফ চাওয়া। না হলে সবার অপঘাতে মৃত্যুর আংশকা রয়েছে।
শাহে সুলাইমানের দরবার কত দূর হুজুর?- আদালত জিজ্ঞেস করলো।
