ভণ্ড পীর ফকিরের দাসত্ব মানুষের মধ্য থেকে আজো কমেনি, যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির রাজত্ব চলছে। সহীহ পীর ফকীর যে নেই এমন নয়, তবে তারা সংখ্যায় খুবই কম। ভণ্ড পীরের মুরিদরা তাদের পীরের ক্ষমতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে এমন গাঁজাখুরি বাহিনী ফেঁদে বসে, শুনলে মনে হবে সে কোন নবীর চেয়েও বড় কারামতওয়ালা। (নাউযুবিল্লাহ)।
আসলে এসব অতিরঞ্জনের কারণ হলো, নিজেকে নিজের প্রবোধ দেয়া যে, সে যাকে পীর মেনেছে সে লোক আসলেই কামেল লোক। ক্যাপ্টেনের ভাইয়ের অবস্থাও ছিলো এমনই। প্রথমত তার বোনের স্বামী-বিচ্ছেদের সমস্যা। দ্বিতীয়ত: তার বিয়ে হয়েছে সাত আট বছর। এখনো বাচ্চার মুখ দেখতে পারেনি। সে আগেই ঠিক করে রেখেছিলো, পীরের পবিত্র পদধূলি এ গ্রামে পড়লেই সে তার কাছে ছুটে যাবে এবং বলবে, তার বোনকে যেন তার স্বামী নিয়ে যায় এবং তাকে একটি সন্তানের ভাগ্য দান করে।
এর মধ্যে একদিন পীরের পদধূলি ঐ গ্রামে পড়লো। এক বাড়িতে তার আস্তানা জমে উঠলো। সে বাড়ি ও বাড়ির আশপাশের রাস্তাঘাট ভক্ত মুরিদদের আনা গোনায় সব সময় সরব হয়ে থাকে।
একদিন এক মহিলা এসে সালাম জানালো। তার দুই ছেলে ইংরেজ সেনাবাহিনীতে গিয়েছে। পীর তাকে দেখতেই বলে উঠলো
তোমার দুই ছেলে একেবারে সুস্থ আছে। চিন্তা করো না। ওদের জানের সদকা দিয়ে দাও। ওরা যে বার্মা ফ্রন্টে আছে। একটু বিপদজনক অবস্থায় ছিলো তারা। এখন ভয় কেটে গেছে। আমি একটা তাবিজ দিয়ে দেবো। বাড়ির প্রথম দরজায় লাগিয় দেবে।
সেখানে যারা ছিলেন সবাই হয়রান হয়ে গেলো। সুবহানাল্লাহ, পীর সাহেব নিজেই তার মনোবাসনা বুঝে নিয়েছেন। আরো কয়েকজন সৈনিকের মা পীরের কাছে আসে। পীর প্রত্যেকের ব্যাপারেই ঠিকঠাক বলে ঝুলি দেয় যে, তার ছেলে অমুক ফ্রন্টে আছে। নগদ নজরানায় পীরের বলে কয়েক ঘন্টাতেই ভরে যায়।
পীরের সঙ্গে তার দুই শাগরেদও ছিলো। পীর এক ঘরে ধ্যান করে বসে। আর সেই দুজন পাশের কামরায় অবস্থান নেয়। পীরের সাক্ষাতে কেউ আসলে ঐ দুজন প্রথমে তার মনোবাসনার কথা জেনে নেয় এবং নির্ধারিত কোন ইংগিতে পীরকে জানিয়ে দেয় যে এই মক্কেল এই এই সমস্যা নিয়ে এসছে। পীর মক্কেলকে দেখেই তার মনের সব কথা তার সামনে তুলে ধরে। মক্কেলের তখন বিস্ময়ের সীমা থাকে না।
ক্যাপ্টেনের যার নাম আমি সুবিধার জন রেখেছি আদালত। আদালত এসব কারামত দেখে ভাই পীরকে তার বাড়িতে নিয়ে এলো।
পীর এত বিশাল হাবেলি দেখে বুঝে ফেললো, এদের অনেক পয়সা আছে। কিছু হাতিয়ে না নিয়ে মনে শান্তি পাবো না।
তুমি তো খুব সামান্যই চেয়েছে- পীর তাচ্ছিল্য করে বললো- এখানে শাহে সুলাইমান (আ) এর ধণভাণ্ডার চাপা পড়ে আছে। তোমরা এর ওপর দিয়ে চলাফেরা করছো…… তোমার সন্তান কেন হবে না। অবশ্যই হবে….. আর তোমার বোনের চিন্তা মন থেকে দূর করে দাও। এই চাঁদের পূর্ণিমাতেই ওর স্বামী এসে ওকে নিয়ে যাবে। এমনিতে ওর স্বামীকে খেপাটে মনে হলেও ভেতর ভেতর সে খুবই অনুতপ্ত। আজ রাতে তোমার বোন ও স্ত্রীকে আমার কাছে নিয়ে এসো। তবে ওদের দেহ যেন সম্পূর্ণ পবিত্র হয়। উভয়েরই অযু করে আসতে হবে।
শাহে সুলাইমানের খাযানার কথা কী বললেন যেন সরকার!- আদালত চরম হয়রান হয়ে জিজ্ঞেস করলো।
অনেক পুরনো খাযানা- পীর রহস্যভরা গলায় বললো- শত শত বছর পেরিয়ে গেছে। খানা কোথায় আছে এটা আমাদের দেখতে হবে। পুরনো খাযানা বা ধণভাণ্ডার মাটির নিচে দাফন করা থাকলে সেটা আপনাআপনি চলা ফেরা করে। জিন বা কালনাগের প্রহরা এর ওপর অবশ্যই থাকে। এ অবস্থায় এর ওপর হাত দেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। অনেক কিছু করতে হবে। এই বাড়ির মাটি আমাকে বলছে, তার পেটে সোনার ভাণ্ডার আছে।
***
ধণ ভাণ্ডার বা গুপ্তধনের গল্প কাহিনীতে মানুষের আগ্রহ খুব বেশি। এর অর্থ হলো অধিকাংশ মানুষই হাস্যকর হলেও মনের গোপন কোনে এ স্বপ্ন লালন করে যে, একদিন যদি কোন গুপ্তধনের সন্ধান পেয়ে যেতাম তাহলে ভাগ্য ফিরে আসতো।
মানুষের আরেকটি বিশ্বাস আছে, এসব খানা বা গুপ্তধনের সন্ধান একমাত্র জাদুকর বা কামেল পীররাই দিতে পারে। তাই খাযানার কথা শুনে আদালতের ভেতরও হাজারো রঙ্গীন স্বপ্ন মাথা চারা দিয়ে উঠে। পীরকে তার মনে হয় আকাশ থেকে নেমে আসা কোন ফেরেশতা।
গুপ্তধনের কথা শুনে তুমি তো বেশ খুশি হয়েছে- পীর আদালতকে বললো- কিন্তু তুমি তো এটা জানো না যে, এই খাযানা যতদিন তোমাদের বাড়ির মাটির নিচে থাকবে ততদিন তোমাদের ঘর থেকে অশুভতা দূর হবে না। তোমার বোন ঘরে পড়ে আছে আর তোমার স্ত্রীর কোল খালি। এটাও একটা কুলক্ষণ।
ঐ খাযানা যদি বের হয়ে আসে তাহলে কি সেটা উদ্ধার করে কোথাও নিয়ে গিয়ে মাটি চাপা দিতে হবে?- আদালত জিজ্ঞেস করলো।
না, খাযানা বের হয়ে এলে এর অশুভতা দূর হয়ে যাবে এবং এর মালিক হবে তখন তুমি- পীর বললো।
আদালত, আদালতের বউ ও তার বোন তো আগ থেকেই পীরের নানান উড়ো উড়ো কারামতের কথা শুনে তার ভক্ত হয়ে গিয়েছিলো। যখন খানা এর আওয়াজ পৌঁছলো ওদের কানে, তখন তো সবাই পীরের দরবারে এসে মাথা ঠুকতে লাগলো।
পীর জানিয়ে দিলো, এ ঘরে তাকে ছয় সাত রাত চিল্লা করতে হবে। রাত জাগতে হবে। তবে শর্ত হলো কোন কিছুর প্রয়োজন হলে সে মুখ থেকে শব্দ বের করতে পারবে না। শুধু তালি বাজাবে। তখন ভেতরে শুধু নারীরাই আসতে পারবে। তবে অযু করে সম্পূর্ণ পবিত্র অবস্থায়।
