ফৌজের মা বাবা, ভাই বোন, স্ত্রী, শ্বশুর শাশুড়ি আত্মীয় স্বজন সবার শেষ ভরসা তখন নতুন নতুন গজে উঠা পীর, মুরশিদ। তাবিজ আর ঝাড় ফুক করে পীরেরা তাদের দুশ্চিন্তা দূর করে দিতো।
কোন বাড়ির কেউ ফৌজ থেকে ছুটি নিয়ে এলে বা ভালোমন্দ কোন সংবাদ এলে পীরের কাছে কাড়ি কাড়ি নযরানা চলে যেতো।
অনেক পীর নিজেদের কিছু লোক বিভিন্ন গ্রামে চর নিয়োগ করে রাখতে। তারা গ্রামে গ্রামে ঘুর বিভিন্ন বাড়ির ভেতর বাইরের সংবাদ জেনে আসতো। কোন বাড়ির কতজন জোয়ান কোন ফ্রন্টে আছে এটা জেনে নিতে পারলেই পীরদের কেল্লা ফতে।
তারপর তারা যে কোন এক গ্রামে গিয়ে ডেরা ফেলতো। কোন উদ্দেশ্যে কেউ এলেই তাদের বলার আগেই পীর বলে দিতো যে, তোমার ছেলে বা ভাই বার্মা ফ্রন্টে বড় বিপজ্জনক অবস্থায় আছে। তারপর তাদের করণীয় সম্পর্কে উপদেশ দিতে এবং কিছু তাবিজ কবজও ধরিয়ে দিতো। কয়েক মুহূর্তেই পীরের পকেট ভরে যেতো কাঁচা পয়সায়। আর পেট পুড়ে উদর পূর্তির পর্ব তো আছেই।
***
ক্যাপ্টেনের বাড়িটি বিশাল। তাদের বিস্তর জায়গা জমি আছে। এদের পূর্বপুরুষরাও সরকারি ফৌজের সদস্য ছিলো। ইংরেজ সরকার তাদেরকে নদী এলাকায় আবাদযোগ্য বিস্তৃত এলাকা দান করে। পুরো বাড়িটাই বিভিন্ন আয়তনের দালান কোঠায় বিন্যস্ত।
ভণ্ডপীর যে ঘরে ধনভাণ্ডার আছে বলে ধোকা দিয়েছিলো সে ঘরে গেলাম আমি। ঘরের এক দিকে একটি গর্ত দেখা গেলো, গর্তটি দুই ফুট এবং ততটুকুই গভীর। এর পাশে একটি কোদাল ও একটি থলে পড়ে আছে। ঘরের মধ্যে অব্যবহৃত একটি খাট, পুরনো সুটকেস ও কিছু আসবাবপত্র দেয়াল ঘেষে রাখা আছে।
পাশের ঘরের সঙ্গে লাগোয়া দরজাটি খুলে আমি পাশের ঘরে গেলাম। এই ঘরটি খাট পালংক ও নানান আসবাবপত্র দিয়ে পরিপাটি করে সাজানো। যে জানালা দিয়ে পীর পালিয়েছে সেটা দেখানো হলো আমাকে।
দৈর্ঘ্যে জানালাটি আড়াই ফুট, প্রস্থ্যে দুই ফুট। জানালার চৌকাঠটি মেপে দেখলাম ১৩ ইঞ্চি। জানালার চারপাশের ফ্রেমটি নোংরা ঝুল আর মাকড়সার জালে নোংরা হয়ে আছে।
পীরের দৈহিক যে বর্ণনা আমাকে দেয়া হয়েছে এতে নিশ্চিত করে বলা যায় এত বড় দেহ দুই ফুট প্রশস্ত জানালা গলে বের হওয়া একেবারেই অসম্ভব। হতে পারে সে কাত হয়ে জানালা পার হয়েছে।
সে ক্ষেত্রে জানালার সমস্ত ঝুলি ময়লা তার দেহের ঘষায় পরিষ্কার হয়ে যেতো। কিন্তু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, জানালা পরিষ্কার করা হয় না অনেক দিন। অর্থাৎ এখান দিয়ে যে কেউ বের হয়নি এটা নিশ্চিত।
আসামী যে এই জানালা গলে বের হয়নি ঘরের কাউকে এর প্রমাণ দিলাম আমি। জানালার ওপাশে গোয়াল ঘর এবং প্রশস্ত আঙ্গিনা। জানালার নিচের মাটি কাঁচা। আমি গভীরভাবে পরখ করলাম। না এখানে কারো পায়ের ছাপ নেই। এমন কাঁচা মাটিতে পায়ের ছাপ পড়লে সেটা মুছে ফেলাও অসম্ভব।
ক্যপ্টেন সাহেব! আমি জিজ্ঞেস করলাম- আসামী এই জানালা পথে বের হয়েছে এটা কি আপনি নিশ্চিত?
হ্যাঁ অবশ্যই। ঘরের ভেতরের দরজা খুলে আসামী এই কামরায় আসে এবং তার চোখে জানালাটি নজড়ে পড়ে। এটা দিয়ে সে গোয়াল ঘরের আঙ্গিনায় আসে এবং বড় দরজা দিয়ে বের হয়ে যায়। এছাড়া তো আর কোন পথ ছিলো না।
বাড়ির মূল অংশে চলে গেলাম আমি। এ অংশটি বেশ ঝকঝকে তকতকে। বাড়ির লোকেরা কে কোথায় ঘুমোয় এটাও জেনে নিলাম এক ফাঁকে।
আমি আসলে বের করতে চাচ্ছিলাম ভণ্ড পীর বের হয়েছে কোন দিক দিয়ে। আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে থাকে সে যেখান দিয়ে বের হোক তো হয়েই গেছে। কিন্তু আমার সন্দেহ বরং এই নিশ্চিত বিশ্বাসে পরিণত হয় যে, আসামী নিজের চেষ্টাতে বের হতে পারেনি। কেউ তাকে বের হতে সাহায্য করেছে। ঐ জানালা দিয়ে সে বের হয়নি।
আমার ধারণা সঠিক হলে তার সাহায্যকারী বাড়ির চাকর বাকর হতে পারে অথবা বাড়িরই অন্য কেউ হতে পারে। এবং এদের কেউ অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকাটাও আশ্চর্যের কিছু হবে না তখন।
আরেকটা ব্যপার হতে পারে, যেটা এখনই বলতে চাই না। সেটা হলো সেই রহস্যময় পীর কোন নিগুঢ় রহস্যের এই বাড়িতে গিয়ে থাকতে পারে। এমন হলে কাহিনীর প্রতিটি বাক্যই যে চমকের পর চমক সৃষ্টি করে যাবে তাতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
এবার ঘরের মহিলাদের প্রতি নজর দিলাম। এখানে ক্যপ্টেনের বৃদ্ধা মা আছেন। ছোট ছেলের ঘরে থাকেন তিনি। আরেকজন হলো ক্যাপ্টেনের বোন। ত্রিশোর্ধ নরী। তার একটি বাচ্চা আছে। স্বামীর সঙ্গে বনাবনি হচ্ছে না বলে বছর খানেক ধরে বাপের বাড়ি পড়ে আছে। মোটামুটি ধরেনর চেহারা, তবে স্বাস্থ্যটি বেশ অটুট–লাবন্যময়ী। সব মিলিয়ে আকর্ষণীয় নারী।
তৃতীয় নারী হলো, ক্যাপ্টেনের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী। ননদের চেয়ে অনেক সুন্দরী। বয়স সাতাস আঠাশ হবে। এদের সবার কাছ থেকেই ঘটনার জবানবন্দি নেবো আমি। শুরু করলাম ক্যাপ্টেনের ভাইকে দিয়ে।
***
অনেক দিন ধরেই মানুষের মুখে মুখে কথা ছড়াচ্ছে, আল্লাহর এক বিশেষ বান্দা এখান দিয়ে যাবেন- ক্যাপ্টেনের ভাই বলতে শুরু করলো- কেউ বললো, তিনি পায়ে হেঁটে হজ্জে যাচ্ছেন এবং পথে যে কেউ তার মনোবাসনার কথা আরয করে সেটা তিনি পূরণ করে দেন।
কেউ বললো, আল্লাহর দরবার থেকে হুকুম করা হয়েছে তাকে যে, বিভিন্ন নগরে শহরে গ্রামে ঘুরে ঘুরে মানুষের মনোবাসনা পূরণ করে। তাকে কিছু না জানালেও তিনি মনের ভেদ এমনিই জেনে নিতে পারেন। তার অলৌকিক কারামতের কাহিনী কেউ শোনালে মানুষের বিশাল জটলা বেঁধে যেতো।
