কূপের এক মালিককেও বলে কয়ে ওপর থেকে নামালাম। নিচে নেমেই সে চোখ মুখ ফুচকে বললো, গন্ধ কিসের এখানে?
আমি তাকে বললাম, তোমাদের পীর যে পানি বের করেছে সে পানি শুঁকে দেখো।
লোকটি হাটু মুড়ে বসে পানির ওপর পুরোপুরি শুঁকতেও পারলো না। এক ঝটকায় পেছনে ফিরে এলো। তাকে বললাম, এখানে কোদাল চালাও। সে কোদাল চালালো। নিচ থেকে শুকনো মাটি ছাড়া আর কিছুই বের হলো না।
মালিক বুঝতে পারলো, আকাশ থেকে নেমে আসা তাদের পীর সাহেব প্রস্রাবের চমক দেখিয়ে অনেক পয়সা হাতিয়ে নিয়েছে……।
ওপরে এসে দেখলাম, পীর সবাইকে ভয় দেখাচ্ছে, তার সাথে এই বেয়াদবির পরিনাম খুব খারাপ হবে। গ্রামের ওপর গজব পড়বে। পীরকে বালতির মা দিয়ে বেঁধে কূপের ভেতরের দিকে ঝুলিয়ে দিলাম। পীর বদদুআ দিয়ে চললো। লোকেরা যখন তার এই ধোকাবাজি সম্পর্কে জানতে পারলো, তারা পীরকে ঢিল ছুঁড়তে লাগলো….
এবার পীর বাঁচার জন্য চিৎকার শুরু করে দিলো। আমি লোকদেরকে ঢিল ছুঁড়তে বারণ করলাম। আর পীরকে বাধনমুক্ত করে জিজ্ঞেস করলাম সে কে?
সে হাতজোড় করে বললো, আমার কাছ থেকে সব পয়সা নিয়ে নাও আর আমাকে ছেড়ে দাও।
আমার ভাইতো ওকে জানে মেরে ফেলতে চাইলো। আমি তাকে থামিয়ে বললাম, একে পুলিশের হাতে ছেড়ে দেয়া হবে। একজন জানালো, পীরের সঙ্গে আরো দুজন লোক ছিলো। ওদেরকে খোঁজা হলো, কিন্তু ততক্ষণে ওরা কেটে পড়েছে…….
সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো। তাই রাত করে থানায় যাওয়াটা কষ্টকর। এজন্য আমাদের গ্রামে নিয় এলাম পীরকে। যে ঘরে সে ধনভাণ্ডার আছে বলে গায়েবী খবর দিয়েছিলো সে ঘরেই তাকে বন্দি করে রাখা হলো। দরজা বাইরে থেকে বন্ধ ছিলো।
কিন্তু সকালে উঠে গিয়ে দেখা গেলো, পীর গায়েব! ঐ ঘরের আরেকটি দরজা ছিলো, সেটা বন্ধ করার কথা কারো মনে ছিলো না। দরজা ভেতরের দিকে, এটা দিয়ে লাগানো অন্যান্য কামরাতেও যাওয়া যায়। কামরায় শিকবিহীন একটি জানালা আছে। ঐ ভণ্ড ঐখান দিয়েই পালিয়েছে …….
পীরের বর্ণনা দেয়া হলো। ছয় ফুট দীর্ঘ। বয়স ত্রিশ বত্রিশ। রং বাদামী এবং কিছুটা গৌর। স্বাস্থ খুব চমৎকার। চেহারা গোলাকার। যে কারো কাছে ভালো লাগবে। চোখের দৃষ্টি গাঢ়। প্রভাব বিস্তারের মতো কিছু একটা আছে তার দৃষ্টিতে, ঘন কালো দাড়ি, সুন্দর করে ছাটা। মাথার কুচকুচে কালো চুল কাঠ অবদি নেমে এসেছে। তার ওপর পাগড়ি বাধা উঁচু করে। গাঢ় সবুজ রঙ্গের আলখেল্লা।
ধোকাবাজ পীর যাকে এখন আমি আসামী বলবো। তাকে সনাক্ত করার সবচেয়ে বড় আলামত আমাকে জানা হলো যে, তার বাম চোখটি নষ্ট। সে চোখের ওপর সাদা কাপড়ের লম্বা চৌড়া পট্রি বাঁধা।
তথ্যটা আমাকে আশান্বিত করে তুললো। কারণ, আসামীর জন্য এটা এমন এক আলামত যেটা সে লুকিয়ে রাখতে পারবে না। তার সঙ্গে যে দুজন লোক ছিলো তাদের দাড়ি ছিলো বেশ লম্বা। তবে একজন মধ্যবয়সী আর একজন যুবক।
***
অন্য কেউ হলে আমি এ কেস নিতাম না। বলতাম তোমরা জেনে শুনে বেওকুফী করবে আর ভণ্ডদেরকে নাচানাচি করে সর্বস্ব হারাবে আর থানায় এসে আমাদেরকে উটকো ঝামেলায় জড়াবে।
কিন্তু বাদী বা বিচারপ্রার্থী ছিলো এক ফৌজি ক্যাপ্টেন। এর অর্থ এই নয় যে, আমরা পুলিশরা ফৌজকে অনেক ভয় পেতাম। আসল ব্যাপার হলো, তখন চলছিলো বিশ্বযুদ্ধ। এজন্য ইংরেজ শাসক সেনাবাহিনীর লোকদের বেশ খাতির যত্ন করতো।
এমনকি সমস্ত পুলিশ বিভাগে লিখিত এই আদেশনামা জারী করা হয় যে, তোমাদের কাছে কোন সেনা যদি কোন অভিযোগ নিয়ে আসে তাহলে তার অভিযোগ দূর করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। প্রতিটি জেলার ডিপুটি পুলিশ কমিশনারের মাধ্যমে সবাই এ হুকুম দিয়ে যায়।
এই এক কারণে এই মামলা আমি গ্রহণ করি। আরেকটা কারণ হলো, আমার এলাকায় প্রতারণার এই ঘটনা ঘটার অর্থ হলো, এ এলাকার অপরাধ জগতের লোকেরা অবাধে অপরাধ করে চলেছে। এখনি এর লাগাম টেনে না ধরলে বড় বিপজ্জনক হয়ে উঠতে সময় লাগবে না।
তাছাড়া আসামী কোন এলাকার তাও জানা নেই। জানা থাকলেও ছদ্মবেশী আসামী শনাক্ত করে তাকে ধরা খুবই মুশকিলের কাজ। অবশ্য আসামী অন্য এলাকার হলে আমার এলাকার পেশাদার আসামীদের সহযোগিতা নিতে হবে আমাকে।
অপরাধীদের মধ্যে একটা নীতি আছে। সেটা হলো, প্রত্যেক অপরাধী নির্ধারিত এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় গিয়ে অপরাধ কর্ম করে না।
আমি ক্যাপ্টেনের রিপোর্ট অনুযায়ি এফআই.আর. লিখালাম। তারপর কয়েকজন কনস্টেবল নিয়ে তাদের গ্রামে চলে গেলাম। থানা থেকে চার মাইলেরও অধিক দূরত্বে তাদের গ্রাম।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হলো তখন যারা ফৌজে চাকুরি পছন্দ করতো না তাদের ঘর থেকেও জোয়ানরা সেনাবাহিনীতে ভর্তি হতে লাগলো। এমন কোন বাড়ি ছিলো না যেখান থেকে একাধিক জোয়ান সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়নি। এমন ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ দুনিয়াতে আর কয়টা হয়েছে।
গ্রাম্য এলাকার এসব জেয়ানরা কোন না কোন ফ্রন্টে লড়াইয়ে শামিল ছিলো। তাই আহত নিহত হওয়ার খবর প্রতিদিনই আসতে লাগলো। প্রতিদিনই কোন না কোন বাড়িতে সরকারি কর্মকর্তারা এসে জানাতো, তোমাদের ছেলে বা ভাই যুদ্ধবন্দি হয়েছে বা মারা গেছে। শোক, আতংক আর হতাশার গাঢ় এক কুয়াশার চাদর এসব ফৌজি এলাকাকে ঘিরে রেখেছিলো।
