ঘরের সবাই তো খুব খুশি। কয়েক রাত কাটালো সে পীর। এক রাতে একটি ঘরের মেঝে খুড়তে শুরু করলো। একবার কোদাল দিয়ে কোপ বসাতেই কোন ধাতব পদার্থের ওপর কোপ পড়লো। জিনিসটাকে চকচকে মনে হলো। পীর বাড়ির সবাইকে বললো, এখন আর সামনে খনন করা যাবে না। দুদিন পর আবার শুরু করতে হবে।
এই বাড়ির মানুষ আর কোন দিন এত খুশি হয়নি। রাতের বেলা পীর সেই ঘর থেকে সবাইকে বের দিয়ে আবার সাধনায় বসলো। পরদিন সকালে বাড়ির লোকেরা দেখলো, পীর গায়েব।
ক্যাপ্টেনের ভাই বললো, পীর সাহেব ধণভাণ্ডার আমাদের দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। দুদিনপর ধণভাণ্ডার নিজেই বেরিয়ে আসবে।
দুদিন চলে যাওয়ার পর ছোট ভাই পীরের খোদাই করা গর্ত কোদাল দিয়ে আরেকটু খুঁড়তেই একটি থালা বের হলো। এর নিচে কিছুই নেই। গর্ত থেকে আরো অনেকখানি মাটি তোলা হলো। কিন্তু মাটি ছাড়া আর কিছুই আবিস্কার করতে পারলো না তারা।
ক্যপ্টেরেন ছোট ভাই থালাটি ভালো করে দেখে আরেকটি ধাক্কা খেলো। আরে এই থালাটি তো ঐ পীরেরই ছিলো। ক্যপ্টেন জানালো, ঐ পীর তার ভাইয়ের কাছ থেকে এক রাতে পাঁচশত টাকা (তদানিন্তন পাঁচশ টাকা বর্তমানে অনেক টাকা) নিয়েছে।
যতদিন সেখানে ছিলো বাড়ির লোকদের কাছ থেকে নানান ছুতো দিয়ে আরো অনেক পয়সা নিয়েছে। গ্রামের আরো দুটি বাড়ি থেকেও এভাবে টাকা পয়সা হাতিয়ে নিয়ে চম্পট দিয়েছে।
যে দিন আমি গ্রামের বাড়ি পৌঁছি- ক্যপ্টেন বললো- আমার ভাই অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে আমাকে এ ঘটনা জানিয়েছে। পরদিন অন্য গ্রামের এক লোক আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটু জিরিয়ে নেয়ার জন্য বাড়ির দাওয়ায় এসে বসলো। কথায় কথায় লোকটি বললো, তাদের গ্রামে এক পীর এসেছে। কারামত ওয়ালা এক ওয়ালিআল্লাহ তিনি। গায়েবের খবরও দেন তিনি….. লোকটি পীরের কিছু কারামত শুনিয়ে গেলো……
পীরের আকার আকৃতি কেমন জিজ্ঞেস করলাম তাকে। সে ঐ পীরের বর্ণনাই দিলো। এখন সে ঐ লোকের গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে চলে গেছে। আমাদের ঘোড়া আছে কয়েকটি।
আমার ভাইসহ আমাদের গ্রামের তিনজন লোক নিয়ে আমরা ঘোড়ায় চড়ে বসলাম। যে গ্রামের কথা বলা হয়েছিলো সে গ্রামে পীরকে পাওয়া গেলো না। পীর আরো অনেক দূরের গ্রামে চলে গেছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হলো আমাদের।
পরদিন সকালে আমরা যে গ্রামে পৌঁছলাম, জানা গেলো পীর সাহেব এখানেই আছেন। গ্রামের একটি খোলা জায়গায় নতুন একটি কুপ খনন করা হয়েছে। কিন্তু পানি বের হচ্ছে না……..
কুপের কাছে গিয়ে দেখলাম, সেখানে বহু লোকের জমায়েত। পীর সাহেব কোথায় জিজ্ঞেস করতেই কয়েকজন চোখমুখ গম্ভীর করে শোনালো, আরে মিয়া! পীরকে তো খোদা আসমান থেকে পাঠিয়েছেন। মোল গজ খননের পরও কুপে পানির দেখা নেই। অথচ এ এলাকার দশ বার গজ খোদলেই পানির ঢের উঠতে থাকে। যমিনের এই আজব অংশের মাটি কেন এমন হয়ে গেলো……
পীর পৌঁছে গেলো। গ্রামবাসীরা দৌড়ে দিয়ে আরজ করলো, ইয়া সরকার কুঁয়া যে পানি দিচ্ছে না। পীর কুপের সামনে গিয়ে একবার নিচের দিকে তাকালো, তারপর আকাশের দিকে। তারপর বলতে লাগলো, কুপের মধ্যে তাকে নামিয়ে দেয়া হোক।
কূপের মধ্যে পীরকে নামানো হলো। নিচে গিয়ে ওপর দিকে মুখ করে বললো, সবাই কূপ থেকে গুনে গুনে সাত কদম দূরে সরে যাও। লোকজন দূরে সরে গেলো।
দশ পনের মিনিট পর পীরের আওয়াজ শোনা গেলো। এসো লোকেরা! দেখে যাও! লোকেরা এগিয়ে গেলো কূপের দিকে।
***
কূপ থেকে পানি বের হচ্ছে এই বলে যখন পীর কূপের নিচ থেকে আওয়াজ দিলো এই ক্যপ্টেন তখনই সেখানে গিয়ে পৌঁছলো। কূপ খননের সময় প্রথম যখন সামান্য পানি দেখা দেয় লোকেরা তখন ওপর থেকে মোবারক মোবারক বলে নিচে পয়সা ফেলে। তখন খননকারীরা তাদের বাকী খনন কাজ শেষ করে।
এখানেও লোকেরা পীরের আওয়াজ পেয়ে কূপের কাছে দৌড়ে গেলো। ওপর থেকে দেখলো, বিস্ময় আর আনন্দে সবাই শ্লোগান দিতে শুরু করলো।
ক্যপ্টেনও একটু ঝুঁকে তীক্ষ্ম চোখে তাকালো। সামান্য একটু জায়গায় পানি চকচক করছে। যাদের কূপ তারা এবং অন্যরাও নিচে পয়সা ছুঁড়ে দিতে লাগলো।
এখানে ক্যপ্টেনের বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়। কূপ সম্পর্কে লোকদের কাছ থেকে আগেই জেনে নিয়েছিলো। কূপের মালিকদেরকে বললো, পীরকে বাইরে বের করে আনন।
পীরকে ওপরে টেনে তোলা হলো- ক্যপ্টেন বলে গেলো- আমার ভাই ও সঙ্গে আসা গ্রামের লোকেরা তাকে চিনে ফেললো।
লোকদেরকে বললাম, এই লোককে এদিক ওদিক যেতে দিবে না। আমার লোকেরা তাকে ঘিরে রাখলো। এসব মূর্খরা পীরকে নবীদের মতো মানে। লোকেরা তাই আমার বিরুদ্ধে হৈচৈ শুরু করলো। তর্ক করে সময় নষ্ট করলাম না। শুধু বললাম, মেহেরবানী করে আমাকে কূপে নামিয়ে দিন। তারপর যা ইচ্ছা বলবেন আমাকে……।
লোকেরা আমাকে রশি ও বালতিস সাহায্যে কূপের মধ্যে নামিয়ে দিলো। ষোলগজ গর্ত কম নয় কিন্তু। ধীরে ধীরে নামতে সময় লাগলো। নিচে নামতেই প্রস্রাবের কূটগন্ধ লাগলো নাকে।
ওপর থেকে যেটা পানি বলে ভ্রম হয়েছিলো। নিচে এসে দেখি সেটা প্রস্রাব। দূর্গন্ধে আমার নাড়িভূড়ি উল্টে আসার যোগাড় হলো। শক্ত বেলে মাটি হওয়াতে প্রস্রাবও মাটি চুষে নিচ্ছিলো না……..
