তুমি যা কিছু হওনা কেন আমার সেটা জানা আছে- আমি আপনি থেকে তুমিতে নেমে এলাম
তোমার মতো বদমায়েশরা ভালো মানুষের মুখোশ পরে একের পর এক অপরাধ করেই চলে। আরো বড় কোন অপরাধের অপেক্ষায় রইলাম আমি। যা দিয়ে তোমাকে যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায়। তখনই তোমাকে ধরবো এবং তোমার আস্তানা উপড়ে ফেলবো। তোমার ভালোর জন্য বলছি, বদমায়েশি কর্মকাণ্ড তোমার বাড়ির চার দেয়ালের ভেতরে থাকতে দাও। তুমি যদি যারিনার বিরুদ্ধে বা তার মা বাবাকে উত্যক্ত করো বা কোন ছুতোয় চড়াও হও; দেখবে, তোমার পীরগিরি উলঙ্গ করে ছাড়বো……
এটা মনে করো না, তোমাকে আমি গ্রেপ্তারি বা শাস্তির হুমকি দিচ্ছি। তোমার ছেলের হাতে তোমাকে খতম করবো। মুরিদরা তোমার লাশ তখন পাবে, যখন তোমার নাপাক দেহ অর্ধেক কুকুর খেয়ে শেষ করে ফেলবে।
পীরের মুখ দেখে মনে হলো, কে যেন তাকে আচ্ছামতো জুতা পেটা করে আলকাতরা মেখে দিয়েছে। আমি আসলে যারিনাকে নিরাপদ রাখতে চাচ্ছিলাম। তাকে এটা জানালাম না যে তার ছেলেকে যারিনা মেরেছে।
যা হোক, পীর শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করলো। আমার দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিলো। আগের থানাদারকে যে মাসোহারা দিতে আমি যদি এর চেয়ে বেশি নিতে চাই তাও দিতে প্রস্তুত সে।
ঘুষের কথা বলায় তাকে আমি আরো কিছুক্ষণ শাসিয়ে সাবধান করে দিলাম যে, ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের নোংরা প্রস্তাব নিয়ে না আসে।
পীরের ছেলেকে নিয়ে আমার বড় সমস্যা ছিলো। এখনো সে সুস্থ হয়নি। দুই তিন দিন পর তার সঙ্গে কথা বলবো বলে ঠিক করলাম। থানায় ফিরে এসে আব্বাস ও যারিনাকে জরুরী কিছু কথা বলে ওদেরকে চলে যেতে বললাম। দুজনে আমার দিকে এমনভাবে তাকালো যেন আমার মুখের কথা তাদের বিশ্বাস হচ্ছে না।
আমাদেরকে কি থানায় আসতে হবে আবার?- যারিনা জিজ্ঞেস করলো।
না, আমি তোমাদেরকে বোঝালামটা কি? আর ডাকবো না তোমাদেরকে….
এখন তুমি নিজেই তোমার সিদ্ধান্ত নাও। স্বামীর বাড়িতে যাবে না বাবার বাড়িতে যাবে। এটা একান্তই তোমার ব্যাপার।
দুজন চলে গেলো।
এর দিন তিন পর আমি হাসপাতালে গেলাম। পীরপুত্র সুস্থ হয়ে উঠেছে। পীরকে যেসব কথা বলেছিলাম তাকেও সে কথা বললাম। এটাও বললাম যে, তোমার তো লজ্জা থাকা উচিত, এক মেয়ের হাতে এভাবে মার খেয়েছো তুমি।
আমি এর প্রতিশোধ নেবো- সে গোঁয়ারের মতা বললো।
সাবধান! কণ্ঠ হিংস্র করে বললাম- যারিনা যদি আবার অপহৃত হয় বা তার কোন ক্ষতি হয় কিংবা উড়ো কোন হুমকি দেয়া হয় সোজা তোমাকে গারদে পুড়াবো। তারপর এমন মার মারবো যে, হাত থেকে গোশতগুলো খুলে খুলে আনবো। মোট কথা তুমি বা তোমার কোন লোক ওদের এলাকায় দেখা গেলে তোমার চামড়াই প্রথমে আমি তুলবো। আমি আমার কথা কখনো মাটিতে ফেলি না। মনে রেখো, আমার এলাকার সব গুণ্ডা বদমাশ আমার হাতে রয়েছে।
পীর ও পীরের ছেলের অপরাধ জগত এরপর অনেক ছোট হয়ে যায়।
এর আট দশ দিন পর কেউ একজন আমাকে জানালো, ইকবাল যারিনাকে তালাক দিয়ে দিয়েছে। তবে যারিনা তার আচরণের জন্য ইকবালের কাছে ক্ষমাও চেয়েছে। আরো মাস পাঁচেক পর আব্বাসের সঙ্গে যারিনার বিয়ে হয়ে যায়। স্পর্শকাতর একটি খুনের মামলার কারণে বিয়ের নিমন্ত্রণে আমি যেতে পারিনি।
প্রেম-পাপী পীর
প্রেম-পাপী পীর
চারদিকে আতংক, অস্থিরতা, অসহায়ত্ব। বাবা, ভাই আপনজন হারানোর নিখোঁজ হওয়ার সংবাদে প্রায় ঘরেই মাতম আর বিষাদ মাখা পরিবেশ।
এটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা। বিশেষ করে যেসব এলাকা বা প্রদেশের অধিকাংশ জোয়ানরা ফৌজে চাকুরি করতে সেখানে তো এই অসহ্য চিত্র ছিলো প্রতিদিনের মামুলি ঘটনা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংরেজদের পক্ষে উপমহাদেশের মধ্যে পাঞ্জাব ও সীমান্তবর্তী এলাকার লোকেরা বেশির ভাগ ফৌজে ভর্তি হয়েছিলো। এজন্য ইংরেজরাও এসব এলাকাকে পছন্দও করতে বিশেষভাবে।
এই অশান্ত অনিশ্চিত সময়ের মধ্যেও এমন কিছু লোক মাথা চারা দেয়, যারা হাসতে হাসতে মানুষের আতংকিত মন ও অসহায় অবস্থাকে পুঁজি করে ব্যবসা ফেঁদে বসে। ফৌজি এলাকাতেই এ ধরনের লোকদের আনাগোনা বেশি ছিলো। সহজ শিকার ধরার জন্য তাদের কাছেও এই এলাকাগুলো বিচরণ ক্ষেত্র হিসেবে দারুণ পছন্দের ছিলো।
গ্রামাঞ্চলের এক থানার ইনচার্জে ছিলাম আমি। একেও ফৌজি এলাকা বলতো।
একদিন এক গ্রাম্য এলাকা থেকে পাঁচজন লোকএলো থানায়। এর মধ্যে একজনকে বেশ অভিজাত মনে হলো। মধ্যবয়সী হবে। পাঁচ চল্লিশ কি সাতচল্লিশ হবে বয়স। সে লোক নিজেকে আর্মির ক্যাপ্টেন বলে পরিচয় দিলো।
পনের দিনের ছুটিতে এসেছে। পচিয়টা এমন উঁচু গলায় দিলো যেমন ফৌজির অফিসার তার অধীনস্তদের হুকুম দিয়ে থাকে।
সেনাবাহিনী সম্পর্কে ওয়াকিফ হাল ব্যক্তিরা জানেন, আর্মির ক্যাপ্টেন সাধারণত অল্প বয়স্ক হয়ে থাকে। কিন্তু এ লোক এই বয়সেও ক্যাপ্টেন!
আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেল সময় সৈন্য সংখ্যা কয়েকগুন বেড়ে যাওয়াতে সেনা অফিসারের সংখ্যা কমে যায়। তখন শিক্ষিত অনেক সুবেদার ক্যাপ্টেনের পদাধিকার লাভ করে। সন্দেহ নেই এ লোকও সুবেদারি থেকে ক্যাপ্টেনের পদ পেয়েছে।
ক্যাপ্টেন আমাকে জানালেন, এবার ছুটিতে আসার পর তাকে জানানো হলো, তার ছোট ভাইয়ের কাছে এক পীর সাহেব আসে। পীর সাহেব দাবী করে, তাদের ঘরে নাকি প্রাচীন এক ধণভাণ্ডার মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। এটা বের করতে হলে পীরকে তিন রাত এখানে রাত জাগতে হবে।
