জনাব! যারিনার কথা শেষ হলে আব্বাস বললো- একটা মেহেরবাণী করুন। রিপোর্ট লিখে দিন, ছোট শাহকে আমি কুড়াল দিয়ে মেরেছি। আমার নামে এ অপরাধ লিখুন যারিনাকে ছেড়ে দিন।
সত্যি বলতে কি, আমিও চক্করেড় পরে গেলাম। ঐ পীর ও তার ঘোট শাহের ওপর তো আমার আগ থেকেই ঘৃণা ছিলো। এ ঘৃণা ক্রোধে রূপান্তরিন হলো। পীরের ছেলে ছোট শাহ মরেছে না জীবিত আছে এ খবরের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমি ভেতর ভেতর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। যারিনাকে বাঁচাবো। আর পীরকে নারী অপহরণের দায়ে গ্রেফতার করবো।
যারিনা ও আব্বাসকে অন্য কামরায় বসিয়ে ওদের দুজনের বাপকে ডেকে বললাম,
আপনারা মেয়েদের সবাইকে নিয়ে বাড়ি চলে যান। আর যারিনার রক্তমাখা পোষাকাদি আগুনে পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে ফেলুন। আর কুড়ালের বাটটি ভেঙ্গে জালিয়ে দিন। স্টিলের ব্লেডটি পরিত্যক্ত কোথাও পুতে ফেলুন বা কোন কূপের ভেতর ফেলে দিন। তবে কেউ যাতে আপনাদের এ সব কাজ না দেখে বা ঘুনাক্ষরেও জানতে না পারে।
হাসপাতাল থেকে খবর এলো, ছোট শাহ কথা বলার মতো উপযুক্ত হয়ে উঠেছে। আই.এস.আই.-এর আসারও সময় হয়েছে।
আমি হাসপাতালে চলে গেলাম। ছোট শাহ-এর জ্ঞান পুরোপুরি ফিরেছে। তার সামনে পীর বসে আছে। পীরকে বললাম, আপনি বাইরে গিয়ে বসুন। পীর যেতে রাজী নয়, চোখ গরম করে তাকালাম। কাজ হলো। বাইরে চলে গেলো।
কী খবর ছোট সরকার! পীরের ছেলেকে বললাম- এমন দুঃসাহস কোন হতভাগার! খালি নামটা বলল, ওকে দশ বছরের জেল দেব!
জানি না জনাব! সে বললো, ওরা ছিল তিনজন। দুজন আমার ওপর কুড়াল চালালো। আমি বেহুশ হয়ে গেলাম। আপনি আমার পকেট দেখুন। কিছু পয়সা ছিলো। তাও গায়েব।
বেটা বলছে কি? এমন মোটা দাগের ধোকা দিচ্ছে আমাকে? নাকি মাথায় চোট খাওয়াতে মাথায় গণ্ডগোল হচ্ছে!
কি বলছো ছোট শাহ! হুশ কি পুরো পুরি ফিরছে তোমার?- আমি জিজ্ঞেস করলাম।
হ্যাঁ পুরোপুরি জ্ঞান ফিরেছে। এই যে আপনি থানাদার আর ইনি ডাক্তার সাহেব!
আমি ও ডাক্তার সাহেব এবার তার সঙ্গে গল্পের ভঙ্গিতে হালকা সুরে কথা বলে দেখলাম। না, সত্যিই পুরাপুরি জ্ঞান ফিরেছে। কিন্তু ছোট শাহ একই কথা বলতে লাগলো। তিন হামলাকারী মিলে তাকে কুড়াল দিয়ে মেরেছে।
এর মধ্যে কোন মেয়ে ছিলো না তো?- আমি তার চোখে চোখ রেখে এক টুকরো বাঁকা হাসি উপহার দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
জনাব! কোন মেয়ে ছিলো না, এটা মেয়েদের ব্যপার নয়- বলার সময় তার গলা ঈষৎ কেঁপে গেলো। মুখের ওপর দিয়ে শংকার ছায়া ঘুরে গেলো।
ডাক্তার সাহেব অন্য রোগীর কাছে চলে গিয়েছিলেন। তবুও আমি ছোট শাহের কানের কাছে মুখ নামিয়ে বললাম,
আমি জানি এটা কিসের চক্কর ছিলো। তুমি যদি চাও, তাহলে তুমি যা বলবে রিপোর্টে আমি তাই লিখবো।
হ্যাঁ, হ্যাঁ পীরের ছেলে খুশি হয়ে উঠলো- হ্যাঁ তাই লিখুন। আমি আমার বেইযযতী চাই না।
সে যা বলতে চায় আমি বুঝে ফেললাম। সে চায় তার বাপ যাতে টের না পায় যে, শিকারকে ছেলে উড়িয়ে নিয়ে গেছে। আর শিকারও শিকার হয়ে গেছে।
আপনি কারো বিরুদ্ধে রিপোর্ট বা মামলা লিখবেন না। আমিও কোর্টে মামলা উঠাতে চাই না- পীর পুত্র বললো।
পীরের সঙ্গে ছেলের ব্যপার নিয়ে কথা বলা জরুরী। পীরকে ভেতরে ডেকে জানালাম, তার ছেলে কি বলছে।
ছেলেকে জিজ্ঞেস করলো পীর। ছেলে বাপের দিকে মাথা ঘুরিয়ে বড় অকথ্য ভাষায় জবাব দিলো। অপমানে পীরের চেহারা লাল হয়ে উঠলেও পীর কিছু বললো না। ছেলের কাছ থেকে এ ধরনের ব্যবহার পেয়ে পীর অভ্যস্থ।
পীর তো এই ধারনায় খোশ মেজাযে ছিলে যে, আমি আসল ঘটনা জানি না। পীর হয়তো নিশ্চিতভাবেই জানতো, যারিনাকে তার ছেলেই দখল করেছে। আগ থেকেই পিতা পুত্রের মধ্যে খিটমিট লেগেছিল।
এ ঘটনার পর তো সেটা ভীষণ শক্রতার রূপ নিবেই। পীর হাসপাতালেও এসেছে এ কারণে যে, যাতে লোকে বলতে না পারে মরণাপন্ন ছেলেকে দেখতে বাপ এলো না।
আচ্ছা পীরজী! আমি পীরের কাছে জানতে চাইলাম- আপনি কি আপনার ছেলের ওপর হামলার ব্যাপারে মামলা দায়ের করবেন?
আমি কি জানি ও যখম হয়েছে কোথায়?- পীর বললো তাচ্ছিল্য করে আমার পক্ষ থেকে রিপোর্ট করার মতো কিছু নেই।
***
পীর ও তার ছেলে মামলা না করাতে আমি খুশিই হলাম। যারিনা বেঁচে গেলো। কিন্তু এখন বিষয় হলো, যারিনাকে না জড়ালে পীরকেও তার অপরাধের জন্য শাস্তি দেয়া যায় না। কিন্তু যারিনাকেও জড়ানো যাবে না। পীরকে শাস্তি দিতে হবে। কমপক্ষে মানসিকভাবে পীরকে পঙ্গু করে দিতে হবে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিলো, প্রথমে যে দুজন যারিনাকে তুলে নিয়েছিলো এবং পীরের হাবেলিতে পৌঁছে দিয়েছিলো তাদেরকে তো যারিনা সনাক্ত করতে পারবে না। আর এটাও প্রমাণ করা যাবে না পীর যারিনাকে বন্দি করে অমানুষিক অত্যাচার করেছে। যারিনাকে তো পাওয়া গেছে অন্য জায়গা থেকে।
পীরকে আমি পৃথকভাবে ডাকলাম।
আমার কথা মন দিয়ে শুনুন পীর সাহেব!- পীরের প্রতি আমার তীর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বললাম- এসব ঘটনা কি করে ঘটলো তা আমি জানি। আপনার ছেলে আপনার শিকার মারতে গিয়ে নিজেই পটকা খেলো। আপনাকে এজন্য গ্রেপ্তার করে শাস্তিও দিতে পারি।
আপনি এলাকায় নতুন এসেছেন- পীর দাপট দেখাতে চাইলেও তার সুরে স্পষ্ট অনিশ্চয়তা ছিলো আমার ওপর হাত উঠানোর মতো ভুল করবেন না। আপনি যদি আমার লোকজনকে ধরে তাদের কাছ থেকে সাক্ষ্য নিতে চান তাহলে আসলে আপনি লজ্জিত হবেন। বাইরে যে সাক্ষ্য তারা আপনার সামনে দেবে আদালতে গিয়ে সেটা অস্বীকার করে বসবে।
