এখন কোথায় পীর?- যারিনা জিজ্ঞেস করলো।
এখানেই আছে- পীরের ছেলে বললো- কিন্তু মদ খেয়ে বেহুশ হয়ে পড়ে আছে।
ছোট শাহজী!–যারিনার গলা ভেঙ্গে পড়লো মিনতিতে- আমাকে আমার মা বাবার কাছে পৌঁছে দাও। টাকায় তোমার দু হাত ভরে দেব।
আমি কিছুই নেবো না তোমার কাছ থেকে ছোট শাহজী বললো- চলো তোমাকে ভোমার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি।
ছোট শাহ যারিনাকে চোরের মতো পা টিপে টিপে হাবেলি থেকে বের করে আনলো। তার হাতে একটি কুড়াল ছিলো। প্রায় আধা মাইল যাওয়ার পর যারিনা দেখলো ওরা ওদের গ্রামের উল্টো দিকে যাচ্ছে। যারিনা প্রশ্ন তুললো, আমাদের গ্রাম তো ওদিকে। আপনি এদিকে যাচ্ছেন কেন?
ছোট শাহ বললো, ঘোর পথে যাচ্ছি। পথে আমার বাপের লোকজন থাকতে পারে।
অনেক দূর যাওয়ার পরও ছোট শাহ রাস্তা বদলি করলো না। যারিনা বললো, ছোট শাহজী! আমাদের গ্রাম তো দেখি অনেক দূর সরে গেছে।
তোমাকে আমি তোমাদের গ্রামে নিয়ে যাচ্ছি না- ছোট শাহ গাঢ় কণ্ঠে বললো- তোমাকে যেখানে নিয়ে যাচ্ছি সেখানে গিয়ে তুমি খুশী হয়ে যাবে। তোমাকে আমি বিয়ের আগে দেখিছি। তখনই ঠিক করি, তোমাকে আমার রানী বানাবো। আমি আমাদের গদির শক্তি প্রয়োগ করতেই তুমি স্বেচ্ছায় আমার হাতে ধরা দিয়েছে। এখন তুমি তোমার ঘরের কথা ভুলে যাও।
যারিনা তার কাহিনী শোনাতে গিয়ে বললো,
আমি প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, নিজেকে নিজে খতম করে দেবো। কিন্তু যে কামরায় আমাকে রাখা হয়েছিলো সেখানে ধারালো কিছুই পেলাম না, যেটা দিয়ে বুক বা পেট চিড়ে আত্মহত্যা করতে পারবো। এরপর ছোট শাহ যখন তার আসল রূপের কথা জানালো তখন আমার ভেতর আর কোন দ্বিধা দ্বন্দ রইলো না। আমি মৃত্যুর সঙ্গে বন্ধুত্ব করে নিলাম।
ছোট শাহকে শান্ত গলায় বললাম। ঠিক আছে, আমি কোন বাধা দেবো না। আমি আপনার সঙ্গেই থাকবো। কিন্তু আপনি আমায় রাখবেন কোথায়? পীরজী আপনার প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন না?
ছোট শাহ তখন তার বাপকে কয়েকটি অকথ্য গালি দিয়ে বললো,
ওকে আমি সোজা করে ফেলবো। এখন তোমাকে অন্য একটি গ্রামে নিয়ে যাচ্ছি। দুই তিন দিনপর তোমাকে এসে নিয়ে যাবো আমি।
যারিনা আসলে ছোট শাহকে আশ্বস্ত করতে চাইলো, সে এখন তার অনুগত হয়ে গেছে। যারিনার কথায় দারুণ খুশি হলো ছোট শাহ। রতের গাঢ় নির্জনতার মধ্যে ছোট শাহ যারিনাকে নিয়ে হাটছে।
যারিনার কথায় ছোট শাহের ভেতর আবেগ উথালপাতাল করে উঠলো। যারিনাকে মুহূর্তের জন্য জড়িয়ে ধরলো। যারিনাও খুব আনন্দ পাচ্ছে এমন ভান করে ছোট শাহের হাত থেকে কুড়ালটি নিয়ে নিলো। কিছু দুর পর্যন্ত যারিনা প্রেম ভালোবাসার কিছু সংলাপ আওড়িয়ে প্রেমিকের অভিনয় করে গেলো।
এক সময় যারিনা হঠাৎ করে একটু পেছনে সরে এলো। তারপর আর দেরি করলো না। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে কুড়াল দিয়ে আঘাত হানলো ছোট শাহের ওপর। কোপটি পড়লো ছোট শাহের কাঁধের কাছে। ছোট শাহ আর্তনাদ করে পেছন দিকে ফিরতে ফিরতে যারিনা আরেকটি কোপ বসালো। এটা লাগলো একেবারে কাঁধের মাঝখানে।
ছোট শাহ এই দুই আঘাতে কাবু হওয়ার মতো লোক ছিলো না। সামান্য টলতে টলতে যারিনাকে ধরতে এগিয়ে এলো। এমন দুঃসাহসিক কাজ যারিনা করতে পারবে কখনো কল্পনাও করেনি।
এজন্য উত্তেজনায় কাঁপছিলো। যখন ছোট শাহকে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখলো, খুব ভয় পেয়ে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে গেলো কাঁপুনি। কুড়ালটিও যেন ধরে রাখতে পারছিলো না।
কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে আরেকটি কুড়ালের আঘাত হানলো ছোট শাহের ওপর। কিন্তু কুড়ালের ব্লেডটি উল্টে গিয়েছিলো। তাই বাট তার মাথায় পড়লো হাতুড়ির বাড়ির মতো করে। মাথায় আঘাত পেয়ে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না ছোট শাহ। বেহুশ হয়ে পড়ে গেলো।
নিজ গ্রামের পথ যারিনার জানা ছিলো। সেদিকে ছুটতে শুরু করলো। ছোটার সুবিধার জন্য কুড়ালটি ফেলে দিলো। কিন্তু একটু এগিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এসে কুড়ালটি উঠিয়ে নিলো। যাতে পথে কোন বদমায়েশ বা চোর ডাকাত ঝামেলা করলে তাকে শায়েস্তা করতে পারে।
যারিনা আমাকে বলেছিলো, মৃত্যুর সঙ্গে সে বন্ধুত্ব করে নিয়েছে। কিন্তু একজন মানুষ মেরে তার যে অবস্থা হলো সেটা সে বর্ণনা করতে পারছিলো না। বলার সময় তার শরীর কাঁপছিলো। ঠিকমতো শব্দও বের হচ্ছিলো না। সে কেঁদে কেঁদে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাচ্ছিলো। কোথায় যাবে কার কাছে যাবে কিছুই ফয়সালা করতে পারছিলো না।
নিজের মা বাবার কাছে? ইকবালের কাছে? আব্বাসের কাছে?
নিজ গ্রামে পৌঁছার পরে ভয় তাকে আরো ভীষণভাবে চেপে ধরলো। সে অবস্থাতেই সে আব্বাসের ঘরে চলে গেলো।
***
রক্তমাখা কুড়াল আর রক্তাক্ত কাপড়ে যারিনাকে দেখে আব্বাসের বাপ, মা বোনরা হতভম্ব হয়ে গেলো। যারিনার মুখ থেকেও কোন কথা বের হচ্ছিলো না। বড় কষ্টে সে যতটা সম্ভব ঘটনা শোনালো।
আব্বাসের বাবা–যারিনার বাবা ও ভাইকে ডেকে নিয়ে এলো। তাদের মাথা ঘুরে গেলো। কি করবে না করবে ভেবে পাচ্ছিলো না তারা।
ওরা একটা কাজ করলো। আব্বাসের এক বোনের কাপড় যারিনাকে পরিয়ে দিলো। আর রক্তাক্ত কাপড়টি লুকিয়ে ফেললো। কুড়ালটিরও রক্ত ধুয়ে লুকিয়ে রাখলো। দুশ্চিন্তায় দিশেহারার চরমে পৌঁছে গেলো তাদের অবস্থা। তখনই ওদেরকে দিয়ে পাকড়াও করি আমি।
