যারিনার শ্বশুড় বাড়িতে পীর দ্বিতীয়বার যখন আসলো, যারিনাকে পৃথক এক কামরায় বসানো হলো। পীর তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, তোমার তো তোমার স্বামীকে ভালো লাগে না।
যারিনা পীরের কাছে স্বীকার করলো, হ্যাঁ, ওকে তার ভালো লাগে না। পীর তাকে তাবিজ পান করিয়ে চলে গেলো এবং চৌকিদারের স্ত্রীকে দিয়ে যারিনাকে ডাকালো।
যারিনা পীরের বদ নিয়ত তখনই টের পেয়ে গেলো। পীরের যদি অলৌকিক কোন ক্ষমতা থাকতো তাহলে তো সে কবেই ইকবালের শুধু স্ত্রীই নয় দাসী বানিয়ে ফেলতো।
শ্বশুর বাড়িতে যারিনা একটা দুশ্চিন্তা আর ঘোরের মধ্যে ছিলো। আরেকটা চাপ ছিলো ইকবাল ওর বিরুদ্ধে কিছুই করছে না। যারিনার কল্পনায় সবসময় আব্বাসই আসতো।
ঘুরে ফিরে আব্বাসের ছবিই বিচরণ করতে যারিনার মনের আঙ্গিনায়। ওখানে এবং নিজের বাড়িতেও ওর এমন কোন সখি বা বান্ধবী ছিলো না যার কাছে মনের কথা বলে হালকা হবে সে। কষ্ট আর হতাশার আগুন ওকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিলো।
এই আচ্ছন্নতার মধ্যেই সে একদিন স্বপ্নে দেখলো, অনেক দূরে আব্বাস দাঁড়িয়ে আছে। ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ওদের মাঝখানে মেঠু সড়ক, নাড়া মুড়ানো যমিন আর বৃক্ষ সাড়ি। ও আব্বাসের কাছে ছুটতে শুরু করলো। আচমকা কোত্থেকে দুই লোক ছুটে এসে ওকে ধরে টেনে হেচড়ে নিয়ে যেতে লাগলো। আর সে হাত পা ছুঁড়তে লাগলো। কিন্তু মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছিলো না। এক লোক ওকে কাঁধে তুলে নিলো। আরেকজন ছুড়ি বের করে ওকে প্রাণনাশের হুমকি দিলো।
তারপর যারিনার চোখে আধার নেমে এলো। তারপর আলো আধরি এবং এর কিছুক্ষণ পর ওর চেতনার আলো ফিরে পেলো। ও দেখলো এক লোক তাকে কাঁধে তুলে রেখেছে আরেকজন ছুরি দেখাচ্ছে।
স্বপ্নের ঘোর কাটতেই ও বুঝতে পারলো স্লিপিং ওয়ার্ক হয়েছে তার। ঘুমের মধ্যেই সে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলো। সুযোগ পেয়ে ওরা অপহরণ করেছে। সে চিৎকার চেঁচামেচি করতে লাগলো। কিন্তু ধূ ধূ ফসলি মাঠে আর কত দূর আওয়াজ পৌঁছবে।
ওকে কাঁধ থেকে নামিয়ে দাঁড় করানো হলো। ছুড়ি ওয়ালা ওর গলায় ছুরি ধরে হুমকি দিলো চিৎকার বন্ধ না করলে যবাই করা হবে। যারিনা চিৎকার করেই বললো, হ্যাঁ, আমাকে যবাই করে দাও।
কোন প্রেমিকের কাছে যাচ্ছিলে। আমরা তোমাকে আর এগুতে দেবো না ওদের একজন বললো।
যারিনা কাঁদতে কাঁদতে জানালো, ওর ঘুমের মধ্যে চলাফেরার রোগ আছে, সে অমুকের মেয়ে অমুকের স্ত্রী।
একজন তখন বললো, ঠিক আছে, চলো। তোমাকে তোমাদের বাড়িতে রেখে আসি। একথা বিশ্বাস করে যারিনা একটু পিছিয়ে গিয়ে গায়ের উড়না ঠিক করতে গিয়ে সেটা একটু আলগা করলো। ওমনিই একজন উড়নাটি কেড়ে নিয়ে তার মুখের ভেতর খুঁজে দিলো। তারপর তাকে উঠিয়ে নিলো।
ওদেরকে চিনতে পেরেছিলে?- আমি জিজ্ঞেস করলাম।
না, যারিনা বললো- এমনিই তো চাঁদ মেঘে ঢাকা ছিলো, তারপর আবার গুণ্ডা দুজনের মাথা ও চেহারা পাগড়ি দিয়ে ঢাকা ছিলো।
ওকে উল্টো করে কাঁধের ওপর নিয়ে যাচ্ছিলো। এজন্য কোন দিকে যাচ্ছে সেটা যারিনা বুঝতে পারছিলো না। ওরা তাকে এক বাড়িতে নিয়ে গেলো। তখন কারো গলার শব্দ তার কানে পৌঁছলো- শিকার শিকার।
বাড়ির এক কামরায় নিয়ে ওকে খাটের ওপর প্রায় ছুঁড়ে ফেললো। সেখানে টিম টিম করে একটি চেরাগদান জ্বলছিলো। লোক দুটি বাইরে চলে গেলো। এবং বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে গেলো। ভয়ে যারিনা বেহুশ হয়ে গেলো। কতক্ষণ পর ওর জ্ঞান ফিরলো মনে নেই। চোখ খুলতেই দেখলো, সে অন্য আরেকটি খাটের ওপর বসা।
তুমি বলেছিলো, আমার কারামত দেখতে চাও- পীর হাসতে হাসতে বললো- দেখেছো আমার কারামত……. আমার জিনেরা তোমাকে কিভাবে উঠিয়ে এনেছে?
ঘুমের মধ্যে আমি জানি না কোথা চলে গিয়েছিলাম- যারিনা কাঁদতে কাঁদতে পীরের কাছে হাত জোড় করে বললো- আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে ছেড়ে দিন। আমার স্বামী আমাকে জানে মেরে ফেলবে।
পীরের মনে দয়ার উদ্রেক হবে তো দূরের কথা, পীর যারিনার কথায় আরো মজা পেলো। হিংস্র জানোয়ারের মতো আচরণ করলো ওর সঙ্গে। যারিনার আর্তচিৎকার শোনার জন্য কেউ এলো না।
***
পীর যারিনাকে লোভের চূড়ান্ত দেখিয়ে বললো, পীর তাকে এ এলাকার পীর সম্রাজ্ঞী বানাবে। ইকবালকে তালাক দিতে বাধ্য করাবে। তারপর তাকে বিয়ে করবে। কিন্তু যারিনার আর্ত চিৎকার চলতেই থাকে।
দুই দিন পীর ওকে এভাবেই কয়েদ করে রাখে। শুধু একজন পরিচারিকা খাবার দিয়ে যেতো। কামরায় আর কেউ আসতো না।
এক রাতে আবার পীর হানা দিলো। যারিনা তার পায়ে ধরে অনেক কান্নাকাটি করলো। কিন্তু সে তখন হিংস্র জানোয়ারের চেয়েও নিকৃষ্ট প্রাণী হয়ে গেছে।
আরো দু তিন রাত এভাবেই কেটে গেলো। এক রাতে কামরায় পীরের ছেলে এসে হাজির হলো। দূর দূরান্তের গ্রামের মেয়েরাও তাকে ভালো করে চেনে। যারিনাও তাকে দেখেছে আগে। তার লম্পটের গল্পও শুনেছে অনেক। তাকে দেখে যারিনা আরো ঘাবড়ে গেলো।
কিন্তু পীরের এই ঠুণ্ডা মার্কা ছেলে যারিনার সঙ্গে বড় নরম- আদুরে গলায় কথা বললো- আমি আজই জেনেছি, আমার বাপ তোমাকে ধরে এনে এখানে কয়েদ করে রেখেছে। তোমাকে যে এখান থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবো সেই সুযোগও পাচ্ছিলাম না। আজ এখন সুযোগ পাওয়া গেছে।
