যে যারিনার ব্যপারে শুনছিলাম কথা বলতে জানে না তার মুখ এখন খৈ ফৌটায় ব্যস্ত হয়ে গেছে। একটু আগে যে মুখটি মরার মতো সাদাটে হয়ে গিয়েছিলো সেটি এখন রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে।
ওর সৌন্দর্যের ছটায় ঘর আবার আলোকিত হয়ে উঠেছে। সঙ্গে সঙ্গে নিষ্পাপ সাফল্যের কমনীয়তা ফুটে উঠেছে। আমার মনে হলো, এই কান্তিবর্তী মেয়ের পক্ষে বড় ধরনের অপরাধ করা কঠিন কাজ। তাই ওকে অভয় দিয়ে বললাম, যা ঘটেছে এর কানকড়িও যেন বাদ না যায়।
আমি যা করেছি আমার আল্লাহ দেখেছেন- যারিন বললো- আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আমার পরম ভরসা আছে। আপনার সামনে মিথ্যা বললে আল্লাহর সামনেও মিথ্যা বলতে পারবো।
পুলিশের সোর্সরা অনেক ভয়ংকর ভয়ংকর ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকে। আর বড় বড় অপরাধীদের ব্যপার তো আছেই। ওদের কাহিনী শুনলে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে এবং ভোলা যায় না তা সহজে। যারিনার ঘটনাও সেরকম। আজো সেই স্মৃতি তাজা। জানিনা যারিনা আমার ওপর কি প্রভাব ফেলে গেছে। ও যে জবানবন্দি দিয়েছে, এখানে শুধু প্রয়োজনীয় অংশটুকু উল্লেখ করা হয়েছে।
যারিনা কথা শুরু করলো এখান থেকে যে, সে আব্বাসকে ভালোবাসতে। এছাড়া অন্য কোন পুরুষের সঙ্গে কথা বলতো না। চুপচাপ থাকা তার আজম স্বভাব। কারো কোন কথা বা কাজ খারাপ লাগলে, দুঃখ পেলে নিজের বুকেই তা চেপে রাখতো। রাতে মাঝে মধ্যে তার স্লিপিং ওয়ার্ক তথা ঘুমের মধ্যে চলা ফেরার স্বভাব ছিলো।
বিশ পঁচিশ দিন পরপর এমন হতো। ঘরের সবাই সকাল হলে বলতে, গত রাতে সে ঘুমের মধ্যে সারা বাড়ি ও আঙ্গিনায় ঘুরে বেড়িয়েছে।
ইকবালের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর সে তার মার কাছে অনুরোধ রেখেছে, কেঁদেছে যে, ইকবালের সঙ্গে যাতে তার বিয়ে না দেয়া হয়। আব্বাসের সঙ্গে যাতে দেয়া হয়। কিন্তু তার বাবা তার স্বপ্নকে গলা টিপে মেরেছে।
আব্বাস আমার সামনেই তো বসা আছে- যারিনা বলে গেলো। আমি ওকে বলে রাখছি, কোন কিছু মিথ্যা হয়ে গেলে আমাকে বাধা দিয়ো…..
আমি এবং সে দুজনে মিলে কুরআন শরীফের ওপর হাত রেখে কসম করি যে, আমরা বিয়ে করবো। ও বলেছিলো, আমি আর কোন মেয়েকে আমার জীবনে স্থান দেবো না। আমি কসম করেছিলাম, আমি কোন পুরষকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করবো না।
তারপর তো ইকবালের সঙ্গে ওর বিয়ে হয়ে গেলো, কিন্তু পবিত্র কুরআনের প্রতি যে তার তাযীমবোধ ছিলো, তার মধ্যে ভীষণভাবে সেটা অনুতপ্ততা জাগালো। ওর কসম ভেঙ্গে গেছে। তার অনিচ্ছায় হলেও এর শস্তি তো পেতেই হবে।
বাসর ঘরে তাকে বসানোর পর সে কায়মনোবাক্যে আল্লাহকে ডেকেছে। দুআ করেছে–
হে আল্লাহ! আপনার পবিত্র কালামের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখার শক্তি দিন।
বাসর ঘরে ইকবাল আসার পর তো সে তার স্বামীকে তার প্রত্যাখ্যানের কথা জানিয়ে দিলো।
যারিনা আমাকে বললো, সে তো এমন সাহসী ও মুখ চোটা ছিলো না যে, একজন সবল যুবককে এ ধরনের কথা বলতে পারবে। সে নিজেই হয়রান হয়ে গেলো ইকবালকে কি করে এমন কথা বলে ফেললো। তারপর তার তখন বিস্ময়ের সীমা রইলো না ইকবাল যখন পেছনে হটে গেলো।
যারিনা আশা করেছিলো, ইকবালের মতো এমন পুরুষ একজন নারীর প্রত্যাখ্যান সইতে পারবে না। তাকে চড় দেবে বা আঘাত করবে এবং জোর করে ওকে বশ মানাতে চেষ্টা করবে। কারণ, যারিনা আগেই জানে, ইকবাল অত্যান্ত সুপুরুষ নির্ভীক পুরুষ। এলাকায় ডাকাবুকা হিসাবে তার বেশ খ্যাতি আছে।
যারিনার মতো আমার বিস্ময়ও কম ছিলো না। আমিও তো একজন পুরুষ। ইকবাল যে আবেগ উদ্দমতা ও তীব্র কামনা নিয়ে বাসর ঘরে গিয়েছিলো, একজনপুরুষই সেটা অনুভব করতে পারে। এটা সবাই তো বুঝতে পারবে, ইকবাল ছিলো গ্রামের কয়েক ক্লাশ পড়ুয়া ছেলে। এরকম ছেলের বউ যখন যারিনার মতো এক সুন্দরী মেয়ে হবে তখন তার অবস্থা- ভাবাবেগ কেমন তীব্রতর হওয়ার কথা?
এক কথায় সে রাতে যে কোন যুবক আদিম পর্বে এসে চরম হিংস্র হয়ে যায়। অথচ ইকবাল যারিনার প্রত্যাখ্যানের জবাবে একেবারে নিভে গেলো। ওর আগুনে যৌবন বরফ হয়ে গেলো। ইকবাল বলেছিলো, যারিনা আমাকে তাবিজ করেছে।
***
যারিনা ইকবালের মতোই হুবহু বর্ণনা দিলো ওদের বাসর রাতের। এই এক মাসের মধ্যে ইকবাল আর যারিনাকে তার স্ত্রী বানানোর সাহস করেনি। বরং তিন চারবার যারিনাকে মিনতি করেছে। কিন্তু যারিনাকে গলাতে পারেনি। তবে ওর সঙ্গে কখনো বিরূপ আচরণ করেনি।
তোমার ইচ্ছেটা কি ছিলো যারিনা?- আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম- তুমি যেভাবে চালাতে চেয়েছে কতদিন চলতো এমন? ইকবাল কত দিন এটা সহ্য করতে?
আমি চেয়েছিলাম ইকবাল অসহ্য হয়ে আমাকে তালাক দিয়ে দেবে। যারিনা বললো- তালাক না দিলে সে আমাকে মারপিট করতো। তখন আমি ওর নামে কাপুরুষের বদনাম ছড়াতাম যে, ও আমাকে মেরে ফেলতে চায়। আর না হয় শেষ পর্যন্ত আমিই আত্মহত্যা করতাম।
যারিনা এরপর শোনালো পীরের কথা। যত অপ্রতিভ আর অমেশুক হোক যারিনা, সে তো নির্বোধ নয়। পীর যখন ওর কাছে আসলো তখনই সে বুঝে ফেলে পীরকে ইকবাল এনেছে। পীর যে যারিনাকে বলেছে, তোমার চোখ ভয়ংকর ছায়া দেখা যাচ্ছে যারিনা এতে মোটেও ভয় পায়নি। সে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে আল্লাহর কাছে মুক্তির জন্য দুআ করতো।
