এতো জীবিত, তবে জ্ঞান নেই- আমি ঘোষণা করলাম।
যখমি ছিলো তো?- পীর চোখ বড় বড় করে বললো।
আরে কেবলা! আপনার মাথা তো খারাপ হয়নি? ওকে এখনই সোজা হাসপাতাল নিয়ে যান- পীরকে আমি বললাম।
আইন মতে প্রথমে ওর যখম দেখে রিপোর্ট লেখার দায়িত্ব ছিলো আমার। কিন্তু আমি বললাম, ওকে এখনই হাসপাতালে নিয়ে যাও, আমি আসছি। শুধু এতটুকু দেখেছি, পীরের ছেলের ঘাড়টি রক্তাক্ত কাপড়ে মুড়ানো।
হাসপাতালে তৎক্ষণাৎ পাঠানোর অর্থ এই নয় যে, ঐ গুণ্ডা ছেলের জন্য আমার দরদ উথলে উঠেছে। আমি শুধু ওর জবানবন্দি নিতে চেয়েছিলাম যে, কে ওকে মেরেছে। তারপর তার মরার খাহেশ হলে মরবে। আমার কিছু এসে যায় না।
আমার আইএসআই জগন্নাথকে তখন হাসপাতাল পাঠিয়ে দিলাম। তাকে দায়িত্ব দেয়া হলো, পীরের ছেলে জ্ঞান ফিরে আসলে ডাক্তারের উপস্থিতিতে তার তাৎক্ষণিক জবানবন্দি নিয়ে নেবে।
যারিনার কেসের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত আমি স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। তাই কাউকেও আমি একথা জিজ্ঞেস করিনি যে, পীরের ছেলের এ অবস্থা কি করে হলো? এসব দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছি আইএসআইকে। এই লাইনে তার অভিজ্ঞতাও কম নয়।
আমি আব্বাস ও যারিনার প্রতি মনোযোগ দিলাম। তখন রিপোর্ট লেখক হেড কনস্টেবল এলো।
স্যার! আপনি যে এখানে? সে বললো- এত বড় সঙ্গীন ঘটনা। যখমিকে অনেক দূরের এক ফসলি ক্ষেত থেকে উঠিয়ে আনা হয়েছে। কে জানে, রাত কয়টায় উনি আক্রান্ত হয়েছেন? দেহে তো মনে হয় এক ফোঁটা রক্তও অবশিষ্ট নেই।
আরো দুইদিন ঝরলেও ওর রক্ত খতম হবে না- কঠিন সুরে বললাম আমি- এরা এদের মুরিদের অনেক রক্ত চুষে খেয়েছে। তুমি এক কাজ করো হাসপাতাল চলে যাও। জগন্নাথকে গিয়ে বলো পুরো কেসের তদন্ত যেন সেই শেষ করে আসে। আর তুমি এফ.আই.আর. লিখে ফেলো। জগন্নাথ চলে আসার পর যদি যখমির জ্ঞান ফিরে, আমাকে খবর দেবে। আমি গিয়ে জবানবন্দি নিয়ে নেবো।
হেড কনেষ্ট বলে চলে গেলো।
কি ছোট শাহ মারা গেছেন?- আব্বাস হতভম্ব হয়ে বললো।
এ ধরনের দাগী-পাপী এত তাড়াতাড়ি মরবে না। তুমিও মনে হয় ঐ গদির মুরিদ- আমি বললাম।
হ্যাঁ জনাব! উনার তো হাজার হাজার মুরিদ আছে- আব্বাস বললো।
যারিনা ওখানকার মুরিদ নয়- আমি যারিনার দিকে কৌতুক চোখে তাকিয়ে বললাম- ঠিক না যারিনা? পীর সাহেব যে তোমাকে ডেকেছিলো, তুমি তো আর যাওনি, না?
মরা মানুষের মতো যারিনার মুখের বর্ণ সাদাটে হয়ে গেলো। চোখ দুটো হয়ে গেলো প্রাণহীন। রূপের যে দীপ্তি এতক্ষণ বিচ্ছুরিত হচ্ছিলো সেটা এখন ম্লানতর। ভয় হলো- আবার না বেহুশ হয়ে যায়।
যারিনা! আশ্বাসের সুরে বললাম- এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। তোমাকে জিজ্ঞেস করছি, তুমি কোথায় গিয়েছিলে বা কে তোমাকে ফুসলিয়ে বা অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিলো?
যারিনার উত্তর শোনার আগে আব্বাসকে জিজ্ঞেস করলাম- কুড়াল হাতে ঐ মেয়েটি কে ছিলো, যে তোমাদরে বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছিলো? না বললে মনে রেখো, এই মেয়ের গুম হওয়া নিয়ে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। কয়েকজন সাক্ষীর সামনে ওকে তোমাদের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তোমার বাবাকেও আইনত করণীয় হওয়া সত্ত্বেও পাকড়াও করিনি……..
কারণ আমি জানি, যারিনার সঙ্গে তোমার প্রেম-প্রনয় আছে। তোমার কাছে বিয়ে বসার ইচ্ছে ছিলো যারিনার। কিন্তু তা আর হয়নি। যারিনা বিয়ের প্রথম রাতেই ওর স্বামীকে পরিস্কার বলে দিয়েছে, আমি তোমাকে স্বামী হিসেবে মেনে নেবো না…..।
তোমাকে আরেকবার বলছি, বিবাহিত এক মেয়েকে তুমি অপহরণ করেছে, সত্য কথা বলতে না চাইলে শাস্তির জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও এই মুহূর্তেই। এই প্রেমের কারণে তোমাকে অনেক খেসারত দিতে হেব……
***
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই যারিনা তাড়াতাড়ি বলে উঠলো।
সেটা আমি ছিলাম। কুড়াল আমার হাতেই ছিলো। আব্বাস আমাকে অপহরণ করেনি। আমি নিজেই গিয়েছি।
কোথায়! কার কাছে?……… আর গভীর রাতে ওর বাড়িতে কেন গেলে?……….. আমার কথা শোন যারিনা! তোমাকে বা আব্বাসকে শাস্তি দেবোই এই ভেবে আতংকিত হয়ো না। তোমাদেরকে আমি বেকসুর বিদায় করতে পারবো। শুধু সত্য কথা বলো।
জনাব! আব্বাস মিনতি করে বললো- আপনি আমাকে গ্রেপ্তার করুন। ওকে আমিই অপহরণ করেছি। রাতে ও অন্য কোথাও থেকে আসেনি। এত দিন ও আমার কাছেই ছিলো। ওকে আমি বন্দি করে রেখেছিলাম।
আমি রেগে গেলাম আবার হয়রানও হলাম যে, একি বাজে বকছে। দুজন দুই কথা বলছে! আর তাদের প্রতি আমার সহমর্মিতার বিষয়টা উপলব্ধি করছে না।
তোমরা তো জঙ্গলি আছই- আবি বজ্র গম্ভীর কণ্ঠে বললাম- আমাকেও জঙ্গলি ভাবছো। তোমরা আসামী এবং থানায় বসে আছে। এই অনুভূতিটুকুও কি নেই! তুমি এটা কেন ভাবছো না, তোমার বোন দুজনকেও থানায় ডেকে আনা হয়েছে। এটা একটা সম্মানিত পরিবারের জন্য কতটুকু অসম্মান।
তোমার বাপ বোন থেকেও আমি জবানবন্দি নেবো। যারিনার বাপ, মা ভাইও এখানে। তোমরা তো জানো না, থানাওয়ালাদের জিজ্ঞাসাবাদ কত কঠিন হয়ে থাকে। সবার বেইজ্জতি হবে।
আমি আব্বাস ও তার পরিবারের জন্য জান দিয়ে দেবো- মুহূর্তের মধ্যে সাহসের দীপ্ত ছড়িয়ে পড়লো যারিনার কণ্ঠে- আমি আপনাকে সবকিছু খুলে বলছি। আব্বাস আমাকে বাঁচাতে মিথ্যা কলা বলছে। আমি আল্লাহ তাআলাকে ভয় করি। আপনি থানার অফিসার। আমার ব্যক্তিত্ববোধ আপনি আসলে বুঝবেন না।
