আপনি ভেতরে আসুন- লোকটি বললো- যে এসেছে সে আমার ভাগ্নি যারিনা। কি করবো না করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আপনি ভেতরে এসে দেখুন।
আমি ভেতরে চলে গেলাম। প্রশস্ত উঠনো আরকজন দাঁড়িয়ে আছে। তাকে আমি চিনি। তিনি ছিলেন যারিনার বাবা। যারিনার বাবা আমাকে বাড়ির বড় একটি ঘরে নিয়ে গেলেন। সেখানে যারিনার মা দাঁড়িয়ে আছেন স্থানুর মতো। আরো তিনজন ছেলে তিনজন মেয়েও দাঁড়িয়ে ছিলো।
ওদের পরিচয় দেয়া হলো, দুজন যারিনার ভাই, অপরজন আব্বাস। ইকবালের মতো সুপুরুষ না হলেও বলবান এক আকর্ষণীয় যুবক আব্বাস। মেয়েদের মধ্যে দুজন আব্বাসের বোন। আর তৃতীয় জন যারিনা। ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মুখটি। তবুও রূপের বিচ্ছুরণ ইহা সারা ঘরকে স্নিগ্ধ করে রেখেছে।
আমি চৌকিদারকে বললাম, এলাকার সাধারণ প্রহরী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মেম্বারকে নিয়ে এসো। সঙ্গে দুজন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিকেও নিয়ে আসতে বলবে।
কথামতো কাজ করা হলো। চারপাঁচজনের একটা দল আসলে ওদেরকে বড় কামরায় নিয়ে আসা হলো।
আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, তারা কি হারিয়ে যাওয়া মেয়ে যারিনাকে চিনে কিনা। সবাই তাকে চিনে বলে সনাক্ত করলো। আমি মেয়ের উপস্থিতিতে লিখিত রিপোর্টের ব্যবস্থা করে সবাইকে থানায় আসতে বললাম। কারণ, এখানে আমি শুনানির কাজ শুরু করতে চাইলেও সে পরিবেশ ছিলো না।
চৌকিদার যখন মেম্বারকে আনতে গিয়েছিলো, তখন আমি যারিনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করলাম। কিন্তু ভয় তাকে এমনভাবে চেপে ধরেছিলো যে, সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছুই বলতে পারলো না। অবশ্য এই শোচনীয় অবস্থা অন্যদেরও কম নয়। তাই জবানবন্দি শোনার জন্য থানাই উপযুক্ত জায়গা।
থানায় গিয়ে আব্বাস ও যারিনাকে আমার অফিসে বসালাম। যদিও ওদের আলাদা আলাদা জবানবন্দি নেয়া উচিত। কিন্তু মেয়ে যেহেতু এখন উপস্থিত তাই ওদেরকে এক সঙ্গেই বসালাম। যারিনার দিকে আরেকবার লক্ষ্য করলাম। শুধু রূপই নয় অত্যন্ত আকর্ষনীয় দেহ সৌন্দর্যের অধিকারিনী। এমন রূপবতী মেয়ে আমি খুব একটা দেখিনি ইতিপূর্বে।
আব্বাস! মিথ্যা বলবে না- আমি সতর্ক করে দিলাম তবে নরম গলায় তুমি ডাকতি করোনি। চুরি করোনি। পুরুষের মতো কাজ করেছে। এখন ভয় নেই। যা কিছু করেছো তুমি ভালোবাসার গভীর টানে করেছে।
এতটুকু বলে একটু থামলাম। ওকে নিরীক্ষণ করলাম, তারপর আবার শুরু করলাম,
যারিনা বিবাহিত না হলে ওকে ঘর থেকে বের করে নেয়া তেমন অপরাধের কাজ হতো না। আমি তখন রিপোর্ট লিখতাম, প্রাপ্ত বয়স্কা এই মেয়ে। তাই সে নিজ ইচ্ছায় ঘর ছেড়ে বের হয়ে গেছে। আইনত এই অধিকার তার আছে। কিন্তু ও তো একজনের স্ত্রী। কারো স্ত্রীকে উঠিয়ে নেয়া- অপহরণ করা শক্ত অপরাধ। ওর শ্বশুর বাড়ির লোকজন ভালো বলেই বলেছে যারিনা অলংকার ও টাকা পয়সা নেয়নি। শুধু ও একলা গিয়েছে।
আব্বাসের চেহারা দেখে মনে হলো নতুন এক আতংক ওকে গ্রাস করছে। কিন্তু যারিনার ভীত মুখে এখন লড়াইয়ের আভাস!
আমাকে ও অপহরণ করেনি- যারিনা বলে উঠলো জোর দিয়ে আমি নিজেই গিয়েছি।
তবুও এটা অপরাধ। তাছাড়া তোমাকে আমরা ওর বাড়ি থেকে আবিষ্কার করেছি।
আপনারা আমার একটু আগে আমি ওদের বাড়িতে ঢুকেছি- ওর সুর ক্রমেই দৃঢ় হয়ে উঠছে।
এতদিন কোথায় ছিলে?
এবার যারিনাকে চিন্তাযুক্ত মনে হলো, কিছু একটা লুকোতে গিয়ে যেন বিপদগ্রস্থ।
আমি যেখানেই ছিলাম, ওর কাছে ছিলাম না- যারিনা বললো।
আব্বাসকে যদি বাঁচাতে চাও তাহলে বলে দাও তুমি কোথায় ছিলে? আমি প্রাথমিক অস্ত্র ব্যবহার করলাম- এটাও মনে রেখো, যে জায়গার কথাই বলবে এটাও প্রমাণ করতে হবে তুমি এতদিন ওখানে ছিলে। মাত্র দুটি পথ খোলা আছে তোমার সামনে। বলে দাও, কোথায় ছিলে। না হয় আব্বাসের জন্য কয়েদখানা বেছে নাও।
***
যারিনার ব্যপারে যা শুনেছিলাম তাই ঠিক মনে হলো। কথা বার্তায় সে খুবই অপ্রতিভ। প্রথম দিকে একটু উত্তেজিত হলেও এখন যেন আরো নিস্তেজ। এছাড়াও মনে হলো ওর মধ্যে সরলতাই বেশি।
তুমি বলছো আমাদের পৌঁছার একটু আগে তুমি ওদের বাড়ি পৌঁছেছে আমি জেরার সুরে বললাম
তাহলে ভীত-আতংকিত হয়ে দৌড়াচ্ছিলে কেন? আর তোমার হাতে কুড়াল ছিলে কেন?
ও কিছু বললো না।
তুমি যদি সে মেয়ে না হও তাহলে আব্বাসকে বলতে হবে সে মেয়ে কে ছিলো যার হাতে উদ্ধত কুড়াল ছিলো?– আমি বললাম।
আব্বাস ও চুপ করে রইলো। আমি ওদেরকে চেপে ধরলাম। জেরার পর জেরা করে নাভিশ্বাস উঠিয়ে দিলাম। ওরা তো কেউ পেশাদার অপরাধী নয়। তাই ভেঙ্গে পড়তে সময় লাগলো না।
যারিনা তো ঘরের চার দেয়ালের বন্দিনী। ও একেবারে কোনঠাসা হয়ে গেলো। চোখ পানিতে ভরে গেলো এবং ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।
এ সময় বাইরে থেকে কোলাহল শোনা গেলো। এক হেড কনস্টেবল দৌড়ে এসে বললো,
স্যার! পীর সাহেব তার ছেলের লাশ নিয়ে এসেছে।
চমকে উঠার জন্য এর চেয়ে বেশি শোনার প্রয়োজন নেই।
আমি এক কনস্টেবলকে থানার নিয়ম অনুযায়ী আব্বাসদের সামনে দাঁড় করিয়ে বাইরে দৌড়ে গেলাম।
পীর আমার দিকে দৌড়ে আসছিলো। থানার সামনে একটি খাঁটিয়া রাখা, আমার বেটা!- পীর শুধু এতটুকুই বললো হাহাকার করে।
খাঁটিয়ার ওপর লাশ চাদর দিয়ে ঢাকা। মুখটুকু শুধু উন্মুক্ত। আমি ওর মাথায় হাত রাখলাম। তারপর নাড়ি পরীক্ষা করলাম। অতি ক্ষীণলয়ে শ্বাস নিচ্ছিলো।
