আপনি যে কথাটা বলতে সংকোচ বোধ করেছেন সেটা আমি বলে দিচ্ছি আমি প্রত্যয়ের গলায় বললাম- ও আব্বাসকে পছন্দ করতো………
আব্বাস আপনার ভাই পুত্র না? ……. মুখ খুলুন। আড়াল করবেন না কিছু। আপনার মেয়ে ফিরে পেতে চাইলে আড়াল করবেন কিছুই।
হ্যাঁ, আপনি ঠিক বলেছেন। ও আমাকে এও বলেছিলো, আমার বিয়ে আব্বাসের সঙ্গে দিন- কথাটা বলতে পেরে যেন যারিনার মা একটু আরামবোধ করলেন।
তাহলে দিলেন না কেন? আমার মতামত চললে তো যারিনা আব্বাসের ঘরেই যেতো। কিন্তু যারিনার বাবা ওর ঘোর বিরোধী। আমার ভাই সম্পর্কে তার ধারনা খুব উঁচু নয়। বিয়ের আগে তিনি বলেছেন, ইকবালের পরিবার ধনে মানে অনেক বেশি আমির ঘরনার।
তাছাড়া দেখতে শুনতে ইকবাল আব্বাসের চেয়ে অনেক আকর্ষণীয়। তারপরও যারিনার মামাকে বলেছিলাম, যারিনার বাপকে যেভাবেই হোক খুশি করে আব্বাসের জন্য যারিনাকে চেয়ে নাও। কিন্তু আমার ভাই যারিনার বাপকে কিছু বলাটা নিজের জন্য অপমানজনক মনে করতো।
যারিনার মা শেষ পর্যন্ত স্বীকার করলেন, যারিনা আব্বাসকে শুধু ভালোই বাসতো না, তাকে একটা দিন না দেখলে যেন তার প্রাণের সাড়া পেতো না। কিন্তু অধিকাংশ মানুষেরই পারিবারিক নীতি ব্যক্তি স্বার্থের শৃংখলে এমনভাবে বন্দি যে, নিজেদের মতামত প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সন্তানের ইচ্ছাকে গলা টিপে হত্যা করে।
যারিনার মাকে জিজ্ঞেস করলাম, এমনকি হতে পারে যে, ইকবালের কাছ থেকে পালিয়ে যারিনা আব্বাসের কাছে চলে এসেছে। কথাটা যেন তার সহ্য হলো না। দুই কান চেপে ধরলেন। তারপর বুদ্ধিমানের মতো একটা উক্তি করলেন।
যদি ওর স্বামীর ঘর থেকে ও পালাতেই তাহলে তো বিয়ের আগেই আব্বাসের সঙ্গে পালিয়ে যেতো। হায়! আমার মেয়ের ওপর এত বড় জুলুম হলো অথচ আমি কিছুই করতে পারলাম না। আর করারই বা ছিলো কি আমার?
যারিনা আপনাকে মনে হয় বলেছে, ইকবালের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন? ওদের মধ্যে কোন হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল?
হৃদ্যতা? ও যখনই আসতো। কান্না ছাড়া আর কিছু শোনাতো না।
ওর সঙ্গে ইকবালের এবং ইকবালের সঙ্গে ওর ব্যবহার কেমন এসবও কি আপনাকে জানাইনি যারিনা?
না কখনই বলেনি, তার গলায় চিন্তা ক্লিষ্টতা।
উনাকে বাড়ি পঠিয়ে দিলাম।
***
আজ সারাটা দিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি গেলো। তাই বিছানায় যেতেই গভীর ঘুম। কতক্ষণ পর জানিনা, সজোরে দরজায় কড়াঘাতের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গলো। দরজা খুলে দেখি, যারিনাদের গ্রামের চৌকিদার।
জনাব! ক্ষমা করবেন- হাতজোড় করে বললো- জরুরী একটা খবর এনেছি। আমি গাঁয়ে টহল দিচ্ছিলাম। হঠাৎ কাউকে স্ববেগে দৌড়ে গ্রামের দিকে আসতে দেখলাম। আমি পথের পাশে আড়াল নিয়ে লুকিলে পড়লাম। চাঁদের আলো তখন আবছা মেঘে ঢাকা…….. কিছুই দেখা যায় না।…
তবে মানুষ দেখা যায়। দৌড়াচ্ছিলো কোন এক নারী। ওর হাতে একটি কুড়াল উদ্বত অবস্থায় ধরা ছিলো। আমাকে সে দেখেনি। আমার কাছ ঘেষে দৌড়ে গেলো। চিনতে পারলাম না ওকে।
আমি ওকে অনুসরণ করার জন্য একটি ঘরের পেছনে দৌড়ে গিয়ে লুকিয়ে পড়লাম। আমার ছুটন্ত পায়ের শব্দ মনে হয় শুনে ফেলেছিলো। সে একবার পেছন ফিরে দেখে নিলো। তারপর আবার দৌড়ের গতি তীব্র করে তুললো। আমি এবার এমন জায়গায় গিয়ে ওর ওপর চোখ রাখলাম যেখান থেকে ওকে সহজে দেখা যায়।
নারী মূর্তি আব্বাসের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। দরজায় আওয়াজ দিলো। দরজা খুলে গেলো এবং সে ভেতরে চলে গেলো…….
ও যদি স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে আসতো আমার সন্দেহ হতো না। সে ঊর্ধ্বশ্বাস দৌড়াচ্ছিলো এবং তার হাতে ছিলো একটি কুড়াল।
আমি ঘড়ি দেখলাম। আজো সেই স্মৃতি উজ্জ্বল হয়ে আছে। তখনো এগারটা বাজেনি। কয়েক মিনিট বাকি ছিলো।
থানা থেকে ওদের গাঁ দেড় কি পৌনে দুই মাইল। আমি কোয়ার্টার থেকে রাত পোহালেই থানায় চলে গেলাম। একজন হেড কনেস্টবল ও তিনজন কনেস্টেবল নিয়ে সাইকেল রিক্সায় করে রওয়ানা হয়ে গেলাম। সঙ্গে প্রয়োজনীয় অস্ত্রপাতিতো ছিলোই। মূল সড়ক পথে না গিয়ে গ্রামের ভেতরের সংক্ষিপ্ত পথে এগুলাম। চৌকিদার সাইকেল নিয়ে আসেনি। তাই সে দৌড়ে আসছিলো।
গ্রামের বাইরে থাকতেই সাইকেল ছেড়ে দিলাম। সারা গ্রাম এমন নিথর নিঃশব্দ যেন কোন মৃত্যুপুরীতে ঢুকেছি। আমরা আব্বাসের বাড়ি চিনতাম না। চৌকিদারের জন্য অপেক্ষা করতে হলো। বেচারা দৌড়াতে দৌড়াতে আসায় তার প্রায় দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। সে আমাদেরকে আব্বাসদের বাড়ির সামনে নিয়ে গেলো।
আমি সজোরে দরজায় করাঘাত করলাম। কোন সাড়া পাওয়া গেলো না। দুই কনস্টেবলকে বাড়ির পেছন দিকে পাঠিয়ে দিয়ে আবার করাঘাত করলাম। না, এবারও সারা মিললো না। চৌকিদারকে বললাম, আব্বাসের বাপকে জোরে আওয়াজ দিয়ে বলল, থানার ওসি সাহেব এসেছে, দরজা খোলো। না হয় তোমার ছেলেকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যাওয়া হবে।
চৌকিদারের আওয়াজ ভেতের পৌঁছতেই দরজা খুলে গেলো। দরজার মুখে এক প্রৌঢ় দাঁড়িয়ে। চৌকিদার জানালো, এই লোকই আব্বাসের বাবা।
তোমাদের বাড়িতে যে কুড়াল হাতে একটি মেয়ে এসেছে ওকে হাজির করো- আমি হুকুম করলাম।
লোকটি দাঁড়িয়ে রইলো অথর্বের মতো। পূর্ণবার আমি হুকুম করলাম। লোকটি তখন আমার হাত জড়িয়ে ধরলো।
