শহরবাসী প্রতিরোধের ব্যবস্থা এরূপ করল যে, সকাল বেলা হঠাৎ করে শহরের ফটক খুলে যেত আর ঘোড় সোয়াররা বাঁধ ভাঙ্গা বন্যার মত এসে মুসলমানদের উপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে শহরে ফিরে যেত। তারা কখন কোন দিন আসবে তা কিছুই জানা যেত না।
মুসা ইবনে নুসাইর এ অবস্থা মুকাবালার অনেক কোশেশ করলেন, কিন্তু কোন উপায় খুঁজে পেলেন না, অবরোধ দীর্ঘায়ীত হতে লাগল। মুসা অভিজ্ঞ সালার ছিলেন, তিনি নিজে যুদ্ধের ময়দানে মামুলী ফৌজের মত লড়াই করেছেন কিন্তু এখন তিনি উপনীত হয়েছেন বার্ধক্যে, আগের মত তকত আর নেই।
ঈসায়ী ফৌজ হররোজ তার ফৌজের লোকসান করতে লাগল, তিনি খুঁজে পেলেন না কি করবেন। পরিশেষে তার দু’ ছেলে আব্দুল্লাহ্ ও মারওয়ান বীরত্ব প্রদর্শন করলেন। তারা পদ্ধতি অবলম্বন করলেন, ঈসায়ী ফৌজ যখন বাহিরে এসে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করে তখন তারা দু’জন তাদের ঘোড় সোয়ার দ্রুত হাঁকিয়ে একদম প্রাচীরের কাছে গিয়ে দুশমনের পিছনে অবস্থান করে তাদের শহরে ফিরে যাবার রাস্তা বন্ধ করে দিল তারপর তাদের ওপর পশ্চাৎ-সম্মুখ হতে. আক্রমণ করে হালাক করা হলো। এভাবে কয়েকবার করে ঈসায়ী ফৌজের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করা হলে, তাদের ফৌজ সংখ্যা কমে গেল। পরিশেষে দেড় মাস পর কেল্লা বিজয় হলো।
তারেক ইবনে যিয়াদ টলেডোর দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। তিনি এখন যে পরিমাণ চিন্তিত এত চিন্তিত ইতিপূর্বে আর কখনও হননি। টলেডোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাকে পেরেশান করে তুলেছিল। প্রয়োজনে কয়েকবার মুসা ইবনে নুসাইরের কাছে সৈন্য সামন্তের আবেদন করার পর তিনি তা পাঠান নি। এ দুঃখের কথা কয়েকবার তিনি তার সাথীদের কাছে প্রকাশ করেছেন। তার সৌভাগ্য কয়েক হাজার বর্বর মুসলমান স্বেচ্ছায় তার সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন। তানাহলে এত কম সংখ্যাক ফৌজ দিয়ে তিনি এত বড় সফলতার্জন করতে পারতেন না।
টলেডোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অতি মজবুত তা তারেক ইবনে যিয়াদ জানতে পেরেছিলেন কিন্তু টলেডোর আভ্যন্তরীণ অবস্থা কি সে ব্যাপারে তিনি অবগত ছিলেন না।
বাদশাহী তখত খালী। সে তখতে কে বসবে তা নিয়ে টলেডোর শাহী মহলে চলছে জোর হাঙ্গামা রডারিকের যেসব সন্তান ছিল তাদের মাঝে কেবল রজমান্ড নামে একজন ছেলে ছিল তার বৈধ সন্তান। তার বয়স ছিল আঠার-উনিশ বছর। নিয়মানুপাতে সেই ছিল তখত আসীন হবার অধিকারী কিন্তু এ বয়সেই সে এত বিলাস প্রিয় হয়ে উঠেছিল যে, বাবার সালতানাতের প্রতি তাকে বারবার মনোযোগী, করে তোলার চেষ্টা করেও কোন কাজ হয়নি। সে ছিল শিকারী প্রেমী আর কোন সুন্দরী যুবতী দেখলেই তাকে নিজের ঘরে নিয়ে আসতো আবার কিছুদিন পর তাকে বাদ দিয়ে আরেক জন নিয়ে আসতো।
রডারিক ছিল স্পেনের শাহেন শাহ। তার যখন যা ইচ্ছে তাই সে করত। স্পেনই নয় আশে-পাশের দেশ থেকে সে সুন্দরী রমণীদের কে তার হেরেমে এনে রাখত। কিছুদিন পর তাদেরকে বিদায় করে দিয়ে নতুনদের আয়োজন হতো। তার বৈধ স্ত্রী ছিল একজন,এ ছাড়া আরো দু’জনকে সে হেরেমে স্থায়ীত্ব দান করেছিল এবং তাদের সাথে সে বৈধ স্ত্রীর আচরণ করতো। এ সকল রমণীদের ছেলে সন্তান ও হয়েছিল। তারা সকলেই ছিল অবৈধ। রডারিকের মৃত্যুর পর এ সকল মহিলারাও উঠে পড়ে লাগল তাদের সন্তানদেরকে রডারিকের স্থলাভিষিক্ত করার জন্যে। কিন্তু রডারিকের বৈধ সন্তান রজমান্ডের বর্তমানে অন্য কেউ শাহী আসনে আসীন হতে পারছিল না।
টলেডোতে ফৌজের জেনারেল ইউগোবেলজী ছিল। সে ছিল রডারিকের ডান হাত-বাম হাত। সে সব সময় টলেডোতেই শাহী মহলে থাকত। আসলে সে ছিল রানীর প্রিয়জন। যার ফলে সে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছিল।
রডারিকের বেটা রজমান্ড ঐ সকল যুবতীদেরকে তার শয্যাসঙ্গী বানাত যারা; রডারিকের উপ-পত্নির গর্ভজাত ছিল আর রডারিক ছিল তাদের পিতা। তাদের মাঝে লিজা নামে এক যুবতীও ছিল। বয়স ছিল বিশ-পঁচিশ বছর। তার এক ভাই ছিল। মহলে তার বেশ ভাল প্রভাবও ছিল।
ইউগোবেলজীও ছিল রডারিকের মত বিলাস প্রিয়। রডারিকের পরে সে হয়ে ছিল মহলে অঘোষিত সম্রাট। সে লিজার প্রেমে পড়ে লিজাকে কাছে পাবার জন্যে পাগল পারা হয়ে উঠে। কিন্তু লিজা তাকে এড়িয়ে চলছিল। পরিশেষে জেনারেল তাকে শাদীর প্রস্তাব দিল তবুও সে তাতে সাড়া দিল না।
তারেক যখন টলেভোর দিকে অগ্রসর হচ্ছেন তখন এক রাত্রে লিজা জেনারেল ইউগোবেলজির কাছে উপস্থিত হলো।
“তুমি কেমন আছো?” জেনারেল জিজ্ঞেস করল।
“আপনার কাছে এসেছি। আপনি আশ্চর্যবোধ করছেন নাকি?”
“তোমাকে এখানে আসতে কেউ দেখেনি তো?”
“না কেউ দেখেনি।”
লিজার জানা ছিলনা মহলের এক ব্যক্তি তাকে প্রত্যক্ষ করেছে এবং তার পিছু পিছু এসেছে। সে হলো রজমান্ড।
আমি অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও বেকুফ নই। তোমার চেহারা দেখে বুঝা যাচ্ছে তুমি নিশ্চয় কোন বিশেষ মাকসাদে এসেছ। তোমার সে মাকসাদ কি তা বল।
লিজা বলল, আমি অল্প বয়সী ও অজ্ঞ। আমার অভিজ্ঞতা নেই কাউকে আয়ত্তে আনতে হলে কিভাবে কথা বলতে হয়। এ কারণে আমি খোলাখুলিভাবে বলছি, আপনি আমাকে শাদী, করতে চেয়েছিলেন আর আমি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। আমার স্থলে যদি আপনি হতেন তাহলে আপনিও অস্বীকার করতেন, আপনি আমার : আর আপনার বয়সের পার্থক্য লক্ষ্য করুন। এখন আমি আপনার কাছে আমাকে সমর্পণ করার জন্যে এসেছি। আপনি শাদী করে বিবি হিসেবে রাখতে পারেন বা এমনিতে রাখবেন তা আপনার ইচ্ছে।
