ঐতিহাসিকরা লেখেছেন, খ্রীস্টানদের মাঝে পূর্ণমাত্রায় এ বিশ্বাস জন্ম নিয়েছিল যে, রডারিক নিহত হয়নি বরং সে রূপ-আকৃতি পরিবর্তন করে খ্রীস্টবাদের প্রচারক ও রক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হবে। এ বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে স্পেন অধিবাসীদের মাঝে বদ্ধমূল ছিল। এ যুদ্ধে পঞ্চাশ হাজার স্পেনী ফৌজ হালাক হয়েছিল যার মাঝে উল্লেখযোগ্য জেনারেল ও স্পেনের নওয়াব ও আমীররা ছিল। আর ত্রিশ হাজার হয়েছিল কয়েদী। রন্ডারিকের ফৌজরা মুসলমানদেরকে কয়েদী হিসেবে বেঁধে নেয়ার জন্যে সাথে বড় রশী এনেছিল কিন্তু পরিণামে মুসলমানরা সে রশী দ্বারা রডারিকের ত্রিশ হাজার সৈন্য কয়েদী করেছিল।
৪. রডারিকের পরাজিত ফৌজ
“নিজেদের ধর্মীয় বিধানকে তোমরা পদদলিত করছ। আমি তোমাদের এ অপরাধ ক্ষমা করতে পারিনা। কুমারী রাহেবাদেরকে তোমরা উপ পত্মী হিসেবে গ্রহণ করতে পার এমন বিধান কি হযরত ঈসা (আ)-এর ধর্মে রয়েছে…না… তোমরা হত্যার উপযুক্ত।”
রডারিকের পরাজিত ফৌজের ত্রিশ হাজার কয়েদীকে একত্রিত করে বাঁধার পূর্বের দৃশ্যছিল এক হৃদয় বিদারক ও মর্মান্তিক। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে শুরু করে সমুদ্র পর্যন্ত দীর্ঘ প্রশস্ত ময়দান, ময়দানে হাশরে পরিনত হয়েছিল। লাশের স্তূপ রক্তগঙ্গায় হাডুডুবু খাচ্ছিল। হাজার হাজার আহতরা কাতরাচ্ছিল। অনেকে উঠে দাঁড়াবার কোশেশ করছিল। অনেকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছিল। আহতদের আত্ম চিল্কারে ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। যাদের শরীরে তীর বিদ্ধ ছিল তারা সবচেয়ে বেশী চিৎকার করছিল। অশ্ব ও পায়দল সৈন্যদের পদাঘাতে উড়ন্ত ধূলী কনা বাতাসে ভর করে স্পেনের রাজধানী টলেডোতে গিয়ে পৌঁছেছিল। একজন ইতিহাসবেত্তা লেখেন, এটা কোন বিস্ময়কর নয় যে তারেক ইবনে যিয়াদ জালেম বাদশাহ্ রডারিকের পরাজয় আশ্চর্যজনকভাবে প্রত্যক্ষ করছিলেন। ইতিহাস আজ পর্যন্ত পেরেশান যে বার হাজার সৈন্য কিভাবে এক লাখ বাহিনীকে পরাস্ত করে নাম নিশানা মিটিয়ে দিল।
রডারিকের আত্মম্ভরিতা যখন যুদ্ধের ময়দানে ভূলণ্ঠিত, তারেক ইবনে যিয়াদ তখন অশ্বপিঠে সোয়ার হয়ে পাহাড়ের চূড়ায় চড়ে সে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছেন। তার বিজয়ী মুজাহিদরা আহতদেরকে ও শহীদ সাথীদের শব পূর্ণ ইহতেরামের সাথে একত্রিত করছিল। কিছু মুজাহিদ ঐ সকল স্পেনীদেরকে পাকড়াও করছিল যারা উঁচু ঘাস ও গাছ-পালার মাঝে লুকাবার কোশেশ করতে ছিল। কেউ কেউ তাদের সাথীদের লাশের নিচে আত্মগোপনের ব্যর্থ চেষ্টা করছিল। মুসলমানরা তাদের হত্যা করবে হয়তো তাদের মনে এ ভয় বিরাজ করছিল। নৌকা দ্বারা তাদের তৈরীকৃত পুল পূর্ণ মাত্রায় সহী সালামতে ছিল। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে অনেকে সে পুল অতিক্রম করছিল। একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে পিছে ফেলে আগে যাবার চেষ্টা করছিল। এ পরিস্থিতিতে অনেকেই তার নিজ সাথীর দ্বারা সাগরে নিক্ষিপ্ত হচ্ছিল। ইতমেনান ও শান্তিতে সেই ছিল যে, হাতিয়ার সমর্পণ করে মুসলমানদের হাতে নিজেকে সোপর্দ, করেছিল।
যে সব স্পেনী কিস্তির পুল দিয়ে অতিক্রম করছিল তাদেরকে ফিরিয়ে আনার হুকুম কে দিয়েছিল তা জানা নেই। বহু তীরন্দাজ মুসলমান সমুদ্র পাড়ে গিয়ে কয়েকজন কয়েদী দ্বারা ঘোষণা করাল তারা যেন সকলে ফিরে আসে তা নাহলে তাদের ওপর তীর নিক্ষেপ করা হবে। স্পেনীরা ফিরে আসার পরিবর্তে আরো দ্রুত অগ্রসর হবার প্রতিযোগিতা শুরু করল। এরিমাঝে কামান হতে তীর গিয়ে কয়েকজন স্পেনীকে ফেলে দিল। এ অবস্থায় তাদের মাঝে আতংক আরো বেড়ে গেল অনেকে পিছে ফিরে এলো কিন্তু যারা অপর প্রান্তের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল তারা প্রত্যাবর্তন করল না। এদের সংখ্যাও একেবারে কমছিল না।
তারেক ইবনে যিয়াদ দেখতে পেলেন, তার দু’তিনজন মুজাহিদ বিশ-পঁচিশ জন যুবতাঁকে হাঁকিয়ে নিয়ে আসছে। এরা ছিল রডারিকের হেরেমের। তারেক ইবনে যিয়াদ চূড়া থেকে নেমে এলে যুবতীদেরকে তার সামনে আনা হলো, তাদের মাঝে একজন কেবল মাঝ বয়সী বাকী সকলেই কিশোরী ও যুবতী, একে অপরের চেয়ে সুন্দরী।
তারেক ইবনে যিয়াদ : এরা কি শাহী খান্দানের?
জুলিয়ন : না ইবনে যিয়াদ! এরা প্রজাদের বিভিন্ন খান্দানের লাড়কী। এরা। রডারিকের আমোদ-ফুর্তির উপকরণ। বিশ-পঁচিশজন উপ-পত্মীই যদি না থাকল তাহলে কিসের বাদশাহী।
তারেক : তাদেরকে জিজ্ঞস কর, তাদের মাঝে এমন কেউ আছে কি যে বাদশাহর হেরেমে স্বেচ্ছায় ছিল না।
তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা সকলেই বলল, তাদেরকে জোরপূর্বক বাদশাহর কাছে সোপর্দ করা হয়েছিল। তাদের মাঝে খ্রীষ্টানও ছিল তবে অধিকাংশ ছিল ইহুদী।
বাদশাহ্ কোথায়?
“এ প্রশ্নের জবাব কোন লাড়কী দিতে পারবে না।” হেরেমের প্রধান রমণী জবাব দিল। চার রাত ধরে বাদশাহ তার খিমাতে কাউকে আহ্বান করেনি। প্রতিরাতে আমি তাকে জিজ্ঞেস করতাম কিন্তু সে আমাকে ধমক দিয়ে বের করে দিত। যুদ্ধের দ্বিতীয় দিন থেকে সে গোস্বায় পাগল হয়ে গিয়েছিল। রাতে সে প্রচুর পরিমাণ শরাব পান করত, একদিন রাতে তাকে বেঁহুশ অবস্থায় উপুড় হয়ে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখলাম। দারোয়ানকে ডেকে তাকে বিছানাতে শয়ন করিয়ে ছিলাম।
স্পেনের শাহানশাহ্র ফৌজকে যে মুসলমানরা পরাজিত করেছিল তাদের সিপাহসালার তারেক ইবনে যিয়াদের শিরে ছিল আল্লাহ্ তায়ালার কুদরতের হাত। আর অন্তরে ছিল রাসূলে খোদা (স)-এর ইশক ও মহব্বত। রাসূল (স) তাকে বাসারত দিয়ে ছিলেন। এ বাশারত প্রকৃত অর্থে তাঁর ফরমান ছিল, “তারেক! তুমি যদি আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত হও তাহলে পরাজিত হবে না। আল্লাহ তোমার সাথে রয়েছেন।”
