তবে মুজাহিদদের এই হামলা ছিলো অত্যন্ত তীব্র এবং একেবারেই আচমকা। যার জন্য কেউ প্রস্তুত তো ছিলোই না এবং প্রস্তুত থাকার কথাও নয়। আসলে মুজাহিদদের এই হামলায় সবচেয়ে বড় যে অস্ত্র ছিলো সেটা হলো, পরাধীনতা থেকে মুক্তির জ্বালা ও স্বাধীনতার অপ্রতিরোধ্য চেতনা। আর ছিলো পাহাড়সম সংকল্প, বিস্ময়কর আত্মবিশ্বাস।
এই অনমনীয় সংকল্প ও তুঙ্গস্পর্শী আত্মবিশ্বাস নিয়ে মুজাহিদরা এমন প্রচণ্ড হামলা চালালো যে, জেনারেল সেলিষ্টার পালাতে গিয়ে মারা পড়লেন। কিছু স্পেনিশ অফিসার পালাতে সক্ষম হলো এবং দেড় দুইশ সৈনিক প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে পারলো। যারা পালাতে পারলো না, ক্যাম্পে রয়ে গেলো। তারা ছিলো। মারাত্মকভাবে আহত। এদের সংখ্যা ছিলো প্রায় সাতশ। আর বাকিরা হলো নিহত।
তারপর মুজাহিদরা স্পেনিশদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সেখানে গিয়ে আত্মগোপন করলো, যেখানে ওরা সাম্রাজ্যবাদী দখলদারদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হচ্ছিলো।
এটা ছিলো মারাকেশের মুজাহিদদের প্রথম হামলা। এর নেতৃত্ব দেন অখ্যাত এক লোক। যিনি পরবর্তীতে আব্দুল করীম নামে সারা দুনিয়ায় খ্যাতিমান হয়েছিলেন। ফ্রান্স ও স্পেনে তার নাম ছিলো, কোথাও কোথাও কিংবদন্তী তুল্য, কোথাও জলজ্যান্ত এক আতঙ্ক।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চার বছর আগে ফ্রান্সীয় সৈন্যরা নিরাপত্তা রক্ষার অজুহাতে মারাকেশে প্রবেশ করে। তারপর প্রতারণা ও দখলদারিত্বের অপচক্রে ফেলে এবং সেনাশক্তি প্রয়োগ করে মারাকেশের বড় একটা অংশ দখল করে নেয়। স্পেনিশরাও এ ধরনের পেশি শক্তির জোরে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে মারাকেশের আরো কিছু অংশে জুড়ে বসে।
প্রথম যুদ্ধের পর ফ্রান্সীয়রা আলজাযায়েরের সঙ্গে সঙ্গে মারাকেশকেও নিজেদের করদরাজ্যে রূপান্তরিত করে। সেখানে অসংখ্য ফ্রান্সীয় সৈন্য সমাবেশ ঘটায়। আর এই সুযোগে ফ্রান্স ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের ভূমিহীন অধিবাসীদেরকে মারাকেশে আবাদ করতে শুরু করে। স্পেনিশরাও নিজেদের দখলকৃত অংশে স্পেন ও ইউরোপীয়ানদের বসত গড়তে শুরু করে।
সাম্রাজ্যবাদী এই দুই জাতি মারাকেশের মুসলমানদের নির্বিঘ্নে বেঁচে থাকার সব পথ বন্ধ করে দেয়। এই দুই সন্ত্রাসী, দখলবাজ জাতির উদ্দেশ্য ছিলো একটাই। সেটা হলো, মারাকেশ যেন ইসলামী রাষ্ট্র বলার যোগ্য না থাকে।
ফ্রান্সীয় ফৌজি কমান্ডার তখন জেনারেল লাইটে। অতি দক্ষ ও চালবাজ জেনারেল হিসাবে সারা বিশ্বে স্বীকৃত। তিনি মারাকেশকে তাদের গোলামির শৃংখলে ফাসানোর জন্য সেই চালই চেলেছেন, যে চাল চেলেছিলো ইংরেজরা উপমহাদেশ দখল করতে গিয়ে। মারাকেশের নেতৃস্থানীয় মুসলমান, যারা বিভিন্ন গোত্র ও রাজনৈতিক অংগ সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন, তাদের পরস্পরের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে দেন জেনারেল লাইটে। শত্রুতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেন মারাকেশের নেতাদের মধ্যে। এভাবে মারাকেশের জাতীয় ঐ ধ্বংসের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দেন জেনারেল লাইটে।
মারাকেশের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও গোত্র সরদারকে ফ্রান্সীয়রা অঢেল ধন সম্পদ ও জায়গীর এবং সুন্দরী নারী দান করে। এভাবে মারাকেশ একটা পর্যায়ে এসে দাসত্বের চরম অবমাননা মেনে নেয়। কিন্তু মারাকেশের এমন একটি প্রাণীকেও পাওয়া গেলো না, যে এর বিরুদ্ধে সামান্য টু শব্দটি করবে। মনে হচ্ছিলো, মারাকেশের মুসলমানদের মধ্য থেকে স্বাধীনতার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নিভে গেছে। মরে গেছে তাদের আত্মমর্যাদাবোধের অনুভূতি।
তবে জীবন্ত কোন জাতির সন্তানরা মরে যেতে পারে, কিন্তু জাতির জাতীয়তাবাদ জীবন্তই থাকে। যা তারই কোন এক সন্তানের রূপ ধরে আগ্নেয়গিরী হয়ে বিস্ফোরিত হয়। তখন স্বাভাবিকভাবেই জাতির বিবেকবোধ সীমাহীন আত্মশ্লাঘা নিয়ে জেগে উঠে।
মারাকেশের পাথরচাপা বিবেকও জেগে উঠলো। সে ছিলো এক গোত্র সরদারের ছেলে। সদ্য যৌবনে পা দিয়েই মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার উদাত্ত শ্লোগান তুললো সেই সরদারের অগ্নিসন্তান। তার নামই আবদুল করীম আল খাত্তাবী।
তার বাবা তাকে আইন শিক্ষা দেন। আইনের ডিগ্রি নিয়েও সম্মানজনক জীবনের সুযোগ সুবিধা তাকে দিতে রাজি ছিলো না ফ্রান্সীয় ও স্পেনিশরা। কারণ, সে ছিলো মুসলমান। তাদের কাছে মুসলমান হওয়া এক অপরাধ। ধার্মিক হওয়া অন্যায় কর্ম। মানবিক ও সামাজিক হওয়া মানে দুর্বলতা।
স্পেনিশদের দখলকৃত অংশে আবদুল করীমরা থাকতো। আইনের প্রথম শ্রেণীর ডিগ্রি থাকার পরও সম্মানজনক কোন চাকুরি সরকার তাকে দিলো না। তবে আধা সরকারি ধরনের একটা চাকরি পেলো আবদুল করীম। সেটা হলো, স্পেনিশ ফৌজের অফিসারদের স্থানীয় বরবার ভাষা শিক্ষা দেয়ার কাজ। মারাকেশের লোকেরা এ ভাষাতেই কথা বলতো।
আবদুল করীমের মনে মারাকেশের স্বাধীনতার অপ্রতিরোধ্য চেতনা তাকে সবসময় দারুণ উজ্জীবিত রাখতো। সঙ্গে সঙ্গে দখলদার ভিনদেশী মুনিবদের বিরুদ্ধে অবিমিশ্র ঘৃণা তাকে তাড়িয়ে বেড়াতো। তার এই জাগ্রত উপলব্ধি সে গোপন রাখতে পারতো না।
একদিন স্পেনিশ অফিসারদের ক্লাশ নিচ্ছিলো আবদুল করীম। ক্লাশে স্পেনিশ জেনারেল সেলিষ্টারও ছিলেন। এক অফিসার ক্লাস টেষ্ট না পারায় আবদুল করীম তাকে মৃদুভসনা করে। জেনারেল সেলিষ্টার এটা মানতে পারলেন না। গোলাম হয়ে, অধীনস্থ হয়ে তার মুনিবকে এভাবে ধমকে উঠবে- এটা জেনারেল কোনভাবেই মানতে পারছিলেন না। তিনি চটে উঠলেন।
