নিজেকে আমাদের কর্মচারীর বেশি মনে করো না করীম! ভদ্রভাবে কথা বলবে। এমন আচরণ সহ্য করা হবে না। জেনারেল সেমিষ্টার বললেন।
আব্দুল করীম জেনারেল সেলিষ্টারের কথায় ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠলেন। জেনারেলের দিকে আগুন চোখে তাকিয়ে বললো,
এর চেয়ে বড় অভদ্রতা আর অসৌজন্যতা কি হতে পারে যে, তুমি তোমার শিক্ষককে ধমকাচ্ছে। এমন উগ্র ছাত্র কোন শিক্ষকই পছন্দ করবে না।
জেনারেল সেলিষ্টার একথার জবাবে আব্দুল করীমকে গালমন্দ করলো। আবদুল করীম মুখে বিদ্রুপাত্মক হাসি নিয়ে বললো,
শোন! স্পেনিশ অফিসাররা! মারাকেশ মুসলমানদের, তোমাদের একদিন না একদিন তোমাদের এখান থেকে বের হতেই হবে।
আবদুল করীম ক্লাশ সেখানেই মুলতুবী করে ক্লাশ থেকে এই বলে বেরিয়ে গেলো, আমি তোমাদের এই নোংরা চাকরির ওপর অভিশাপ দিচ্ছি।
তারপর আবদুল করীম তার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছতে পারলো না। জেনারেলকে আবদুল করীম যা বলে এসেছে তা স্বৈর আইনে সরাসরি বিদ্রোহ ছিলো। বাড়ির অর্ধেক পথে থাকতেই তাকে গ্রেফতার করা হলো। বিনা বিচারে তার জেল হয়ে গেলো।
জেলখানায় তার বিশ দিনও কাটেনি। একদিন সকালে জেলখানায় একটি সংবাদে বোমা ফাটার মতো অবস্থা হলো। সেটা হলো আবদুল করীম ফেরার হয়ে গেছে।
আজ পর্যন্ত কেউ এটা আবিষ্কার করতে পারেনি, রাতের বেলা আবদুল করীম পাহাড় সমান এত উঁচু প্রাচীর কি করে টপকালো। তাও সে প্রাচীর ছিলো ন্যাড়া পাহাড়ের মতো খাড়া এবং মসৃণ। প্রাচীরের কোথাও কোন খাঁজ ছিলো না। স্পেনিশরা আজো এই প্রাচীর টপকানোকে অলৌকিক কীর্তি বলে মনে করে। এটা ছিলো ১৯২১ সালের ঘটনা।
জেলখানার সাধারণ প্রহরী থেকে নিয়ে জেলার পর্যন্ত কাউকে রেহাই দেয়া হলো না। আবদুল করীমের ফেরার হওয়ার কারণে সবাইকে কঠিন শাস্তি দেয়া হলো। একজনকে মৃত্যুদণ্ডও দেয়া হলো। অনেক খোঁজাখুঁজি হলো। তদন্তের পর তদন্ত হলো। কিন্তু কেউ হদিস করতে পারলো না, আবদুল করীম কোন পথে জেল থেকে পালিয়েছে।
এক কয়েদির ফেরার হওয়ার ব্যাপারটা তো এমন গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়াবহ ব্যাপার ছিলো না। স্পেনিশ জেনারেলের সামনে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠাতেই আবদুল করীমের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গিয়েছিলো। কিন্তু কিছু দিন পর যখন জানা গেলো, সে কয়েদির ফেরার হওয়ার প্রেক্ষাপট মারাকেশের ইতিহাসের মোড় পাল্টে দেবে, তখন স্পেনিশদের আরো বেশি টনক নড়লো। তারা আবদুল করীমকে যে মামুলি গুরুত্ব দিয়েছিলো তাই ছিলো তাদের সবচেয়ে বড় ভুল এবং অমার্জনীয়ও।
***
আবদুল করীমের ব্যাপারে খবর পাওয়া গেলো যে, সে এক দুর্গম পাহাড়ি গিরিকরে স্বাধীনতাকামী মুক্তিযোদ্ধাদের হেডকোয়ার্টার ও ট্রেনিং ক্যাম্প খুলেছে। কিন্তু সেই পাহাড়ি উপত্যকা যে কোনটা সেটা শত চেষ্টা করেও স্পেনিশ আর্মি জানতে পারেনি বহু দিন।
আবদুল করীম অতি নিঃশব্দে এবং সুনিপুণ নেতৃত্বে এই আন্দোলনকে এমনভাবে পরিচালনা করলো যে, অল্প সময়েই অসংখ্য যোদ্ধা তার ঝাণ্ডাতলে এসে সমবেত হলো। এসব যোদ্ধারা ছিলো মারাকেশের সাধারণ নাগরিক। যারা দিনের পর দিন স্পেনিশ ও ফ্রান্সীয়দের গোলাবারুদের উত্তাপ সহ্য করেছে। বাপ ভাইদের নির্বিচারে মরতে দেখেছে। দেখেছে মা বোনদের সম্ভ্রমহানি ঘটাতে। নির্যাতন নিপীড়ন সইতে সইতে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এসবই মারাকেশের সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার অপ্রতিরোধ্য চেতনা জাগিয়ে তুলেছে।
সেনা ফ্রান্সী হোক বা স্পেনিশ হোক, তাদের একমাত্র টার্গেট ছিলো মারাকেশী মুসলমানরা। এই দুই সাম্রাজ্যবাদী দেশের সেনারা সেখানকার জনগণের সঙ্গে হিংস্র প্রাণীর মতো আচরণ করতো। সৈনিকরা ক্ষুধার্ত মানুষের খাবার কেড়ে নিতো। মজুর-শ্রমিকদের হাড়ভাঙ্গা পয়সা ছিনিয়ে নিতো। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মাঠে ঘাটে খেলতে বেরোলে মেরে কেটে তাড়িয়ে দিতো। এমনকি মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর ঔষধও ছিনিয়ে নিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়তো। তাহলে কেন মারাকেশী জনগণ সেই নরপিছাচদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে না? কেন জীবন বাজি রেখে দেশ দখলদার মুক্তি করতে ও স্বাধীনতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে না।
মারাকেশী যযাদ্ধাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিলো যেটা সেটা হলো, তাদের কাছে অস্ত্র ছিলো না। তারপর আবার তাদের লড়াই ছিলো একই সঙ্গে দুই পরাশক্তির সেনাদের বিরুদ্ধে। এক ফ্রান্সীয়, আরেকটা হলো স্পেনীয় সেনা।
ফ্রান্স তো বিশ্ব মিডিয়ায় এটা ছড়িয়ে রেখেছিলো যে, মারাকেশের আসল শাসন কর্তৃত্ব স্থানীয় মুসলমানদের হাতেই রয়েছে।
এক চুক্তির অধীনে মুলত: ফ্রান্সীয় সেনাবাহিনী মারাকেশের নিরাপত্তা ও শাসন সংস্কারের নামে মারাকেশে আস্তানা পেতে বসে। অজুহাত ছিলো মরুচারী বেদুইন জাতি বিদ্রোহী হয়ে সবসময় মারাকেশের সীমান্তে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে রাখতো। কখনো কখনো মারাকেশের অভ্যন্তরে তারা গেরিলা হামলা চালাতো। তাদের এ অজুহাত ঠিকই ছিলো। কিন্তু মারাকেশের মুসলমানদের শায়েস্তা করার জন্য গোপনে ফ্রান্স ও স্পেন অস্ত্রও সরবরাহ করতো। এভাবেই বেদুইনরা অস্ত্রশস্ত্রে শক্তিশারী হয়ে উঠে।
তারপর সেই বেদুইনরা যখন মারাকেশে গেরিলা আক্রমণ চালিয়ে সারা দেশে দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেয়, তখন ফ্রান্স ও স্পেনিশরা উড়ে আচে মারাকেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। এভাবে মারাকেশ দখল করে তাদের নিরাপত্তা কর্মসূচির পূর্ণাঙ্গতা দান করে।
