এই ভেবে মেজর ডগলাস গালালাকে বললেন।
এখানে বসে থেকে এক দিক দেখিয়ে দিলে তো হবে না। সামনে গিয়ে সঠিক দিক নির্ণয় করে এসো।
মেজরের মুখে তখন ধূর্তের হাসি খেলছিলো। অবশ্য মাইন ফিল্ডের রাস্তা ছাড়া মেজরের সামনে আর কোন রাস্তা ছিলো না। দুই দিকে ছিলো টিলার সারি। সেখান দিয়ে পাড়ি নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।
গালালা কোন কথা বললো না। মুখে এক টুকরো হাসি ঝুলিয়ে মাথা একদিকে কাত করলো। অর্থাৎ সে দেখে আসতে রাজি। গালালা সামনের দিকে হাঁটা শুরু করলো। গালালা কয়েক কদম যাওয়ার পর মেজর যমিনে হামাগুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, যেকোন সময় গালার পায়ের নিচ থেকে মাইন বিস্ফোরিত হবে। তখন মাইনের তীক্ষ্ম ব্লেডের টুকরো উড়ে এসে মেজরের গায়ে লাগতে পারে। কিন্তু এ জাতীয় কিছুই ঘটলো না। তিনি দেখলেন, গালালা নিচের দিকে তাকিয়ে কখনো ডান দিকে কখনো বাম দিকে যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে পাগুলো অনেক ওপরে উঠিয়ে আবার সাবধানে নিচে নামাচ্ছে। এভাবে দেড়শ দুইশ গজ গিয়ে আবার ফিরে আসতে লাগলো একটু ধূসর পথে।
গালালা মেজরের দিকে না এসে জিপের দিকে এগিয়ে গেলো অতি সহজ ভঙ্গিতে। যেন জিপের মধ্যে জরুরী কিছু একটা আছে। সেটা তার এখনই খুব দরকার। সামনের সিটের ওপর রিভলবার পড়েছিলো। পাশে পড়েছিলো গুলি ভরা কার্তুজের বাক্স।
এটা মেজরের ব্যক্তিগত রিভলবার। মেজর ভাবলেন, আব্দুল্লাহ গালালা হয়তো দরকারী কোন কিছুর জন্য জিপে উঠেছে। এজন্য তিনি যেভাবে ছিলেন সেভাবেই রইলেন। কিন্তু একটু পর খুটখাট আওয়াজ হলে উঠে বসলেন। দেখলেন, গালালা রিভলবারে গুলি ভরছে। কি ঘটছে প্রথমে তিনি হুতভম্ব হয়ে চেয়ে থেকে বুঝতে চেষ্টা করলেন। তারপর হন্তদন্ত হয়ে জিপের দিকে ছুটে গেলেন।
কিন্তু ততক্ষণে গালালা রিভলবারে ছয়টি গুলি ভরে ফেলেছে এবং তার নল মেজরের দিকে তাক করে কঠিন চোখে তাকিয়ে আছে। বৃটিশ ইন্টেলিজেন্সির এত বড় দুর্দান্ত অফিসার সামান্য এক বেদুইনের দিকে করুণা প্রার্থী চোখে তাকিয়ে রইলেন।
আমি একজন মানুষ, গাধা নই- আব্দুল্লাহ গালালা গম্ভীর গলায় বললো, তুমি আমাকে মেরে তোমার রাস্তা পরিষ্কার করতে চেয়েছিলে। সেখানে অসংখ্য মাইন ওঁৎ পেতে ছিলো আমার জন্য। ঝড়ের তান্ডবে সবগুলোর উপর থেকে বালি মাটি সরে গেছে। এজন্য আমি সাবধানে এগিয়ে আবার ফিরে আসতে পেরেছি।
না হয় এতক্ষণে আমার দেহটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতো। তোমাদের সাদা চামড়ার ইংরেজদের মত ধূর্ত শয়তান নই বলেই আমরা সবসময় ঠকে এসেছি। সাধারণ একটা গাধার মূল্যও তোমরা আমাদেরকে দিতে চাও না। আমি আমার অপমানের প্রতিশোধ নেবো। আর শুনে রেখো, মরুচারীরা যে তাদের গাধা দিয়ে মাইন ফিল্ড খুঁজে বের করে সেটা আমার অজানা নয়।
মেজর ডাগলাস নিজেকে কিছুটা সামনে নিয়েছিলেন। গালালার দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে অফিসারের মতো হুকুমের সুরে বললেন, রিভলবারটি দিয়ে দাও আমাকে।
আয় ফিরিঙ্গ, গালালার কণ্ঠ চিড়ে যেন চাবুক বেরিয়ে এলো, আমি তোমাদের নুন খেয়েছি এজন্যে তোমাকে হত্যা করবো না। মুসলমানরা তোমাদের মতো বেঈমান নয়। যদি পথ হারিয়ে মরে যাও আমাকে কেউ দোষ দিতে পারবে না। যাও, হাঁটতে থাকো। দাঁড়িয়ে থাকলে গুলি চালাবো আমি … যাও?
গালালার খুনি মূর্তি দেখে মেজর হাঁটতে শুরু করলেন। কয়েক কদম গিয়ে ফিরে গালালার কাছে অনুনয় বিনয় করতে লাগলো, সে যেন তাকে মাফ করে দেয় এবং জিপটি তাকে ছেড়ে দেয়।
গালালা বাতাসে ফায়ার করে বললো, হাঁটতে থাকো গাঁধা; আমাকে গাধা মনে করো না।
মেজর হাঁটা শুরু করলেন গোমরা মুখ করে। আর গালালা জিপের টায়ারগুলো ফুটো করে দিতে লাগলো। তারপর গালালা মেজরের যা কিছু ছিলো তা নিয়ে এক দিকে হাঁটা ধরলো।
মুসলমানদের আমরা যতটা নির্বোধ মনে করি, পরে ডাগলাস স্বীকার করেন। তারা আসলে ততটা নির্বোধ নয়। প্রয়োজনে আমাদের চেয়েও অনেক বিচক্ষণ। ওদের মধ্যে কৃতজ্ঞতাবোধও অনেক বেশি। সত্যি বলতে কি সেই বেদুইন আমাকে আসলে মানুষকে মানুষ হিসেবে ভাবতে শিক্ষা দিয়েছে।
সিংহ পুরুষ : অহিংস কাহিনী
সিংহ পুরুষ
অহিংস কাহিনী
১৯২২ সাল। মারাকেশ তখন গোলাম ছিলো। গোলাম ছিলো দুই সাম্রাজ্যবাদীর। মারাকেশের এক অংশ দখল করে রেখেছিলো স্পেনিশরা। আরেক অংশ দখল করে রেখেছিলো ফ্রান্সীয়রা। তবে বেশির ভাগ এলাকা ছিলো ফ্রান্সীয়দের দখলে।
১৯২২ সালের প্রথম দিকের কথা। মারাকেশের দক্ষিণাঞ্চলে স্পেনিশ ফৌজের একটি ক্যাম্প রয়েছে। সেখানে প্রায় এক হাজার সেনাবাহিনী রয়েছে। স্পেনিশ জেনারেল সেই ক্যাম্পে এক জরুরী কাজে গেলেন। স্পেনিশ সেই জেনারেলের নাম জেনারেল সেলিষ্টার।
জেনারেলের এই আগমন ছিলো আসলে ক্যাম্প পরিদর্শনের জন্য। এজন্য সেনা ও তাদের কমান্ডাররা বেশ সতর্ক এবং ফিটফাট হয়ে ছিলো। প্রত্যেক সৈন্য এবং ক্যাম্পের প্রতিটি কোন জেনারেলের পরিদর্শনের জন্য প্রস্তুত রাখা ছিলো। জেনারেল সেলিষ্টার ক্যাম্প পরিদর্শন করছিলেন।
আচমকা ক্যাম্পের ভেতর ছুটোছুটি শুরু হয়ে গেলো। ক্রমেই সেটা প্রলয়ের বিভীষিকায় রূপ নিলো। ক্যাম্পের ভেতর আসলে লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছিলো। হামলা করেছিলো মারাকেশের নির্যাতিত মুজাহিদরা। যাদের সংখ্যা ছিলো স্পেনিশ বাহিনীর দশ ভাগের এক ভাগ। মারাকেশের মুজাহিদদের অস্ত্র ছিলো লোহার লাঠি, তলোয়ার, বর্শা ও খঞ্জর। এগুলো দিয়ে তারা এমন এক সেনাবাহিনীর ওপর হামলা করলো, যাদের কাছে ছিলো অত্যাধুনিক রাইফেল, মেশিনগান, গ্রেনেড, দূরপাল্লার পিস্তল, ট্যাংক ও কামান।
