সিংহশাবক

১.১ প্রথম খণ্ড – ষড়যন্ত্র

সিংহশাবক / মূল : এনায়েতুল্লাহ আলতামাস / অনুবাদ : ফজলুদ্দীন শিবলী

ভূমিকা

বড়ই রোমাঞ্চকর সেই যুগ যে যুগে আজকের স্পেনে সবুজ চাঁদতারা নিশান উড়ত। সুন্দর, স্বপ্নীল ও বর্ণিল অনুভূতি নিয়ে কর্ডোভার মসজিদ কালের সাক্ষী হয়ে আজো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আলহামরার পোড়া ইট, বালুকণা আজ তারিকী তলোয়ারের স্মৃতি-রোমন্থন করে। গোয়াদেলকুইভার, জিব্রাল্টার প্রণালী, যাল্লাকা প্রান্তর, আলমেরিয়ার যমীন বুকে ধারণ করে আছে বীর মুসলিম জাতির অশ্বখুরের ছোঁয়া।

স্পেনের ইতিহাসের ধূসর পাতা খুললে সর্বাগ্রে মনে পড়ে সেই মহান বিজেতাদের অমিততেজা হিম্মতি উপাখ্যান, উপকূলে নেমে যারা জ্বেলে দিয়েছিলেন স্বদেশে ফেরার রণতরীগুলো। অপরিচিত দেশ, অচেনা মানুষ এমন কি আসমান-যমীনও যাদের কাছে বৈরী সেই মর্দে মুমিনদের এই দুঃসাহসিকতা দেখে ইউরোপিয়ান ঐতিহাসিকদের কলম পর্যন্ত স্তব্ধ হয়ে যায়।

মুসলিম জাতির বিজয় কেবল স্পেন ভূ-ভাগেই থেমে থাকেনি-সীমানা পেরিয়ে তা প্যারিস পর্যন্তও বিস্তৃত হয়। কুলাঙ্গার উমাইয়া খলীফা সুলায়মান ইবনে আবদুল মালিক তারিক বিন যিয়াদ ও মূসা ইবনে নুসায়েরের অগ্রাভিযানের মাঝপথে বাদ না সাধলে হয়ত আজকের ইউরোপের মানচিত্র অন্যভাবে আঁকতে হত।

মোটকথা স্পেন সেদিন একটি শক্তিধর মুসলিম রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। খোদাপাগল বিজেতাদের মৃত্যুর পর অবশ্য স্পেনের গদিতে এমন সব নীল ভ্রমরদের আবির্ভাব ঘটে যারা পূর্বসূরিদের রক্তমাখা উপাখ্যানগুলো গিলে খেতে থাকে। কেন্দ্রীয় খলীফার শাসনাধীন হয়েও এরা নিজেদের বাদশাহ ভাবতে শুরু করে। পতনের শুরুটা মূলত এখান থেকেই। পরবর্তী ইতিহাস আরো করুণ আরো বেদনাবিধুর।

খ্রিস্টানরা মুসলমানদের প্রজা ছিল। তাদের সব ধরনের নাগরিক সুবিধা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা ছিল। ইসলাম গ্রহণের জন্য তাদের ওপর জবরদস্তি করা হয়নি কোনদিনও। এদের যারা ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে-তারা নিজ উদ্যোগেই ইসলামের মহানুভবতায় আকর্ষিত হয়েছিল। কিন্তু ধর্মান্ধ, প্রতিক্রিয়াশীল, প্রতিহিংসাপরায়ণ, মৌলবাদী, গোড়া খ্রীস্টানরা উগ্রবাদী মনোভাব নিয়ে স্পেন ও মুসলমানদেরকে স্পেন ছাড়া করতে আদা নুন খেয়ে ময়দানে নামে। এই শয়তানী লক্ষ্যে হেন কাজ নেই যা। তারা করেনি। এ জন্য তারা তাদের সুন্দরী মেয়েদেরকে আমীর-ওমরাদের প্রাসাদে পাঠিয়েছে। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তাদের শয্যাসঙ্গিনী হয়ে এরা ধোকা, ষড়যন্ত্র ও বিদ্রোহে অদৃষ্টপূর্ব ভূমিকা রেখেছে। এই কূলটা নারীরাই সেদিনের স্পেনে মুসলিম প্রশাসনের জন্য কালনাগিনী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দাগাবাজ বিদ্রোহী খ্রীষ্টানরা ফ্রান্সসহ ইউরোপের অন্যান্য শাসকবর্গ থেকে মদদ পেতো।

বিধর্মীরা মুসলিম স্পেনকে যতটা না ক্ষতি করেছে তার চেয়ে অধিক ক্ষতি করেছে বিলাসী নারীলোভী ও মদ্যপ রাজা-বাদশাহরা। বক্ষ্যমান বইয়ে আমি স্রেফ এমন এক আমীরের কাহিনী তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। আমার লেখার উপজীব্য হচ্ছে রাজধানী কর্ডোভর হেরেমে ঠাই পাওয়া চাটুকারদের ষড়যন্ত্র ও হেরেমের বাইরের এলোগেইছ ও জোরা কাহিনী। ৮ম খ্রীষ্টাব্দের স্পেনের আমীর ছিলেন দ্বিতীয় আঃ রহমান। ওই সময় কিছু সিংহশাবক গাঁটে গামছা বেঁধে নেমেছিলেন আন্তর্জার্তিক ও অভ্যন্তরীণ শত্রু থেকে স্পেনকে বাঁচাতে। এরা স্রেফ স্পেন নয় বাঁচিয়েছিলেন আঃ রহমানকেও।

আমাদের কাহিনীকাররা ফ্লোরাকে কোন না কোন মুসলিম শাসকের হেরেমের হীরা সাব্যস্ত করেছেন। তাকে নিয়ে রোমাঞ্চকর উপাখ্যান তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাস্তব এর উল্টো। ফ্লোরা কোনদিনও মুসলিম হেরেমে কারো শয্যাসঙ্গিনী হয়নি।

সবশেষ কথা হলো এটি উপন্যাস, ইতিহাসনির্ভর। ঘটনা সত্য। কাল্পনিকতা স্রেফ সাহিত্যের উপস্থাপনে, মৌলিকতায় নয়। হায়! এ যুগের শাসকবর্গ ও আগামী দিনের শাসকবর্গ যদি এ থেকে সবক নিতেন।

.

প্রথম খণ্ড – ষড়যন্ত্র

৮২৫ খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকের কথা। আজকের স্পেনে সেদিন মুসলিম শাসন ছিল। ওই সময় পর্তুগালও মুসলিম শাসনাধীনে ছিল। ওই সময়কার ফ্রান্সের সম্রাট ছিলেন সুই। একদিন তিনি রাজ দরবারে উপবিষ্ট। তার পাশেই গোথ মুর্চের রাজা ব্রেন হার্ট ও কর্ডোভার এলোগেইছ নামী প্রভাবশালী খ্রীস্টান। সারিবদ্ধ চেয়ারে উপবিষ্ট যথাক্রমে মন্ত্রী ও দু জেনারেল।

এলোগেইছ। সম্রাট লুই শাহী কণ্ঠে বলেন, স্পেনে সরকারীভাবে কোন পদমর্যাদা নেই জেনে সিদ্ধান্তহীনতায় পড়েছিলাম যে, তোমাকে সাক্ষাতের অনুমতি দেব কিনা। কিন্তু এক্ষণে বুঝলাম, তোমার মত লোকের সাক্ষ্য আমার কাছে খুবই জরুরী ও তাৎপর্যবহুল। আমার স্রেফ এটুকু নিশ্চিত হওয়া দরকার যে, তুমি মুসলিম গোয়েন্দা নও! আর তুমি আবেগপ্রবণ হয়ে আলাপ করতেও আসেনি। এক্ষণে প্রয়োজন কাজ ও শ্রমের; ত্যাগ-তিতিক্ষার মুহূর্তে আবেগ কোন কাজে আসেনা।

এলোগেইছ বলল, আমি মুসলিম নই-এ হয়ত মুখের ভাষা দিয়ে বোঝাতে পারব না। আপনার গোয়েন্দা যদি এতটা চৌকস ও সুনিপুণ হয় যতটা মুসলিম গোয়েন্দারা; তাহলে প্রস্তাবের উত্তর ত্যাগ-তিতিক্ষাক্ষণেই পেয়ে যাবেন।

তবুও আমি সতর্ক পদক্ষেপের পক্ষপাতী। আমি যেমন তোমাকে ভয় পাই না, তেমনি পাই না মুসলমানদেরও। বললেন টলুই।

আপনার বাপ-দাদাও সতর্ক পদক্ষেপের পক্ষপাতী ছিলেন যার ফলশ্রুতিতে স্পেনে মুসলিম শাসনের গৌরবময় এক শতাব্দী অতিবাহিত হয়ে গেছে। আপনি দেখছি পূর্বসূরীদের পদাংক অনুসরণ করে ফিরছেন। স্পেনে আমরা যেমন গোলামের জাতিতে পর্যসত ঠিক তেমনি আমাদের ধর্ষও। আপনার হৃদয়ে যদি ঈসা মসীহ এবং কুমারী মরিয়মের ভারাসা ও ইজত থাকত তাহলে আপনি এভাবে যত গুটিয়ে বসে থাকতে পারতেন না। তারপরও কি আপনি বলবেন, আমি আবেগ তাড়ি হয়ে এই সূদূরে ছুটে এসেছি? আমি মহৎ এক উদ্দেশ্যে এসেছি। সে উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত নয়। আপনার মত বিশাল বাহিনী আমার অধীন থাকলে মুসলমানদের স্পেনছাড়া করতে না পারলেও তাদের সুস্থে বসে থাকতে দিতাম না। ওদের লোকালয়ে গুপ্তহত্যা ও গেরিলা হামলা চালাতাম। শেষের দিকের কথাগুলো বলতে গিয়ে এলোগেইছএর চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠল।

আমরা তোমার চেতনার কদর করি এলোগেই। কিন্তু তোমার হয়ত জানা নেই যে, আরব মরুচারীদের পরাভূত করা দুঃসাধ্য। সম্রাট লুই বললেন।

তার মানে! কি বলতে চাইছেন আপনি? এলোগেইছে, কণ্ঠে বিস্ময়।

আমি বলতে চাচ্ছি, মুসলমানরা ধর্মীয় উদ্দীপনা নিয়ে লড়াই করে। আল্লাহর সন্তুষ্টিকয়ে ওরা দুশমনের বিরুদ্ধে লড়ে। ওরা মনে করে, খোদা নাকি ওদের সাথে কানে। এলোগেইছ। তুমি ওদের স্পেন বিজয়ের গোড়ার কথা যদি জেনে না থাক, তাহলে আমার থেকে শুনতে পার। ওরা সংখ্যায় ছিল হাজার সাতেক। স্পেন উপকূলে অবতরণ করেই ওরা ওদের রণতরীগুলোয় আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল যাতে কারো মনে পলায়ন করার মানসিকতা জেঁকে না বসে। তুমি হয়ত বাহিনী গড়তে পারবে কিন্তু এই চেতনা পাবে কোথায়? এই চেতনা-ই ওদের স্পেন বিজয়ে সহায়তা করেছিল সেদিন। ওদের ঘোড়া যেখানেই যেত সেখানেই বিজয়ী পতাকা উড্ডীন হত। কোন অভিযানেই ওরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেনি। খুব সম্ভব ফ্রান্স ওদের হাত থেকে রেহাই পাবে না। ফ্রান্স বিজয় করে ও স্পেনের সীমানা বাড়াতে চাইবে। থামলেন সম্রাট লুই।

আপনি ওদের এই অগ্রযাত্রা রোখার কোন উদ্যোগ নেবেন না? আমি তো ওদের পায়ের তলার যমীনও ছিনিয়ে নিতে পরিকল্পনা সেধেছি। শেন মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণার মত বাহিনীও তৈরী করছি। এলোগেইছ বললেন।

আমাদের মেহমানের কি জানা নেই যে, এ পর্যন্ত কি পরিমাণ খ্রীস্টান মুসলমান হয়েছে? বলে সম্রাট লুই মন্ত্রী কেনেথের দিকে তাকালেন, ওরা পাকা মুসলমান বনে গেছে। ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে ওরা কান দেবে না। তনুমন দিয়েই ওরা ইসলাম গ্রহণ করেছে।

এলোগেইছের ঠোঁটে পরিধি বাড়ান মুচকি হাসিফুটে উঠল। তিনি রাজ দরবারে উপবিষ্ট জনের প্রতি তাকিয়ে নিলেন। বললেন, জানি সে কথা। কিন্তু আপনি হয়ত জানেন না, ওদের আমি হাত করে নিয়েছি ইতোমধ্যে। বেশক ওরা মুসলমান। মসজিদে নামায পড়ে, রোজাও রাখে। কিন্তু ওদের মন মীনার থেকে কুশ-চেতনা মোছেনি। ওরা পূর্বেকার মত খ্রীস্টান-ই রয়ে গেছে। কারণ, আরব্য মুসলমানরা প্রথম শ্ৰেণীর নাগরিক আর নও মুসলিম খ্রীস্টানরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। ওদের ব্যবহার-ই এই শ্রেণী বৈষম্যে বাধ্য করেছে। এটাই আমাদের জন্য প্লাস পয়েন্ট। ও নও মুসলিমদের ধোঁকা দিয়ে চলেছে। ওরা নামায পড়লেও তলে তলে মুসলিম শেকড় কেটে চলেছে। ওদের একজন জাদরেল নেতা দরকার। দরকার কোন খ্রীষ্ট শামরে মদদ। মদদ দ্বারা উদ্দেশ্য, ফৌজি মদদ।

সম্রাট লুই এলোগেইছের কথায় নিশ্চিত হলেন যে, লোকটা মুসলমানদের গোয়েন্দা নয়। এই উদ্দেশ্য মনে মনে পুষে আসছেন তিনি। এই একটা চিন্তা-ই তাকে ততদিন কুরে কুরে খেয়েছে। কেননা, মুসলিম জাতির অগ্রযাত্রা প্রতিরোধ না করা গেলে একদিন গোটা ইউরোপে ইসলাম ছড়িয়ে পড়বে।

এলোগেইছ! সম্রাট লুই বললেন, তুমি নিজকে একাকী ভেবো না। আমি বলেছি, ওদের সাথে সম্মুখ সমরে পেরে ওঠা যাবে না। এর মতলব এই নয় আমি হাতমুখ গুটিয়ে বসে থাকব। গোথ মুর্চের রাজা নে হার্টকে বিশেষ এক উদ্দেশ্যে ডেকে পাঠিয়েছি। মুসলিম শাসনের প্রোথিত শেকড় আমাকে ভূ-গর্ভে গিয়েই কাটতে হবে। দ্বিতীয় আব্দুর রহমান এখন শেনের শাসক। গুপ্তচর মারফত জেনেছি তার প্রকৃতি, জেনেছি তার চারিত্রিক দুর্বলতার দিকগুলো। বাস্তবিকই তিনি যুদ্ধংদেহী। লড়াই করা ও কানোত অদ্বিতীয় তিনি। তার হৃদয়ে ধর্মোদ্দীপনা টইটম্বুর। স্পেনের সীমা বৃদ্ধিকল্পে তিনি নানান পরিকল্পনার জাল বুনছেন। জ্ঞান-গরিমায়ও কমতি নেই। তাঁর বাবা আল-হাকাম স্পেনের বেশ ক্ষতি করেছেন। বিলাস ও ইন্দ্রিয়পরায়ণ হিসেবে তিনি যথেষ্ট দুর্নাম কুড়িয়েছেন। তোষামোদ ও চাটুকারদের জন্য উজাড় করে দিয়েছিলেন রাজকোষ। কিন্তু আবদুর রহমান ভিন্ন ধাতুর। তার বাবা মুসলিম স্পেনের যে ক্ষতি সাধন করেছিলেন আবদুর রহমান তা পুষিয়ে দিতে চাইছেন।

এতদসত্ত্বেও তার চরিত্রের একটা দিক খুবই দুর্বল। সংগীত ও নারীর প্রতি তার রয়েছে অগাধ আকর্ষণ। রণাঙ্গন থেমে বিমুখ করতে ওই দুটো অস্ত্র আমাদের প্রয়োগ করতে হবে। এলোগেইছ যাও! চেতনা ও আবেগ দুটোই পুঁজি করে বেরিয়ে পড়। জানি, তুমি বেছে বেছে এক একটা মুসলমানকে হত্যা করতে চাইছ। ফলে একদিন সম্মুখ সমরে লড়াই। যার পরিণতিতে আমরা চরম মার খাব। কিছু একটা যদি করতেই চাও তাহলে ওদের দুর্বল দিকগুলো আরো দুর্বলতর করে তোল। বললেন সম্রাট লুই।

কিন্তু তা কি করে? প্রশ্ন এলোগেইছের।

সম্রাট লুই মন্ত্রী কেনেথের দিকে নজর বুলান। উতয়ে কেবল মুচকি হাসেন। মন্ত্রী বললেন, আমাদের প্রিয় দোস্ত। তুমি একজন আবদুর রহমানকে হত্যা করলে আরেক অবদুর রহমান ক্ষমতায় বসে হাজার খ্রীস্টানকে হত্যা করবে। সকলের প্রগাঢ় ধারণা জম্মাবে, খ্রীস্টানরাই আবদুর রহমানকে হত্যা করেছে। হয়ত শাসকের মৃত্যুর পর এমনও লোক ক্ষমতায় বসতে পারে, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে যে পাকা মুসলিম আর চারিত্রিক দুর্বলতার ঊর্ধ্বে। আবদুর রহমানের নারীর প্রতি এতই মোহ যে, বাঁদী থেকে এক মহিলাকে রাজরাণী করেছেন বলে শুনেছি। তার হেরেমে এমনও তুবন মোহিনী রয়েছে যাদেরকে তুমি হীরের টুকরো বলতে পার। এরা সবাই তারই রঙে রঙীন। তার হেরেম এমন এক নারীকে টোপ দেয়া যেতে পারে, যে তার ওপর প্রভাব বিস্তার করবে। এমন এক নারীও ইতোমধ্যে আমি নির্বাচন করে ফেলছি।

সে মুসলমান, না খ্রীস্টান?

নামকাওয়াস্তে মুসলমান। মন্ত্রী কেনেথ বললেন, এ ধরনের মহিলাদের কোন ধর্মকর্ম থাকে না। তুমি হয়ত জানে, স্পেনে তুরুব নামে একটি জায়গীর রয়েছে। জায়গীরদার মারা গেছে। তার একটি মেয়ে আছে। সুলতানা তার নাম। জুবের রাণী হিসেবে তার পরিচয়। গুপ্তচর মারফত যতদূর জানতে পেরেছি, সে তুরুব-সীমান্ত সম্প্রসারণ করতে নিজস্ব রূপ-যৌবনকে সওদা বানিয়ে চলেছে। কথিত আছে, সে খুবই

চৌকস ও বুদ্ধিমতী। ভুবনমোহিনী শাহাদীরা পর্যন্ত তার অঙ্গুলী হেলনে নেচে থাকে। তার সৌম্যকান্তি অনিন্দ্য সুন্দর দেহবল্পরীত স্বর্গের অপ্সরা না বলে উপায় নেই। দ্বিতীয় আবদুর রহমানের নষর এখনও তার প্রতি পুড়েনি। তুমি যদি পরিকল্পনা মোতাবেক তোমার মিশন এগিয়ে নিতে চাও তাহলে তাকে বাগে এনে তুরুবের মত আরেকটি জায়গীর প্রাপ্তির টোপে তাকে দলভুক্ত করে কাজে লাগাতে পার। তার স্পর্শকাতর্ব দিকে এভাবে টোকা মারতে পারো যে, সামান্য ভূ-সম্পত্তির কন্যা হয়েও তুমি আজ রাণী হিসেবে পরিচিত। সে রাণী হতে চায়। আমরা তাকে রাণী বানাব…… কি পারবে তুমি এ কাজ করতে?

পারব না মানে! আলবৎ পারবো, সরাসরি তার সাথে কথা বলব। বললেন এলোগেইছ।

আমি এও শুনেছি, আবদুর রহমান সংগীতানুরাগী। বললেন সম্রাট লুই, তাঁর দরবারে যিরাব নামে জনৈক সংগীতজ্ঞ আছে। যদি সুলতানা তার সাথে একযোগে কাজ করতে পারে তাহলে কার্যসিদ্ধি ত্বরিৎ অর্জন করতে পার।

কার্যোদ্ধার যদি এতেই নিহিত মনে করেন তবে আমি তাই করব। ভবে তলোয়ারের আশ্রয় না নিয়ে লুকোচুরি খেলায় মশগুল হওয়াকে আমি কাপুরুষতা মনে করি।

আমাদের উদ্দেশ্য কি মিঃ এলোগেইছ? মন্ত্রী কেনেথ প্রশ্ন করেন, ইউরোপকে মুসলিম শূন্য করা-এই তো! আর খ্রস্টের শিক্ষা গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া। মুসলিম শক্তির ভিত্তিমূলে আঘাত করতে হবে। ওদের ধর্মোদ্দীপনার ভিত্তি নড়বড়ে করে দিতে হবে। আমাদের নারীরা এ কাজে মোক্ষম হাতিয়ার। তারা যে কোন ত্যাগ স্বীকারে অকুণ্ঠ। দুশমনকে কুপোকাত করতে যে কোন কাজ-ই জায়েজ। খোদা না করুন, এদের প্রতিহত করতে না পারলে সেদিন বেশী দূরে নয় যেদিন গোটা ইউরোপে মুসলিম পতাকা পতপত করে উড়বে।

ইসলামকে আমরা মুসলিম রাজা-বাদশাদের মাধ্যমেই কমযোর করে দেব। আমাদের যুবতী নারী ও সংগীতজ্ঞরা আবদুর রহমানের ওপর প্রভাব বিত্তার করতে পারলে ব্রেনহার্ট গোটা স্পেন সীমান্তে গুহামলা ও গেরিলা আক্রমণ শুরু করে দেবে। তুমি স্পেনে বিদ্রোহের শ্রগিরি উদগীরণ করো। এই মহতি অভিযানে দুমি নিঃসঙ্গ নও বন্ধু। তোমার সাথে ছায়ার মত আছি আমরাও। বললেন সম্রাট লুই। দরুবার ওদিনের মত মুলতবি ঘোষণা করা হল।

***

যে সময় ফ্রান্সের রাজপ্রাসাদে স্পেন পতনের নীল-নকশা প্রণয়ন করা হলি এর থেকে ১১৪বছর পূর্বে মাত্র হাজার সাতেক ফৌজ নিয়ে তারিক বিন যিয়াদ স্পেন উপকূলে নোর স্করেছিলেন। জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন তৎক্ষণাৎ তার রণতরীগুলো, যাতে কারো মনে প্রত্যাবর্তনের খেয়াল না চাপে। সমর ইতিহাসে সম্ভবত: এমন নজীর আর নেই। রণতরীতে আগুন লাগিয়ে ইবনে যিয়াদ যে বক্তব্য রেখেছিলেন, আরবী ইতিহাসের বইগুলোতে হুবহু সে শব্দগুলো লিপিবদ্ধ আছে।

তিনি বলেছিলেন,

শহীদী কাফেলার সাথীরা আমার! রণাঙ্গন থেকে পালানোর মূলযান জ্বালিয়ে দেয়া হল। তোমাদের অগ্রে দুশমন আর পশ্চাতে সুবিশাল ভূ-মধ্যসাগর। সততা, ধৈর্য ও সমই এক্ষণের সম্বল তোমাদের। স্পেন উপকূলে তোমরা ঠিক কৃপণের দস্তরখানে বসা এতিমের মত। সামান্যতম ভীরুতা নাস্তানাবুদ করে দেবে তোমাদের অস্তিত্ব। এমন এক বাহিনীর সম্মুখীন হতে যাচ্ছ তোমরা, যাদের ভাণ্ডারের অস্ত্র ও ফৌজ অফুরন্ত পক্ষান্তরে সামান্য কয়েকটি তলোয়ার-ই তোমাদের ভরসা। রসদ হাসিল করার জন্য রয়েছে ওদের হাজারো মাধ্যম। খোদা না করুন তোমরা অমিততেজা হিম্মত ও কালজয়ী বীরত্ব প্রদর্শন না করলে মুসলিম ঐতিহ্য ধূলি ধূসরিত হবার পাশাপাশি দুশমনের দুঃসাহসিকতায় প্রবৃদ্ধি আসবে। এক্ষণে ইজ্জত ও ইসলামের মান রক্ষার একমাত্র পন্থা হলো, যে দুশমনকে তোমরা মোকাবেলায় পাচ্ছে তাদের ওপর টর্নেডোর বিভীষিকা বিস্তার করে ওদের শক্তিবাহু দুর্বল করে দিও।

এমন কোন বিষয় থেকে তোমাদের অভয় দিচ্ছি না, খোদ আমি নিজেই যে ব্যাপারে ভীতসন্ত্রস্ত। এমন সরেযমীনে তোমাদেরকে শত্রুর মুখোমুখি করছি না, আমি যেখানে লড়ব না। আমীরুল মুমীনুন ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক তোমাদের মত তারুণ্যের অহংকারীদের এজন্য নির্বাচন করেছেন, যাতে তোমরা স্পেন সম্রাটের জামাতা হতে পার। এখানকার শাহ-সওয়ারদের কচুকাটা করতে পারলে দেখবে খোদা ও তাঁর রাসূলের বিধান কায়েম হয়ে গেছে। যে বধ্যভূমিতে তোমাদের ডাকছি, সে ভূমির দিকে সর্বপ্রথম যাত্রী খোদ আমি-ই। দুশমন ধেয়ে এলে যাকে সর্বাগ্রে তাদের মোকাবেলায় এগিয়ে যেতে দেখবে, সে আমিই। দুশমনের রক্তে যার তলোয়ার সর্বপ্রথম স্নান করবে সে তলোয়ার আমারই। আমি শহীদ হলে তোমরা আমার অন্য কাউকে সেনাপতি নিযুক্ত করো তবুও খোদার রাহা হতে পিছপা হবো না। স্পেন বিজয় না হওয়া পর্যন্ত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে না।

তারিক বিন যিয়াদ যে স্থানটিতে ভাষণ দিয়েছিলেন ইতিহাস একে জাবালুততারেক জিব্রাল্টার নামে নামকরণ করেছে।

ওই সাত হাজার মর্দে মুজাহিদ-ই আজকের স্পেনকে জয় করেছিলেন। ইতিপূর্বে রোমানরা একে জয় করেছিল তারা এর নাম দিয়েছেন হেম্পেনিয়া। পরবর্তীতে এই উপদ্বীপকে জার্মানীরা জয় করে এর আন্দালাস নাম রাখে। ৭১১ হিজরীতে তারিক বিন যিয়াদের নারা বুলন্দ হবার পাশাপাশি আযান ধ্বনি উচ্চকিত হলে এদেশকে আন্দালুসিয়া বলা হতে থাকে। বদলে যায় এর পাহাড়, নদী-নালা, খাল-বিল ও শহরের নামও। এখানকার পুরানো তাহযীব-তামাদুন বদলে এক নয়া কালচারের উন্মেষ ঘটায়। এই নয়া সংস্কৃতি মানুষকে ইসলাম ধর্মে টানতে উৎসাহ যোগায়। আলহামরা ও কর্ডোভার মসজিদ আজও কালের সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যদিও বন্ধ হয়ে গেছে আযান দেয়ার কষ্ঠ চিরদিনের তরে।

এই সাত হাজার মুজাহিদ ওখানকার ক্ষমতা দখল করতে যাননি, গিয়েছিলেন আল্লাহর যমীনে আল্লাহর রাজ কায়েম করতে। এঁদের কতজন শহীদ হয়েছিলেন, কতজন আজীবন পঙ্গুত্বের জ্বালা সয়েছিলেন-ইতিহাস এ ব্যাপারে খামোশ হলেও কল্পনা খামোশ থাকেনি। জ্ঞানীমাত্রই অনুধাবন করতে পারেন কি পরিমাণ রক্তস্রোত বয়ে গিয়েছিল। স্পেনের মাটি তাদের হাড়মাংস খেয়ে ফেলছে। এরাই তারা যারা বুকের তাজা খুন নযরানা দিয়ে দ্বীনের মশাল জ্বেলে দিয়েছিল।

***

তারিক বিন যিয়াদ একদিন এ জগতের সফর শেষ করেন। এরপর এক শতাব্দী অতিবাহিত হয়ে যায়। এ সময় স্পেন-তখতে এমনও শাসক আসেন যারা মন-মীনার হতে তারিক ও তার জানবার্য সঙ্গীদের চেতনা মুছে ফেলেন। যে সব আত্মোৎসর্গী মুজাহিদ কলজের ঘামে এ দেশের বৃক্ষলতাকে রক্তস্নাত করেছিল, এরা তাকে অপকর্মের কালিতে কলংকিত করে। খোদার রাজত্বের স্থলে মানবের রাজত্ব শুরু হয়। যে দরবারে একদিন আদল-ইনসাফ হতো, সঙ্গীত ও নৃত্যশিল্পীদের কোমর দোলানো নাচে সে দরবার রিনিঝিনি করে উঠল। চাটুকারদের ভীড়ে রাজ দরবার টইটম্বুর হয়ে গেল। আমীর-ওমরারা চাটুকারদের ভাষায় কথা বলতে লাগল।

৮২২ খ্রীস্টাব্দে এমন এক বাদশাহর মৃত্যু হল আল-হাকাম যার নাম। ইতিহাস কালের সাক্ষী, তিনি রাজতন্ত্র ও হেন জুলম নেই যা বাকী রেখেছিলেন। একদিকে তিনি যেমন জনমতের তোয়াক্কা করেননি তেমনি ধার ধারেননি তাদের জান-মাল এস্তেমালের। গদীরক্ষার স্বার্থে স্রেফ দুএকজন নয়, হাজারও জনতার খুন বহাতে ন্যূনতম কার্পণ্য করেননি তিনি। মনে চাইলে মানুষের জমি-জিরাত বাজেয়াপ্ত করতেন। তার জুলুম নিপীড়নের তালিকা থেকে দ্বীনী আলিম ও মুফতীয়ানে কেরামও বাদ যাননি। রাজতন্ত্র কায়েমের ইবলিসী নেশায় তিনি হেন যড়যন্ত্র ও কূট-কৌশল নেই যা করেননি। মোটকথা আল হাকামের যুগ ছিল জুলুম ও বর্বরতার যুগ। রাজার সংবিধান ছিল তার জিহ্বা-ই।

আল-হাকামের যুগে অর্জিত বিজয়ে আম-জনতার রক্ত বইলেও তার খান্দানের কারো ফোঁটা রক্তও ঝরেনি। তিনি জানতেন না, এদেশের প্রাথমিক দিকের বিজেতারা কি পরিমাণ ত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছিল। যেহেতু তিনি জানতেন না, সেহেতু এর মর্যাদা দেননি কোনদিনও। রাজার মৃত্যু হলে পুত্র ক্ষমতার মসনদে বসে যেত। মসনদে বসতে গিয়ে কেউ এ উপলব্ধি করেন যে, এদেশ জয় করতে এসে মুজাহিদবৃন্দ তাদের রণতরীগুলোয় আগুন ধরিয়েছিলেন। তারা তাদের চেতনা হাতে কলমে বাস্তবায়িত করেই দেখিয়েছিলেন।

কোন দেশের মান-মর্যাদা বাস্তবিকপক্ষে তারা-ই দিতে জানে, যারা ওই দেশ জয় করতে বুকের খুন ন্যরানা দিয়ে থাকে। বিজিত দেশে যারা রক্তপাহীন ঝঞ্ঝাটমুক্ত শাসনের অধিকারী হয়, তারা নিজকে রাজা আর অধীনস্থদের প্রজা ঠাওরায়। দরবারে চাটুকারদের ঠাই দেয়। আর এদের দৃষ্টি কেবল নাকের ডগা অবধিই থাকে। ইতিহাস তো তাই বলে আসছে, বলছে, এমন কি ভবিষ্যতে বলবে। এরাই দেশ ও জাতির অবক্ষয়ের মাধ্যম। ওদের হাতে দেশ, জাতি ও স্বাধীনতা কিছুই নিরাপদ নয়। স্পেনের গ্রানাডা ট্রাজেডি এ ধরনের বিকারগ্রস্ত আমীর-ওমরাদের দ্বারাই হয়েছিল সেদিন।

***

আল-হাকামের মৃত্যুর পর তার পুত্র দ্বিতীয় আবদুর রহমান ৩১ বছর বয়সে ক্ষমতাসীন হন। ইতিহাস কালের সাক্ষী হয়ে নীরব ভাষায় বলে চলেছে, তাঁর দরবারে কাব্য, সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্য ও বুদ্ধিচর্চার চাটুকারদের এতটা ভীড় ছিল যতটা দেখা যায়নি অন্য কোন শাসকের কালে। আবদুর রহমানের প্রাসাদ যেখানেই স্থানান্তরিত হত সেখানেই রঙ্গ-রসের আসর জমত। তিনি একদিকে যেমন তলোয়ারবাজ রণ নিপুণ ছিলেন তেমনি ছিলেন নারীর প্রতি চরম আসক্ত। মহলে তিন নারী তার জন্য প্রাণোৎসর্গী ছিল। এরা তিনজনই বাদী। এরা প্রত্যেকেই ভুবন মোহিনী কেউ কারো চেয়ে কম নয়। তম্মধ্যে একজনের নাম মোদাচ্ছেরা। আবদুর রহমান তার সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হয়ে বিবাহ-ই করে ফেলেন। দ্বিতীয় জনের নাম জারিয়াহ আর শেষোক্ত জন শেফা। গান-বাজনার মুহূর্তে এরা আবদুর রহমানের পাশ ঘেঁষে বসে থাকত।

এরপর তার দৃষ্টি এক সময় সুলতানার ওপর পড়ে। সুলতানার অনিন্দ্য সুন্দর মুখ ও নিটোল দেহবল্লরীতে যাদুর কারিশমা। আবদুর রহমান স্তম্ভিত হয়ে যান। তিনি ভেবে পান না যে, তার দেশে এমনও রূপের রাণী বর্তমান। কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন না যে, সুলতানা নিজে আসেনি তাকে আনা হয়েছে।

স্পেনের অন্যান্য রাতের মত একটি রাত। আবদুর রহমানের প্রাসাদে সংগীতের সুর-মূৰ্ছনা। সংগীত সম্রাট যিরাবের সুনিপুণ বাদ্যযন্ত্রে সম্মোহনী টান। জারিয়া তার পার্শ্বে উপবিষ্ট। বাঁশির সুরে দ্বিতীয় আবদুর রহমান এতটা নিমগ্ন যে, তিনি ঠাহর করতে পারছেন না। তিনি স্পেনের বাদশাহ। তিনি ঠিক তখনই বিলাসিতায় নাক অবধি ডুবছেন যখন তার প্রাসাদ ঘিরে ক্রুসেডের ষড়যন্ত্রজাল। তিনি ভুলে গেছেন যে, তাকে ইসলামের সুমহান দাওয়াত নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। অন্ধকার ইউরোপে হকের মশাল জ্বালাতে হবে, যাতে নিপীড়িত মানবতার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সিংহশাবক

ইসলামী খেলাফতের এই আমীর তার বাবার মত নিজকে একজন স্বাধীন রাজা মনে করতেন এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিভোর না থেকে সংগীত চর্চায় মেতে ওঠেন।

একদিন তুরুবের প্রাসাদে জনৈক দরবেশ প্রবেশ করলেন। এই দরবেশকে ইতিপূর্বেও সুলতানা তার মহলের আশেপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখেছেন। একবার সুলতানা তার গতিরোধ করে পথিমধ্যে দাঁড়িয়ে গিয়াছিলেন। সুলতানা শুভ্র ঘোড়া গাড়ীতে সওয়ারকালীন ওই দরবেশকে পথ চলতে দেখে সখীকে বলেছিলেন, মনে হচ্ছে বেটা কোন সেঁক খাওয়া প্রেমিক। কতবার এপথে তাকে চলতে দেখেছি।

মনে হচ্ছে লোকটা ভিক্ষুক। সখি বলেছিল।

না। সুলতানা বললেন। ভিক্ষুক নয়? তার চেহারায় এক ধরনের আভিজাত্য রয়েছে যা তাকে অভিজাত বলেই মনে হতে বাধ্য করে। চোখে-মুখে বুদ্ধির রেশ। পুরুষের চেহারা শনাক্ত করতে আমি কখনই ভুল করি না।

সখী মুচকি হেসে বলেন, দরবেশ হোক আর সপ্ত মহাদেশের বাদশাহ হোক, তোমার রূপ-লাবণ্যের সম্মোহন সকলের তরে সমান।

সুলতানা ঘাড় কাত করে তার দিকে তাকালেন। দরবেশ পূর্বস্থানেই দণ্ডায়মান। তার দৃষ্টি সুলতানার ঘোড়ার গাড়ীকে লেহন করছে। এ যেন টিকটিকির চুপিসারে আসামী অনুসরণ। সুলতানার গাড়ী এগিয়ে চলছে। সূর্য ডুবু ডুবু ভাব। দরবেশ পূর্বস্থানে দাঁড়ান। প্রত্যাবর্তনের পথে তাকে দেখে সুলতানা চমকে ওঠেন। তিনি গাড়ী থামান। ইশারায় তাকে কাছে ডাকেন। দরবেশের চোখের রঙ নীল, দেহ বাদামী, দাড়ি আধাপাকা।

তোমাকে আমি কয়েকবার দেখেছি, সুলতানা বললেন, আমাকে যেভাবে পর্যবেক্ষণ কর সেভাবে কি প্রত্যেক নারীকেই পর্যবেক্ষণ কর?

দুনিয়ার কিছু নারী সুলতানার চেয়ে সুন্দরী হলেও ভোমার সৌন্দর্য কিছুটা ভিন্ন। অন্যের সৌন্দর্য চোখ ঝলসে দেয় আর তোমারটা হৃদয়ে উষ্ণ পরশ বুলায়। আর যাদের রূপ-লাবণ্য হৃদয়ে টোকা মারে তারা পার্থিব নারীদের চেয়ে ভালো হবেই। দরবেশ বললেন।

নিছক আমাকে দেখার জন্যই কি আমার মহলের আশেপাশে ঘোরাফেরা করতে? প্রশ্ন সুলতানার।

হা! এর সাথে কিছু বলার জন্যও।

কি বলার জন্যে?

যাদের দৃষ্টি তোমাকে লেহন করছে ওই দর্শকদের সামনে দরবেশ তোমাকে কিছু বলতে পারে? দেখ রাণী! পথে পথে লোক তোমাকে কি ভালবাসা ও শ্রদ্ধার চোখে দেখে। আমি তোমাকে এমন পথ দেখাতে চাই যে পথে দৰ্শককুল কেবল তোমার রূপসুধা পান করবে না বরং শ্রদ্ধায় মস্তকাবনতও করবে। সুলতানার জন্য স্পেনের সিংহাসন অপেক্ষমান।

তুমি যদি গণক হয়ে থাক এবং আগামী দিনের কথা আগাম বলে দিতে সক্ষম হও তাহলে আজকের রাতটা আমার মহলে থেকে যাও। দারোয়ান তোমায় রুখবে না।

রাতের বেলায় দারোয়ান রুখা তো দূরে থাক বরং সসম্মানে সুলতানার কামরায়, পৌঁছে ছিল। এই কামরায় সাধারণত সুলতানা ছাড়া আর কারো প্রবেশের অনুমতি নেই। সুলতানা অর্ধনগ্ন মিহি রেশমী পোশক আচ্ছাদিত। পিঠে আছড়ে পড়া একরাশ কেশ ওই রেশমের চেয়েও মোলায়েম। ঝাড়-ফানুসের আলোয় তার রূপটা গোটা কক্ষকে আরো উজ্জ্বল করে তুলছে। সুলতানা উত্থিত যৌবনা। তার কণ্ঠে সংগীতের সুরলহরী। চাল-চলন যাদুকরী। কথন-বচন গভীর। হাসিতে শরাবের মাদকতা।

ইতিহাস লেখে, খোদা তাকে যেমন রূপ-যৌবন দিয়েছিলেন তেমনি দিয়েছিলেন মেধা ও বিচক্ষণতা। ছুটন্ত চঞ্চল হরিণীর ক্ষিপ্রতা। চোখে প্রেম ও আকর্ষণের অধীর চাহনি। পক্ষান্তরে তিনি ছিলেন প্রতারক ও শ। তিনি আপনার মূল্যায়ন জানতেন এবং পুরুষকে হাত করার কৌশল রপ্ত করেছিলেন। রূপের দরিয়ায় ঝড় তুলে বীর পুরুষকে কুপোকাত করতে তার জুড়ি নেই।

দরবেশ এই অপ্সরাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ শেষে চেহারায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন।

তুমি কি করে বললে, স্পেনের সিংহাসন আমার জন্য অপেক্ষমান? সুলতানা প্রশ্ন করেন।

এটি রূহের জগতের কথা রাণী! আমি যদুর জানি, আপনি রাণী হওয়ার ব্যাপারে প্রচণ্ড আশাবাদী। কিন্তু কোন পন্থা খুঁজে পাচ্ছেন না। তাছাড়া অদ্যাবধি এমন কাউকে পাননি, যে আপনাকে দিতে পারে সে পথের সন্ধান। দরবেশ বললেন।

তুমি সে পথ দেখতে পারলে আমার অর্ধেকটা জায়গীর তোমায় এনাম দেব।

এনাম চাই না রাণী। খাজানা আমার চারপাশে অঢেল। কিন্তু সেটা আমার জন্য বেকার। আমি এ জগতের মানুষ নই। নই জ্যোতিষী, বরং আমি গণক। স্পেনরাজ দ্বিতীয় আবদুর রহমান তোমার পথ চেয়ে বললেন দরবেশ।

কিন্তু তিনি আমাকে দেখলেন কবে? শুনেছি জনাতিনেক পরমা সুন্দরী হেরেমে আটকা। আরও শুনেছি তিনি একজন পাক্কা মুসলমান ও দরবেশ প্রকৃতির যুদ্ধংদেহী। খুব সহব এজন্যই বুঝি তার কাছে আমার নামোচ্চারিত হয়নি আজো; সুলতানা বললেন। সুলতানার কণ্ঠে আকুতি ও খায়েশের সুর।

ইতিহাস বলছে, রাণী হওয়ার পাগলামি তার চেপে বসেছিল। রাণী হওয়ার ব্যাপারে তিনি প্রচণ্ড আশাবাদীও ছিলেন। এজন্য অন্য কোন পুরুষের প্রেম নিবেদনে সাড়া দেননি কোনদিনও। এছাড়া প্রতারণায়ও তার বিশেষ খ্যাতি ছিল। তিনি দরবেশকে বললেন,

আমি রাণী হতে চাই-একথা বলা ছাড়াই রাণী হওয়ার ব্যাপারে তুমি আমাকে। কোনরূপ মদদ করতে পার না? পার না আমাকে ময়ূর সিংহাসনে পৌঁছে দিতে? শুনেছি দরবেশরা অনেক কিছুই করতে পারে।

এর পূর্বে বলল, তুমি কোন মুসলিম শাসকের রাণী হতে চাও কি………

সুলতানা হেসে বললেন, আমার চাহিদা ধর্মীয় দৃষ্টিতে নয়। ধার্মিক হলে এতদিনে আমি অন্য কারো স্ত্রীত্বে থেকে বাচ্চা-কাচ্চার মা হতাম।

তাহলে আমি যা বলব সে অনুযায়ী কাজ করতে পারবে কি? একটি প্রদেশ তোমার অপেক্ষায়- যেটা মুসলমানদের হতে পারে না। তোমাকে দ্বিতীয় আবদুর রহমানের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে হবে এবং তার হেরেমের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হতে হবে।

অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে তাকে বাধ্য করবো আমাকে রাণী করতে-এইতো? না। সে তোমাকে রাণী নয় বিবি বানাবে। পরে একদিন তোমার ওপর বিরাগী হয়ে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করবে। পরবর্তীতে তোমার মত কাউকে নির্বাচিত করে নেবে। তার চেয়ে শোন, এই প্ল্যান অনুযায়ী কাজ করতে পার। করলে তুমি ওই প্রদেশের রাণী হতে পারবে। তোমার হাতে থাকবে বিশাল ফৌজ ও স্বাধীন রাজত্ব।

সুলতানা অসাধারণ বুদ্ধিমতী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্না নারী ছিলেন। তিনি দরবেশের কথা খুবই ধীরস্থির মস্তিষ্কে শুনে যাচ্ছিলেন। বারকয়েক দেখে নিয়েছিলেন তার চেহারাও। আচমকা তিনি উঠে দাঁড়ালেন। অগ্রসর হয়ে দরবেশের দাড়ি ধরে আঁকা দিলেন। দাড়ি তার হাতে উঠে এল। অপর হাত দরবেশের মাথায় রেখে হ্যাঁচকা টান মারলে মাথার চুলও তার হাতে লেগে থাকল। মুখের থেকে নকল দাড়ি ও মাথা থেকে নকল চুল অপসারিত করে সুলতানা দেখলেন, কোথায় কার দরবেশ! এতো এক জোয়ান আদমি।

কে তুমি? গোৰা, বিস্ময়ে হতবাক কণ্ঠে বলেন সুলতানা, কি জন্যে এসেছে এখানে? তোমার কি জানা নেই যে, আমি তোমার লাশ কুত্তা দিয়ে খাওয়াতে পারি?

তাগড়া জোয়ানটি ভয়ে না কেঁপে মুচকি হাসতে লাগল।

এলোগেইছ আমার নাম রাণী! ছদ্মবেশে তোমার কাছে আসা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। তুমি আমার লাশ কুত্তা দিয়ে খাওয়াবে- এ মানসিকতা নিয়েও আমি আসিনি। আমার ছদ্মবেশ উন্মোচিত হবার পরও ঐকথা বলবো- ছদ্মবেশী থাকতে যা বলেছিলাম। কথার মাঝে ধর্ম এজন্য টেনেছি যাতে তোমার ইসলাম প্রিয়তা প্রবল হলে ওভাবেই ফিরে যেতে পারি।

তুমি কি আমায় খ্রীস্টান বানাতে এসেছ? প্রশ্ন সুলতানার।

না সুলতানা, তুমি মুসলমান থাকছ এবং রাণী হবার পরও থাকবে। বলে এলোগেইছ পকেট হাতড়ে একগোছা মোতির মালা বের করলেন। কুপির টিমটিমে আলোতে তা চকচক করে ওঠল। তিনি আরো বললেন, এটা কেবল রাণীদেরই সোনার অংগে শোভা পায়।

মোতির মালা তিনি সুলতানার দিকে বাড়িয়ে বললেন, এটা তোহফা। জানো, কে প্রেরণ করেছে? ফ্রান্স সম্রাট লুই। নাও, তোমার এটা।

সুলতানার চোখে বিস্ময়। তিনি আনন্দে উহ্। সত্যিই এ ধরনের মালা তার জীবনে প্রথম। তারপরও তা ফ্রান্স সম্রাট প্রেরিত। বিস্ময়ের ঘোর কেটে তিনি জিজ্ঞেস করেন, কি চান ফ্রান্স সম্রাট? প্রশ্নের ঢং কতকটা এমন যেন তিনি নিজকে ভুবন মোহিনী ভাবছেন এবং সম্রাট তার নারী সুষমার স্বাদ নিতে পাগলপারা।

তিনি তোমাকে সম্রাজ্ঞী বানাতে চাচ্ছেন না, চাচ্ছেন একটি প্রদেশ দিতে। প্রতারণা বা প্রবঞ্চনা দেয়া হবে না তোমাকে বরং তোমাকেই প্রতারণায় প্রতিভূ হতে হবে।

তার মানে দ্বিতীয় আবদুর রহমানের প্রাসাদে প্রবেশ করিয়ে আমার দ্বারা তাকে ধোকা দেয়া হবে এই তো। তোমার দুঃসাহসিকতার তারিফ করি আমার গ্রেফতানীর শংকা তোমার মাঝে নেই দেখে। আমি তোমায় হত্যাও তো করতে পারি।

তুমি জিন্দা থাকলে তো? আমার যবান এক কিন্তু শক্তিৰাহু ও হাত অনেক। আমি একাকী নই। এক ব্যাটেলিয়ন সৈন্য আমাকে ছায়ার ন্যায় ঘিরে আছে। যতটা আমি যমীনের ওপরে ঠিক ততটা অভ্যন্তরেও আমাকে গ্রেফতার করার পরিকল্পনা ত্যাগ কর সুলতানা। আমি তোমার ভবিষ্যৎ চমকে দেব। তোমার ভুবন মোহিনী সৌন্দর্য থেকে ফায়দা তোল। তোমার ওই রূপ-যৌবন ক্ষণিকের তরে। তোমার থেকে কিছু নিতে নয় দিতে এসেছি আমরা। আবদুর রহমান তোমাকে নয়নমণি বানাবে। তাঁকে দিওয়ানা বানিয়েই তোমার স্বার্থোদ্ধার করতে হবে।

এমনিতেই আমি একাকী। প্রাসাদে যাবো ভাবলে তুমি ভুল করছ। একাকী যাঞ্চা করে গেলে আমার মূল্যায়ন হবে না।

তার চোখে তোমার রূপের ঝলক ফোঁটানোর দায়িত্ব না হয় আমিই নিলাম। তুমি স্রেফ বলো, আমাদের প্রস্তাবে সম্মত কি-না। বাকী কাজ আমরাই করব।

কি করতে হবে আমাকে?

আবদুর রহমানের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে হবে, রূপের হাটের সওদাগর বানাতে হবে। তিনি তার তিন বাদীর জন্য পাগল। ওদেরকে সতীন জ্ঞান না করে ওদের সাথে মিলে আবদুর রহমানের সত্তাকে নারীত্বের মাঝে লীন করে দেবে। যেনতেন মানুষ নয় সে। নারীমোহ হোক একবার চোখ ফেরালে গোটা খ্রিস্ট বিশ্বে তার প্রভাব পড়বে। তাঁকে পাগলপারা করে তোল, বিষ প্রয়োগ কিংবা হত্যা নয়। বিনিময়ে যা পাবে তা তোমার স্বপ্নাতীত ও কল্পনাতীত।

আমি প্রস্তুত। সুলতানা বললেন।

তাহলে এখন শোন- তোমার করণীয় কি? বলে এলোগেইছ বলতে আরম্ভ করলেন।

***

যে রাতে আবদুর রহমান সঙ্গীতজ্ঞ যিরাবের যাদুকরী সুর-মূর্ঘনায় ডুবেছিলেন এবং তার প্রিয় তিন বাদী তার চারপাশে ছিল যাদের একজনকে তিনি স্ত্রীত্বে নিয়েছিলেন, ঐ রাতেই তার সাধের স্পেনে এক নয়া ষড়যন্ত্রের কুটিল জাল বিস্তার করা হচ্ছিল। এ সেই আবদুর রহমান যিনি রণসিংহ হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছিলেন। যিনি ছিলেন খ্রিস্টবিশ্বের ব্রাস, যার দূরদর্শিতার সামনে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ফ্রান্স সম্রাট দুই পর্যন্ত মাথা নোয়াতে বাধ্য ছিলেন। সেই আবদুর রহমানই রঙ্গরসের আসর সাজিয়ে আপনার বীরত্ব আর নারীমাংসমোহে গলা অবধি ডুবে ছিলেন। যে হাত এক সময় জাতির বীর গাযীদের সফলতায় তালি বাজাত সেই হাতই এখন নৃত্যশিল্পীর কোমর দোলানোয় স্পন্দিত হতে থাকল।

যিরাব ইরানী বংশোদ্ভূত। প্রকৃত নাম আলী ইবনে নাফে। উপনাম আবুল হাসান। তিনি ওই যুগের সাড়া জাগানো সংগীতবিশরিদ ছিলেন। সুগায়ক ইসহাক আল মোহলী মুকরীর শাগরেদ ছিলেন। যিরাবের কণ্ঠের গানে যে মাদকতা তা তার ওস্তাদদের মাঝেও ছিল কি-না মুশকিল। তিনি কেবল সঙ্গীত সম্রাট-ই নয়, ছিলেন হ্যান্ডসাম ও সুঠামদেহী। তিনি গেয়ে যেতেন শ্রোতারা মন্ত্রযুদ্ধের ন্যায় শুনত। গানের সুরে মানব হৃদয়কে কি করে কাছে টানতে হয় সে গুণটি ছিল তার মাঝে। জনগণের মাঝে এমনও একটা শ্রুতি ছিল যে, লোকটার কজায় হয়ত কোন গায়েবী শক্তি কিংবা জিন-ভূত আছে। কেননা এ বয়সের এক যুবকের মাঝে এ পরিমাণ যোগ্যতা থাকার কথা নয়।

তিনি আফ্রিকা চলে গিয়েছিলেন। আবদুর রহমানের পিতা আল হাকাম তার খ্যাতি শুনে ইহুদী গায়ক মারফত স্পেনে ডেকে পাঠান। যিরাব ঠিক তখনই কর্ডোভায় পৌঁছেন। যখন আল-হাকাম পরকালের পথ ধরেছেন এবং তার স্থানে তদীয় পুত্র আবদুর রহমান সিংহাসনে বসেছেন। যিরাবের হতাশ হতে হয়নি, কেননা আবদুর রহমানও তার পিতার মত সঙ্গীত পাগল ছিলেন। তিনি যিরাবকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানালেন। তিনি সামান্য দিনের ব্যবধানে প্রাসাদে প্রভাব বিস্তার করলেন। শুধু কি তাই! সঙ্গীতজ্ঞের পাশাপাশি নিজকে একজন আলেম, দার্শনিক ও তর্কবাগীশের কাতারে শামিল করলেন।

***

এর দিনদুয়েক পরে আবদুর রহমান শিকারে বের হলেন। যেদিকটায় হরিণের আনাগোনা বেশী সাধারণত সেদিকটায় তিনি বেশি যেতেন। সঙ্গে রাজকীয় গার্ড বাহিনী। আবদুর রহমান ঘোড়ার পিঠে। তীর হাতে সর্বাগ্রে তিনি। সন্নিকটে একটা সফেদ ঘোড়ার গাড়ী দেখা গেল। ওই গড়ীর কোচোয়ানের গতি আবদুর রহমানের দিকেই। আচমকা সে থেমে গেল। বোঝা গেল তার ঘোড় ভীত হয়েই ছুটছে। যমীন বন্ধুর। ঠাসা বৃক্ষরাজি। ঘোড়ার গাড়িটা বারবার পড়তে পড়তে বেঁচে যায়। আবদুর রহমানের দৃষ্টিতে ব্যাপারটা পড়ে। সহসাই তিনি গার্ড বাহিনীকে এই গাড়ির সাহায্যে ছুটে যেতে বলেন। ঘোড়ার গাড়ীটা তখন এলোপাথাড়ি ছুটছে তো ছুটছে। গাড়ী চালক লাগামশেষে টান মারে। ভেতরে শোনা যায় নারীকণ্ঠের আর্তনাদ। গাড়ী চালক এই আর্তনাদে প্রভাবিত হয়ে প্রচেষ্টার পর প্রচেষ্টা চালিয়ে থামিয়ে ফেলে। তাকে সাহায্যে করে দেহরক্ষী বাহিনী।

গাড়ী থেকে পরমা সুন্দরী এক নারী বেরিয়ে এলো। সে দেহরক্ষী বাহিনীকে কৃতজ্ঞতা জানাল। তার ফুলে ফেঁপে ওঠা চোখ-মুখ নেপথ্যে বলে চলছে, সে বেশ ভড়কে গিয়েছিল। চালকের অবস্থা তার চেয়ে সঙ্গীন। দেহরক্ষীরা জানাল, এটা স্পেনরাজের রাজকীয় শিকার ক্ষেত্র, এখানে আসার কারণ কি তোমাদের? তারা আরো বলল, তোমাদেরকে বর্তমান স্পেনরাজ দ্বিতীয় আবদুর রহমানের সামনে যেতে হবে। তারা আরো বলল, তোমাদেরকে বর্তমান স্পেনরাজ দ্বিতীয় আবদুর রহমানের সামনে যেতে হবে। তার হুকুমেই আমরা তোমাদের সাহায্য করতে এসেছি। উদ্ধার করে তোমাদের তার সামনে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ আছে।

দেহরক্ষীরা অগ্রে চলছে। গাড়ীতে অবস্থানরত নারী হাওদার মধ্যে থেকে চালকের দিকে তাকাল। সে কতকটা উপরে বসা।

এলোগেইছ! নারীকণ্ঠ ফিসফিসিয়ে ওঠল, সত্যিই কি আমাদের ঘোড়া ভয়ে অমন টগবগিয়ে ছুটছিল? আমার রক্ত তো শুকিয়ে যাবার মত অবস্থা।

এলোগেইছ হেসে বললেন, আমার কারসাজির প্রশংসা কর সুলতানা! ঘোড়া ভয়ে অমন করেনি। আমিই ইচ্ছাপূর্বক ওদের অমন করতে বাধ্য করেছি। যাতে রাজার দেহরক্ষীরা সাহায্যে ছুটে এসে আমাদের বন্দী করে নেয়। এক্ষণে ওরা তোমাকে তাঁর সমুখে নিয়ে চলেছে। সত্যি বলতে কি, সরকারী শিকার ক্ষেত্রে আনাগোনা অন্যায়। আমার সুনিপণ চাল তুমি দেখেছ। এবারের পালা তোমার।

***

এটা নিছক এলোগেইছের চাল। আবদুর রহমানের প্রাসাদে তারই এক লোক সংবাদ দিয়েছিল যে, অমুক দিন তিনি শিকারে বেরোচ্ছেন। সুলতানাকে পেশ করার মোক্ষম সুযোগ হিসেবে এই শিকারকে লুফে নিলেন তিনি। ইচ্ছে করেই ঘোড়ার গতি বৃদ্ধি করে সুন্দরী সুলতানাকে পেশ করার চাল চাললেন। ঘোড়া প্রকৃতপক্ষে তার করায়ত্তেই ছিল।

সুলতানাকে যখন আবদুর রহমানের সামনে পেশ করা হল তখন গোস্বার স্থলে তার চেহারায় ফুটে ওঠল আনন্দদ্যুতি। ঠোঁটে পরিধি বাড়ানো মুচকি হাসি। সুলতানাদের পরিকল্পনা সফল। আবদুর রহমান এলোগেইছের-দিকে তাকালেন যিনি ছদ্মবেশে চালকের আসনে ছিলেন। তিনি এই বলে আসন থেকে নামলেন, অপরাধ আমার স্পেন সম্রাট! ঘোড়ার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বসেছিলাম। তাছাড়া শাহী শিকার ক্ষেত্রের জ্ঞানও ছিল না আমার।

আবদুর রহমান যেন তার ওজর গুনেও শুনছেন না। তার দৃষ্টি সুলতানার চেহারায় নিবদ্ধ।

শাহী শিকার ক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই আমার। তুমি কে? সুলতানাকে প্রশ্ন করেন আবদুর রহমান।

তুরুবের রাণী। সুলতানা আমার নাম।

কোন প্রদেশের রাণী? তুরু? আবদুর রহমান জিজ্ঞাসুনেত্রে সরকারী অফিসারদের দিকে তাকান।

তুরুব একটি জায়গীর; কোন প্রদেশ নয়। জনৈক অফিসার বললেন।

সুলতানা তাঁকে জানালেন যে, তার বাবা মারা গেছেন, তিনি এখনও কুমারী। ওই জায়গীরের মালিক।

সত্যি সত্যিই তুমি রাণী হতে পার। তুমি যুবতী। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ফায়সালা করার এখতিয়ার আছে তোমার। আমার যদুর বিশ্বাস, কি বলতে চাই আমি-তা তোমার অবোধগম্য নয়।

বুঝেছি স্পেনরাজ! এতটুকু ইশারা বুঝাবার মত জ্ঞান আছে আমার।

খানিকবাদে ঋীমায় দস্তরখানে খানা খাচ্ছিলেন সুলতানা। খাদ্য তালিকায় ছিল সদ্য শিকারকৃত হরিণ শাবকের রনি। আবদুর রহমানের খুশীর অন্ত নেই। যুৎসই শিকার মিলে গেছে তার। সুলতানার নিটোল মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি যেন অতৃপ্ত হৃদয়ের জ্বালা নিবারণ করে যাচ্ছিলেন অহর্নিশ।

***

জ্বালা নিবারণের এই পরম্পরা, আবদুর রহমান ইবনুল হাকামের ওপর ছায়া বিস্তার করে রইল। সুলতানা তার বিবাহিতা স্ত্রী ছিলেন না বটে, কিন্তু হেরেম ও আবদুর রহমানের অন্দর মহল তার অধীনেই চলত। তিনি আবদুর রহমানকে ঘূর্ণাক্ষরেও জানতে দেননি যে, প্রথম তার সাথে যে মোলাকাত হয় সে সময় তার ঘোড়ার গাড়ী চালক মিঃ এলোগেইছ তার কর্মচারী ছিল না। ওই ঘটনা ছিল সাজানো নাটক। সুলতানার চরিত্র সম্পর্কে এলোগেইছ বলছে,

ভুবন মোহিনী তার রূপ, সৌন্দর্য অনন্য। কুদরত বুঝি নিজ হাতে তাকে বানিয়েছিলেন। যেমন সুন্দরী এই নারী তেমনি চালাক ও প্রতারকও। আপাদ মস্তকে তার বুদ্ধি টইটম্বুর। যেমন পোষাকী তেমনি দেমাগী। ভাবখানা যেন এমন, রাজা বাদশাহরা তার কর্মচারী। তিনি আবদুর রহমানকে পাগল বানিয়ে ফেলেন। আমীরের এই দুর্বলতা ভালভাবেই উপলব্ধি করেন। একবার আবদুর রহমান তাকে খুশী করতে গিয়ে এত সোনা-দানা দান করেন যাতে খাজাঞ্চিখানা তলাহীন ঝুড়িতে পরিণত হয়।

একবার সুলতানা স্পেন আমীরের ওপর রাগ করে দরোজায় খিল এঁটে দেয়। তার বিরহে আবদুর রহমানের জীবন তেতো হয়ে ওঠে। পরিবেশ খাঁ খাঁ করে ওঠে। তিনি কবাদীর মাধ্যমে তাকে রাজী করিয়ে হেরেমে যেতে উদ্বুদ্ধ করান। কিন্তু সুলতানা অনড়। মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা তাঁকে বোঝান। সামান্য একা নারী এতই দাম্ভিক যে, সে হেরেমে থেকেও রাজার সম্মান বজায় রাখতে ভুলে গেছে। তারা বলেন, দরোজার বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেয়া হোক যাতে সে ভেতরেই দম আটকে মরে।

আবদুর রহমান এই পরামর্শ তো শুনলেনই না উপরন্তু উপদেষ্টাদের ওপর প্রচণ্ড রাগ করলেন। বললেন, যাও। তার কামরার সম্মুখে স্বর্ণমুদ্রার নূপ জমা করো। তার হুকুম তামিল হল। আবদুর রহমান দরজার কাছে গিয়ে সুলতানাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, দরজা খুলে দেব। এসব দৌলত তোমার। দরজা খুলে গেল। সুলতানা এই খেল-তামাশায় পাক্কা খেলুড়ে। তিনি বের হয়ে আবদুর রহমানের পায়ে পড়লেন, হাতে নামিয়ে দিলেন দুঠোঁট। ভাবখানা যেন এই তিনি বাদশাহর জন্য দেওয়ানা। দেওয়ানা তো বাদশাহ স্বয়ং, যিনি দেখে দেখলেন না যে, এই নারী কিসের পাগল। তিনি বাদশাহর হাতে চুমো দিলেন ঠিকই, এর পাশাপাশি বাদশাহকে কামরায় নিয়ে যাওয়ার পূর্বেই সোনা-দানা ও মনি-মাণিক্যের থলেগুলোকে ঝুলিতে পুরলেন।

মহলে কানাঘুষা শুরু হল। হেরেমের নারীরা দাতে আংগুল কাটল।

সকলের মনে সুলতানার প্রভাব সঞ্চারিত হল। এরা সকলে আবদুর রহমানের সৌন্দর্য, সমর নিপুণতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কথা জানত। তারা এক্ষণে অনুধাবন করল, এহেন সিংহপুরুষকে যে কাবু করতে পারে, তার মধ্যে নিশ্চয়ই কোন অলৌকিক গুণ কিংবা যাদু রয়েছে।

সবচেয়ে বেশী হতাশ হয়ে পড়ল ওই তিন নারী আবদুর রহমান যাদেরকে চক্ষুর আড়াল হতে দিতেন না। সুলতানা তাদের প্রিয় মানুষটিকে কুক্ষিগত করে নিয়েছে। নারীসুলভ ঈর্ষায় এরা জ্বলতে থাকে। থাকাটাই স্বাভাবিক। সুলতানা একবার এদেরকে তার কামরায় ডেকে পাঠালেন। তিনজনই যেন অশেষ ঘৃণা নিয়ে হাজির হল। তারা তার ঠোঁটে মুচকি হাসির রেখা দেখল যা এক প্রকার বিজয়িনীর-ই টিপ্পনি বলা বলে।

তোমরা আমার নিকটে এসো। সুলতানা বললেন, আমি যদুর জানি এখানকার সকলের যবান আমার বিরুদ্ধে সোচ্চার, সবকিছুই আমার কানে এসেছে। কিছু কথা তোমরাও বলেছ।

তিনজনই বে-চাইন হয়ে পড়ে। এটা ভীতিভাবের বহিঃপ্রকাশ। কারণ, সুলতানা তাদেরকে হেরেম থেকে বহিষ্কার করে দিতে পারে। স্পেনরাজ তার হাতের পুতুল। এমন কি এদের হত্যার হুকুমও জারী করাতে সক্ষম। তিনি আবারও বললেন,

তোমাদের চেহারায় চিন্তার ভাজ দেখছি যে তোমরা কি আমায় সতীন ঠাওরাচ্ছ? মন থেকে এমন চিন্তা মুছে ফেল। আমি আর যা কিছুই হই না কেন-তোমাদের মত এক নারীতে! নারীই বোঝে নারীর হৃদয়। আমি নিজে যেমন তোমাদেরকে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করি না তেমনি করবে না তোমরাও। স্পেন রাজ্যের প্রতি ভালবাসা সবার তরে সমান। আজ তিনি মারা পড়লে কাল কোন বন্ধুবখশ তার স্থানে আমীর হলে আমরা চারজনই তার দাসী হব। তোমরা আমার পজিশন লক্ষ্য করেছ। আমি কি করতে পারিকি পারি না। তবে আমি হেরেমের কোন নারীর বিরুদ্ধে না যাবার অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি।

মুদাচ্ছেরা? সুলতানা বললেন, স্পেনরাজ তোমায় বিবাহ করেছেন, তুমি তার স্ত্রী। তিনি তোমার প্রতিও দুর্বল। তুমি কি মনে কর কেবল তোমার প্রতিই তার সব ভালবাসা উৎসর্গিত?

তিনি কারো নন, বললেন মুদাচ্ছেরা, আমি তার একমাত্র স্ত্রী নই। অন্যের তুলনায় তিনি আমাকে অধিক পেয়ার করেন। এজন্যেই আমাকে বিয়ে করেছেন। এক্ষণে তুমি তার কাছে সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় হলে……….

কিন্তু আমি তার সাথে বিবাহ বসব না। বিবাহ-বহির্ভূত পন্থায় তাঁর সান্নিধ্যে থাকবো। তোমাদেরকে বলছি, কোন অবস্থায় আমার প্রতি শক্ৰমনোভাবাপন্ন হবে না। পূর্বেই বলেছি আমি যেহেতু নারী, তাই কোন নারীকে আমার পদতলে নেব না।

তার নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয় আমি এর দ্বারা তোমরা এ ধারণা করে না যে, তাঁকে তোমাদের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছি। কাজেই তোমরা মনমুকুর থেকে উদাসীনতা ও হীনতা মুছে ফেল।

ওই তিন রাণী সুলতানার কক্ষ থেকে এই চেতনা নিয়ে বের হল যে, সে না কোন রাণী, না কেবল স্পেন রাজ্যের একক অধিকারিণী বরং সে এদের সহমর্মী ও সহনশীল। কাজেই সকল ঘৃণা ও ক্ষোভ তার মন মীনার থেকে ধুয়ে ফেলল।

***

এটা বে-ইনসাফী, এটাও জুলুম যে, কাল পর্যন্ত যে আপনার দৃষ্টিতে সেরা ছিল-আজ আমার প্রেম আঁচলে বন্দী হয়ে তাকে ভুলে চলেছেন। সুলতানা বললেন আবদুর রহমানকে, আপনি স্রেফ পুরুষ নন-একজন বাদশাহও। সুতরাং আপনার হৃদয়টাও বাদশাহসুলত হওয়া চাই। কোন নারী অপর এক নারীর হৃদয়কে কাঁচপাত্রের টুকরো হতে দিতে নারাজ। আমি দু-তিন দিন পর জায়গীর যেতে চাই। কাজেই আপনি মোদাচ্ছেরা, জারিয়াহ ও শেফাকে সে দৃষ্টিতে দেখবেন যে দৃষ্টিতে আমাকে দেখে থাকেন। নতুবা ওদের হাহাকার আমাকে জ্বালিয়ে ছাই করে দেবে।

না, সুলতানা। আবদুর রহমান সমোহনী সুরে বললেন, দুতিন দিন তো দূরে থাক তোমাকে দুতিন মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল হতে দেব না।

আপনি বাদশাহ বলে আপনাকে কামনা করি না। অঢেল মনি-মাণিক্যের লোভেও আপনি আমার প্রিয়পাত্র নন। একজন মানুষ হিসেবেই আপনাকে ভালবাসি। আমার সেই ভালবাসা ঠিক তখনই আহত হয় যখন আমি কোন নারীকে আমারই কারণে হাহাকার করতে দেখি। মাত্র তিন দিন রাজন!

তিনি আবেগতাড়িত আলাপ করে আবদুর রহমানকে এভাবে কাবু করলেন যেভাবে ধুরন্ধর সাপুড়ে তার বাঁশি দ্বারা বিষধর সাপকে নত করে। সুলতানা এভাবে প্রেম নিবেদন করলেন যেন আবদুর রহমানকে ছাড়া তার দুতিন মুহূর্তও চলে না।

সন্ধ্যার দিকে তিনি জায়গীরের উদ্দেশ্যে হেরেম ছাড়লেন। আবদুর রহমান তার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দেহরক্ষী দিলেন-রাতের বেলা যারা তাকে দুশমন থেকে রক্ষা করবে। দিলেন শাহী বাবুর্চিও এবং অসংখ্য চাকর-বাকরও। এলোগেইছ ছদ্মবেশী হয়ে হাজির হল। দেহরক্ষীদের কেউ তাকে সন্দেহও করার সুযোগ পেল না।

সুলতানা বললেন, আমি সর্বদিক দিয়ে কামিয়াব। জানতাম না এই লোকটা নারীদের প্রতি এতটা দুর্বল। নারীদের ঘ্রাণ পেলেই সে দুজাহানই ভুলে যায়।

দিমাগে নারীসুষমা প্রভাব ফেললে রক্তখেকো যুদ্ধাংদেহী অস্ত্রধারণ করার শক্তি হারিয়ে ফেলে। পক্ষান্তরে নারী যদি কোন কাপুরুষের পিঠ চাপড়ে বলে, আমি তোমার সম্ভম তো সে বীর পুরুষ হয়ে যায়। আমরা স্পেনের মুসলিম শাসকদের এভাবেই অকর্মা বানিয়ে ছাড়ব। বলল এলোগেইছ।

এলোগেইছ ছোট একটা বাক্স এনেছিল। সেটি খুলে সুলতানার সামনে রেখে বলল, নগণ্য এই উপঢৌকনটুকু ফ্রান্স সম্রাট তোমায় দিয়েছেন। প্রকৃত উপঢৌকন এখন তোমার অপেক্ষায়।

আমাকে আর কি করতে হবে? সুলতানা প্রশ্ন করেন।

যা করে চলেছ-তাই। আমি তোমাকে বলে যাব তুমি সে অনুযায়ী কর্ম-সাধন করে যেতে থাকবে।

ওই তিন নারীকে আমি হাতের মুঠোয় এনেছি। মহলে কারো সাথে আমার দুশমনি নেই। মহলে যিরাব নামের সংগীতজ্ঞ যার প্রতি স্পেনরাজ উৎসর্গিত-তার কথায় দরবার চলে। সে যা ইচ্ছে তাই করতে পারে, এমন কি করেও ছাড়ে। কুদরতের এক অলৌকিক সৃষ্টি এই লোক। তার মাঝে এমন কিছু শক্তি আছে যার বদৌলতে পাথরে ফসল ফলাতে পারে। শেনরাজ তার সামনে মক্তবের ছাত্রের মত। আমাকে সে কতকটা সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা শুরু করেছে। আমি তার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গবেষণা শুরু করেছি। আশা করি তাকেও কুপোকাত করতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না।

ওকে তোমার সহকর্মী করে নাও। আর হ্যাঁ, মনে রেখ সুলতানা! স্পেনরাজকে হত্যা করা যাবে না। জীবিত আবদুর রহমানই আমাদের উপকারে বেশী আসবে মৃত আবদুর রহমান থেকে। তাকে ইন্দ্রিয়পরায়ণতা ও বিলাসিতায় গলা অবধি ডুবিয়ে রাখার দায়িত্ব তোমার, বাদবাকী কাজ আমাদের।

এলোগেইছ! আমার সম্পর্কে একটা কথা তোমাকে বলতে চাই। আমি কারো হাতের খেলনা কোনদিনও হইনি। খেলনা বানিয়েছি সকলকে। তুমি এখনও তোমার প্ল্যান-প্রোগ্রাম আমাকে জানাও নি। কি তোমার ষড়যন্ত্র যার ক্রীড়নক হিসেবে আমাকে ব্যবহার করছ? আমার ওপর কি তোমাদের ভরসা নেই? যদি বলি তোমরা নিজেদের স্বার্থোদ্ধারেই আমাকে ব্যবহার করছ-এটা বললে ভুল হবে কি? এই মনি-মাণিক্য দ্বারা আমাকে ক্রয় করতে যেও না এলোগেইছ।

আমি যদ্দুর শুনেছি ধীমান নারী ইশারা বুঝতে সক্ষম। আমি তোমাকে নির্বাচন করে ভুল করিনি। অদ্যাবধি কি বুঝলে না, কি আমাদের প্ল্যান ও ষড়যন্ত্র? মনে করে দেখ তো, প্রথম সাক্ষাতে যখন তুমি আমার ছদ্মবেশ আবিষ্কার করেছিলে, তখন আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম-কি তোমার ধর্ম আর ধর্মের প্রতি কেমন তোমার টান? তুমি উত্তর দিয়েছিলে, ধর্মের প্রতি আমার কোন আকর্ষণ নেই। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়াই কেবল তোমায় ধর্ম। রাণী হওয়া এর অন্যতম। বলেছিলাম, তোমাকে আমরা রাণী বানাবো, বেশ কিছুদিন তুমি আবদুর রহমানের রাণী হিসেবে থেকেছ। স্পেনে মুসলিম পতনের শুরু হতেই একটা প্রদেশ পেয়ে যাবে। ফ্রান্স সম্রাট নিজ হাতে তোমার আঁচলে বেঁধে দেবেন এর চাবি।

আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে, এদেশে আমাদের বিদ্রোহাগ্নি জ্বালাতে হবে। আমরা এক গুপ্ত আন্দোলনের দাবানল সৃষ্টি করতে যাচ্ছি। তোমার হয়ত অজানা নয় যে, যে দেশে বাদশাহর বিরুদ্ধে অত্যুত্থান হয় সে দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে রক্তপাতের সৃষ্টি হয়। যদি বাদশাহ যিরাবের মত সংগীতজ্ঞ আর তোমার মত ভুবনমোহিনীর রূপে মোহাচ্ছন্ন থাকে, আর তার অধীনে সুদক্ষ সেনাবাহিনীও থাকে তাহলে তারা কমযোর হয়ে পড়বে অতি অবশ্যই। তুমি তোমার রূপের যাদুতে স্পেনরাজকে কাবু কর। তাকে তোমার নারী সুষমায় রাজ্য ও প্রতি-আক্রমণের কথা ভুলিয়ে দাও।

বুঝেছ সুলতানা। কি বলছি আমি। আমরা আবদুর রহমানকে জীবিত রাখতে চাই। তবে তার পৌরুষবহুল বীরোচিত ভেতরটা ভোলা বানিয়েই। এ কাজ খুব একটা সহজ নয়। এজন্য তোমার এনাম এত বিশাহু-বিশাল এক প্রদেশ, যার কর্ণধার হবে তুমি। থামল এলোগেইছ।

***

এলোগেইছ যে গুপ্ত আন্দোলনের প্ল্যান বয়ান করছিল তা কেবল ঔপন্যাসিক গল্প নয়- এই প্ল্যান বাস্তব। এলোগেইছ-ই যার পথিকৃত। স্পেনের মুসলিম শাসকদের গ্রানাডাচ্যুত করার প্রথম অধিকর্তা এই লোকই। কুদরত তাকে দিয়েছিলেন অসাধারণ প্রজ্ঞা ও মেধা। ধর্মজ্ঞানে সুপন্ডিত আর কূটনৈতিক ময়দানে সুদক্ষ সেপাই। সে আরবী ভাষা রপ্ত করেছিল এবং কুরআনের মানে মতলব বুঝতে শিখেছিল। স্পেনের প্যালোনায় খ্রীস্টানদের ইবাদাতগাহ ছিল। ওখানে একটি বই উদ্ধার করা হয়, যাতে বিশ্বনবী সম্পর্কে কুৎসা লেখা ছিল।

এ বইতে অনেক বইয়ের রেফারেন্স ছিল। এলোগেইছ এর কপি নকল করে গীর্জায় বিলি করে ও পাদ্রীদেরও নকল করে বিলি করতে বলে। সুতরাং ইসলামের বিরুদ্ধে প্রোপাগাণ্ডা পুরোদস্তুর চলতে থাকে। মুসলমান প্রশাসক যারা আমীর বা গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত ছিল তাদেরকে বাদশাহ আখ্যা দেয়া শুরু হল। তারা জানলনা ইসলাম ও ইসলামী সাম্রাজ্য নিয়ে চলছে কি ষড়যন্ত্র।

এলোগেইছ শহরে শহরে ঘুরে অবশেষে ফ্রান্সে গিয়ে উপনীত হল। ইসলামী সাম্রাজ্যের শেকড় কাটা ও মুসলিম শাসন ধ্বংসের মিশন বানাল সে। তার এ আওয়াজ গীর্জা ও খ্রীস্টান বাড়ী বাড়ীতে পৌঁছে গেল যে, ধর্ম-কর্ম ছেড়ে দিলে আগামী বংশধরও মুসলমানদের গোলাম হয়ে যাবে। ধর্মের ঝান্ডাবাহীরাই বর্তমান সময়ে ধর্মের রক্ষাকর্তা। মুসলমানদের নৈতিক অবক্ষয় শুরু হয়েছে। তাদের শাসক মহলে নূপুর, নিক্কণ ও নারী বিলাসিতা জেঁকে বসেছে। হৃদয়ে প্রগাঢ় হয়েছে ক্ষমতালোভ। ওরা জাতিকে এক্ষণে ধোকা ও প্রতারণা দিয়ে চলেছে। ওদের সেই অজেয় সমর চেতনা লোপ পেয়ে গেছে যার বদৌলতে এক সময় অর্ধ দুনিয়া শাসন করেছে। ওদের বাদশাহরা জাতিকে এমন স্থানে নিয়ে গেছে যেখানে কোন তারিক বিন যিয়াদ পয়দা হবে না। এ জাতি এমন সন্তান পয়দা করতে অপারগ। ওদের বধূ-মাতারা বন্ধ্যা হয়ে গেছে। এখন থেকে কর্তৃত্ব হবে ঈসা মসিহর। শাসন হবে ক্রুসেডের।

এলোগেইছের এই আন্দোলনকে ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতা বলে। কপটচারিতা বলেও অনেক ঐতিহাসিক বর্ণনা করেছেন। আরবীতে একে মোয়াল্লেদীন বলে। মোয়াল্লেদীন ঐসব খ্রীস্টানদের বলে, যারা মুসলিম শাসনের যবনিকাপাতের স্বার্থে ইসলাম গ্রহণ করে। এদের অধিকাংশই কর্ডোভা, টলেডো ও মালাকাবাসী।

এরা এলোগেইছের মত নেতা পেয়ে খ্রিস্টধর্মে প্রত্যাবর্তন না করে মুসলমান থেকেই ইসলামের শেকড় কাটতে থাকে। ইতিহাস লিখেছে, ওরা মসজিদে নামায আদায় করত। দেখতে পাকা মুসল্লী, কিন্তু তলে তলে পাক্কা খ্রিস্টান এবং মুসলমানদের আস্তিনের সাপ। ইসলাম বিরোধী চেতনা ছাড়াও আরবদের ব্যবহার ওদের হতাশ করে দিয়েছিল। আরবজাতি এই নও মুসলিমদের ঘৃণার চোখে দেখত। অথচ কুরআন ও ইসলামী ভাবধারা মোতাবেক ওদের প্রকৃত আরবদের মতই পজিশন লাভ করার দরকার ছিল, কিন্তু বাস্তবে ছিল এর উল্টো।

এলোগেইছ আরেক সতীর্থের সন্ধান পেয়েছিলেন। আইলিয়র তার নাম। এরা দুজনই জনৈক ঈসায়ী ধর্মপ্রচারক শীর-এর শাগরেদ। ওদের এই বস একটি ইসলাম বিরোধী বই লিখেছিলেন।

দ্বিতীয় আবদুর রহমানের যুগে মুসলিম চেতনাকে বিনাশ করার জন্য যখন এহেন ষড়যন্ত্র দানা বেঁধে উঠছিল তখন তিনি মিউজিকের ধুম-ধাড়াক্কা ও নারীদেহ নিয়ে মেতে ছিলেন।

***

তুরুবের রাণী সুলতানা আব্দুর রহমানকে বলেছিলেন যে, দুতিন দিনের মধ্যে ফিরে আসবেন। যে উদ্দেশ্যে তিনি গিয়েছিলেন তা প্রথম দিনেই সমাধা হয়ে যায়। মাত্র এক রাতই জায়গীরে অবস্থান করেছিলেন। এটি তার জীবনের এক স্মরণীয় রাত। এলোগেইছের যাদুকরী প্ল্যান আর তার যৌবনদীপ্ত চেহারা সুলতানাকে আকর্ষণ করে। সুলতানার মনে দাগ কাটে। তাছাড়া তিনি এলোগেইছের সাথে এজন্য ভাব রাখতে চান। যাতে নয়া প্রদেশ পেয়ে যান।

এলোগেইছ রাতে আলাদা কামরায় থাকল। মাঝরাতে কারো হস্তস্পর্শ ঘুম ভেঙ্গে গেল। চোখ গেল খুলে। দ্রুত সে কোমরে গোঁজা ছোরায় হাত বুলাল। সুলতানা কথা বলে না ওঠলে তার ছোরা সমূলে বিদ্ধ হত বুকে। এলোগেইছ বলে উঠল, সুলতানা! কি সংবাদ নিয়ে এলে?

সংবাদ নয় তোমার পৌরুষে টোকা মারতে এসেছি। সুলতানা আধো ঘুম অবস্থায় নিজের শরীর এলোগেইছের দেহে লীন করে দিয়ে বলল, যে কথা তুমি বলতে চাওনি তা আমি বুঝতে পেরেছি। নিজকে এভাবে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দিচ্ছে কেন এলোগেইছ?

এলোগেইছ হো হো করে হেসে ওঠল। এ হাসি মুচকি নয়-গম্ভীর। সে বলতে লাগল, আমাকে ওই শ্রেণীর পুরুষের কাতারে শামিল করো না যারা নারী সুষমায় মাতোয়ারা। তুমি যে পৌরুষে সুড়সুড়ি দিতে এসেছ তাতে আমার দেহ সজাগ হলেও হৃদয় মরে যাবে, আমার দেহ নিয়ে যেমনি কোন অনুরাগ নেই তেমনি নেই তোমার দেহের প্রতিও কোন রকম টান।

সুলতানা ঠিক এভাবে কামরা থেকে বেরোল যেন এলোগেইছই তাকে জোরপূর্বক বের করেছিল। যাবার সময় তিনি বললেন, এলোগেইছ! আমাকে তোমার অযোগ্য মনে করছ বুঝি?

যোগ্য মনে না করলে তোমাকে আমার গুপ্তরহস্য খুলে বলতাম কি? তোমাকে মহলে প্রেরণ করতাম না। তোমার অবস্থান আমার হৃদয়ে। আমি তোমার পূজারী-ভোগকারী নই। আর যাকে পূজা করা হয় তার দ্বারা জৈবিক চাহিদা নিবারণ মহাপাপ। ভোমাকে কলুষিত করা আমার অভিপ্রায় নয়। বারবার তোমাকে এই বাস্তব সত্যটি বোঝাতে চাইছি। তোমার প্রতি কোন প্রকার দুর্বলতা থাকলে আব্দুর রহমানের মহলে নয় আমার মহলেই রাখতাম তোমাকে। যে ব্যক্তি স্বার্থমোহে নারীর ওপর সওয়ার হয় তার সব কাজই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। হয়ে যায় সে হায়েনা। এই একটি পয়েন্টেই আমি স্পেন রাজ আবদুর রহমানকে কুপোকাত করতে চাই। তার মত যদি আমিও নারীমাংসলোভী হয়ে উঠি তাহলে আমার সুবিশাল মিশন মাঝপথেই মুখ থুবড়ে পড়বে। এই মিশন সামনে রেখেই আমি জীবন-যৌবন জলাঞ্জলি দিয়েছি।

তুমি মহান। এলোগেইছের হাতে দুঠোঁট নামিয়ে সুলতানা বললো, তুমি যে ত্যাগ-ই চাইবে আমি তা-ই দেব। তোমার শ্রেষ্ঠত্বের প্রাপ্য সেটাই। এতটুকু বলে সে বেরিয়ে গেল।

***

পরদিন। আবদুর রহমানের মহলে পৌঁছলো সুলতানা। স্পেনরাজ কল্পনাও করেননি যে সুলতানা দ্বিতীয় দিনেই ফিরে আসবে। সুলতানা আবদুর রহমানের বাহুতে নিজকে এলিয়ে দিয়ে বললেন, যেখানে এক মুহূর্ত আমাকে ছাড়া আপনার চলে না সেখানে আমার চলে কি করে রাজন? সুলতানার নারী সুষমার ঘ্রাণ আবদুর রহমানকে করে তোলে পাগলপারা। সুলতানা ওই রাতে সঙ্গীতজ্ঞ যিরাবকে আপনারে কামরায় ডেকে পাঠাল এবং তিন বাদীকে আবদুর রহমানের হাওয়ালা করল। সঙ্গীতজ্ঞকে বললেন,

তোমার কণ্ঠে যাদু আছে যিরাব! তোমার আওয়াজ শুনলে আমার শীরাতন্ত্রীতে শিহরণ জাগে। এটা কোন গোস্তাকি নয় তো৷ যিরাব জিজ্ঞাসা করেন।

না! তুমি আমায় মাতাল করে তুলেছ। তোমার নেশাদার ওই দুটি চোখ সঙ্গীতের তানে পাগল বানিয়ে ছাড়ে আমায়।

যিরাব জানতেন, সুলতানা আবদুর রহমানের-ই প্রাইভেট পাত্রী,এজন্য তিনি মাথা নীচু করে থাকেন। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ খামোশ থাকার পর সুলতানার কামরা থেকে নিষ্ক্রান্ত হবার পর তার প্রগাঢ় ধারণা জন্মে যে, সুলতানা আবদুর রহমানের একার নয়, সে তারও। তার প্রেম তলে তলে লালন করে আসছে। এই মোলাকাতের পর তার ওই ধারণা আরো মজবুত হয়। একরাতে সুলতানা আবদুর রহমানকে বলেন, আমার জায়গীরে যেতে হবে। যিরাব থাকবে সাথে। সুলতান এমনভাবে ছুটি চাইল যেন জায়গীরের মুক্ত বাতাস সেবন না করলে তার দম আটকে যাবে। আবদুর রহমান তৎক্ষণাৎ অনুমতি দিয়ে দেন।

রাতে এলোগেইছ এলো। তার সাথে সুলতানার আগে থেকেই যোগাযোগ। যিরাব সুলতানার প্রেমে এতই মজেছিল যে, স্পেন সুন্দরী পর্যন্ত চিন্তায় পড়ে গেল। তিনি যিরাবের অন্তরে আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টি করার জন্যই প্রেমাভিনয় করেছিলো। একবার সে বললো, কেমন যেন একটা বাধ্যবাধকতার মধ্যে আটকে আছি। তোমার সংগীতের কাছে বিক্রী হয়ে গেছি। আমার সৌন্দর্যও খরিদকৃত। না তুমি পলায়ন করতে পারবে, না পারব আমি। যেখানেই যাবে সেখানেই ধরা খেয়ে যাবে। এ ছাড়া সুলতানা তাকে বলে রেখেছিল, এলোগেইছ আমাদের মুক্তির ব্যবস্থা করেছেন। মুক্তির ব্যবস্থা হলে আমরা একটি জায়গীর পেয়ে যাব। সে অবস্থায় তুমি হবে আমার উপদেষ্টা।

ওই রাতে যিরাবের সাথে এলোগেইছের সাক্ষাত। সুলতানার সাথে যিরাবের পরিচয় ঠিক এমনভাবে উপস্থাপিত হল যেন মা ও ছেলে কোন প্রানে একমত হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, যিরাব নিছক একজন গায়ক-সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন না বরং অসাধারণ মেধাবী ও রাজনীতিজ্ঞ ছিলেন। কিন্তু সুলতানা জগদ্দিল পাথরের মত তার মেধা-বিবেকের ওপর চেপে বসল। এতে কোন ফাঁক-ফোকর থাকলে এলোগেইছ সেটুকু পূরণ করেছিল। মোটকথা যিরাব ও সুলতানার নাচের পুতুলে পর্যবসিত হল।

শেষ পর্যন্ত এলোগেইছ তাকে বললেন, মুসলিম তাহযীব-তামাদুন বদলে দাও। যে জাতি তার তাহযীব-তামাদ্ন ভুলে যায় সে জাতি কোনদিনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। অথবা এও মনে করতে পার, তারা ক্ষমতা চালানোর শক্তি হারিয়ে ফেলে। জানি, এতে প্রচুর সময় লাগবে। বছর কিংবা যুগও একাজে পেরিয়ে যেতে পারে, কিন্তু কোন জাতিকে নিঃশেষ ও দেউলিয়া বানাতে এর বিকল্প নেই। স্পেনরাজকে আমরা প্রকাশ্য ময়দানে যুদ্ধে ডাকলে আরব থেকে অসংখ্য ফৌজ আসবে সেক্ষেত্রে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসবে।

সুলতানা ও এলোগেইছ কথায় কথায় যিরাবকে একটি প্রদেশের রাজা ও সুলতানাকে রাণী বানিয়ে দিল। সুলতানা যিরাবকে তিনদিন পর্যন্ত জায়গীর রাখল। স্থানটি বড়ই মনোরম। গাছ-গাছালিতে ঠাসা। ফুলে ফলে সুশোভিত। প্রানোচ্ছল। সুলতানা ও যিরাব হাত ধরাধরি করে তিনদিন ওই কানকুঞ্জে বিচরণ করল। সুলতানা নারী সুষমা আর যিব তার সঙ্গীতের সুর মূৰ্ছনা বিনিময়ের দ্বারা পরস্পরকে আকৃষ্ট করে যেতে লাগল। প্রাসাদে ফিরে আসার পর যিরাবের পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতায় বেশ পরিবর্তন দেখা গেল। তার কণ্ঠে পূর্বেকার সুর তো ছিল, কিন্তু এর অনেকখানি দখল করেছিল সুলতানার প্রেম।

সুলতানা নারীসুলভ প্রতারণার মাধ্যমে যিরাবকে আবদুর রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুললো।

***

সময় বসে থাকে না নিশুপ। সময় এগিয়ে চলে আপন গতিপথে। এক রাতে আবদুর রহমানের উজীরে আলা হাজেব আবদুল করীম দুলোক সহকারে সিপাহসালার ওবাইদুল্লাহর বাসভবনে এলেন।

উবায়েদ। তিনি সিপাহসালারকে বললেন, এ দুজনকে চেনো?

হা! কেন নয়। ওবায়দুল্লাহ জবাব দেন, আমাদের গুপ্তচর বৃত্তিতে ওরা ওস্তাদ।

শুনুন। এরা কি খবর দিচ্ছে।

সালারে মুহতারাম। তন্মধ্যে একজনে বললো, কর্ডোভা সীমান্তে, টলেডো ও মালাকায় খ্রিস্টানরা সশস্ত্র হচ্ছে। অভ্যুত্থানের জন্য তৈরী হচ্ছে। ওরা অতি সংগোপনে নও মুসলিমদের ওদের দলে ভেড়াচ্ছে। গলায় গলায় ভাব ওদের। কি অদ্ভুত ব্যাপার! আমাদের সাথে একসাথে যারা নামায পড়ে তারাই আমাদের বিরুদ্ধে দল ভারী করে চলেছে। খুব শীঘ্র ওরা আমাদের বিরুদ্ধে মাঠে নামবে। দলভারী মুসলিম সৈন্য ওদের মোকাবেলায় টিকবে না বলে ওদের বিশ্বাস। মরনের অঙ্গীকার নিয়েছে ওরা।

গুপ্তচররা আরো জানাল, ফ্রান্স সম্রাট লুই ওদের তলে তলে মদদ যোগাচ্ছেন। ওদিকে গোথমার্চের সম্রাট ব্রেনহার্ট স্পেন ভূমি যতটুকু সম্ভব দখল করবে। এই গুপ্তচরদ্বয় নও মুসলিমের ছদ্মবেশে এদের সাথে কথা বলেছে। তারা বলেছেন, এলোগেইছ নামীয় জনৈক খ্রীস্টান বক্তৃতা ও গোপন পরিকল্পনার মাধ্যমে খ্রীস্টানদের রক্ত গরম করে বেড়াচ্ছে। বিদ্রোহীদের সে-ই শিরোমণি। বিদ্রোহাগ্নি আরো কিছুস্থানে দানা বেঁধে উঠছিল। উজিরে আলা হাজে আবদুল করিমও ইতিপূর্বে এই বিদ্রোহ প্রস্তুতির খবর আঁচ করতে পেরেছিলেন। তিনি বারদুয়েক আব্দুর রহমানকে এ ব্যাপারে হুঁশিয়ারীও দিয়েছিলেন, কিন্তু আবদুর রহমান এতে কান দেননি।

উবায়েদ ভাই। হাজেব সিপাহসালারকে বললেন, আমাদের প্রতি এভাবে বেপরোয়াভাব দেখানো হলে কি ভূমিকা থাকবে আমাদের? আমরা তো তার মত উদাসীন থাকতে পারি না।

না। সালার উবায়দুল্লাহ বললেন, স্পেন আবদুর রহমানের নয়। এ সেই স্পেন যা এক সিংহের জাতি জয় করেছিল। ওরা এদেশ জয় করে পুনরায় ফিরে যায়নি। আফসোসের বিষয়, সাধের সেই স্পেন আজ গোষ্ঠীবিশেষের উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে রূপান্তরিত। দেশ ও জাতির সাথে ওদের কোন সম্পর্ক নেই। ওদের সম্পর্ক গদির সাথে, বিলাসিতার সাথে। আজ স্পেনের বড় দুশমন ওই ক্ষমতাসীনরা যারা চাটুকারদের ইশারায় ক্ষমতা চালাচ্ছে। এই ভূ-খণ্ডকে কুফরের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। বহিঃশত্রুর যড়যন্ত্র ও বিদ্রোহীদের মদদ দেয়ার পর আমার কানেও এসেছে। সেটার সত্যায়ন করলে তুমি। তোমরা যদি আমার পরামর্শমত কাজ কর তাহলে আমীর আবদুর রহমানের কাছে চলো।

আমার পরামর্শও কতকটা এমন। কিন্তু এক্ষণে সে স্পেনসুন্দরী সুলতানা আর গায়ক যিরাবের কজায়। এই কজা জ্বিনে ধরা রোগীর মত। এ এমন এক প্রাচীর যা টপকাতে পারব না আমরা।

হাজের বললেন, চেষ্টা করে দেখতে অসুবিধা কোথায়? বললে এখনই যেতে চাই। ওবাইদুল্লাহ বললেন।

হাজেব ও উবায়দুল্লাহ উভয় গুপ্তচরসহ প্রাসাদ অভিমুখে চললেন।

উজিরে আলা ও সিপাহসালার জরুরী কথা নিয়ে আমীরের সাথে দেখা করতে চান- এ মর্মে আবদুর রহমানের কাছে খবর এলে সুলতানা বেরিয়ে এলেন। পরনে তার নগ্নপোষা। তার আকর্ষণীয় চাঁদমাখা বদনে বিরক্তির ছাপ সুস্পষ্ট। তিনি এদের বললেন,

আপনারা কি দিনের বেলায় দেখা করতে পারেন না? এইমাত্র তিনি যিরাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। এ সময় স্পেনরাজ কারো সাথে দেখা করবেন না।

কিন্তু আমরা যে তার সাথে দেখা করেই ফিরে যেতে চাই। হুকুম আমরা তার থেকে চাই-তোমার থেকে নয় সুন্দরী। তাঁকে গিয়ে বললো, আমরা দেখা না করে ফিরব না। উবায়দুল্লাহ বললেন।

আর আমি আপনাদেরকে তার সাথে দেখা করতে দেব না। সুলতানার কণ্ঠে ক্ষোভ ও দৃঢ়তা।

হাজে আবদুল করীম উবায়দুল্লাহকে বললেন, এরপরও কি তুমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে চাও?

আমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকব না। আবার খালি হাতেও ফিরব না– ভেতরে যাব। হেবেমের এক নারী রাণীর দাপট নিয়ে চলছে। তার বিরক্তি ও দাপটে আমার কিছুই যায় আসে না। উবায়েদ বললেন।

স্পেনরাজ অন্দর মহলে যিরাবের সুর মূর্ঘনায় ডুবেছিলেন। সেই সুর জগত থেকে ভেসে এলো, সুলতানা! তুমি কৈ! ওদেরকে কাল আসতে বল। উবায়দুল্লাহ আবদুর রহমানের কামরায় পৌঁছে যান। হাজেব করেন তাঁর অনুসরণ। পেছনে পেছনে সুলতানা। আবদুর রহমান অর্থ নিমিলিত চোখে সকলের প্রতি দৃষ্টি বুলান।

এদের কি শাহী রেওয়াজ মনে নেই? চাপা ক্ষোভ নিয়ে বাঘিনীর মত গর্জে ওঠে সুলতানা।

কোন জরুরী কথা হবে হয়তবা সুলতানা। সামান্যতেই ক্ষেপে যেও না। এসো আমার পাশে এখানটায় বসো। এরপর তিনি আগন্তুকদ্বয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, এমন কি কিয়ামত ঘটে গেছে যে, তোমরা সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলে না? আর যেখানে আমি বললাম, এখন দেখা হবে না, সেখানে তোমরা কোন্ সাহসে অন্দরে প্রবেশ করলে? তোমরা কি তোমাদের পদমর্যাদার কথা ভুলে গেছ? প্রশ্ন, বিস্ময় ও ক্ষোভযুক্ত কণ্ঠে বলেন আবদুর রহমান।

হ্যাঁ! আমীরে স্পেন! আমরা পদমর্যাদার কথা ভুলে গেছি। এই ভূ-খণ্ডের বিজেতা কোন পদমর্যাদার খাতিরে এখানে আসেনি। ওই শহীদান কি বদলা পেয়েছিল যারা এদেশে আল্লাহ ও তার রাসূলের সন্তুষ্টিতে এখানে এসেছিল? অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সেই পূতঃ পবিত্র যমীনের রাজপ্রাসাদে জনৈকা নগ্ন নর্তকী প্রধানমন্ত্রী ও কমান্ডার-ইন-চীফকে একথা বলার সাহস পায় যে, তোমরা এখান থেকে চলে যাও! উবায়দুল্লাহ শেষের দিকের কথাগুলো বলতে গিয়ে গলার স্বর পরিবর্তন করেন।

উবায়দুল্লাহ! কাঁচা ঘুমভাঙ্গা বাঘের মত গর্জে ওঠেন আবদুর রহমান, কি হলো তোমাদের? আজ এ কি বলছ তুমি?

তখনও তার চোখ অর্ধ নিমিলিত। এবার তা পুরো খুলে যায়। যিরাবের সঙ্গীত যায় থেমে। সুলতানা দূরে দাঁতে দাঁত পেষেণ। আবদুর রহমানের চোখ রক্ত জবার মত লাল। এ লাল রাগ-গোস্বার নয়। এই রক্তিমাভা সর্বপ্রথম দেখছে যিরাব ও সুলতানা। এঁরা অবাক, এ আবার কোন আবদুর রহমান। এ কি কোন ঘুমন্ত ব্যাঘ্রের ন্দ্রিাভঙ্গ, না কি কোন লৌহ মানবের গাত্রোত্থান? তিনি বললেন, তোমরা কি বসবে না? আগন্তুকম্বয়কে বলে তিনি যিরাব ও সুলতানাকে বললেন, তোমরা ওপাশের কামরায় যাও। মনে হয় জরুরী কোন কথা আছে। নইলে এরা এভাবে বিনা অনুমতিতে আসার মত ব্যক্তি নয়। তার কণ্ঠে এক ধরনের ওজর ও মিনতি।

যিরাব ও সুলতানা চলে গেলে উবায়দুল্লাহ ও হাজেব বসে পড়েন। আবদুর রহমান যেভাবে যিরাব ও সুলতানার কাছে মিনতি করলেন তাতে এরা ব্ৰিতিবোধ করে একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করেন। তারা ফিস ফিস করে বলেন, আজ এর একটা বিহিত বিধান করেই ছাড়বেন। আবদুর রহমান বললেন, বলল! কি বলতে এসেছ?

খলীফা আপনাকে স্পেনের আমীর নিযুক্ত করেছেন। কিন্তু দরবারী চাটুকাররা আপনাকে স্পেন সম্রাট বলতে শুরু করেছে, আর আপনিও পুরোদস্তুর সম্রাট সেজে বসে আছেন। উবায়দুল্লাহ বললেন।

কি বলতে চাও উবায়েদ! আবদুর রহমানের কন্ঠে শাহী দাপট, তুমি নিজকে সর্বদা রণাঙ্গনের অধীন সেনার মত মনে কর। তোমার কল্পনাও কেবল ক্যান্টনমেন্টসুলভ। যা বলতে এসেছ তা সহজে বল!

না! আমি সহজে বলতে পারছি না। যেদিন আমার লড়াই খতম হয়ে যাবে সেদিন আপনার সিংহাসনের তলার মাটিটুকুও সরে যাবে এবং স্পেনভূমি হতে ইসলামী পতাকা ও আযানের সুরলহরী স্তব্ধ হয়ে যাবে চিরদিনের তরে। সেনাপতি কখনও দরবারী হয় না। হয় না ক্ষমতালোভী। তার অবস্থান রণাঙ্গনে। অবস্থান কুফর ও বাতিলের বিরুদ্ধে। আপনিও একজন সেনাপতি। রণসিংহ। কিন্তু আফসোস! সেই সিংহশাবককে আজ খোঁচা মেরে জাগাতে হল। সংগীত ও নারী সুষমা লাভের উম্মাদনায় আপনি তলোয়ার। সিংহাসনের নীচে ছুঁড়ে মেরেছেন। আপনার প্রজ্ঞা আছে, মেধা আছে কিন্তু এক উদ্ধত নারী আপনার ওপর আছর করেছে যে আপনাকে জান্নাতী পরিবেশ দান করেছে, যদিও সেটা নিরেট জাহান্নাম।

সমস্যা হচ্ছে, যে জাহান্নামের দিকে উবাইদুল্লাহ ইশারা করছেন ওতে কেবল বাদশাহ একাকী নয় নিপতিত হবে গোটা জাতিই। বাদশাহর ভুলে গোটা জাতি এর ইন্ধন হবে। বাদশাহর অপরাধে প্রায়শ্চিত্ত করে গোটা কওম। দুশমন সম্পর্কে উদাসীন বাদশাহর প্রজাদের ললাটে বিজাতির গোলামী ছাড়া আর কিইবা লেখা থাকতে পারে। হাজেব বললেন।

দেমাগ থেকে ক্ষমতার নেশা ঝেড়ে ফেলুন আমীরে মুহতারাম! আজ বিজাতি অভ্যুত্থানের নীলনকশা তৈরী করছে, কাল মুসলিম ফৌজই আপনার টুটি টিপে ধরতে আসবে। সেনাপতি বললেন।

বিদ্রোহ! অভ্যুত্থান! কেমন বিদ্রোহ। কোন ফৌজ অভ্যুত্থান করবে? আমার জানা নেই। খোদার দিকে চেয়ে খুলে বল। আবদুর রহমান চমকে ওঠেন।

আপনি এজন্য জানেন না যে, দরবারী চাটুকাররা আপনার চোখ-কান বন্ধ করে দিয়েছে। আপনার নিকটতম তোষামোদকারী বেসরকারী উপদেষ্টারা যেটা বলে দেবেন কেবল সেটাই আপনি শুনবেন। এক নর্তকী আর সুরেলা গায়ক আপনার ভেতরকার সিংহপুরুষকে হত্যা করে ফেলেছে। এদেশ স্বাধীনচেতা মর্দে মুজাহিদদের। আপনি তাদের আমীর নন-আমীর জনতার, হাজেব বললেন।

না হাজেব! সুলতানা আমাকে ধোঁকা দিতে পারে না। যিরাব আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না।

কে ধোঁকা দিল-আর কে দিল না, কে নেমকহারাম আর কে নেমক হালাল–তাও বলতে আসিনি আমরা। এর প্রতি আমাদের কোন আকর্ষণই নেই। আমাদের ক্ষোভ সেসব বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে যারা স্পেন হতে ইসলামের নাম-নিশানা মিটিয়ে দিতে চায়। খুব চিন্তা-ভাবনা করে দেখবেন আমীরে মুহতারাম।

উবাইদুল্লাহ ও হাজেব গুপ্তচরদের ডেকে পাঠালেন। আমীরের সম্মুখে তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে নির্দেশ দিলেন। তারা বিস্তারিতভাবে রিপোর্ট পেশ করলেন। হাজেব ও উবায়দুল্লাহও এতে কিছু প্রবৃদ্ধি ঘটালেন।

***

আবদুর রহমানের ভেতরের সিংহপুরুষটা সজাগ হয়ে ওঠল।

ওদিকে ওপাশের কামরায় যিরাব ও সুলতানা আক্ষেপে উরু চাপড়াচ্ছিল। সুলতানা কক্ষের শার্সিতে আড়ি পেতে এতক্ষণের আলাপ শুনেছেন। তিনি বললেন,

দুরাচাররা বাদশাহর ভেতরটা জাগিয়ে তুলেছে। তিনি একবারের জন্যও ময়দানে নামলে আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাবেন। আমরা সেক্ষেত্রে ব্যর্থ হব। এলোগেইছ বলেছে, বিদ্রোহীরা প্রস্তুত। ওদিকে ফ্রান্স সম্রাট লুই আর বার্সিলোনা ও গোথের বাহিনীও প্রস্তুত। কিন্তু এ তথ্য এরা পেল কি করে? এলোগেইছকে জানিয়ে দেয়া দরকার যে, মুসলিম টিকটিকিরা তোমার প্রস্তুতি জেনে ফেলেছে। জেনে ফেলেছেন আবদুর রহমানও। এদুলোককে পাক্কা টিকটিকি মনে হচ্ছে। যিরাব বললেন।

হা! এরা টিকটিকিই বটে। ওদের খতম করা জরুরী।

যিরাব খুবই চৌকস লোক। তিনি বললেন হত্যা করলে কোন লাভ হবে না। তাদের স্থানে আরো দুজন এসে যাবে। তার চেয়ে টোপ ফেলে ওদেরকে আমাদের দলভুক্ত করতে পারি। ওরা সরকারী গোয়েন্দার ছদ্মাবরণে থাকলেও প্রকৃতপক্ষে কাজ করবে এলোগেইছের হয়ে। এরা সেনাপতি ও প্রধানমন্ত্রীকেও ধোঁকা দিতে সক্ষম।

এনামস্বরূপ এদেরকে হেরেমের সুন্দরী নারীকে দিতে পারি। এই এনামের বিনিময় ওরা আমাদের গোলাম হবে। বলে সুলতানা আবারো আড়ি পাতলেন। উবাইদুল্লাহ বলে যাচ্ছে আর সুলতান শুনে যাচ্ছে। তার চেহারার রং-এ এসেছে পরিবর্তন।

প্যাম্পোলনায় ফ্রান্সীয় কাউন্ট আবলুস ও আইসেন এয়ার্স-এর ফৌজ হামলা করেছে। আপনাকে বলা হয়েছে এ ফৌজ পিছপা হতে গিয়ে সংকীর্ণ উপত্যকায় মুসিবতের সম্মুখীন হয়েছে। ওরা ওই সংকীর্ণ গিরিপথে চরম মার খেয়েছে। বেশুমার ফৌজ বন্দী হয়েছে। এক্ষণে বার্সিলোনা আক্রান্ত হবার সম্ভবনা।

তোমরা কি মনে করছ? প্রথমে জেনে নাও, এই সম্ভাবনার ভিত্তি কতটুকু? ভুলও হতে পারে। বললেন আবদুর রহমান

আমিও হাজেব আপনার কমান্ডে কাজ করতে পারলে গৌরববোধ করব। দূত রওয়ানা করে দিয়ে আমরা সেনাপতি ও উজীর হিসেবে এখানে বসে থাকব আর অধীনরা আমাদের সালাম করবে-এই হয় কি? আমীরে মোহতারাম আমরা আমাদের দায়িত্বে এতটুকু শিথিলতা আনিনি। দুশমনের মোকাবেলায় আপনি এমন ঔদাসীন্য মনোভাব দেখালে এ মুহূর্তে ইসলাম ও মুসলিম জাতিকে রক্ষায় যা করার দরকার, আপনার নির্দেশ উপেক্ষা করে হলেও তা আমরা করে যাব। আপনার গদীরক্ষার জন্য আমাদের ব্যবহার করতে যাবেন না। দুশমন সে দুশমনই। ওদের মিত্রতাও শক্রতা। আমরা সীমান্তে ফৌজ পাঠাতে চাই। এদের নেতৃত্ব থাকবে আমার হাতে। আমরা এক্ষণে যা চাইব তা দিতে হবে আপনাকে। সেনাপতি বললেন।

তোমাদেরকে সকালে বলব। খানিক ভাবতে দাও। আবদুর রহমান বললেন। সকালে আমরা মার্চ করব। অর্ধেকটা ফৌজ কর্ডোভায় থাকবে। এদের নেতৃত্বভার থাকবে হাজেবের হাতে। আপনার অজানা নয়, হাজেও একজন দক্ষ সেনানায়ক। আমার অনুপস্থিতিতে বিদ্রোহ হলে হাজেবই এদের দমন করবেন। উবাইদুল্লাহ বললেন।

আমি আমীরে মুহতারামকে জানিয়ে দিতে চাই আমার কর্মকাণ্ড আভিজাত্যপূর্ণ হবে না। আমি সেই বিষবৃক্ষের শিকড় উপড়ে ফেলব যারা উপর দিয়ে মুসলমান সেজে তলে, তলে খ্রীস্টানদের মদদ দিয়ে চলেছে। ওদের রক্তে গোসল করে লাশ পুড়ে ছাই বানাব। হাজেব বললেন,

সুলতানা তখন শার্সিতে আড়িপাতা। তার কানে আবদুর রহমানের আওয়াজ এলো, তোমরা প্ল্যান-প্রোগ্রাম তৈরী কর। যেখানে যখন যত সৈন্য প্রয়োজন পাঠাও।

উবাইদুল্লাহ ও হাজেব বেরিয়ে গেলেন।

ওরা চলে গেল। যিরা সুলতানাকে বলল, খেয়াল রেখো সুলতানা! বাদশাহ যেন টের না পান– আমরা তার এই ফয়সালায় ক্ষুব্ধ। কথা আমাকে বলতে দিও।…. কাল এলোগেইছকে বিস্তারিত রিপোর্ট জানাবে। সে-ই ভাল বুঝবে-এ অবস্থায় করণীয় কি।

আজকের আলোচনা ও সিদ্ধান্ত দ্বারা এতটুকু অনুধাবন করা গেল, আমাদের প্রভাব আবদুর রহমানের ওপর পুরোপুরি পড়েনি। তার ভেতরের সিংহপুরুষ এখনও নিস্তেজ হয়ে যায়নি। সুলতানা বললেন।

আবদুর রহমান তাদের ডেকে পাঠালেন। ওরা ফওরান এসে পড়ল। সুলতানা জিজ্ঞেস করলেন, সালার ও উজীর কেন এসেছিলেন? আবদুর রহমান তাদেরকে সব কথা খুলে বললেন।

জিন্দাবাদ স্পেনরাজ! যিরাব বলল, সৈন্য মার্চ করতে বলে আপনি বিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। কাফেরদের কেটে শত টুকরা করা দরকার। ইতিহাসে আপনার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

সুলতানা আবদুর রহমানের গাঁ ঘেষে গলায় হাত রেখে সোহাগ করে বললেন, স্পেনরাজ মর্দে-মুমিন ও মর্দে মুজাহিদ। আপনার পৌরুষ ও দুঃসাহসিকতা-ই আমাকে হেরেমে এনেছে। আমি আপনার মত বীর মুসলিমের মেয়ে। আরবী বংশোদ্ভূত ঘোড়ায় চেপে ময়দানে নামতে ইচ্ছে করে।

তুম যাবে কেন? সুলতানাকে কোলে চেপে আবদুর রহমান বলেন, তোমার জন্য আমি আমার গোটা ফৌজ ফরমান করতে পারি।

স্পেনরাজ আরেক বার বাস্তব দুনিয়া থেকে ছিটকে পড়লেন।

***

যারা ধর্ম ও দেশের প্রতি মুহাব্বত রাখেন তারা যেমন মিত্রদের চেনেন তেমনি চেনে শত্রুদের। নিশ্চিন্তে তারা কখনও হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেন না। ইউরোপিয়ানদের বেলায় আমরা এমনটা দেখতে পাই। তাদের সীমার ওপর হেলালী নিশান প্রোথিত হয়েছিল। তারা শংকা করছিল, ইসলামের অগ্রযাত্রা এখনই রোধ করা না গেলে এটা গোটা ইউরোপ দখল করে তবেই ক্ষান্ত হবে। সুত্রং তারা নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিল। সূচনাতেই তাই তারা ইউরোপের প্রবেশদ্বার স্পেনে হামলা শানাল ও সীমান্তবর্তী বসতি ছিন্ন ভিন্ন করে চলল। সীমান্তবর্তী মুসলিম ফৌজ এদের যথাসাধ্য প্রতিরোধ করে যেতে লাগল। এতে মুসলিম ফৌজে ক্রমশঃই ঘাটতি দেখা দিল ও নয়া ফৌজ ভর্তি করা শুরু হল।

ইউরোপিয়ানদের যখন এই অবস্থা তখন মুসলিম শাসকবর্গ নিশ্চিত প্রাসাদে দাবার খুঁটি চালছিল। পরিণতিতে স্পেনের সীমানা সম্প্রসারিত হওয়ার ক্ষেত্রে আরো সংকুচিত হতে লাগল। কুদরত প্রতি শতাব্দীতে স্বাধীনচেতা মর্দে মুজাহিদ সৃষ্টি করলেন যদরুন তারা আট শতাব্দী পর্যন্ত স্পেনকে মুসলিম শাসনে রাখতে পেরেছিলেন। স্বাধীনচেতা মনোভাবের লোক যেহেতু বাদশাহ আমীর কিংবা খলীফাগণ ছিলেন না সেহেতু এক সময় এই মনোভাবেও চিড় ধরল, কাজেই এক সময় হাল ধরার মত কাণ্ডারীও ফুরিয়ে গেল।

স্বাধীনচেতা এমন এক মর্দে মুজাহিদ ছিলেন উবাইদুল্লাহ বিন আবদুল্লাহ। তিনি ভ্যালেন্সিয়ার অধিবাসী। আরেকজন হাজেব আবদুল করীম যিনি তার অধীনদের নিয়ে বিলাসী শাসকদের বিরুদ্ধে আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন আমৃত্যু।

রাতের বেলায় সালার উবাইদুল্লাহ তার ফৌজ ও সহকারী কমান্ডারদের জাগ্রত করেছিলেন। বলেছিলেন, আমাদের দেশে বিদ্রোহের ধূম্রগিরি উদগীরণ হতে যাচ্ছে। এ থেকে আমাদের দৃষ্টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে দুশমন সীমান্তে হামলা শুরু করে দিয়েছে ইতোমধ্যে।

আমাদেরকে একটি প্রাবনে ভাসিয়ে নিতে দুশমন ফুঁসে উঠছে। আমাদের বাহিনীকে কমান্ডারের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যশীল থাকতে হবে। লড়তে হবে দুর্গম গিরি, কান্তার মরু ও দুস্তর পারাবারে। জীবন দিতে অকুষ্ঠ চিত্ত থাকতে হবে। আল্লাহর সৈনিক অন্যান্য সৈনিক থেকে পৃথক। মহান এক উদ্দেশ্যে আমাদের লড়াই। কোন ব্যক্তি বিশেষ বা খান্দান বিশেষের ক্ষমতার আসন পাকাঁপোক্ত করার জন্য আমরা লড়াই করি না। আল্লাহর আইন মানব-জীবনে প্রয়োগ করার উদ্দেশ্যেই আমাদের লড়াই। কুফর খতম না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের লড়াই চালিয়ে যাওয়া ফরয-আমাদের লড়াই কোরআনের এ আয়াতকে সামনে রেখেই।

আমাদের সেপাইদের তারিক বিন যিয়াদের ঐতিহ্য মনে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, অল্প কজন সৈন্য নিয়ে তারা এদেশে এসেছিলেন। সেই জানবাষ শহীদান আমাদের পবিত্র আমানত। স্পেন উপকূলে নেমেই তারা রণতরীগুলো জ্বেলে দিয়েছিলেন। সেই চেতনা পুনরুজ্জীবিত করতে হবে।

যে কথা আমি বলতে চাচ্ছি, তা তোমাদের সিপাইদের বলো চাই না বলল, তোমরা ধ্যান-খেয়ালের সাথে শুনে নাও-খলীফার পক্ষ থেকে যিনি আমীর নিযুক্ত হয়েছেন সম্প্রতি তাকে বাদশাহ খেতাবে ডাকা শুরু হয়েছে। এটা অনৈসলামিক পন্থা। ইসলামী শাসনব্যবস্থায় কোন বাদশাহ হয় না, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আজ আমাদের ওপর এমন বাদশাহ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, যে নামকাওয়াস্তে মুসলমান আর তার কর্মকাণ্ড সবই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল বিরোধী। তার হেরেম আবাদ হচ্ছে গায়ক ও খেমটা নর্তকীদের দ্বারা।

আমাদের বর্তমান আমীরের অবস্থা এমন-ই। তোমাদের পুঞ্জীভূত অভিযোগ পুঁজি করেই বলছি, আমীর সাহেব কোনদিন তোমাদের সাথে দেখা করেননি। নিজ চোখে কোনদিন দেখেননি তোমাদের হাল-হকিকত। তোমাদের অনেকেরই জানা আমাদের বাদশাহ রাগ-রাগিনীতে আসক্ত। সুতরাং এক্ষণে ময়দানে লড়ে লাভ কি।

এমন খেয়ালের কেউ থেকে থাকলে বাহিনী থেকে বেরিয়ে যাও। এ যমীন খোদা তাআলার- তোমরা এর রক্ষক। যার যার কবরে সে যাবে। বাদশাহ তোমাদের কবরে আর তোমরা তাঁর কবরে যাবে না। আমি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলতে চাই, যে দেশে কোরআনের শাসন কায়েম হয় সে দেশ কোন ব্যক্তি বা বংশের জায়গীর হতে পারে না। আমরা সবে এ দেশের মালিক, সুতরাং এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমাদের সকলের। বাদশাহর দরবারে নয় আমাদের জবাবদিহি করতে হবে প্রভু পরওয়ারদেগারের দরবারে। এই মহান উদ্দেশ্যে সামনে নিয়েই মুসলমানরা লড়ে থাকে। জয়-পরাজয়ের তোয়াক্কা নেই তাদের।

এভাবে জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে উবাইদুল্লাহ উপ-সেনাপতিদের রক্ত গরম করে দিলেন। সকাল বেলা সমস্ত উপ-সেনাধ্যক্ষ মার্চ করলেন।

***

সৈন্যবাহিনীর অগ্রযাত্রা ছিল খুবই তেজোদীপ্ত। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে এরা শহরের গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। আবদুর রহমান ন্দ্রিা থেকে গাত্রোখান করে পি এ-র মাধ্যমে সেনাপতিকে খবর দিয়ে বললেন, আমি বাহিনীকে বিদায় জানাতে চাই।

ফৌজ এ মুহূর্তে শহরের চৌহদ্দী থেকে অনেক দূরে চলে গেছে আমীরে মোহতারাম! হাজে আপনার অপেক্ষায় আছেন। পি এ বললেন।

তাকে ভেতরে ডেকে পাঠাও। হাজেব এলে তিনি বললেন, উবাইদুল্লাহ খানিক অপেক্ষা করতে পারত না?

না, আমীরে মোহতারাম? দুশমন এ খেয়াল করে না যে, তাদের প্রতিপক্ষ বাদশাহর বিদায়ী সালাম নিয়ে এসেছে কি-না। বিদায়ী সালামের সময় নেই আমীরে স্পেন। অবধারিত দায়িত্বের হাতছানি এমনই হয়। হাজেব বললেন।

আবদুর রহমানের মনে চাপা ক্ষোভ থাকলেও তা প্রকাশ করার সাহস পান না। হাজেব তাকে শুনিয়ে যান খ্রীস্টানদের কচুকাটা করার প্ল্যান একের পর এক।

সীমান্তের প্যাম্পোলোনা চৌকি।

দুফ্রান্সীয় কাউন্ট এখানে কিছুদিন পূর্বে হামলা করেছে। বেশ কিছু মুসলমানদের তারা বন্দী করে নিয়ে গেছে। তাদের সাথে এরা পাশবিক ব্যবহার করেছে।

কদিনের ব্যবধানে সালার উবাইদুল্লাহ এখানে এসে উপনীত হন। তিনি এখানকার অধিবাসীদের মাধ্যমে এখানকার অবস্থাদি পর্যবেক্ষণ করেন। জানতে পারেন, খ্রীস্টানরা সীমান্তে দুর্গ স্থাপন করেছে। এই কেল্লাপ্রাচীর টপকানো চাট্টিখানি কথাতো নয়। উবাইদুল্লাহ স্পেন পাড়ি দেয়ার অনুমতি আবদুর রহমান থেকে নেননি। নেয়ার প্রয়োজনও মনে করেননি। প্রয়োজনে তিনি সীমান্ত অতিক্রম করবেন-এক্ষণের সিদ্ধান্তে তার কতকটা এমন-ই।

গভীর রাত।

সীমান্তবর্তী কিছু গাইডের মাধ্যমে তিনি স্পেনসীমানার বাইরে পা রাখেন। গাইডরা তাকে বড় কেল্লাটি দেখান। তাদের চলার শক্তি দ্রুত। আঁধার রাতে তারা কেল্লা ঘেরাও করেন। এর পরপরই কামান থেকে পাথর ছোঁড়া শুরু করেন সাথে সাথে নিক্ষেপ করেন অগ্নিগোলা। কামানের পাথর আর অগ্নিবান ওইযুগে শক্রমনে বিভীষিকা সৃষ্টি করত।

খ্রীস্টানরা কেল্লাপ্রাচীর থেকে তীর নিক্ষেপ শুরু করে কিন্তু ওদিকে উবাইদুল্লাহ ও তার বাহিনীর মধ্যে চরম উত্তেজনা। তাঁদের কমান্ডার তেঁতে আগুন। অনেক ফৌজ তীর মারতে কেল্লা প্রাচীরে পৌঁছে যায়। তারা কুঠার দ্বারা কেল্লাঘার ভাঙ্গতে শুরু করে এক সময় দরজা ভেঙ্গে ফেলে। তুমুল রক্তক্ষয়ী লড়াই শুরু হয়। বানের পানির মত মুসলিম ফৌজ কেল্লাভ্যন্তরে প্রবেশ করে। এদের অনবরত বর্শাঘাতে বিপক্ষ বাহিনী জাহান্নামে পৌঁছতে থাকে। লাশের পাহাড় হয়ে যায়। এর পরের লড়াই উবাইদুল্লাহ বাহিনীর খ্রস্টানদের লাশে পাহাড় রচনার লড়াই।

মুসলিম কয়েদীরা এই কেল্লায়ই ছিল। তাদের পায়ে ডাবেড়ী। রাতে ওই বেড়ীর সাথে শেকল পেঁচানো হত। চতুষ্পদ জন্তুর মত তাদেরকে খোয়াড়ে রাখা হত। এদের সকলকে মুক্তি দেয়া হলো।

এরপর দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ কেল্লা অবরোধ করা হলো।

উবাইদুল্লাহ যখন ওখান থেকে ফিরে আসেন তখন ওখানে খ্রিস্টান লাশের পাহাড় আর কেল্লায় ধূম্রকুণ্ডলী ঘুরপাক খাচ্ছিল।

১.২ প্রতিরোধ

স্পেনভূমি বিদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রের আখড়ায় রূপ নিতে লাগল। এক শাসকের পর আরেক শাসক স্থলাভিষিক্ত হত। খেলাফতের গদীতে একের পর এক খলিফা আসীন হতে থাকল। বিদ্রোহ ও ষড়যন্ত্র কমা তো দূরে থাক আরো বাড়তে লাগল। স্পেন শাসক যিনি কেন্দ্রীয় খেলাফতের গভর্নর ছিলেন নিজকে বাদশাহ বলে ঘোষণা করলেন। আপনার দায়িত্ব সম্পর্কে বিলকুল উদাসীনতার পরিচয় দিলেন। তারা ইসলামের মহান শিক্ষা ভুলে গেলেন। ভুলে গেলেন ঔসব শহীদানের রক্তস্নাত কাহিনী যাদের বুকের তাজা খুনে স্পেনের সীমানা বাড়ছিল। এসব দুর্নীতিবাজ শাসকের মাথায় ক্ষমতায় নেশা চেপে বসে। রাজত্ব ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার ওপর আলোচনার স্থলে এদের প্রাসাদ চাটুকারিতা ও তোষামোদী চর্চা হতে থাকে।

বিদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রের ভিত্তিমূলে ছিল খ্রিস্টান জাতি আর এদের পৃষ্ঠপোষকতা করছিল স্পেনের প্রতিবেশী রাজন্যবর্গ। আমরা ওদের সমালোচনায় কলম ধরতে চাই না। ধরব কি করে-ওরা তো প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়েছিল, ইসলাম ও মুসলমানদের ইউরোপ থেকে নিশ্চিহ্ন করেই আমরা দম নেব। ওরা একে ধর্মীয় যুদ্ধ সাব্যস্ত করেছিল।

স্পেনের মুসলিম শাসকদের প্রথম ও একমাত্র লক্ষ্য থাকা উচিত ছিল, ইসলাম ও মুসলমানদের জানমাল রক্ষার্থে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো। কিন্তু তারা এর স্থলে নিজেদের গদীরক্ষার প্রচেষ্টা চালিয়েছিল সেদিন পুরোদস্তুর। পরিণতিতে এক শাসক মারা গেলে তার স্থলাভিষিক হিসেবে বেশ কজন দাবীদার দাঁড়িয়ে যেত। গদীতে বসতে পারত। একজন, কিন্তু এর ফলশ্রুতিতে তার জ্ঞাতী ভাই ভাইয়ের দুশমনে পর্যবসিত হত এবং তারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হত। দুশমন ওই সুযোগে সীমান্তে মাথাচাড়া দিয়ে উঠত। দেশের অভ্যন্তরে বিদ্রোহ আর সীমান্তে যখন শত্রুর আনাগোনা তখন প্রাসাদে অবস্থানরত চাটুকাররা রিপোর্ট দিত, দেশ পুরা শান্ত। কোথাও কোন কোন্দল নেই। এসব জ্ঞান-পাপীরা স্বজাতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখেও মুখে কুলুপ এঁটে দিত।

মুসলিম ইতিহাসে চাটুকারিতা তেমন একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি, কিন্তু স্পেনে এর ব্যতিক্রম দেখা গেছে প্রতিযুগেই। স্পেন প্রাসাদের চাটুকাররা ছিল খুবই অভিজ্ঞ ও চৌকস। এরা উপদেষ্টা ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে নিযুক্ত ছিল। ওর যাদুকরি ভাষণে গভর্নরকে কুপোকাত করত। ওদের অন্তরে কোন ন্যায়নিষ্ঠা ছিল না, ছিল না চিন্তায় গভীরতা। জাতির দরদে, ধর্মের দরদে ওদের চিন্তার ললাটে ভাঁজ পড়ত না। রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোতে কোন বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকাও ছিল না। স্পেনে এমন কর্মকাণ্ড হয়ে আসছিল এবং ওইভাবে হয়ে যাচ্ছিল। ইতিহাস থেকে বিমুখ জাতি আমরা। আমাদের পদস্খলন ও নির্বুদ্ধিতাকে চাটুকারদের জ্ঞানের আলোকে চালিয়ে দেয়ার জাতি আমরা। আগামী বংশধরেরা শাসকবর্গের ওপর বিরাগভাজন হয়-এমন ইতিহাস লিখতে আমরা হীনমন্যতার পরিচয় দিয়ে নেহাৎ জুলুম করেছি। স্পেনের ইতিহাস লিখতে হচ্ছে ল্যাটিন কিংবা অমুসলিম ইউরোপিয়ানদের একপেশে ইতিহাসের ওপর ভর করে। এসব ইতিহাসবেত্তা যেখানে গ্রানাডা ট্রাজেডির কথা লিখতে গিয়ে খ্রিস্টানদের বিরোচিত কাহিনী উল্লেখ করেছে সেখানে অন্ধকার ইউরোপের রন্ধ্রেরন্ধ্রে ইসলামের আলো বিকিরণকারী মুসলিম সিংহপুরুষদের কথাও না এনে পারেনি।

স্পেন থেকে ইসলাম সেদিনই বিদায় নিতে শুরু করেছিল যেদিন কেন্দ্রীয় খলীফার নিযুক্ত গভর্নর নিজকে বাদশাহ খেতাব দেয়া শুরু করল এবং চাটুকার কর্তৃক দেশ চালাতে লাগল। কিন্তু তদানীন্তন মুসলিম ফৌজে এমনও কিছু মর্দে মুজাহিদ ছিলেন যারা শাসনবর্গের বিলাসিতা ও হেরেমে নারী সমাবেশ দেখে বিরাগভাজন হয়ে নিজেরা দেশ ও জাতির জন্য জান কোরবান দিয়েছিলেন। তুলে ধরেছিলেন খোদার দ্বীনকে সবার ওপরে।

দ্বিতীয় আবদুর রহমানের যুগে বিদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রের কুটিল জাল বিস্তার লাভ করছিল। ক্রমশঃ বেড়ে চলছিল এর সিলসিলা। ষড়যন্ত্রের এই বীজ প্রথমদিকের শাসকবর্গের যুগেও ছিল। যেহেতু তারা এর মূলোৎপাটন করেননি, সেহেতু পরবর্তীতে এর শাখা-প্রশাখা বিস্তার লাভ করে বিশাল মহীরূহে পরিণত হয়।

আবদুর রহমান সবচেয়ে বিষধর যে সাপটিকে তার দরবারে দুধকলা দিয়ে পুষছিলেন যিরাব তম্মধ্যে অন্যতম। অনেক ঐতিহাসিক যিরাবকে বড় শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ কয়েছেন। তারা তাকে পাক্কা মুসলমান ও চৌকস বলে মত ব্যক্ত করেছেন। করেছেন। তাকে দেশ প্রেমিক হিসেবে চিহ্নিত।

সে জ্ঞানী ও চৌকস ছিল বটে তবে তার সবখানিই ব্যয়িত হয়েছে চাটুকারিতায়। ইতিহাসবেত্তারা লিখেছেন, লোকটা সজ্ঞানে ও পাণ্ডিত্যে কর্ডোভার দরবার মাত করে দিত। একদিকে যেমন সংগীতজ্ঞ অন্যদিকে তেমন কূটনীতিবিদও। আবদুর রহমান তার খোদাপ্রদত্ত মেধা ও কর্মকুশলতায় এতই হতবাক হন যে, তাকে শেষ পর্যন্ত প্রাইভেট সেক্রেটারী হিসেবে নিয়োগ দেন। এছাড়া বাগিতা ও তর্কে তার জুড়ি ছিল না।

জন্মগত কারিশমা ও অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর তার সংগীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এছাড়া সে বিজ্ঞ ফ্যাশন ডিজাইনার ছিল। সাদা কাপড়ের ওপর নকশা ও ফুল বুননে ওই যুগে সে অদ্বিতীয় হিসেবে আখ্যা পায়। নারীদের এমনও পোশাক সে বানাতে পারত যা তাদেরকে নগ্ন বানানোর নামান্তর। চিত্ত বিনোদনের নামে নিত্য-নতুন প্রোগ্রাম তৈরিতে ওস্তাদ ছিল এই যিরা। যে স্পেনে একদা আরবী তাহযীব-তামাদুন জারী ছিল এই লোক সেখানে সাংস্কৃতিক বিপ্লব আনল। আরবী কালচার বদলে গেল। যিরাবের রকমারি শৌখিন ফ্যাশন ও আধুনিকতার নিপুণ ছোঁয়াই এর মূলে কাজ করেছিল সেদিন।

আরব থেকে আগত মুসলমানরা বাবরী চুল ও লম্বা দাড়ি রাখতেন। যিরাবের সাংস্কৃতিক বিপ্লব সেই আরবদের বাবরী পাংক-এ এবং পোষাকে ইউরোপিয়ান স্টাইল আনল। তাদের দাড়ি ছোট হতে লাগল। এক সময় শেভ শুরু হলো। দূর আকাশের ওই হাজার সিতারা তার নীরব ভাষায় বলে চলেছে, ক্রুসেডাররা মুসলমানদের স্পেনছাড়া করেনি বরং যিরাবের মত সাংস্কৃতিক কর্মীরাই এ জাতিকে ডুবিয়েছে। স্পেন ট্র্যাজেডি প্রমাণ করেছে, যে জাতিকে তলোয়ার দ্বারা নিশ্চিহ্ন করা যায় না, সাংস্কৃতিক বিপথগামিতাই তাদের নাস্তানাবুদ করতে যথেষ্ট। যিরাবই নারী সুষমাকে পরপুরুষের সামনে সুন্দর আদলে ফুটিয়ে তুলেছিল। খোশবু আতর আবিষ্কার করেছিল।

ধুরন্ধর যিরাবের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মুসলিম মননের পরতে পরতে প্রভাব সৃষ্টি করল। সে প্রবাদ পুরুষ বনে গেল। কুদরত তাকে এমন বিস্ময়কর মেধা দান করেছিলেন যদ্দরুন সে নিত্য নতুন ফ্যাশন উদ্ভব ঘটাতে লাগল। তার প্রকৃতিই এমনটা হয়ে গিয়েছিল।

যিরাবের প্রভাব রান্নাঘর থেকে রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। স্পেনরাজ পর্যন্ত তার প্রতি অনুরাগী ছিল। যে সব তদবিরকারগণ বাদশাহর দরবারে প্রবেশানুমতি পেত না তারা যিরাবের শরণাপন্ন হতেই মুশকিলে আসান হত। এর ফলে বাদশাহ-বেগম, উজির-নাজির, শাহযাদা-শাহযাদীদের চোখে সে অল্প দিনেই প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে। বিশেষ করে আবদুর রহমানের নিঃসঙ্গ মুহূর্ত তাকে ছাড়া চলেই না।

সুলতানার আলোচনা ইতিপূর্বে হয়েছে। আবদুর রহমানের দিবানিশির স্বপ্ন ওই কালনাগিনী। তিনি যখন যিরাবের সাথে প্রেম নিবেদন করেন তখন প্রমাণ মেলে যে, সুলতানা যিরাবের– আবদুর রহমানের নয়। এই প্রেমাভিনয়ের পেছনে ইসলামের ঘোরতম দুশমন এলেগেইছের হাত ছিল-যিরাব যা বুঝতে পারেনি। অন্যের ওপর কথার যাদু বিস্তারকারী যিরাব বুঝতে পারল না-সুলতানা তার ওপর যাদু করেছে। এদিকে আবদুর রহমান ঠাহর করতে পারেননি যে, তার সবচে অনুরাগী দাসী তুরুবের রাণী তার নয়-ফিরাবের।

আবদুর রহমানের দরবারে যখন সংগীত আর রূপবতীর এই রূপ-যৌবনের লুকোচুরি চলছিল তখন তার সেনাপতি প্যাম্পোলনায় খ্রিস্টানদের প্রতিরোধ করে যাচ্ছিলেন। তিনি ফ্রান্সের দু কাউন্টকে শোচনীয়ভাবে পরাভূত করলেন যারা অত্র এলাকায় লুটতরাজ ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে চলছিল। এবার তিনি তার বাহিনী নিয়ে কর্ডোভার পথ ধরলেন। তার এই প্রত্যাবর্তন একটানা হয়নি। পথিমধ্যে তিনি স্পর্শকাতর এলাকা পর্যবেক্ষণ করেন। সিংহভাগ এলাকাই পাহাড়ী ও ঘন-ঝোপে ঠাসা। তার কাছে এ মর্মে সংবাদ এসেছিল যে, খ্রিস্টানরা যুৎসই স্থানে গুপ্তঘাঁটি স্থাপন করেছে গেরিলা আক্রমণের জন্য। তার যেখানেই সন্দেহ হয়েছে সেখানেই তল্লাশি চালিয়ে তিনি ঘাঁটিসমূহ ধ্বংস করে দিয়েছেন। এজন্য তার প্রত্যাবর্তন ছিল খুবই ধীরগতির, ঢিমেতালের।

কর্ডোভায় তাঁর প্রত্যাবর্তনের প্রতি আবদুর রহমানের তেমন কোন আগ্রহ ছিল না। এদিকে হাজেব আবদুল করীম এবং অন্য আরেক সালার আবদূর রউফের উবাইদুল্লাহর ব্যাপারে বড় শংকা ছিল। তাঁরা দূত প্রেরণ করে তার সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিচ্ছিলেন।

সেদিন সালার আবদুর রউফ হাজেবকে বললেন, আমার শংকা হয় আবদুর রহমান এই সাম্রাজ্যকে রসাতলে দেয় কিনা। এর কি কোন প্রতিকার নেই?

আমরা আবদুর রহমানকে হত্যা করতে পারি। যিরাব ও সুলতানাকেও পরলোকের পথ দেখাতে পারি-কিন্তু এতে লাভ? আবদুর রহমান খান্দানেরই কেউ তার স্থলাভিষিক্ত হবে। পরে একটা রেওয়াজ হয়ে যাবে যে, হত্যা কর, ক্ষমতা দখল কর। এতে খেলাফত দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়বে। আমরা সাধ্যমত আমাদের দায়িত্ব পালন করে যাই-এই ভালো। বললেন-হাজেব।

স্পেন গভর্নরকে আমি একটা কথা বলতে চাই। দেশ শাসন কর-কিন্তু ইসলামের নাম মুখে এনো না। ধর্মের নামে সে আমাদের সাথে প্রতারণা করছে। নয়নাভিরাম মসজিদ নির্মাণ করছে। কথায় কথায় কোরআনের রেফারেন্স টানছে। এটা কি অপরাধ নয়?

আমার যা ধারণা, স্পেন অবক্ষয় নয় পতনের চোরাবালিতে আছড়ে পড়তে যাচ্ছে। শাসকবর্গ সংগীত, নারী ও চাটুকারদের পাল্লায় পড়লে দেশের ভিত্তিমূলে ঘুণ ধরা শুরু করে। শত্রুপক্ষ তাদের তলোয়ারে শান দিচ্ছে আর আমাদের ননীর পুতুল শাসকশ্রেণী ওদের দিকে মিত্রতার হাত বাড়াচ্ছে। কেননা ওদের সাথে অনাক্রমণ চুক্তি করলেই ক্ষমতা পাকাঁপোক্ত করা সম্ভব। আবদুর রউফ! তুমি তোমার দায়িত্ব সুচারুরূপে আঞ্জাম দিয়ে যাও-অনাগত ভবিষ্যৎ তোমাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। হতে পারে তোমার কর্মকাণ্ড তাদের জেহাদী জীবনে প্রাণসঞ্চার করবে। পক্ষান্তরে তুমি যিরাবের প্রদর্শিত অপসংস্কৃতির কোলে আশ্রয় নিলে জাতির ভিত্তিমূলে কুঠারাঘাত করবে। কালের গতিপথ যেভাবে বদলাচ্ছে তাতে আমার ভয় হয়, বিশ্ব একদিন না আবার ইসলামকে নগণ্য একটি মতবাদ ও কৌলীন্য প্রিয় জাতির ভ্রান্তি বিলাস মনে করে বসে। সেই প্রদীপে আমাদের তেল সঞ্চার করতে হবে, শহীদী খুনের দ্বারা যাকে প্রজ্বলিত করেছিলাম আমরা। কুফরী শক্তি ফুঁসে উঠছে, এরপরও হতে পারে আমাদের ভাগ্য প্রদীপ টিমটিম করে জ্বলবে। আগামীতে হয়ত এমনও বংশধর আসবে যারা ওই নিভু প্রদীপকে রাসূলে আরাবীর যুগের মত প্রদীপ্ত প্রত্যুজ্জ্বল করবে।

সালার আবদুর রউফের চেহারায় ঝিকিমিকি ও চোখে উদ্যমী আলোর রেখা ফুটে উঠল। এটি তার অধ্যাত্ম নূর যা মুখমণ্ডলে দীপ্ত হয়েছিল। তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা আত্মসম্ভ্রম বোধসম্পন্ন ব্যক্তিত্ববান–ক্ষমতা বা গদীর লোভে লোভী নন।

***

এমন ঝিকিমিকি কিছুটা যিরাবের চেহারায়ও যে ছিল না তা কিন্তু নয়। যিরাব যদিও মদ্যপ ছিল, কিন্তু তার মাদকতা সুলতানার জীবনে আসার পর আরো বেড়ে যায়। সুলতানার জায়গীরে সে ইতিপূর্বেও গিয়েছে। মহলে দম আটকে আসছে- মুক্ত বায়ু সেবনের এ অজুহাতে যিরাবসহ সুলতানা কতবার তার জায়গীরে গিয়েছেন এর ইয়ত্তা নেই। আবদুর রহমানের অস্বীকৃতির কোন সৎসাহস ছিল না। প্রথমদিকে তিনি চুপেচাপে যিরাবকে সাথে নিতেন, কিন্তু পরবর্তীতে একাকিত্বের জ্বালা ঘুচানোর অজুহাতে খোলামেলা সাথে নিয়ে যেতেন।

চাঁদনী রাত। কমলকুঞ্জে পুষ্পসৌরভ, দুর্বাঘাস মখমলের সবুজ গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে। এর ওপর কপোত-কপোতী উপবিষ্ট। নিথর-নিস্তব্ধ রজনী। কোথাও কোন সাড়া-শব্দ নেই। পিয়ানো যিরাবের সবচে আকর্ষণীয় বাদ্যযন্ত্র। এতে সুর তুলে সে শ্রোতাকে অচিনপুরীতে নিয়ে যেত। এতে সে সুর দিয়ে যে কাউকে অন্য জগতে নিয়ে যাবার যোগ্যতা লাভ করেছিল। সুলতানার তন্ত্রীতে খেলে যায় শিহরণ। কিন্তু এতদসত্ত্বেও সে যেন এর থেকে মুক্তি চাইছে। যিরাব বলে।

তুমি আমার পাশে না থাকলে আমার ব্যক্তিত্ব লোপ পায়। আমি তোমার সত্ত্বায়লীন হয়ে যাই। যিরাব সুলতানার হস্তস্পর্শ করে কাছে টানে। কাছে আসার স্থলে সুলতানা দূরে সরে। যিরাব মৃদু হাসে। বলে, তুমি জান না, কি পরিমাণ তৃষ্ণার্ত আমি। ওভাবে দূরে থেকো না।

খোদা তোমাকে জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়েছেন যিরাব। কিন্তু প্রেমরহস্য এখনও তোমার কাছে অজানা। তুমি কি সত্যিই তৃষ্ণার বিস্বাদ পাচ্ছ? সুলতানা বললেন।

বিরহের স্বাদ তুমি নিয়েছ কি কখনও? নাকি এতদসম্পর্কে তোমার কোন এক্সপেরিয়েন্স নেই?

বিরহের তড়পানিতে যে স্বাদ– বিরহে তা নেই। পুরুষের প্রকৃতিতে টোকা মারায় ওস্তাদ সুলতানা বললো, তোমার হয়তো জানা নেই স্পেনরাজ অন্ধ নন কিন্তু আমার প্রেমে তিনি তা-ই। তার প্রেমের বয়স আমার বয়সের চেয়েও বেশী। যেদিন তিনি আমার প্রতি বিরক্ত হয়ে যান সেদিন আমি হেরেমের নিকৃষ্ট এক কীটে পরিণত হই। আমি চাই না, তুমি আমার দেহের স্বাদ নিয়ে অমন বিরক্ত হও। আমি এক রহস্য। এই রহস্য ফাঁস হয়ে গেলে তোমার হৃদিক তড়পানিতে ভাটা আসবে। তুমি আমাকে খেল-তামাশার বস্তুতে রূপান্তরিত করলে তোমাকে নিছক রূপের হাটের সওদাগর মনে কবর। আমাকে আমার পূজা করে যেতে দাও।

যিরাবের হাতের বাঁধন ঢিল হয়ে এল। যিরাবের জীবনে সুলতানার এই আলাপ প্রথম নয়। যে তৃষ্ণা তিনি যিরাবের মনে পয়দা করেছেন ঠিক তদ্রূপ পয়দা করে আবদুর রহমানের বেলায়ও। মহলের তিন বাদির মধ্যে স্পেনরাজকে মত্ত রেখে সুলতানা তার যাদুকরী চাল চালিয়েই যাচ্ছেন। আবদুর রহমানের পাশে থেকেও দূরত্ব বজায় রেখেই চলতো এই রহস্যময়ী নারী।

***

সন্নিকটে অশ্বখুড়ধ্বনি শোনা গেলে যিরা বলল, এলোগেইছ এল বলে।

মনে হয় তা-ই। তুমি এখানে বস। আমি তার সাথে দেখা করে আসি। তিনি চলে গেলেন। তাদের ধারণা যথার্থ। আগন্তুক এলোগেইছ-ই। সুলতানা তার ঘোড়ার লাগাম জনৈক নওকরের হাতে তুলে দিলেন। এলোগেইছকে নিয়ে গেলেন, খানিক দূরে। বললেন, যিরা আছে আমার সাথে। আমি একটি মুসিবতে পড়ে গেছি এলোগেইছ! সে কথা তুমিও জানো যে, সে আমার প্রেমে দিওয়ানা। পরিণতিতে আমিও কেমন যেন তার প্রতি ঝুঁকে পড়ছি ক্রমশ। দেখো এলোগেইছ! তোমার কথামত আমি যতই ওর জন্য মরীচিৎকার অভিনয় করছি ততই হন্যে হয়ে সে আমার পিছু নিচ্ছে। কিন্তু এই বাস্তবতাকে এড়িয়ে যেতে পারছি না যে, ওর প্রতি আমারও দুর্বলতা আছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, ও নয় বরং আমিই ওর প্রতি প্রেমের পরাগরেণু ছড়াচ্ছি। এক্ষণে আমার জানার ইচ্ছা, কি যাদু আছে ওর মধ্যে যদ্দরুন আবদুর রহমানের মত ধীমান, জ্ঞানী ও চৌকস লোককেও মুরিদ সাব্যস্ত করতে পেরেছে? উপরন্তু দেখছি সে একটি জাতির তাহযীব-তামদুনও সমূলে বদলে ফেলেছে।

এলোগেইছ যেন তেন খ্রিস্টানের নাম নয়। সে যেমন খ্রিস্ট আলেম তেমনি মুসলিমও। সে যদিও সঙ্গীতজ্ঞ নয় তথাপিও জ্ঞান-গরিমা ও বাগ্মীতায় যিরাব থেকে কম নয়। সে খ্রিস্ট সমাজে মুসলিম বিরোধী এমন জীবাণু ছড়ায় যদ্দরুন তারা মুসলিম বিরোধী হয়ে যায়।

প্রেম কোন পাপকর্ম নয় সুলতানা! কিন্তু আত্মসচেতন লোকেরা আপনার অভিষ্ট লক্ষ্য ও ব্যক্তিত্বকে প্রেমের ওপর কোরবান করে না। আমরা তোমাকে সম্রাজ্ঞী বানাচ্ছি, সেই দৃষ্টি নিয়েই তোমাকে দেখে থাকি, কিন্তু অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছুতে তোমাকে নাটক করে যেতে হবে। সেই নাটকের একটা অংকে যিরাবের সাথে নায়িকার ভূমিকায় থাকতে হবে। ওর প্রতি মনের মাধুরী মেশানো টান দেখাতে হলে ওকে আত্মসচেতন হতে দেয়া যাবে না। সর্বদা তোমার রূপ-মাধুর্যে ডুবিয়ে রাখবে। শুনেছি সে আমাদের অনেক কাজ করেছে। সম্প্রতি এমনও লোকদের দেখেছি যারা আরব হয়েও পোশাক আশাকে আমাদের মত।

তুমি বহুত কমই দেখেছ, আমরা ওর চেয়েও সর্বক্ষেত্রে সফলকাম হয়েছি। বললেন সুলতানা

চলো সে আমাদের অপেক্ষায়! ওকে কোন প্রকার সন্দেহে ফেলা উচিত হবে না তোমাকে আবারও বলছি, আত্মসচেতন থেকো সর্বদা। যিরাবের দৃষ্টিতে সুন্দর থাকবে। রূপ-মাধুর্যে ডুবিয়ে রেখে কার্যোদ্ধারই এ মুহূর্তের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

হাঁটতে হাঁটতে ওরা এক সময় যিরাবের কাছে এলো।

তোমার কর্মকাণ্ড শোনা এবং শুনানোর মত দীর্ঘ সময় আমার হাতে নেই। আমার চাহিদা মোতাবেক তুমি কাজ করে যাচ্ছ বলে শুনেছি। আমার প্ল্যান বুঝতে পারায় তোমাকে ধন্যবাদ। এ স্বার্থ কেবল আমার নয়-তোমারও। ক্ষমতা-লোভী নই আমি যে, তোমাকে বলব স্বধর্ম ছেড়ে খ্রিস্টান হয়ে যাও। আমার দৃষ্টিতে ধর্মের কোন মূল্যায়ন নেই। মানবতার মুক্তিকামী আমি। তোমরা দুজন মানুষ। সুলতানা ভুবন মোহিনী আর তুমি উঁচুস্তরের সংগীতজ্ঞ না হলে তোমাদের এই পদমর্যাদা জুটতো কি, দরবারে যা হাসিল করেছো তোমরা। আবদুর রহমান স্পেন শাসন করার যোগ্য বলে তুমি মনে কর কি? শাসন করার যোগ্য সে তো তুমি-ই? যার যার মোগ্যতানুযায়ী প্রাপ্তি বুঝে নাও।

আবদুর রহমান সম্পর্কে আপনি ভুল ধারণা করছেন। যিরাব বলেন, তার যোগ্যতার কথা প্রতিবেশী খ্রিস্ট রাজন্যবর্গ অকপটে স্বীকার করেন। আপনার হয়ত জানা নেই যে, তার বাবা আল-হাকাম যখন আমাকে স্পেনে নিয়ে আসেন তখন প্রশাসনের লাগাম তার মুঠায় ছিল। বেশীর বেশী এতটুকু বলতে পারেন যে, আমি ও সুলতানা তার বুদ্ধিমত্তা ও মোগ্যতা উপেক্ষা করে কাজ করে যাচ্ছি। নারী ও সংগীতের প্রতি লোকটার টান না থাকলে স্পেনে কোন খ্রিস্টান বিদ্রোহের কথা কল্পনাও করত না। আজো কেউ তাকে আমাদের পথ হতে বিচ্যুত করলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যাবে। তবে আমি ও সুলতানা সহজে তা হতে দেব না। গোটা প্রাসাদে আমি মুসলিম চেতনা বিরোধী ইউরোপিয়ান কালচার চালু করে দিয়েছি। যেভাবে ধর্মের প্রতি আপনার কোন আকর্ষণ নেই সেভাবে নেই আমারও।

যিরাবের সত্যিই ধর্মের প্রতি কোন অনুরাগ ছিল না। কিন্তু এলোগেইছের ছিল শতকরা ১০০ ভাগই। যিরাবের মত জ্ঞানী মানুষ ঠাহর করতে পারল না যে, এলোগেইছ তাকে ধোকা দিচ্ছে। আবদুর রহমান নারী ও সংগীতের প্রতি দুর্বল মন্তব্য করে যিরাব নিজেই যে এক নরীর প্রতি দুর্বল তা বুঝতে পারল না। অনুধাবন করতে পারল না, সুলতানা তার বিবেকের ওপর সওয়ার হয়ে বিধর্মীদের স্বার্থোদ্ধার করে যাচ্ছে।

ওই রাতে তারা অনেক কথা বলল। পূর্ব প্রানেরই চর্বিত চর্বণ করা হলো এলোগেইছ সতর্ক লোক। সে ওদের কাছে গুপ্তকথার একবর্ণও উচ্চারণ করল না। ধুরন্ধর আর কাকে বলে।

***

সালার উবাইদুল্লাহ প্যাম্পেলনায় ফ্রান্সীয় ফৌজকে চরম মার দিয়ে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। তার বাহিনী ছিল ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন। পথিমধ্যে তিনি একটি ময়দানে খিমা গেড়েছিলেন। স্থানটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। সন্ধ্যার পূর্বক্ষণ। এ সময় দু ঘোড়সওয়ার আবির্ভূত হলো। সাধারণ মুসাফিরের মত দেখতে তারা। তারা জানাল, আমরা খ্রিস্টান ছিলাম, ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং সালারে আলার সাথে দেখা করতে চাই। রহস্যময় একটি কথা তাঁর কাছে বিবৃত করতে চাই। তল্লাশি করে এদের কাছে কোন অস্ত্র পাওয়া গেল না। শেষ পর্যন্ত তাদেরকে সালারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো।

হতে পারে এটা আমাদের ভ্রান্তি বিলাস। আগন্তুকদ্বয়ের একজন বলল, কিন্তু আমরা যা অবলোকন করেছি তা আপনার গোচরে আনা জরুরী মনে করেছি। আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি ইসলামকে মুক্তি ও শান্তির ধর্ম মনে করেই।

দীর্ঘ এই ভূমিকার পর তারা জানাল, আমরা ময়দানে বিচার করছিলাম আচমকা চার/পাঁচজন মহিলাকে একটি বাংকারে প্রবেশ করতে দেখলাম। পোশাক-আষাকে তাদেরকে অত্র এলাকার বলে মনে হলো না। এই বিজন অঞ্চলে তারা একাকী সফর করতে পারে না। আমরা দুজন এদের অনুসরণ করলাম। বাংকারটি পুরানো একটি গীর্জার মধ্যেই ছিল। আমরা দুজনই ওই নারীদের দেখেছি। দেখতে ওরা গ্রাম্য। জিজ্ঞাসা করেছি, তোমরা কে, কোত্থেকে এসেছ? কোথায় যাচ্ছ?

তারা বলল, আমরা মুসলমান, মুসলিম ফৌজের সাথে দূরত্ব বজায় রেখে চলছি। আমরা ফৌজের সালারের সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই। কিন্তু নারী হিসেবে আমরা সাক্ষাৎ করার সাহস পাচ্ছি না। আমাদের কাছে এমন তথ্য আছে, যা সেনাপতিকে ছাড়া আর কাউকে বলা যাবে না। দেখা না পেলে আমরা এমনিতেই চলে যাবো। ওরা এখানে এসে সব কথা শুনতে পারেন।

উবায়দুল্লার ঠোঁটে রহস্যপূর্ণ হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন– তোমরা কি আমাকে বেকুফ ঠাওরাচ্ছ?

পুরুষ হলে আমরা ধরে আনতাম, কিন্তু নারীর গায়ে হাত দিয়ে আমরা কোন সমস্যার জড়িয়ে যাই-এজন্য ধরে আনেনি। তদুপরি আমাদের সাথে আসতে বলেছিলাম, কিন্তু আমাদের সাথে আসতে রাজী হয়নি ওরা। ওদের দুজন কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। জানিনা, কি সে কথা যা তারা আপনার কাছেই বলতে চায়। আপনি কি নারীদের ভয়ে কুঁচকে গেলেন? না গেলে সে আপনার মর্জি। আমরা পর্যটক। এখান থেকেই আমাদের পথ আলাদা হয়ে যাবে।

ওদের কথায় সালার উবাইদুল্লাহ প্রভাবিত হয়ে রওয়ানা করলেন। সঙ্গে স্রেফ দুজন দেহরক্ষী। ওই এলাকায় তিনি তল্লাশি চালিয়ে যে থমথমে পরিবেশ সৃষ্টি করছিলেন তাতে কেউ তার সাথে প্রতারণা করবে বলে তার মনে হয়নি।

গীর্জাভ্যন্তরের সেই বাংকার সেনাছাউনি থেকে মাইল তিনেক দূরে। আগন্তুকদ্বয় অগ্রে অশ্বপৃষ্ঠে চলছিল। সালার দেহরক্ষীসহ এদের পেছনে। বাংকারের কাছে আসতেই নারীকন্ঠে কান্না শোনা গেল। ঘোড় সওয়াররা থমকে দাঁড়াল।

সামনে যাবেন না। তম্মধ্যে একজন বলল, এদের মানুষ বলে মনে হচ্ছে না। জিন-ভূত মনে হচ্ছে। ওরা কাঁদবে কেন? অত্যাচারিত হওয়ার মত কোন কথা তো ওরা আমাদের গোচরে আনেনি!

ভেতরে চিৎকার শোনা গেল বাঁচাও! জালেমদের কবল থেকে উদ্ধার কর! আগন্তুকদ্বয় তলোয়ার হাতে অশ্বপৃষ্ঠ হতে নেমে এল এবং বাংকারের দিকে এগিয়ে গেল। দেহরক্ষী দুজনও ওদের অনুসরণ করল। আগন্তুকরা ফিরে এসে বলল, চিৎকার থেমে গেছে। তারা সালার ও দেহরক্ষীদের বাইরে থামিয়ে এ কথা জানাল কিছু না! এমনিতেই ওরা কান্নাকাটি করছিল।

দেহরক্ষীরা বাইরেই থাক। আপনি ভেতরে যান। জরুরী কোন কথা হবে হয়তবা। এরা নিরিবিলিতে আপনার সাথে কথা বলতে চায়। আগন্তুকদের একজন বল।

উবাইদুল্লাহ ভেতরে গেলেন। উবুজুবু হয়ে পড়া ভগ্ন ছাদের নীচ দিয়ে তিনি এগিয়ে চলছেন, ভেতরে কেমন একটা উৎকট গন্ধ। উবাইদুল্লাহ কামরার ভেতরে প্রবেশ করলেন।

এখানে কোন নারী নেই। উবাইদুল্লাহ কোষ থেকে তরবারী বের করলেন। কামরাটিতে ৪টি দরজা। তম্মধ্যে একটি খোলা, ওই পথে তিনি তাকালেন। লঘু পদধ্বনি শুনতে পেয়ে তিনি পেছনে তাকালেন। দেখলেন উঁচুকায় বর্শাধারী দুলোক এগিয়ে আসছে। চেহারা-সুরতে এরা খ্রিস্টান। চোখে-মুখে হিংস্রতা। সালারের দিকে তাকিয়াই ওরা তাকে ঘিরে নিল। উবাইদুল্লাহর নিজ ভুলের উপলব্ধি হলো। আগন্তুকদের কথায় প্রভাবিত হওয়া ঠিক হয়নি।

কি চাও তোমরা? আচমকা প্রশ্ন করেন তিনি।

যা চাই তা পেয়ে গেছি। দুজনের একজনে বলল।

সালারে আলা! তোমার দুদেহরক্ষীকে আমরা শেষ করে দিয়েছি। দেউরীর দরজা থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল। তিনি ভড়কে পেছনে তাকালেন। এ কণ্ঠ সেই আগন্তুকদের যারা তার সাথে প্রতারণা করেছে। ওদের হাতে তলোয়ার। টাটকা রক্ত ঝরে পড়ছে তা থেকে।

তুমি এক্ষণে আমাদের হাতে বন্দী। ভয় নেই। আমরা তোমাকে হত্যা করব না। ফ্রান্স সম্রাটই এ বেলার বিচার করবেন। একজন বলল।

খ্রিস্টানদের হত্যার হিসাব দিতে হবে তোমাকে, আরেকজনে বলল।

আরেকজন অগ্রসর হয়ে বলল, তোমার তলোয়ার আমাদের কাছে সোপর্দ কর।

উবাইদুল্লাহ ঈমানদীপ্ত কণ্ঠে বললেন, জান দেব তবু তলোয়ার সোপর্দ করব না। তোরা ৮ জন, আমি একা, তোদের বর্ণা আমার দেহ ঝাঁঝরা করে রূহ বের করে নিলেই কেবল পারব তলোয়ার কজা করতে।

সাবধানে কথা বলো উবাইদুল্লাহ! আমরা তোমাকে হত্যা করতে চাই না, আমরা তোমাকে জীবন্ত বন্দী করতে চাই। কিন্তু শক্তি পরীক্ষা করলে অহেতুক জীবনটা ঘোয়াবে।

আমি এজন্যে পূজারী প্রস্তুত। জীবিত নয় মৃত উবাইদুল্লাহ-ই ফ্রান্স সম্রাটের প্রাসাদে যাবে।

আমরা ক্রুশ পূজারী। তোমার রাসূল (স)-কে ডাক, পারলে আমাদের হাত থেকে তোমাকে উদ্ধার করুক। আমরা তলোয়ার চাই-দিয়ে দাও।

তলোয়ার আমার রাসূল (স)-কেই দেব। রাসূলের অনুসারীরা দুশমনের হাতে তলোয়ার দেয় না।

এসময় বাইরে অসংখ্যা অশ্বখুরধ্বনি শোনা গেল, যা আচমকাই বন্ধ হয়ে গেল। জনৈক খ্রিষ্টান বলল, দেখতো? বাইরে কারা এলো?

ওদের একজন বেরিয়ে গেল। পরে ফিরে এসে বললো, একে হত্যা করে বেরোও।

সালার উবাইদুল্লাহ অনুমান করলেন তার সোকজন এসে পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে এরা খোঁজারু বাহিনী। এলাকায় বিচরণ করে পরিস্থিতির প্রতি নয়র বুলাত। সংখ্যায় জনাবিশেক। বাংকারের সামনে এসে তারা ঘোড়র গতিরোধ করল। তাদের-ই পরিচিত দেহরক্ষী বাহিনীর দুসদস্যের লাশ দেখে সন্দেহ হল। তারা আরো দেখল, এরা সেনাপতিরই দেহরক্ষী। তাছাড়া খালি ঘোড়াটি যে সেনাপতির এতে তাদের কোন সন্দেহ ছিল।

খ্রিষ্টানদের কমান্ডার ভেতরে এলো। সকলে তাকাল তার দিকে। উবাইদুল্লাহ তলোয়ার বের করলেন। এবং অতি কাছের এক খ্রিস্টানের গরদান কেটে ফেললেন। সেই সাথে ভীত কমান্ডার সকলকে ভেতরে ডাকলেন। কমান্ডারের নির্দেশ পালন করা হলো। কজন বাইরে দাঁড়িয়ে আগত মুসলিম সেপাইদের প্রতিহত করছে আর কজন বর্শাসহ উবাইদুল্লাহর ওপর আক্রমণ চালাল। যারা বাইরে বেরোল মুসলমানরা তাদের পথ আগলে রাখল। ওরা পলায়নের কোন কোশেশ করেনি- মোকাবেলার জন্যই ওদের বেরোনো। উবাইদুল্লাহ বর্শাধারীদের প্রতিহত করে যাচ্ছিলেন। বর্শাধারীদের বর্শাগুলো খুবই লম্বা বিধায় এগুলো ভেদ করে আক্রমণ করা যাচ্ছিল না। ওদিকে তার অনুসন্ধানী বাহিনীর সদস্যরা ক্রুসেডারদের আগমত ধোলাই দিচ্ছিল।

তলোয়ারের আঘাতে সেনাপতি একটি বর্শা ভেঙ্গে ফেললেন। ইতোমধ্যে তার দুসেপাই ভেতরে এসে পড়ল। এক খ্রিস্টানকে পয়লা আঘাতেই যমালয়ে পাঠাল তারা। উবাইদুল্লাহর হুকুমে তারা জিন্দা একজনকে পাকড়াও করল। তিনি বাইরে এসে দেখলেন ক্রুসেডারদের সকলে মারা পড়েছে, আর তার বাহিনীর মাত্র তিনজন শহীদ। ঈসায়ীরা বড় জোশ-জযবার সাথে এই খণ্ড লড়াই করেছিল।

জীবিত যে লোককে পাকড়াও করা হলো তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, এরা কারা, কি উদ্দেশ্যে এই ফাঁদ পেতেছিল? বন্দী সেপাইটি বলল,

জীবনের মায়ায় আপনাদের সকল প্রশ্নের উত্তর দেব ভাবলে বলব, আপনারা ভুল করছেন। স্যালাস আমার নাম। উবাইদুল্লাহকে গ্রেফতার করতেই এই ফাঁদ পাতা। আমাদের উপর নির্দেশ ছিল, তার পক্ষ থেকে কোন প্রকার আক্রমণ এলে হত্যা করে ফেলার। এতটুকু বলতে পারি, তাঁকে গ্রেফতার করে ফ্রান্স সম্রাট সুইয়ের কাছে নিয়ে যাবার কথা। এর চেয়ে বেশী কিছু বলতে পারব না।

বলতে হবে, তোমাদের এই চক্ৰজাল কতদূর বিস্তার লাভ করেছে? সেনাপতি বললেন, আর এখানকার মুসলমানদের কারা কারা তোমাদের দলের হয়ে কাজ করছে-বলতে হবে তাও।

বলবো না। আমরা মা মেরীর নামে কসম খেয়ে এসেছি, জীবন গেলেও রহস্য ফাঁস করব না। আমরা আত্মোৎসর্গী বাহিনী-বলতে পারেন আত্মঘাতী। ধর্মের জন্য আমরা মরতে রাজি। স্যালাস বলল।

অনুসন্ধানী বাহিনীর উপ-সেনাপতি তলোয়ার কোষমুক্ত করে চোখ রাঙিয়ে বললেন, আমাদের প্রশ্নের উত্তর তোমাকে দিতেই হবে।

সালারে আলা উবাইদুল্লাহ এদের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন। বললেন,

ধর্মের জন্য জানযি রাখায় এ লোককে মোৰারকবাদ। আমি ওর ওপর সামান্যও কঠোরতা প্রদর্শনের বিরোধী, ………. স্যালাস। তোমার গোপন তথ্যকে গোপন রাখার পূর্ণ অধিকার দিলাম। এমন কি তোমাকে মুক্তও করে দিলাম। এতগুলো মানুষের দ্বারা নিরত্র এক লোককে হত্যায় কোন প্রকার বীরত্ব দেখছি না আমি। যাও, ফ্রান্স সম্রাটকে গিয়ে বললো, আমাকে গ্রেফতার করতে হলে যেন সে নিজেই আসে। তুমি ধর্মের নামে সুইসাইড বাহিনী গড়েছ আর এদিকে সালার থেকে সামান্য এক সেপাই পর্যন্ত ধর্মের প্রতি অনুরাগী হয়ে সুইসাইড স্কোয়াডে নাম লিখিয়েছ। যাও স্যালাস! ওই ভীরু নপুংসককে বলবে, নিঃসঙ্গ কোন কাফেরের উপর মুসলিম সেনাপতিরা হাত উঠায় না। আর শোন তোমার এক সাথী এইতো কিছুক্ষণ পূর্বে শ্লেষমিশ্রিত কষ্টে আমাকে বলেছিল, তোমার রাসূল (আ)-কে ডাকো। পারলে তোমাকে উদ্ধার করুক। দেখলে! আমার রাসূল আমাকে কি করে উদ্ধার করলেন? বলে তিনি সেস্থানে এসে দাঁড়ালেন যেখানে তার দুদেহরক্ষী দাঁড়িয়ে ছিল। এ সময় বন্দী খ্রিস্টান বলল, আপনি আমার সাথে প্রতারণা না করলে দুএকটা কথা বলতে চাই।

না, কোন প্রকার প্রতারণা করার ইচ্ছে নেই দোস্ত আমার! আমি অভয় দিচ্ছি যা বলার অকপটেই বলে ফেল। যদি তুমি আমাকে অকথ্য ভাষায় গালও দাও তাহলেও তুমি আযাদ। সেনাপতি বললেন।

আমি নির্ভীকচিত্তেই বলছি সালারে আলা! তবে আপনাকে গাল দেব না। সুইসাইড বাহিনী জিহ্বা নয় সর্বদা তলোয়ারের ভাষায়-ই কথা বলে থাকে। আমি আপনার উদারতার সামান্য বদলা দিতে চাই। আপনি জানতে চেয়েছেন, কোন কোন মুসলমান আমাদের দলে ভিড়েছে? এ প্রশ্নের জনাব দিতে আমি অপারগ। কেননা এর উত্তর আমার কাছে নেই। তবে এতটুকু বলতে চাচ্ছি, আপনাদের শাসন ক্ষমতায় ঘুণ ধরে গেছে। বোধ হয় খুব বেশিদিন আপনারা এদেশ শাসন করতে পারবেন না। স্পেনের মূল শত্রু এক্ষণে আপনাদের শাসকবর্গই। এটা গোপনীয় কোন তথ্য নয়। খোদ নিজেরাই যেটা নিত্য-নৈমিত্তিক দেখে চলেছেন। আপনারা এই ঘুণ দূর করতে পারবেন কি? পারবেন না। হাজারো খ্রিস্টান ইসলাম গ্রহণ করেছে। আরব থেকে এসেছে হাজারো মুসলমান, যাদেরকে আপনারা পাকা মুসলমান ঠাওরান। ওরা নামকাওয়াস্তের মুসলিম। যে কাজ জিহ্বা দিয়ে চলে তলোয়ার দিয়ে চলে না সেটা। যে জাতি আপনার সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনে তাদের তলোয়ার হামেশাই ভোতা প্রমাণিত হয়।

কাবার রবের কসম! তুমি পেশাদার ভাড়াটে খুনী নও। তোমার কথায় বিজ্ঞতা প্রকাশ পাচ্ছে। প্রশংসা করছি তোমার চিন্তার গভীরতাকে। উবাইদুল্লাহ বললেন।

আপনার ধর্মোদ্দীপনা দেখে আমি বিমূঢ় হয়ে গেছি। এই উদ্দীপনার সামনে আমরা শতাব্দীকাল ধরে দুর্বল প্রমাণিত হয়ে আসছি। স্যালাস বলল। ( আমি দীপ্ত কণ্ঠে বলতে চাই, ষড়যন্ত্র করে তোমর কামিয়াব হতে পারবে না কোনদিনও।

আমাদের ওস্তাদ বলেছেন, কোন জাতিকে একদিন কিংবা একরাতে খতম করা যায় না। আপনার অভূতপূর্ব ব্যবহার-ই আমাকে এসব বাক্য ব্যয়ে উদ্বুদ্ধ করছে। শত্রু পক্ষকে পতনের পথ দেখাও-এতেই তোমাদের কামিয়াবি। ভবিষ্যৎ বংশধরকে বলে যাবে এ পথকে তোমরা আঁকড়ে ধরবে। শিশুদের বলবে তারা যেন পূর্বসূরিদেরদের পদাংক অনুসরণ করে জান কোরবান করে। ওদের কানে দেশ-জাতির জন্য জীবনো সর্গী অজানা বীরদের কাহিনী শোনাও- এরাই আমাদের রেখে যাওয়া কাজ করে যাবে। আর এর ফলশ্রুতিতে দেখবে, দুশমন একদিন এমনিতেই নিঃশেষ হয়ে যাবে, যেভাবে সকালের আগমনে কুয়াশা বিদূরিত হয়। আমরা আপনাদের অবক্ষয় ও পতনের চোরাবালিতে আছড়ে ফেলার নীল নকশা এঁকে যাচ্ছি। স্যালাস বলল।

আমাদের ফৌজ সম্পর্কে তোমার ধারণা কি? আমাদের ফৌজদেরও কি তোমরা অবক্ষয়ের পথ ধরাতে চাও? ওদেরকে তোমরা পরাভূত করতে পারবে কি?

যে জাতির বাদশাহ ক্ষমতাসন পাকাঁপোক্ত করার জন্য হেন কাজ নেই করে না, যে তার দুশমনের সাথে মিত্রতা স্থাপন করে, যে সরকার গান-বাজনা আর নারীদের অতিরিক্ত মূল্যায়ন করে, সে জাতির ফৌজ যতই দুর্ধর্ষ ও প্রভাবশালী হোক না কেন তারা নিৰ্মা প্রমাণিত হতে বাধ্য। আপনাদের ফৌজদের অবস্থাও এমনটা হবে। সরকার তার আইন-শৃখলা রক্ষা বাহিনীর চিন্তার সাথে ঐকমত্য পোষণ না করে তাদের শিকড় কাটলে সে জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। দাঁড়ালেও গোলাম হিসেবে, স্বাধীন হিসেবে নয়।

সালারে আলা! লোকটা ভাড়াটে খুনী নয় মনে হচ্ছে জাদরেল নেতা। একে জীবিত রাখা রীতিমত ভৌতিক বৈতো নয়। ওকে হত্যা করছেন না কেন? অনুসন্ধানী বাহিনীর প্রধান বললেন না।

সালারে আলার চোখে স্যালাসের কথাগুলো ভেসে বেড়ায়। ঠোঁটে প্রশান্ত হাসি। তিনি বলেন, ওর হত্যা আমার জন্য অবধারিত নয়। বুদ্ধিমান দুশমনকে আমি মূল্যায়ন করি।

আর আমি আপনাকে করি মূল্যায়ন। স্যালাস সেনাপতিকে একথা বলে অনুসন্ধানী বাহিনীর প্রধানকে বলল, হত্যা করতে হয় তো তোমাদের বাদশাহকেই করো। তাকেই বাদশাহ বানাও যে স্বার্থোদ্ধারে অন্ধ নয়।

খানিক পরে স্যালাস ঘোড়ায় চেপে অদৃশ্য হয়ে যায়।

***

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, খ্রিস্টানরা স্পেন সাম্রাজ্যকে পতনের চোরাবালিতে আছড়ে ফেলেছিল। তাদের মধ্যে ধর্মোদ্দীপনা সৃষ্টি করা হয়েছিল। ওদের এলোগেইছ ও আইলিয়রেরা এবং পাত্রীসমাজ এমনভাবে অগ্রসর হচ্ছিল যাতে কাউকে মুসলিম গোয়েন্দা কিংবা টহলদার বাহিনীর সামনে পড়তে না হয়। ওদের প্রথম টার্গেট ছিল মুসলিম তাহযীব-তামাদুনের ওপর, যাতে ভোগ, বিলাসিতা ও ইবাদতবিমুখতা নিহিত। একদিকে উবায়দুল্লাহর মত জানবায সিংহশাবকেরা যখন ইসলামের নামে ঘুম হারাম করে দিয়েছিলেন অন্যদিকে তখন প্রাসাদে নারীকণ্ঠের কলকাকলী আর সংগীতের টুং টাং শব্দমজুরীতে ভূমিকম্পের রেশ তৈরী হচ্ছিল।

ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, আবদুর রহমানও সালার ছিলেন। ছিলেন সমকালীন বিশ্বের নামজাদা যুদ্ধংদেহীও কিন্তু নারী ও সংগীতের কোপানলে পড়ে আপনার পরিচয় গিলে ফেলেছিলেন তিনি। কবি ও কাব্য-চর্চায় ছিল তাঁর অকৃত্রিম শখ। তারপরও তার সত্তা যেন অন্যের কজায় ছিল।

কাব্য চর্চা আর কবিগানের আসরই স্পেনকে ডুবিয়েছে। দরবারী চাটুকাররা বাদশাহর মেজাজ-মর্জির বিরুদ্ধে কথা বলত না। উপরন্তু তারা বাদশাহকে কথার আফিমে মত্ত রাখত। ইতিহাস লিখেছে, বনী উমাইয়ারা চাটুকারদের দরবারী আমলা বানাত। দেশ ও জাতির হিতাকাক্ষী ন্যায়-নিষ্ঠ লোকদের তারা চিনত, কিন্তু তাদের থেকে সযতে দূরে থাকত। মন্ত্রী ততক্ষণ মন্ত্রীত্বে থাকত যতক্ষণ সে বাদশাহর দৃষ্টিতে প্রিয়পাত্র থাকতে পারত। এসব রাজা-বাদশাহরা যেহেতু ক্ষমতাকে পারিবারিকীকরণ করতে চাইত সেহেতু শহর-বন্দরের প্রভাবশালী লোকদের দরবারে ঠাই দিত। এজন্য তারা দুহাতে খাজাখির ধন খরচ করত। মন্ত্রী, আমলা ছাড়াও দেশের কবি, বুদ্ধিজীবীরাও চাটুকারদের খাতায় নাম লিখিয়ে সরকারী ভাতা ভোগ করত।

স্পেনের ঐতিহাসিকবৃন্দ এসব চাটুকার কবি ও বুদ্ধিজীবীদের দোষ দিতে গিয়ে বলেছেন, এরাই তদানীন্তন শাসকদেরকে ডুবিয়েছে, আত্মতুষ্টিতে ভুগিয়েছে। পরিণতিতে পতন শুধু স্পেনিয় মুসলিমদের পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকেনি পতনের এই ধারাবাহিকতা ইসলাম পর্যন্ত এসে ঠেকেছে। উন্নয়নের সিঁড়িতে পা কেবল সে জাতিই রাখতে পারে যারা পূর্বসূরিদের বিভ্রান্ত পথ ও মত এড়িয়ে চলে।

স্পেন বিজয় নাটকে আজো ফ্লোরা কাহিনীর নাট্যরূপ দেয়া হয় এবং তাকে কোন না কোন মুসলমানের প্রতি অনুরাগী বানানো হয়। কিন্তু সত্যি বলতে কি, এই ফ্লোরারাই সুলতানার মত সুন্দরী ছিল যারা উপর দিয়ে মুসলিম অনুরাগী থাকলেও তলে তলে ছিল কুশ পূজারী। এ সেই ফ্লোরা যাকে চীফ জাস্টিসের কাঠগড়ার ওঠানো হয়েছিল এবং একেই আজ প্ৰেমজগতের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারিনী সাব্যস্ত করা হচ্ছে।

দ্বিতীয় আবদুর রহমানের যুগে খ্রিজাতি চারদিক দিয়েই মাথা উঁচিয়ে দাঁড়াচ্ছিল অথচ তিনি শরাবের মটকায় জাতির ভাগ্যতরীকে ডুবিয়ে যাচ্ছিলেন। অবশ্য এ সময় কিছু জাত্যাভিমাণী মুসলিম সন্তান ন্যায় নিষ্ঠার সাথে ইসলাম নামের বৃক্ষটির গোড়া বুকের তাজা খুনে সিঞ্চিত করছিলেন। অনেকে ইসলাম প্রচারের মাধ্যমেও এ কাজ করে যাচ্ছিলেন। এদের দাওয়াতে কিছু মানুষ আন্তরিকভাবেই মুসলমান হয় আর কিছু হয় নামকাওয়াস্তের।

***

আচমকা একদিন কর্ডোভায় এ খবর ছড়িয়ে পড়ল যে, এখান থেকে পাঁচ-ছয় মাইল দূরে একটি উপত্যকায় হযরত ঈসা মসীহ (আ)-এর বিশেষ এক শিষ্যের আবির্ভাব ঘটেছে। ওখানকার সমতল প্রান্তরে একটি বৃক্ষের ওপর একটা তারকা চমকাচ্ছে, সেইসাথে ওই শিষ্যের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।

ওখানে একটি প্রাচীন গীর্জা ছিল। ওটি উঁচু প্রান্তরে নির্মিত। বিগত কোন যুগের বসতি যা আজ পোডড়াবাড়ীতে রূপান্তরিত। খ্রিস্টান সমাজে প্রচলিত ছিল, এখানে দুষ্টু আত্মার সদম্ভ বিচরণ রয়েছে। বড় ভয়ানক কাহিনী এ গীর্জা অবলম্বনে যার শ্রুতি রয়েছে। অনেক বলত, এটা দুষ্টু আত্মা নয় বরং ঈসা (আ)-এর যুগের নেক শিষ্যদের পুণ্যাত্মা। সম্প্রতি ওখানে এ নিয়ে বেশ রটনা, আলোচনা ও পর্যালোচনা। সর্বশেষ এই খবর বেরোল, এখানে তার এক শিষ্যের আবির্ভাব।

মানুষেরা ভয়ে ওদিক তেমন একটা যেত না। কিন্তু পাদ্রী সমাজে এই আলোচনা শুরু হলে দু একজন মানুষ যাতায়াত শুরু করে নিতান্তই কৌতূহলবশে। ওখানে যখন মানুষের আনাগোনা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায় তখন গীর্জাসংলগ্ন বৃক্ষে তারকা চমকাতে শুরু করে। ওখানে গির্জা আর বৃক্ষের মাঝে একলোককে ঘোষণা করার জন্য দাঁড় করিয়ে দেয়া হত। ভয় নেই, তারকা চমকালে ঈসা মসীহকে স্মরণ কর বলে সে এলান করত।

ওই সময়কার রাতগুলো খুবই জমকালো হত। মধ্যরাতের পর চাঁদ উঠত। কোন এক রাতে লোকজনকে দুপ্রান্তের মাঝে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো। তাদের সামনে একটি সমতল ভূমি, পেছনে উঁচু পাহাড় যা ঘন ঝোঁপ-ঝাড় আর বৃক্ষে ঠাসা। এরই মাঝে গীর্জাটি স্থাপিত। যাতায়াতের জন্য একটিমাত্র রাস্তা। যাতায়াত না থাকার কারণে সেটিও ঝোঁপঝাড়ে পূর্ণ। পাহাড়ের বুক চিরে কখনও বেরিয়ে আসত ঝর্ণা। এখন ওখানে প্রকাণ্ড এক জলাশয়। যেখানে জন্ম নিয়েছিল ছোট আকৃতির কুমীর। মানুষের আনাগোনা বন্ধের কারণ এও হতে পারে। আশেপাশে ছোটখাট টিলা।

মানুষেরা আসত টিলার পাদদেশে। কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। মানুষের কানাঘুষা আচমকা বন্ধ হয়ে গেল। নেমে এল কবরের নিস্তব্ধতা। সামনের পাহাড়ের ঢালের একটি বৃক্ষে তারকা চমকে উঠল। এখনও একটি প্রবাদ খ্রিস্টান সমাজের প্রচলিত আছে যে, বৃক্ষে তারকাকৃতিতে ঈসা (আ) আবির্ভূত হন। আসমানের তারকার মতই ওটি ঝিকমিক করে।

গির্জা থেকে সমবেত কণ্ঠের গান-বাজনা শ্রুত হলো। রীতিমত গীতবাদ্য। রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে এই গীত যাদুকরী আকর্ষণ সৃষ্টি করে যাচ্ছিল। সকলে সামনে পিছে নজর বুলিয়ে বুকে হাত রেখে ঈসা (আ)-এর উপস্থিতি অনুধাবন করে যেতে লাগল। সকলেই ওই গীত মুখে উচ্চারণ করল। তারকাটি দুলছে ও এর কিরণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

ক্রুশ পূজারীবৃন্দ। জলদগম্ভীর একটি কণ্ঠে সকলে চমকে উঠল, ঈসা মসিহর ভক্তবৃন্দ। আমি বাণী নিয়ে এসেছি। পতন তোমাদের দিকে ধেয়ে আসছে। একে রুখখা। রুখবার শক্তি আছে তোমাদের। ঈসা কুষ্ঠরোগকে উপশম করতেন কিন্তু ওরা কুষ্ঠ ছড়াচ্ছে। তোমাদের যারা খ্রিস্টধর্ম ছেড়েছে তারা পুনরায় স্বধর্মে ফিরে যাও নয়তো সকলকে কুষ্ঠ রোগে ধরবে।

তারকাটি অদৃশ্য হয়ে গেল। জমকালো আঁধারে ঢেকে গেল পরিবেশ। সমবেত মানবের মাঝে নেমে এল কবরের নিস্তব্ধতা। পরে ওই পাহাড় থেকে বিশেষ আওয়াজে সকলের চমক ভাঙ্গলো। একটি কণ্ঠে ঘোষণা হলো, এবার তোমরা স্বগৃহে ফিরে যাও। নিজস্ব আমলের প্রতি সতর্ক থেকে। কাল আবারো এসো। আবির্ভাব আবারও হতে পারে।

মানুষেরা ভয়ে ভয়ে বাড়ীর পথ ধরল।

***

এ ঘটনা উপস্থিত শ্রোতামগুলীর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকল না। ওই যুগ ছিল নিরক্ষরতার যুগ। লেখাপড়া জানত না মানুষ। জনশ্রুতিকে ওহী জ্ঞান করত। এ ধরনের কথা তারা অন্তরের অন্তঃস্থল দিয়ে শুনত ও পরে তা মানুষের কাছে বলত। তখন এতে বেশ কিছু কথা মিশ্রণ করে দিত। হযরত ঈসা (আ)-এর সাহাবীর আবির্ভাব-তাও আবার তারকাকৃতিতে-এমন এক মোজেযায় রূপ নিল যে, যাকে দেখার শখ জাগল সকলের মনে। মুসলমানরাও যেতে প্রস্তুতি নিল।

মসজিদে মসজিদে এ খবর ছড়িয়ে পড়ল। মুসল্লীরা ইমাম ও মৌলবী সাহেবানদের জিজ্ঞেস করতে লাগল, এ ঘটনা কতটুকু সত্য। বিজ্ঞ ইমামবৃন্দ একে কৃত্রিম বলে এর ওপর বিশ্বাস আনতে নিষেধ করলেন। এটা প্রকাশ্য কুফর। আমাদের ধর্মের ওপর চুনকালি মাখতে খ্রিস্টানরা নিরর্থক এক নাটক মঞ্চায়ন করছে। এটি বানোয়াট, উদ্ভট ও বিভ্রান্তিকর।

এটা কোন ভেল্কিবাজিও হতে পারে। জনৈক বিজ্ঞ আলেম এই ফতোয়া দিলেন। তিনি আরো বললেন, কোন মুসলমান একে দেখতে গেলে শেরকের গোনাহ হবে।

***

ঈসা (আ)-এর শিষ্য তারকা আকৃতিতে আবির্ভূত হয়েছেন-এ কথার সত্যাসত্যের জন্য দরকার ছিল ব্যাপারটা খতিয়ে দেখার। এটা কোন ভেল্কিবজি কি-না। কি এর নেপথ্যে রয়েছে? এতে কোন সন্দেহ এই যে, খ্রিস্টানরা নাশকতামূলক, বিদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রের জাল বুনে যাচ্ছিল কিন্তু এ সময় আলেম সাহেবরা শিরক ফতোয়া দিয়ে ব্যাপারটি তদন্তের পথ বন্ধ করে দিলেন।

সেনাপতি উবাইদুল্লাহ তখনও কর্ডোভা পৌঁছাননি। উজির হাজেব ও আবদুর রউফ পরস্পরে আলাপ করছিলেন, ব্যাপারটা তদন্ত করে দেখা উচিত। খ্রিস্টানেরা মুসলিম মনকে বিভ্রান্ত করাতে ধূম্রজাল সৃষ্টি করেনি তো! তারা অনেক আলাপ-আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নিলেন, আবদুর রহমানকে জানানোর পূর্বে আমরা তদন্ত করে দেখতে চাই।

ওদিক খ্রিস্টানরা গোটা শহরে ব্যাপারটা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করে দিল।

আবদুল করীমের দুরহস্যভেদী রহীম গাযালী ও হামেদ আরাবী পরের রাতে খ্রিস্টানদের সাথে ওখানে গেলেন। এখানে মুসলমানরা খুবই কমই হাজির হয়েছে। কেননা ওখানে না যাওয়ার প্রতি মসজিদে মসজিদে ফতোয়া ঝেড়ে দেওয়া হয়েছে।

ওই রাতটিও ছিল জমকালো। দুপাহাড়ের মাঝখানে অন্ধকার আর। উৎসুক জনতার ঠাসাভীড়। আচমকা সেখানে গীতবাদ্যের আওয়াজ গুঞ্জরিত হল। জনতার মাঝে পীন পতন নিস্তব্ধতা। খানিকবাদে পাহাড়ের চূড়ায় একটি তারকা চমকে উঠল। সিংহশাবক বেশ কিছু কষ্ঠ সেই সাথে গীত গেয়ে ওঠল। এই গীত প্রতিটি গির্জার খ্রিস্টানরা গেয়ে ওঠে। জনতার মাঝে এই গীত গুঞ্জরিত হল।

তারকা এক সময় অদৃশ্য হয়ে গেল। বিস্ময় বিস্ফোরিত লোচনে সকলে এ দৃশ্য দেখল। তারকার দীপ্তি গির্জা চূড়ায়ই দেখা গেল, সাধারণতঃ যেখানে কুশদণ্ড স্থাপিত থাকত। দুই-আড়াই গজ দীর্ঘ ছিল এই চমক। এর মধ্যে কুশের ছায়াচিত্র দৃশ্যায়িত হত। জনতার ভীড়ে কান্নাকাটি শোনাগেল। সকলেই হাঁটু গেড়ে বসে গেল এবং পবিত্ৰগীত তাদের মুখে। রহীম গাযালী ও হামেদ আরাবী বসলেন না। তারা মুখ-চাওয়া চাওয়ি করে বললেন, এটা কোন ভেল্কিবাজি হতে পারে না। পরে তারা কেমন একটা মন্ত্রমুগ্ধের মত বসে গেলেন। মনে হলো কোন অদৃশ্য শক্তি তাদের বসিয়ে দিয়েছে। তারা খ্রিস্টানদের রহস্যপূর্ণ গীত জানতেন না। তাই মনে মনে কালেমা-ই তাইয়্যেবা উচ্চারণ করতে থাকেন।

গীত উচ্চারণ আস্তে আস্তে থেমে এলো। তারকার দীপ্তিও ম্লান হলো, যাতে ঈসা (আ)-এর অবয়ব দৃশায়িত ছিল।

এই হতাশ রূহ তোমাদের সতর্ক করছে। দূর থেকে একটি আওয়াজ ভেসে এলো, স্বধর্ম ত্যাগ করো না। তোমরা বুঝতে পারছ না গোনাহর শাস্তি কি! যে যমীনে গির্জা বিরান হয়ে যায় সে যমীন মানুষের বসবাসের যোগ্য থাকে না। গির্জায় যাতায়াত কর। সেখানে তোমাদের করণীয় কি তা বুঝিয়ে দেয়া হবে। বলা হবে সম্ভাব্য মুসিবতের কথা। একতা ও সততা বজায় রেখ। তোমাদের একতায় চিড় ধরছে। তোমাদের যারা মুসলমান হয়েছে তারাও গির্জায় যাবে। নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তওবা করবে। তোমাদের দেশে ঈসা মসীহের নূর বিচ্ছুরিত কর।

***

রহীম গাযালী ও হামেদ আরাবী উজির আবদুর করীমের বাসভবনে যান। তাদের দেখা কাহিনী বর্ণনা করেন। বলেন, এটা কোন ভেল্কিবাজি হতে পারে না।

আবদুল করীম বিজ্ঞ উজির ছিলেন। তিনি আচমকা প্রশ্ন করলেন, তোমরা কি কেবল ওই চমক দেখছিলে, না কি আশে পাশেও ঘুরেছিলে?

তারা জানালেন, যখন তারকার চমক শেষ হয়ে যায় তখন গির্জার বিপরীত দিকের নীচে কোথাও আগুন জ্বলছিল। পরে এই আগুনও নিভে যায়।

এটা ভেল্কিবাজি। অলৌকিকতা নয়। নয় যাদুও। খ্রিস্টানদের মনে ভীতি সঞ্চার করতে আমাদের বিরুদ্ধে সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র। এটি নও মুসলিমদের পুনরায় খ্রিষ্টান বানানোর প্ল্যান। তোমাদের দুজনকেই এটি খতম করতে হবে। যে আওয়াজ তোমরা শুনেছ, গির্জায় যাও তাহলে বুঝতে পারবে-কি মুসিবত আসছে। আমার যদুর বিশ্বাস, এ আওয়াজ এই দুনিয়ার মানুষেরই মেকী আওয়াজ। কাল নাগাদ আমার কানে আসবে, ওইসব লোককে পুনরায় কি বলতে বলা হয়েছে।

পরের রাতে হাজেব আবদুল করীমের কাছে চার/পাঁচজন লোককে বলতে শোনা গেল, আজ গির্জায় এত ভীড় ছিল যে, উঁচ রাখারও জায়গা অবশিষ্ট নেই। পাদ্রীরা ইসলামের বিরুদ্ধে বিষোদগার তুলেছে। স্পেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে এমনও কথা বলেছে, যা শুনলে গা শিউরে ওঠে। তারা বলেছে, এই প্রশাসনের বিরুদ্ধাচরণ ধর্মের-ই কাজ। বিদ্রোহ জরুরী। তারা ঈসা (আ)-এর আবির্ভাব জোরালো ভাষায় সমর্থন করে মানুষের মনে ভীতি সঞ্চার করেছে। জনতা যখন গির্জা থেকে বেরোয় তখন সকলের মনে ভীতিভাব।

আবদুল করীম পরদিন সালার আবদুর রউফকে বললেন, আবদুর রহমানকে না জানিয়ে এই ভেল্কিবাজির রহস্যোদ্ধার করতে হবে। তিনি ওই মুহূর্তেই রহীম ও হামেদকে ডেকে পাঠালেন। ডেকে পাঠালেন আরো চার লোককে। বললেন, আমরা তোমাদেরকে অগ্নি পরীক্ষায় পাঠাচ্ছি। আমরা জেনেছি, হযরত ঈসা (আ)-এর আবির্ভাব সম্পূর্ণ বানোয়াট। যখন তথাকথিত ওই তারকা চমকায় ও মানুষের মধ্যে প্রভাব সৃষ্টি হয় তখনই লোকসম্মুখে একে চুরমার করে দিতে হবে। তোমরা সতর্ক থাকবে। যে রাতে তোমরা শুনবে ঈসা (আ) আবির্ভূত হচ্ছে, সে রাতে তোমরা উঠানে উপস্থিত থাকবে। তবে জনতার কাতারে নয় থাকবে বিরান গির্জার নিকটে, ওখানেই তোমরা উদ্ধার করতে পারবে কোত্থেকে আসছে তথাকথিত এই তারকা চমক।

কোথাও না কোথাও দেখবে আগুন জ্বলছে। এমন স্থান থেকে আগুন জ্বলছে, যা মানুষের নজরে পড়ছে না। খুব সম্ভব দুএকজন লোক এ কাজে জড়িত। ওদের ওপর আক্রমণ করে আগুন আয়ত্তে আনবে। এর পূর্বে তোমরা দুজন গির্জার পাশে ওঁত পেতে থাকবে। লক্ষ্য করবে, কে কথা বলে। তাকে পাকড়াও করবে। তোমাদের সাথে খঞ্জর ও বর্শা থাকা চাই। ওদের সাথে লড়াই করতে হতে পারে। এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে কাউকে জীবিত রাখবে না। পরে তোমাদেরই একজনকে ভেল্কিবাজি ও প্রতারণা বলে একে ঘোষণা করতে হবে। বলতে হবে, ওখানে কোন ঈসার আবির্ভাব ঘটেনি। আর আমরা বিরান গির্জা জনতাকে নিয়ে দেখাব। দেখাব সে জিনিষও যা বৃক্ষে চমকাত।

উজির ও সালার তাদেরকে এই অভিযানের বিস্তারিত সব কিছু বুঝালেন। সবশেষে বললেন, এই কাজের প্রতিদান আল্লাহ-ই দেবেন। আমি আবারও বলছি, এ অভিযান সহজ নয়। কুশ পূজারীরা পাক্কা বন্দোবস্ত করেই রেখেছে। তোমাদের জীবন হুমকির মুখে মনে করতে পার। আমি তোমাদের হুকুম দিচ্ছি না। তোমরা যেতে না চাইলে কোন প্রকার প্রতিশোধ নেব না। এমন কি রাগও করব না। ধর্ম ও জাতির অতন্দ্র প্রহরী তোমরা। এদেশ কোন খান্দান বিশেষের নয়– তোমাদের। তোমাদের ঘরে ডাকাত পড়লে তোমাদের বাপ-দাদারা, ওদের ছেড়ে দিলেও তোমরা কি নিশ্চুপ থাকবে?

স্পেন তোমাদের ঘর। ঘর আমাদের সকলের। শেষের দিকের কথাগুলো বলতে গিয়ে হাজেবের চোখে পানি এসে গেল।

আমরা যে কোন কোরবানী দিতে প্রস্তুত। আমরা প্রস্তুত-এদের একজন বললেন।

আমরা কারো থেকে কোন প্রতিদান চাইব না।

খোদা তায়ালার কাছেও কোন প্রতিদান চাইবো না।

ছ’ছজন জানবায প্রস্তুতি নিয়ে ফেললেন।

***

দুরাত পরেই খবর এলো, আজ কিছু নযরে আসবে। ওখানে যে-ই যেতে চায় সে যেন গোসল করে যায়। মসজিদ মসজিদে এলান করা হয়, কোন মুসলমান যেন না যায়। ছজন জানবার্য পরিকল্পনামত রওয়ানা দিলেন।

রহীম, হামেদ ও চার সেপাই সূর্যাস্তের পর পরই তারা ওখানে উপনীত হলেন। দিনের বেলা ছদ্মবেশে প্রথমোক্ত দুজন এলাকাটা সফর করে এসেছেন। পাহাড়ে উঠেও তারা পর্যবেক্ষণ করেছেন। আঁধার রাতে এই ছমুজাহিদ পাহাড়ের কোন এক প্রান্ত দিয়ে ওপরে চড়লেন। ওপরে ওঠার পথ কয়েকটা। চূড়ায় সামান্য সমতল ভূমি। এখান থেকে আরো উপরে ঢালু আছে। পাহাড়ী ঘাসে ওই ঢালগুলো ঠাসা। স্থানটা খুবই ভীতিজনক। ওখান থেকে একটি ঝর্ণা নীচে নেমে গেছে অবিরাম ধারায়।

রহীম গাযালী দুসেপাই সাথে নিলেন এবং বাদবাকী দুজনকে হামেদের সাথে দিলেন। সকলের হাতেই বর্শা ও খঞ্জর। সকলে গেলেন পৃথক হয়ে। রহীম তার দুসাথী নিয়ে গির্জার পাশে ওঁৎ পেতে থাকলেন। আর হামেদ তার দুসাথীসহ ওই বৃক্ষের কাছে গেলেন যেখানে ভৌতিক তারকা চমকাত।

আঁধার জমকালো রূপধারণ করলে রহীম গীর্জার নিকটে সে ধরনের আওয়াজ শুনতে পেলেন। পরমুহূর্তেই গির্জার আলো জ্বলে উঠল, যা শার্সির ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছিল। গির্জার কপাট খুলে কজন বলল, গোটা সরঞ্জামাদি শেষবারের মত পরখ করে নাও। আরেকজনে বলল, আমরা সবকিছু দেখে নিয়েছি। তোমরা গাছে চড়। উৎসূক জনতার আগমন শুরু হয়েছে। পরে আরেকজন বলল, মানুষের চিন্তা করোনা। ওরা উপরে আসছে না।

হামেদ আরাবী বৃক্ষের নিকটে ছিলেন। তিনি পায়ের আওয়াজ টের পেলেন। অন্ধকারে দুটি ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসছে। ওদের একজন গাছে চাপল। নীচে দাঁড়ানো লোকটা বলল, ওই স্থানটা মনে আছে তো?

মনে আছে। গাছের ওপর থেকে আওয়াজ এলো।

দুতিনজন লোক হামেদের কাছ থেকে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে গেল। পর মুহূর্তে চূড়া-প্রান্ত থেকে লঘু আওয়াজ শ্রুত হলো। উৎসুক জনতা সমবেত হল। ওদের সুরও স্ব স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।

মুহূর্তেই প্রান্তরে স্থাপিত দেয়াল আলোকিত হয়ে উঠল। হামেদ খুব ধ্যান-খেয়ালের সাথে তাকিয়ে দেখলেন, বড় সাইজের একটি ঝাড় ফানুস এর আলো কেবল সামনে ঠিকরে পড়ছে। ডানে-বামে, উপরে কিংবা নীচে পড়ছে না। হামেদ দেখলেন, গাছে চড়া লোকটা নেমে আসছে। নীচে যে লোকটা ছিল সে চলে গেছে। তিনি লঘু পায়ে অগ্রসর হলেন এবং তার বুকে বর্শা ছুঁয়ে বললেন, আবার গাছে চড়, উপরে যা রেখে এসেছে তা নিয়ে এসো।

লোকটা ভ্যাবাচাকা খেয়ে বলল, কে তুমি?

যা বলছি তা কর। হামেদ বললেন।

বর্শা সরাও। উপরে যাচ্ছি।

লোকটা গাছে চড়তে লাগল। বিদঘুঁটে অন্ধকার। হামেদ দেখতে পাচ্ছেন না, লোকটা কি করছে। তিনি তলোয়ার বের করলেন। লোকটা গাছে সামান্য উঠে ঠুস করে নেমে খঞ্জর বের করে হামেদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তিনি নিজকে বাঁচাতে পারলেন না। খণ্ডরের ডগা তার বাহুতে ঢুকে গেল। হামেদ মুহূর্তে বাঁ হাতের বর্শা লোকটার পেটে ঢুকিয়ে দিলেন। লোকটা আর্তনাদের সুরে কারো নাম ধরে ডাকল। হামেদও তার লোকজনকে ডাকলেন। ওদিকে যে আলো জ্বলছিল তা হামেদ ও তার লোকজনের দিকে বিচ্ছুরিত শুরু করল। গির্জার ভেতর থেকে কলোক দৌড়ে বেরোল। সকলেরই হাতে খোলা তলোয়ার। হামেদ তার লোকজনকে আত্মগোপন করতে বললেন। নিজেও আত্মগোপন করলেন। গির্জা থেকে আগুয়ান লোকেরা সংখ্যা বেশ। তাদের সাথীকে বৃক্ষের নীচে পতিত দেখতে পেয়ে আশেপাশে তল্লাশি শুরু করল। আততায়ী মুহূর্তে গেল কৈ?

একলোকে হামেদের কাছে পৌঁছে গেল। বসা অবস্থায় তার পার্শ্বদেশে তিনি বর্শা ঢুকিয়ে দিলেন। তার মুখ থেকে নির্গত বিশেষ আওয়াজে অন্যান্য সাথীরা দৌড়ে এল। ওদেরই কেউ চিৎকার দিয়ে বলল, আলো এদিক ফেরাও।

হামেদ যখমী ছিলেন। তাঁর সঙ্গী মাত্র দুজন। তারা সকলে ওদের নযরে পড়ে গেলেন। হামেদ রহীমকে ডাকলেন এবং এদের সাথে যুদ্ধ শুরু করে দিলেন। ওরা এদের তিনজনকেই ঘিরে ফেল। ওদিকে রহীম তার লোকজন নিয়ে স্পটে এসে পৌঁছলেন।

পাহাড়ের পাদদেশে যখন সমবেত জনতা তারকা দীপ্তির অপেক্ষা করছে, এদিকে তখন দীপ্তিকারীরা জীবন-মৃত্যুর দোলনায় দোল খাচ্ছে।

১.৩ শেষ রাত

হাজেব আবদুল করীম যখন ঘুম থেকে গাত্রোত্থান করেন তখন সহসা কেউ তার দরজায় করাঘাত করল। তিনি খুলে দেখলেন তাঁর জনৈক চাকর দণ্ডায়মান। সে বলল, বাইরে যমী একলোক আপনার অপেক্ষায়। আবদুল করীম দৌড়ে বেরোলেন। দারোয়ান যমীকে শুইয়ে দিয়েছে। রহীম গাযালীই সেই যখমী। তার কাপড় রক্তে লাল। জীবনের আখেরী দম নিচ্ছিলেন তিনি। ত্বরা করে হেকিম ডাকতে নির্দেশ দিলেন তিনি, কিন্তু রহীম তাকে বারণ করলেন।

হেকিম আসা পর্যন্ত বোধ হয় আমি জীবিত থাকব না। রহীম গাযালী কাতরাতে কাতরাতে বললেন, আমার আখেরী কথাগুলো শুনুন। আমার কোন সাথী ফিরে এলে মনে করবেন সকলেই শাহাদাঁতের সুমিষ্ট শরাব পান করেছে। বাস্তবিকই ওটা ছিল ভেল্কিবাজি। ওদের দুএকজন হয়ত বেঁচে আছে। আপনি ফরান গির্জায় যান। ওখানে লাশের দেখা পাবেন। গোটা রহস্য ওখানে গেলেই উদ্ধার করতে পারবেন।

তিনি অতি কষ্টে কথাগুলো আওড়ান। এ সময় তিনি দীর্ঘশ্বাস নিচ্ছিলেন। এই খাস এক সময় গোঙানীতে পরিণত হল। হেকিম এসে পৌঁছালেন, কিন্তু তার আগেই রহীম তার আখেরী শ্বাস টেনে প্রভুর দরবারে চলে গেলেন। হাজেব মনে মনে বললেন, না এদের খুন বৃথা যেতে দেব না।

শিরা-উপশিরার খুন তাঁর টগবগিয়ে উঠল। দাঁতে দাঁত পিষলেন তিনি। কর্মচারীরা বললেন, সালার আবদুর রউফকে ডেকে পাঠাও। তাকে যে অবস্থায় পাও এখানে নিয়ে এসো।

আবদুর রউফ খুব একটা দুরে ছিলেন না। তিনি এসে গেলেন। তিনি রহীম গাযালীর আখেরী কথাগুলো তাকে শোনালেন। তিনি তৎক্ষণাৎ ২০/২৫ জন ফৌজ প্রস্তুত করলেন। তিনি ও উজিরে আলা পৃথক দুটি ঘোড়ায় চাপলেন। যেহেতু তখনও আঁধার তাই সাথে মশাল নিলেন। সাথে এমনও এক লোককে নিলেন যে ওই এলাকাটা চিনত।

বিরান গির্জায় গিয়ে তারা দেখলেন, আলো জ্বলছে তখনও। জ্বলছে ঝাড়-ফানুসও। কোন লোকজনের দেখা নেই। দেয়ালের পাশে একটি কাষ্ঠলক পতিত। ওতে ক্রুশবিদ্ধ যীশুর প্রতিচ্ছায়া। প্রতিচ্ছায়া ওই আলোতে চমকাচ্ছে। বাইরে বৃক্ষের তলে বিক্ষিপ্ত লাশ। মুসলিম-খ্রিস্টান সবারই লাশ। তারা লাশ শনাক্ত করতে পারলেন। আচমকা একটি মুসলিম লাশকে নড়তে দেখা গেল। সালার আবদুর রউফ তার কাছে হাঁটু গেড়ে বসলেন ও বললেন, ভয় নেই তোমাকে চিকিৎসা করলে সেরে উঠবে। তার পেট ফাড়া। সালারকে দেখে তার ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটে উঠল, কিন্তু কথা বলার শক্তি তখন তার নেই। তিনি আস্তে আস্তে উপরে হাত ওঠালেন। তর্জনী বৃক্ষের দিকে। আবদুর রউফ বললেন, ওখানে কি? ওদিকে আবারো তর্জনী উঁচিয়ে তিনি ঢালে পড়লেন। পরে প্রতিটি লাশই পরীক্ষা করা হলো, কিন্তু কারো দেহে প্রাণ ছিল না।

গির্জা থেকে কারো দৌড়ানোর আওয়াজ শোনা গেল। সেপাইরা সেদিকে তাকাল। তারা দেখল, ঈসা (আ)-এর প্রতিচ্ছবি সম্বলিত কাষ্ঠলক নিয়ে দুখ্রিস্টান পালাচ্ছে। মুসলিম সেপাইদের আগুয়ান দেখে তারা দ্রুত পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে লাগল, কিন্তু পারল না। মাঝপথেই হোঁচট খেল। এদের পাকড়াও করা হোল। গির্জায় তখনও ধোঁয়া উড়ছে। ফওরান ফানুস দেখে আলোক উদগীরণ হচ্ছে। গির্জার ছাদ কাঠের। আড়া ও বেড়াও কাঠের। সবগুলোতেই আগুন লেগেছে, ভয়াবহ এ আগুন নিভানোর কোন ব্যবস্থা ছিল না, নেভানোর জরুরতও ছিল না।

***

কাষ্ঠ নিয়ে পলায়নকারীদের গির্জার পাশে নিয়ে আসা হোল। দরজা দিয়ে আগুন বেরোচ্ছে। পুরোটা গির্জা তখন অগ্নিকুণ্ডে রূপান্তরিত।

এই রহস্যের দ্বারোম্মোচন করলে তোমাদের মুক্তি দেব। উজির বললেন, এটা তোমাদের ধর্মীয় ব্যাপার। কাজেই তোমাদের কারাগারে রাখব না। যে ভেল্কিবাজি দেখিয়েছে এর প্রতিও আমাদের কোন আপত্তি নেই, কিন্তু বলতে হবে এটা কি? নয়তো তোমাদের জ্বলন্ত গির্জার ইন্ধন বানাব। উভয়কে আগুনের এত কাছে আনা হলো যাতে তাদের চেহারায় তাপ লাগছিল। আগুনের তাপে ওদের চেহারা ঝলসে যাবার উপক্রম। ওরা দূরে সরতে চাচ্ছিল। দূরে সরানো হলো। ওদেরই একজন বলল, এর পেছনে কার হাত রয়েছে তা আমরা আপনাদের বলব না। জবরদস্তি করার চেয়ে আমাদের এই আগুনে ফেলে দেয়াই ভালো। একজন মানুষের জীবনে এর চেয়ে উত্তম কি হতে পারে যে, ধর্মের জন্য তারা জীবন দেবে।

ধর্ম সেখানেই গতিশীল যেখানে ধার্মিকরা তাদের নবীর নামে জ্বলতে পারে। ওদের অপরজন বলল,ইসলামী তরী ডুবন্ত, খ্রিস্টবাদ মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো। আমরা আমাদের টার্গেটে পৌঁছবই।

এ কথার জন্য ওদের ওপর কোন প্রকার শাস্তি না দিয়ে ধন্যবাদ জানানো হলো। এতে কোন সন্দেহ নেই, ওরা ছিল খুবই বুদ্ধিমান ও চৌকস। ওদের কথা হেলায় ফেলে দেবার মত নয়। ওরা পরিষ্কার জানিয়ে দিল, সামনের প্রান্তরের ঘন বৃক্ষের তীব্র রশ্মিসম্পন্ন ফানুস জ্বালানো হত। এর ওপর গোলাকার প্লেট রাখলে আলো চারদিকে না ছড়িয়ে কেবল সম্মুখ দিকেই আছড়ে পড়ত। গাছে গোলাকার কাঠের রক রাতের আঁধারে ওই আলোতে চমকাত। যেহেতু ওই ব্লক সুতায় লটকানো, তাই বাতাসে হেলাদুলা করত। হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে প্রচলিত ছিল যে, তার নূর গাছে চমকায়, এই আকীদা অবলম্বনে তারা চলচ্চিত্র বানায়। সেটাই হচ্ছে আপনাদের জিজ্ঞাসার সদুত্তর। এই গির্জায় আমরাই আগুন লাগিয়েছি তাই এই কাষ্ঠলক নিয়ে পলায়ন করছি।

যে মুসলিম মুমূর্ষ সেপাই তর্জনী দ্বারা বৃক্ষের দিকে ইশারা করেছিলেন এই কাষ্ঠখণ্ডকেই বুঝিয়েছেন তিনি, যার ওপর ছায়া পড়ে। ওই সেপাই-ই রাতের বেলা এক লোককে গাছে ওঠানামা করতে দেখেছেন। সেই কাষ্ঠপ্লেট এখনও গাছে ঝুলছে। ওটি নামানো হলো। সামনের প্রান্তরে ফানুস নিতে গিয়েছিল। ওটি প্রজ্বলনকারীরা মরে পড়েছিল ওখানেই।

আমরা যা কিছু করেছি তা ধর্মের খাতিরেই। দুজনার একজনে বলল, আমাদের লোকেরা ইশারায় কথা বোঝে, তারা ইশারায় আমাদের বুঝিয়েছিল যে, জীবন গেলেও সত্যের দ্বারোদঘাটন করবে না। আপনাদের সাথে আমাদের কোন ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। এটা দুধর্মের দ্বন্দ্ব। ইসলাম ছড়িয়ে পড়ছে-খ্রিস্টবাদ একে প্রতিহত করবেই। প্রতিহত করতে গিয়ে আমরা বৈধ-অবৈধ সবই করে যাব, আমাদের আগুনে ফেলে দিন। আমাদের ছাই ভষ্ম থেকে এমনও লোক জন্মাবে যারা আমাদের পথে চলবে।

১.৪ হুংকার

দিগন্ত প্রসারী অলোর বন্যা নিয়ে সূর্য উঠছে।

হাজেব আবদুর করীম ও সালার আঃ রউফ আবদুর রহমানের মহলে এসে পৌঁছলেন। তাঁদের সাথে মুসলিম-খ্রিষ্টান জানবাষদের লাশ। এমন কি হযরত ঈসার ছবি, কাষ্ঠলক ও প্লেটও, যা আলোতে চমকাত। সাথে ওই দুজীবিত খিস্টানও। তাদের আগমন বার্তা স্পেনরাজ আবদুর রহমান জানতে পারেন। তিনি এই মাত্র ঘুম থেকে জেগেছেন। পাশে সুলতানা। আবদুর রহমান তাকে পাশে থাকতে বললেন।

তারা উভয়ে হলঘরে বসলেন। আবদুর রহমান হেরেম থেকে বেরোলে, সুলতানা তার খাস খাদেমের মাধ্যমে যিরাবকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, তাকে যে অবস্থায় পাও বলো, উজিরে আলা ও সালার এসেছেন। আবদুর রহমান হল ঘরে ঢুকলে তার সাথে সুলতানা থাকলেন। তিনি তখনও নাইট গাউন পরিহিতা। কাঁধ ও বাহুতে রেশমী কোমল চুল চকচক করছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর তার যৌবনের কাঁচা অঙ্গ। কোন প্রকার প্রসাধনী নেই এ মুহূর্তে তার দেহে। দর্শককে যেন বলছে, দেখো! আমাকে প্রকৃতি নিজ হাতে গড়িয়েছেন।

স্পেনের উজিরে আলা ও সালার তার দিকে এক ন্যর দিয়ে পরস্পরে মুখ চাওয়া চাওয়ি করেন। সুলতানাকে দেখে তারা কেমন যেন চমকে ওঠেন। চোখে চোখ রেখে তারা বললেন, আমাদের খুবই সজাগ হয়ে কথা বলতে হবে। কারণ কথার যাদুতে যে আবদুর রহমান মারা পড়েছে তাকে নতুন কথার যাদুতে জাগিয়ে তুলতে হবে। তার ভেতরকার পৌরুষকে জাগাতে হবে, যাতে মর্দে মুমিন হুংকার মারতে পারেন। নারীদেহের এই অশ্রুতপূর্ব হাস্য-লাস্যে কোন পুরুষের পক্ষে জীবিত থাকা সম্ভব নয়। আবদুর রহমান মৃত লাশে পরিণত। তাকে জাগিয়ে ভোলা এই মুহূর্তের প্রধান কাজ। উজিরে আলা কথা শুরু করলেন,

আমরা আপনাকে তিরস্কার করব না। কিন্তু স্পেনে খ্রিস্টানরা এমন কিছু শুরু করেছে যাতে আমাদের ঘুম হারাম হবার উপক্রম। ওদের ভেল্কিবাজি ইসলামের উপর প্রভাব ফেলছে। ওরা স্রেফ খ্রিস্টানদের নয় মুসলমানদেরও বিদ্রোহী করে তুলছে।

ভীতিকর কোন ঘটনা ঘটেছি কি? আবদুর রহমান হাই তুলে বললেন, নাকি কোন সংবাদদাতার সংবাদ আমাকে শোনাতে এসেছেন?

আমীরে স্পেন! গতরাতে একটি ঘটনা ঘটে গেছে ইতিপূর্বেও যা ঘটে আসছিল। গত রাতে আমরা ওই ঘটনার যবনিকাপাত ঘটিয়েছি। বাইরে কিছু লাশ পড়ে আছে। তন্মধ্যে কিছু আমাদের করে বাদ বাকী খ্রিস্টানদের। ওদের জীবিত দুজনকে আমরা ধরে এনেছি। সিংহশাবক

লাশ! আবদুর রহমান চমকে ওঠেন, ব্যাপারটি কি এতই গুরুতর যে, রক্তারক্তি করতে হলো?

এ প্রশ্নের জবাবে সালার ও উজির পুরো কাহিনী শুনিয়ে গেলেন। ইতোমধ্যে যিরাব এসে হাজির। তিনি বড় এক নিমেষে রাতের ঘটনা বলে যাচ্ছিলেন। আবদুর রহমানের ঘুমের ঘোর কাটেনি তখনও। সালার আবদুর রউফ বললেন,

আমরা আপনার হুকুমের অপেক্ষায় মাননীয় আমীর। এ দুকয়েদীর খেকে শোনা যেতে পারে, কে এর নাটের গুরু! অচিরেই ওদের কারারুদ্ধ কিংবা জল্লাদের কাছে হাওয়ালা করা দরকার। তাদের বন্দী করা দরকার যারা এ কাজের হোতা। ওদের মেজাজ-মর্জি পরীক্ষা করা প্রয়োজন, যা এই ফেত্নর জন্মদাতা।

গোস্তাকি মাফ করবেন স্পেনরাজ! আবদুর রহমানের স্থলে যিরাব বললেন, শ্রদ্ধাভাজন উজির ও মান্যবর সালার যে কাজ করেছেন তা পরধর্মসহিষ্ণুতার বিরোধী। স্বাধীন ধর্মকর্মের প্রতি নগ্ন হস্তক্ষেপের শামিল। ভেল্কিবাজি ধর্মের নামে কেউ করলে করুক- আমাদের ধর্মে এর কোন ঠাঁই নেই। ওদেরকে এ ধরনের ভিত্তিহীন কর্মকাণ্ড করতে দেওয়া উচিত, যাতে জনতা বুঝতে পারে ইসলাম ও খ্রিস্টবাদের ফারাক। অচিরেই তারা জানতে পারবে ইসলাম কোন ভেল্কিবাজির ধর্ম নয়।

যিরাব! উজির গর্জে ওঠেন, আমরা আমীরে স্পেনের সাথে কথা বলছি তোমার সাথে নয়। হুকুম তার থেকে চাই-তোমার থেকে নয়। নয় মহলের সামান্য এক গায়ক থেকে। আমীরে মুহতারাম। এই ভেল্কিবাজি ইসলামের বিরুদ্ধে হচ্ছিল।

আমীরে স্পেন আবদুর রহমানের ভেতরটা সজাগ হয়ে উঠল। তিনি কোন আনাড়ি শাসক নন। জ্ঞানী ও কর্মঠ মর্দে মুজাহিদ। তার জ্ঞান গরিমার কথা ইতিপূর্বে আলোচনা হয়েছে। নারী ও সংগীতইও তাকে খেয়েছে। এর ওপর ঘুমের প্রকোপ। আবদুল করীমের গর্জন তার পৌরুষে আঘাত হেনেছে। তিনি যিরাবের দিকে ফিরে তাকান। সুলতানা নিছক এ উদ্দেশ্যেই যিরাবকে ডেকে পাঠিয়েছিল। আবদুর রহমান বললেন,

যিরাব! তুমি চুপ থাক, ওরা ঠিকই বলেছে। হুকুম দেব আমিই।

যিরাবও খুব চৌকস। কুদরত তাকে অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন করেছিলেন। তার সুরে ছিল মাদকতা। কথায় যাদু। ঠোঁটে খেলে গেল মুচকি হাসি। তিনি বললেন, স্পেনরাজ! আমি আমার কথা ফিরিয়ে নিচ্ছি। সেই সাথে ক্ষমা চাচ্ছি মাননীয় উজির ও মান্যবর সালারের কাছে। আমি আপনাদের চেতনা বিরোধী কথা বলিনি। বলতে চেয়েছি স্পেনরাজ আপনাদের কৃতকর্মের জন্য সাধুবাদ দিন। তবে রাজাকে তার প্রজাদের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত দিতে হবে। আপনারা আজ বাদে কাল ক্ষমতায় এসে এমন চিন্তা করেই সিদ্ধান্ত দেবেন বলে আমার বিশ্বাস। যদি স্পেনরাজকেও সেনাপতি বানানো হত তাহলে আপনাদের চেয়ে কঠোর হস্তে এই ফেত্নার মূলোৎপাটন করতেন তিনিও।

যিরাব চাতুর্যপূর্ণ যুক্তির বেড়াজালে আত্মপক্ষ সমর্থন করে তার বক্তব্য ঝেড়ে যাচ্ছিলেন। উপস্থিত শ্রোতাকুলে পিনপতন নিস্তব্ধ। আবদুর রহমান মন্ত্রমুগ্ধের মত গোগ্রাসে গিলছেন এই চাটুকারের বচন। তার ওপর আবার অর্ধনগ্ন সুলতানার রেশমী কোমল কুন্তলরাজি তার দেহে মাদকতার সুবাতাস বইয়ে দিচ্ছে। তার দেহে লাগছে নারী সৌন্দর্যের পিরামিডের উত্তাপ। ওর দিকে তাকালে স্পেনরাজের শ্বাস আর ওর শ্বাস একাকার হয়ে যেত। আরদুর রহমান বললেন, তোমরা যা করেছ-বেশ করেছে। ব্যাপারটা এখানেই চুকিয়ে ফেল।

এ সময় সুলতানা বললো, ওই দুকয়েদীকে যেন মুক্তি দেয়া হয়, যাতে অমুসলিম সংখ্যালঘুরা যেন একথা বলতে না পারে যে, ইসলাম একটি প্রজাপীড়ক ধর্ম।

হ্যা! ওদের ছেড়ে দিতে হবে, আবদুর রহমান বললেন।

হাজেব আবদুল করীম গোস্বায় উঠে দাঁড়ালেন। উঠে দাঁড়ালেন আবদুর রউফও।

আমীরে স্পেন? উজিরে আলা দরবারী রীতি উপেক্ষা করে বলতে লাগলেন, আপনি আরাম করুন। আমরা স্পেনে থাকি। আমরাই ইসলামকে জিন্দা রাখি। ইসলামের দেখুভাল ওইসব শহীদানই করে যাবে যারা বুকের তাজা খুন নজরানা দিয়ে আপনার দরজায় পড়ে আছে। যাদের আপনি এক নযর দেখারও প্রয়োজনবোধ করেননি।

আপনাকে দেখতে হবে না আমীরে মোহতরাম! খোদাতাআলাই ওদের দেখবেন। সালার আবদুর রউফ বললেন।

আপনারা শান্ত হয়ে বসুন! গোবেচারাস্বরে বললেন, আবদুর রহমান, আমি শুনে চলেছি। আমারও তো কিছু বলার থাকতে পারে।

স্পেন আপনার জায়গীর হলে আপনার অনুমতি ব্যতিরেকে আমরা শ্বাস ছাড়তাম না। এদেশ খোদাপ্রদত্ত। এদেশে ইসলাম কাউকে ভয় পেয়ে টিকবে না। কারো পরোয়া করবে না সে। ইসলাম ও ইসলামী সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখতে আমরা একপায়ে খাড়া। জীবনের শেষ ফোঁটা রক্ত দিয়ে হলেও এ মহতী কাজে আমরা পিছপা হব না।

আফসোস! আমার কারণে……………যিরাব বলতে লাগলো।

হাজেব তার কথার মাঝে বললেন, তোমার কথার কোন মূল্যায়ন নেই আমাদের কাছে মিঃ যিরাব। রাষ্ট্রীয় কাজে-কর্মে তোমার মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। তোমাকে আর এই নারীকে রুমবন্দী থাকা চাই। খেলাফতের কোন পরামর্শে তোমারা নাক গলাবার কে?

আমরা যা বুঝেছি করেছি। আবদুর রউফ বললেন, আমরা চলে যাচ্ছি। আমরা যদি কোন অন্যায় করে থাকি তাহলে আমাদের শাস্তি দাও।

উভয়েই আবদুর রহমান থেকে অনুমতি না নিয়েই চলে যেতে উদ্যত হলেন। আবদুর রহমান বললেন, দাঁড়াও! আমি শহীদানকে শ্রদ্ধা করি।

তারা থেমে গেলেন। তিনি তাঁদের দিকে এগিয়ে গেলেন। চলনে তার সিংহের ক্ষিপ্রতা। সুলতানা ও যিরাবও ভড়কে যায় ওই চলনে। তাঁর যাবতীয় ক্লান্তি ও প্রভাব যেন উবে গেছে। তিনি বললেন, আমি এইমাত্র বিছানা থেকে গাত্ৰোস্থান করেছি। আলোচ্য ঘটনা আমি এতটা ভেবে দেখিনি।

জাগো আমীরে স্পেন জাগো, দুশমন জাগছে। তুমি ঘুমিয়ে থেকোনা, তাহলে গোটা স্পেনই মরণ ঘুমে ঢলে পড়বে।

তারা আমীরে স্পেনের বিবেকের রুদ্ধদ্বারে টাকা দিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।

***

শার্সির কপাট ফাঁক করে আবদূল রহমান বাইরে তাকালেন। হাজেব আবদুর করীম ও সালার আবদুর রউফ শহীদানের লাশ ওঠাচ্ছেন।

ঈসায়ীদের লাশ ও জীবিত দুকয়েদী কি এখানে থাকবে? দারোয়ান জিজ্ঞেস করল।

আমীরে স্পেন যে হুকুম দেন তাই করো। আমরা স্রেফ শহীদানের লাশ নিয়ে যাচ্ছি।

আবদুর রহমান শহীদানের লাশ নিয়ে যেতে দেখলেন। প্রতিটি লাশ কাষ্ঠখণ্ডে শায়িত। চারজন করে সেপাই এদের বাহক। শহীদদের এ শব মিছিল মৌনতায় ভরপুর। উজির ও সালার সর্বপেছনে। এঁদের সম্মানে কোষমুক্ত তলোয়ার উঁচানো তাঁদের হাতে। ঘোড়া থাকতেও পদাতিক তারা। সামনে ডানে-বামে তলোয়ার উঁচিয়ে রাখা সেপাই। তাদের চাল-চলন ও গমন শোকের। ওরা তীব্রগতিতে চলছে। কেঁপে উঠছে যমীন। লাশবাহকদের চলায় গাম্ভীর্য বিদ্যমান। মামুলি চলছে তারা, যেন কাঁধে কিছু নেই।

আবদুর রহমান শার্সির ফাঁক দিয়ে এ দৃশ্য দেখে চলেছেন। তাঁর দৃষ্টির সীমায় শহীদী কাফেলার মৌন মিছিল। তার জোশ-জ্যবায় জোয়ার এল। টগবগ করে উঠল শিরার খুন। শাসির ফাঁক বন্ধু করে পেছনে ফিরলেন তিনি। তার দেহে নেই এক্ষণে সংগীত কিংবা সুলতানার আকর্ষণ। যিরা তাঁর অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন আনয়ন করেন। তিনি তাকে লক্ষ্য করে বলেন,

ওরা যা করেছে ঠিক করা বোধ হয় ঠিক হয়নি। আমিও আমার ভুল স্বীকার করছি। আপনি তাদের গোস্তাকি আশা করি সহজে নেবেন না।

কেন সহজে নেব না? আবদুর রহমান প্রশ্ন করেন, বিশ্বস্ততার সাথে তারা স্বীয় দায়িত্ব পালন করেছে। ওদের দরবারী রেওয়াজের বিরুদ্ধাচরণ হজম করেই ওদের ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখব। আর যিরাব! সুলতানা! তোমরা আগামীতে আমার উজির ও সালারের সামনে ওভাবে কথা বলবে না। এটা নিছক রাষ্ট্রীয় ব্যাপার। এতে কোন কথা কিংবা সিদ্ধান্তের যিম্মা ওদের-তোমাদের নয়। রাজনীতি যারা বোঝে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে কথা বলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কেবল তারাই।

যিরাবের আপাদমস্তক ঝটকা মেরে ওঠল। সুলতানা তা দেখে মাথা নীচু করলো। আমীরে স্পেন তাকিয়ে বললেন, সুলতানা! আমার গোসলের ব্যবস্থা করে। এরপর ওই দুই খ্রিষ্টানকে আমার সামনে হাজির করো। চীফ জাস্টিসই ওদের বিচার করবেন। কিন্তু এর আগে জানতে চাই, ওদের উদ্দেশ্য কি!

সুলতানা কামরা থেকে বেরিয়ে গেলো। আবদুর রহমান গেলেন বেডরুমে। যিরাবও বেরিয়ে গেল। যাবার সময় সে সেপাইদের বলল, দুকয়েদীকে আমার কাছে সোপর্দ কর। সে ওদের নিয়ে আরেকদিকে চলে গেল এবং তাদের সাথে জরুরী আলাপে মশগুল হল।

***

গোসল সেরে আবদুর রহমান শাহী হলরুমে প্রবেশ করেন। তার সামনে খ্রিস্টান দুকয়েদী। যিরাবও আছে ওদের সাথে।

তোমরা সত্য উচ্চারণ না করলে এমন ভয়াবহ শাস্তি দেয়া হবে-যার কল্পনাও করতে পার না। আবদুর রহমান বললেন, কে এই ভেল্কিবাজির উদগাতা? আমি এই পরিকল্পনার জন্য তাকে সাধুবাদ জানাই। তবে সে শাস্তির কবল থেকে রক্ষা পাবে না। সত্য উচ্চারণ করলে তোমরা জানে বেঁচে যেতে পার।

কি অপরাধ আমাদের? দুজনের একজন ফরিয়াদী সুরে বলল, আমরা আপনার প্রজা। উজির ও সালারের মোকাবেলায় আমাদের কথাকে আপনি বিশ্বাস করবেন না-যদিও আমরা সত্যবাক। বাস্তবতা আরেক রকম। আপনার লোকেরা কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়ানো গির্জায় আগুন লাগিয়েছেন, যা হযরত ঈসা (স)-এর যুগে নির্মিত। একে আপনি বাংকার বললেও সেটা আমাদের কাছে এমন পবিত্র যেমন আপনাদের কাবা শরীফ। রাতে আমরা ওখানে এবাদত করতে যাই। আমরা যখন ইবাদতে লিপ্ত তখন আপনার সেপাই আমাদের ওপর অকস্মাৎ হামলা চালায়। আমাদের সকল লোককে হত্যা করা হয় কেবল আমরা বন্দী হই। যেহেতু এক্ষণে আপনার কয়েদী আমরা, এজন্যই আমাদের অপরাধী বলতে পারেন।

ইসলামের শিক্ষা কি এই যে, সংখ্যালঘুর ইবাদতগাহে হামলা চালানো হবে? অপর কয়েদী প্রশ্ন করল, এই ঈসা মসীহর ছবি ওখানে পড়ে আছে। আপনার সেপাইরা এটা উঠিয়ে এনে এখানে আছড়ে ফেলেছে। আমাদেরকে এভাবে প্রভাবিত করে মুসলমান বানাবেন-এই খেয়াল করে থাকলে তা বাস্তবায়িত হবে না কোন দিনও।

ইয়াহইয়া। আবদুর রহমান দরবারী জনৈক চাটুকার আলেমকে লক্ষ্য করে বললেন, আমার সালার ও উজিরের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারী করব? ওরা মিথ্যা বলছে বলে মনে করব?

ইয়াহইয়া এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন এমতাবস্থায় এক কয়েদী বলে উঠল, উজির ও সালার তো কোন ফেরেশতার নাম নয়। ধর্মীয় উন্মাদনায় তারা আমাদের ওপর জুলুম করেছে। কিন্তু তারা ধারণা করেনি যে, এতে খ্রিস্টান সমাজ তাদের বিরুদ্ধে গেছে। আমরা আপনার বিশ্বস্ত প্রজা। ফ্রান্স সম্রাট লুই আর আল-ফাও খ্রিস্টান-এতদসত্ত্বেও আমরা তাদের বিরোধী, কেননা তারা আপনার দুশমন। দুশমন স্পেনের।

ওদের দুজনকে বাইরে নিয়ে যাও। আবদূল রহমান বললেন, আমাকে ভাববার একটু সময় দাও।

কয়েদীদের বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো। যিরাবের ঠোঁটে খেলে গেল আঠাল হাসি। ইয়াহইয়া গভীর চিন্তায় নিমগ্ন। আবদুর রহমানের গালে হাত। তার ও ইয়াহইয়ার জানা নেই যে, স্পেনরাজ গোসলখানায় গেলে যিরাব বেরিয়ে গিয়েছিল। সাথে নিয়ে ছিল দুকয়েদীকে। যিরাব যেহেতু দরবারী লোক, সেহেতু সেপাই বা কয়েদীদ্বয়কে তার হাতে তুলে দিতে দ্বিধাবোধ করেনি।

আমি উজির ও সালারের বিরুদ্ধে যাব? না না, তা হয় না। আবদুর রহমান ইয়াহইয়াকে প্রশ্ন করে নিজেই স্বগতোক্তি করেন।

হ্যাঁ। তাই। উজিরের বিরুদ্ধে যাওয়া ঠিক হবে না। বললেন ইয়াহইয়া। যিরাব তার সুরে সুর মিলিয়ে বলল, হ্যাঁ! উজির ও সালারের বিরুদ্ধে যাবার ঝুঁকি নিতে যাবেন না। আবদুল করীম যেমন উজির তেমনি তিনি সালারও। তিনি মারাত্মক একটি ভুল করেছেন, তাই বলে পরিস্থিতি এখনও হাতের বাইরে যায়নি। আমি খ্রিস্টানদের উত্তেজনা প্রশমনে যারপরনাই চেষ্টা করব। আপনি এদের মুক্তি দিন।

আপনি চাইলে তাই করুন। ইয়াহ্ইয়া বললেন, তবে এটা ভুলবেন না যে, বিদ্রোহ ফুঁসে উঠছে। আমি যদুর নিরপেক্ষ সূত্রে জেনেছি এর প্রতিপাদ্য হচ্ছে, রহস্যপূর্ণ রশ্মির মাধ্যমে পুরানো ওই গির্জায় স্পেনের মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে খ্রিস্টানদের উঙ্কে দেয়া হয়েছে। তবে কে এর হোতা তা জানা যায় নি। আমার পরামর্শ হচ্ছে, ওদের দুজনকে রেহাই দিয়ে খ্রিস্টানদের গতিবিধির ওপর কড়া নজর রাখা। গির্জায় আগুন জ্বেলে আপনি বিদ্রোহ নির্বাপিত করতে পারেন না। ঠাণ্ডা মাথায় ভাবুন।

কিছুক্ষণ এভাবে আলোচনা-পর্যালোচনা হোল। ইয়াহইয়া খ্রিস্টানদের পক্ষাবলম্বন না করলেও তাদের মাঝে তার স্বার্থ নিহিত ছিল, তাই কথা কিছুটা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে তাদের পক্ষেই নিলেন। যিরাব ওপরে ওপরে আবদুর রহমানের লোক হলেও প্রকৃতপক্ষে সে খ্রিস্টানদের-ই মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছিলেন। এরা দুজন প্রভাব বিস্তার করে দুকয়েদীকে আবদুর রহমানের মুখ দিয়ে মুক্ত করার ঘোষণা বের করাল।

কর্ডোভার গির্জায় এই সময় অনবরত ঘন্টাধ্বনি বেজে উঠল। কখনও জোরে, আবার কখনও আস্তে। এটা গির্জার ঘন্টাধ্বনির সময় নয়। মনে হচ্ছে তাদের ওপর কোন মুসিবত এসেছে।

আবদুর রহমান পেরেশান হয়ে বললেন, ওদের কি হলো? কোন মুসিবত ধরল ওদের?

যিরাব বললেন, প্রাচীন গির্জায় আগুন কি কম মুসিবত? এটা শোকধ্বনি। ওদের শোক-বিলাপ কি করে রুখবো রাজন! আপনি চিন্তা করবেন না। আমি ওদের সান্তনা দেব। ব্যাপারটা ধামাচাপা দিয়ে ওখানেই শেষ করব।

***

প্রাচীন এই গির্জা ছিল পাহাড়ের ওপর। এর ওপর প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা কর্ডোভার মানুষেরা দেখেছিল। কর্ডোভার গির্জায় গির্জায় তথাকথিত ঈসা মসিহের সেই কল্পিত বাণী চর্চা হতে লাগল যে, তোমরা স্বধর্মে ফিরে এসো।

কর্ডোভার পোপ বিশপরা জনগণকে বলতে লাগল, তোমাদের সেই গির্জায় আজ মুসলমানরা আগুন লাগিয়ে দিয়েছে যেখানে তোমাদের ইশ্বর-পুত্রের আগমন ঘটেছিল। এই গির্জাই তার নিকট প্রিয়পাত্র ছিল। তিনি বলতেন, তোমরা দুশমনদের হাতে পুরাভূত হবে। কোন কোন গির্জায় এ আওয়াজও শ্রুত হলো যে, ঈসা মসিহ নিজেই ওই গির্জায় আগুন লাগিয়ে চলে গেছেন যেখানে তিনি আঁধার রাতে আসতেন।

গির্জার ঘন্টা বেজেই যাচ্ছিল যেন এটা আর বন্ধ হবে না, আবদুর রহমানের প্রাসাদে এর ঢন ঢন্ আওয়াজ গুঞ্জরিত হয়। তিনি সিংহাসনে এলে ওই আওয়াজ আরো জোরালো হয়। তিনি গর্জে উঠে বলেন, ওদেরকে বন্ধ করতে বল। আমিতো সিদ্ধান্ত ওদের পক্ষে দিয়েছি।

স্পেনরাজের হুকুম তামিল করতে দুজন গির্জার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। বাইরে শোনা যায় এদের বিলীয়মান ঘোড়ার খুরধ্বনি। খানিকবাদে ঘন্টাধ্বনি কমে যায়।

গীর্জার ঘন্টা বন্ধ হয়ে গেছে আমীর সাহেব। আবদুর রহমানকে জানাল কেউ।

হা হা! আমার কান আছে। বললেন তিনি।

কিন্তু আপনি ওই তুফানকে কি করে প্রতিহত করবেন, গির্জাকে কেন্দ্র করে যা ফুঁসে উঠছে? উজির আবদুল করিম বললেন, যিনি পদমর্যাদানুযায়ী তার পাশে। বসেছিলেন, মানুষের মধ্যে ধিকি ধিকি করে জ্বলা আগুন নেভানো কি প্রক্রিয়া আছে আপনার কাছে? আমীরে স্পেন। আমি এইমাত্র শহীদদের দাফন করে এসেছি।

শহীদ! শহীদ!! আবদুর রহমান আনমনে উচ্চারণ করেন। আবদুল করীম অন্য কোন প্রশ্ন থাকলে বল, এই ব্যাপারটা নিয়ে আমাকে একটু ভাবতে দাও। বলে তিনি দরবারের সকলকে অবাক করে দিয়ে অন্দরে চলে যান।

সন্ধ্যার দিকে আবদুর রহমানকে রোজকারমত সারাদিনের খবরাখবর শোনানো হচ্ছিল। তার তথ্য উপদেষ্টা ছিলো দুজন। সরাসরি তারা আবদুর রহমানের সাথে দেখা, করতে পারত না। জনৈক দরবারী আমলা এদের থেকে তথ্য নিত এবং কেবল সে সব খবরই আবদুর রহমানের কানে দিত যা শুনতে তিনি পছন্দ করতেন। যিরাব দরবারে ঠাই পাবার পর থেকে দেশের সুখকর খবর- গুলোই (স) তার গোচরে আনতেন আর খারাপ খবরগুলো সযতে এড়িয়ে যেতেন।

জনগণ কেন্দ্রীয় মুসলিম খলিফাঁকে চেনে না, চেনে কেবল স্পেনরাজকে। তথ্য উপদেষ্টা আবদুর রহমানকে বলল,

কোথাও কি বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে না? প্রশ্ন করেন তিনি।

বিদ্রোহ? কি ধরনের বিদ্রোহ? মুসলিম খ্রীস্টান সকলেই হুজুরের নামে সেজদা করে। পাগল মাত্রই বিদ্রোহের কথা ভাবতে পারে। বলল তথ্য উপদেষ্টা।

প্রতি সন্ধ্যায়, তাকে এমন খবর দেয়া হত যাতে খোদার পরেই তাকে আসন দানের প্রয়াস থাকত। তিনি প্রজাদেরকে চাটুকার আমলাদের মত মনে করতেন এবং ওদের কান দ্বারা বাইরের খবর শোনতেন। এরাই স্পেন গভর্নরকে স্পেন সম্রাটে, পরিণত করেছিল।

গোটা স্পেনে যখন বিদ্রোহের ধূম্রগিরি উদগীরণ, হচ্ছিল, যখন ভেল্কিবাজির আগুন খ্রীষ্ট সমাজে মুসলিম বিদ্বেষী চেতনা ছড়াচ্ছিল; ঠিক তখন চাটুকাররা প্রজারা রাজাকে সেজদা করে-এমন খবর পরিবেশন করত। স্পেনের সেই আমীরের সামনে যিনি আলেম, বিজ্ঞ, রাজনীতিজ্ঞ, তর্কবাগিশ, ধীমান এবং যার তলোয়ারের সামনে ফ্রান্স সম্রাট লুই এবং আল-ফাপ্পর মত যুদ্ধংদেহী যার সামনে মাথা নোয়াত। কিন্তু তিনি আঁচ করতে পারলেন না চাটুকাররা কিছু বলছে আর পর্দার আড়ালে অন্য কিছু করছে। তাদের দ্বারা যা কিছু বলা হচ্ছে কিং করানো হচ্ছে-তাই আগামী দিনের ইতিহাস, ইতিহাস ইসলামের।

ইতিহাস যেমন শিক্ষাপ্রদ তেমনি আলোবর্তিকাও। অনাগত ভবিষ্যৎ যেমন এর আলোকে পথভ্রষ্ট হতে পারে ঠিক তেমনি এর দ্বারা মঞ্জিলে-মকসুদেও পৌঁছতে পারে। পথ হারিয়ে ফেলা কিংবা পথপ্রাপ্তির মানদণ্ড হচ্ছে, পূর্বসূরিদের মিথ্যা বলা কিংবা সত্য বলা। যে জাতির ইতিহাসে চাটুকার ও গাদ্দারদের প্রবল দখল তাদের ইতিহাসের পৃষ্ঠা অবশ্যই মিথ্যাচারে পরিপূর্ণ। মানুষ মানুষকে আত্মপূজারী বানাতে পারে। বানাতে পারে রাজাও, কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা বড় কঠিন ও ভয়াল।

হিন্দুস্তানে মোঘল ও স্পেনে বনি উমাইয়ারা যে ইতিহাস রচনা করেছে তা চাটুকারদেরই হাতে লেখা, যার ওপর আমরা গর্ব করে থাকি। প্রাচ্যের তাজমহল, শাহী মসজিদ আর পাশ্চাত্যের আলহামরা, কর্ডোভা মসজিদ দেখে আমরা অবাক হয়ে যাই, কিন্তু আমাদের কজনা এই চিন্তা করেন যে, এই স্থাপত্য শিল্পীদের অবক্ষয় এল কেন? কেন ইসলামী সাম্রাজ্য শত খণ্ডে খণ্ডিত হল?

এই কার্যক্রম চাটুকার ও গাদ্দারদের যারা প্রশাসনের বিবেচনার ওপর জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসেছিল। এরা তারাই যারা এই প্রশাসনের মৃত্যুর পর তাদের কবরের ওপর প্রমোদ ভবন নির্মাণ করেছিল। স্পেন ইতিহাসের এক একটি পৃষ্ঠা ও এক একটা শব্দের ওপর চিন্তা করলে আমাদের স্বতঃই উপলব্ধি হবে যে, শতাব্দীকাল ধরে আমরা সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছি। চাটুকার উপদেষ্টারা আমাদের প্রশাসনকে দেশী-বিদেশী পুরস্কার ও সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা করে তাদের স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডকে ধামাচাপা দিচ্ছে। রাজা-প্রজার সম্পর্ক আজ সাপে-নেউলে পর্যায়ের। আজকের শাসকবর্গ মনে করছে, তারা যাই কিছু করুক না কেন প্রজারা তাদের সম্মুখে করজোড় প্রণাম রত আছে, থাকবে।

***

যে সন্ধ্যায় আবদুর রহমানকে ওই খবর শোনানো হয় সেই খবরের কোথাও খ্রীস্ট প্রজ্বলন ও তাদের বিরূপ জাগরণের নামোল্লেখ পর্যন্ত ছিল না। এমন কি খোদ আবদুর রহমান প্রশ্ন করেন যে, এ ব্যাপারে কি কোন খবর নেই?

এমন কিছু হয়নি যা বলার মত। কেউ তাকে উত্তর দেয়।

সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ওই দিন প্রত্যূষে বলা উজির ও সেনাপতির কথা মনে পড়ে যায়। তারা বলেছিলেন, আপনি আরাম করুন আমরা জিন্দা আছি। ইসলামকে আমরা জিন্দা রাখবই। ইসলামেরাও সম্ভ্রম রক্ষা তাদের দ্বারাই হবে যাদের লাশ আপনার দরজায় পড়ে আছে।

যদি বলার মত গুরুত্বপূর্ণ কথা না-ই হবে তাহলে গির্জায় ঘন্টা বাজলো কেন? প্রশ্ন আবদুর রহমানের, তোমরা ওই শহীদানের নামোল্লেখ করোনি আজ যাদের দাফন করা হয়েছে, জনগণ তাদের জানাযায় শরীক হয়েছে। তাদের মাঝে নানান কথার কানাঘুষা, নানান অভিমত, আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে নিশ্চয়ই।

স্পেনরাজের এ ব্যাপারে মাথা ঘামানোর সময় কৈ? এ বিষয় নিয়ে তারাই ভেবে দেখবে যারা এর সাথে সংশ্লিষ্ট। আপনি নিশ্চিত থাকুন। যিরাব বললেন।

যে রাতে তথ্য সন্ত্রাস দ্বারা আবদুর রহমানকে অবোধ শিশুর মত ঘুম পাড়ানো হচ্ছিল সে রাতে কর্ডোভা থেকে ৫০/৬০ মাইল দূরে জনৈক দুঘোড়া চালক এলোগেইছকে বোঝাচ্ছিল যে, পুরাতন গির্জায় যে ঈসা-নাটক শুরু হয়েছিল, দুর্ভাগ্যজনক হলেও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে তা। অবশ্য এর দ্বারা উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে পুরোপুরি। রাতের বেলায় ঘটা করে এ কাহিনী তাকে সবিস্তার শোনানো হয়। বলা হয়, গীর্জায় লাগানো ভেল্কিবাজির কথা। এরা সেই লোক যাদেরকে গীর্জা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং পরে আবদুর রহমান যাদেরকে রেহাই করে দিয়েছিলেন।

তোমাদের মুক্তি দেয়ার অর্থ এই যে, আবদুর রহমানের কাছে ব্যাপারটায় তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। আমলারা এ ব্যাপারে কি প্রতিক্রিয়া জাহির করেছে? প্রশ্ন করে এলোগেইছ, আপনি যথার্থই অনুমান করেছেন। স্পেনরাজের সম্মুখ হাজির করার পূর্বে যিরাব আমাদেরকে বাইরে এনে বলে দিয়েছিল, কি বলতে হবে আবদুর রহমানের সামনে। যিরাব ও সুলতানা স্পেনরাজের দিমাগের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। আমরা মজলুমের অভিনয়ে বলেছিলাম, আপনার আমলারা সম্পূর্ণ বিনা উস্কানিতে আমাদের গীর্জায় আগুন দিয়েছিল। বলল জনৈক ঈসায়ী।

স্পেনরাজের হরমের দুজন খ্রীস্টান নারী বলেছে, আবদুর রহমানের দিমাগ পরিষ্কার করা হয়েছে। তিনি তাই এ ঘটনাকে তেমন একটা পাত্তা দিচ্ছেন না, অপর ঈসায়ী বলল।

গীর্জায় এক্ষণে খ্রীস্টানরা আবারো জমায়েত হচ্ছে। তাদের প্রতিশোধস্পৃহা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। প্রথম খ্রীস্টান বলল।

আমি মুসলমানদের মধ্যে এর বেশ প্রতিক্রিয়া দেখেছি। সিংহভাগ মুসলমানের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে, হযরত ঈসা (আ)-এর আত্মপ্রকাশ ঘটেছে, আর এই আগুন তাদের বদ দোয়ার কারণে লেগেছে। দ্বিতীয়জন বলল।

এই আগুন আমরা নিভতে দেব না। বলল- এলোগেইছ এদের পুরোকথা শোনার পর, তোমরা কর্ডোভায় ফিরে যাও, আমি মাদ্রিদ যাচ্ছি।

এলোগেইছ যে পাদ্রীর আশ্রয়ে ছিল সে জিজ্ঞেস করল, মাদ্রিদ গিয়ে তুমি কি করবে- কর্ডোভায় কেন যাবে না? বিদ্রোহাগ্নি জ্বলছে-একে এগিয়ে নেয়া দরকার নয় কি?

আমার দৃষ্টি এ মুহূর্তে গোটা স্পেনকে নিয়ে দেখতে চায়। এলোগেই বলল, এ মুহূর্তে মাদ্রিদে একপশলা স্ফুলিঙ্গ জ্বালানো দরকার। এতদুদ্দেশে আমার জনৈক সহপাঠী ওখানে আগেই চলে গেছে। ওখানে এমন এক মুসলিম শাসক রয়েছে যাকে আমরা বিদ্রোহী ভরে তুলতে পারি। আমার প্ল্যান হচ্ছে, বিদ্রোহের দায়ভার নিজেদের কাঁধে না নিয়ে কোন মুসলমানে ওপর দায়ভার চাপানো।

তুমি এমন কোনো মুসলমানকে দলে পাওয়ার আশাবাদী, যে মুসলিম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ধুম্র গিরি উদগীরণ করবে? পাদ্রী জিজ্ঞেস করল, দেখো, কোনো মুসলমান তোমার সহপাঠীর সাথে হাত মিলিয়ে না আবার তোমায় শ্রীঘরে পাঠায়। তোমার অনুপস্থিতিতে ওই বিদ্রোহাগ্নি তো সহসাই নিভে যাবে।

এলোগেইছকে খোদাতাআলা এমন কিছু গুণ দান করেছিলেন যা অন্যের বেলায় করেননি। সে কোরআন গবেষণার এতই গভীর পৌঁছেছিল যে, মুসলিম মনীষীরা যে গভীরে পৌঁছুতে পারেননি। কোরআন গবেষণার দরুন সে স্বধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে নামকাওয়াস্তের খ্রীষ্টানে পর্যবসিত হলেও প্যাম্পোলনার প্রাচীন গির্জায় গভীর রাতে জনৈক পাদ্রীর লিখিত একখানা পুস্তক আবিষ্কার করল। ওই বইতে ইসলাম ও এর নবীর বিরুদ্ধে কুত্সায় ভরা। মনগড়া কথকতায় ঠাসা। ইসলামের প্রতি কোরআন গবেষণার দ্বারা যে প্রভাব তার মনে দাগ কেটেছিল ওই পাণ্ডুলিপি পড়ে তার খ্রীস্টত্ব পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তার ইসলাম মিত্ৰতা সে সময় বৈরিতায় পর্যবসিত হলো। মুহূর্তেই মুসলমানদের ঘোরর দুশমনে পরিণত হল।

সর্বাগ্রে তাই সে জনৈক ঈসায়ী আলেম সেন্ট জুলিয়াসের শিষ্যত্ব গ্রহণ করল। পরে সে কেবল খ্রীস্টীয় আলেমই নয় বরং মানুষের দুর্বল পয়েন্টগুলো জেনে যথোপযুক্ত আঘাত করার বুৎপত্তি অর্জন করল। যিরাবের মত চৌকস লোককেও সে নাচের পুতুলে পরিণত করেছিল। কর্ডোভার ঈসা মসীহের তথাকথিত আত্মপ্রকাশ তারই তীক্ষ্ণমেধার ফসল। পরিস্থিতি যেমনই হোক একে অনুকূলে নিয়ে আসার যোগ্যতাটুকু ছিল তার পুরোপুরিই।

বিছানো কুটিল ফাঁদের রিপোর্টগুলো এবার সে নিতে শুরু করল একে একে। পাদ্রী তাকে বলেছিল, কোনো মুসলমানের ওপর আস্থা না আনতে। কেননা এ জাতি খুবই ধূর্ত। শেয়াল যাদের কাছে হার মানে।

নারী ও ধন-দৌলত এমন এক সম্মোহনী শক্তি যা স্বীয় ইবাদতগাহে পর্যন্ত আগুন লাগাতে পারে। এলোগেইছ বলল, আমি যতটা ইঞ্জিলের আলেম ততটা কোরআনেরও। ও দুধর্মগ্রন্থে খোদাতায়ালা ধনের মোহ থেকে দূরে থাকতে এবং কোনো নারীকে ভাল লাগলে তাকে বিয়ে করে নিতে বলেছেন। অবৈধভাবে কোনো নারীর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের সাজা মৃত্যু। ব্যভিচারী নারী-পুরুষকে কোরআন পাথরাঘাতে শেষ করতে বলেছে। ইঞ্জিলের বিধানও এমন………কিন্তু কেন? কেন এত কঠোর? কেননা একজন সুন্দরী নারী দেশ-জাতির এতটা ক্ষতিসাধন করতে পারে-যা। পারে না একটি দেশের সব সৈন্য মিলেও।

নারী এক ধরনের মদ। এক ধরনের নেশা। এক প্রকারের যাদু আছে যা বড় বড় যুদ্ধংদেহীকে পর্যন্ত কুপোকাত করেছে। দিগ্বিজয়ী বীরবিক্রমকে সে নাচের পুতুল বানিয়েছে। এর চেয়ে মারাত্মক নেশা হচ্ছে মনি মান্নিক্যের ও রাজ সিংহাসনের। কোনো মানুষকে গদীর লোভ দেখালে দেখবে সে তার ঔরসের মেয়েকে নিলাম করে দেবে। মিথ্যা কথা বলবে। নিজ খোদা ও ধর্মকে পর্যন্ত মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে দ্বিধাবোধ করবে না। একদিকে সে যেমন খানার মুখ খুলবে তেমনি খুলবে কয়েদখানার মুখও। কাউকে অন্ন-অস্ত্রে দুহাত ভরে দেবে আবার কাউকে শ্রীঘরে পাঠিয়ে রাজার্সন পোক্ত করবে।

এরপরও আমার কেন যেন মনে হচ্ছে তোমাকে ধোঁকা দেয়া হচ্ছে, পাদ্রী বলল, অনেক ক্ষেত্রে পরিপক্ক কানুন ও দর্শন বিফল হয়ে থাকে।

আবদুর রহমানের মত চৌকস ও পাক্কা মুমিন যদি নারীর বাহুতে আটকে যেতে পারে তাহলে আমার মনে হয় দুনিয়াতে এমন কোনো মুসলমান নেই-নারীর মোহ থেকে যে বাঁচতে সক্ষম। যবান থেকে এক্ষণে আমার পরিকল্পনা ফাঁস করব না-এটা এক ধরনের গোনাহ। আমার মিশন খ্রীষ্টবাদ ও স্পেনকে মুসলিম মুক্ত করার উদ্দেশ্যে। ধর্ম ও জাতির জন্য তাই মিথ্যা বলতেও রাজি আমি। এতে সওয়াবেরও আশা করি। আমি হুকুমত চাই না, চাই না আত্ম প্রসিদ্ধি। আমি নিজেকেই নিজে হাতে হত্যা করেছি। মুসলিম ঘরনা ও শাসকবর্গকে জিন্দা রাখার কোশেশ করছি। বাহ্যত তাদের মধ্যে একতা দেখাব, কিন্তু পরস্পরকে পরস্পরের দুশমন বানাব। কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে এর বিকল্প নেই।

মাদ্রিদে আবদুল জব্বার নামী শাসককে এতদিন নেককার মুমিন বলে জেনেছি। বর্তমান শুনেছি সে নাকি গদিলাভের স্বপ্ন দেখছে। আমি তাকে হাতের মুঠোয় আনতে চাই। আমাদের কিছুলোক তার পিছু নিয়েছে। তাকে আমার চাই। শুধুই আমার। শেষের দিকের কথাগুলো বলতে গিয়ে এলোগেইছের চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠল।

***

মুহাম্মদ ইবনে আবদুর জব্বার স্পেন। আমীর দ্বিতীয় আবদুর রহমান ইবনে হাকামের যুগে স্পেনের বিখ্যাত রাজনীতিজ্ঞে পরিণত হয়েছিলেন। তবে সুখ্যাতি নয় তার নামে ছড়িয়েছিল কুখ্যাতি। আবদুর রহমানের বাবা আল-হাকামের যুগে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, জনগণের ওপর থেকে ট্যাক্স উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল। এদিকে আবদুর রহমানের যুগে কোষাগার প্রতিনিয়ত তলাহীন ঝুড়িতে পরিণত হতে চলেছিল। কথিত আছে, সীমান্তে যেহেতু প্রায়শই বিদ্রোহ হত সেহেতু সেনা প্রেরণ করতে হত। বারবার ব্যাটালিয়ন প্রেরণের কারণে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বেড়ে যেত। এর চেয়ে বেশী ব্যয় হত মহল সামলাতে। যিরাব ও সুলতানা স্পেনরাজের জন্য খাই খাই হাতিতে পরিণত হয়েছিল। সর্বোপরি চাটুকারদেরও আবদুর রহমান সেলামি দেয়া শুরু করেন। যিরাব ও সুলতানা যাকে যখন যেমন চাইত বখশিস দিত।

এসব ট্যাক্সের অতিরিক্ত বোঝাটা চাপানো হত মাদ্রিদের জনগণের ওপর। মাদ্রিদ ওইযুগে এ যুগের প্রদেশের মত ছিল। ট্যাক্স, কর ও বখরা উসুলের জন্য কর্মী নিযুক্ত ছিল। মাদ্রিদের গভর্নর ছিলেন আবদুর জব্বার, তার প্রায়শই গ্রাম-গঞ্জে সফর করতে হত। তিনি ছিলেন দ্বীনদার গভর্নর এবং কঠোর প্রশাসক। এজন্য লোকেরা তাকে সমীহ করে চলত। তার প্রভাবে প্রভাবিত থাকত।

সরকারী বডিগার্ড ছাড়াও তার আশেপাশে ঠাই দিয়েছিলেন গ্রাম্য লড়াকু মাস্তান ও গুণ্ডাদের। এরা ট্যাক্স আদায় করে আবদুল জব্বারের খুব মদদ করতেন। এরা বখশিসের যোগ্য ছিল, কিন্তু উসুলকৃত ট্যাক্স থেকে সামান্যও দিতেন না তিনি। এই চক্র একটি পন্থা বের করে। সেই পন্থার নাম ডাকাতি। তারা অযথা হয়রানি করে কাফেলার গতিরোধ করে চাঁদাবাজি করত।

এদের ছাড়া আবদুল জব্বার ছিলেন অসহায়। তিনি এই রাহাজানির পথ রুদ্ধ করেন। তিনি বলেন, তোমরা পাইকারী হারে রাহাজানি করো না-একটু আধটু করলে তাতে আপত্তি নেই। মাস্তান গং এই প্রস্তাব লুফে নিল। ওরা দুএকদিন পরপর কাফেলার গতিরোধ করে। একবার তারা একটি কাফেলার গতিরোধ করে একটি তলোয়ার আবদুল জব্বারকে হাদিয়া দিল। পর্যায়ক্রমে এভাবে তারা দুএকটা উপহার গভর্নরকে দিয়ে চলত।

***

লুটের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকল, আবদুর জব্বার ডাকাতদের হাদিয়া কবুল করে যেতে থাকলেন। কিন্তু উসুলকৃত ট্যাক্সের কানাকড়িও তাদের দিতেন না। একবার তিনি শহর থেকে দূরে কোন এলাকায় ট্যাক্স আদায় করতে গেলেন। তাকে দুচারদিন ওখানে থাকার দরকার ছিল। রাতের বেলা ডাকাতদল তার কাছে এলো। সাথে তাদের সুন্দরী দুযুবতী। ডাকাতরা বলল, এ সামান্য তোহফা। এরা কাফেলা থেকে এদের অপহরণ করেছিল।

মুহাম্মদ ইবনে জব্বার এই তোহফা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন।

আপনি এদের একজনকে না হয় গ্রহণ করুন। ডাকাতদের একজনে বলল, দুজন রাখলে আপত্তি নেই।

ডাকাতির যে মাল আমি এতদিন গ্রহণ করে এসেছি তাও এক ধরনের গোনাহ। কিন্তু এই যুবতীদের গ্রহণ করে কবিরা গোনাহ করতে পারব না। নিয়ে যাও ওদের। আবদুর জব্বারের কণ্ঠে তিরস্কার।

এক যুবতী তার পথে আছড়ে পড়ল, অপরজন ফুঁপিয়ে কাঁদছিল।

আমাদেরকে আপনার কাছে রাখুন। আছড়ে পড়া যুবতী বলল, আমাদেরকে ওই হিংস পশুদের হাতে সোপর্দ করবেন না।

যুবতীরা দেখল লোকটা খুবই সৎ। খুব সম্ভব তিনি তাদেরকে বাড়ী ফেরৎ পাঠাবেন, প্রথমজন বলল, আপনি আমাদের ফেরৎ না পাঠিয়ে আপনার স্ত্রীত্বে বরণ করুন।

উভয়ে এমনভাবে কাকুতি মিনতি করল যাতে আবদুল জব্বারের মন গলে গেল। তিনি বললেন, আমি এই তোহফা কবুল করলাম। আমি ওদের বাবা-মার কাছে পৌঁছালে তোমাদের কোন আপত্তি থাকবে না তো!

শর্ত হচ্ছে, আমাদের গ্রেফতার করবেন না। ডাকাত সর্দার বলল।

তোমাদের কেউ গ্রেফতার করবে না। তোমরা যাও। এদেরকে আমার কাছে থাকতে দাও। গভর্নর বললেন।

ডাকাতরা চলে গেল। আবদুর জব্বার যুবতীদের বললেন, তোমরা এখন নিরাপদ। রাতে তোমাদের আলাদা কামরায় থাকতে দেয়া হবে। আমার কাজ শেষ হলে তোমাদের বাড়ী পৌঁছে দেব।

তিনি ওদের ওপাশের কামরায় পাঠিয়ে দিলেন। বললেন, চাইলে দরজায় ছিটকিনি ভেতর থেকে বন্ধ করে দিতে পার। এরা উভয়ে এমন খুবসুরত ছিল যে, নেহাৎ নেককার হওয়া সত্ত্বেও কেমন যেন তার ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। জীবনে এমন নারী এই প্রথম দেখছেন তিনি।

১.৫ গভীর রাত

গাঢ় নিদ্রায় বিভোর আবদুর জব্বার। কামরার কোণে টিমটিম করে জ্বলছে কুপি। আচমকা তার দৃষ্টি খুলে গেল। কে যেন তাকে সুড়সুড়ি দিয়ে জাগাচ্ছে। কে তাকে এভাবে জাগাতে পারে? ধড়ফড়িয়ে উঠলেন তিনি। সহসাই তলোয়ার উঁচিয়ে ধরেন। আবছা আলোয় খাটের কোণে জনৈক তরুণীকে দণ্ডায়মান দেখেন তিনি।

তুমি! তুমি এখানে?

আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে। আমি এর অযোগ্য হলে বলুন কি করে আপনার এই অনুদান শোধ কর। বলে যুবতী খাটের কোণে বসে গেল।

আমি এমন আহামরি কি করলাম তোমার জন্য। আবদুর জব্বার বললেন, প্রতিদান দেয়ার স্থলে তুমি আমাকে উদ্বিগ্নই করে তুলছ, তুমি দিতে এসেছ আমার মুখে চুনকালি।

যুবতী তার ১ হাত নিজের মুখে পুরে নিল এবং চোখ ঘেঁয়াল, পরে নামিয়ে দিল ঠোঁট।

আবদুর জব্বারের চেহারায় যৌবনের ইতিহাস। তার যৌবনের সেই সোনালী দিন এখন কেবল ধূসর অতীত। যুবতীর আবীর ছোঁয়া তাকে পেছন অতীতে নিয়ে চলে। নিযুতি রাত আর ভুবন মোহিনীর এই সম্মোহনী শক্তি আবদুর জব্বারকে তার পরিণতির কথা ভুলিয়ে দেয়।

রাত আরো গম্ভীর হতে থাকে। নেককার গভর্নর আর কুলটা যুবতীর জীবনে আরেক দুনিয়ার দরজা উন্মুক্ত হচ্ছিল। জীবনে যা তার কাছে অভাবনীয় ছিল তা বাস্তবে ধরা দিল। বড় মনোমুগ্ধকার হয়ে দেখা দিল। যেখানে তার তিনদিন থাকার কথা, সেখানে তিনি দশদিন থাকলেন। শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরতে হল। অবশ্য যুবতীদের সাথে নিতে ভড়কালেন। ওদেরকে ওখানেই থাকার ব্যবস্থা করলেন। ডাকাতগংকে বললেন, এদের শান্তি-নিরাপত্তায় খেয়াল রাখতে। আরো বললেন, তিনি আসতে থাকবেন। এরপর তিনি চলে গেলেন।

যুবতীদের যাবতীয় ব্যবস্থা করল ওরাই যারা ওদেরকে কাফেলা থেকে বন্দী করে নিয়ে এসেছিল। মুহাম্মদ ইবনে আবদুর জব্বারের প্রস্থানের পর ডাকাতরা যুবতীদের কাছে এলো।

মনে হচ্ছে তোমাদের মিশন সফল হয়েছে। ডাকাত সর্দার বলল।

তোমরা বলতে লোকটা পাথুরে হৃদয়বিশিষ্ট। কিন্তু আমরা তাকে মোমের মত গলিয়ে দিয়েছি। যুবতী বলল।

গোনাহর একটি দরজা খুললে অন্যান্য দরজাও খুলে যেতে লাগল আবদুল জব্বারের জীবনে একে একে। জীবনের পিছল পথে গোনাহ অতি অবশ্যই ওঁত পেতে থাকে কিন্তু একে সামাল দেয় সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি। অবশ্য ওঁত পাতা এই দুশমন মানব প্রতিরোধের পাহাড়কে দুমড়ে মুচড়ে থেতলে দেয়। যে আবদুল জব্বার বৈধ পন্থায় রাজস্ব আদায়কে ঈমানী দায়িত্ব বলে অংগীকারবদ্ধ ছিলেন, সেই আবদুল জব্বারই নীতিজ্ঞানহীন খ্রীষ্টানদের মায়াজালে আটকে পড়লেন। তার সে এমন এক মায়াজাল, এমন এক সম্মোহনী শক্তি যা যে কোন গোনাহর জন্ম দিয়ে চলে একের পর এক। তিনি অধিকাংশ সময়ই দেশ শাসন ছেড়ে সফরে বের হতেন। আসতেন সেই গ্রামে যেখানে ঐ দুযুবতীর অবস্থান।এরা সেই যুবতী যারা পয়লা মোলাকাতে কেঁদেছিল এক্ষণে হাসিখুশিতে কালাতিপাত করতে লাগল। ওরা কুলটা হতে শাহযাদীতে রূপান্তরিত হল। পুরানো দিনের পোড়াবাড়ী প্রাসাদোপম অট্টালিকায় রূপ নিল। সেই মহলে শরাব আমদানী হল। অল্পদিনে নতকীরও অন্তর্ভুক্তি হল। এই জলসা সাজাতে চাই কাড়ি কাঁড়ি অর্থ। আবদুল জব্বার ট্যাক্সের আমানতে খেয়ানত করতে শুরু করলেন। ডাকাতের সূচী লম্বা হতে লাগল। আবদুল জব্বার রীতিমত হেরেম বানালেন। বনে গেলেন মুকুটহীন সম্রাট।

***

অল্পদিনের ব্যবধানেই তিনি আঁচ করতে পারলেন তার আশেপাশে যারা চাটু কারের ভূমিকার ছিল তাদের সকলেই খ্রীস্টান। তমধ্যে মুসলমানও ছিল। কিন্তু সকলেই নও মুসলিম। যারা বাহ্যত নব দীক্ষিত মুসলিম হলেও তলে তলে কুশ পূজারী। ওরা নেপথ্যে পেয়ে যেতে লাগল মুসলিম শেকড় কাটার ষড়যন্ত্র বার্তা। আবদুর জব্বারের উপদেষ্টারা যেতেন-এরা তারই নির্বাচিত। তারা তাকে রঙ্গ-রসের আসরে গলা অবধি ডুবিয়ে রাখল। এরা শুধু তার ডান হাত নয় তার রহস্যের সংরক্ষকও।

একবার তার এই করুণ দশা দেখতে পেল ন্যায়নিষ্ঠ এক মুসলিম সেনা। তিনি তাদেরকে এনাম দেয়ার টোপে তথ্য প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান। এর ভেতরে-বাইরের দশা দেখে রীতিমত কেঁপে উঠলেন তিনি। দেখলেন দিগম্বর নর্তকীরা কোমর দুলিয়ে নাচছে, শরাবের বন্যা বইছে। পরদিন আবদুল জব্বার অধিবেশন ডাকেন। ট্যাক্স অনাদায়ী লোকদের হাজির করা হয়। তারা টাক্স আদায়ের অপারগতার কথা শোনায়, আব্দুল জব্বার জনগণের পক্ষেই সব সময় ফায়সালা করতেন। কাজেই এই অধিবেশনের ফায়সালা ওদের পক্ষেই গেল।

আবদুল জব্বার মাদ্রিদ চলে গেলেন। তার দেহরক্ষী বাহিনীর প্রধান সালারকে জিজ্ঞেস করলেন, আবদুল জব্বার বাইরে কোথায় যান? খাজাঞ্চিখানা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। ট্যাক্স ফাঁকিদাতাদের গ্রেফতার না করে তাদের ফোর্সে শামিল করেছেন।

আবদুল জব্বার আর মাদ্রিদ ফিরলেন না। মাস্তান গুণ্ডাদের নিয়ে তিনি ওখানেই এক বিশাল বাহিনী গড়ে তুললেন। ডাকাত দলের প্রধানকে ডেকে গোটা এলাকায় এ মর্মে ঘোষণা করতে বললেন যে, আজ থেকে আবদুল জব্বার এখানেই থাকবেন-মাদ্রিদ যাবেন না। ট্যাক্সের অফিস এখানেই খোলা হচ্ছে। কাজেই ট্যাক্স এখন থেকে এখানে আদায় করতে হবে। এলোগেইছ এবার পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। তার মিশন সাকসেসফুল। তখন আবদুর জব্বার তার টোপ গিলে ফেলেছে। কাজেই তাঁর সাথে কথা বলা যায়। বলা দরকার। এলোগেইছ এসে বলল,

আপনাকে মনে রাখতে হবে, জীবন চলার পথে একাকী মুসাফির নন আপনি। এক্ষণে আপনার কোন প্রভাব কিংবা মূল্যায়ন নেই। যে কোন সময় আপনাকে হত্যা করা হতে পারে। কিন্তু আপনাকে আমি মাদ্রিদের স্বাধীন রাজা বানাব। মাদ্রিদ হবে খণ্ডিত স্পেনের স্বাধীন রাজ্য। খ্রীস্টান ও নবদীক্ষিত মুসলমানরাই আপনাকে সাহায্য করবে। ওরাই আপনার বাহিনী। আপনার মর্যাদা পুনরুদ্ধারের অপচেষ্টা চালিয়ে আমাদের ধোকা দেয়ার চেষ্টা করলে পরিণাম এতই ভয়াবহ হবে যে, এর কল্পনাও করতে পারবেন না আপনি।

এই পরামর্শ আবদুল জব্বারের আনুকূল্যেই। তিনি এলোগেইছের সাথে প্রাণ দাঁড় করালেন। ঈসায়ীরা তাকে সম্রাট ঠাওরাল। তারও আশা ছিল, বিদ্রোহের ঝাণ্ডা কোনো মুসলমানের হাতে থাক। সে মুসলমান তিনি পেয়ে গেলেন।

***

ট্যাক্স আদায় করতে নয়া আমলা এলাকায় গেলে আবদুল জব্বারের প্রাক-সরকারী আমলারা তাকে অভিশাপ দিল এবং তাকে হৃদয় থেকে মুছে ফেলল। মাদ্রিদ থেকে নির্বাচিত হবার কয়েক মাস অতিবাহিত হয়ে গেছে। আবদুল জব্বার যে এলাকায় ছিলেন সেখানে বিদ্রোহীদের স্বাধীন রাজ্য কায়েমের খবর আসতে থাকে। কিন্তু মাদ্রিদের কেউই জানতেন না যে, কে এই সদ্য স্বাধীন রাজ্যের কর্ণধার।

নয়া আমলারা ট্যাক্স আদায় করতে মাদ্রিদের উপকণ্ঠে পৌঁছুলে পাহাড়ের অজ্ঞাত স্থান থেকে পশলাদার-তীর বৃষ্টিতে তাদের সকলেই মারা পড়ল। যারা প্রাণ ভয়ে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করল তারাও বেশী দূর এগুতে পারল না। এদেরকে গর্ত খুঁড়ে মাটিচাপা দেয়া হল।

আবদুল জব্বার ট্যাক্সের মাত্রা কমিয়ে দিলেন। এতে তিনি জনগণের অকুণ্ঠ প্রশংসা পেলেন। তিনি প্রাসাদ স্থানান্তর করলেন। কেউ জানল না তিনি কোথায় গায়েব হয়ে গেলেন। তিনি পাহাড়ী এলাকায় আত্মগোপন করলেন। খ্রীস্টান সন্ত্রাসীরা তারা তাকে অন্তরীণ করে রাখল।

এবার কর্ডোভার প্রাচীন গীর্জার ঘটনার অনেকদিন পর সেখানকার ফৌজি শক্তি আন্দায করতে সেখানে ছুটে গেল এলোগেইছ।

ওইদিন সালার ওবাইদুল্লাহ সসৈন্যে কর্ডোভায় প্রত্যাবর্তন করছিলেন। এটা ছিল তার আখেরী যাত্রাবিরতি। যাত্রাছাউনির অদূরে ছিল আবাসিক এলাকা। সালার অত্র এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তার ওপর একটি প্রাণঘাতী হামলাও হয়েছিল। ছাউনির চারদিকে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন গোয়েন্দা টিম। সাধারণ মানুষেরা ছদ্মরণে এই এলাকায় বিচরণ করত। এদের দুজন আবাসিক এলাকা ঘুরে এসে সালারকে জানাল, এখানে একটি মসজিদ আছে। এই মসজিদে অপরিচিত কে যেন কি দরস দেবে।

ওবাইদুল্লাহ বাদ এশা ছদ্মবেশে ওই মসজিদে গেলেন। বাদ নামায নামাযীরা বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়ার স্থলে বসে ছিল। খবর নিয়ে জানা গেল, আজ ইমাম সাহেব বাদ নামায তকরীর রাখবেন।

আজ আপনাদেরকে জেহাদ বিষয়ে আলোকপাত করব। ইমাম সাহেব ওয়াজ শুরু করলেন।, মুসলিম জাতির জিন্দা থাকার মাকছাদ হচ্ছে, তারা কিছু একটা করবে। মসজিদে ইবাদত কিংবা রনাঙ্গনে লড়াইয়ের একটাই উদ্দেশ্যে ছওয়াব। পরকালে তাই প্রতিদান পাবে সকলে। তারপরেও কেন বাচ্চাদের এ এতীম ও নারীদের বিধবা বানানো? নামাযটাইতো এক ধরনের জেহাদ। রনাঙ্গন থেকে মসজিদ উত্তম। তিনি একটি আয়াত তেলাওয়াত করলেন। দুতিনটি জাল হাদীস পড়লেন। বললেন, রাসূলে পাক (স)-এর জীবনের এমন অনেক সময় অতিবাহিত হয়েছে যখন তিনি জেহাদ বিমুখ হয়েছেন এবং লাগাতার রাত জেগে নফল ইবাদতে লিপ্ত থেকেছেন। স্পেনে যে বাদশাহ একে ইসলামী রাজ্য বলছেন তিনি আপনাদেরকে ইসলামের নামে গোনাহে লিপ্ত করছেন। ইমাম বলে চলছেন, তিনি নিজে মদ্যপ ও উলঙ্গ নর্তকীর নৃত্য উপভোগকারী। মুসলমান কারো গোলাম নয়। আপনাদের থেকে যে ট্যাক্স উসুল করা হয় তার সবই তার রঙ্গরসের জলসায় খরচ হয়।

এভাবেই তিনি হুকুমতের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে যাচ্ছিলেন। দলিলের বেলায়। কুরআন-হাদীসের রেফারেন্স টানছিলেন।

তার হৃদয়গ্রাহী তকরীর শুনে মুসল্লীরা বাড়ীমুখী হচ্ছিল। উবাইদুল্লাহ তার স্থানে উপবিষ্ট। সঙ্গে তার দুকমাণ্ডার। ইমাম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা বসে কেন?

আপনার তকরীরে এতটাই প্রভাবিত যে, কিছু প্রশ্ন মনে জাগছে, বললেন উবাইদুল্লাহ।

অবশ্যই! আপনারা কেথেকে? আর প্রশ্নই বা কি? ইমামের সপ্রশ্ন দৃষ্টি। আমরা ভিনদেশী, যাচ্ছি কর্ডোভা। জানতে ইচ্ছে, স্পেনের বর্তমান শাসকের বিরুদ্ধে আমাদের করণীয় কি এক্ষণে। আপনি বলেছেন, বাদশাহ গোনাহগার, আমাদের ঘামঝরা শ্ৰমার্জিত অর্থ আত্মসাৎ করে রঙ্গরসের আসর জমাচ্ছে। আমার মনে হয় এ ধরনের শাসকের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে তার কোষাগার লুণ্ঠন করা উচিত। উবাইদুল্লাহ বললেন।

আরেকদিন আসবেন। আমি আপনাদের প্রশ্নের জবাব দেব সেদিন। ইমাম বললেন।

ইমাম সাহেব বেরিয়ে গেলেন। উবাইদুল্লাহ ও তার দুকমান্ডার তার পিছু নেয়। আবাসিক এলাকায় চোরাগলিতে সে ঢুকলে উবাইদুল্লাহ তাকে দ্রুত অনুসরণ করেন। শেষ পর্যন্ত ইমাম সাহেব থমকে দাঁড়ান। উবাইদুল্লাহকে বলেন, ওরা দুজন আমার পিছু নিচ্ছে কেন? উবাইদুল্লাহ বলেন, ওরা আপনার পদাংক অনুসরণ করতে চায়। ইমাম চলছেন। উবাইদুল্লাহ তার পিছু নেন আবারো। ইমাম বসতির বাইরে বেরোলে উবাইদুল্লাহ তার পথ আগলে বলেন, ইমাম সাহেব! আপনার বাসা কোথায়?

আমি এই আবাসিক এলাকায়ই থাকি। এই একটু বাইরে যাচ্ছি জরুরী কাজে। বললেন ইমাম।

চলুন না! এক সাথেই যাওয়া যাক।

ইমাম এবার খানিক রাগ হয়ে গেলেন। সালারের ইশারায় কমান্ডার তলোয়ার বের করল। উভয়েই তলোয়ারের ডগা তার দুপাশে ছোঁয়াল। আমাদেরকে তোমার বাসায় নিয়ে চলো। এদিক সেদিক করেছ কি আমার সাথে ফৌজ আছে। এলাকার বাড়ী বাড়ী চিরুনী অভিযান চালাব। সে অবস্থায় ঘোড়ার পেছনে রশিদ্ধ করে আবাসিক এলাকার ঘোরাবোতোমাকে। বললেন সালার।

***

ইমাম সাহেব একটি পৃথক বাড়ীতে থাকতেন। পরে জানা গেল ওই ঘরে আর কারো প্রবেশানুমতি ছিল না। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, তার এখানে কিছু ভূত-প্রেতের আনাগোনা, তারা ইমামর কাছে দরস নিতে আসে। ইমাম ও উবাইদুল্লাহ ওখানে এসে দাঁড়ালেন। সর্বাগ্রে তাদের চোখে ভেসে উঠল দুযুবতী। ঘর তল্লাশি শুরু হোল। তম্মধ্যে একটি কামরা অবিকল গির্জার মত। ওখানে ক্রুশদণ্ড, মেরীর মূর্তি ও ঈসার প্রতিকৃতিও পাওয়া গেল। গির্জায় এবাদত করতে যা লাগে তার সব উপকরণই এখানে। উবাইদুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে ইমাম বললেন, তিনি প্রায় মাস ছয়েক ধরে এখানে ইমামতি করে আসছেন।

সালার ওইসব ইবাদত-উকরণাদি তুলে নিলেন। সঙ্গে দুযুবতী ও তথাকথিত ইমাম। পথিমধ্যে ইমাম সাহেব বললেন, আপনি দু যুবতাঁকে নিয়ে নিন এবং যত অর্থ চান এর বিনিময়ে আমাকে ছেড়ে দিন। চাইলে এর চেয়ে ভুবন মোহিনী নারী কোন অর্থ ব্যতীতই আপনাকে দেয়া হবে।

আঁধার রাতে এ দুযুবতী কমান্ডারদের হৃদয়ে উত্তাপ বাড়িয়ে তুলতে গা ঘেঁষে চলছিল। তারা নারী সুষমার সবটুকু উজাড় করে দেয়ার জন্য মেহনত করে যাচ্ছিল। কিন্তু লোহার ছাঁচে গড়া এই সালারের এতে এতটুকু পরিবর্তন নেই। উবাইদুল্লাহ ছাউনিতে এসে, এদেরকে নিয়ে চললেন অফিসে। বললেন যুবতীদের লক্ষ্য করে,

শুনে নাও! তোমরা এক ফৌজি খিমায় এক্ষণে। তোমাদের অনেক প্রশ্নেরই উত্তর দিতে হবে। উত্তর এদিক সেদিক করেছ কি ক্ষুধার্ত সেপাইদের হাওয়ালা করে দেব। ওরা সবে হিংস্র বর্বর। মনে করে দেখ সেই বীভৎস চিত্রের কথা-কোন নারী যাকে সহ্য করতে পারে না। পারবে না তোমরাও।

আপনি আমার প্রস্তাব কবুল করছেন না তাহলে? ইমাম সাহেব উবাইদুল্লাহকে প্রশ্ন করেন। এ মুহূর্তে তার কণ্ঠে চ্যালেঞ্জের সুর। মনে হচ্ছে কতকটা ধমকি দিয়েই তিনি বলছেন।

না করছি কমিনা! এক্ষণে তোমার প্রাণ হরণের প্রস্তাব গ্রহণ করছি। সত্য কথা বললে বাঁচলেও বাঁচতে পার। সালারের কণ্ঠে দৃঢ়তা।

সত্য কথা শুনতে চান। তবে শুনুন। আপনাদের সাম্রাজ্যের অবক্ষয় শুরু হয়েছে। আমাদের নারীদের ব্যবহার করছি-এ মর্মে আসমহীনতার ধিক্কার দিলেন শুনে নিন, আমরা একে আত্মসন্ত্রামহীনতা মনে করি না। ওই দুনারীকে আলাদা জিজ্ঞেস করে দেখুন। তারা সানন্দে আমাদের এই আন্দোলনে শরীক হয়েছে। ওদের কাউকেই আমরা জবরদস্তিমূলক শরীক করিনি। ধর্মের খাতিরে আমরা সবকিছুই কোরবান করতে পারি। আমরা এদেশ থেকে ইসলামকে উৎখাত করবই। আমরা না পারলেও আমাদের পরবর্তী বংশধর এ কাজ করবে। যে তুফান আমরা উছলে দিয়েছি তোমাদের গোটা সাম্রাজ্য মিলেও তাকে প্রতিহত করতে পারবে না। দৈহিক কোন আঘাত করার অভিপ্রায় নেই আমাদের। আঘাত করেছি তোমাদের মৌল বিশ্বাসের ভিত্তিমূলে। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করেছে, করছে এবং করবে।

তোমরা কোনো সম্প্রদায় বিশেষকে চিহ্নিত করছ কি? সালার প্রশ্ন করেন। না। তিনি জবাব দেন, আমাদের সম্প্রদায়ের কোন ক্ষতি করতে পারবে না তোমরা। নিজেদের চড়কায় তেল দাও। তোমাদের বেশ কিছু ইমাম মসজিদে মসজিদে জুয়া তাফসীর দিচ্ছে। তারা জানতেও পারছে না যে, তারা যাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছে তারা সকলেই খ্রীস্টান। এখন থেকে এই তাফসীরই তোমরা মসজিদে মসজিদে গুনতে থাকবে। এর মূলে কাজ করছে ইহুদী ওলামা ও ইমাম। ছদ্মবেশে আর কিছু আমার মত খ্রীষ্টানরা। আবার তোমাকে বলে রাখছি…………তুমি তো সামান্য এক সালার। তোমার জীবনের সিংহভাগ কেটেছে রণাঙ্গনে। তুমি কোরআন পড়েছ হয়তবা কিন্তু এর মর্মোদ্ধার করতে পারনি। আমি এর মর্মোদ্ধার করেছি। কোরআন এক পুর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। মুসলিম জাতি সত্যিই যদি এর মর্যোদ্ধারে সক্ষম হত তাহলে তাদের সাম্রাজ্য সীমা অস্ত-উদয়ের মধ্যবর্তী তামাম জনপদে বর্ধিত হত। কিন্তু ইহুদী-খ্রীস্টানদের সাফল্য বলতে পারতারা একে যাদু ও তাবিজ-কবজের সমন্বিত কিতাব বলে চালিয়ে দিতে পেরেছে। সর্বোপরি মতানৈক্য পয়দা করে এর এক এক আয়াতের হাজারো দুর্বোধ্য ব্যাখ্যায় রূপান্তরিত করেছে। থামলেন ইমাম সাহেব।

সালার উবাইদুল্লাহ শুনে চলেছেন নিশূপ নির্বিকার। এক্ষণে তার আর কিছু জিজ্ঞাসার জরুরত নেই। এরা ইসলামের বিকৃতি সাধন করে চলেছে। এরা বড় চৌকস। দুযুবতাঁকে কমান্ডারদের কাছে হাওয়ালা করে দিলেন। তারা ইমামের জবানবন্দীর বাইরে আরো কিছু তথথ্যাদ্ধারের চেষ্টা করলেন, কিন্তু তেমন কিছু উদ্ধার করা গেল না। উবাইদুল্লাহ শেষ প্রহরে কর্ডোভার উদ্দেশ্যে ছাউনি তুলে নিলেন। ইমাম ও যুবতাঁকে বন্দী করে নিয়ে চললেন।

***

রাতের বেলা উবাইদুল্লাহ কর্ডোভায় প্রবেশ করেন। কয়েদীদের জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়া হলো। সকালে ক্যাম্পে হাজির করার কথা বলা হলো। কর্ডোভায় উজির আব্দুল করিম, সালার আবদুর রউফ, মূসা ইবনে মূসা ও করন তাদের সংবর্ধনা জানান। আগে ভাগেই ফৌজি আগমনের সংবাদ দেয়া হয়েছিল। আমীরে নেই তাদের এ খবর দিয়েছিলেন।

উবাইদুল্লাহ ছিলেন খুবই ক্লান্ত। তিনি সালার ও উজিরকে নিরিবিলি স্থানে নিয়ে গেলেন। তিনি এদের জানালেন, কি করে তার প্রাণনাশের ষড়যন্ত্র করা হয় এবং টহলদার বাহিনীর তাকে উদ্ধারের কাহিনীও শোনান। বলেন, প্রত্যাবর্তনের পথে বন্দী করা ইমাম ও দুযুবতীর কথাও। এরপর সংক্ষেপে ওই কাহিনী শুনিয়ে যান।

উপসংহারে তিনি বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে খ্রীস্টানরা সম্মুখ সমরে আমাদের মোকাবেলা করতে অপারগ। ওরা নেপথ্যে আমাদের মোকাবেলার জন্য তৈরী হচ্ছে। প্রত্যাবর্তনের পথে বহু ছাউনি দেখেছি। সংবাদদাতা, গোয়েন্দা ও টহলদার বাহিনীর মাধ্যমে আশপাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছি। এদের তথ্যের মাধ্যমে বুঝেছি, তলে তলে বিশাল এক ফেৎনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সীমান্তের লড়াই থেকে যে সব কয়েদী আমি ধরে এনেছি তন্মধ্যে বেশ কিছু পদস্থ অফিসারও রয়েছে। ওরা বেশ কিছু তথ্য প্রকাশ করেছে। ওরা বলেছে, স্পেনে যে বিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠছে ফ্রান্স সম্রাট লুই এর পৃষ্ঠপোষক। শুধু কি তাই! তার বাহিনীও আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলানো শুরু করে দিয়েছে।

আমি লোকমুখে এলোগেইছ নামী এক লোকের কথা শুনেছি। মনে হচ্ছে, লোকটা কট্টর খ্রীস্টান আলেম এবং অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন। এই লোকের নেতৃত্বেই বিদ্রোহ হচ্ছে। ওর টিকটিকি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে অবনতির দিকে যাচ্ছে। আমাদের চৌকস হতে হবে। কোটা বৃদ্ধি করতে হবে সেনা তালিকায়। প্রতিটি মহকুমায় সেনাক্যাম্প গড়ে তুলতে হবে। শেষকথা স্পেন পরিস্থিতি এ মুহূর্তে বিস্ফোরনোমুখ।

ভাই উবাইদুল্লাহ! উজির বললেন, তোমার দেখার আনেক কিছুই বাকী রয়ে গেছে। তুমি লড়াইয়ে যাবার পর এখানে এক ভৌতিক কাণ্ড ঘটে গেছে। ঈসা (স)-এর নামে এক পাহাড়ে আবির্ভাব নাটক দেখানো হয়েছে। বলে উজির তাকে গির্জায় কাহিনী ঘটা করে শুনিয়ে যান। আমাদের উদারচিত্ত রহমদিল আমীর অপরাধীদের ছেড়ে দিয়েছেন। দেখারও প্রয়োজন মনে করেননি শহীদানের লাশ। আমরা তার নিরুজ্ৰব ভূমিকায় যারপরনাই হয়রান হয়েছি।

আর তোমরা মুখ বুজে সহ্য করে গেলে? সালারের কষ্টে বিষয়।

ভাই। আমি ও রউফ যথাসাধ্য করেছি। তাকে লজ্জিত করেছি। অবশেষে রাগ করে বেরিয়ে এসেছি। উজির বললেন।

যিরাব ও সুলতানা তার দিল-দিমাগে প্রভাবে ফেলেছে পুরোদস্তুর। তিনি এখন আর কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। বললেন আবদুর রউফ।

দরবারে তোষামোদ ও চাটুকারদের ঠাসা ভিড়। ওরাই এখন দেশ চালাচ্ছে। সাথে সাথে ভারী হচ্ছে ওদের ঝুলি। মূসা ইবনে মূসা বলে বললেন।

এর এলাজ একটাই। সালার করতুন বললেন, ওদের কাউকেই বাঁচিয়ে রাখা যাবে না, নয়তো স্পেন থেকে আমাদের গাভি-বোঁচকা গুটাতে হবে।

না। উবাইদুল্লাহ বললেন, খুন-খারাবি ও অভ্যুত্থানের পরিণতি সাধারণত ভালো হয় না। এতে গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা থাকে। গৃহযুদ্ধ লেগে গেলে দুশমন জ্বলন্ত আগুনে ঘি ছিটাবে। এতে জাতি কমযোর হয়ে পড়বে। সীমান্তের ওপারের দুশমন নির্বিঘ্নে অভ্যন্তরে হামলা চালাবে। কেউই ওদের রুখতে পারবে না। আমরা আমীরকে হত্যা করলে একটি বদ রেওয়াজ চালু হবে। পরবর্তী বংশধর মনে করবে হত্যা কর, গদী দখল কর।

তাই বলে কি নিপ বসে থাকব? বললেন জনৈক সালার।

এখন একটাই উপায়, আমীরে স্পেনের ভেতরটায় টোকা মারা। তিনি মামুলী লোক নন। তার অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও বুদ্ধিমত্তা আপনাদের অজানা নয়। আল হাকামের যুগে তিনিই ছিলেন রাষ্ট্রের সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। তিনি লড়াই করেছেন। আমার যদুর বিশ্বাস স্পেনে তার মত দ্বিতীয়জন কেউ নেই। বললেন উবাইদুল্লাহ।

কিন্তু আমরা কতদিন অপেক্ষা করব? উজির প্রশ্ন করেন। উজির প্রশ্ন করেন, আমরা আবদুর রহমানের রঙে রঙিন হতে পারি না। ঈমান ও স্বাধীন সত্তাবলে বলীয়ান আমরা। ইসলাম বলেছে, আমীর কিংবা খলীফা পথচ্যুত হলে তাকে খতম করে দাও। আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে হবে আমাদের-আবদুর রহমানকে নয়।

কাল সকালে তার সাথে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছি। ভুয়া ইমাম ও যুবতীদেরও সাথে নেব। তিনি আমার জযবা ঠাণ্ডা করতে চাইলে আপনাদের সাথে পরামর্শ করব এবং অন্য প্ল্যান নেব। ফ্রান্সের পক্ষ থেকে আমি হুমকি পাচ্ছি। আমি ফ্রান্স অভিমুখে সৈন্য প্রেরণে তাকে বাধ্য করতে চেষ্টা করব। আপনারা সকলেই সেনা কমান্ডার কমান্ডারদের নীতি হচ্ছে, দুশমনের থেকে হুমকি এলে সঙ্গে সঙ্গে হামলা চালানো। ওরা প্রস্তুতি নিয়ে ময়দানে নামার পূর্বে গ্রেপ্তার করা। সামনের পথ খুবই দুর্গম আমাদের। স্পেনকে বাঁচাতে চাই আমরা। ইসলামের এই প্রতিরোধ দুর্গ হেফাজত করা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব।

***

সিপাহসালার উবাইদুল্লাহ স্পেনের আমীর আবদুর রহমানের সাক্ষাৎক্তমে তার বিগত কর্মকাণ্ড শোনাচ্ছিলেন। সালারদেরকে বলা কথারই পুনরাবৃত্তি করেন তার সামনে। আরো বলেন : স্পেন আমীর গীর্জায় গাঁজায় হুকুমত বিরোধী প্রপাগাণ্ডা চলছে-একথা কেউ কি বলেনি আপনাকে? মুসল্লীদেরকে মসজিদে মসজিদে বিকৃত তাফসীর শোনানোর মাধ্যমে তথ্য সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে। আমি জনৈক খ্রীস্টান ও দু যুবতী নারীকে ধরে এনেছি। এই লোক কয়েকমাস ধরে মসজিদে ইমামতি করছে। আমার দুমান্ডার তার বিকৃত তাফসীর শুনেছে। আমি ছদ্মবেশে এথানে যাই। বলে তিনি পুরো কাহিনী বলেন।

ওদের আমি সাজা দেব উবাইদুল্লাহ। আপনার এতটা উত্তেজনা ও উদ্বিগ্নতা আমি আশা করিনি। মাত্র একটা লোক আমাদের কি করবে? দুনারী আর এমন কি সমস্যা? সিপাহসালার অবাক হয়ে যান। স্পেনের আমীর এতটুকুও জানেন না যে, তাদের দেশের কোথায় কি ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তিনি বলছেন দুএকজন দেশের কি করবে? উবাইদুল্লাহ গির্জার ভেল্কিবাজির কথাও তুলে ধরেন। আবদুর রহমান বলেন, উজির আঃ করিম ও সালার বড্ড বাড়াবাড়ি করেছে। তারা খামোখাই গির্জায় আগুন লাগিয়েছে।

আমীর সাহেব! আমার যদ্র বিশ্বাস দেশের প্রকৃত খবরাখবর আপনার থেকে সযতে গোপন করা হয়েছে।

আমি একজন মানুষ বৈ তো নই। আবদুর রহমান সাদামাটা গলায় জবাব দেন। এই জবাবের মধ্যে শাহী দাপটের লেশমাত্র নেই। আমি তো আর গোটাদেশে সফর করে খবর নিতে পারি না। আমার কানে যে খবর দেয়া হয় একেই সত্য ও বিশ্বস্ত বলে মনে করি।

আবদুর রহমানের টেবিলে একটুকরা কাগজ পড়ে ছিল, এতে দীর্ঘ কবিতা লেখা। কথার ফাঁকে উবাইদুল্লাহ তা পড়ে ফেলেন। কোনো কবি এটা স্পেন-আমীরের নামে লেখেন। কাগজটি হাতে তুলে নেন উবাইদুল্লাহ বলেন, আলীজাহ! স্পেন যদি আপনার জায়গীর হত আর আমি যদি আপনার কেনা গোলাম হতাম তাহলে সর্বাগ্রে আপনার সম্মুখে মাথা ঝুঁকিয়ে সালাম করতাম। এমন দিস্তার পর দিস্তা কবিতা লেখতাম আপনার স্তুতি বন্দনায়। আপনার কানে যা দেয়া হয় অবলীলায় তাকে সত্য বলে মেনে নেন কেন? আলীজাহ! বলুন! কেন এমনটা হচ্ছে?

উবাইদুল্লাহ! তোমাদের হয়েছেটা কি শুনি! আবদুল করিম ও আবদুর রউফও কেমন যেন আমার প্রতি অসন্তুষ্ট। আমি বুঝতে পারি ওরা কি বলতে চায়। ওদের জবা সম্পর্কে আমি সবিশেষ অবগত, কিন্তু তোমরা কেন দরবারের শ্রদ্ধা-সম্মান ও আদব ভুলতে বসেছ সকলেই।

আর এ সেই বিষ যা স্পেনের শিরা-উপশিরায় প্রবিষ্ট হচ্ছে। চাটুকারদের প্রতি আপনি ঝুঁকে পড়েছেন। কলমবাজ, ফটকবাজ কবি-সাহিত্যিকের কলম আপনার দিল দেমাগে বাসা বেঁধেছে। আপনার কান কেবল চাটুকারদের স্তুতিগান শুনতে অভ্যস্ত। আরেক বিষ হচ্ছে, যাকে আপনি দরবারী আদব বলছেন, ইসলামে দরবার কেবল খোদার হয় যেখানে আমরা সিজদা করি। আলীজাহ! আপনি আপনাকে খোদা বানাবেন না।

কি বলছ উবাইদুল্লাহ। আবদুর রহমান গর্জে উঠলেন, তুমি আমাকে ফেরাউন ঠাওরাচ্ছ?

***

উবাইদুল্লাহ কিছু বলতে যাবেন এমন সময় যিরাব সেখানে প্রবেশ করল। সালার তাকে দেখে কেমন ভ্যাবাচাকা খেয়ে যান। সে দুহাত প্রসারিত করে উবাইদুল্লাহকে বগলদাবা করতে আসে।

আমার ভাই! বিজেতা সিপাই সালার উবাইদুল্লাহ। কোলাকুলিতে উদ্যত যিরাব অগ্রসর হয়ে বলল। সেনাপতি বসে বসেই কেবল মোসাফাহা করলেন। যিরাব খুশীতে গদগদচিত্তে বলল, আলীজাহ! আমরা সেনাপতি মহোদয়ের জন্য বিজয়োসব করব। আমার পুরোদল এমন নাচ নাচবে, আসমানের অযুত সেতারা যা দেখে বিমোহিত হয়ে যাবে। এমন গীত শোনাবে যা আপনারা শোনেন নি কোনদিনও।

হা হা যিরাব! আবদুর রহমান ভাঙ্গাকণ্ঠে বললেন, ও আমার বাঘ! স্পেনের বাঘ এখন শ্রান্ত-ক্লান্ত।

কেমন উৎসব পালন করবে যিরাব? সালার বললেন, সেই শহীদানের উৎসব পালন করবে, দরবারীরা যাদের সম্পর্কে এতটুকু জানার আগ্রহ ব্যক্ত করেনি যে, তারা কি জন্য জান কোরবান করেছে?

ইতোমধ্যে সুলতানা কামরায় প্রবেশ করল। সেও যিরাবের ন্যায় আনন্দ জাহির করল। করল উৎসবের অভিব্যক্তি। বসে গেল আবদুর রহমানের পাশে। উবাইদুল্লাহ লক্ষ্য করছেন, তার কথায় আবদুর রহমানের চেহারায় যে উদাসীনতার ছাপ পড়েছিল সুলতানার স্পর্শে তা মুহূর্তে দূরীভূত হল। উবাইদুল্লাহর দেহে আগুনের উত্তাপ কিন্তু তিনি দাঁত কামড়ে নিজকে সংযত করেন।

আলীজাহ! তিনি ঠাণ্ডা গলায় বলেন, রণাঙ্গনে মৃত্যুবরণকারীদের উৎসব পালনের পূর্বে আপনার সাথে নিরিবিলিতে কটি কথা বলতে চাই।

উবাইদুল্লাহ প্রত্যুৎপন্নমতি লোক। তিনি যিরাব ও সুলতানার চাল ভালভাবেই পরিজ্ঞাত। তাকে আগেভাগেই উজির ও নায়েব সালার বলে দিয়েছিল, এরা আবদুর রহমানকে একা থাকতে দেয় না। কোনো সালার কিংবা সরকারী কর্মকর্তা যখন মহলে আসেন তখনই তারা তার পাশে জেঁকের মত লেগে থাকে এবং আমীরের কানভারী করে থাকে। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, এই চাটুকাররা আমীরের কাঁধে এমনভাবে চেপে বসেছিল যার থেকে তার মুক্তি ছিল না। না ছিল ওদের ধর্মীয় কিংবা জাতীয় স্বার্থ। আবদুর রহমানসহ তার পূর্বেকার আমীরগণ দরবারে চাটুকার নিয়োগ করে আসছেন বরাবরই। ওরা বাইরের সঠিক রিপোর্ট পেশ করত না কখনই। চাটুকারিতাই ওদের ধর্ম। এরা সকলেই মুসলমান থাকা সত্ত্বেও নেপথ্যে ছিল খ্রীস্টশক্তির ক্রীড়নক।

উবাইদুল্লাহ নিরিবিলিতে কথা বলার আগ্রহ ব্যক্ত করতেই আবদুর রহমানের মুখটা মেঘলা দিনের মত কালো হয়ে ওঠে। এতে তাদের কথাবার্তায় কিছুটা তেতো স্বাদও এসে যায়।

বলুন আমি না হয় চলে যাই। সেনাপতি বলেন, তবে বলে রাখছি, আমি আপনার দরবার থেকে চলে যাব ঠিকই, তবে স্পেন থেকে নয়। এই অনুভূতি নিয়ে যাব না যে, স্পেন আপনার বাপ-দাদার সম্পত্তি। যতক্ষণ আমার ও আমার অধীন বাহিনীর দেহে প্রাণ আছে ততক্ষণ কাউকে এই চিন্তা করতে দেব না যে, স্পেন কারো কেনা জায়গীর।

আমি তোমার কথা শুনে চলছি। যিরাব ও সুলতানার সম্মুখে কথা বলতে তোমার আপত্তি থাকার কথা নয়।

আমি ওদের মুখের ওপরই বলছি যে, মহলের এক সামান্য গায়ক আর এক সুন্দরী নারী যদি রাষ্ট্রীয় গোপন আলোচনায় শরীক থাকে তাহলে এ দেশে না স্থায়ী হবেন আপনি, আর না স্পেন। আপনি আমীর না হলে আপনার মুখ দর্শনও করতাম না। যদি এ লোকটা গায়ক আর ঐ মেয়েটার মুখশ্রী নিটোল সুন্দর না হত তাহলে হয়ত আপনি এদের মুখও দেখতেন না। ওদের জাদু কেবল ওটাই। একজনের কাছে সংগীত অপর জনের কাছে সৌন্দর্য। এই সম্পদই আপনার অবস্থার ভিত্তি। বললেন সেনাপতি।

যিরাব ও সুলতানা একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। চোখের ইশারায় সুলতানাকে বের হতে বলে সে এমনভাবে বেরিয়ে গেল যেন তার গোটা দেহে আগুন লেগে গেছে। চকিতে উভয়ের দিকে তাকালেন আবদুর রহমান, তিনি জবেহকৃত মুরগীর ন্যায় ছটফট করছেন। রাগে তিনি অগ্নিশর্মা।

উবাইদুল্লাহ! তোমার দাবী কি শুনি! স্পেনের আমীর, যাকে ইতিহাস আগামীতে স্পেন সম্রাট বলেই আখ্যায়িত করবে তার সামনে কথা বলছ- সেকথা ভুলে গেলে কি করে? আমার অন্তরঙ্গ জীবন বলতেও তো একটা জিনিষ আছে। সেখানে হস্তক্ষেপ করছ কেন?

এজন্য যে, খোদাতায়ালা আপনাকে বিশাল পৃথিবীর এক ভূখণ্ডের অধিপতি করেছেন। আমার কোনো ব্যক্তিস্বার্থ এখানে কাজ করছে না। যে মসনদে আপনি উপবিষ্ট সে মসনদে বসে কোনো আমীর রঙ্গরসের সাগরে ডুবে যেতে পারে না। পারে না সে প্রজাদের ঘামঝরা পরিশ্রমে অর্জিত অর্থ কোনো গায়ক কিংবা ভ্ৰষ্টা নারীর দুপায়ে লুটাতে। পারে না উৎসব পালন করতে। অন্তরঙ্গ জীবন নিয়ে যে আমীর এটা উদ্বিগ্ন রাজমহল ছেড়ে তার বেরিয়ে পড়াই শ্রেয়।

উবাইদুল্লাহ! যা বলতে এসেছে বলো!

যে মানসিকতা আপনি পয়দা করেছেন তাতে মূল আলোচনা আসছে না। আমি বলতে এসেছি যুদ্ধের কথা। আপনি কি ফ্রান্সে আক্রমণের কথা শুনবেন? শুনবেন সেই সব বিদ্রোহের কথা যা আপনার চারপাশে আড়মোড়া দিয়ে জেগে উঠছে? কান দেবেন কি সেই রক্তাক্ত উপাখ্যানের দিকে স্পেনের জমিন যা বলে চলেছে?

এ কথায় প্রভাবিত হলেন আবদুর রহমান। আর যাই হোক তিনি তো স্পেনের কর্ণধার। তিনি সহসাই উঠে দাঁড়ালেন। বললেন শাহী দাপটে,

ফৌজ কোথায় যাবে, কি করবে সে ফায়সালা দেব আমিই। কোনো সেনাপতিকে আমি যাচ্ছেতাই করতে দিতে পারি না। দেব না। তোমার অধীনদের জানিয়ে দাও, আমি তাদেরকে যে কোনো সময় ডেকে পরিস্থিতি আঁচ করে ব্যবস্থা নেব।

পরিস্থিতি যা তাতে আপনার এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমি সেনা প্রধান। অধীনস্থ সালারদের বলব, পরিস্থিতি কি এবং ত্বরা করেই আমাদের রওয়ানা হতে হবে।

আমার হুকুম ছাড়া একজন সৈন্যও স্থান থেকে নড়তে পারে না। বললেন আবদুর রহমান।

আলীজাহ! স্বস্তির সুরে ক্ষীণকণ্ঠে উবাইদুল্লাহ বললেন, আপনি মুসলিম ইতিহাসের চাকা উল্টাতে চলেছেন। মোহাম্মদ ইবনে কাসিম হিন্দুস্তানের মত কাফেরদের দেশে আল্লাহ ও তার রাসূলের পয়গাম পৌঁছিয়েছেন। ইসলাম দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছিল। কিন্তু ওই সময় সুলায়মান ইবনে আবদুল মালিক জ্বলে উঠলেন। জাতি খলিফার থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে ওই সেনানায়কের গুণকীর্তনে লেগে যায়। তিনি বিন কাসিমকে ডেকে কয়েদ করেন ও গুপ্তহত্যা করেন।

আমার হৃদয়ে এমন কোনো হিংসা নেই। বললেন আবদুর রহমান

আর স্পেনের ইতিহাসও আপনার স্মৃতিভ্রম না ঘটলে ভুলে যাবার কথা নয়। আবদুর রহমানের কথা কেটে উবাইদুল্লাহ বললেন, স্পেন উপকূলে নেমে রণতরী জ্বালানো তারিক বিন যিয়াদ এদেশ জয় করে নিলে প্রধান সেনানায়ক মূসার হৃদয়ে এই হিংসা জ্বলে উঠেছিল। তিনি তারিকের সাথে ছিলেন। তারিক অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলছিল। মূসা কেবল তার গতিরোধই করলেন না বরং জবাব চাইলেন, কেন সে স্পেন ছেড়ে আরো দূরপাল্লার পথে অভিযান চালাচ্ছেন। তিনি তারিকের নেতৃত্ব কেড়ে নেন, কিন্তু তারিক তাকে বলেন, হুকুম মূসারটাই চলবে, শেষ পর্যন্ত উভয়ের সমঝোতা হয় এবং ফ্রান্স সীমান্তে গিয়ে উপনীত হন।

আমার মনে আছে উবাইদুল্লাহ! এটা আমাদের বাপ-দাদার উপাখ্যান। সবই মনে আছে।

আপনার কিছুই মনে নেই। আমি আপনাকে বলতে চাচ্ছি। আপনার বাপ-দাদার কি কি পদস্খলন ঘটেছিল। তারিক ও মূসা ফ্রান্স সীমান্তে পৌঁছালে দামেস্ক থেকে ওলিদ ইবনে আব্দুল মালিকের ফরমান এলো, থেমে যাও এবং দামেস্ক চলে এসো। অত অগ্রযাত্রার দরকার নেই। তিনি এদেরকে খেলাফতের হুমকি মনে করেছিলেন। মূসা বলেছিলেন তিনি প্রত্যাবর্তন করবেন না, কিন্তু তারিক বলেছিলেন, খলীফার হুকুম বরখেলাফের মত গোনাই করবেন না। তিনি চলে এলেন। মূসাও বাধ্য হলেন চলে আসতে।

পরবর্তী কাহিনী আমি জানি উবাইদুল্লাহ! খলীফা মূসার সাথে খুবই দুর্ব্যবহার করেছিল এবং তারেককে গুপ্তহত্যার শিকার হতে হয়েছিল।

আবদুর রহমনের অবস্থা এক্ষেত্রে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায়। তিনি যেন সেনাপতির সামনে তলোয়ার সোপর্দ করে অসহায় হয়ে পড়েছেন। সালারে আলা তাকে বাপ-দাদার অতীত কাহিনী শোনাচ্ছেন। তার কথায় তেতো ঝাঁঝ থাকলেও তা ছিল উত্তেজনাবর্ধক। উত্তেজনায় মৃদু রাগ থাকলেও এতে ছিল না অভিযোগের সুর, ছিল না প্রতিবাদ। উবাইদুল্লাহ তাকে ভৎর্সনা করছিলেন না। তার আগুনঝরা বক্তব্য থেকে শব্দ আসছিল, আমীরে স্পেন কিছু করবেন না করার যা তা আমিই করব।

আবদুর রহমান তাকে খামোশ করানোর বহু কোশেশ করেছিলেন, কিন্তু এতে ভেতরে ভেতরে তার জ্বলে ছাই হবার উপক্রম। তাঁর রাজমহল ও ব্যক্তিত্ব সামান্য এক সালারের উত্তেজক বক্তব্যের মাঝে লীন হয়ে যাচ্ছে। উবাইদুল্লাহ তাকে বনি উমাইয়ার কাহিনী শোনাচ্ছিলেন। আবদুর রহমান বনি উমাইয়ার নয়ন মনি। এটা কোনো কেচ্ছা নয় বরং এটাই ওইযুগের খেলাফত ও স্পেনের বাস্তব ইতিহাসের প্রতিফলন। ইতিহাস আমাদের কাছে এভাবেই পৌঁছেছে। এই ইতিহাসের তেমন একটা গুরুত্ব না দেয়ার কারণে আমাদের পতন ও অবক্ষয় ত্বরান্বিত হয়েছে।

আলীজাহ! উবাইদুল্লাহ বললেন, আপনি বলেছেন, মূসার সাথে খলীফা খুবই দুব্যবহার করেছেন-এটুকু বলা যথেষ্ট নয়। বরং মূসা ও তারিক তখনও দামেস্কে থেকে দূরে ছিলেন। এ সময় খলিফার ভাই সুলায়মান ইবনে আবদুল মালিক উপকণ্ঠে এসে তাদের বললেন, খলীফা মুমূর্ষ। কিছু দিনের মধ্যেই মারা যাবেন এজন্য আপনারা এ মূহুর্তে দামেস্কে প্রবশে করবেন না। পরপর্তীতে দেখা গেছে গদীলোভী আরো লোক ছিল। সুলায়মান এদের মধ্যে প্রধান। তিনি মূসা ও তারিককে সাথে নিয়ে ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন……………..।

মূসা তাকে বলেছিলেন, খেলাফতের প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই। নেই তারিকেরও। প্রত্যাবর্তনের ফরমান পেয়ে আমরা এসেছি। সুলায়মান তাকে ক্ষমতা দখলে সাহায্য করার যথেষ্ট কাকুতি-মিনতি করেছেন। মূসা তাকে এই বলে চুপ করিয়েছিলেন যে, সেনানায়কদের যেমনি ক্ষমতালোভী হওয়া অনুচিত তেমনি আমিও ফৌজের মধ্যে রাজনীতি ঢুকতে দেব না। সুলায়মান এতে যার পরনাই রাগ করে চলে গেল।

মূসা ও তারিক ওয়ালিদের রাজমহলে এলেন এবং নানান তোহফা ও নগদ অর্থ পেশ করলেন। ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক তখন একটু সুস্থ। তিনি বেশ খুশি হলেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে জ্বলে পুড়েন। চল্লিশ দিন পর ওয়ালিদ ইবনে আবুল মালিক মারা যান এবং সুলায়মান তার স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি মূসার থেকে এমন করুণ প্রতিশোধ নেন, ইতিহাসে বনি উমাইয়াকে তা মাথা হেঁট করে দেয়। দুর্নীতি দমনের নামে তিনি মূসার বিরুদ্ধে এমন ভিত্তিহীন, আজগুবি অপবাদ আনেন যার ক্ষতিপূরণ আদায় তার পক্ষে অসম্ভব।

ইতিহাস লিখেছে, সুলায়মান মূসার প্রতি দুলাখ দীনার ক্ষতিপূরণ মামলা করেন। একজন সেনাপতির পক্ষে এই পাহাড়সম ক্ষতিপূরণ আদায়ের সামর্থ্য কৈ? সুলায়মান পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক তার প্রতি বর্বর প্রতিশোধ নেন। থৈ ফোঁটা তপ্ত বালুকাপ্রান্তরে খুঁটি গেড়ে তাতে মূসাকে পিঠমোড়া বাঁধেন। আলীজাহ! জানেন তখন মূসার বয়স কত? ৮০ বছর বয়সে মূসা তারিককে নিয়ে স্পেন জয় করেছিলেন। এর প্রতিদানে ৮০ বছর বয়স্ক সালারকে খৈ ফোঁটা মরুতে বেঁধে রেখে পরে বন্দী করে রাখে। আলীজাহ! আপনার অজানা নয় মূসার এক নওজোয়ান পুত্র ছিল। নাম আঃ আজিজ। তিনিও সেনানায়ক ছিলেন। পিতার এই বর্বর আচরণের প্রতিশোধ শংকায় সুলায়মান তাকেও ফযরের নামাযের সময় হত্যা কনে। আঃ আজিজ সূরা ফাতেহা পড়ে সূরা ওয়াকেয়াহ শুরু করলে সুলায়মানের নিযুক্ত আততায়ী তাকে কূপ হত্যা করে।

এখানেই কি শেষ? বর্বর সুলায়মানের বর্বর হত্যাকাণ্ড। তিনি আঃ আজিজের ছিন্ন মস্তক জেলখানায় মূসার সামনে পেশ করেন। মূসা এর প্রতিক্রিয়ার স্রেফ এতটুকু বলেছিলেন, পাষণ্ড এমন এক সেনা নায়ককে হত্যা করল, যে দিনে যোদ্ধা ছিল আর রাতে তাহাজ্জুদ গোর। ৮০ বছরের গুপ্ত এ শোকও বরদাশত করে নিলেন।

হিজরী ৯৭ সালের হজ্জের কথা মনে করুন আলীজাহ! সুলায়মান ইবনে আবদুল মালিক মূসা ইবনে নুসায়েরকে তার সাথে করে নিয়ে যান পায়ে শেকল দিয়ে এবং তাকে মক্কায় গ্রাম্য ভিক্ষুকদের মত ভিক্ষা করতে বাধ্য করেন। সুলায়মান তাকে বলেন, ভিক্ষা করুন, জরিমানা আদায় করুন সবশেষে মুক্ত হোন। ওই বছর হাজীগণ খুবই উ ফুল্লচিত্ত ছিলেন। তারা একে অপরকে মোবারকবাদ দিচ্ছিলেন এজন্য যে, সম্প্রতি স্পেন সীমান্ত বর্ধিত হয়েছে। কিন্তু কারো জানা ছিল না যে, স্পেন বিজেতা ভিখারীর মিছিলে জিঞ্জিরাবদ্ধ। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর রহমত উপচে উঠল। মদীনা মুনাওয়ারায় এসে মূসা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। অপরদিকে তারিক বিন যিয়াদ গুপ্ত হত্যার শিকার হন। খলীফা সুলায়মান তাকেও নতুন কোনো যুদ্ধে যেতে দেননি।

আবদুর রহমান উঠে দাঁড়ান। পেরেশানি হালতে বিক্ষিপ্ত পায়চারী শুরু করেন। খোদার কানুন নিজ হাতে তুলে নেবেন না। আপনি ইচ্ছে করলে আমার সাথে সুলায়মানের মত ব্যবহার করতে পারেন। আমিও মুসা ইবেন নূসায়ের, মুহাম্মদ বিন কাসিম ও তারিক যিন যিয়াদের মত বিড়ম্বনার শিকার হতে পারি। তবে আপনাকে দরাজ কণ্ঠে বলছি, আমি ও আমার বাহিনী সত্য কণ্ঠ উচ্চারণে এতটুকু কুণ্ঠিত হব না। আগাম সতর্ক করে বলছি, আপনার পরিণতি খুবই ভয়াল বলে মনে হচ্ছে। বলে উবাইদুল্লাহ বেরিয়ে গেলেন। আব্দুর রহমান বড় চোখ করে উবাইদুল্লাহর চলে যাবার তাকিয়ে রইলেন।

আবদুর রহমান সাধারণ ব্যক্তি নন। তিনি বিজ্ঞ শাসক ও চৌকস। দেশ শাসনে যতটা দক্ষ তেমনি যুদ্ধ নিপুণ। উবাইদুল্লাহ জীবন বীণার সূক্ষ্ম তারগুলো ছিঁড়ে গেলো যেগুলো গুনগুনিয়ে যাচ্ছিল যিরাব ও সুলতানা। তিনি বসে গেলেন। ললাটে চিন্তায় রেখা।

***

কারো স্পর্শে তিনি চমকে উঠলেন। অঁকানো মাথা উত্তোলন করলেন। দেখলেন মোদাচ্ছেরা তার পেছনে দণ্ডায়মান। মেদাচ্ছেরা তার বাঁদী থেকে স্ত্রী হওয়া নারী। সুলতানার সাথে তার রূপের তুলনা চলে না। বড়ই ভুলিভালি মেয়ে। চেহারায় নিষ্পপের মত ছাপ। আব্দুর রহমান তাকে বিয়েই করেছিলেন। সুলতানার সম্মোহনী রূপ ও চঞ্চলতা তাকে মুগ্ধ করেছিল।

মোদাচ্ছেরা মৃদু হেসে বললেন, আপনি হেরে গেলেন কি? আপনি না সেই আবদুর রহমান, আল হাকামের যুগে যিনি কয়েকবার ফ্রান্স সীমান্তে ক্রুসেডারদের রক্তবন্যা বইয়েছিলেন? আপনি না সেই আবদুর রহমান যিনি শার্লিম্যান খ্রীস্টানকে শোচনীয়ভাবে পরাভূত করেছিলেন? শার্লিম্যান অবরোধ করলে সেই অবরোধ ভেঙ্গেছিলেন যিনি সেই আবদুর রহমান কি আপনি নন?

আবদুর রহমান আড়চোখে মোদাচ্ছেরার দিকে তাকাল। মোদাচ্ছেরাকে এই মুহূর্তে সুলতানার চেয়ে ভাল্লাগছে তার কাছে। মোদাচ্ছেরা ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেলেন। আবদুর রহমান খামোশ হয়ে বসে। মোদাচ্ছেরা কিছুক্ষণ পর ফিরে এলেন, হাতে তার কোষবদ্ধ তলোয়ার। কোষ থেকে তলোয়ার বের করলেন। এগিয়ে দিলেন তলোয়ার স্বামীর দিকে। বললেন,

শুকে দেখুন! চোখ মেলে তাকান। এতে পাবেন সে সব কাফেরদের রক্তঘ্রাণ যারা অবশ্যই আল্লাহর দুশমন ছিল। এই তলোয়ারের চমকে দেখতে পাবেন সেই কেল্লাগুলো, এর ধারের কাছে যা পরাভূত হয়েছিল। ভোতা হয়নি এ তলোয়ার, মরচে ধরেনি। আপনার মাথা নীচু কেন রাজন?

তুমি শোননি এই লোক কি বলে গেল আমাকে? আবদুর রহমান বললেন।

ঘুমন্ত সিংহকে জাগিয়ে হুংকার মারার জন্য যতটুকু ঝাঁকুনি দেয়া দরকার ততটুকু দিয়ে গেলেন তিনি। তার প্রতিটি শব্দ শুনেছি আমি। প্রেমের দোহাই পাড়ব না, কেননা বহু নারীই ওই জিনিষটায় ভাগ বসিয়েছে। অবশ্য ওই দু অবোধ শিশুর দোহাই পাড়ব যারা আমার কলজে ছেঁড়া ধন। ওদেরকে সেই সবক দিন যা ওর দাদা-পরদাদারা আপনাকে দিয়েছেন। বনি উমাইয়াদেরকে আজকাল সেনাপতি ও ইসলামী বিজেতা হন্তা নামে খেতাব দেয়া হচ্ছে। আপনি ওই কালো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করবেন না।

মোদাচ্ছেরা তলোয়ারখানা তার ক্রোড় রাখলেন। দুহাতে মাথা রেখে স্বামীর চোখে চোখ রাখলেন তিনি।

কিন্তু তার উদ্দেশ্য কি? আজকাল হলো কি, যে-ই আমার কাছে আসে টেরা কথা জানিয়ে চলে যায়; বললেন আবদুর রহমান।

গোথ একটি প্রকাণ্ড শক্তিরূপ ধারণ করতে যাচ্ছে। ফ্রান্স সম্রাট লুই তাকে মদদ করছেন। আপনার মাদ্রিদে বিদ্রোহের পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে গেছে ইতোমধ্যে।

কে বলছে তোমাকে এ কথা?

তাদের থেকে, যাদের কথা আপনি শুনতে চান না।

তাহলে আমার কাছে এসব কথা এতদিন লুকিয়ে রেখেছে কে?

এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারব না। দিলে আপনি আমাকে আস্ত রাখবেন না। আপনি বলবেন, মোদাচ্ছেরা! তুমি সামান্য এক বাদী বৈ তো নও! সামান্য এক নারী। রাজপ্রাসাদের আভিজাত্য থেকে নিশ্চয়ই নিজকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হতে দেবে না। আপনার হৃদয়ে এখন থেকে এই তলোয়ারের প্রেম হওয়া চাই। শুধু এই তলোয়ারের।

আবদুর রহমান হাতে তরবারী ধারণ করলেন। ভালভাবে ওটি পর্যবেক্ষণ করলেন, মোদাচ্ছিরা একপাশে খামোশ হয়ে দণ্ডায়মান। তার চেহারার রঙে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। তিনি আচমকা উঠে দাঁড়ান এবং দারোয়ানকে ডেকে পাঠান বলেন, প্রধান সেনাপতিকে তার অধীনস্থ সালারদের নিয়ে আমার সাথে জলদি দেখা করতে বল। মোদাচ্ছেরাকে বললেন, তুমি এখন যাও।

সালারগণ এসে সম্মেলন কক্ষে জমায়েত হলেন। আবদুর রহমান ফুঁসছেন সিংহ শাবকের ন্যায়। কালকের আবদুর রহমান আর আজকের আবদুর রহমানের মধ্যে বিরাট ফারাক। তিনি সিংহাসনের সামনে এভাবে পায়চারী করছিলেন যেন কোন বিশ্ববিজেতা পায়চারী করছেন। সিংহ যেমন শিকারের দিকে তাকায়, সালারদের প্রতি সেভাবে তাকালেন বনি উমাইয়ার এই সিংহশাবক। সালারদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। হুংকার মারেন তিনি,

সেনাপতি উবাইদুল্লাহ! ফ্রান্স সীমান্তের অবস্থা আমাকে বলুন! আর বলুন ফ্রান্সে হামলা করলে কি কি সমস্যার সম্মুখীন হওয়া লাগবে।

সিদ্ধান্ত নিলে কোনই সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে না। অবস্থাদি পর্যালোচনা করলে ফল এই দাঁড়ায় যে, আমাদের সামান্য মহড়া করতে হবে। বলে সেনাপতি উবাইদুল্লাহ ফ্রান্সের অবস্থাদি তুলে ধরেন। আবদুর রহমান ও অন্যান্য সালাররা অনেক কিছু অবগত হতে পারলেন। এরপরে আবদুর রহমান এমন ফরমান জারী করলেন যাতে সকলেই চমকে ওঠেন। আবদুর রহমান বললেন, আমরা ফ্রান্সে হামলা করব। ফেত্নার উৎস গিরির মুখ আমি মূলোৎপাটন করবোই।

সালারদের বিস্ময় মুচকি হাসিতে রূপ নেয়। কেননা তারাও তো সিংহের বাচ্চা এক একটা। এই ফরমান শোনার অপেক্ষায় ছিলেন তারা অধীর আগ্রহে। আব্দুর রহমান তাদের যুদ্ধের বিভিন্ন দিকের পরামর্শ দিয়ে কথা শুরু করেন। বলেন?

যে বাহিনী ফ্রান্সে হামলা করবে, তাদেরই একদল মূসা ইবনে মূসার নেতৃত্বে গোখমুর্চের দিকে কোচ করবে। আরেক দল সালার আবদুর রউফের নেতৃত্বে ফ্রান্স সীমান্তের দিকে রওয়ানা হবে। আবদুর রউফ বিক্ষিপ্ত হামলা করবে যাতে ওরা বুঝতে পারে আমাদের হামলা সীমান্তেই সীমাবদ্ধ। আমি নিজেই আপনাদের সাথে যাব আমার সাথে উবাইদুল্লাহ, আব্দুল করিম আর করনের কাহিনী থাকবে। আমি ঝড়োগতিতে ফ্রান্সে হামলা করব, পরে গোটা স্পেন বাহিনী আমার সঙ্গ দেবে। এই অভিযান থেকে ফারেগ হয়ে আমি অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের বিষদাঁত ভাঙব। সর্বাগ্রে বিদ্রোহীদের উৎসগিরি চুরমার করা দরকার, এটাকে আমি ইসলামের চূড়ান্ত লড়াই মনে করি।

সালারগণ এই প্ল্যানকে খুব পছন্দ করলেন। কেউ কেউ সামান্য পরামর্শ দিলেন। সকলের ঐকমত্যে অবস্থাটা এমন দাঁড়াল যাতে বোঝা গেল, ফ্রান্স অচিরেই ইসলামী সাম্রাজ্যভুক্ত হতে যাচ্ছে।

***

আবদুর রহমানের প্ল্যান মোতাবেক সেনাবাহিনী রওয়ানা হলো। গন্তব্য পৌঁছুতে কম করে হলেও বিশ দিন দরকার। সালার মূসা ইবনে মূসা ও আবদুর রউফ আগে ভাগেই মূল বাহিনী থেকে পৃথক হয়ে যান। দিনদুয়েক পর আবদুর রহমানও তাঁর বাহিনী নিয়ে রওয়ানা করেন।

এই বাহিনী যখন কর্ডোভা ছাড়ছিল তখন দ্রুতগামী একটি ঘোড়া দূরপাল্লার উদ্দেশ্যে লাগাম কষল। এই ঘোড়ার গন্তব্য মাদ্রিদ। সুলতানা ও হেরেমের রমণীগণ উঁচু মহলে দাঁড়িয়ে এদের চলে যাবার দৃশ্য দেখছিল। শহরের হাজারো নারী-পুরুষ খোদমস্ত সৈনিকদের দিচ্ছিল প্রাণঢালা আল-বিদা।

এদিকে সুলতানা যিরাবকে তখন বলছে, লোকটা সময়মত কি পৌঁছুতে পারবে?

তাতো বটেই। যিরাব বলল।

আবদুর রহমানকে এই যুদ্ধে মোদাচ্ছোই উদ্বুদ্ধ করেছে। আবদুর রহমান এখনো তার প্রভাবে প্রভাবিত। আমি ওকে বাঁচতে দেব না।

বুঝে শুনেই পদক্ষেপ নাও সুলতানা আবদুর রহমান আমাদের প্রতি সন্দিহান হন৷ এমন কোন কাজ করতে যেও না। তুমি এখনো আবিষ্কার করতে পারনি আবদুর রহমান চিজখানি কি! চিন্তা করো না। অর্ধেক পথ থেকে তাঁকে ফিরে আসতে হবে।

ঘোড় সওয়ার মদ্রিদের উদ্দেশ্যে ছুটছে। যিরাব তাকে রওয়ানা করিয়েছে। মাদ্রিদে আঃ জব্বার তখন একটি একক শক্তিতে রূপ নিয়েছে। হাজারো ঈসায়ী তার দলে ভিড়েছে। নও মুসলিমের সংখ্যাও কম না।

রাতের বেলা ঘোড়সওয়ার পৌঁছে গেল। সে বিদ্রোহীদের জানাল আবদুর রহমান ফ্রান্সে হামলা করতে রওয়ানা হয়ে গেছে। আবদুর রহমানের অগ্রাভিযান খুবই গোপনীয় ছিল। কিন্তু যেখানে চাটুকার থাকে সেখানে তারা আস্তিনের সাপের ভূমিকা পালন করে।

পনেরো দিনের ব্যবধান সালার মূসা ইবনে মূসা ও আবদুর রউফ পরিকল্পিত ময়দানে গিয়ে ছাউনি ফেলেন। ওদিকে আবদুর রহমান তখনও ফ্রান্স থেকে দূরে। এ সময় মাদ্রিদের জনৈক কমান্ডার তার কাছে এসে খবর দেন, আঃ জব্বার মাদ্রিদে হামলা। করে বসেছে এবং সে এখানকার গভর্নরকে গ্রেপ্তার করেছে। খ্রীস্টানরা লুটপাট শুরু করে দিয়েছে। এখানে ওখানে আঃ জব্বারের শাসন চলছে।

আবদুর রহমান ফ্রান্স অভিযান মুলতবি করতে বাধ্য হলেন। দ্রুত এক ঘোড়ায় জনৈক দূত মারফত আঃ রউফের কাছে পাঠিয়ে বললেন, মাদ্রিদে পৌঁছুতে এবং এ শহর অবরোধ করার নির্দেশ দেন। তিনি নিজ বাহিনীসহ ফ্রান্সের দিন ধাবমান বাহিনীর গতি মাদ্রিদ্রের দিকে ঘোরান। সিংহশাবকদের দংশন শুরু করে স্পেনের কালনাগিনী।

২.১ দ্বিতীয় খণ্ড – কালনাগিনী

দ্বিতীয় খণ্ড – কালনাগিনী

মাদ্রিদের পথে

ক্রুসেড যুদ্ধ সেদিনই শুরু হয়েছিল, যেদিন থেকে গীর্জা অনুভব করল যে, কুশদণ্ডের ওপর চাঁদ-তারার ছায়াপাত শুরু হয়েছে। এ ঘটনা সালাহউদ্দীন আইয়ূবীর যুগের বহু পূর্বের। উত্তাল তরঙ্গময় নোম সাগর পাড়ি দিয়ে ইসলাম গীর্জার জগতে প্রবেশ শুরু করলে কুশপূজারীরা খড়গহস্ত হয়ে ইসলামকে নাস্তানাবুদ করতে ময়দানে নামল। ওই যুগে যে কোন লড়াইকে দুরাজার লড়াই বলা হোত। পরে দুধর্মের লড়াইতে রূপ নিত। রূপ নিত দুটি পারস্পরিক আকীদার দ্বন্দ্ব-সংঘাতের।

মুসলিম জাতি সর্বদা আল্লাহ ও তলোয়ারের ওপর ভরসা করে আসছে। সর্বদাই সমরবিদ্যা ও জেনারেলশিপ অবলম্বন করেছে, ময়দানে কারিশমা দেখিয়েছে। অল্পসংখ্যক সৈন্য জঙ্গী চাল, গেরিলা টেকনিক এবং উৎসাহ-উদ্দীপনার দরুন বিশাল বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছে। পরে বিজিত এলাকায় তলোয়ার খাপে, ঢুকিয়ে একনিষ্ঠতা ও প্রেম-প্রীতিবলে মানব হৃদয় জয় করেছে।

খ্রীস্টান ধর্মগুরু ও রাজাগণ মুসলমানদের ক্রমাগত বিজয় দেখে যুদ্ধের পাশাপাশি অন্যান্য কৌশল অবলম্বন করেন। এগুলো সবই গুপ্ত কৌশল ও নারীঘটিত। ঐ যুগে যদিও মনোবিজ্ঞানের অস্তিত্ব ছিল না তথাপিও মানুষের বুদ্ধি, মেধা ও জ্ঞান-গরিমা কম ছিল না। মানব জীবনের দুর্বল ও স্পর্শকাতর দিকগুলো তারা চিহ্নিত করতে পারতো। এমনই কিছু দিক হচ্ছে গদীলোভ, নারী সুষমা ও অর্থ টোপ। গীর্জা নারী সুষমাবলে মুসলিম সরকার, মন্ত্রী ও সেনানায়কদের মনোরঞ্জন করার চেষ্টা করে। সর্বোপরি তারা মুসলিম সমাজে আত্মঘাতী গাদ্দারও সৃষ্টি করে।

মুসলিম জাতির প্রাণঘাতী চরম দুশমন ইহুদী চক্রও এসময় খ্রীস্টশক্তির এসব গুপ্ত কৌশলে হিস্যা নেয়। ইহুদীদের ইতিহাস শয়তানি আর সন্ত্রাসের ইতিহাস। খ্রীস্টান শক্তিকে এরা হেন কোন সন্ত্রাস নেই মুসলমানদের মোকাবেলায় যা করতে শেখায়নি। তাদের ভুবন মোহিনী যুবতীদের দিয়েও সাহায্য করে। ইহুদী নারীদের সম্মোহনী কৌশলে সফলতা দেখে শেষ পর্যন্ত খ্রীস্টানরাও তাদের নারীদের নিয়োগ করে এ কাজে। শুধু কি তাই! ইসলামকে নাস্তানাবুদ করতে তারা কোরআন-হাদীসের গবেষণা শুরু করে। এমন কি মসজিদে পর্যন্ত ইমামতি শুরু করে। ইসলাম খেদাও অভিযানে ক্রুসেডাররা আত্মদানও করে। ইসলামের ক্ষতি সাধনের মাধ্যমে খ্রীষ্টধর্মের স্থিতিশীলতায় তারা যা করেছে তা সত্যিই প্রশংসাই। পক্ষান্তরে অদূরদশী মুসলিম শাসকবর্গ নিজেরা ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে কলহে লিপ্ত হয়। বেশ কিছু সেনানায়ক ক্ষমতার মোহে গৃহযুদ্ধ পর্যন্ত লাগিয়ে দেয়। শক্তিশালী প্রতিপক্ষ দুর্বল প্রতিপক্ষকে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে। তারা রণাঙ্গন ছেড়ে সিংহাসনমুখী হয়। পরিণতিতে যা হবার তাই হয়। শাসনকার্যে। সিংহশাবক অদক্ষ এসব নীল ভ্রমরদের কারণে রাজনীতি দেউলিয়াত্ব রূপ ধারণ করে। যাদের একটু-আধটু প্রজ্ঞা ছিল তাও নিঃশেষ করে দেয় চাটুকাররা। এরা রাজাদেরকে বিশ্বাধিপতি করে তুলছিল। এতদসত্ত্বেও ওই যুগে এমন কিছু সিংহশাবক ছিল যাদের আত্মোৎসর্গের দরুন স্পেনে দীর্ঘ ৮০০ বছর ধরে হেলালী নিশান পতপত করে উড়ছিল। টিমটিম করে হলেও এদের বদৌলতে এখানে হকের আলো জ্বলছিল। এরা আজ অতীত ইতিহাসের নিঝুমপুরীতে এভাবে বিলীন যে, খুব তত্ত্ব-তালাশ না করলে কাউকে উদ্ধার করা যায় না। চটি বই, ক্ষুদ্র পুঁথি ছাড়া তাদের খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সত্যিই এটা ইতিহাস বিমুখ জাতির এক বেদনাদায়ক দিক।

স্পেন ইতিহাসে ৮২২ খ্রীস্টাব্দ ছিল সালার ওবায়দুল্লাহ, আঃ করিম, আঃ রউফ ও করনের যুগ। এরা সেই সিংহশাবক যারা দ্বিতীয় আব্দুর রহমান ইবনুল হাকামকে যিরাব ও সুলতানার মোহজাল থেকে উদ্ধার করেছিলেন। আব্দুর রহমান যখন ফ্রান্স অভিমুখে টর্নেডো গতিতে ধেয়ে যাচ্ছিলেন তখন তাকে সেই মদ্যপ ও নারী লোলুপ মনে হয়নি, কর্ডোভা প্রাসাদে যিনি সুলতানার বাহুবন্ধনে দিনাতিপাত করতেন। তার চোখে তখন খালিদী রশ্মি, মুখে তারিকী হুংকার ও দেহে ইবনে নুসায়েরের শৌর্য বীর্য। আপাদমস্তক জুড়ে তার জেহাদী উদ্দীপনা ছিল। দেমাগে শুধু রণাঙ্গনের রক্তলাল দৃশ্য।

তিনি মাদ্রিদে আব্দুল জব্বারের অ্যুত্থান কাহিনী শুনে এতটুকু প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন না। মনে হয় ব্যাপারটা তিনি আগেভাগেই জানতেন। তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেননি কোনদিনও। এটাই যোগ্য শাসকের বৈশিষ্ট্য। ফওরান ফ্রান্স যাত্রা স্থগিত ঘোষণাকরত আঃ রউফকে জানান, ফ্রান্স অভিযান থেকে ফিরে এসো মাদ্রিদে কোচ করো। আব্দুর রহমানও তার বাহিনীসহ মাদ্রিদ অভিমুখী হন।

মাদ্রিদ অভ্যুত্থান একদিনেই হয়নি, ঘটা করে হয়নি, ঈসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্রোহী পরিবেশ সৃষ্টি করছিল। ওরা আঃ জব্বারের মত নেককার ও সৎ শাসককে বদকার ও অসৎ বানিয়ে তাকে এই টোপ দিয়েছিল যে, তোমাকে মাদ্রিদের স্বাধীন সম্রাট বানানো হবে। খ্রীস্টানরা হবে তোমার জনগণ ও মদদগার। শুধু কি তাই, তাকে লোকালয় ছেড়ে নির্জন পাহাড়ের গুহায় নারী ও মদে ডুবিয়ে রাখা হয় গলা অবধি।

লাগাতার যুদ্ধের দরুন ট্যাক্স বেড়ে যাচ্ছিল। মাদ্রিদ রাজ্যে বিশেষ ট্যাক্সের মাত্রা বেড়েছিল অধিক। যদ্দরুন এই অঞ্চলের মানুষ বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল।

এদিকে কেন্দ্রীয় গভর্নরের বিরুদ্ধাচরণ কার দরুন আব্দুল জব্বারকে গদীচ্যুত করা হয়েছিল। খ্রীস্টানদের বিগবস এলোগেইছ ও এলিয়ার মাদ্রিদে পৌঁছে গেল। এদের মাদ্রিদ গমনকে গোপন রাখা হল। তারা গীর্জার পাদ্রিদের সেখানে একটি গুপ্ত মিটিং-এ জরুরী পরামর্শ দিল।

কাজেই এপর থেকে পাদ্রীরা তাদের ধর্মোপদেশের মধ্যে একথাও সংযোজন করল যে, ঈসায়ীদের মুসলিম জাতিতে পর্যবসিত করার জন্য ট্যাক্সের ভারবাহী বোঝা চাপানো হচ্ছে। ঈসায়ীরা এই বোঝা কবুল করে এর তলে পিষ্ট হতে হতে একসময় ভিক্ষুকের জাতিতে পর্যবসিত হবে এবং একদিন ইসলাম গ্রহণে বাধ্য হবে। আর কেউ বাধ্য হয়ে ইসলাম গ্রহণ করলে সে হবে মুসলমানদের দাস, সুতরাং এর থেকে পরিত্রাণের উপায় একটাই-কর্ডোভাকে ট্রাক্স দেয়া বন্ধ করো। গীর্জার অফিসার ও কর্মচারীদের জানিয়ে দেয়া হলো, যে কোন শ্রেণীর লোকদের জন্য দরজা উন্মুক্ত করো। সবাইকে বলো, কর্ডোভাকে ট্যাক্স না দিতে। ইতোমধ্যে আঃ জব্বার ষড়যন্ত্র করে কেন্দ্রের ট্যাক্স উসূল কারীদের হত্যা করে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে মাদ্রিদের ট্যাক্স অর্ধেক মওকুফ করে দিল। বলল, এখন থেকে আমার লোকজনই ট্যাক্স আদায় করবে।

নিহত ট্যাক্স উসূলকারীদের দাফন করে দেয়া হলো। তারা ফিরে না যাওয়ায় তালাশ শুরু হল, কিন্তু কোন হদিস করা গেল না। কানাঘুষার মাধ্যমে ছড়ানো হলো, তাদেরকে দেশের অন্য কোথাও দেখা গেছে। শেষ পর্যন্ত জানা গেল আঃ জব্বার ট্যাক্স উসূল শূরু করে দিয়েছে, কিন্তু তারওতো কোন খোঁজখবর নেই, তার দ্বারা জনগণ উপকৃত হচ্ছিল। কাজেই তার সন্ধান দিতে কেউই তেমন একটা আগ্রহ দেখালো না।

এলোগেইছ শহর-বন্দরে ঘুরে ঘুরে মানুষের মাঝে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প হড়াতে ব্যাপৃত হল। বলে বেড়ালো, আব্দুল জব্বারই আমাদের শাসক। মাদ্রিদ স্বাধীন রাজ্য। সুতরাং এখন প্রতিটি খ্রীস্টানকে সেটাই মনে করতে হবে। মাদ্রিদের বর্তমান গভর্নর এক্ষণে আমাদের হাতে বন্দী। কিছুদিনের মধ্যে কর্ডোভা বাহিনী আসবে। লড়াইতে নামতে হবে সকলকে, ওদের মোকাবেলা করতে হবে। স্পেনকে মুসলিম মুক্ত করার অভিযানের এইতো সময়।

জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত চিত্তে আবুল জারের পতাকাতলে শামিল হতে লাগল। এক রাতে ডঙ্কা পিটিয়ে ঘোষণা করা হলো, সকালে রণসংগীত বাজতেই সকলে সশস্ত্র ঘর থেকে বের হবে এবং গভর্নর হাউজে চড়াও হয়ে তাকে গ্রেপ্তার করতে হবে।

মাদ্রিদের আমীর আবদুল জব্বার সম্পর্কে জানা গেল, মানুষের থেকে ট্যাক্স উসূল করে তিনি অন্তর্ধান হয়ে গেছেন, কিন্তু তিনি জানতেও পারলেন না যে, মাদ্রিদের খ্রীস্টানরা সৈনিক হয়ে গেছে। মাদ্রিদ জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। যে কোন সময় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। রাজ্যটা ছিল না খ্রীস্টান অধ্যুষিত। নও মুসলিমরা পর্দার আড়ালে খ্রীস্টানদেবই আজ্ঞাবহ ছিল। আরব অধিবাসীরা ছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে। তারা শহরের পরিস্থিতি ঘুণাক্ষরেও জানতে পারলেন না।

ইতিহাসের পাতা নীরব ভাষার বলে চলেছে, আরব থেকে আগত মুসলিমরা স্পেন বিজয় করে নিজদেরকে বাদশাহ ভাৰা শুরু করে দিল, তারা খ্রীস্টান আবাসন থেকে দূরত্ব বজায় রেখে বসবাস করত এবং এদেরকে ঘৃণা করত দুর্ব্যবহার করত। এজন্য নও মুসলিমদের হৃদয়ে ইসলাম স্থান করে নিতে পারেনি। ইসলামের সৈনিক হওয়ার স্থলে তারা ঈসায়ী হয়ে ওঠে। মুসলমানদের ওই অদূরদর্শীতার ফল হলো এই যে, খ্রস্টানরা যখন কোনো ষড়যন্ত্র করেছে, দেখার মত কেউ ছিল না তখন। কাজেই ভূগর্ভস্থ ওই ষড়যন্ত্র তাদের অজ্ঞাতসারে করা গেছে সহজেই। গভর্নরদের গোয়েন্দা বিভাগ এতই সংকুচিত ও চিলাচল ছিল যে, শহরের কোনো খবরাখবর তারা রাখতে পারত না। ওখানে ছিল স্রেফ গভর্নরের সামান্য বডিগার্ড, সামন্য কিছু ফৌজ।

***

মধ্যরাত।

মাদ্রিদ ঘুমিয়ে গেছে।

ঘুমিয়ে গেছে আরব্য মুসলিম নিজ বাসভবনে।

কিন্তু বিদ্রোহীরা বিদ্রি। মোহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার সাধুবেশে শহরে পৌঁছে গেলেন। ওই সময় পর্যন্ত তার অধীনে ৪০ হাজার ফৌজ ছিল। যাঁর সিংহভাগই শহরের বাইরে। বাদবাজ সামান্য মাদ্রিদে।

গভীর রাতের সূচিভেদ্য অন্ধকারের বুকে গভর্নর হাউজের সামনে হাজারো মশালের আলোতে নারা ধ্বনি শোনা গেল। আমীরে গভর্নরের বডিগার্ডরা ঘুম ভেঙ্গে পরিস্থিতি আঁচ করারই সুযোগ পেল না, প্রতিরোধ তো পরের কথা। গভর্ণর চোখ মেলে দেখলেন তার সম্মুখে আট দশ জন সশস্ত্র সেপাই। সকলের হাতে নাজা আসি। তারা তাকে উঠিয়ে বাইরে নিয়ে গেল। বাইরে বিদ্রোহী জনতার গগন বিদারী চিৎকার। ঘোড়ার হ্রেসাধ্বনি। মুসলমানদের ঘরে আগুন। চলছে লুটতরাজ সেখানে সমানে। আমীরে মাদ্রিদ চিৎকার দিয়ে বলেন, দেহরক্ষীরা কৈ? এগুলো হচ্ছে কি?

তোমার আগেই তাদের জেলে পুরা হয়েছে জনৈক বিদ্রোহী বলল, তোমার বাহিনীকে নিরস্ত্র করে আশে পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। এর নাম অভ্যুত্থান। তোমার নেতৃত্ব শেষ। এখন তুমি গর্ভনর নও-আমাদের বন্দী।

তাকে এক আলীশান মহলে নেয়া হলো। যেখানে ঝাড়বতি জ্বলছে। ওখানে এক লোককে দেখে তিনি চমকে উঠলেন। বললেন,

তুমি! মুহাম্মদ ইবনে আবদুর জব্বার? আমার থেকে জবাবদিহিতার সময় শেষ। তোমার গোস্বা এমুহূর্তে থোক। বাকী জীবন তোমাকে জেলের ঘানি টানতে হবে।

গাদ্দার! শেষ পরিণামের প্রতি এতটা উদাসীন হয়ো না। গাদ্দার বাদশাহকে হত্যা করতে পারে, বাদশাহ হতে পারে না। কদিন নেতৃত্বের নেশা পুরে নিজের চোখেই এর পরিণতি দেখবে। যাদের কাঁধে করে এ পর্যন্ত পৌঁছেছে তারাই তোমাকে রেখে বিপদ দেখে সটকে পড়বে।

মুহাম্মদ ইবনে আবদুর জব্বারের চোখে-মুখে এ সময় ক্ষমতার নেশা। তিনি ঘৃণাসুলভ মুখে বললেন, তাকে নিয়ে যাও। বন্দী করে তার পরিবার-পরিজনকে।

ফৌজকে নিরস্ত্র করা হয়েছিল। তাদের আশেপাশে বিদ্রোহীদের প্রহরা। চারদিকেই মশালের আলো। শহরে কিয়ামতের বিজষিকা। মুসলমানদের ধন-সম্পদ খ্রীস্টান মাড়োয়ারীদের ঘরে জমায়েত হচ্ছে। বাড়ীতে বাড়ীতে আগুনের লেলিহান শিখা। এ সময় জনৈক মুসলিম কমান্ডার সুযোগ বুঝে একটি বৃক্ষে চড়ে আত্মরক্ষা করেন। তিনি মাদ্রিদ থেকে পালানোর সুযোগ খুঁজতে থাকেন। ওই বৃক্ষের নীচে পাহারাদারেরা টহল দিচ্ছে। তিনি এক সময় সুযোগ পেয়ে গেলেন। এক পাহারাদার একাকী ঘোড়ার পিঠে টহল দিচ্ছিল। কমান্ডার সহসাই বৃক্ষ থেকে লাফ দিয়ে পড়ে ঘোড় সওয়ারকে হত্যা করে তার পিঠে চেপে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

শহরের প্রবেশ দরোজা উন্মুক্ত ছিল। মোহাম্মদ ইবনে আবদুর জব্বারের যে বাহিনী শহরের বাইরে অবস্থান করছিল তারা ভেতরে ঢুকছিল। আবার ভেতরের লোকজনও বাইরে আনাগোনা করছিল। লুটতরাজের দরুন গোটা শহরে হুলুস্থল কারবার। কে কার খবর রাখে। অতি দ্রুত সে শহর থেকে বেরিয়ে পড়ে এবং কর্ডোভাভিমুখী হয়। সামনে তার দূরপাল্লার পথ অথচ পৌঁছাতে হবে দ্রুত। জলদি মাদ্রিদের খবর পৌঁছানো দরকার যে, এখানে অভ্যুত্থান হয়েছে। রাতভর সফর করল সে। অবসাদ মোচনের এতটুকু সময় হয়নি তার। আঁধারের বুক চিরে সূর্য উঠে এলো। সন্নিকটে এক জোড়া ঘোড়া তার সামনে ভেসে উঠল। মনে হচ্ছে ওরা ফৌজ। দ্রুত সে তাদের কাছে গেল। জানাল মাদ্রিদ অ্যুত্থানের কাহিনী। তারা বলল,

কর্ডোভায় গিয়ে কি করবে। স্পেনের আমীরকে ফ্রান্স অভিমুখী দেখবে। তিনি সসৈন্যে ফ্রান্স আক্রমণ করতে যাচ্ছেন। কোথাও যেতে হলে ওদিকেই যাও।

সওয়ারদ্বয় কমান্ডারের দিকে ও তার ক্লান্ত ঘোড়ার দিকে তাকাল। তারা সাগ্রহে ঘোভা বিনিময় করল। এক্ষণে সে একটি তাজা ফৌজি ঘোড়ার পিঠে। পদাঘাত করে ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘোড়া ছুটোয়। দিগন্ত প্রসারী ধূলিঝড় উড়িয়ে ঘোড়া চলে টগবগিয়ে। এভাবে এই কমান্ডারের মাধ্যমেই আমীরে স্পেন মাদ্রিদ-অভ্যুত্থানের খবর পান।

***

ফ্রান্স অভিযান স্থগিত রেখে সালার আবদুর রউফকে প্রত্যাবর্তন করতে হলো। তার গতি ছিল দ্রত। তিনি মাদ্রিদ থেকে খুব একটা দূরে ছিলেন না। এদিকে আবদুর রহমানও ছুটছেন মাদ্রিদমুখো। তিনি সহসাই রণসঙ্গীত বাদকদের মাঝে এনে বাদ্য বাজালেন। সঙ্গীত বাদকরা বলল, আলীজাহ! আমরা রক্ত উত্তেজক বাদ্য বাজাব। আমাদের বাজনায় ঘোড়ার পর্যন্ত জোশ-জযবা বাড়বে। বাদকদল উত্তেজনাকর বাজনা শুরু করল। পুরো ফৌজে তখন প্রতিশোধের আগুন।

আবদুর রহমান যা চাচ্ছিলেন তাই-ই হলো। আবদুর রহমান যেন শরীর থেকে দূষিত রক্ত বের করে ভাল রক্ত ভরে দেন। তার দিগ্বিজয়ী চাঁদ-তারা পতাকা এভাবে উড়ছিল যাতে সৈনিকদের উদ্দীপনা বেড়েই চলছিল। ভাবখানা যেন এমন যে, তাদের সকলকে দুর্গম পাহাড় অতিক্রম করতে হবে।

আবদুর রহমান বদিকে তাকালেন। তার প্রধান সেনাপতি উবায়দুল্লাহ চলে যাচ্ছিলেন। তিনি তার কাছে এগিয়ে গেলেন। বললেন, উবায়দুল্লাহ! রণসংগীত থেকে যেদিন মুসলিম জাতি বিমুখ সেদিন থেকেই তাদের পতন শুরু।

উবায়দুল্লাহ বললেন, সংগীতে এমন সম্মোহনী শক্তি আছে যা মৃতদের জাগিয়ে তোল। পক্ষান্তরে এই সংগীতের বদৌলতে জাগ্রত মানুষও সময় বিশেষ মরণ ঘুমে বিভোর হয়ে পড়ে। এটা শিরার জমাট খুনকে যেভাবে গরম করে তোলে, তেমনি গরম খুনকেও হিমশীতল করে ফেলে। কাজেই এক্ষণে মানুষের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কোন ধরনের সংগীতামোদী।

নারীর মধ্যেও এ ধরনের স্ববিরোধী সমোহনী শক্তি বিদ্যমান। নারী যেমন খাপ ছিঁড়ে তলোয়ার বের করে প্রিয়জনের হাতে তুলে দেয়, তেমনি নাঙ্গা তলোয়ারও অনেক সময় খাপে ঢুকাতে বাধ্য করে। আমি নারীর

এ দুটি রূপই দেখেছি। মোদাচ্ছেরাই আমার হাতে তলোয়ার তুলে দিয়েছিল। আর আপনার তলোয়ার খাপে ঢুকিয়েছিল কে?

আবদুর রহমান চকিতে উবায়দুল্লাহ দিকে তাকালেন। তাঁর চিন্তাজগতে কেমন যেন চমক লেগে গেছে। তিনি আনমনা হয়ে গেলেন। এই প্রশ্ন তার কাছে প্রত্যাশিত নয়। তিনি যেন সহসাই নিজকে সংযত করে নেন। উবায়দুল্লাহ তাঁর পরিবর্তন দেখে কথার মোড় ঘুরিয়ে দিলেন। আমীরের চোখে এ সময় ভেসে ওঠে কর্ডোভার রাজপ্রাসাদ যেখানে যিরাব ও সুলতানার রূপের ঝিলিক। উবায়দুল্লাহ মাদ্রিদ অবরোধের প্ল্যান নিয়ে কথা শুরু করলেন। তিনি দেখলেন, আবদুর রহমানের ভেতরের স্পন্দন ঠাণ্ডা হয়ে যায়নি। মাদ্রিদ নিয়ে তিনি উচ্চাশা পোষণ করলেন।

মাদ্রিদ তখনও বেশ দূরে। ফৌজ চলছে লাগাতার। যাত্রা বিরতি দরকার।

***

মাদ্রিদের খানায় ইবনে আবদুল জব্বারের কালো গ্রাস। তিনি রীতিমত মাদ্রিদের স্বাধীন গভর্নর হয়ে গেছেন। নও মুসলিমরা ইসলাম ছেড়ে খ্রীস্টান ধর্মে ফিরে গেছে। এলোগেইছদের মিশনের এটা প্রথম সাফল্য। নও মুসলিম দ্বি-চারী মনোভাবই এই সাফল্যের মূল কারণ। এলোগেইছ ও ইলিয়ার মাদ্রিদেই ছিল। তাদের ফৌজি পরিসংখ্যান ৪০ হাজারের ওপরে। মাদ্রিদ দখল করতেই এই সংখ্যার সাথে আরো ১৫ হাজার যোগ হয়। অবশ্য এরা সুদক্ষ ট্রেনিংপ্রাপ্ত নয় আদৌ। সকলেই শহুরে। একক লড়াই জানত। সৈনিকদের মত দলবদ্ধ লড়াই জানবে কোত্থেকে। খুব সহজেই তাদের অভ্যুত্থান নাটক মঞ্চায়িত হয়েছিল। বিজয়োৎসবে তাই তারা বিভোর। মুসলিম ঘর-বসতি তখন জ্বলন্ত ছাই-ভয়ে রুপান্তরিত। প্রিয়জন কোথায় কি হালে আছে তাও অনেকের জানা ছিল না।

মাদ্রিদের কেন্দ্রস্থলে বিশাল এক ময়দানে ঘোড়দৌড় ও ফৌজি মহড়া হত। বিদ্রোহী লিডারদের আমন্ত্রণে জনগণ ওই রেসকোর্স ময়দানে সমবেত হলো। খানিক পর মোহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার, এলোগেইছ ও ইলিয়ার ঘোড়ায় চেপে সেখানে এলো।

এলোগেইছ সমবেত জনতাকে লক্ষ্য করে জ্বালাময়ী ভাষণ রাখিল :

মাদ্রিদ বিজয়ী বীর জনতা হে। অভূতপূর্ব বিজয়ে তোমাদের মোবারকবাদ জানানোর ভাষা নেই আমার। মাদ্রিদের গভর্নর, সুলতান কিংবা আমীর যাই বল না কেন, সে এক্ষণে তোমাদের সামনে। সমবেত জনতা ইবনে আবদুর জব্বার জিন্দাবাদ, ঈসা মসীহ জিন্দাবাদ নারা লাগাল। স্পেন আমাদের আমরা স্পেনের। হাজার জনতার গগন বিদারী চিৎকারে আকাশ বাতাস মুখরিত। খ্রীস্টান মহিলারাও ওখানে এসেছে। তারা একে অপরের বুকে মিশে যাচ্ছে। এতে নগ্নতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

জনতার তুমুল করতালির মধ্যে এলোগেইছ বলে চলেছে, বন্ধুরা আমার। আমীর ইবনে আবদুর জব্বার প্রমাণ করেছেন ধর্মের কোন গুরুত্ব নেই মানব জীবনে। তোমাদের মুক্তির স্বার্থে তিনি হুকুমত ও ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। তোমাদের হাতে মাদ্রিদের পতন ঘটেছে। সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন কর্ডোভাও তোমাদের হাতে চলে যাবে। তবে এর জন্য তোমাদের চরম কোরবানী দিতে হবে।

আচমকা জনৈকা ঘোড়সওয়ার কাতার চিরে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যায়। তার চোখে-মুখে ভীতির ছাপ। বক্তারা তার কথা শোনার পর এলোগেইছ আবারো জনতার উদ্দেশ্যে উঠে দাঁড়াল।

মাদ্রিদের বীর বাহাদুরগণ! তোমাদের আত্মত্যাগের মুহূর্ত আসন্ন। এইমাত্র জানতে পারলাম, স্পেনের গভর্নর মাদ্রিদ অভিমুখ ধেয়ে আসছেন। শহরের প্রবেশদ্বার ভেতর থেকে বন্ধ করে দাও। যার যা আছে তাই নিয়ে শহর রক্ষা প্রাচীরে উঠে যাও। তীর-পাথর মেরে দুশমনের গতিরোধ কর। অনবরত নারা আর দুয়োধ্বনির মাধ্যমে দুশমনকে অভিনন্দন জানাও। খেয়াল রেখো, কর্ডোভা বাহিনী যেন প্রাচীরের কাছেও ঘেঁষতে না পারে। ভয় পেয়ো না। আমাদের পর্যাপ্ত খাদ্য-রসদ রয়েছে। আমরা ভাতে মরব, পানিতে মরব তবুও দুশমনকে শহরে প্রবেশ করতে দেব না।

মোহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার জলদগম্ভীর স্বরে বলেন, মাদ্রিদের ব্যাঘ্র সন্তান! বিজয় তোমাদের পদচুম্বন করবেই, তবে এবারে তোমাদের টক্কর হবে সুদক্ষ সুশিক্ষিত কর্ডোভা বাহিনীর সাথে। আবদুর রহমান বাহিনী কেল্লা পতনের কৌশল জানে। তোমরা নিছক নারা ও দুয়োধ্বনি দ্বারা তাদের পরাভূত করতে পারবে না। তবে ওদের পরাজিত করা অসম্ভব নয়। তোমরা হতাশ হবে না। দুশমন যেদিক থেকে চড়াও হতে চাইবে সিংহশাবক সেদিক থেকেই তীরবৃষ্টি বর্ষণ করবে। মনে রেখো, সুযোগ তোমাদের এই প্রথম এবং শেষ। জিতলে বেঁচে গেলে আর হারলে নির্ঘাত করুণ পরিণতির শিকার হবে তোমরা। কর্ডোভা বাহিনী ভেতরে ঢুকলে যে বিভীষিকা সৃষ্টি হবে তা তোমাদের কল্পনারও বাইরে। ওরা আমাদের ফৌজ। ওদেরকে জানি আমি। শাস্তি দেয়া শুরু করলে ওদের অন্তর পাথর হয়ে যায়। পাইকারী হত্যার সম্মুখীন হবে তোমরা। তোমাদের যুবতী মেয়েদের কর্ডোভা বাহিনীর বিমায় নিয়ে যাওয়া হবে। যে আযাদী তোমরা হাসিল করেছ তার মূল্যায়ন করতে চেষ্টা করো, সংরক্ষণ করতে ব্যাপৃত হও।

জনতার উৎসাহ এই জ্বালাময়ী বক্তৃতার পর বহুগুণে বৃদ্ধি পেল। চারদিকে কেবল স্লোগান। এলোগেইছ, ইলিয়ার ও মোহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার যোগ্য লোক বেছে বেছে নড়াইয়ের স্কীম বানাতে লেগে গেল। আবদুর রউফ ও মূসা ইবনে মূসার বাহিনী টর্নোডো গতিতে ধেয়ে আসছিলেন। তিন দিনের দূরত্ব তারা দুদিনে অতিক্রম করলেন। কিছু বাহিনী আলাদা করে আবদুর রহমান পথিমধ্যে সাময়িক যাত্রাবিরতি করলেন। তিনি উবায়দুল্লাহর নেতৃত্বে কিছু সেনা মাদ্রিদ রওয়ানা করে বললেন,

উবায়দুল্লাহ! আপনার অজানা নয় বিদ্রোহীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন ফ্রান্স সম্রাট লুই। আমি এই খণ্ডদল নিয়ে ফ্রান্স ও মাদ্রিদের মাঝপথে থাকব। ফ্রান্স বাহিনী মাদ্রিদ অবরোধ ভাংতে এগিয়ে আসতে পারে। আমার বাহিনীকে টহলরত রাখব, টহল দেব খোদ আমি নিজেও।

ফ্রান্স বাহিনী এসে গেলে সামান্য বাহিনী নিয়ে আপনি ওদের প্রতিহত করতে পারবেন না। তবে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে আমাদের থেকে কমান্ডো চেয়ে পাঠাবেন।

মুসলমান হামেশা সামান্যই থাকে ও থাকবে। আমি ফ্রান্সীয়দের পথ আগলে রাখব লড়াই করব না। সৈন্যদের দলে দলে বিভক্ত করে গেরিলা হামলা শানাব। ওদেরকে হাঁকিয়ে হাঁকিয়ে ঘাম বের করে ছাড়ব। আল্লাহর উপর অগাধ আস্থা রেখে আপনি যান সেনাপতি। আল্লাহ আমাদের সহায়।

এ ছিল স্পেন অধিপতি আবদুর রহমানের প্রকৃত রূপ। তিনি যেমন সিংহাসনের যোগ্য লোক ছিলেন, তেমনি ছিলেন রণ নিপুণ জাদরেল সেনানায়ক। উচ্চজ্ঞানের মহান বিবেক দ্বারা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ফ্রান্স বাহিনী অতি অবশ্যই সীমান্তে ঘোরাফেরা করে থাকবে এবং গেরিলা আক্রমণ চালাবে। কিন্তু সংগীত আর নুপুর-নিক্কণের ঝনঝনানিতে সিংহশাবক কিছুকাল ঘুমিয়েছিলেন।

***

মাদ্রিদের যে সামান্য কেন্দ্রীয় বাহিনী ছিল তারা সকলেই কারাবন্দী। এদের এক কমান্ডার পলায়ন করার সুযোগ পেয়েছিলেন। ইনি কর্ডোভার ফৌজকে বিদ্রোহের খবর দিয়েছিলেন। যেদিন মাদ্রিদে কর্ডোভা বাহিনীর আগমনের খবর ছড়িয়ে পড়ে সেদিন সকলের মাঝে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহী কমান্ডার মুসলিম বন্দী সেপাইদের বলেন, কাল নাগাদ কর্ডোভার ফৌজ এসে পড়বে আমরা কিছুতেই তাদের অবরোধ সফল হতে দেব না। ওরা শহরে কোনক্রমে প্রবেশ করতে পারলে পাইকারী হত্যাযুদ্ধ চালাবে। আমাদের সঙ্গ দেয়ার স্বার্থে তোমাদের নিজেদের জান বাঁচাতে পার। কর্ডোভা বাহিনী অবরোধ উঠিয়ে নিলে তোমাদের মুক্ত করে দেয়া হবে, তখন যেখানে ইচ্ছা যেতে পার।

এটা একটি চাল। বিদ্রোহীদের প্রকৃতপক্ষে টেনিংপ্রাপ্ত দক্ষ সৈনিকদের দরকার। এরা জেলখানা থেকে জনাচারেক মুসলিম সেপাইকে রাজী করতে পারল। ওই চারজনের একজনের নাম আবু রায়হান। ইনি গেরিলা কমান্ডার। অন্যরা সাধারণ সেপাই। সকল মুসলিম ফৌজ অবাক হলো আবু রায়হানকে দুশমনের দলে ভিড়তে দেখে। এরা চলে গেল। কারার সেলে আবদ্ধ ফৌজ এদের গাদ্দার ও বুদিল বলে ধিক্কার দিল। বিদ্রোহী কমান্ডার এগিয়ে চলছে, আর এর পেছনে। এরা গলির মোড়ে এলে বুদ্ধিমত্তা বলে আবু রায়হান একটু পেছনে চলতে লাগলেন। সঙ্গীরা পর্যন্ত ব্যাপারটা আঁচ করতে পারল না। আবু রায়হান পেছনে তাকাল এবং আরেক গলির মোড়ে অদৃশ্য হয়ে গে। কমান্ডার কর চলার পর খেয়াল করলেন, চারজনের একজন উধাও। আবু রায়হান তখন অনেক দূরে চলে গেছেন। সূর্য ডুবছে। গোটা শহরে ছড়িয়ে পড়ছে, কর্ডোভা বাহিনী আসছে। সকলের মাঝে হতাশা।

শহরের কোল জুড়ে রয়েছে অগভীর নদী। রয়েছে বিশাল প্রাচীর ও তার নীচে খাদ। জনশ্রুতি রয়েছে যে, ওইসব খাদে ভূত-প্রেতের আনাগোনা। মানুষের আনাগোনা তাই এদিকটায় কম।

আবু রায়হান সাথীদের কাছে গেলেন না। তিনি শহর ছেড়ে বেরুতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু কর্ডোভা বাহিনীর আগমনি শুনে সকল প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তিনি শহরেও কোথাও আত্মগোপন করতে পারছিলেন না। তিনি বিরান এলাকাভিমুখী হলেন। সূর্যাস্তের পর তিনি ওই এলাকায় গেলেন। ওই খাদ-এর পাশে এসে দাঁড়ালেন। তার হৃদয়ে তোলপাড়। না জানি ভূত-প্রেত গলা টিপে দেয় কি-না! রাত বাড়ার সাথে সাথে তার ভীতিভাবও বেড়ে চলছিল।

আবু রায়হানের সামনে মৃত্যু বিভীষিকা। এখন বাঁচার একমাত্র পন্থা খ্রীস্টান কমান্ডারের কাছে আত্মসমর্পণ করা এবং বিদ্রোহী বাহিনীর হয়ে লড়াই করা। কিন্তু এ যে তার পক্ষে অসম্ভব। হাড় কাঁপানো শীতে তার অবস্থা করুণ। অনেক চিন্তা-ভাবনার পর তিনি একটি গবরের সামনে এসে দাঁড়ালেন।

***

যবানে তার খোদার নাম। বার বার উচ্চারণ করছিলেন কোরআনের আয়াত। নির্জন গুহায় কেননা সাড়াশব্দ নেই। ভয়াল কোনো ভূত-পেতিরও দেখা নেই। গুহার দেয়ালে ধূলি ধূসর তৈলচিত্র, কোথাও অশ্বথবৃক্ষের শেকড় দাঁত বের হাসছে। আলোহীন মোট পরিবেশ। শিরশির হিম বাতাসের হিন্দোলে তিনি গুহার আরো ভেতরে প্রবেশ করেন। আচমকা মানবশিশুর আর্ত চিৎকারে তার আপাদমস্তক কেঁপে ওঠে। আবু রায়হান ব্যাপারটা আঁচ করার চেষ্টা করেন। তার সামনে এখন শহর থেকে বের হওয়াই মূল সমস্যা নয়- সমস্যা জান বাঁচানোরও।

নির্জন গহ্বরের অভ্যন্তরের এই চিৎকার ও ফিসফিসানি তাকে দুঃসাহসী করে তোলে। তিনি উচ্চস্বরে সূরা ইয়াসীন তেলাওয়াত করতে থাকেন। ভেতরে একটি করিডোর দেখতে পান। ওখানে থেকে সামান্য বামে ফোপানো কাঁদার সুর ভেসে আসে। মনে হচ্ছে, ভূত-প্রেত তাকে গ্রাস করতে আসছে। এই বুঝি ছোঁ মারল। ঠিক এ সময় পেছন থেকে কারো লঘু পদধ্বনি কানে আসে। ভূত ছাড়া এই ভৌতিক কর্মকাণ্ড আর কার? আবু রায়হান বড় সাহস করে সামনে এগোল, পেছনে সরার উপায় নেই। কেননা পেছনে কারো আগমন ঘটছে। বাচ্চার চিৎকার আচমকা থেমে গেল। নারীর সানাদায়ক ছেলে ভুলানো কথা কানে এলো। আবু রায়হান এ সময় মৃত্যু হাতের মুঠোয় পুরেন। রিক্তহস্ত তিনি। বিদ্রোহীরা তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। মনে মনে বলেন, গোটা ব্যাপারটাই ভূতুড়ে। ওদেরকে বলব, আমি চোর-ডাকু নই। আল্লাহর সেপাই। আল্লাহর নামে লড়ি। আমি কাফেরদের বন্দীশালা থেকে ভেগে এসেছি। ওদের সামনে আসমর্পণ করিনি।

ভূত-পেত্নীকেও তিনি খোদার সৃষ্টি মনে করতেন। খোদা তায়ালা তাকে এই মুসিবত থেকে বাঁচাবেন বলে তার বিশ্বাস। বাচ্চার কান্না থামার পর আরবী ভাষায় পুরুষ কন্ঠে বলতে শুনলেন,

ওকে দুধ দাও কিংবা গলা টিপে দাও। পরক্ষণে নারীকণ্ঠে শোনা গেল, এ আওয়াজ বাইরে যাবে না।

আবু রায়হান একে জীবিত মানুষের আওয়াজ বলে মনে করছেন না। তারপরও লঘুপায়ে তিনি আগে বাড়েন। কুপির টিমটিমে আলো তাকে আরো ধোকায় ফেলে দেয়। যে কোনো পরিস্থিতি হজম করতে তিনি সিদ্ধহস্ত। আচমকা কারো কড়া নির্দেশে তার মোহভ হয়। কে যেন বলে, দাঁড়াও। একচুলও নড়বে না। খোলা তলোয়ারের ডগা তার পিঠে ছুঁয়ে আছে। নির্দেশটা আরবী ভাষায়।

কে তুমি? আবু রায়হান আরবীতেই প্রশ্ন ছোঁড়েন, প্রাণে মারার আগে আমার কথা শোনো। আমি মাদ্রিদ বাহিনীর কমান্ডার। নিরস্ত্র করে আমাদের বন্দী করা হয়। আমি কোনোক্রমে পালিয়ে এসেছি, এখান থেকে শহরের বাইরে বেরোতে আমার আসা।

ইতোমধ্যে একটা কুপি আনা হয়। যিনি কুপি এনেছেন তার অপর হাতে নাঙ্গা তলোয়ার। ওই লোক জিজ্ঞেস করেন, লোকটা কে?

আবু রায়হান আমার নাম। ফৌজি কমান্ডার।

তার পেছনের লোকটা সামনে এলো। আবু রায়হান বললেন, তোমরা জিন্দালোক,

অশরীরী আত্মা। যাই কিছু হও না কেন, আমাকে বলল। অশরীরী আত্মা হলে নিশ্চয়ই আরবী হবে। তবে আরবী হলে প্রেতাত্মা হতে পার না-নেককারই হবে। আমাকে সাহায্য কর। আকে শহরের বাইরে যাওয়ার সুযোগ করে দাও। আমি আমার ফৌজ নিয়ে আসব এবং কাফেরদের মাদ্রিদ থেকে বের করে দেব।

আগে বাড়ো।

***

কামরাটি অতি প্রশস্ত।

দুটি কুপি জ্বলছে টিমটিম।

ওখানে ১০/১২ জন যুবতী ও ৩/৪ জন বয়স্কা মহিলা। জনৈকা মহিলা বাচ্চাকে দুধ পান করাচ্ছিলেন। পুরুষ মাত্র দুজন, যারা আবু রায়হানকে ভেতরে নিয়ে এসেছে এদের একজন বৃদ্ধ। তিনি আবু রায়হানকে বললেন, ওদের দেখো! আমাদের মেয়ে। সেই আরবী মেয়ে যারা মাদ্রিদে বসবাস করত। ওদের কারো বাপ, আর কারো ভাই শহীদ হয়েছে। আমাদের বেশ কিছু নারী কাফেরদের হাতে চলে গেছে। এদের কোনক্রমে কাফেরদের হাত থেকে ছিনিয়ে এনেছি, ওরা এখানে ভালই আছে।

কার অপরাধে আমাদের এই পরিণতি। বৃদ্ধ বললেন, এই কাফেররা বিদ্রোহের অগ্নিকুণ্ডলী তৈরী করছিল। মোহাম্মদ ইবনে আবদুর জব্বার আকাম-কুকাম করে খ্রীস্টানদের সাথে হাত মিলিয়েছে সেই কবে। অথচ কর্ডোভার আমীর এখানে সৈন্য বুদ্ধি করেননি। এমন কি ননীর পুতুল মাদ্রিদের আমীর এতটুকু ঠাহরও করতে পারেননি যে, মাদ্রিদ এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি।

এসব পেঁচাল পেড়ে এখন লাভ? আবু রায়হান বললেন, বাইরের অবস্থা সম্পর্কে খুব সম্ভব তোমাদের কোনো ধারণা নেই।

না। এক লোক বলল, সত্যিই আমরা বাইরের কিছুই জানি না। বলতে পার অভ্যুত্থানের পর কতদিন অতিবাহিত হয়েছে? আমরা পোকা-মাকড়ের মত দিন গুজরান করছি। এই মেয়েগুলো নিয়ে সমস্যায় আছি। ইজ্জতের সাথে আমরা বেরুতে চাই।

আমি একাকী বেরুতে চেষ্টা করছি। তবে এ সমস্যা আমারও। আমি এ ব্যাপারে আপনাদের সঙ্গ দেব। বাইরের অবস্থা এ মুহূর্তে ভাল নয়। মোহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার মাদ্রিদের স্বাধীন বাদশাহ। খ্রীস্টানরা তার আনুগত্য কবুল করেছে। ওদের দুলিডার এলোগেইছ ও ইলিয়ার এর পুরোধা। কর্ডোভার ফৌজ ঝডোগতিতে এগিয়ে আসছে। শহরের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা লড়াই করার জন্য তৈরী। এতে অবরোধ কতটা ফলপ্রসূ হবে তা এক্ষণে বলা মুশকিল। ওদের জনৈক কমান্ডার এসে আমাদের বলেছিল যারা আসন্ন অবরোধে আমাদের সঙ্গ দেবে তাদের মুক্ত করে দেয়া হবে। পক্ষান্তরে, যারা সঙ্গ দেবে না তাদের হত্যা করা হবে। মাত্র তিনজন সৈন্য ওদের এ কথায় প্রতারিত হয়েছে বাকীরা অস্বীকার করেছে। আমি ওদের চতুর্থজন। এই আশায় ওদের সঙ্গ দিয়েছিলাম যাতে পলায়নের সুযোগ পাই। মোক্ষম স্থান এটাই। তোমাদের মনে করেছিলাম প্রেতাত্মা।

প্রেতাত্মায় পর্যবসিত হতে যাচ্ছি আমরা। বাদশাহদের আলসেমি আমাদের এরূপ করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

মুহতারাম বুযুর্গ! এটা স্বীয় কৃতকর্মের সাজা। এখানকার প্রতিটি মুসলমান নিজকে খ্রীস্টানদের বাদশাহ বলে মনে করত এবং তাদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করত। নিছক মসজিদে নামায পড়াকেই আপনি ইসলাম মনে করতেন, কিন্তু মানুষের প্রতি ভালবাসা আল্লাহকে ভালবাসার-ই নামান্তর শিক্ষাটি বেমালুম ভুলে গেছেন। আপনার অজানা নয়, শাসিতের প্রতি অবজ্ঞা একদিন শোষককেই ভোগ করতে হয়। শোষিতের মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বলতেই থাকে। ওই আগুনে একদিন শোষককে পুড়ে মরতেই হয়। নিজেদের হাতে তৈরী অগ্নিকুণ্ডে এক্ষণে নিজেরাই জ্বলে মরছেন। অবশ্য আমাদের সমস্যা এখন ভিন্ন ধাচের। আমাদের ফৌজ আসছে, তাদের শহরে প্রবেশের মওকা পাইয়ে দিতে হবে। গোটা শহরবাসী লড়তে উম্মাদপ্রায়। ভেতর থেকে কোনক্রমে দরজা খুলে দিতে হবে। আমাদের বন্দী সেপাইদের হত্যা করার হুমকিও উড়িয়ে দেয়া যায় না। থামলেন রায়হান। বৃদ্ধ বললেন,

আমাদের যার পর নাই কোরবানী দিতে হবে। ভেতর থেকে দরোজা খোলার মত কোন প্ল্যান তোমার আছে কি? তুমি সৈনিক, কমান্ডার। বহু অভিজ্ঞতা তোমার ঝুলিতে।

স্রেফ সৈনিক নই-গেরিলা কমান্ডারও। এই যুবতীদের সর্বাগ্রে হেফাযতে রাখা জরুরী।

ওরা যদি না থাকত……………।

আমরা মেয়েরা তো আর শল্য নই বলল জনৈকা যুবতী। আপনি আমাদেরকে পুরুষদের মত সড়াতে চাইলে আমরা প্রস্তুত।

আমরা এখানে আত্মগোপন এজন্য করেছি যে, খ্রীস্টান বিদ্রোহীরা অসংখ্য। খোদার কসম, যদি একক যুদ্ধ হত তাহলে আমরা এই নির্বাসনের পথে এগুতাম না। আপনি প্ল্যান তৈরী করুন, ইনশাআল্লাহ আমাদের সেপাই পাবেন। আমাদের সতীত্ব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। বলল আরেক যুবতী।

খবর যদি সত্যি হয় তাহলে আজ রাতেই অবরোধ হওয়ার কথা। আচ্ছা, তোমাদের কাছে হাতিয়ার আছে কেমন?

চারটি বর্শা। নয়টি তলোয়ার। সামান্য খঞ্জর। তিনটি ধনুক ও বেশ কিছু তীর।

বহুত আচ্ছা। খ্রীস্টানরা তাদের মেয়েদের স্বপ্নের রাজকন্যা, শয্যার প্রজাপতি, ভূগর্ভস্থ মায়াবিনী ছলনাময়ী হিসেবে পেশ করেছে, আর আমাদের মেয়েদেরকে আমরা বীরাঙ্গনা করে পেশ করব আসন্ন যুদ্ধে। এটাই ইসলামের শিক্ষা ও আভিজাত্য। ইসলাম নারীকে তার দেহের উঁচু নীচু তরঙ্গ দেখিয়ে পুরুষকে আকর্ষণ করতে শেখায় না বরং তলোয়ারের চমকে দুশমনকেই তার পদতলে নাচাতে শেখায়। প্রস্তুত হও জাতির বীরাঙ্গনা! এর পাশাপাশি ক্ষুধা-কষ্টের প্রস্তুতি নাও। একনাগাড়ে অনেকগুলো কথা বলে আবু রায়হান হাঁপিয়ে উঠলেন।

***

ওই রাতে মাদ্রিদ অবরোধ করা হলো। মাদ্রিদবাসী রাতে ঘুমুতে পারেনি। সূর্যাস্তের পূর্বেই কর্ডোভাবাহিনী সতর্কভাবে এগিয়ে আসছিল। শহরবাসী খাদ্য সামগ্রী সঞ্চয় করছিল যাতে দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হতে না হয়। দড়াম করে লেগে গেল প্রবেশদ্বারগুলো। সামর্থ্যবান পুরুষেরা হাতিয়ার নিয়ে প্রাচীরে চড়ল। সিঁড়ি স্থাপন, সুরঙ্গ খোদাই কিংবা দেয়ালের কাছে আসতেই যেন প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারে এজন্য তারা জ্বালানী কাঠ নিয়ে গেল। পানি কামানেরও ব্যবস্থা থাকল। প্রতিটি বুর্জে ঝানু তীরন্দাযকে নিয়োগ দেয়া হলো। মোটকথা অবরোধকারীদের দেয়ালের কাছে আসার সম্ভব সব ব্যবস্থাদি করা হলো।

সালার আবদুর রউফ ও উবায়দুল্লাহ মাদ্রিদ থেকে সামান্য দূরে অবস্থান নিলেও নেতৃত্ব ওবায়দুল্লাহর হাতেই ছিল। ফৌজকে যুদ্ধসাজ দিয়ে সামান্য কিছুকে রাখালের ছদ্মবেশে অগ্রগামী বাহিনী হিসেবে শহর রক্ষা প্রাচীরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানকার পরিস্থিতি অবলোকন করতেই এদের পাঠানো। উবায়দুল্লাহ এর পূর্বেই জানতে পারেন। শহরের বাইরে বিদ্রোহীদের টিকিটিই নেই।

উবায়দুল্লাহ সৈনিকদের উদ্দেশে বলেন, বন্ধুরা আমার। বিদ্রোহীদের সামান্যও সমর কৌশল জানা থাকলে তারা শহর ছেড়ে এখানেই আমাদের বাধা দিত। ওরা আমাদের আগমণ শোনেনি, তাও অবিশ্বাস্য। ওদেরকে অদূরদর্শীই মনে হচ্ছে। শহরের ভেতরে থেকে আত্মরক্ষামূলক হামলাকে ওরা যুতসই মনে করছে।

সালার উবায়দুল্লাহ বাহিনীকে ছড়িয়ে দিলেন। একসময় বাহিনী শহর রক্ষা প্রাচীরের নিকটে পৌঁছে গেল। তারা দেখল প্রাচীরের ওপরে মশাল জ্বলছে। উবায়দুল্লাহ আবদুর রউফকে বললেন, পেছনে লক্ষ্য রাখবেন। দুশমন পশ্চাৎদিকে ওঁৎ পেতে থাকতে পারে।

***

গভীর রাতে প্রাচীরের ওপর থেকে ভেসে এলো, দুশমন এসে গেছে। শহর অবরুদ্ধ। হুঁশিয়ার। সাবধান। প্রাচীরের ওপর থেকে তারা তীরবৃষ্টি নিক্ষেপ শুরু করে। উবায়দুল্লাহ উঁচুস্থানে দাঁড়িয়ে বলেন, আমরা বিদ্রোহীদের ক্ষমার সুযোগ দিতে চাই। শহরের দরজা খুলে দাও। ক্ষমা করা হবে তোমাদের। গ্রেফতার পর্যন্ত করা হবে না কাউকে।

প্রাচীরের ওপর থেকে ভেসে এলো, হিস্মত করো মুসলমানরা! পারলে আগে বেড়ে দরজা নিজ হাতেই খুলে নাও।

জনৈক কমান্ডার প্রাচীরের কাছে গিয়ে বললেন, আমীরে স্পেন স্বয়ং এই অবরোধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ……………কথা শেষ হতে না হতেই এক পশলা তীর তাকে ঝাঁঝরা করে ফেলে।

সালার উবায়দুল্লাহ বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের স্থলে পাল্টা আক্রমণ করতে দেখে দেয়াল ও ফটকে চড়াও হবার নির্দেশ দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীর থেকে অগ্নিগোলা ও তীরবৃষ্টি ছুটে আসে। আগুয়ান ফৌজ সামান্যতমও প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারে না। এই পরিস্থিতি উবায়দুল্লাহ আগেভাগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ মিনজানিক (পাথর ছোঁড়া কামান) প্রস্তুত করেন এবং কামান থেকে পাথর ছুঁড়তে নির্দেশ দেন।

প্রাচীরের হৈ চৈ বাংকারের সৈনিকদের কানে পর্যন্ত যায়। এদিকে আবু রায়হান শহরের প্রবেশদ্বারগুলো সম্পর্কে সবিশেষ অবগত ছিলেন। তিনি এক হাতে তলোয়ার ও আরেক হাতে তীর নিয়ে বেরুলেন। তিনি দেখতে চান, শহর ফটকে বিদ্রোহীদের অবস্থান কিরূপ। এক্ষণে গ্রেফতারীর ভয় নেই তার। তিনি সবদিক ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকেন। উম্মাদপ্রায় মানুষ ছুটাছুটি করছে। কে কার খবর রাখে। আবু রায়হান মুখ ও মাথা ঢেকে শহুরে মানুষের ভীড়ে ঢুকে পড়েন।

তিনি দুএকটি দরজা ঘুরে আসেন। দেখলেন সহস্রাধিক লোকের প্রহরা প্রতিটি দরজায়! ওরা মুসলমানদের অকথ্য ভাষায় গালি দিচ্ছে। ওখানে প্রহরীদের এতই ভীড় যে, সুঁই রাখারও স্থান নেই। ওরা বাইরে তীর নিক্ষেপ করেই চলেছে। প্রাচীরের বাইরে কামান থেকে নিক্ষিপ্ত প্রকাও পাথর দরজায় না লেগে দেয়ালে লাগলে দুদ্রোহী মারা যায়। আবু রায়হান কামানোর টার্গেট ব্যর্থ হওয়ায় নিরাশ হয়ে পড়েন।

***

গর্তে লুকানো মুসলিম আত্মগোপনকারীদের রাতেই জানানো হলো, বাইরে কি হচ্ছে তার কিছু আশা করা যাচ্ছে না। তবে মুসলিম বাহিনী অতি অবশ্যই দরজা ভাঙ্গার প্ল্যান নিয়ে থাকবে। কেননা দরজা ভাঙ্গা ছাড়া অবরোধ সফল হবে না– এতে প্রাণহানি যতই ঘটুক না কেন তাদের।

পরদিন সকালে মুখে নেকাব লাগিয়ে আবু রায়হান বেরিয়ে পড়েন। প্রাচীরে চড়েন এক সময়। দেখেন কর্ডোভা বাহিনীর অবস্থান। দিগন্তে লকলকিয়ে ওঠা ফসলী ক্ষেত। উবায়দুল্লাহ ওই ফসলগুলো কেটে ফেলতে বলেন। হাজারো ফৌজ তলোয়ার দ্বারা ফসল কাটা শুরু করেন। পরে ঘোড়ার খাদ্য হিসেবে আটি বেঁধে ওগুলো নিয়ে আসা হয়। ফলদার বৃক্ষগুলো কুঠারাঘাতে ধরাশায়ী করা হতে থাকে। আবু রায়হান প্রাচীরে দাঁড়িয়ে কতবার দেখেছেন, সুরঙ্গ করার জন্য কর্ডোভার জানবার্য সেপাইরা আগে বাড়লেও তীয়বৃষ্টির সম্মুখে টিকতে না পেরে পিছু হটেছে। তাকে কেউই চিনতে পারেনি। দেয়াল থেকে নেমে এলেন তিনি। তার মনে এক নতুন পদ্ধতি এসে যায়। দরকার এক্ষণে তার কাগজ-কলম। তিনি একটি দরোজায় করাঘাত করেন। জনৈকা মহিলা দরজা খুলে দেয়। তিনি বলেন, তিন চারটা কাগজ, কলম ও কালি দরকার। কমান্ডারদের কালি লাগবে। তখনকার মানুষের রক্ত দিতেও প্রস্তুত। ওই মহিলা ফওরান কাগজ, কালি ও কলম এগিয়ে দেন।

আবু রায়হান এদিক সেদিক নজর বুলিয়ে গর্তের একপাশে চলে যান। কাগজে কিছু লেখে গুহার লোকদের হাতে সোপর্দ করেন। প্রতিটি কাগজের ভাষ্য একই।

দক্ষিণ দিক থেকে ফৌজ হাটিয়ে নিন। বেশী বেশী প্রহরা প্রধান ফটকে রাখুন। বিদ্রোহীরা দক্ষিণ দরজা থেকে ফৌজ খালি করতে যাচ্ছে। রাত আমরা দক্ষিণ দরজা ভাংতে চেষ্টা করব।

এই কাগজের নীচে তিনি আপনার নাম ও পদবির উল্লেখ করেন। চিরকুট তিনটি মুড়ে পৃথক তিনটি তীরের মাথায় গেঁথে দেন। এই তীর তিনটাসহ একটা ধনুক নিয়ে বের হন। কেউ দেখতে না পাক এভাবে চুপিসারে গুহার মুখ থেকে বের হন এবং প্রাচীরে চড়েন। এদিকটায় প্রহরী নেই দেখেই তিনি এখানটায় চড়েন।

তিনি আরেকটু দক্ষিণ দিকে যান। তার ধনুকটি বড় মজবুত। ধনুকটা যতটুকু বাঁকানো যায় ততটুকু বাঁকিয়ে তীর নিক্ষেপ করেন। প্রথমটা মেরে দেখেন যথাস্থানে পতিত হলো কিনা? আঁ! তিনি জানেন প্রতি তীরই সৈন্যদের মাঝে ফাঁকা জায়গায় গিয়ে পড়েছে এবং কর্ডোভা বাহিনী তা তুলে নিয়েছে।

ওই তিনটা তীরের একটা সালার আবদুর রউফের শিবিরের সন্নিকটে পতিত হয়। জনৈক সেপাই ওটি উঠিয়ে সালারের কাছে পৌঁছে দেন। আবদুর রউফ চিরকুটটি প্রধান সালারের কাছে নিয়ে যান। তিনি বলেন– এটা ধোকাও তো হতে পারে।

হ্যাঁ, এর একটি কারণ থাকলেও থাকতে পারে, চিরকুটের কথামত আমরা দক্ষিণ দিকটা খালি করে দিলে দুশমন ওদিক থেকে বেরিয়ে আমাদের ওপর হামলা শানাতে পারে। এমনটা হলে এ থেকে আমরাও ফায়দা লুটতে পারি। বিদ্রোহীরা বাইরে এলে ওদের একটাকেও ভেতরে যেতে দেব না। বরং আমরাই সে সময় ভেতরে যাব। বললেন আবদুর রউফ।

দ্বিতীয়ত দরজা উন্মুক্ত দেখে ভেতরে ঢুকলে হয়ত দেখব দুশমন ঘাঁটিতে ওঁৎ পেতে আছে। বললেন সালারে আলা।

আমাদের দরজা খোলা দরকার। আমার খণ্ডবাহিনী তাহলে টর্নেডো গতিতে ভেতরে ঢুকবে। যে কোন অবস্থায় আমাদের ঝুঁকি নিতেই হবে। ঝুঁকি নেয়ার সিদ্ধান্ত তো সেই প্রথম থেকেই নেয়া হয়েছে।

সূর্যাস্তের সময় দক্ষিণ দিকের বাহিনী তাঁবু টাল। ভাবখানা যেন অবরোধ উঠিয়ে নেয়া হচ্ছে। ওদিকে পশ্চিম দরোজায় প্রচণ্ড হামলা চলছে। প্রাচীর রক্ষীদের যারা এদিকে সেদিকে ছিল তাদের সকলের দৃষ্টি প্রধান দরজায় পড়ল এবং সকলে ওই দরজা রক্ষা করতে এগিয়ে এলো। এদিকে দক্ষিণ দিকের মুসলিম বাহিনী পিছু হটছে দেখে বিদ্রোহীরা ওই দিকের বাহিনীকে অন্যত্র সরিয়ে দিল।

সূর্যাস্তের পর আবু রায়হান গুহার ভেতরে এলেন। বললেন, আমার পয়গাম পৌঁছে গেছে। দক্ষিণ প্রান্ত থেকে আমাদের বাহিনী সরে গেছে। কাজেই আমাদের সালাররা আজ ওই দরজা খোলার অপেক্ষায় থাকবেন। দরজাটা খোলার ব্যবস্থা করা দরকার। আমি যে প্ল্যান করেছি তাতে তিনজনে কাজ হবে না। কমপক্ষে দশজন চাই।

সে চাওয়া আমরা পূরণ করব। প্ল্যানটা আগে বলবেন কি। জনৈকা যুবতী বলল।

হা! ওদের নিয়ে যাও। বৃদ্ধ বললেন।

তবে এদের পুরুষের বেশে যেতে হবে। কারো সন্দেহ হলে সেরেছে। বললেন আবু রায়হান।

পরিস্থিতি সে পর্যন্ত গেলে আমরা জানবামি রাখতে কুণ্ঠিত হব না। জনৈকা যুবতীর কণ্ঠে দৃঢ়তা। এরপর আবু রায়হান তার প্ল্যান বলে গেলেন।

***

মাদ্রিদ থেকে দূরে অবস্থানরত আবদুর রহমান তার বাহিনী ছদ্মবেশে দূর দূরন্তে ছড়িয়ে দেন। এদের মাধ্যমে পালাক্রমে যাবতীয় তথ্যাদি তার কাছে পৌঁছুতে থাকে। গেরিলা বাহিনী ঘোড়ায় চেপে বিভিন্ন পয়েন্টে ওঁত পেতে পরিস্থিতির প্রতি গভীর নযর রাখে। ছাউনির কেন্দ্রবিন্দুতে হেড কোয়ার্টার থাকলেও দিন-রাতের অধিকাংশ সময় তিনি ঘোড়ার পিঠেই থাকেন। কমান্ডারদের কাছ থেকে রিপোর্ট সংগ্রহ করেন। সালার মূসা ও করন তার সঙ্গী।

আবদুর রহমান আপাদমস্তকে সিপাহীসুলভ অভিব্যক্তি। মনে হত রণাঙ্গনেই তার জন্ম আবার মৃত্যু সেই রণাঙ্গনেই, এমন কি দাফনও। এক সময়কার সংগীতের সুর, মূৰ্ছনা ও নারী সৌন্দর্যে বিভোর আবদুর রহমান এখানটায় ঠিক এভাবেই বিচরণ করতেন যেন চিতাবাঘ তার শিকার খুঁজে ফিরছে। তার আত্মিক ও জাগতিক শক্তির দুটোই এক্ষণে জাগরুক। মানসিক ইদ্রিয়ানুভূতি এমন যে, ওটা যদি অতিন্দ্রীয়ভাবে আত্মার সাথে দেহের সংমিশ্রণ ঘটে তাহলে তা বজ্রবিদ্যুৎ ঘটতে সময় লাগবে না। একরাতে তিনি অধীনস্থ কমান্ডারকে বলেন, আমরা এখান থেকে তাঁবু গুটাব ভাবলে দুশমনকে হতাশই হতে হবে। ইসলামী সাম্রাজ্য সংকুচিত হওয়ার স্থলে ক্রমশই এর সীমা বিস্তার লাভ করবে। স্পেন আমাদের পূর্ববর্তীদের রক্ত আমানত। স্পেন ইসলাম ও ইজ্জতের প্রতিভূ। আমারা একে রক্তের মাধ্যমে পবিত্র ও হেফাজতে রাখব।

কমান্ডাররা এখন আমীরের কঠে এ আওয়াজ শোনেন যিরাব ও সুলতানার কোপানল মুক্ত। বিলক্ষণ তারা শংকা করছিলেন, আবদুর রহমান না আবার যিরাব ও সুলতানাকে এখানে ডেকে পাঠান। কিন্তু সকলকে অবাক করে দিয়ে আবদুর রহমান বলেন, ফ্রান্স সম্রাট লুইয়ের লেজে আঘাত করতে হবে। ফেত্নার উৎপত্তি যেখান থেকে সেখানেই তাকে প্রতিহত করতে হবে। মাদ্রিদের অবরোধ সফল হলে ওখানকার কাউকেই ক্ষমা করা হবে না। ইতিহাস আমাকে রক্ত খাদক হিসেবে চিহ্নিত করলে করুক। ব্যক্তিস্বার্থে একফোঁটা খুন ঝরালে ইহকালে-পরকালে খোদা আমাকে সাজা দিন, কিন্তু জেহাদের প্রতি আমি অকুণ্ঠচিত্ত। কাফেররা অস্ত্র সমর্পণ করুক, ক্ষমা ভিক্ষা চাক কিংবা পরাজিত হয়ে তোমাদের কদমে পড়ুক তথাপিও ওদের বিশ্বাস নেই।

কিন্তু আমীরে মুহতারাম! কোরআন বলছে দুশমন সন্ধির হাত বাড়ালে তাতে সাড়া দাও। করন বললেন।

কিন্তু কোরআন এও বলেছে, ওদের ওপর কোনো প্রকার ভরসা করো না। ওদের সাথে সখ্য, করো না। মুসিবতে পড়লেই নিরূপায় হয়ে ওরা সন্ধির প্রস্তাব করে। অবস্থার পরিবর্তন হলেই ওরা তোমাদের না জানিয়েই সন্ধিভঙ্গ করবে। দেখছ না আমাদের মাঝে কি করে ফেত্না গজিয়ে উঠছে একের পর এক। মাদ্রিদে অভ্যুত্থান ঠিক তখনই হলো যখন আমরা ফ্রান্সভিমুখী হই। বিদ্রোহীরা ফ্রান্স হামলা থেকে আমাদের বিমুখ করতেই এই অত্যুথান করেছে।

বিদ্রোহীদের পুরোধাকে আপনি চেনেন কি? প্রশ্ন মূসার।

মাদ্রিদের বিদ্রোহাগ্নি তো মুহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বারই জ্বেলেছে, কিন্তু তার খুঁটির জোড় খ্রীস্টান জাতি। বললেন আবদুর রহমান

ওদের একজনের নাম এলোগেইছ। অপর একজন ইলিয়ার মূসা বললেন।

ওদের দুজনকেই গ্রেপ্তার করতে হবে। মাদ্রিদ থেকে কোনো খবর আসছে না। উবায়দুল্লাহ হয়ত খুব শীঘ্ৰ মাদ্রিদ ঢুকবেন। বললেন আমীরে স্পেন।

***

সালার ওবায়দুল্লাহ দ্রুত শহরে প্রবেশ করতে চাচ্ছিলেন। দেয়ালে সুরঙ্গ সৃষ্টিকারী জানবাব মুজাহিদরা ক্রমশ শহীদ কিংবা যখমী হয়ে যাচ্ছিলেন। প্রাচীরের ওপর থেকে তীর, পাথরও অগ্নিবান পরিস্থিতিকে নাযুক থেকে নাযুকরো করে ফেলছিল। খণ্ড বাহিনীর প্রধানের উদ্দীপনা দেখে তিনি মনে করছিলেন, তারা ত্বরা করেই শহরে ঢুকতে পারবেন। তিনি বলেছিলেন, দেয়াল টপকাতে না পারলে বিদ্রোহীরা শহরবাসীদের দুঃসাহস আরো বাড়িয়ে তুলবে। কর্ডোভার মিনজানিক মাদ্রিদবাসীদের সাহসে এতটুকু ভাটা ফেলতে পারছে না। কেননা কামান দাগানোর সুযোগ দিচ্ছে না।

ভেতরে এক লোক কর্ডোভা বাহিনীর রাস্তা সাফ করার ব্যবস্থা করছিলেন। যুবতীরাই তার সাথী। যুবতীদের সাথে দুলোক। এদের হাতে তলোয়ার, খঞ্জর ও তীর-ধনুক, ওদের দরকার পুরুষ বেশে সাজা, কিন্তু পুরুষের পোশাক অপ্রতুল।

গভীর রাতে আবু রায়হান এদের নিয়ে বেরোলেন। নিলেন প্রচণ্ড ঝুঁকি। এক্ষণে তাদের দরকার কিছু হৈ-হুঁল্লোড়। ঘটনাক্রমে হৈ-হুঁল্লোড় লেগে যায়। বেশ কিছু পাথর বসতবাড়ীর ছাদে পড়ে। বসতির লোকজন ঘরদোর ছেড়ে বেরোয়। গোটা শহরে হুলুস্থুল পড়ে যায়।

***

আবু রায়হান দক্ষিণ ফটকে এগিয়ে যান। এর পূর্বে শেষবারের সঙ্গীদের নির্দেশনা দেন। বলেন, এবার একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যাও, যেন তোমাদের কারো সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। সফরে দ্রুত এদের মত চল। কেননা আস্তে চললে মানুষ সন্দেহ করতে পারে।

ফটকের কাছাকাছি চলে এলেন তিনি। ওখানে দপদপ করে গোটাচারেক মশাল জ্বলছে। শহরের হৈ চৈ-এ প্রবৃদ্ধি আসে। ফটকের ওপরে-নীচে কম করে হলেও এক জনের বিচরণ। প্রহরীরা এভ-ক্লান্ত। আবু রায়হান তার সঙ্গীদের আড়ালে রেখে দরজার কাছে যান। তিনি ওদের ভাষা জানতেন। খুবই ঘাবড়ে তিনি বলেন, এত লোক এখানে কি করছ। ওই পাশের ফটকে কোনো প্রহরী নেই। মুসলিম বাহিনী ওই ফটক ভাংতে চেষ্টা করছে। ওরা বলেছে, এখানে মাত্র চারজন লোক যথেষ্ট। বাদ বাকীরা ওদিকে যাও। জলদি যাও, কাপুরুষের জাতি। শহর হাতছাড়া হয়ে গেল।

কারা দরজায় থাকবে আর কারা যাবে অতিশীঘ্র তিনি তা নির্ধারণ করেন। মাত্র চারজন লোককে রেখে বাদবাকীদের হাঁকিয়ে দেন। আবু রায়হানও ওখান থেকে সরে যান। তার বাহিনী ওই চার প্রহরীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুবতীরা বর্শা ও তলোয়ার দ্বারা এদের যমালয়ে পাঠায়। সকলে ফটক খুলে ফেলেন। আবু রায়হান সঙ্গীদেরকে দ্রুত মুসলিম শিবিরে গিয়ে খবর দিতে বলেন, কয়েকজনকে এখানে থাকতে বলেন।

উপরের বুর্জ থেকে তিন/চার জন লোক নীচে চলে আসে। মশাল জ্বলছে। তারা দরজা সামান্য খেলা দেখতে পেল। ওখান থেকে আবু রায়হান বেরুচ্ছিলেন। আরো দেখল, তাদের বেশ কজন প্রহরীর লাশ। এদের একজন আবু রায়হানকে লক্ষ্য করে বর্শা নিক্ষেপ করল। বর্শাটি গিয়ে তার পার্শ্বদেশে গেথে গেল। যুবতীরা এই চারজনকে শেষ করে দিলেন।

আবু রায়হান জমিনে লুটিয়ে পড়লেন। অবশিষ্ট সাথীরা এগিয়ে এল। তিনি বললেন, সামনে বেড়ে ডান দিয়ে মোড় নিও। ওদের বলো, দক্ষিণের দরজা খোলা। বাকীরা তোমরা দরজার ওপাশে ওঁৎ পেতে থেকো। কেউ যেন দরজা বন্ধ করতে না পারে।

***

মানব ও ঘোড়ার স্রোত দক্ষিণ গেটে ছুটে আসছিল। প্রাচীর থেকে শাঁ শাঁ করে তীর ছুটে আসছে। বেশ কজন ওই তীরাঘাতে ঘায়েল হয়। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর উদ্দীপনায় ভাটা ফেলতে পারে না। এরা সুদক্ষ, সুশিক্ষিত বাহিনী। কেল্লা ও ফটক দখল করার কৌশল ওদের জানা ছিল। প্রতিটি সৈনিক জানে এ মুহূর্তের করণীয় কি! একদল দরজা ভেদ করে ভেতরে গিয়েই প্রাচীরে উঠে যায়। মশাল নিভিয়ে প্রাচীরে রক্ষীদের পাইকারী হত্যা শুরু করা হয়।

এদেরই একদল ফটকের দুকপাট পুরোপুরি খুলে দেয়। এবার বিদ্রোহীর জীবন-মৃত্যুর দোলায় দোল খেতে থাকে। জনৈক ইতিহাসবিদ লেখেন,

বিদ্রোহীরা জানত, তারা মারাত্মক অপরাধী। এরা মুসলিম খেলাফতের বিদ্রোহী। তারা মুসলিম নেতৃত্বে আঘাত হেনেছে। তাদের ঘরদোরে আগুন জ্বেলেছে। মা-বোনদের সম্ভ্রমহানি করেছে। সুতরাং তারা ওই কৃতকর্মের শাস্তির জন্য প্রস্তুত ছিল। কাজেই তারা ও সময় জীবনবাজি রেখে এভাবে লড়তে থাকে যাতে মুসলিম শিবিরে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে।

লড়াই এবার অলি গলিতেও ছড়িয়ে পড়ল।

এ সময় মুসলিম সেনাপতি চিৎকার দিয়ে বলেন, পুরুষদের গলা কেটে ফেল। ওদের একটাও যেন প্রাণে রক্ষা না পায়। কাফেরদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।

সকাল বেলা দেখা গেল মাদ্রিদের রাজপথে রক্তবন্যা। পা পিছলানো অবস্থা। প্রধান সেনাপতি দক্ষিণ ফটক খোলার খবর শুনতেই জনৈক দ্রুতগামী দূতের মাধ্যমে এ খবর আমীরে স্পেনের কাছে পৌঁছান।

উবায়দুল্লাহ শহরে প্রবেশ করেই সরকারী ইমারত দখল করার ঘোষণা করেন এবং একদল চৌকস গুপ্তবাহিনীকে কোষাগার দখল করতে বলেন। নিজে একদল নিয়ে কয়েদখানায় যান। ওখানে সামান্য প্রতিরোধ হয়। জেল দারোগাকে মুসলিম ফৌজও গভর্নরকে ছাড়িয়ে বাইরে নিয়ে আসতে বলেন।

সেনাপতি এবার আবদুর রউফকে বলেন, এলোগেইছ, ইলিয়ার ও মোহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বারকে পাকড়াও করার হুকুম জারী করেন। কিন্তু তা কি করে সম্ভব। তার বাহিনীর কেউই এ তিনজনকে চেনে না। কোনদিন দেখেনি। ইবনে আবদুল জব্বারকে কেবল সালারগণ চিনতেন। এদের পাকড়াও করার জন্য শহরের প্রতিটি কোণে খোঁজাৰুবাহিনী যায়। কিন্তু পরবর্তীতে জানা গেল, বাহিনী প্রবেশের আগে ভাগেই এরা শহর ছেড়ে আত্মগোপন করেছে।

***

আবদুর রহমানের কাছে দূত খবর দিতেই তিনি মূসা ও করনকে বললেন, তাদের বাহিনী যেন পূর্বের মতই টহল দিতে থাকে এবং ফ্রান্স বাহিনী চোখে পড়তেই যেন তাদের ওপর চড়াও হয়। ওদের একটা। যেন ফিরে যেতে না পারে। এরপর তিনি সসৈন্যে মাদ্রিদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তার চলার গতি খুবই তীব্র। পরদিন দুপুরের পূর্বেই মাদ্রিদের কেন্দ্রস্থলে চলে আসেন। শহরে কখনও লড়াই চলছে।

আমীরকে দেখামাত্রই ঘোষণা হলো, আমীরে স্পেনের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম।

আবদুর রহমানকে দেখামাত্রই ফৌজের মাঝে নব জীবনের জোয়ার এলো। তিনি প্রথম যে ফরমান জারী করেন, তা হচ্ছে ওই দুশমন পুরুষের একটাও যেন জীবিত না থাকে।

সূর্যাস্তের পূবেই বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণ করল। তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হলো। মশালের আধিক্যে অন্ধকার বোঝার উপায় নেই। আমীরের ফরমান মোতাবেক ঘরে ঘরে তল্লাশি চালিয়ে পুরুষদের বের করে আনা হলো। মোহাম্মদ ইবনে আবদুল জব্বার, এলোগেইছ ও ইলিয়ারের টিকিটিও নেই। পাদ্রীদেরও গ্রেপ্তার করা হলো। শহরবাসীদেরকে জিজ্ঞেস করলে কেউ না কেউ এই পাদ্রীদের নামোল্লেখ করলই। এভাবে নেতৃস্থানীয়দের বিরাট একটা দল বেরিয়ে এলে তাদের আলাদা করা হল।

ওই কার্যক্রমে দুদিন লেগে গেল। নেতৃত্বদানকারী কাউকে সন্দেহ করা হলে তাকে আলাদা করা হলো। শহরবাসীদের কড়া ভাষায় বলা হোল, বাঁচতে চাইলে বলো, আর কে কে তোমাদের নেতৃত্ব দিয়েছে। এবারও বিশাল একটা দল বেরিয়ে এলো। মুসলিম নারীদের অপহরণকারী ও ঘরে আগুনদাতাদেরও পৃথক করা হোল, আমীর এবার তার চূড়ান্ত ফয়সালা করলেন। এদের সকলকে হত্যা করা হোক। তিনি বললেন, এলোগেইছ, ইলিয়ার ও আবদুল জব্বারের সন্ধান দাতাদের মাফ করে দেয়া হবে। কিন্তু কেউই তাদের সন্ধান দিতে পারল না। এরা মুসলিম ফৌজ শহরে প্রবেশ করার পূর্বেই পালিয়েছে। ইবনে আবদুর জব্বার লিজবন আর বাকীরা অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়।

এই সময় আবদুর রহমান জানতে জানতে পারেন, শহরের প্রথম দরোজা খোলা মুজাহিদ আবু রায়হান শাহাদত বরণ করেছেন। আরো জানতে পারেন কিছু লৌহমানবীও এ কাজে সহযোগিতা করেছে। আবদুর রহমান ওই যুবতী ও বাপ-মাকে অঢেল সম্পদ দিয়ে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

মাদ্রিদ লাশের শহরে পরিণত। আবদুর রহমান গোটা শহরে বিচরণ করেন। লাশ অপসারণ নিজের চোখেই অবলোকন করেন। সর্বশেষ মাদ্রিদের বন্দী গভর্নরকে উদ্ধার করে তাকেই আবার এখানকার গভর্নর নিযুক্ত করেন।

***

কর্ডোভায় খবর পৌঁছে যায়, আমীর সাহেব আসছেন। চাটুকাররা তাদের থলের ভাষার অলংকার ঘষেমেজে চোখা করে রেখেছিল। মহলে চলছিল চুনকাম। যিরাব ও সুলতানার ঘুম চলে গেছে। সংবাদদাতারা বলেছিল যে, ফ্রান্স অভিযান স্থগিত হয়ে গেছে। কিন্তু মাদ্রিদে বিদ্রোহীদের রক্তবন্যা বইয়ে দেয়া হয়েছে। আরো জানানো হয়, ময়দানে আবদুর রহমানকে চেনার উপায় নেই। খুব সম্ভব তিনি ভুলে গেছেন যে, তাকে স্পেন সম্রাট খেতাব দেয়া হচ্ছে।

ফুলে ফুলে সুশোভিত নয়নাভিরাম একটি স্থানে সুলতানা ও মোদাচ্ছেরা পায়চারী করছিলেন। সুলতানা মোদাচ্ছারকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তিনি মোদাচ্ছেরার সাথে এভাবে সখ্য দেখান যা ইতিপূর্বে ছিল না। মোদাচ্ছেরা বলেন,

রাণী হে। যা বলার বলে ফেলুন। যদিও জানি আমার প্রতি সামান্যতম সহানুভূতি নেই আপনার মাঝে।

তাহলে শোন মোদাচ্ছেরা! আমীরে স্পেনের ওপর তোমার প্রভাব ফেলা চলবে না। মনে রেখে, হেরেমের সামান্য এক বিৰি মাত্র তুমি। সুলতানা বলল,

আপনি কোন ধরনের প্রভাবের কথা বলছেন?

স্পেন সম্রাট একজন রসিক ও মিশুক প্রকৃতির লোক। সেই মিশুক লোককে তুমি ময়দানে নামাতে বাধ্য করেছ। লড়াই তার জন্য নয়, এজন্য ভাড়াটে সেনা ও সিপাহসালার রয়েছে। তারাই দেশকে শত্রুর হাত থেকে বাঁচাবে।

তিনি না খোদ নিজে যাচ্ছিলেন, না সিপাইসালারদের যাবার ফরমান দিচ্ছিলেন। তিনি যদি সৈন্য প্রেরণ না করতেন তাহলে ফ্রান্সবাহিনী স্পেনের ওপর হামলা করে বসত এবং মাদ্রিদের বিদ্রোহ দমন সম্ভবপর হত না।

তিনি মারা গেলে তুমি কি বিধবা হতে না? তোমার বাচ্চারা কি এতিম হতো না?

মুসলিম নারীরা খোদার রাহে স্বামী সোহাগকে কোরবান দিয়ে থাকে। তারা সে মুহূর্তে বাচ্চাদের এতিম হওয়ার ভয় করে না। মোদাচ্ছেরার কণ্ঠে দৃঢ়তা, ইসলাম আমাদের থেকে এই কোরবানীই চায়। শহীদের বিধবাকে আপনি ঘৃণার চোখে দেখে থাকেন বুঝি? স্পেন আমীরের সাথে আপনার সম্পর্ক কিসের শুনি? তিনি শহীদ হলে আপনি সেক্ষেত্রে পরবর্তী আমীরের দাসীই তো হবেন-নয় কি?

আমি স্পেন সম্রাটের দাসী নই। আমি তার বাচ্চার মা হতে যাচ্ছি। আমি স্পেনের ভাবী সম্রাটের গর্ভধারিণী।

স্পেনভূমি এতটা নাপাক হয়ে যায় নি যে, তার ভাবী সম্রাট এমন এক বাচ্চা হবে যার মায়ের সাথে তার বাবার বিয়েই হয়নি এখনো। জারজ সন্তান স্পেনের ভাবী আমীর হতে পারে না। আর মনে রাখবেন রূপের রাণী! আপনার মত আবদুর রহমানের হাতে আমি শরাবের পেগ তুলে দেব না– তুলে দেব তলোয়ার।

মোদাচ্ছেরা! সুলতানা গর্জে ওঠল, হৃদয় থেকে আত্মতৃপ্তি মুছে ফেল। আবেগের প্রশ্রয় নিও না। তোমার কাছে মিনতি নয়, সিদ্ধান্ত দিয়ে বলছি, আমীরের ওপর প্রভাব বিস্তার করার পরিণতি ভাল হবে না।

আপনার হুকুম আমি মানতে প্রস্তুত নই। বিবাহিত কোনো নারী স্বামীর দাসীর হুকুমে চলে না। আমি বনী উমাইয়ার মেয়ে, দাসী নই। মোদাচ্ছেরা বাঁকা চোখে তাকিয়ে বেরিয়ে গেলেন। সুলতানা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বলল, অচিরেই টের পাবে, হুকুম দাসীরটা চলে না স্ত্রীরটা।

২.২ ফ্লোরা

কর্ডোভার হেরেমে সেই জৌলুস নেই ইতিপূর্বে যা ছিল। আমীরে স্পেন মাদ্রিদে ছিলেন যেখানে রক্ত নদী বয়েছে। মাদ্রিদে বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে বহু সেনা শহীদ হয়েছেন। যখমীদের ফিরিস্তিও কম নয়। মাদ্রিদ লাশের শহরে পরিণত। কর্ডোভা এজন্য মর্মাহত, নিঝুম পুরীতে পর্যবসিত। কর্ডোভাবাসী শেষ পর্যন্ত বিজয় সংবাদ পায়। তবে এতে উদ্ভট বানোয়াট সংবাদও অন্তর্ভুক্ত ছিল। যাদের ছেলে এই যুদ্ধে শামিল ছিল তার বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। সর্বত্র খবর ছড়িয়ে পড়ে আমীরে স্পেন আগামীকাল আসছেন।

হেরেম সেজেছে নয়া দুলহানের বেশে। জৌলুসহীন হেরেমের আজ শেষ রাত। ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সংঙ্গীতজ্ঞ তার বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বসে গেছে। যিরাব বাদ্যযন্ত্রে প্রাণ এনেছেন। তিনি এর প্রতি সর্বপ্রথম মুসলিম সমাজে আকর্ষণ সৃষ্টি করেছেন।

তিনি রোমান গীত শুরু করেন। এই সংগীতের আবিস্কারক তিনি নিজেই। তার সুরলহরী হৃদয়তন্ত্রীতে ঝড় তোলে। তার সেতারার সুর উজ্জীবন শক্তি। দরোজার পিঠ করে তিনি সুর তুলে চলেছেন। তার সুরের শব্দমঞ্জুরীতে নারী সৌন্দর্যের পিরামিড দরজায় ফুটে ওঠে। নারীমূর্তি যিরাবের সুরে তন্ময়। যিরাব ওদিকটায় তাকালে দেখত প্রতিচ্ছবি। এই প্রতিচ্ছবিই তার সুরে ও আবেগের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে। নারী সুষমার বাস্তব প্রতিচ্ছবি সুলতানা।

আমীরে স্পেন কর্ডোভায় ছিলেন না বিধায় সুলতানা স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলেন। তার রেশমী কোমল একরাশ কুন্তল ঘাড়ের শোভা বর্জন করে চলেছে। কাঁধ খোলা। দর্শকের দৃষ্টি এখানে পড়লে চমকে উঠতে বাধ্য। যিরাবের সেতারে সুর তাকে মোহিত করে তোলে। দরজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে নিজকে আগে জাগিয়ে পরে যিরাবকে জাগাতে চায় সে। তার ধারণা যিরাবের সামনে গেলে তন্ময়তা কেটে যাবে।

যিরাব গানের কলি দোহরায়। ওই গানের প্রতিপাদ্য নারী সুষমা। জান্নাতের হর-ই কেবল হতে পারে তার কল্পনার সেই নারী। সুলতানা দিল-দিমাগে ঝড় তোলে। একসময় বাড়ে সুরের মূর্ঘনা। সুলতানার কথায় ভেঙ্গে যায় যিরাবের সংগীত সাধনা, তোমার গানের সেই নারী কেবল আমিই হতে পারি। এ আমার সৌন্দর্য ও প্রেমের সংগীত। আমার সৌন্দর্য-পূজার কি অপার কসরত।

সুলতানা যিরাবের দিকে এগিয়ে যায়। সেতারের তার থমকে যায়। বলে, তুমিই আমার কল্পনার ছবি?

সুলতানার মুচকি হাসি দুঠোঁটে খেলে যায়। যিরাবের হাত তার ভোলা কাধ স্পষ্ট করে। সুলতানা হাসে। হাসিতে জলতরঙ্গের ঢেউ। জড়িয়ে ধরে কাপেটে বসায়। বলে, আমায়ও সেতারের অনুভূতি কখনো পাগল করে তোলে। সে আওয়াজে তোমার প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। এমতাবস্থায় দেখি তুমি হাজির।

আমি কি কোন নাগিনী যে সাপুড়ের বাঁশির মোহতানে হাজির হয়ে যাই?

সত্যিই তুমি নাগিনী সুলতানা। তোমার বিষেও সৌন্দর্য রয়েছে। রয়েছে যাদু ও নেশা। সুলতানা! আমি সেই লোক যে দোর্দণ্ড প্রাতপশালী শাসক, আলেম ও বীর বিক্রম আঃ রহমানের ওপর প্রভাব ফেলে বিজয়ী হয়েছি। তুমি দেখে থাকবে আমীর-উমরাগণ পর্যন্ত আমার মাধ্যমে তার দেখা পায়। আমার দ্বারাই তায়-তদ্বির করে। কিন্তু তুমি সামনে এলে মনে হয় আমি পরাজিত হয়ে গেছি, তুমি আমায় দংশন করেছ, আমার ওপর তোমার যাদু কার্যকরী হয়েছে।

কিন্তু তোমার সংগীতকে আমি দংশন করব না। তুমি চাচ্ছ তোমার সংগীতের অপমৃত্যু ঘটুক, পরে স্পেন-নাগিনী তোমার সুরেলা আওয়াজে না আসুক, না ঝাকুক। সর্বোপরি নাগিনীকে সংগীতের সুতোয় বাঁধবে এবং তোমার হয়ে বাঁচবে। যিরাব প্রভু! আমি তোমার। তোমারই থাকব। এসো! আবেগ রেখে খানিক বাস্তব জগতের কথা বলি। যিরাবকে আকর্ষণ করতে গিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল সুলতানা। তার চুলের উষ্ণ পরশ লাগছে যিরাবের গায়ে, সে বলল; আমাদের স্বপ্নের জগতে এক কালনাগিনী ছোবল মেরেছে।

নিশ্চয়ই সে মোদাচ্ছেরা! যিরাব বললেন, মোদাচ্ছেরা স্পেন সম্রাটের ভেতরের পৌরুষকে উদ্দীপ্ত করেছে-এই বলতে চাও তো!

সম্রাটের ওপর প্রভাব ফেলে জয়ী হয়েছ– এ দাবী মিথ্যা হয়ে গেছে তোমার। তিনি আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেছেন। সুলতানা বলল।

সুলতানা! আর্তনাদ করে বললেন যিরাব, তোমার কখনো মনে পড়ে নি– ভালবাসা আমাকে এমন পথেও নিয়ে যায় যেখানে আমাদের যাওয়া উচিত নয়। আমি সঙ্গীত সম্রাট।

তুমি সম্রাট নও গোলাম। এক বাদশাহর গোলাম। কি করে ভুলে গেলে, সালারগণ তোমাকে দরবারী গায়ক বলে থাকেন। আত্ন প্রবঞ্চনার শিকার হয়ো না। তোমাকে সিংহাসনে দেখতে চাই। এই আশায় বেঁচে থাকব, তুমি হবে রাজা আমি তোমার ক্রীতদাসী।

তুমি আমার হৃদয়ের রাণী! এসো আরো নিকটে এসো।

মুচকি হেসে সুলতানা তার আরো কাছে যায়। যিরাব সুলতানার চোখে চোখ রাখেন। চোখের মাঝে সুলতানার দীঘল কালো চুল আড় হয়ে দাঁড়ায়। সঙ্গীত যাদুর ওপর নারী সুষমা প্রভাব ফেলে। ছোট্ট অথচ ক্ষীণকণ্ঠে বেরোয়, যিরী! মোদাচ্ছেরা নামের কণ্টক বিদায় কর।

দীর্ঘক্ষণ তারা আবেগের জগতে ডুবে থাকে। এর মধ্যে শরাবের পেগ পরিবেশিত হয়।

কাউকে পথের কাঁটা মনে করে দূর করার স্বপ্ন মুছে ফেল মন থেকে; যিরাব বললেন, আমি মোদাচ্ছেরাকে আমার প্রভাব বলয়ে আনছি।

তুমি ভুল পথে চলছ- সে কথা বলছ কেন? মুচকি হেসে বলল সুলতানা।

আমার মন বলছে আমার চলার পথেকে যেন বাধার পাহাড় হয়ে আছে। তুমি খায়েশ ও স্বপ্নের মরুতটে বিচরণ করছ।

তুমি সত্যিই মহাবিজ্ঞ যিরী। আমাদের মনে রাখা দরকার যে, আমরা উভয়েই মুসলমান, এ থেকে আমাদের চোখ ফিরানোর জো নেই। খ্রীস্টান যে হারে ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে তাতে বোঝা যাচ্ছে, ইসলাম এদেশ থেকে অচিরেই বিদায় নিতে চলেছে। জানো এরপর কি হবে? তুমি হবে খ্রীস্টান দরবারের গায়ক আর আমি খ্রীস্ট সম্রাটের দাসী। এলোগেইছ তোমাকে সবকিছু খুলে বলেছে। তুমি মুসলিম আমীর-নাজিরদের অহযীব-তামাদুন বদলে দিয়ে তাদের ইসলামবিমুখ করায় তিনি যারপরনাই খোশ হয়েছেন। যে খ্রীস্ট শাসন অচিরেই এখানে কায়েম হতে যাচ্ছে আমরা তাদের সাথে টক্কর দেয়ার ঝুঁকি নিতে যাব কেন? আমরা স্রেফ স্পেন সম্রাটকে আমাদের যাদুকাঠিতে মোহন্দ্র করে রাখব। তিনি কাল আসছেন। মোদাচ্ছেরাকে বলল, সে যেন তার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলে। তিনি এক্ষণে মোদাচ্ছেরার প্রভাবে প্রভাবিত।

একেতো সুলতানার নেশা এর ওপর আবার মদের নেশা। গভীর রাত। যিরাব সুলতানাকে মাতাল করতে গিয়ে নিজেই মাতাল বনে গেছেন। বলেন, আমি এক্ষুণি মোদাচ্ছেরার কাছে যাচ্ছি।

***

খাদেমার মাধ্যমে যিরাবের আগমন বার্তা পেয়ে দরজায় তাকে অভ্যর্থনা জানান মোদাচ্ছেরা। তিনি কিছুটা অবাক হন যে, এ লোক এত রাতে এখানে কেন?

দরজায় যিরাবকে দেখা গেল। তিনি বললেন, স্পেন-সম্রাটের অপেক্ষায় প্রহর কিভাবে শুনছেন মোদাচ্ছে?

স্পেন সম্রাট নয়- স্পেন আমীর বলুন! ইসলামে কোন সম্রাট হয় না মুহতারাম যিরাব। আপনি রাজনীতিজ্ঞ। আপনি বোঝেন না, এক জন আমীর কি করে সম্রাট হয়ে যান? আমাদের খলিফা পর্যন্ত সম্রাট নন। সম্রাট কেবল আল্লাহ। বলুন এতে করে আপনার অভিমত।

বুদ্ধির সম্রাট মোদাচ্ছেরার অকল্পনীয় কথায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান। সৌন্দর্যে সুলতানা অপেক্ষা মোদাচ্ছেরা কোনো অংশে কম নন। মোদাচ্ছেরা বরং সুলতানার চেয়ে অধিক আকর্ষণীয়। যিরাব এভাবে তার বেডরুমে প্রবেশ করেছিলেন যেন তিনি সামান্য এক হেরেমের স্ত্রী। কিন্তু মোদাচ্ছেরার ভাব-গাম্ভীর্যপূর্ণ কথায় তিনি নিজকে যতটা হামবড়া মনে করছিলেন ততটা নন।

আপনি বসবেন কি? বললেন মোদাচ্ছেরা।

এদিক থেকে যাচ্ছিলাম তাই আপনার এখানে হয়ে যাওয়া-এই আর কি। বসতে বসতে বললেন যিরাব।

মুহতারাম যিরাব! আপনার মেধা ও বিচক্ষণতার সামনে আমি কিছুই নই। সূর্যের সামনে চেরাগের যতটা তুলনা ততটাও নই আমি। আপনার চেহারা বলে দিচ্ছে, এদিক থেকে যাওয়াচ্ছলে আমার এখানে আসেন নি, বরং আমার উদ্দেশ্যেই আপনার আসা। বলুন। আপনারার কি খেদমত করতে পারি। আপনার স্মৃতিশক্তির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলছি, আমাকে হেরেমের সাধারণ নারী মনে করলে ভুল করবেন-আমি আমীরের স্ত্রী।

যিরাব হেসে বললেন, সুন্দরী নারীদের ধারণাই এমন যে, প্রতিটি পুরুষ তাকে ভিন্ন নযরে দেখে থাকে। আপনার ধারণা এ পর্যন্ত ঠিক যে, আমি এমনিতেই আপনার কাছে আসিনি, এসেছি কিছু বলতে। আপনার ধারণা ভুল যে, আমি আপনার স্বামীর অনুপস্থিতির সুযোগ নিতে এসেছি। সুলতানার প্রতি আমার অতটা আকর্ষণ যতটা আপনার প্রতি। আপনাদের দুজনের পার্থক্যটাও আমার অজানা নয়।

এত দীর্ঘ ভূমিকার দরকার কি মুহতারাম যিরাব! কেন বলছেন না, আমীর ও সুলতানার মাঝে যেন না পড়ি আমি! সুলতানা এক আকর্ষণীয় কবিতা, সে আপনার সংগীতও। যে ওটা শোনে মত্ত হয়ে পড়ে, এ এক বাস্তবতা। বাস্তবিক কবিতা তবে কাউকে মত্ত করে না। স্পেন-আমীর আমার স্বামী, কিন্তু আমার কতৃত্বে নন। উনি প্রথমে দেশের সুলতান, এরপর কারো স্বামী। সেই দেশে তাকে খেলাফত কিংবা রাজ্যের প্রতি উদাসীন দেখলে সেটা শুধরে দেয়া অপরিহার্য দায়িত্ব। তিনি এরপরও উদাসীন থাকলে আমার ওপর তাকে হারাম মনে করব।

সুলতানার নেশা যিরাবের মগজ থেকে দূরীভূত হল। মোদাচ্ছেরা বলে চলেছেন, সুলতানার ওপর এমন কোন বিধি-নিষেধ নেই। তিনি বিলাস ও সাজ-সজ্জার এক পিরামিড।

তার শক্তি তো এখানেই। এই সৌন্দর্যই ধ্বংসাত্মক অস্ত্র। সে যে ফেত্না সৃষ্টি করতে পারে, তা পার না তুমি। তোমার সত্ত্বার শানে আমার আকর্ষণ। তাই বলতে চাচ্ছি, সুলতানার সাথে শুক্রতার কি না নিতে। সে চায়, আমীরে স্পেন ময়দানে ময়দানে বিচরণ করুক। তিনি ফ্রান্সে সৈন্য প্রস্তুত করছিলেন। তার এখানে প্রশাসনিক কাজে থেকে যাওয়া দরকার ছিল। তুমিই তাকে এমন এক শব্দে আবেগতাড়িত করে তুলেছিলে যদ্দন তিনি হেরেম ছেড়ে তলোয়ার হাতে তুলে নিয়েছেন।

ফ্রান্স ও গোথকমূর্চে কাফেরদের সাথে স্পেনের জানবাষ মুজাহিদরা যে সময় জীনপণ লড়াই করবে সেক্ষেত্রে আমার স্বামী সে সময় হেরেমে এক সংগীতজ্ঞ ও খ্যামটা-কুলটা সুন্দরীর সম্মোহনি শক্তিতে বিভোর-এ আমি চাইনি। স্বামী সোহাগের চেয়ে মুসলিম নারীরা জ্ঞাতি সোহাগকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে।

মোদাচ্ছেরা! আমি তোমায় আবেগে প্রীত। শুধু বলতে চাই, এখানে অভিজ্ঞ সালার রয়েছেন। উবায়দুল্লাহকে তুমি কি মনে কর। আমীরে স্পেনের অনুপস্থিতিতে সে কি নেতৃত্ব দেয়ার অযোগ্য?

না, অযোগ্য নয়। সালার মূসা, আঃ রউফ, করন ঐতিহাসিক যুদ্ধ করে চলেছেন, কাজেই আমীরে স্পেনের সাম্প্রতিককালের অভিযানে না গেলেও চলত।

যিরাব যখন বক বক করছিল তখন মোদাছেরা চেয়ার ছেড়ে উঠে কামরায় পায়চারী করছিল। তার চাল চলনে ছিল এক শ্রেণীর প্রভাব-দাপটের ছাপ। পায়চারী করতে করতে তিনি যিরাবের কাছে এগিয়ে আসেন। তিনি মাথাটা নীচু করে যিরাবের মুখের কাছে এনে সোফায় বসে পড়েন। বলেন, আপনার মুখ থেকে শরাব ও দেহ থেকে সুলতানার প্রসাধনীর ঘ্রাণ আসছে। যে কথা আপনি বলতে এসেছেন, তা সুলতানার এসে বলা দরকার ছিল। কিন্তু তিনি আসলেন না। তার সাথে আমার কথা হয়েছে। আপনি এক মহান লোক খোদা তায়ালা আপনাকে উঁচু মাকাম দান করেছেন। আপনার মেধা-বিবেকেও শেষ পর্যন্ত এক সুন্দরী নারী প্রভাব ফেলল?

মুহতারাম যিরাব! আপনি আপনার কথা সেরে ফেলেছেন। এবার আমার বলার পালা। সুলতানার মত আমাকে স্পেন-আমীরের মনোরঞ্জনের ইচ্ছে নেই। তার হৃদয়ের কোণে ঠাঁই না থাকলে আমাকে হেরেমে রাখতেন না, বিবাহ করতেন না। হেরেমের অন্যান্য নারীদের মত দাসী বানিয়ে রাখতেন। আমার সম্পর্ক কোনো ব্যক্তি বিশেষের সাথে নয়- সম্পর্ক গোটা জাতির সাথে। স্পেনে যে বিদ্রোহাগ্নি দাউ দাউ করে জ্বলছে তার নেপথ্যে ফ্রান্স সম্রাট লুই ও আল-ফার হাত। এরা ইসলামের মূলোৎপাটন করতে চায়। মাদ্রিদে অভূত্থান ঠিক তখনই হলো যখন আমাদের বাহিনী ফ্রান্স অভিমুখে ধেয়ে যেতে লাগল। এটা এক ষড়যন্ত্রের ফসল। কাফের গোষ্ঠী অ্যুত্থান করে ফ্রান্স অভিযান রুখেছিল। এখন হয়ত সম্রাট লুই ও আল-ফাঞ্চ মাদ্রিদের খ্রীস্টানদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে অন্য কোথাও বিদ্রোহ করতে চেষ্টা করবে। আমার দৃষ্টি এক্ষণে কেবল সেদিকেই।

আপনার প্রতি খেয়াল রেখো মোদাচ্ছেরা!

মুহতারাম যিরাব! আপনার প্রতি যে শ্রদ্ধা-সম্মান আমার আছে তাকে আপনি আহত করে চলেছেন। আমি বলেছিলাম, আপনার মুখে মদ ও শরীরে সুলতানার প্রসাধনীর সুবাস। আপনার জামার ওপর লম্বা চুলটি ঝুলে আছে তা সুলতানা ছাড়া আর কার?

যিরাব দ্রুত জামার দিকে তাকিয়ে দেখলেন তার সাদা জামায় লম্বা একগাছি চুল জড়িয়ে আছে। আঙ্গুলে পেঁচিয়ে তা আলাদা করলেন ও ফরাশে ছুঁড়ে মারলেন।

তিনি কাল আসছেন। মোদাচ্ছেরা বললেন, আসছে আমাদের ফৌজ শহীদী ও যখমী কাফেলা আসছে। তাদের মিছিলে বহু মায়ের পুত্র থাকছে না। থাকছে না বহু বোনের ভাই। বহু পিতা থাকছে না, বিধবাদের স্বামী থাকছে না। তারা স্বভূমি থেকে বহু দুরে মাটির নীচে শুয়ে গেছেন। তাদের যখন কেউ গলা কেটে ফেলেছেন, যন্ত্রণায় আহ-উহ করছেন তখন আপনার গালে মদের উকট গন্ধ আর দেহে সুন্দরীর লম্বা চুল ছিল। যখন ইসলামী পতাকায় রক্তের ছিটে লাগছিল তখন সুন্দরী কুলটা নারীর বাহুবন্ধনে থেকে ভাবছিলেন, আমীরে স্পেনের ওপর কোন নারীর প্রভাব থাকা দরকার।

মোদাচ্ছেরা! যিরাব আহত কণ্ঠে বলেন, সত্যিই তুমি বড্ড আবেগ প্রবণ। তোমাকে বলতে এসেছিলাম, সে তোমাকে আবদুর রহমানের কাছে বিতর্কিত করে তুলবে। তোলার শক্তি তার আছে।

সে কথা আমাকে খুলে বলার দরকার নেই মুহতারাম যিরাব! আমি সবকিছু বুঝেছি। আপনি বলতে চাচ্ছিলেন, আবদুর রহমান ও সুলতানার মাঝে এলে আমাকে হত্যা করা হবে এইতো! কিন্তু আপনার যবানে আছে যাদু। বড্ড চৌকস আপনার মেধা। বড্ড সতর্ক ভরে কথা বলেছেন। যাদুর প্রভাব তার ওপর পড়ে যার মধ্যে ঈমানের লেশমাত্র নেই। যিরাব মোদাচ্ছেরার চেহারায় গভীর নফরে তাকান। সুলতানার চেয়ে তাকে সুন্দরী ও আকর্ষণীয় লাগছে– এটা তার আত্মিক সৌন্দর্য। যিরাব যাতে পুড়ে মরছেন, পারছেন না তার তাপ সহ্য করতে। তিনি ভাবছেন, সুলতানার দূত হয়ে এখানে আসা ঠিক হয়নি। মোদাচ্ছেরা বলে চলেছেন,

আমি কাউকে ভয় করি না। যে বিষয়টি নিয়ে আপনারা আমাকে শাসাচ্ছেন আমি একে থোড়াই পরোয়া করি। ইসলামের জন্য আমি জীবন ওয়াকফ করেছি। স্বামীর সাথে আমার সম্পর্ক ততক্ষণ থাকছে যতক্ষণ তিনি ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন। আপনি ধীমান মিঃ যিরাব! আপনার অজানা নয় যে, মুসলিম বধূমাতারা সুলতানা হওয়া শুরু করলে মুসলিম সাম্রাজ্য সংকুচিত হতে হতে কাবা শরীফ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকবে। ইসলামী স্মৃতিবহ হিসেবে কেবল কাবাই থাকবে। পরে অমুসলিমরা বলবে, এ সেই জাতির নিশানা যাদের মেয়েরা শালীনতা পরিত্যাগ করে নগ্ন হয়েছিল। তাদের লজ্জা-শরম শিকায় তুলে রেখেছিল। পর পুরুষের সামনে নিজের স্বকীয়তা হায়েনার মত তুলে ধরেছিল। তারা এমন সন্তান জন্ম দিয়েছিল যাদের সন্তান-সন্ততিরা স্বাধীনতা ও আযাদী শব্দটি পর্যন্ত ভুলে গিয়েছিল।

তুমি যা বলছ আমি খুব ভালভাবেই অবগত।

এ কথা যিনি সর্বপ্রথম আমার কানে দিয়েছিলেন তিনি এর ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন। তিনি আমার স্বামীর বাবা আল হাকাম। টলেডো অভিযানে শাহাদতের পূর্ব মুহূর্তে এ কথা বলেছিলেন। মুহতারাম যিরাব। আপনাকে আরো কিছু বলার আছে আমার। আপনি স্রেফ সগীতজ্ঞ নন। খোদা যে গুণে আপনাকে গুণান্বিত করেছেন, যে গুণ দ্বারা আপনি জনতাকে পাগল করে তোলেন, একে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করবেন না। আপনার মহান বিবেক দ্বারা অন্যকে গোমরাহ করবেন না। খোদা ধনদৌলত দিলে গরীবদের পোকা মাকড় মনে করবেন না। খোদা তায়ালা শক্তি দিলে অধীনদের গোলাম করবেন না।

তুমি আমাকে দর্শন শোনাচ্ছ কেন? আমি তোমাকে নষ্ট করতে আসিনি। সুলতানার কোপানল থেকে বাঁচাতেই আমার আসা।

আপনার চেহারায় আমি এক ধরনের চিন্তা ও পেরেশানি লক্ষ্য করছি। ভয় নেই আমীরের কানে এর কিছুই দেব না আমি।

তোমাকে ধমক দেয়া আমার অভিপ্রায় নয়। তোমার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশই গভীর রাত্রে আমাকে এখানে ডেকে এনেছে।

***

শহরবাসী বীর সেনানীদের অভিনন্দন জানাতে উপকণ্ঠে ছুটে গিয়েছিল। তম্মধ্যে মুসলিম-খ্রীস্টান সকলেই শামিল ছিল। কর্ডোভায় আগেভাগেই খবর পৌঁছেছিল মাদ্রিদ বিদ্রোহের। সকলে জেনেছিল অবরোধের কথা। ফৌজ শহরের দ্বারে পা রাখতেই নারা ধ্বনি দিল। রাস্তাঘাট ও বাড়ীর বেলকনি থেকে নারীরা পুষ্পবৃষ্টি বষর্ণ করতে লাগল। আবদুর রহমানের রথের পেছনে সুলতানা, শেফা ও অন্যান্য হেরেমের নারীরা চলছিল। মোদাচ্ছেরা একটি পৃথক ঘোড়ার সওয়ার। তার ঘোড়াটি আবদুর রহমানের গাড়ীর সাথে লাগোয়া। এই চার নারী আবদুর রহমানের নয়নমণি। এদের মোদাচ্ছেরাই একমাত্র বিবাহিতা স্ত্রী। শাহী রেওয়াজ মোতাবেক সকলেই উপকণ্ঠে এসেছে। যিরাব ও অন্যান্য আমলারা দূরত্ব বজায় রেখে পেছনে চলছে।

বিশেষ কোন ঘটনা, কোনো কথা? আবদুর রহমান মোদাচ্ছেরাকে জিজ্ঞেস করেন।

না তেমন কিছু না। দোয়া ও কল্যাণ কামনার মধ্যে আমার বিগত দিনগুলো অতিবাহিত হয়েছে। বিদ্রোহী নেতাকে গ্রেফতার সম্ভব হয়েছে কি? মোদাচ্ছেরা বললেন।

হাত থেকে ফসকে গেছে। ওদের ধরা খুব সহজ ছিল না। এলাকাটা মুসলিম অধ্যুষিত হলে ধরা যেত। খ্রীস্টানরা তাদের পালাবার সুযোগ করে দিয়েছে। যিরাব ও সুলতানা কেমন ছিল।

ওদের সাথে আমার দেখা হয়নি। অভিযান নিয়েই দিন-রাত চিন্তা ছিল আমার।

যিরাবের ঘোড়া সুলতানার টাঙ্গার কাছাকাছি ছিল। হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডাকল। যিরা তার কাছে এলো। সুলতানা বললো, দেখছ যিরাব! হতচ্ছাড়ি এখানেই তার কানভারী করা শুরু দিয়েছে। আর তুমি বলছ তাকে নিয়ে আমাদের কোনো ভয় নেই।

এদিকে আবদুর রহমানকে মোদাচ্ছেরা প্রশ্ন করেন, বিদ্রোহের শংকা এখন কেটে গেছে কি?

না, ওরা আমাদের তখতে তাউস উল্টানোর যোগসাজশ করছে। এজন্য যারপরনাই কোরবানী করছে। সামান্য এই অভিযানে ওরা দমবে না।

এখানকার মুসলমানদের মধ্যে উত্তেজনা ও আবেগ পয়দা হলে বিদ্রোহের শংকা বহুলাংশেই দূরীভূত হবে। আমাদের শংকা নও মুসলিমদের নিয়ে। এরা দুমুখো গোখরা। আমাদের জন্য ওরা ফাঁদ পেতে চলছে।

কাফের সম্প্রদায় তার সুন্দরী নারীদের নানাভাবে ব্যবহার করছে। আপনার অনুমতি পেলে আমি মুসলিম যুবতীদের গোয়েন্দা করে শহরের খবরাখবর নিতে থাকব। ওদের সেনা প্রশিক্ষণেরও দরকার।

না।

কেন? আপনি কি ইতিপূর্বে যখমীদের পট্টি বাঁধা ও সেবা শুশ্রূষা কারার জন্য নারীদের নেন নি?

এতে দুর্ণাম হতে পারে। বলে তিনি নারারত শহরবাসীদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়েন।

মোদাচ্ছেরার সাথে কৃত্রিম আলাপ করায় সুলতানা ভেতরে ভেতরে জ্বলে খাক। বার বার সে যিরাবের প্রতি তাকায়। যিরা তা দেখেও দেখেন না।

***

সড়ক সংলগ্ন একটি দ্বিতল বাড়ীতে জনৈকা সুন্দরী তরুণী দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখছিল। বীর সেনানীদের তাদের দৃষ্টি মাঝে মধ্যে ইমারত থেকে ভেসে আসা পুষ্পবৃষ্টির দিকে তাকায়। তারা দেখত জানালা ও বেলকনি থেকে তরুণীরা ও গৃহবধূরা ফুল ছিটাচ্ছে। ব্যতিক্রম শুধু দ্বিতল বাড়ীর তরুণীটি। তার হাতে কোনো ফুল নেই। মুখে নেই আনন্দের লেশ। চেহারায় এক প্রকার বির্ষের ছাপ। আবদুর রহমানের দিকে তাকানোর সময় ঘৃণায় তার মনটা তেতো হয়ে ওঠে। আচমকা কারো হস্তস্পর্শে ওই তরুণী সম্বিত ফিরে পায়। কে যেন তাকে ডাকে, ফ্লোরা! তরুণী ঘাড় কাত করে পেছনে তাকায়। ওর মা পেছনে।

তুমি তো পুষ্প ছিটাওনি। এমন কি নাড়ছ না হাতও। ফ্লোরা! ওখান থেকে সরে এসো। তোমার বাবা নীচে দাঁড়ানো। স্পেন সম্রাটকে দেখার পরও ফুল ছিটাওনি দেখলে উপরে এসে তিনি কেয়ামতের বিভীষিকা কায়েম করবেন।

আমি এদের প্রতি পু থু নিক্ষেপ করতেও ঘৃণা করি। আমি কি ওই সেনানীদের ওপর ফুল ছিটাব যারা খ্রীস্টানদের কচুকাটা করে এসেছে? ধর্মরক্ষা কি আমাদের অভিপ্রায় নয়? ইসলামকে উত্তত করা কি আমাদের এখনকার দাবী নয়? ফ্লোরা বলল।

ভূলে যেও না মা। তোমার বাবা মুসলমান। আমরা নাম কাওস্তের মুসলমান সন্দেহ হতেই তিনি আমাদের হত্যা করে ফেলবেন।

কেন ফ্লোরা গর্জে ওঠে, তাহলে তুমি আমাকে খ্রস্টের শিক্ষা দিয়েছিলে কেন? আজ আবার মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শনে বাদ সাধছ কেন? আমার বাবা তোমার স্বামী না হলে সত্যিই তাকে খুন করে ফেলতাম। তোমার প্রেমের প্রতি আমার করুণা হয়, এজন্যই বড় কষ্ট করে নিজকে মুসলমান বাবার কন্যা বলে মনকে সান্ত্বনা দেই। অথচ খ্রীস্টান যীশু আমার পথ প্রদর্শক। খ্রীস্টানদের জন্য আমি জীবনোসর্গ করেছি। আমার বাবার প্রতি তোমার অনুরাগ আছে। তুমি তার শৃঙ্খলে আবদ্ধ– আমি নই।

হ্যাঁ ফ্লোরা! তোমার বাবার প্রতি আমার টান অকৃত্রিম। এতদসত্ত্বেও ধর্মানুরাগ থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি।

***

১৮ বছরের পুরানো কথা।

তখন ফ্লোরার মায়ের বয়স ১৮। এই সময় স্পেন শাসক ছিলেন আল-হাকাম। স্পেনের করদরাজ্য কতলুয়ানা ছিল খ্রীস্টান অধ্যুষিত। এখানে মাঝে মধ্যে মুসলিম ফৌজ যাতায়াত করত। কতলুয়ানাবাসী ছিল নেহাৎ ধুরন্ধর ও পিশাচ প্রকৃতির। তারা মুসলিম বাহিনীর প্রতি প্রতারণামূলক অসংখ্য হামলা করেছে। সত্যি বলতে কি কতলুয়ানা খ্রীস্টান ষড়যন্ত্রের আখড়ায় পর্যবসিত হয়েছিল।

জনৈক মুসলিম সংবাদদাতা (ইতিহাসে যার নাম খুঁজে পাওয়া যায় নি। যিনি পরবর্তী ফ্লোরার বাপ হয়েছিলেন) কর্ডোভায় এ মর্মে খবর দেন যাতে এক ন্যক্কারজনক ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যায়। এটা মুসলিম অফিসারের কৃতিত্ব। ইনি ওঁৎ পেতে ছদ্মবেশে এই তখ্যোদ্ধার করেন ও কর্ডোভায় জানান। তৎক্ষণাৎ মুসলিম ফৌজ রওয়ানা হয়। তারা কতলুয়ানায় ঝড়ো বেগে উপস্থিত হয়। সংবাদদাতা এই বাহিনীর পথ প্রদর্শক। তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের ধরিয়ে দেন। কিন্তু সশস্ত্র শহুরে বিদ্রোহীরা ফৌজের মুখোমুখি হয়। খ্রিস্টান নারীরা পর্যন্ত অলি গলিতে মুসলিম ফৌজকে আক্রমণ করে। মুসলিম সেনাপতি কালবিলম্ব না করে বাড়ীতে বাড়ীতে আগুন ধরাল। ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণ করে।

শহুরে লোকদের আবেগ-উদ্দীপনা এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছিল তারা জঙ্গী প্রশিক্ষণ নিয়েছে। পাশাপাশি এ তথ্যও উদঘাটিত হয় যে, শহুরেদের লেবাছে ফ্রান্স বাহিনীর অসংখ্য সেনা এখানে এসেছিল।

মুসলিম ফৌজর জ্বালানো গোটা শহরের অর্ধেক জ্বলে ছাই হয়ে গেল। এলাকাবাসী বাইরে বেরিয়ে এল।

দুদিন পর।

সংবাদদাতা কোনো কাজে শহরের বাইরে এলেন। পাহাড়ী এলাকা অতিক্রম করতে গিয়ে তিনি নারী কন্ঠের আর্তনাদ শুনতে পেলেন। তিনি. ঘোড়ার গতিপথ বদলালেন। দেখলেন, জনাতিনেক লোক, এরা ফৌজ নয়। জনৈক সুন্দরী তরুণী নারীর পোষাক খামচাচ্ছে। সে ঘোড়র নিকটে দাঁড়ানো। ওই লোক খাপ থেকে তলোয়ার বের করলেন এবং ঘটনাস্থলে গিয়ে উপস্থিত হলেন। ওই তিন লোক তরুণীকে এভাবে টানা হেঁচড়া করছিল যে, তারা অন্য কারো উপস্থিতি ঠাহর করতে পারল না।

তার ঘোড়া কাছে এলে ওরা আঁচ করল, কিন্তু ততক্ষণে তার উদ্যত তলোয়ারের ডগা একজনের বক্ষছেদন করে ফেলছে। তিনি বর্শার মত তলোয়ার নিক্ষেপ করেই হত্যা করেছিলেন। এবার ঘোড় থামিয়ে দুজনের দিকে এগিয়ে গেলেন। ওরা তরুণীকে ছেড়ে তাকে আক্রমণ করতে উদ্যত হলো। খাপ থেকে বের করল তলোয়ার। ছিনতাইকারীরা দুদিক থেকে তাকে ঘিরে নিল। তিনি বিত্তহস্ত–ওদের হাতে অস্ত্র।

এই আগন্তুকের মৃত্যু অনিবার্য মনে হচ্ছিল। এ সময় ত্রাণকর্তার সাহায্য জরুরী মনে করল তরুণী। সে নিহত ছিনতাইকারীর তলোয়ার দ্বারা ওদের ওপর হামলা করলো। শেষ পর্যন্ত ছিনতাইকারীরা সকলেই মারা গেল। অবশ্য উদ্ধারকর্তা মারাত্মক যখমী হলেন।

তরুণী তার ওড়না ছিঁড়ে ক্ষতে পট্টি বাঁধলেন। এ সময় সে কান্না জড়ানো কণ্ঠে বলে, আমি এক খ্রীস্টান। মুসলিম সেনানীরা আমাদের ঘরে আগুন লাগায়। আমাদের সকলে মারা গেছে। আমি প্রাণভরে পালাচ্ছিলাম। রাতে লুকিয়ে ছিলাম। সকালে ওখান থেকে বেরিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে বেরোই। এ সময় এরা আমাকে ছিনতাই করার চেষ্টা করে।

উদ্ধারকর্তা জিজ্ঞাসা করেন, তোমার গন্তব্য এক্ষণে কোথায়? সে বলল,জানি না।

তুমি যেখানে যেতে চাও সেখানে তোমাকে পৌঁছে দেব। বললেন তিনি।

তরণীর অবস্থা তখন খুবই করুণ। সে তার পায়ে পড়ল। তিনি বললেন, আমি মুসলমান। তোমাকে সাথে নিতে পারব না। যুবতী জেদ ধরে বলল, গেলে কোথায়ও আপনার সাধেই যাব।

আমার দেহটা ছাড়া আর কিছুই নেই এক্ষণে। একেই এখন পেশ করতে পারি। এর বিনিময়ে আপনার সাথে নিয়ে চলুন এবং শহরের কোনো পাদ্রীর কাছে সোপর্দ করবেন। বলল তরুণী।

আমি কোনো গোনাহের কাজ করব না। তুমি নিরাশ্রয়, অসহায় ও একাকী। আমি তোমার দেহ ওভাবে গ্রহণ করব না। আমার সাথে গেলে আমাদের ধর্ম গ্রহণ করতে হবে। আমার স্ত্রীত্বে আসতে হবে।

তরুণী খানিক ভেবে বলল, হা হা। ধর্মান্তরিত হয়ে হলেও আপনার স্ত্রীত্বে বরণ করতে রাজি। আপনার মত মানুষই হয় না। আমার মত সুন্দরী বাগে পেয়েও যার এতটুকু আকর্ষণ নেই তাকে স্বামী হিসেবে পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার বটে।

আগন্তুক যুবতীর গলায় ক্রুশ ঝুলছে, তিনি কুশমালা হাতের মুঠোয় নিয়ে ফেলেন। ক্রুশদণ্ড সামান্য তখনও তার হতে ছিল। ওটা যমীনে ফেলে পায়ের তলায় পিষলেন। বললেন, চলো আমার সাথে।

তিনি ছিনতাইকারীদের ঘোড়াগুলো কজা করলেন। একটিতে তরুণীকে চাপিয়ে অপর দুটির লাগাম হাতে নিয়ে কতলুয়ানার উদ্দেশ্যে চললেন। তার ক্ষতস্থান থেকে রক্ত পড়ছিল বেয়ে। আস্তে আস্তে হয়ে আসছিলেন নিস্তেজ। শহরে তার চিকিৎসা হয়। মাসখানেক পরে তরুণী মুসলমান হয়ে গেলে ওই অফিসারে সাথে তার বিবাহ হয়।

তরুণীটি ধর্মপ্রান খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের। চরম মুসিবতে নিজকে এই লোকের হাতে সোপর্দ করে বিবাহত্বে আসার পর নিজ ধর্মের টান হৃদয় থেকে মুছতে পারলেন না, আবার একে ছাড়তেও পারলেন না। এই লোক না থাকলে হয়ত তিনি বর্বরদের পাশবিক হামলার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করতেন।

একদিকে উদ্ধারকর্তার প্রেম অপরদিকে খ্রীস্টধর্মের টান। সর্বোপরি পরিবারের সকলের মৃত্যুশোক তিনি কি করে ভুলবেন। স্বামী তার সেই লোক-ই যিনি নিজে খ্রীস্টান বিদ্রোহীদের ষড়যন্ত্র ফাঁস করেছেন। তার পরিবারে মর্মান্তিক মৃত্যুর মূলে বহলাংশেই দায়ী তার স্বামী। তার মনে নেই কত সহস্র খ্রীস্টান অগ্নিকংকাল হয়েছে এবং কত নারী বাদী হয়েছে। তার এই স্বামী গলা থেকে ক্রুশমালা শুধু ছিঁড়েই ক্ষ্যান্ত হননি, পায়ের তলে পিষেছেনও। কুশদণ্ড তিনি চোখের ওপর রেখেছেন চিরদিন- কিন্তু তিনি তা দিয়েছেন পায়ের তলে। মুসলিম স্বামীকে তিনি ধর্মান্তরকরণের কথা বলেছেন। বলেছেন তার প্রতি অগাধ আকর্ষণের কথাও, কিন্তু হৃদয়ের কোণে জমাট খ্রীস্টধর্মের যে অগাধ মমতা তা বলেননি, জানতেও দেননি কোনদিন।

***

অনেক চেষ্টা করার পরও মনে প্রাণে ইসলামকে গ্রহণ করতে পারেননি তিনি। এক বছর পর তার কোলজুড়ে একটি কন্যা সন্তান আসে। বাবা তার নয়নের মণির সুন্দর নাম রেখেছিলেন। ইতিহাসে ওই নামটি অবশ্য সংরক্ষিত নেই। মা তাকে ফ্লোরা নামে ডাকেন। বাবা এতে আপত্তি জানান না। ফ্লোরা নামকেই মা চয়েজ করেন। ইতিহাসে সে এ নামেই খাতে।

ফ্লোরা সেই নাম যে বহু কাহিনীর জন্মদাতা। এই নামে অসংখ্য নাটক লেখা হয়েছে। সাহিত্যের পাতায় এই ফ্লোরার প্রেমে মুসলিম সেনাপতি ও শাহযাদাদের তড়পাতে দেখা যায়। কোনো সাহিত্যিক তাকে ক্লিওপেট্রা বলে খেতাব দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবের সাথে এসব নাটক-উপন্যাসের কোন মিল নেই। মুসলিম ইতিহাসবেত্তাদের পাশাপাশি অমুসলিম ইতিহাসবেত্তারা পর্যন্ত ফ্লোরারে মত ইসলাম বেরিতার প্রতিভূ ছিল। এই মেয়ের দ্বারাই স্পেন থেকে মুসলিম উৎখাতের প্রেরনার উৎস পেয়েছিল তাবৎ খ্রীস্টান শক্তি। ইসলাম বৈরিতার এই ষড়যন্ত্র-কন্যার মাধ্যমে খ্রীস্টান জাতি তাদের দলে অসংখ্য মানুষকে ভেড়ায়। এই আন্দোলনকে ইতিহাসে মোয়াল্লেদ (মুসলিম হটাও আন্দোলন) বলা হয়।

ফ্লোরার মা ছিল এই আন্দোলনের পুরোধা। দ্বীনদার এক মুসলিমের স্ত্রী, নামটাও ইসলামী। কিন্তু মনে প্রাণে কট্টর খ্রীস্টান। তাই তিনি ফ্লোরাকে আশৈশব খ্রীস্টত্ব শিক্ষা দিয়ে আসছেন। স্বামীর প্রতি অগাধ প্রেম থাকায় তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম ছাড়তে পারেননি। আবার খ্রীস্টত্বের ঘোষণাও দিতে পারেননি। মন থেকে বাপ-দাদার ধর্ম মুছে ফেলতে চেয়েছেন বারংবার, কিন্তু পারেন নি। কুশ তার শৈশবের খেলা ছিল, যৌবনের ছিল মাবুদ। ১৮ বত্সরের যুবতীর দেহ থেকে খ্রীস্টত্ব পড়ত টপকে টপকে।

এক মুসলিমের সাথে বিবাহ। এর থেকেই সন্তান। অবশ্য প্রতিপালন মুসলিম হিসেবে হয়নি। হয়েছে মনের কোণে লুকানো খ্রীস্টত্বেই। গর্ভে আসার পর ফ্লোরার মা একবার স্বপ্নে কি দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। স্বামী তাকে বুকে চেপে ধরে। বাচ্চাদের মত সান্ত্বনা দেন। কোরআনের আয়াত পড়ে ফুঁক দেন। নিজের গালে উভয় হাত রেখে বড় চোখ করে তাকিয়ে বলেন, আগুন লেগেছে আগুন! উঠে দেখ! কে যেন ঘরে আগুন লাগিয়েছে। মানুষ পোড়া গন্ধ তোমার কানে আসছে না? কে যেন জ্বলে ছাই হচ্ছে।

যখন তার পুরোপুরি হঁশ আসে তখন স্বামীর কোলে মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। স্বামী তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, যুবতী মেয়েদের প্রথম সন্তান গর্ভে আসলে একটু আধটু এ রকম আছর হয়েই থাকে। কাজেই ভয়ের কিছু নেই। স্বামী কাছে থাকলে এ ধরনের আছরে তেমন কোন ক্ষতি হয় না।

ফ্লোরার মা স্বামীর ওই বৃত্তান্তকে দুঃস্বপ্ন বলে মেনে নেন। কিন্তু বেশ কিছুদিন পর স্বপ্নে গীর্জার ঘন্টাধ্বনি শুনতে পান। আওয়াজটা খুবই অস্বাভাবিক। বিলকুল গরিলার মত গর্জন। পরে এই আওয়াজ অগ্নিরূপ ধারণ করে দূর দরাজ পর্যন্ত তার শিখা ছড়িয়ে দেয়। তিনি ভয়ে গির্জার উদ্দেশ্যে ছুটতে থাকেন। আগুনের রোশনাই আকাশ ছুঁই ছুঁই। আকাশ লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। এই বর্ণ তার কাছে খুব ভাল লাগে। তিনি চলতে চলতে বুকে হাত রাখেন। ওখানে কুশের অস্তিত্ব অনুভব করেন। বুকে যেন চাঁদের কুশ চমকাচ্ছে। ক্রশটি তিনি হাতের মুঠোয় পুরেন।

এক সময় খুলে যায় চোখ। হাত তখনও বক্ষদেশে ঘুরে ফিরছে। ওখানে এক্ষণে কুশ নেই। মনে পড়ে মাসচারেক আগে উদ্ধারকালে তার এই উদ্ধারকর্তা ক্রুশ গলার থেকে ছিনিয়ে পদতলে পিষ্ট করছিল। কুশ অপমানের জ্বালায় তিনি পুড়ে মরেন। সেই স্বামী আজ তার পাশে দিব্যি নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। এই লোক যদি তাকে জোরপূর্বক বিবাহ করত তাহলে নির্ঘাত হত্যা করে বসতেন তিনি। পরে কোনো গীর্জায় নাব্রত পালন করতেন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে অঙ্গুলি হেলনের শক্তি-সুযোগ নেই যে।

হাত দুটি তখনও বক্ষদেশে। অন্ধকার আকাশে স্বপ্নে দেখা সেই বর্ণ এখনও বিদ্যমান। কামরায় গরিলার আওয়াজের প্রতিধ্বনি ভাসছে। এক সময় তর্জনী আঙ্গুল দ্বারা বুকে ক্রুশ আঁকেন। এতে মনে সান্ত্বনা আসে।

এখান থেকেই তার প্রেমে বিভাজন আসে। এর সপ্তাহ খানেক পরে তিনি স্বপ্নে যেন কার ডাক শুনতে পান, তুমি খ্রীস্টের পূজারিণী–মুসলিম নও। আবার দেখেন, আগুন জ্বলছে, মানুষ পুড়ছে। চাঁদের আলোয় ছোট ছোট হাজারো ক্রুশ বাতাসে ভেসে চিকচিক করছে। মুসলিম সৈনিকরা এগুলো নামিয়ে পিষ্ট করছে। তিনি সৈনিকদের বারণ করেন, কেউ তার ডাকে সাড়া দেয় না। ভাঙ্গা কুশ হাতড়ান, পান না। শেষ পর্যন্ত বুকে হাত দিয়েই ক্রুশ অঙ্কন করে মনকে প্রবোধ দেন।

স্বপ্নে তিনি এখন আর ভয় পান না। স্বামীর সেই বৃত্তান্ত মন থেকে বের করে দেন। স্বপ্ন দেখার পর অনপোলব্ধিগতভাবে নিজে একটা বৃত্তান্ত করতেন। স্বপ্নের তাবীর বুঝতেন, তিনি খ্রীস্টানের ওপর দৃঢ় থাকার নির্দেশ পাচ্ছেন। যে নির্দেশ পাচ্ছেন তা তাকে শুনতে হবে, বুঝতে হবে।

স্বপ্নে নির্দেশাবলীকে তিনি গ্রহণযোগ্য ও সত্যি বলে মেনে নেয়ার পর তার হৃদয়ে প্রশান্তি আসে। এদিকে স্বামী তার দিকে প্রেমময় দৃষ্টিতে তাকাল তিনি সব কিছু ভুলে যান। আপনার সত্তা, ব্যক্তিত্ব ও আভিজাত্য সবকিছু স্বামী সত্তার মাঝে লীন করে দেন। প্রেম এমন এক মহৌষধ যাতে স্বামীর অঙ্গ বনে যান স্ত্রী। অঙ্গাঙ্গি এই সম্পর্ক মানুষকে সব কিছু ত্যাগ করতে তালিম দেয়। ব্যাপারটা ফ্লোরার মাকেও উদগ্রীব করে। উপলব্ধিগতভাবে তিনি এই দ্বি-চারী মনোভাব সমর্থন করতেন না। তবে সচেতনভাবেই ধর্মের টানটা কেন যেন তার মাঝে এসেই যেত। শরীরের রক্ত যেন খ্রীস্টত্বই জপত তার মাঝে।

***

তার স্বামী গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা। দায়িত্ব পালনে তাকে বাড়ীর বাইরে থাকতে হত। তার উপস্থিতিতে স্ত্রী নামায আদায় করতেন, তার থেকে কোরআনের সবক নিতেন, কিন্তু তিনি ঘরের বাইরে গেলে খ্রীস্টের উপাসনা শুরু করতেন। বাড়ীর নিকটেই একটি গীর্জা ছিল। এর থেকে ঘন্টাধ্বনি আসত। তিনি ঘন্টার আওয়াজ শুনেই ওখানে হাজির হতেন।

স্বামীর ছিল দুটি ঘোড়া। একটি অনেক আগের আরেকটি ছিনতাইকারীদের থেকে নেয়া। এই ঘোড়া ছিল তার সুবর্ণ বাহন।

একদিন বাড়ী থেকে বের হবার সময় স্বামী তাকে বললেন, ঘোড়ার পায়ে লোহার কড়া (জুতো) পরানো দরকার। বিশেষ কাজে আমি কর্ডোভার বাইরে যাচ্ছি। বাইরের থেকে তুমি জুতা লাগিয়ে নিও। তিনি বাড়ী ছাড়ার পর স্ত্রী ঘোড়ায় চেপে জুতো লাগানোর তালাশে বের হলেন। কেউ তাকে বলেছিল, হাশেম কর্মকার ভালো জুতো বানাতে পারে, সে বর্শার বেয়নেট বানায়, বানায় তলোয়ার, খঞ্জর ও তেগও। মাঝবয়সী সাধারণ গোছের এই কর্মকার। ছোটখাট সংসার। শহরের মানুষ তাকে এক নামেই চেনে।

১৮ বছরের নজরকাড়া সুন্দরীর আগমনী দেখে হাশেম তার নিটোল গালের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে। যুবতীর দুঠোঁটে মুচকি হাসি। সেই হাসির ছটা মুখে রেখেই তিনি প্রশ্ন করেন-খ্রীস্টান বুঝি?

যুবতী সহসাই উত্তর দেয়, না।

তাহলে নও মুসলিম?

হ্যাঁ, মুচকি হেসে হাশেম বলেন, এখানে কি উদ্দেশ্যে?

হাশেম কাজ ছেড়ে বাইরে আসেন এবং ঘোড়র জুতো খুলতে থাকেন। কাজ করার পাশাপাশি যুবতীর সাথে তিনি কথা চালিয়ে যান। যুবতী অবাক নয়নে লক্ষ্য করেন, লোকটার কাজের চেয়ে মুখ চলছে বেশী। সামান্য আলোচনার পর তিনি ধারণা করেন লোকটার খপ্পরে পড়ছেন তিনি। চির পরিচিত মানুষের মত অকৃত্রিম আলাপচারিতা শুরু হয়। যুবতীর দোদুল্যমান মনোব তাকে এই আলাপে আরো আগ্রহী করে তোলে। স্বামী ও ধর্মের দোদুল্যমানতা প্রকাশের একটা অভয়ারণ্য মনে করেন এই কর্মকার। এক পর্যায়ে তিনি বলে ফেলতে চান মনঃকষ্টের কথা। স্বামী ও খ্রীস্টধর্মের দ্বন্দ্ব সংঘাতের কথা। কিন্তু হাশেমকে মুসলমান জানতে পেরে নিজকে সংযত করে নেন।

১৮ বছর পর্যন্তু খ্রীস্টান থাকলে, কি বুঝে সংঘাতধর্মী একটি ধর্ম গ্রহণ করলে? কেন করলে? প্রশ্ন হাশেমের।

কিছু একটা বুঝেই করেছি। কিন্তু ও প্রশ্ন কেন আপনার?

তোমার থেকে কোনো তথ্যোদ্ধার উদ্দেশ্যে নয় আমার। অভিজ্ঞতা আমার প্রচুর আমি ইতিপূর্বে খ্রীস্টান ছিলাম। একটি কারণে মুসলমান হয়ে যাই। সে বহু পুরনো কথা। মুসলমান হলেও হৃদয় থেকে খ্রীষ্টের শিক্ষা ভুলতে পারিনি। গভীর রাতে গীর্জার ঘন্টাধ্বনি আমার কানে গুঞ্জনে তোলে। তখন মনের কি অবস্থা হয় তা ভুক্তভোগী মাত্রই অনুমান করতে পারে।

আপনার এই অভিজ্ঞতার ভোজা আমিও একজন। এ রকম দোদুল্যমান রোগী আমি। সত্যিই, শত চেষ্টা করেও ধর্মীয় টান তনুমন থেকে মুছতে পারছি না।

হাশেম কাজ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং তার স্বামীর পেশা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। যুবতী অনভিজ্ঞ। স্বামী তাকে বলেছিলেন, তার পেশা সম্পর্কে কাউকে কিছু না জানাতে। তিনি ছিলেন গোয়েন্দা, সাধারণ মানুষ তাকে মুন্সী বলেই জানত। যুবতী বললেন, আমার স্বামী সরকারী গোয়েন্দা। আরো বললেন, কতলুয়ানার ঈসায়ী বিদ্রোহে আমার স্বামী গোয়েন্দগিরি করেছিলেন। স্পেনের আমীর তাকে এর জন্য বিশাল এনামও দিয়েছেন।

একথা কেন বলছ না কতলুয়ানা। পাইকারী খ্রীস্টান হত্যাযুদ্ধের মূল নায়ক তোমার স্বামীই। হাশেম বলল।

এ হত্যাকাণ্ড তো অবধারিত ছিলই। ঈসায়ীরা সশস্ত্র বিদ্রোহে নেমে পড়েছিল। আমাদের যুবতী মেয়েরা ছাদে চড়ে মুসলিম সেনাযাত্রীদের পাথর বর্ষণ করেছিল। অসংখ্য ফৌজ মারা পড়েছিল সেদিন আমাদের হাতে। ফৌজ এরপরও আমাদের ছেড়ে দেবে কেন?

তুমি মুসলিম পক্ষে ওকালতি করে চলেছ।

হ্যাঁ। আমি মুসলমানদের বিপক্ষে কথা বলতে পারি না। কেননা আপনিও একজন মুসলমান। দ্বিতীয়ত আমার স্বামীও মুসলমান। তিনি আমাকে তিন তিনজন হিংস্র : মানবজন্তু থেকে উদ্ধার করেছিলেন। হাশেমকে পুরো ঘটনা শোনানোর পর তিনি বললেন,

তিনি আমার সতীত্ব রক্ষা করেছেন। এর প্রতিদানে নিজকে তার কাছে সোপর্দ করলে তিনি অস্বীকৃতি জানান। বলেছিলেন, বিবাহের শর্তে তোমাকে গ্রহণ করতে পারি। জেনে শুনেই তারা স্ত্রীত্বে এসেছি আমি।

তিনি তোমাকে তার বাণী মনে করেন।

না। হৃদয়ের রাণী মনে করেন। স্বপ্নঘোরে চিৎকার করে উঠলে তিনি আমাকে তার বুকে সেভাবেই চেপে ধরেন যেভাবে বাল্যকালে দুঃস্বপ্নে মা তার বুকে আমাকে চেপে ধরতেন।

দুঃস্বপ্নে ভয় পাও কেন? আমিও প্রথমদিকে অমন স্বপ্ন দেখতাম। ধর্মান্তর করনের শুরুতে অমন একটু আধটু হয়। দুধর্মের মানসিক টানাটানিতে মানুষ দোদুল্যমান হয়ে থাকে। আমার ওপর দিয়ে যা বয়ে গেছে ঠিক তা-ই এখন বয়ে যাচ্ছে তোমার ওপর দিয়ে।

হ্যাঁ, আপনার অনুমান যথার্থ।

আমার সাথে প্রাণ খুলে আলাপ করতে দ্বিধাবোধ কর না। বেশক আমি মুসলমান কিন্তু এর পাশাপাশি রক্তমাংসের গড়া একজন মানুষও। আমাকে স্রেফ কর্মকার মনে না করলে সবকিছু খুলে বল। তোমাকে কিছু প্রশ্ন করলে আমার উপর অবস্থা রেখ। তোমার বাড়ীঘর জ্বলে ছাই। জ্বলে ছাই আমার ঘরও। টলেডো বিদ্রোহকালে আমি মুসলমান হই। তদানীন্তন স্পেন শাসক ছিলেন আল হাকাম। ঘটনা ৮১৩ খ্রীস্টাব্দের ঘটনা। টলেডোতে খ্রীস্টানরা বিদ্রোহ করেছিল। স্পেনশাসক বড় কড়া নির্দেশ দিলেন। তিনি ফরমান জারী করে বললেন, গোটা শহরে আগুন লাগিয়ে দাও। তোমাদের শহরে তো তা-ই করা হয়েছে।

মুসলিম ফৌজ ঈসায়ীদের ঘরে আগুন লাগাল। আগুনের লেলিহান শিখা আমার ঘরকে গ্রাস করল। তাদেরকে বললাম, আমি মুসলমান, নও মুসলিম। সৈনিকরা বলল, তুমি বিদ্রোহী, খ্রীস্ট পূনর্জাগরণের কর্মী। তুমি মোয়াল্লেদ। মোয়াল্লেদ-এর অর্থ জানো? এটি আরবী শব্দ। অর্থ ধর্মান্তরিত হয়ে সাবেক ধর্মের প্রতি টান থাকা।

আমি সৈনিকদের বললাম, আমার ঘর তল্লাশি করে দেখ। এখানে তোমাদের কোরআন শরীফ ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের নিশানা পাবে না। ওরা আমার কথা এজন্য বিশ্বাস করতে পারল না যে, নও মুসলিমরাই উপরোক্ত বিদ্রোহে মদদ জুগিয়েছিল। ওরা আমার ঘরে আগুন লাগাল। আমার স্ত্রী ছিল, ছিল দুটি বাচ্চা। ওরা প্রাণরক্ষার্থে বেরিয়ে ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হয়ে মারা গেল। কেউ আমার ফরিয়াদে কান দিল না। আমি ঘরছাড়া হয়ে গেলাম। হয়ে গেলাম নিঃসঙ্গ। কোনো হাকীমের সন্ধানে কর্ডোভায় এলাম। স্পেন আমীরের সাথে দেখা করারও চেষ্টা করলাম। তার কাছে আমার প্রতি নিষ্ঠুর জুলুমের কাহিনী শোনাতে চেয়েছিলাম। হয়ত বা সামান্য ক্ষতিপূরণ পাব এই ছিল মনে আশা। কিন্তু আমার ওই আশা মনের কোণেই জমা থাকল, আমীর পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব হলো না। আল হাকাম ছিলেন বিলাসী। চাটুকারে তার দরবার ঠাসা। কবিরা তার দরবারে নিরলস কাব্যচর্চা করত। প্রজাদের বাঁচা-মরা নিয়ে তার কোন চিন্তা ছিল না। বেঁচে থাকার একটা অবলম্বন দরকার ছিল। কর্মকারের কাজ একটু আধটু জানতাম। সেটাকেই শেষ পর্যন্ত জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন বানালাম।

এতে আপনি খুশী? আপনি তৃপ্ত কি?

দেখো। আমার ব্যক্তি জীবন নিয়ে আর কিছু বলো না। তুমি এক গোয়েন্দার স্ত্রী। তোমার স্বামী ঘূর্ণাক্ষরেও জানলে আমি গ্রেফতার হয়ে যাব। চারদিকেই ষড়যন্ত্র আর যোগসাজশের প্রয়াস। যার ওপর সামান্য সন্দেহ হচ্ছে তাকেই আটকানো হচ্ছে। তোমার স্বামী গোয়েন্দা বলে ভুলে করেছ। গোয়েন্দারা খুবই চালাক। তাকে আমাদের এই অমানিশার কথোপকথনের কথা জানতে দিও না। আর কারো কাছেই তোমার স্বামীর পরিচয় দিতে যেও না। স্বামীর সাথে যে কথা বলতে পার না আমার সাথে তা নির্বিবাদে বলতে পার। তোমাকে আমার মেয়ে ও বোন বলেই মনে করব। আমার হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত। খুব সম্ভব তোমার ভেতরটাও তথৈবচ।

আমার স্বামীকে কখনো এ কথা বলবেন না তো-আজকের আলাপচারিতার কিছু?

আমি তোমার সাথে প্রতারণা করছি না। আমার কাছে যাওয়া-আসা জারী রেখো। বড় নিঃসঙ্গ আমি। এ জগতে কেউ নেই আমার। সত্যি বলতে কি, আমার ধর্মও নেই। মুসলমানদের ব্যবহারে আমি ত্যক্ত-বিরক্ত। ধর্মের শাসন-অনুশাসন স্রেফ প্রজাদের জন্য প্রযোজ্য শাসকদের জন্য নয়। মুসলমানদের মধ্যে আজ এটাই হয়ে চলেছে। স্পেন বিজেতারা বলেছিলেন, ইসলাম গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে দেবেন, কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এরা একদিন এদেশ থেকেই বিতাড়িত হবে। হতে বাধ্য। বলল হাশেম।

বাড়ীর পথ ধরার সময় যুবতী অনুমান করলেন, লোকটা স্রেফ কর্মকারই নন তার ব্যক্তিত্বে রয়েছে আকর্ষণ– সাধারণ মানুষের বেলায় এমনটা দেখা যায় না।

***

ইতিহাস নীরব থাকেনি। এগিয়ে চলেছে তার গতিপথে। ইতিহাসের বাঁকে তাই দেখা যায় হাশেমের আলোচনা। তিনি সত্যিই ছিলেন চৌকস, ছিলেন মোয়াল্লেদ। মুসলমানদের অমানবিক আচরণ নও মুসলিমদের বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। ঘোড়ার লৌহজুতো বানাতে মানুষ তার কাছে আসত। তম্মধ্যে খ্রীস্টান-মুসলিম উভয়ই ছিল। তিনি খ্রীস্টানদের মন জয় করতে চেষ্টা করেন। অতি গোপনে তিনি খ্রীষ্টান পুনর্জাগরণ বাহিনী গড়ে তোলেন। তিনি সকলকে ফ্লোরার বাপ থেকে সতর্ক করেন। বলেন, রহস্যভেদী এ টিকটিকি থেকে সাবধান।

ফ্লোরার মা তার কাছে যাতায়াত করে থাকেন। পীরের আসনে বসান তাকে। তিনি হাশেমকে মনের খবরটা দিয়ে বলেন, কিছুতেই ইসলামকে মনে ঠাই দিতে পারছি না। আরো বলেন,

আমার স্বপ্ন নিছক স্বপ্নই নয়। সত্যিই এটি এক প্রাঞ্জল দিক নির্দেশনা।

হা! এটা নির্দেশনা। তবে স্বামীকে ইসলাম বৈরিতার ব্যাপারটা বুঝতে দিও না। পরবর্তীতে হাশেম তাকে বলেন, তুমি এখনো স্বামীকে উপেক্ষা করতে পার না। উপেক্ষা করলে মারা পড়বে।

স্বামীহীনা হতে চাই না। এ লোকটার সাথে আমার প্রেম ততটুকু যতটুকু খ্রীস্টত্বের সাথে। তার ছায়াতলে থেকেই খ্রীস্টত্বের মুক্তির জন্য সম্ভব সব কিছু করব, নয়ত আমি পাগল হয়ে যাব।

তুমি সন্তানের মা হতে চলেছ। ছেলে হোক মেয়ে হোক তাকে বাবার অজান্তে খ্রীস্টত্বের তালিকা দিও। তার হৃদয়ে মুসলিম বিদ্বেষ পয়দা করো এবং সে অবস্থায় ছেড়ে দিও। পরবর্তী সন্তানের বেলায় এই ঝুঁকি নিতে যেও না। কেননা তার বাবা জেনে যাবে। সে অবস্থায় তোমার পরিণতি খারাপ হয়ে যাবে। যে সন্তানকে তুমি খ্রীস্টান বানাবে নিজের ভবিষ্যৎ সে নিজেই গড়ে নেবে এবং তোমার আত্মার প্রশান্তি আনবে। খ্রীস্ট ধর্মের জন্য তুমি একটা কাজ করতে পার। তোমার স্বামী সরকারী গোয়েন্দা। তুমি তার প্রাইভেট সেক্রেটারী হয়ে ভেতরের খবরাখবর সংগ্রহ করে। তার কাছে অনবরত জানতে থাকবে, খ্রীস্ট ধর্মের বিরুদ্ধে তার প্রোগ্রাম কি। এতে পরিবর্তন আসছে কি-না? যদি আমাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ দেখ তৎক্ষণাৎ আমাদের অবহিত করো।

হাশেমের এই কথায় যুবতীর আত্মিক প্রশান্তি আসে। রহস্যভেদী তার যে স্বামীর চোখ ভূগর্ভের ষড়যন্ত্রও উদ্ধার করতে পারত, প্রেমের আড়ালে তার স্ত্রী যে ইসলাম উ স্থাতের ষড়যন্ত্র করছে, ঘূর্ণাক্ষরেও তা জানতে পারল না।

***

ফ্লোরা ভূমিষ্ঠ হলো। বাবার রাখা নাম সম্পর্কে ইতিহাস নিশুপ। ফ্লোরার একটু বুঝসুঝ হলে মা তাকে শিক্ষা দিলেন, সত্য চিরন্তন ধর্ম সেতো খ্রীস্টান ধর্ম। ইসলাম কোনো ধর্মই নয়। ফ্লোরার বয়স এক বছর হলে তার একটি ভাই জন্ম নেয়। বছর দুয়েক পরে ওদের আরেকটি বোন হয়। ভায়ের নাম বদর। সে তার বাবার মত হয়। মার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকত ফ্লোরার ওপর।

১৩/১৪ বছর বয়সে ইসলামের প্রতি ফ্লোরার ঘৃণা এত চরমে পৌঁছে যে, সে তার বাবাকে বাবা ও ভাইকে ভাই ডাকা পর্যন্ত ছেড়ে দেয়। মা তাকে মজলুম খ্রীস্টানদের কাহিনী শোনাতেন, মুসলমানদের তিনি জালিম হিসেবে চিহ্নিত করতেন। মেয়েকে সে সব স্বপ্নের কথাও শোনাতেন যেগুলো তিনি বিয়ের প্রথম দিকে দেখে থাকতেন। ফ্লোরাকে কখনও বাইরে যেতে দিনে না। ও কোনো তথ্য ফাঁস করে দেয় কি-না ভয় কেবল এটাই। আশপাশের লোকেরা অকে মুসলিম ঘরানার সন্তান বলেই মনে করত।

সেই ফ্লোরার বয়স যখন ১৮ তখন বেলকনিতে দাঁড়িয়ে স্পেন শাসক আবদুর রহমানের বিজয় কাফেলা অবলোকন করছিল। তার চেহারা ক্রমশ কুঁচকে যাচ্ছিল ঘৃণায়। মা তাকে বললেন, ফৌজের চলার পথে ফুল ছিটিয়ে দাও, হ্যান্ডশেক করো। তোমার বারা নীচে কোথাও আছেন। তিনি এ.অবজ্ঞার কথা জানলে কিয়ামত কায়েম, করবেন। ফোরা মায়ের কথায় ক্ষেপে গিয়ে বলল, আমি কি ঐ দুশমন জাতির চলার পথে ফুল ছিটাব যারা মাদ্রিদের অলিগলিতে খ্রীস্টানদের রক্তে প্লাবিত করেছে? মা তাকে বললেন, রাগ সংবরণ করো মা! কিন্তু নিজের হাতে যে আগুন তিনি জ্বেলেছেন, তা নেভার নয়। যে ঘৃণা হৃদয়ে তিনি পয়দা করেছেন তা কভু মিটে যাবার নয়।

মা ফ্লোরা জানালার কপাট বন্ধ করে বলল, আমি এখন আর এ ঘরে থাকতে পারি না।

আরে বেকুফ নাকি! কোথায় যাবে তুমি?

কোনো গীর্জায় আশ্রয় নেব। যদি থাকি এখানে.তাহলে বাবা-ভাইকে হত্যা করেই।

মেয়ের মুখে সজোরে চপেটাঘাত করে মা বললেন, বাবা-ভাইকে হত্যা করার জন্যই কি তোকে আমি খ্রীস্ট শিখিয়েছি?

হ্যাঁ হ্যাঁ, ফ্লোরা চিৎকার দিয়ে বলল, এই শিক্ষাই তুমি আমার দিয়েছ যে, মুসলিম জাতি হিংস্র, বর্বর। ওরা খ্রীস্টের দুশমন।

মায়ের চোখে পানি এসে গেল। নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত অনুভব হলো তার। তিনি মেয়েকে মেহার্ভ কণ্ঠে বললেন, খ্রীস্টান ছেলের সাথে বিবাহ দেয়ার জন্যই তোমাকে খ্রীস্টত্ব শিক্ষা দিয়েছি। আমার রক্তের একটা ধারাকে খ্রীষ্টত্বের সাথে মিলাতেই তোমাকে খ্রন বানিয়েছি। আর তুমি কি-মা তোমার বাবাকে আমায় তালাক দেয়ার পথ সুগম করছে।

আমি খ্রীস্টান মা! শুধুই খ্রীস্টান। এটা মুসলমানদের ঘর। এ ঘরের প্রতি আমার প্রচণ্ড ক্ষোভ ও ঘৃণা। কামরায় একটি বজ্রকণ্ঠ শোনা গেল, কি কি বললে তুমি? তুমি খ্রীস্টান?

মা-মেয়ে চকিতে দরজার দিকে তাকাল। এখানে ফ্লোরার ভাই বদরকে দেখা গেল ওরা জানতে পারেনি বদর ছাদে উঠেছিল। সেখান থেকে নামার পথে এই কথা তার কানে যায়। ওর বয়স ১৭। এ বয়সে তাকে হ্যান্ডসাম হিরো মনে হয়। মা-বোন উভয়ের মাঝে এসে দাঁড়ায় সে।

ও অন্য কারো কথা বলছিল বেটা! শোন বলছি তোমাকে………..

তুমি নও আমিই বলছি ওকে। ফ্লোরা বলল, তুমি মিথ্যা বলবে না। অতঃপর সে ভাইকে লক্ষ্য করে বলল, সত্যিই আমি খ্রীস্টান। আমার স্বধর্মের লোকদের হত্যাকারীদের আমি ধর্ম গ্রহণ করতে পারি না। ফ্লোরা ইসলামের বিরুদ্ধে বড় মানহানির কথা বলল।

বদর অগ্রসর হয়ে বোনকে এত জোরে থাপ্পড় মারল যে, টাল সামলাতে না পেরে সে দেয়ালে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। সে অন্যান্য মেয়েদের মতই ক্রন্দন না করে হন হন করে অন্য কামরায় চলে গেল। ওপাশের কামরায় একটি তলোয়ারও দুটি বর্শ। বদর তার পিছু নিল। ফ্লোরা খাপ থেকে তলোয়ার বের করছিল, বদর গিয়ে ওর হাত থেকে তলোয়ার ছিনিয়ে নিল। চড়, কিল ও ঘুষি দিয়ে তাকে পালংক থেকে নীচে ফেলে দিল। মা ও ফ্লোরার ছোট বোন বদরের রাগ সংবরণ করতে ব্যর্থ হলো। ফ্লোরা আধাবেশ। মা ওকে জড়িয়ে ধরলেন।

***

বদর মাকে সাথে নিয়ে বেরোল এবং দরজায় ছিটকিনি বাইরে থেকে লাগিয়ে দিল। মাকে বলল,

মা ওর মনে খ্রীস্টত্বের প্রতি এত গভীর আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে কে? নিশ্চয় তুমি জানো। মা তার সন্তানের মনের খবর জেনে থাকেন। এবার সে বোনকে বললো, তুই জানিস কিছু?

বোন অজ্ঞতা প্রকাশ করল। মা-ও একই কথা জানালেন। বদর বলল, আমার বাবাকে এ অজ্ঞতা জানিয়ে আশ্বস্ত করতে পারবে কি? ওর সাথে কোনো না কোনো খ্রীষ্টানের সাথে অতি অবশ্যই যোগাযোগ আছে।.ওর সাথে কোনো মুসলমানের সাথে সম্পর্ক হলে সে অবশ্যই খ্রীস্টন হত্যা নয়- জেহাদ বলে বোঝাত। মুসলমানরা এটাকে ধর্মযুদ্ধ মনে করে। মাড্রিঙ্গ কি হয়েছিল? তুমি তাকে পৈত্রিক প্রদেশ কতলুয়ানার কাহিনী শুনিয়েছে।.ওখানে লড়াই শুরু করেছিল কে? এর পূর্বে টলেডোয় কি হয়েছিল? আমর মুসলমান মা! ইসলাম প্রচার-প্রসার আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। মুসলমানদের কোরআন কাফেরদের ফেত্না মূলোপাটন করতে বলে, যতক্ষণ না ফেনা নির্মূল না হয়।

ক্রন্দন ছাড়া মা আর কোন জবাব দিলেন না।

বাবা আগামীকাল আসছেন। তিনি আসার আগ পর্যন্ত ওকে ওই ঘর থেকে বেরোতে দিও না।

গভীর রাত।

ফ্লোরার চোখে ঘুম নেই।

সন্ধ্যার দিকে ওর ছোট বোন খাবার নিয়ে এসেছিল, কিন্তু সে বলল, এ ঘরের পানি পানও আমার জন্য হারাম। শেষ পর্যন্ত মা এলেন। ফ্লোরা পূর্ববৎ বেঁকে বসল। গভীর রাতে ফ্লোরা পালংক থেকে নামল। বদ্ধ দরজায় লাগাল কান। ওপাশের কামরার তিনটি প্রাণী ঘুমের ঘোরে। কোথাও কোন সাড়াশব্দ নেই। জানালার ছিটকিনি খোলে সে। এখান থেকে নীচের দিকে তাকায়। লাফ দিয়ে নামা সম্ভব নয়। ফ্লোরার মৃত্যুভয় নেই। মুসলমানদের রক্তে হোলিখেলার প্রতিজ্ঞা নিয়ে ফেলেছে সে। ইতোমধ্যে জানালা পথে বেরিয়ে লঘুপায়ে পাশের বাড়ীর ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করে। এক সময় বহু সতর্কতার সাথে সে ওপাশের বাড়ীর ছাদে পৌঁছায়। এবার ওই ছাদ থেকে কি করে নামা যায় চিন্তা কেবল সেটাই। ছাদ থেকে উঠানের দিকে তাকায়। চোখে ভেসে ওঠে কাঠের একটা সিঁড়ি। এ বাড়ীর বাসিন্দাদের ফ্লোরা চেনে। জনৈক বৃদ্ধের এক জোয়ান বেটা ও তার স্ত্রী থাকে। ঘর থেকে পালানোর সময় সে লম্বা একটা হোরা নিয়ে এসেছিল এতদসত্ত্বেও জোয়ান পুরুষের সাথে লড়াই করার শক্তি কৈ তার। মনে মনে ভয় পায় সে।

এ ভয় এক সময় বাস্তবে রূপ নিল। জোয়ান লোকটা ছাদে কারো পায়ের আওয়াজ শুনে উঠানে এলো। ছাদের দিকে গভীর নযরে তাকিয়ে দেখল কোনো মহিলা বিচরণ করছে। এক সময় সে তরতর করে সিঁড়িতে ওঠে। ফ্লোরা এবার গ্যাড়াকলে পড়ে গেল। পালানোর কোনো পথ নেই।

আচমকা একটি দুষ্ট বুদ্ধি তার মনে চেপে বসল। প্রেম অভিনয় এ মুহূর্তে বাঁচার একমাত্র মাধ্যম। লঘু পায়ে ফ্লোরা সিঁড়ি মুখে এগিয়ে গেল। যুবকটা সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। হাঁটু চৌকাঠে রেখে ঝুঁকে ঠোঁটে হাত রেখে সে বলল, জোরে কথা বলো না। আমি ফ্লোরা।

ফ্লোরা? যুবক হতকিত হয়ে গেছে, তুমি এখানে?

ওপরে এসো বেকুফা চুপ থাকো।

আত্মসৌন্দর্যে বিমুখ ছিল ফ্লোরা। জোয়ানকে মায়াজালে আটকাতে তার সময় লাগল না। যুবকটির দিকে সে বড় চোখ করে তাকাতে লাগল। ফ্লোরার দৃষ্টি বলছিল, সে ক্ষুধার্ত, কোন যুবক যা মেটাতে পারে। গভীর এই নিশুতি রাতে তার আচমকা আবির্ভাব যুবকের জন্য অলৌকিকই বটে।

যুবক সম্বিত ফিরে পেয়ে বলল, তুমি এখানে কেন?

তোমার সাথে মিলন আছে। বলে সে যুবকের হাতে দুঠোঁট নামিয়ে দিল। আবেগাতিশয্যে বলল, হৃদয়ে এতদিন জগদ্দল পাথর চেপে বসে ছিলাম, শত প্রবোধ সত্ত্বেও মনকে বুঝতে পারলাম না। এইমাত্র স্বপ্নে দেখছিলাম তোমায়। চোখ খুলে গেলাম ঘাবড়ে। জানিনা কি সেই আকর্ষণ যা আমাকে এখানে ডেকে এনেছে। এসো কাছে এসো প্রিয়।

ফ্লোরা ভরন্ত যৌবনা। পিনোন্নত বক্ষ যুব সমাজকে হাতছানি দেয়। পুরুষ তাতে পুড়ে মরতে বাধ্য। ফ্লোরাকে সে বুক চেপে ধরল। ফুসফুস থেকে তার শ্বাস বের করে নিতে চায় যেন। ফ্লোরা যুবকের দেহে মিশে যায়। তার দীঘল কালো চুল যুবকের মুখে জড়িয়ে যায়। ফ্লোরা বলল, চলো বাইরে যাই! বাড়ীর কেউ জেগে গেলে বিপদ।

উভয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল শিকারী বিড়ালের মত লঘুপায়ে।

*

যুবক নেহায়েত সতর্কতা অবলম্বনপূর্বক দরজা খুলল। তার বুড়ো বাবা ও যুবতী স্ত্রী টের পেল না। সে আগে চুলল, ফ্লোরা পেছনে। তার বাড়ী থেকে দূরে এসে দাঁড়াল। এই এলাকাটি অনাবাদী।

কোথায় যাবে? ফ্লোরাকে প্রশ্ন করল।

ও দিক।

সেদিক তারা চলতে লাগল। ফ্লোরা তার অজান্তে ছোরা বের করল। আগ বাড়িয়ে তার কাঁধে হাত রাখল। যুবক পেছনে ফিরতেই তার বুকে ছোরাটা আমূল ঢুকিয়ে দিল। ছোরাটা একটা ঢুকে গেল যে, ওটা বের করতে তাকে বেশ কষ্ট করতে হল। যুবক সামান্য আওয়াজ করারও সুযোগ পেল না। ফ্লোরার দিকে একবার বড় চোখ করে তাকিয়ে সে মুখ থুবড়ে পড়ল এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।

আমি তোমাকে ঘৃণা করি ………ঘৃণা ………. শুধু ঘৃণা। মুবকের রক্ত জামায় মুছে হন হন করে ছুটতে লাগল।

***

গভীর রাতে ও স্পেন শাসক মহলে এসে পৌঁছাল। এদিকে তখন মহলে আলোকসজ্জা যা জমকালো রাতকে দিনে পরিণত করছিল। সর্বাগ্রে তিনচারজন কবি আবদুর রহমানের শানে চাটুকারিতামূলক কাব্যচর্চা করছিল। তাদের জমজমাট কাব্যে স্পেন শাসক দিগ্বিজয়ী বিশ্ব বিজেতা হিসেবে চিহ্নিত। তার তলোয়ারকে শেরে খোদার তলোয়ারের সাথে তুলনা কলেন। তাদের কাব্যের ভাষ্যে আবদুর রহমান ইহুদী নাসারাদের জন্য যমদূত। তার সামনে মাথা ওঠালে সে মাথা আর আস্ত থাকে না। তুমি মূর্তি হলে আমরা তোমাকে পূজা করতাম।

পরে সারিবদ্ধ খোশামোদীরা তাকে তোহফা পেশ করতে লাগল। দিতে লাগল চুমো, এ থেকে তার জুতোও বাদ যায় না। এরপর অর্ধনগ্ন নৃত্যশিল্পী নেচে গেয়ে তার মনোরঞ্জন করতে চেষ্টা করে। এদের সংগীত পরিচালক যিরাব।

আবদুর রহমানের ডান পার্শ্বে সুলতানা আর বামপার্থে মোদাচ্ছেরা। অন্যান্য বিবি ও বাদীরা পেছনে। বিজয়োৎসবের এই আসরে সমস্ত মালার স্বয়ং উপস্থিত। তারা শাসককে দেখছিলেন। তাদের ধারণা, এ আরেক আবদুর রহমান।

এ লোককে আমরা অভিযানে ব্যস্ত রাখতে চাই। বললেন আবদুর রউফ সালারদের।

তার কাছে জৌলুস ও ইন্দ্রীয়পরায়ণতার এত উপকরণ ভালো নয়।

উবায়দুল্লাহ বললেন,

চাটুকার কবির্গ শব্দের জাদুতে তাকে মোহিত করে চলেছে এবং ইসলামের শেকড় কাটছে। আমাদের দুশমন আড়মোড়া দিয়ে জাগছে। এগুলো বিষ, যা তিনি গিলে চলেছেন।

আমার যদ্দুর ধারণা, টলেডোর খ্রীস্টানরা জেগে উঠবে।

মূসা বললেন, বিদ্রোহের এই পরম্পরা উৎখাত করে যাব আমরা।

পন্থা এর একটাই- ফ্রান্সে হামলা, সম্রাট লুই এর-মস্তকচুর্ণ। এই লোক স্পেনের খ্রীস্টানদের মদদ দিয়ে চলেছে। সে স্পেনকে খণ্ডবিখণ্ড করতে চায়। বিদ্রোহীদের এক স্থানে কচুকাটা করলে অপরস্থানে ওরা মাথা তুলে দাঁড়ায়।

***

যখন স্পেন শাসক নৃত্য শিল্পীদের যৌন উন্মাতাল দেহের ভাজে ডুবে ছিলেন, যখন তার ভেতরের পৌরুষত্ব খাবি খাচ্ছিল তখন হাশেম কর্মকারের দরজায় করাঘাত পড়ল।. হাশেমের দেহে এক্ষণে আর সেই দম নেই, ফ্লোরার মা প্রথমদিকে আসায় যা ছিল। তখন ফ্লোরা তার মায়ের পেটে। ১৮ বছর পেরিয়ে গেছে। এক্ষণে তার চেহারায় যৌবনের ইতিহাস। ৫৫/৬০-এর মাঝামাঝি বয়স ছিল, দিল-দেমাগ অবশ্যই আগের চেয়েও তুখোড়। তার গুপ্ত দলের শেকড় বেশ বিস্তার লাভ করছে। মাদ্রিদের বিদ্রোহ দমন করা হলে তিনি অন্য কোথাও বিদ্রোহ করার পাঁয়তারা করছিলেন। তার এবারের দৃষ্টি টলেডো।

দরজায় করাঘত হলে তিনি চমকে ওঠেন। ড্রয়ারে লুকানো ছোরা নিয়ে বের হন এবং দরজা খোলেন। জনৈক তরুণীকে দেখে তার আক্কেল গুম।

আমি ফ্লোরা। বলে ফ্লোরা ফওরান ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, জনৈক মুসলিম প্রতিবেশীকে হ্যাঁ করে এসেছি। এসেছি বাড়ী থেকে পালিয়ে। বলো এখন কি করব? হাশেমকে সে পুরো ঘটনা জানিয়ে গেল।

ফ্লোরা ইতিপূর্বে বেশ কবারহাশেমের কাছে এসেছে। হাশেমও তাকে ইসলামের বিরুদ্ধে উকে দিয়েছে। প্রেম নিয়ে তার কোনো উচ্চাভিলাস নেই। তার প্রেম খ্রীস্টরে মাঝে, এর জন্যে সে পাগলপারা।

হাশেম বলল, আমি তোমাকে আমার কাছে রাখব না। সকাল হতেই এখানে লোকজনের আনাগোনা শুরু হবে। তোমাকে জনৈক পাদ্রীর কাছে নিয়ে যাব।

পীর দরজায় করাঘাত পড়তে তিনিও চমকে ওঠেন। কে আসতে পারে এখন? মাদ্রিদ বিদ্রোহে পত্রী-গ্রেফতারের হিড়িক পড়লে এদের সকলে ভয়ার্ত ছিলেন। কিন্তু দরজা খুললে প্রাণে পানি এলো। দেখলেন জনৈক সুন্দর যুবক ও বৃদ্ধ একলোক। যুবক ভেতরে ঢুকে আচকান ও ছদ্মবেশ খুলে ফেলল। হাশেম বলল,

ও ফ্লোরা। ওর সম্পর্কেই আপনাকে ইতিপূর্বে অবহিত করেছি। ওর মা আপনার সাথে বেশ কবার সাক্ষাৎ করেছেন। মেয়েটা আজ ঘর থেকে পালিয়ে এসেছে। হাশেম পুরো ঘটনা তাকে শুনিয়ে গেলেন।

বৃদ্ধ পাদ্রী ফ্লোরার রূপে মুগ্ধ হয়ে গেলেন।

তুমি খুবই সুন্দরী ফ্লোরা। স্পেন শাসকদের শেষ করতে তোমার এ রূপ কাজে লাগবে। তুমি সালারদের মাঝে দ্বন্দ্ব লাগাতে পার। তোমার এক চিলতে মুচকি হাসি মুসলিম সালারদের রণাঙ্গনে আমাদের কয়েদী বানাতে পারে। বর্তমান স্পেন শাসক তোমার মতো তাক লাগানো সুন্দরী পেলে হৃদয় থেকে স্পেনকে মুছে দিতে পারে এটাই তার দুর্বলতম দিক। তুমি তাকে ও তার সালারদের মাঝে ঘৃণা সৃষ্টি করতে পার, কিন্তু এর জন্য তোমাকে……।

ইজ্জত খোয়াতে হবে এই তো। কিন্তু আমি আমার কুমারীত্ব খোয়াতে চাই না। কুমারী মরিয়মের দাসী আমি। জানি, মুসলিম শাসক, সালার, আমীর-উজিররা সুন্দরী নারী রক্ত-মাংসের ঘ্রাণ পেলে নিজ দায়িত্ব ভুলতে বসে। কিন্তু কোনো মুসলমানের ঘ্রাণ নিতে পারব না আমি।

আমাকে ভাবতে দাও ফ্লোরা। এখানে তুমি নিরাপদ থাকবে। নিজকে সংযত কর, আবেগ তাড়িতের পরিণাম ভাল হয় না। বলে পাদ্রী হাশেমকে জিজ্ঞেস করলেন, আর কোনো খবর,

পরিস্থিতি বিস্ফোরনোমুখ। আমি কর্মকার, আমি লোহা ঠাণ্ডা করা অপেক্ষা গরম করার পক্ষপাতী। লোহা কিভাবে গরম করতে হয় তা আমার জানা আছে। মাদি থেকে বহুলোক টলেডো পালিয়ে গেছে। আমার লোকজন ওখানে হাজির। ওরা নেতৃত্বে আমাকে চাইছে। ভাবছি কি করি।

ভেবো না হাশেম। পাদ্রী বললেন, প্রদেশটা তোমার। অতএব নেতৃত্বও তোমাকে নিতে হবে। জানি জঙ্গী নেতৃত্ব দেয়ার অভিজ্ঞতা নেই তোমার, কিন্তু তোমার বুদ্ধিমত্তা অজেয়-বিরল। লোকদের আবেগে তুমি ঘৃতাহুতি দিতে পার। এমন যোগ্যতা আর কারা মাকে দেখছি না আমি। তুমি না হয় একবার টলেডো ঘুরে এসো। ওখানে এলোগেইছ কিংবা ইলিয়ার কারো না কারো সাথে দেখা হবে।

কিছুক্ষণ আগে শুনতে পেয়েছি, আবদুর রহমান বিজয়োৎসবে গলা অবধি ডুবে গেছেন। সুলতানা আজ তাকে নয়া শরাব দিয়েছেন। স্পেন শাসক বিলাসিতার রসিক কিন্তু শরাব পান করেন না। আমি শুনেছি মোদাচ্ছে নারী তার এক স্ত্রী রয়েছে, সে তাকে মুঠোয় পুরেছে। সুলতান শবতের মধ্যে আজ পাব মিশ্রণ করে দেবে।

ওই শাসককে নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। মাথাব্যথা যত তার সালারদের নিয়ে। এসব সালারদের সামনে স্বর্ণবাপ ফেলতে হবে। ফ্লোরার মত নারীদের পেশ করতে হবে। তথাপিও দেখবেন ওরা পাথরের মূর্তি। ওরা বড্ড স্বাধীনচেতা। স্পেনের সিংহশাসক। স্বাধীনতাকে ঈমানের অংশ মনে করে।

কিন্তু এই সালারদের মাঝে ক্ষমতার লোভ পয়দা করতে পারলে দেখবে ওদের সেনাবল নষ্ট হয়ে যাবে। সালার ক্ষমতায় এলে বাদশাহ হয়ে যায়। এবং দুশমনকেও দোস্ত ভাবা শুরু করে। ফলে এদের কোনো ধর্ম থাকে না। কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তাদের নেতৃস্থানীয় লোকদের মাঝে ক্ষমতার বাসনা পয়দা করে দাও। ওরা একে অপরের রক্তলোলুপ হয়ে উঠবে। ফলে জাতি ক্ষুধার্ত থাকবে চারিত্রিক অবক্ষয় দেখা দেবে, প্রতাপে ভাটা পড়বে।

এদিকেও একটু খেয়াল করবেন। টলেডোর পরিস্থিতি উত্তপ্ত রাখতে হবে। এবার এ তরুণীকে সামলান। আমি যাচ্ছি। বলে হাশেম বেরিয়ে গেল।

***

ফ্লোরাও প্রতিবেশীর ঘরের সকলে বিমর্ষ, পেরেশান। ফ্লোরা নেই। নেই বৃদ্ধের জোয়ান পুত্রও। পুরুষ হওয়ায় বৃদ্ধ ভাবলেন তার ছেলে ফিরে আসবে। কিন্তু ফ্লোরা তো মেয়ে। সে বদ্ধঘরের জানালা পথে পালিয়েছে। সে পথে পালানো খুব সহজ নয়।

জোরার জোয়ান প্রতিবেশী বাড়ীতে এলো। জিন্দা নয়; মুর্দা হয়ে। লোকালয়ের উপকণ্ঠে ঘেরাবিষ্ক তাকে উদ্ধার করা হয়েছে। স্বপিন্ডে তার আঘাত। ফ্লোরা যে তার হতা, ও সন্দেহটুকু কারো হয়নি।

ফ্লোরার বাবা এলেন। বদর তাকে বোনের যাবতীয় কাহিনী ও খ্রীস্টান হবার কথা জানান। ফ্লোরার মাকে বাবা বললেন, ওর অন্তর্ধানে তোমার হাত রয়েছে অবশ্যই। তুমি মোয়াল্লেদ হয়েছে বলে আমার ধারণা। বিগত ২০ বছর ধরে আমাকে ধোঁকা দিয়ে আসছ।

না’ জোড় হাত করে স্ত্রী স্বামীর পদতলে লুটিয়ে পড়লেন, আমাকে অপবাদ দেবেন না। আমি আপনাকে ধোঁকা দেইনি। নিজ হাতে আমাকে হত্যা করুন তবুও আমার প্রেমের প্রতি সন্দিহান হবেন না। খুব সম্ভব খ্রীষ্টান মেয়েদের সাথে মিশে ওর এই দশা। ওরাই ওর দেমাগ খারাপ করে দিয়েছে। বদর ওর ওপর অমানুষিক অত্যাচার চালিয়েছে- পালাবার কারণ এও হতে পারে। পানিতে ডুবে মল কি-না কে জানে।

আমি ফ্লোরাকে দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি। আমার অপর দুসন্তানের চেয়েও কেমন যেন ভিন্ন ধাতুর। কখনও নামায় পড়তে দেখেনি। তিনি খানিক চিন্তা করে বললেন, আমি এক গোয়েন্দা। বুঝতে বাকী নেই, কোখা গেছে ও। সিংহশাবক

তিনি পুত্রকে সঙ্গে করে বেরিয়ে গেলেন। চাপলেন বাপ-বেটা পৃথক দুটি ঘোড়ায়। সাথে নিলেন জনাচারেক সৈনিক। গিয়ে উঠলেন একটি গীর্জায়। ওখানকার পাত্রীকে বললেন, রাতে জনৈকা তরুণী তোমার এখানে এসেছে। তাকে তাড়াতাড়ি বের করে দাও।

আপনি গীর্জা ও আমার বসত-বাড়ী তল্লাশি করে দেখতে পারেন। পাদ্রী অনুনয় করে বললেন,

তরুণীর সাথে আমার সম্পর্ক কিসের?

সৈনিকরা এই পাদ্রীকে গ্রেফতার করল। গেল আরেকটি গীর্জায়। এই গীর্জায় পাদ্রীও পূর্বের পাদ্রীর মত অজ্ঞতা প্রকাশ করলেন।

আমরা জানি গীর্জাগুলো আজকাল যড়যন্ত্রের আখড়ায় পরিণত। ফ্লোরার বাবা বললেন, একে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে চলো।

সৈনিকরা তাকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে চলল। প্রথম পাদ্রীও এদের সাথে। এদের ওপর অত্যাচার শুরু করলে আচমকা একটি নারীকণ্ঠ সকলকে হতবাক করে দিল, আমার ধর্মগুরুদের ছেড়ে দাও। আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলো।

কণ্ঠটি ফ্লোরার। সে বলে চলেছে, আমি তাদের অপমান সইতে পারি না। তাই স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছি।

বদর তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মেরে আধামরা করে ফেলল, কিন্তু সে কাঁদল না, চিৎকার দিল না, কাউকে সাহায্যও করতে বলল না। বলছিল, আমি খ্রীস্টান। কুমারী মরিয়মের দাসী। এমন কি ইসলামের নামে যাচ্ছেতাই গাল দিল।

থামো। সৈনিক বলল, ধর্ম ব্যক্তিগত ব্যাপার এজন্য তাকে শাস্তি দেয়া যায় না। তবে ইসলামের অপমান অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দেশের প্রচলিত আইনে তার সাজা হবে। তাকে আদালতে ওঠাব আমরা।

আদালতে ওঠানো হলে ফ্লোরা ইসলামের নামে আপত্তিকর অশ্লীল মন্তব্য করল। বিজ্ঞ কাজী বললেন, তুমি মৃত্যুদণ্ডের যোগ্য। সুন্দরী বলে তোমায় ছেড়ে দিয়ে আরেক ফেনার আশংকা রয়েছে।

বাবার, হৃদয়ে এবার সন্তানের প্রেম উথল উঠল। আর যাই হোক ফ্লোরা তার মেয়েতো। তিনি ঠিক আদালতের সামনে আর্জি পেশ করলেন, আদালত যদি তার ক্ষমা মঞ্জুর করে তাহলে আমি ওর জামিন নিতে পারি। ও আমার কলজের টুকরা। সঠিক রাস্তায় আনতে পারব বলে আমার বিশ্বাস।

আদালত এই আর্জি কবুল করছে। কিন্তু এক বছরের মত তাকে ঘরে নজরবন্দী করে রাখত্বে যুব। সেখানে থাকবে নারী-প্রহরা যারা তাকে দীক্ষা দেবে।

ফ্লোরাকে একটি ঘরে আটকে রাখা হলো। দেয়া হলো তার প্রহরা হিসেবে সুশিক্ষিতা তিন নারীকে। ফ্লোরা নির্লিপ্ত হয়ে গেল। সে কেবল জছে, পালানোর উপায়।

২.৩ জিদ্দী

ফ্লোরাকে তার বাবা খুব ভালবাসতেন। কলজের টুকরার প্রতি স্নেহ থাকাটাই স্বাভাবিক। তার মেয়ের মতো মেয়ে লাখে একটা। কিন্তু ফ্লোরা তার বাবার প্রতি তেমন ভালবাসা প্রদর্শন করেনি কোনোদিনও। ফ্লোরার সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ বাবা তার স্ত্রীকে বলতেন, দেখে নিও তোমার মেয়েটা খুবই লাজুক হবে-আমার সাথে কথা বলতে পর্যন্ত লজ্জা পায়। কিন্তু এই নিরীহ বাবা কোনদিন জানতে পারেন নি মেয়ের নির্লিপ্ততার কারণ। জানতে পারেননি নেপথ্যে তার খ্রীস্টত্বের তালিমের কথা।

কাজীর বিচার শুনে বাবার কলিজায় তীরাঘাত হয়। তার শোক তিনি একে অধিক স্নেহ করতেন দ্বিতীয়ত সেই মেয়েই আবার মুসলিম বিদ্বেষী। নজরকাড়া কালনাগিনী তার ঘরেই কি-না পেলে-পুষে বড়।

কাজীর নির্দেশমত তিনজন ধার্মিক মুসলিম মহিলাকে নিয়োগ দেয়া হলো। ফ্লোরার বাবা লিখিত দস্তাবেজে সই দেন।

তিনি রাজী হলেন। মেয়ের এই পরিণতির ধকল সইতে না পেরে তিনি শয্যাশায়ী হন। শয্যা থেকে আর তার ওঠা হলো না। একদিন মারা গেলেন। ফ্লোরার ভাই বদর রাগে শোকে অগ্নিশিখা হয়ে বোনের কাছে এসে বলে,

বাবা তোর শোকে মারা গেছেন।

শোকে আরো মানুষও মারা যায়। তিনি আমার বাবা– এ মুহূর্তের আফসোস কেবল এতটুকু, কিন্তু তিনি মুসলমান মনে পড়লে আমার এই আফসোস তিরোহিত হয়ে যায়।

এর মানে এই যে, তুমি সঠিক পথে আসছো না?

আমি সঠিক পথেই আছি। তোমরা এক বছর অপেক্ষা করো না। এক বছর পর আমার জিবে এ কথাই শুনবে। কাজীকে বলো, আমাকে জল্লাদের কাছে সোপর্দ করতে। আমার পয়গম্বর ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন আর আমি ফাঁসিকাষ্ঠে মরব। সত্য পথে থেকে সবার জন্য আমি তাকিয়ে আছি অধীর আগ্রহে।

তুমি জীবিত থাকবে ফ্লোরা মৃত্যুর দেখা পাবে না সহসাই। বাকী জীবন তোমাকে শ্ৰী ঘরেই কাটাতে হবে। জীবন্ত জাহান্নামে থাকবে। আমি তোমার ভাই। তাই শেষ করলাম আমার আখেরী দায়িত্ব। আমি বলতে চাই, বাতিলের ওপর থাকলে দুনিয়া-আখেরাতে শাস্তি পেতে থাকবে।

দুনিয়ার শাস্তি আমাকে আখেরাতের শান্তি থেকে বাঁচাবে। বলে ফ্লোরা পাহারাদার মহিলাদের দিকে তাকিয়ে বললো, তোমাদের কি বলা হয়নি, এ ঘরে কোনো পুরুষ প্রবেশ করতে পারবে না? এ লোক কি করে ঢুকল?

উনি তোমার ভাই বলে আমরা বাধা দেইনি। জনৈকা মহিলা বললেন।

আমার কাছে ও অপরিচিত। কোনো মুসলমান আমার ভাই হতে পারে না। বের করে দাও ওকে এ ঘর থেকে।

বদর বোনের নিষ্ঠুর কথায় আহত হয়ে বেরিয়ে পড়ল।

***

মা! বদর মাকে বলল, আমার যা ধারণা, তুমিই ফ্লোরার দেমাগ খারাপ করেছ। বাবা বলেছেন, তুমি তার সাথে প্রতারণা করেছ।

শোনো বাবা! তোমার বাবাকে ধোকা দেইনি কোন দিনও। আমার কোনো আশ্রয় ও ঠিকানা ছিল না। তোমার বাবা আমার দুর্দিনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমি তার সহধর্মিনী হলাম। একদিকে তার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা অন্যদিকে আমার ধর্মের টান একসাথে দুটি ভালবাসাই আমি মনে পুষেছি। সেই ভালোবাসার অর্ধেকটা ফ্লোরাকে দিয়ে এসেছি আশৈশব। ধর্মশিক্ষা সেই ভালবাসার প্রতীক। এক্ষণে তোমার বাবা নেই। কাজেই এ ঘরের প্রতি আমার আর আকর্ষণ নেই। আমি তোমার ছোট বোনকে সাথে নিয়ে ঘর ছাড়ছি।

কোনো মা কি তার সন্তানকে ছেড়ে যেতে পারেন যেভাবে যাচ্ছ তুমি? তোমার মমতা ও আবেগ মারা গেছে কি?

আমার সাথে যেতে চাইলে তুমি আমার ধর্মে এসে যাও। ধর্মের কারণে আমি আমার পুত্রকে কোরবান করতে প্রস্তুত।

আর আমিও ধর্মের কারণে আমার মা-বোনদের উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। চলে যাও ভোমরা। আমার ঘরে কাল নাগিনীদের ঠাঁই নেই। তোমাদের মুখ-দর্শনও করতে চাই না। বলে বাইরে চলে গেল। সন্ধ্যার পর সে ফিরে এলো। দেখল তার মা-বোন ঘরে ছেড়ে চিরদিনের তরে চলে গেছে।

অন্তরীণ অবস্থায় খামোশ ছিল ফ্লোরা, এতে প্রহরী তিন মহিলা বেশ স্বস্তি অনুভব করছিল। কোনো প্রকার জ্বালাতন না করাই তাদের স্বস্তির কারণ। ও বড় খেয়ালী, পাগল ও জেদী মেয়ে বলেই তাদের কাছে দেয়া হয়েছিল।

এক নারী তাকে জিজ্ঞেস করছিল, তোমার অপরাধ কি মা?।

আমার বাবা এক আইবুড়োর কাছে বিয়ে দিতে চেয়েছিল আমাকে। লোকটা কেবল বুড়ো নয় মদ্যপও। সে আমার বাবাকে সওদা করেছিল। আমি বেঁকে বসলাম। এ ধরনের বুড়োকে পতি করতে কি তোমরা? বেঁকে বসার দরুন আমার এই ভাই আমাকে বেদম মারপিট করেছিল। বাবার মারও কি কম খেয়েছি। আমি উভয়কে গালিগালাজ করেছি। বাবা আমাকে ধরে কাজী সাহেবের কাছে নিয়ে যান। বলেন, ও আমার বেটি। ধর্মের অবমাননা করেছে। রাগে আমি নিজকে হারিয়ে ফেলি। বলল, এ অবস্থায় তোমাদের কি গো আসত না? মহিলা হলে তার গোস্বা আসার কথা। গোর দরুন কাজী ও বাবা দুজনকেই গালমন্দ করি। কাজী সাহেব ফায়সালা করেন, মেয়েটা বেজায় মুখরা। কয়েদখানায় না পাঠিয়ে তাকে গৃহে অন্তরীণ করে রাখা হোক এবং তাকে সৎ-অসৎ শেখানো হোক।

তোমার বাবা মারা গিয়েছেন। তোমার ভাই এসেছিল কেন?

ওই আইবুড়োকে বিয়ের চাপ দিতে। ভাই আমাকে লোভ দিয়ে বলেছিল বিয়েতে রাজী হলে জলদি মুক্তির ব্যবস্থা করবে।

চীফ জাস্টিস কি তার রায় ফিরিয়ে নেবেন? কেন, তোমাকে তো ইসলাম অবমাননার দায়ে বন্দী করা হয়েছে বলল আরেক মহিলা।

ফ্লোরা সুযোগ বুঝে চীফ জাস্টিসের নিন্দাবাদ করে বলল, তোমরা এসব বিচারপতিকে ফেরেশতা জ্ঞান কর। কাজী সাহেব আমাকে যে দৃষ্টিতে দেখেছিলেন, নারীরা প্রথম নযরেই তা বুঝে ফেলে। কাজীর ওই দৃষ্টির জবাব যথাযথভাবে আমি দিলে বাবার এই পরিণতি হত না এবং বন্দীও হতাম না। কাজী ও স্পেন আমীরগণ পর্দার অভ্যন্তরে নারী আর শরাবে ডুবে থাকবে, শান্তি আমার ভাগে আর সুফল ভোগ করবেন তারা।

সুন্দরী নারীর সৌন্দর্য-ই তার বড় অপরাধ। যৌবনই তোমার প্রধান অপরাধ। নজরকাড়া সৌন্দর্যও। স্পেন শাসক তোমাকে দেখামাত্রই তার হেরেমে নিয়ে নেবেন।

ওদিন হবে আমাদের জীবনের শেষ দিন।

এক্ষণে তোমার চিন্তা কি? কয়েদখানা থেকে বেরিয়ে কোথায় যাবে?

তোমাদেরকে বলতে চাই। আমি পলায়ন করব না। দেব না ধোকা। এতে শাস্তি পাবে তোমরা। নারী নারীকে ধোঁকা দেয় না। দিতে পারে না। তোমরা কিছুক্ষণের জন্য চলে গেলেও আমাকে এখানে পাবে। হ্যাঁ! আমি পালিয়ে গেলে যাব কোথায় তা পালানোর পরই ভেবে দেখব। সর্বান্ন তোমাদের তিনজনকে বলব, আমাকে তোমাদের আশ্রয় নিয়ে নাও।

***

প্রহরী তিন নারী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তারা ওকে চুপ চাপ দেখলেন। দেখলেন নিপ-নির্বিকার। সুতরাং ওরা যেমন একটা গা-ছাড়া ভাব দেখানো শুরু করলেন। ফ্লোরার খোদাপ্রদত্ত যাদুবলে আপনার মনগড়া অতীত কাহিনী শুনিয়ে সহানুভূতি পরায়ণ করে তুলেছিল।

পাঁচদিন পর পয়ত্রিশোর্ধ এক লোক এলেন। যৌবনপুষ্ট তার দেহ। মুখভর্তি দাড়ি। মাথায় পাগড়ী, চোখে ইলমের দূতি। চাল-চলন ও লেবাস-পোষাকে আলেম মনে হয়। হাতে দুটি কেতাব। তিনি দরজায় করাঘাত করলেন। প্রহরী দরজা খুলে দেয়। আলেম সাহেব সরকারী পরোয়ানা দেখান। ওতে লেখা, ইনি ফ্লোরাকে তালীম দেবেন এবং যথাযথ দীক্ষাও দেবেন।

তাকে ভেতরে ডেকে দরজা বন্ধ করে দেয়া হলো এবং ফ্লোরার সামনে নিয়ে যাওয়া হলো। ফ্লোরা তার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করলেন। তৎক্ষণাৎ তার চেহারায় ঘৃণার কালো রেখা ফুটে ফুটে ওঠল। এতদসত্ত্বেও সে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে অভিনন্দন জানাল। আলেম সাহেব বললেন, শুনেছি তুমি নাকি আল্লাহ ও তার রসূলের নাফরমানি করেছ। যাচ্ছেতাই বলে গাল দিয়েছ। তোমাকে এর শাস্তি দেয়া ঠিক হয়নি। এক্ষেত্রে মূল অপরাধী তোমার বাবা, পরে তোমার মা। বসো৷ মন থেকে বন্দীদশার বেদনা মুছে ফেল, খোদা তায়ালাকে বক্রদৃষ্টিতে দেখার বয়স তোমার। রূপের গর্বে তুমি অন্ধ হয়ে গেছ। ধর্ম তোমার কাছে তাই ঠেকেছে বিরক্তির এক অধ্যায় হিসেবে। বলো আমার এই সন্দেহ অমূলক কি-না?

না। ফ্লোরা মনের কথা গোপন রেখে বললো, এই প্রথম কোনো পুরুষের মুখোমুখি হলাম, যে আমার সৌন্দর্যের অনুভূতি প্রকাশ করল। নিজকে কখনও খেলাঘরের ছোট্ট শিশুটি মনে করতাম– যুবতী নয়। আপনার কি মনে হয় বাচ্চা নই কি এখন?

হা! তুমি অবুঝ এখনো। এজন্যই বলেছি। তোমাকে শাস্তি দেয়া ঠিক হয়নি। তোমার বয়স কম দেখে কাজী সাহেব প্রথম শাস্তি দিতে চাননি। যা হবার হয়ে গেছে। তোমার শিক্ষাদীক্ষার ভার আমাকে দেয়া হয়েছে। সর্বান্তঃকরণে তুমি ইসলামকে মেনে নেবে তো?

ফ্লোরা অবুঝ নয়-সেয়ানার হাড়ি। দেহের চেয়ে তার মনের পরিপক্কতা বেশী। এই পরিপক্কতাবলে সে প্রতিবেশী এক যুবককে কুপোকাত করেছিল। পুরুষদের মাত করার কৌশল রপ্ত ছিল তার। ফ্লেরাকে সেই যুবকই পলায়ন করার সুযোগ করে দিয়েছিল। যদিও বেচারার প্রাণ হরণ করেছিল এই ফ্লোরা। কিন্তু এতো এক আলেম। যার কথার প্রতিটি ছত্র দ্বারা ধর্মানুরাগ টপকে পড়ছে। ফ্লোরা তার চোখে চোখ রাখল। ঠোঁটে এমন এক মুচকি হাসি টানল যাতে আলেমের দেহে মৃদু কম্পন সৃষ্টি হল।

আমি ধর্ম গ্রহণ করব কি-না, তা নির্ভর করে এ কথার ওপর যে, প্রস্তাবকের গ্রহণযোগ্যতা কতখানি?

আলেম সাহেব এই অপ্রত্যাশিত কথায় চমকে উঠলেন।

ফ্লোরা বলল, আপনি দৈনিক আসলে গ্রহণ করতেও পারি। তবে শর্ত হচ্ছে, আমাকে নিরস ও কঠোর কথা বলতে পারবেন না। এ কথাও ভুলবেন না যে, আমি বন্দিনী। বিলকুল ওই বিহঙ্গের মত খাঁচায় আটকে যে আঁইটাই করে।

তুমি কি মুক্ত বিহঙ্গের মত উড়াল দিতে চাও।

না। মুচকি হাসতে চাই। ধর্ম যদি আমার আবেগকে মেরে ফেলে তাহলে খুব সম্ভব আমি আপনার শিক্ষার প্রতি অনুকূল সাড়া দিতে পারব না।

তুমি কি আমার সাথে হাসি-খেলা করতে চাও?

আপনি আমার জরুরত পূরণ করলে আপনার বাদী হয়ে যাব, আপনার শিক্ষা আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রতিফলিত হবে।

আলেম সাহেবের মুখ থেকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাসি বেরিয়ে এল, তুমি বড় বুদ্ধিমতী মেয়ে। আমি তোমার শৈশব ফিরিয়ে আনব। এক্ষণে এসো শেখানোর পালা শুরু করা থাক। এসো বসবে।

***

স্পেন শাসক দ্বিতীয় আবদুর রহমানের শাহী হেকিম ছিলেন হুররাণী। ঐতিহাসিক বর্ণনায় তার পূর্ণ নাম অনুপস্থিত। সিরিয়ায় তার বাড়ী। স্পেনের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হলে তিনি এখানে আসেন। কর্ডোভায় ডাক্তারী পড়েন। অল্পদিনেই তার খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বড়ি ও সালসা বানিয়ে তিনি স্পেনে অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেন। রাজপ্রাসাদে এ খবর পৌঁছলে তিনি শাহী হেকিমের পদ অলংকৃত করেন। ইতিহাস বলছে, তিনি আলেমও ছিলেন। কিন্তু আবদুর রহমান তাকে নিছক হেকিম হিসেবে মূল্যায়ন করেন তার জ্ঞান গরিমায় প্রভাবিত হননি কোন দিনও।

একবার তিনি বড় হতাশ ও পেরেশান অবস্থায় যিরাবের কাছে আসেন। বলেন, আমি শাহী হেকিম মুহতারাম যিরাব! রাসরি আলীজাহর কাছে যাওয়া দরকার, কিন্তু দরবারের ব্যাপার-স্যাপার আপনি ঠিক ততোটা ভালো জানেন, যতটা আমি জানি রোগ-ব্যামো বিষয়ে। আপনি আমায় সাহায্য করুন, আমি টেনশনে আছি; বললেন হেকিম হুররাণী।

হেকিম সাহেব টেনশনে থাকলে তো রোগীরা মরে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। বলুন। আপনার টেনশনটা কি?

সুলতানা আমাকে বলছেন, আমি যেন স্পেন শাসককে তার স্বাস্থ্য ক্রমশ যে দুর্বল হতে চলেছে তা বলে সতর্ক করি। তার উদ্দেশ্য, আবদুর রহমান যেন নতুন কোন অভিযানে না যান। শুধু কি তাই! তাকে যেন এমন এক রোগী বলে সাব্যস্ত করি যেন তিনি তাতে ভড়কে যান।

আপনি তাকে কি জবাব দিলেন।

সুলতানাকে বলেছি, আমার পেশা খুবই নিরপেক্ষ নিখাদ সেবাধর্মী ও পবিত্র। প্রাণঘাতী দুশমনকেও আমি ধোকা দিতে পারিনি, দেইনি কোন দিনও। আমি ওই রোগীদেরও সাথে মিথ্যা কথা বলতে পারি না, যারা আমার বন্ধু নয়। আর ইনি তো স্পেন শাসক। একেতো তার আনুগত্য আমার জিম্মায় ফরঅন্যদিকে আমি তার শাহী হেকিম। সুলতানাকে বলেছি, মাফ করবেন! আমার দ্বারা এ কাজ সম্ভব নয়। তিনি বললেন, যদি এটা গোনাহ হয়ে থাকে তাহলে এর মধ্যে ভালো দিকও আছে একটা। সেটা হচ্ছে, আমীরে স্পেন একজন অনন্য মানুষ। দুশমনের সামনে বুক উঁচিয়ে যুদ্ধ করে তিনি আহত হলে লাগাতার পরিশ্রম ও বিদ্রি রাত কাটাতে কাটাতে মারা যাবেন। স্পেনকে তার দরকার। তাঁর মত শাসক নেই আর। সুলতানকে বলেছি, যুদ্ধবিগ্রহ করতে হয়ত আমি তাকে সতর্ক করতে পারি। বলতে পারি, স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখবেন তথাপিও মিথ্যাচার আমার পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়।

আপনি কি আমীর সাহেবের কাছে সুলতানার বিরুদ্ধে অভিযোগ ঠুকতে চান?

আমার জিজ্ঞাসাও তাই আপনার কাছে। কথা এখানেই শেষ নয়। আমার প্রস্তাবে সুলতানা রেগে যান। তিনি আমাকে বললেন, মুহতারাম হেকিম। স্পেন-শাসক হেকিম আর কাউকে বানাতে পারেন। কিন্তু দ্বিতীয় সুলতানা কাউকে বানাতে পারবেন না। তার ওপর আমার যে প্রভাব তা কিন্তু আপনার নেই। একটি মাত্র ইশারায় আপনাকে তার কাছে বিতর্কিত করে তুলতে পারি। আমার কথামত আপনি আমল না করলে লোকেরা জানবে, প্রাসাদে হুররাণী নামী এক হেকিম ছিল। কাজেই যা বলছি তা করুন! করলে বহু এনাম পাবেন।

মুহতারাম যিরাব? আমীরের কাছে আমার মূল্যায়ন তেমন একটা নাই জানি, যতটা সুলতানার। হেকিম বহু আছে কিন্তু সুলতানা একজন। কাজেই তাকে আমি ক্ষ্যাপাতে চাইনা।

জনাব হুররাণী! সুলতানা যা বলছে তা আপনাকে করতে হবে। না করলে আপনার পরিণতির কথা আমি বলতে পারব না। শুধু কি তাই? তার কাছে আপনাকে বিতর্কিত করে তোলা হবে, আপনার চরিত্রে কালিমা লেপন করা হবে। শেষ পর্যন্ত এমন জেলে যেতে হবে যেখানে জীবন-মৃত্যু সমান। আমিও সুলতানার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলছি, যেভাবে আমীরে আঃ রহমান দ্বিতীয় কোনো সুলতানাকে পাবেন না সেভাবে স্পেনও কোন দ্বিতীয় আবদুর রহমানকে পাবে না। কাজেই স্পেনের ভবিষ্যৎ ভাবনায় বৃহত্তম স্বার্থে আপনাকে মিথ্যাচার করতেই হয়।

হুররাণী খামোশ হয়ে যান। শেষতক বলেন, আমার আরো কিছু বলার ছিল– কিন্তু বলব না। আমাকে তা-ই করতে হচ্ছে যা করা উচিত নয় আমার জন্য।

***

তিনি মিথ্যাচারে রাজী হতে চাইছিলেন না। সুলতানাকে যিরাব বললেন, আমি তাকে রাজী করিয়েছি।

খুব সম্ভব সে আসছে। সুলতানা বলল, আমি তাকে ডেকে পাঠিয়েছি। স্পেন সম্রাটকে বলেছি, আপনার চেহারা হলদে বর্ণ ধারণ করেছে, চোখের দ্যুতি নিষ্প্রভ হতে চলেছে। হেকিম আগমনের সংবাদটাও তাকে আগাম দিয়ে রেখেছি।

তোমার কতদিন বাকী? প্রশ্ন যিরাবের

এক মাসের কিছু কম। আমার আশা, ছেলে হবে এবং সে আবদুর রহমানের স্থলাভিষিক্ত হবে। আমার পুত্রকে ভাবী সম্রাট বানাব। এক্ষণে খ্রীস্টানদের সাহায্য দরকার। সাহায্য দরকার তোমারও।

ইতোমধ্যে জানা গেল হেকিম হুররাণী এসে গেছেন। সুলতানা ও যিরাব হররাণীকে তাদের কামরায় ডেকে আনলেন এবং আবদুর রহমানের কাছে যা বলা লাগবে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিলেন। ওই সময় মোদাচ্ছেরা আবদুর রহমানের কাছে বসলেন। আবদুর রহমান তার প্রতিও বেশ দুর্বল। মোদাচ্ছেরা তাকে ফ্লোরার বাহিনী শোনাতে লাগলেন। আবদুর রহমান বললেন,

এ ধরনের মেয়ের মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত।

আপনি কাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে চাচ্ছেন? ক্রুসেডাররা ষড়যন্ত্রজাল বিস্তার করে চলেছে। এই সমস্যা নিরসন আপনার নিজ হাতে করতে হবে। কমান্ডার মাঠে লড়বে, কিন্তু সিদ্ধান্ত দিতে হবে আপনাকেই। ফ্রান্সে অতি শীঘ্র হামলা করা দরকার। বিদ্রোহীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে এই দেশটি– বললেন মোদাচ্ছেরা।

আমার জঙ্গী প্রস্তুতি এতদুদ্দেশ্যেই।

আমি দেখেছি, যুদ্ধে নামলে আপনার সুস্থতা এসে যায়। এখানে পড়ে থাকা আপনার স্বাস্থ্যহীনতার কারণ বলে মনে করি। স্মিতহাস্যে বললেন মোদাচ্ছেরা।

সত্যিই একটা ভালো কথা বলেছে। আল্লাহর দুশমনরা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে আর আমি চুপচাপ বসে থাকব– তা হয় না। অভিযানে নেমে আমি প্রাণ দিতে চাই। দৌর্বল্যে আমার হাত কাঁপলেও তখন আমার হাতে তলোয়ার থাকবে। দেখবে ঘোড়ার পিঠে চাপতে।

মোদাচ্ছেরা সুন্দরী আকর্ষণীয়া যুবতী নারী। দেহসৌষ্ঠব, দীঘল কালো চুল, টানা টানা চোখ সর্বোপরি গোলাপ পাপড়ি সদৃশ তার প্রাণোচ্ছল হাসির প্রতি অগাধ আকর্ষণ ছিল আবদুর রহমানের। মোদাচ্ছেরা কেবল দৈহিক সুন্দরী নন, তিনি আত্মিক সৌন্দর্যেও আঃ রহমানকে মাত করেছিলেন।

তোমার ও সুলতানার মধ্যে একটা পার্থক্য অনুমান করছি আমি, কিন্তু প্রকাশ করতে পারছি না। সেই পার্থক্য তোমার অজানা নয়।-বললেন আবদুর রহমান।

কখনও জানার চেষ্টা করিনি। পূর্ববৎ হেসে বললেন মোদাচ্ছেরা, কখনও এ খেয়ালে ডুবে থাকিনি যে, আপনি শুধু আমার। সুলতানা আর আমার মাঝে পার্থক্য ফুলের মত। প্রতিটি ফুলের ঘ্রাণ আলাদা। কখনও ভাবিনি, আমি সেই ফুল, বাগানে যে একা।

***

এই অন্তরঙ্গ মুহূর্তে দরজার হালকা করাঘাত হলো। এই করাঘাত কার হতে পারে তা যেমন আবদুর রহমান জানেন তেমনি জানেন মোদাচ্ছেরাও। তিনি বললেন, বলো! এখন আসার কোন সময় হলো?

আসতে দিন।

তারও তো এখানে অধিকার আছে। বলে মোদাচ্ছেরা দরজা খুলে দিলেন।

সুলতানা দরজার দাঁড়ানো। বলল, হুররাণী এসেছেন। সুলতানার পেছনে যিরাব ও হেকিম হুরাণী। হুররাণী কামরায় ঢুকেই আবদুর রহমানের নাড়ীতে হাত রাখেন। তার চেহারায় কালো রেখা ফুটে উঠল। সে ক্রমে ক্রমে তার সিনায় হাত রেখে চাপ দিতে লাগল। জিভ বের করাল এবং চোখ খুলে পাতার দিকে তাকিয়ে কুঁচকালো।

হুররাণী! আবদুর রহমান বললেন, তুমি হয়ত দেখতে এসেছ, আমি রোগাক্রান্ত হচ্ছি না কেন। খোদা তায়ালা আমার ভেতরে এমন একটা প্রাইভেট রগ রেখেছেন, যা আমার প্রতিটি রোগকে উপশম করে দেয়। আমার অসুস্থতা নিয়ে তোমার এই অতি উ ৎসাহের কারণ কি?

আমরা এটাই দেখতে এসেছিলাম যে, ব্যাপারটা কি? কোনো প্রকার দুশ্চিন্তা আমাদের নেই। তবে এতটুকু আমাদের উদ্বেগ যে, খেলাফত ও স্পেনের জন্য সুস্থ আবদুর রহমানের দরকার বেশী বলল যিরাব।

আবদুর রহমান তো এদেশে অনেক–কিন্তু আপনার মত কজনা। অভিযান শেষ হয়েছে সেই কবে, কিন্তু চেহারা থেকে এখনও ক্লান্তির ছাপ মোছেনি। আমি মুহতারাম হুররাণীর সাথে কথা বললে তিনি বললেন, খুব সম্ভব স্পেনের কলিজা দুর্বল হতে চলেছে। তিনি অভিযানে যাওয়া বন্ধ না করলে ওই কলিজা নিস্তেজ হয়ে যাবে একেবারেই। বলল সুলতানা।

তোমার দৃষ্টিতে এতটা ফারাক কেন? অথচ মোদাচ্ছেরার দৃষ্টিতে আমি সুস্থ যুদ্ধ আমার সুস্থতা বাড়িয়ে তোলে-তার কথা এমনটা। কিন্তু তোমরা আমার সুস্থ কলিজায় ব্যামো আবিষ্কার করছো যে খুব। বললেন আবদুর রহমান। সুলতানা চোখ রাঙ্গা করে মোদাচ্ছেরার দিকে তাকাল।

স্পেন আমীরের দীর্ঘ বিশ্রামের দরকার। কলিজায় প্রেসার বাড়ছে। নাড়ির স্পন্দন বলছে, রম্ভে সঞ্চালন খুবই হালকা- দ্রত হওয়া চাই। হেকিম বললেন।

মুসলমানের রক্ত ঘরে বসে থাকলে দ্রুত হয় না। ময়দানে জেহাদে নামলেই কেবল রক্ত গরম হয় বললেন আবদুর রহমান।

আপনার সুস্থতার প্রতি নজর দিতে হবে মুহতারাম আমীর! বলল সুলতানা।

যদি কোনো চাটুকার আপনাকে সুস্থ বলে থাকে সে আপনার হিতাকাঙ্ক্ষী নয়। মুহতারাম হেকিম! আপনি দাওয়া প্রস্তুত করুন– আমি তাকে সুস্থ করে তুলব। আরাম দেব।

যতটুকু আরামে তিনি এ মুহূর্তে আছেন খুব সম্ভব সেটুকুও তার থাকছে না। কোনো দরবারী যদি তার অসুস্থতার দোহাই পাড়েন তাহলে এতেও এক ধরনের চাটুকারিতার গন্ধ পাওয়া যায়! বললেন মোদাচ্ছেরা।

হুররাণী উঠে দাঁড়ালেন। মনে হলো, তার মন-মেধা অন্য কোথাও। তিনি বললেন, আমি দুটি দাওয়া দেব। আমীর মুহতারামের সুস্থতা অপরিহার্য। বলে বেরিয়ে গেলেন।

যিরাব ও সুলতানা অগাধ জ্ঞানের অধিকারী। আঃ রহমানের কলিজায় ঘুণ ধরছে এ মর্মেই তারা কথা বলল। স্রেফ আরামই নয় যুদ্ধ ও নারী তাকে ত্যাগ করতে হবে। সুলতানার এ কথার উদ্দেশ্য, সে ছাড়া আর কেউ যেন তাঁর সংশ্রবে না আসে।

***

তিনদিন পর।

হেকিম হুররাণী দেখা করতে চান বলে মোদাচ্ছেরার কাছে সংবাদ এলো। কিন্তু তিনি মহলে আসতে ভয় পেতেন। মোদাচ্ছেরা পেটের পীড়ার অজুহাতে তাকে মহলে আসার পথ সুগম করে দেন।

পরদিন মোদাচ্ছেরা কৃত্রিম পেটের পীড়ায় উহ্ আহ করতে লাগলেন। হুররানী এসে গেলেন। মোদাচ্ছেরা খাস কামরায় শায়িত। তিনি চোখের ইশরায় চাকরানীকে বেরিয়ে যেতে বলেন।

আপনার সাথে বোধ হয় এক্ষণে কথা বলতে পারব। আমার মন একটি দুঃসহ বেদনার বোঝা বয়ে নিয়ে চলেছে। আপনার সামনে কেবল ওটা পেশ করতে পারি। হুররাণী বললেন।

সেই বোঝা আমার অজানা নয়। স্পেন আমীরের কলিজায় কোন ঘুণ ধরেনি, অথচ দিব্যি আপনি তাকে রোগী বানিয়ে ফেলেছেন।

হুররাণী ভূত দেখার মত চমকে ওঠে মোদাচ্ছেরার দিকে তাকালেন।

আপনি তাকে এ কথা বলে দেবেন বুঝি? প্রশ্ন হেকিমের।

আমি তার সন্দেহ লাঘব করতে চেষ্টা করব। তবে একথা বলব না যে, সুলতানা বা যিরাব তার ওপর প্রভাব বিস্তার করছে এবং শল্য বানাতে চাচ্ছে। ওরা দুশমনের সাথে সওদা পাকাপাকি করে ফেলেছে। আমি ব্যাপারটা তার কাছে গোপন রাখতে চাই। কেননা ওদের বিরুদ্ধে তিনি ক্ষেপে গেলে ওরা আরেক দিকে আমাকে ঘায়েল করতে চাইবে। আমি পরিণত হব ওদের টার্গেটে। এতে আত্মরক্ষাকল্পে আমাকে নানান ষড়যন্ত্র করতে হতে পারে। আমার চিন্তা-চেতনা এ মুহূর্তে দেশ ও জাতিকে নিয়ে। আপনি আপনার বোৰা অপসারণ করে ফেলেছেন। খুব ভাল করছেন। আরো ভালো করেছেন সুলতানার কথামত কাজ করে। ওর কথামত কাজ না করলে না জানি আপনার ওপর কি ভীষণ মুসিবত নেমে আসত! বললেন মোদাচ্ছেরা।

শ্রদ্ধেয়া মালেকায়ে আলীয়াহ! আপনি সত্যিই অনন্যা, প্রিয়ংবদা। আপনি আমার হৃদপীড়ন বন্ধ করেছেন। আমাকে আরেকটি কথা বলতে হয়। বলে তিনি এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন, আরেকটি অপরাধ আপনার চরণে বিসর্জন দিতে চাই। আগামীকাল রাতে আপনার কোনো চাকরাণী আপনার কাছে দুধের গ্লাস নিয়ে আসবে। বলবে, এতে মিশরের মধু মিশ্রিত। ভাগ্যবানদের কপালেই এটা জুটে থাকে। এই দাওয়াই যৌবনকে চির অটুট রাখে। আগের যুগের রাজা-বাদশাহরা এটা সেবন করত। এতে রূপলাবণ্য বৃদ্ধি পায়। সে এই মধু আহরনের স্থানেরও উল্লেখ করবে। বলবে, এটা আমীরকে সেবন করাতে। আপনি ওই শরবত না খেয়ে তার মাধ্যমে কোনো পশুকে খাওয়াবেন।

এই বিষ সুলতানার পক্ষ থেকে আমার কাছে আসছে!

তবে কি বলছি। তিনি আমাকে বলেছেন, এই বিষ প্রয়োগের ব্যবস্থা না করলে এর চেয়ে মারাত্মক বিষ নিজ হাতেই আপনাকে খেতে হতে পারে। এটাও কি আপনি আবদুর রহমানের কাছে গোপন করতে চান?

না! এটা গোপন করব না। করলে স্পেনের কালসাপ সবাইকেই দংশন করবে। আপনি ওই নারীকে ভালোমত চিনতে পারেননি। তার সৌন্দর্যের চেয়ে ভেতরের রূপটা আরো ভয়াবহ। তা যাকগে। আপনি তাকে বিষ দিয়েছেন কি?

হ্যা! মোদাচ্ছেরার প্রভাবে প্রভাবান্বিত হুররাণী তার হাতের পিঠে চুমু খেয়ে বললেন, এরপরে কি বলবেন, হেকিম হুররাণী দুধে বিষ মিশিয়ে পাঠিয়েছেন? তার চেয়ে এক কাজ করুন! আমাকে জল্লাদের হাতে সোপর্দ করুন। আমি জীবিত থাকতে চাই না। আল্লাহ আমাকে রোগীর উপশমের দায়িত্বে রেখেছিলেন এতদিন, এক্ষণে আমার হাতে মানুষ মারার কায়দা-কাজেই জীবনের চেয়ে মরাই শ্রেয়। হুররাণী কেঁদে ফেলেন। বলেন, আমি এখান থেকে চলে যাব। এখানে থাকার পরিবেশ নাই।

আপনি এখানেই থাকবেন। মোদাচ্ছেরা বললেন, আপনাকে আমার বড় প্রয়োজন। সময় আসছে, যখন আপনার হাতে এই বিষ আমীরের মুখে তুলতে বাধ্য করা হবে। আপনি আমাকে যেভাবে আগেভাগে স্মরণ করালেন সেভাবে আবদুর রহমানের বেলায়ও তাকে স্মরণ করাবেন।

মাঝে মধ্যে মনে হয় সুলতানার মুখেই এই বিষ তুলে দেই। কিন্তু আমি হেকিম-যমদূত নই।

আপনি শান্ত হোন। আপনার প্রতি সুলতানার বিশ্বস্ত নষ্ট করে বসেন না যেন।

আমি ভেবে হয়রান সে খ্রীস্টানদের চর।

না! কালনাগিনী কারো প্রতি সহানুভূতিপরায়ণ নয়। সে যা কিছু করছে স্বার্থান্ধ হয়েই করছে। আপনি দেখবেন এক বুক আশা নিয়ে তার বেঁচে থাকা। ভাবী খলিফার গর্ভধারিণী সে। খ্রীস্টানদের ক্রীড়নক হয়ে তাদের থেকে একটি প্রদেশের মালিক হতে চাচ্ছে। এদিকে স্পেন আমীরের শয্যাশায়িনী হয়ে স্পেনের ভাবী সম্রাটের গর্বিত মা হবার স্বপ্ন দেখছে। ওদিকে আবদুর রহমান নারীর ছলনা ও কুমতলবে খোঁড়াই উপলব্ধি করতে পারছে। আমি তাকে কতভাবে বুঝতে চেষ্টা করলাম। আপনি আজ যে অকল্পনীয় সহমর্মিতা প্রদর্শন করলেন তার প্রতিদান একমাত্র আল্লাহই দিতে সক্ষম। নিশূপ নির্বিকার থেকে যান।

হুররাণী খামোশ বেরিয়ে যান, কিন্তু তার চলার গতি বলছিল, বড় বেচাইন তার মানসিকতা এই মুহূর্তে।

***

পরদিন।

হেরেমের বিশেষ এক চাকরাণী যে মোদাচ্ছেরার পরিচিত দেখা করল, সে বলল, তার এক ভাই মিশর থেকে এসেছে। নিয়ে এসেছে যৌন উত্তেজক মধু। এই মধু আগের যুগের ফেরাউনরা সেবন করত। এটা কেবল যুবতী রাজমহিষীরাই ব্যবহার করে থাকেন। এতে সৌন্দর্য-বৃদ্ধির পাশাপাশি শরীরে যৌবনের বান ডাকে। এখন ওই মধু মিশরের নির্জন এলাকায় পাওয়া যায়।

আপনি চাইলে দুধে মিশিয়ে আনব। মধু খুব কম : এক ঢোকেই সবটুকু পান করবেন- তাহলেই কেবল প্রতিক্রিয়া হবে।

নিয়ে এসো! এখনই। মোদাচ্ছেরা বললেন, চাকরাণীর চোখে আনন্দ দ্যুতি। চাকরাণী এক পেয়ালা দুধ নিয়ে এল। মোদাচ্ছেরা পেয়ালা দুধ হাতে নিয়ে বললেন, সুলতানা তোমাকে এই দুধ দিয়ে একথা কি বলেনি যে দেখ; দুধ খেয়ে আমি দাঁড়িয়ে থাকি, না মাথা ঘুরে পড়ি? মনের চাপা পেরেশানি সংযত চাকরাণী বলল, আপনি একি বলছেন? সুলতানার সাথে এই দুধের সম্পর্ক কি?

ওহহো! দুধের প্রতিক্রিয়া দেখার পর বুঝি তাহলে তুমি পুরস্কার পাবে?

যতই চৌকস হোক না কেন চাকরাণী বুঝতে পারল, ইনি আবদুর রহমানের স্ত্রী। তার সন্দিহান মনোব দেখে সে কাঁপতে লাগল। মুদাচ্ছেরা হেসে পড়লেন।

ভয় নেই। বলো, এই বিষ তোমাকে কি সুলতানা দেয়নি?

হা! তিনিই দিয়েছেন। চাকরাণী কম্পিত কণ্ঠে বললো, এটা আমাকে দিয়ে দিন। আমিই পান করে নিচ্ছি। আসন্ন শাস্তির চেয়ে ওটা পান করে নেয়াই শ্রেয়। সে কেঁদে বলল, এ কাজ না করলেও তার শাস্তিও আমাকে পেতে হত।

চাকরাণী মোদাচ্ছেরার পায়ে আছড়ে পড়ল। বলল, আমার সন্তানদের প্রতি দয়া করুন। এখান থেকে পলায়ন করার সুযোগ দিন। হেরেম ছেড়ে চিরদিনের তরে চলে যাব। কর্ডোভার মুখ দেখব না কোন দিনও।

মোদাচ্ছেরা বললেন, তুমি হেরেমেই থাকবে। কেউ তোমাকে কোনো শাস্তি দিতে পারবে না।

বাইরে দাঁড়াও। আমি না আসা পর্যন্ত এখানেই থাকবে। কারো সাথে কোনো কথা বলবে না।

দুধের পেয়ালা হাতেও ওঠালেন তিনি। চাকরাণী কাঁপছে বেতসপাত্র মাফিক।

***

সুলতানা ড্রেসিং টেবিলের সামনে রূপচর্চায় লিপ্ত। হেরেমের নারীরা সূর্যাস্তের পর এভাবে রূপচর্চায় লিপ্ত হতেন। সুলতানা ছিল রাতের স্বপ্ন। তার কামরায় আতরের ঘ্রাণ মৌ মৌ, জনগণ যার কল্পনাও করতে পারে না। রকমারী রঙিন আলোতে অন্দর ঝলমল।

লঘুপায়ে কামরায় প্রবেশ করলেন মোদাচ্ছেরা। আয়নায় তাকে ভেতরে ঢুকতে দেখে সুলতানা চমকে ওঠেন। মোদাচ্ছেরার ঠোঁটে প্রশস্ত মুচকি হাসি।

আপনি এখানে? প্রশ্ন ও বিস্ময় দুটিই সুলতানার চোখে-মুখে, আর এই পেয়ালা?

তোমার জন্য এমন এক মধু এনেছি যা স্রেফ মিশরেই পাওয়া যায়। ফারাওদের হেরেমে এর ব্যবহার ছিল যথেচ্ছা– বলেই মোদাচ্ছেরা কারুকার্য খচিত টিপয়ে পেয়ালাটি রাখলেন, এই মধু সামান্য দুধে মিলিয়ে সেবন করলে নারীদের রূপলাবণ্য বেড়ে যায়, দেহের ভাঁজে ভাঁজে যৌবনের উন্মাদনা খেলে যায়। হেরেমের জনৈক চাকরাণীর ভাই মিশর থেকে এনেছেন। চাকরাণী এই দুধ আমার জন্য এনেছিলেন, কিন্তু আমি পান করিনি, এনেছি তোমার জন্য। তোমার দেহ ও যৌবনের প্রতি আমীরে স্পেনের যে টান সেটা চিরন্তন হোক-প্রত্যাশা আমার এই। আমার স্বামীকে খোশ দেখতে চাই। নাও পান করা। আমার নিজ দেহের প্রতি কোনোই আকর্ষণ নেই।

বুদ্ধিমতী সুলতানার বুঝতে বাকী রইল না যে, তার ষড়যন্ত্র ধরা পড়ে গেছে। তার বলার ছিল অনেক কিছু, কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই বেরোল না। তার চেহারার ঔজ্জ্বল্যে কালো রেখা ফুটে উঠল। এ অপরাধ যেনতেন নয়।

সুলতানা! মোদাচ্ছেরা বললেন, নৈকট্য, লোভ ও হিংসা মানুষকে একদিন এ ধরনের নীচু কাজে নামায়, যেখানে নেমেছো তুমি। তোমার চেহারা যা তাতে এ শরবত তোমার মুখেই যাওয়া দরকার। তোমার অবস্থান বোধকরি অজানা নয়। আমি স্পেন আমীরের স্ত্রী। তুমি তার দাসী মাত্র। তোমার এই সর্বশেষ ষড়যন্ত্র কেবল তোমারই নয় বরং আগত সন্তানের মুখেও চুনকালি দিয়েছে।

সুলতানার মাথা চক্কর খেল। নির্বাক তার যবান। দড়াম করে সে পালংকে বসে গেল। ফ্যালফ্যাল করে মোদাচ্ছেরার প্রতি তাকাল।

বলো এ বিষ তুমি পাঠাওনি? মোদাচ্ছেরা প্রশ্ন করেন, যার হাতে এ দাওয়াই তুমি দিয়েছ, সে আমার চাকরাণী। তাঁকে জীবিত থাকতে হবে। কমপক্ষে তার সন্তানের জন্য হলেও। তোমার পদমর্যাদা ও অর্থলোভই তাকে এ পথে এনেছে। তার সাথে আমি মাত্র দুটি কথা বলেছি এতেই সে জাহান্নামের ভয় পেয়েছে। জীবনের মমতায় সে বেচাইন হয়ে গেছে। বিষের পেয়ালা রেখে সে আমার পায়ে পতিত হয়েছে। সে আমাকে পুরো কাহিনী শুনিয়েছে। আমাকে নয়, নিজকেই জিজ্ঞেস করো। হেরেমে তোমার অবস্থান কি? এখানকার চাকর-চাকরাণী কোনো দাসীর জন্য হেরেমের নারীকে ধোঁকা দিতে পারে না। তোমার যেমন সত্যকথা বলার সাহস নাই তেমনি নাই মিথ্যা বলারও। বলো না, আজ তোমার এই রাতটাকে জীবনের শেষরাত বানিয়ে দেই। ইচ্ছে করলে মাফও করে দিতে পারি। রূপ-লাবণ্যই তোমার জন্য কাল হল। বলল এ রূপ আজ কোন কাজে লাগছে?

সুলতানার চেহারায় বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠল। পটলচেরা চোখ রক্তজবার মত লাল। এতে এক সময় দেখা দেয় অশু। আচমকা উঠে সে বিষের পেয়ালা ধরল। ফোপানো কাদার সুরে বলল, আমি আর জীবিত থাকতে চাই না। মোদাচ্ছেরা সহসা উঠে তার ঠোঁট চেপে ধরেন একহাতে, আরেক হাতে পেয়ালা ছিনিয়ে নিয়ে বলেন,

এর মানে এই যে, বিষের পেয়ালা তাহলে তোমার মুখে আমিই তুলে দিয়েছি। অসহায় সুলতানা মোদাচ্ছেরার দুহাত ধরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। বলে, তুমি যদি শাহী খান্দানের মেয়ে হয়ে থাকো তাহলে এর প্রমাণ দাও এবং মাফ করে দাও। হ্যাঁ, আমিই তোমাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করতে চেয়েছিলাম। স্পেন ম্রাটের কানে এ খবর গেলে তিনি আমায় আস্ত রাখবেন কি?

হ্যা! তিনি তোমায় জীবিত রাখবেন– তবে কারার নিশ্চিদ্র কুঠরিতে। এমন কুঠরী যেখানে রাত-দিনের পার্থক্য বোঝায় উপায় নেই।

সুলতানা মোদাচ্ছেরার আরো শক্ত করে হু হু করে কাঁদতে থাকে।

কিন্তু আমি তোমাকে ওই মাহফিলেই জীবিত রাখতে চাই। স্পেন সম্রাটের জীবনে তোমার উপস্থিতি জরুরী। জানি, আমি যা বলছি একে আমার ধর্ম গোনাহ সাব্যস্ত করে, কিন্তু স্বার্থচিন্তা আমার জীবনে সবসময়ই কম। আমার মন উদার, চিন্তাধারাও তথৈবচ। নিজের নয় ভাবছি স্পেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে। ওঠো, পালংকে উঠে বসো। সুলতানা অবোধ প্রাণীর মত উঠে পালংকে বসল। মোদাচ্ছেরা বলল, ভাল করে শোন সুলতানা! এই পেয়ালা ভেঙ্গে যাবে। এই দুধ যমীন শুষে নেবে। সময় বয়ে যাবে আপন গতিতে। মাসের পর মাস বছরের পর বছর। কিন্তু তোমার অপরাধ মাটি শুষে নেবে না। সময়ের ইথারও এটা মুছতে দেবে না। বিষের এই পেয়ালা সর্বদা ঠোঁটে ছোঁয়ানো থাকতে দেখবে। সিংহশাবক

তোমার অপরাধ আমি ক্ষমা করতে পারি, তবে তা কিছু শর্তে আগামীতে সেই শর্তের একটারও বিরোধিতা করলে পরিণতি হবে খুবই ভয়াবহ। (১) খ্রীস্টানদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করো। গোয়েন্দা আমারও আছে, যারা প্রতিনিয়ত আমার কাছে খবর পৌঁছিয়ে থাকে। যদি স্বপ্ন দেখে থাকো, খ্রীস্টানরা তোমাকে কোনো একটা প্রদেশের রাণী বানাবে তাহলে মন থেকে সেই স্বপ্ন মুছে ফেল। ওই কাফেরদের কারো সাথে যেন তোমার সম্পর্ক না থাকে। এলোগেইছ ও ইলিয়রের সাথে সম্পর্ক ছাড়। অবশ্য প্রতারণা করে ওদেরকে ধরিয়ে দিতে পারলে সেটা হবে এক মহান কাজ।

আমি তোমার প্রতিটি শর্ত মেনে নিলাম। আমায় ক্ষমা করে দাও। স্পেন সম্রাটকে কিছু বললো না।

বলব না। হুররাণীর সাথেও কোনো কথা বলো না। সে যেন আমীর সাহেবকে খামোকা রোগী সাব্যস্ত না করে। তাকে নয়া শরবত পান করাতে যেও না। রাজা ও রাজ্যের কোনো ব্যাপারে নাক গলাতে যেও না। আমীর সাহেবের সামনে নিজকে একজন দাসী হিসেবেই পেশ করা। যিরাবকে ব্যবহার করা ছেড়ে দাও।

কিন্তু মোদাচ্ছেরা! যিরাব আমার প্রেম দিওয়ানা যে!

ভূমি তার প্রেমে তাহলে মজে যাও। তার প্রেম মাথা পেতে নিয়ে তার মাঝে নিজকে লীন করে দাও, তবুও আমীরে স্পেনকে মহলে বন্দী করতে যেও না। সুলতানা। তোমার দৃষ্টি আজ কেবল নিজকে লক্ষ্য করেই। জগতে আসার অর্থই হচ্ছে, দুনিয়ার স্বাদ লুটা, কিন্তু আমার দৃষ্টি ভবিষ্যৎ নিয়ে। সেটা নিজের নয় স্পেনের। আমার দৃষ্টি ওই ইতিহাসের দিকে, যা মরার পরে লেখা হবে। ইতিহাসের ওই ধূসর পাতাগুলো আমি রওশন করতে চাই, যাতে দিক নির্দেশনা খুঁজে পাবে আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধর। আমার কথা তোমার বোধগম্যের বাইরে হয়ত বা। খুব ভেবে দেখো– বুঝতে অসুবিধা হবে না।

বুঝি মোদাচ্ছেরা! আমি তোমার প্রতিটি শর্ত কবুল করে নিলাম।

আমার স্বামীর ও আমার মাঝে তোমাকে আসতে নিষেধ করছি না। আমি শ্রদ্ধা করি পতপত করে ওড়া ওই পতাকাকে যা মহলে উড়ছে এক্ষণে। হৃদয় মিনারে ভাসমান সেই পতাকাকে আমি শ্রদ্ধাবনতচিত্তে স্মরণ করি যা মুজাহেদীনে ইসলাম জেহাদের ময়দানে উড়িয়ে থাকেন। যাও সখি! তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।

মোদাচ্ছেরা পেয়ালা ওঠালেন এবং সুলতানার কামরা থেকে বেরিয়ে গেলেন। রাতের আঁধারে ওই পেয়ালা ভেঙ্গে দেয়া হলো। মাটি শুষে নিল এর মধ্যকার বস্তু।

সুলতানার অবস্থা ওই নাগিনীর মত এক্ষণে, যার বিষদাঁতগুলো একে একে ভেঙ্গে নিয়েছে সুচতুর কোনো সাপুড়ে।

***

নজরবন্দী ফ্লোরা।

কেটে গেছে ইতোমধ্যে বেশ কিছুদিন।

আলেম সাহেব তাকে দীক্ষা দিতে আসতে থাকেন সকাল-সন্ধ্যা।

ফ্লোরার সান্নিধ্যে থাকার সময়সীমা রোজানাই বেড়ে চলছিল তার। ফ্লোরাও নিজকে তার সামনে মেলে ধরেছিল। সে তার গৃহশিক্ষককে বারদুয়েক বলেছেও, আপনার অপেক্ষায় আমার চক্ষু থিতু হয়ে গেছে। মাথা গেছে বিগড়ে। আপনার স্থলে কেউ হলে এই দীক্ষায় আমার আকর্ষণ এতটা হতো কিনা সন্দেহ।

দীক্ষার স্থলে আলেমের ধ্যান-খেয়াল এক্ষণে ফ্লোরার কাঁচা অঙ্গের দিকেই বেশী। অন্তরঙ্গ বান্ধবীর মতই সে ফ্লোরার সাথে রসালাপে লিপ্ত থাকত। পরে দিত ধর্মদীক্ষা। ফ্লোরা তার সম্মুখে বসত, পরে তার গা ঘেঁষে বসা শুরু করে। পাঠ নিতে সে এভাবে কাছাকাছি হত যাতে তার দীঘল কালো চুল আলেমের গালে আছড়ে পড়ত। গৃহশিক্ষকের হাত ফ্লোরার অজান্তেই তার কোমরের নীচে নেমে যেত। ফ্লোরা তার দিকে মুচকি হেসে এভাবে তাকাত যেন এই আবেদনে তার আপত্তি নেই। লাজুক মুখে সে বলে যায়, আপনি আমার হৃদয়ে খোদার মহব্বত সৃষ্টি করতে এসেছেন, কিন্তু আমার হৃদয়ে এক্ষণে আপনার মহব্বত। মনটা যেন আনচান করে বুক করে দুরুদুরু। এটা গোনাহ না, তো?

না! গৃহশিক্ষক বলেন।

ফ্লোরার দুঠোঁট গৃহশিক্ষকের গণ্ডে নেমে আসে। গৃহশিক্ষক তার শিক্ষাদীক্ষা ভুলে যান। সুচতুর ফ্লোরা তার দেহে আগুন ধরিয়ে সটকে পড়ে। পরবর্তী তিন দিন সে তার সনে প্রেমোন্মাতাল অভিনয় করে যায়। পুরোদস্তুর চেপে বসে তার দিলদেমাগে।

একদিন সে গৃহশিক্ষককে বলে বসে, নিঃসঙ্গতায় থাকতে থাকতে তার মাঝে একটা একঘেয়েমি ভাব জন্ম গেছে। মন চায় ঘরের সম্মুখস্থ দুবৃক্ষে ফুলনি করার, দোলনায় দোলার। কাজটি নেহাৎ মন্দ না। এক ঘেয়েমি কাটার যুৎসই হাতিয়ার। আপনাকে রশি আনতে হবে। গৃহশিক্ষক রাজী হয়ে যান।

কিন্তু প্রহরী নারীরা বেঁকে বসেন। তারা বলেন, এ মেয়ে নজরবন্দী। এই রশির দ্বারা সে পলায়নের সুযোগ পেতে পারে। গৃহশিক্ষক বলেন, কাল তোমরা নিজ হাতে ওই বৃক্ষদ্বয়ে দোলনা বানিয়ে দিও। এটা স্রেফ ফ্লোরার নয়, তোমাদেরও একঘেঁয়েমি কাটতে সহায়ক হবে। মহিলারা একে মেনে নিল। তারা দেখেছিল ফ্লোরা সাদাসিধে এক যুবতী। সে এ অবধি এমন এনো আচরণ করেনি যাতে সন্দেহ জন্মে।

সন্ধ্যার দিকে আলেম সাহেব চলে গেলেন। সন্ধ্যার জমকালো আঁধার পরিবেশকে থমথম করে তুলেছিল। প্রহরী দুনারী ঘুমিয়ে গেল, একজনই কেবল শুইল ফ্লোরার কামরায়। ফ্লোরা ঘুমযায়নি। দরজায় তালা। চাবি ওপাশের কামড়ায় ঘুমন্ত দুপ্রহরীর কাছে।

মধ্যরাতে ফ্লোরা উঠল। দেখল তার পাশে ঘুমন্ত নারী মরণ ঘুমে বিভোর। বিছানায় এগিয়ে এলো সে। চোখে মুখে হত্যার নেশা। তার শক্ত দুহাত এক সময় ঘুমন্ত প্রহরীর গলায় নেমে এলো। মহিলাটি গোঁ গোঁ করতে এক সময় নিথর হয়ে গেল।

ফ্লোরা রশি হাতে তুলে নিল। মৃদুপায়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। উঠানে ছিল সিঁড়িপাতা। উঠানের কোণে কেল্লার প্রাচীর। ফ্লোরা সিঁড়ি সে দিকে নিয়ে গেল। প্রাচীরে রশি নিক্ষেপ করে শরীরটা বাতাসে ভাসিয়ে সে বাড়ী থেকে বেরিয়ে এলো। এখন সে যাবে কোথায়? অত ভাবার সময় নেই। অন্ধকার গলিপথে সে অদৃশ্য হয়ে গেল।

ফ্লোরা যার দরজার কড়া নাড়ল ইতিহাস তার নামোল্লেখ করেনি। তবে সে একজন মোয়াল্লেদ খ্রীস্টান অতি অবশ্যই। মায়ের সাথে অসংখ্যবার এর কাছে এসেছে ফ্লোরা। লোকটা শেয়ালের মত ধূর্ত। লোকেরা একে দেখল সাদাসিধা ও নিরীহ। ইতিহাস বলছে, এলোগেইছ কর্ডোভা এলে এর বাড়ীতেই আশ্রয় নিত।

খ্রীস্টান লোকটা ফ্লোরাকে দেখে হতবাক হয়ে গেল। ফ্লোরাকে হাত ধরে সে ভেতরে নিয়ে গেল ও দরজা বন্ধ করে দিল। ফ্লোরা বলে গেল তার পলায়নের কাহিনী।

জানিনা কতদিন তোমাকে আমার ঘরে বন্দীর মত থাকতে হবে; মেজবান বলল, সকালে খবর পাঠাব। কেউ এসে তোমাকে কর্ডোভা থেকে নিয়ে যাবে।

আমার মায়ের সংবাদ কি?  ফ্লোরা প্রশ্ন করে।

তোমার ভাই বদর মা ও বোনকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। দিন তিনেক তারা আমার এখানে ছিল। তাদেরকে বহুদূরে পাঠিয়েছি। কর্ডোভা ছাড়লে কোথাও না কোথাও তাদের দেখা যাবে। আমাদের দিক নির্দেশেক এলোগেইছ চারদিনের মধ্যেই এসে যাবেন। তিনি এখানেই ওঠবেন। তার সাথে তোমার পরিচয় হওয়া দরকার।

এলোগেইছ! ওহহ……………এলোগেইছ! আমার মা তার অনেক কথাই বলেছেন। বলেছেন, এলোগেইছ তার জীবন-যৌবন ও চাওয়া-পাওয়া ইসলামকে মূলো ৎপাটন ও খ্রীস্টবাদ পুনরুদ্ধারে ওয়াকফ করেছেন।

এলোগেইছ নজরকাড়া সৌন্দর্যের অধিকারী যুবক। তিনি অদ্যাবধি বিয়ে করেননি তিনি ঈসামসীহের জন্য দেওয়ানা। আবদুর রহমানের মহলের সুলতানা ও সংগীতজ্ঞ যিরাব ও তার ক্রীড়নক।

সত্যিই দুজন কাজ করে যেতে পারলে আমাদের কাজ ত্বরান্বিত হবে।

না! আমরা ওদের ওপর আস্থাবান হতে পারি না। কেননা ওরা মুসলমান এছাড়া যিরাব সংগীতজ্ঞ আর সুলতানা সামান্য দাসী মাত্র। এরা দরবারী চাটুকার। আমরা ওদের সাথে সতর্ক হয়েই কথা বলে থাকি। তোমাকে আগেই বলেছি, সুলতানা ভুবন মোহনী ও অতুলনীয় সৌন্দর্যের অধিকারিণী। এলোগেইছ নিঃসঙ্গতায় তার সাথে কাটিয়েছেন। এতদসত্ত্বেও সুলতানার চোখ ঝলসানো রূপ তাকে মাত করতে পারেনি।

ফ্লোরার রূপ যৌবনও নজড়কাড়া বেনজীর। এ সেই রূপ যা নীতিবান আলেমকে নীতিচ্যুত করেছে। শুধু কি তাই তাকে গোলামে পরিণত করেছে। ফ্লোরা কখনও ভেবে দেখেনি তার রূপ যৌবনের একজন সাথী দরকার। দরকার একজন মনের মানুষ। ফ্লোরা নিজকে কখনো নারীই মনে করেনি। ধর্মোদ্দীপনাই তার নারীত্বকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হত, অদৃশ্য কোনো শক্তিবলে সে বলীয়ান।

হায়! মুসলিম জাতির মাঝে যদি এই উদ্দীপনা থাকত তাহলে সাহারা পেরিয়ে আটলান্টিকের অথৈ পানিরাশিতে ইসলাম আছড়ে পড়ত, কিন্তু তলোয়ারের স্থলে যখন এ জাতির হাতে শরাবের পেগ উঠে এলো তখন থেকে শুরু হলো এদের পতন। রণাঙ্গনের স্থলে মহলের নারীসঙ্গ বিভোর হওয়ায় তাদের ধর্মোদ্দীপনায় অনেকখানি ভাটা পড়ল। এক সময় তারা ওই সমুদ্রেই ডুবে গেল যেখানে একদিন জানবার্য জাতি তাদের রণতরীগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন।

***

পরদিন।

কর্ডোভার আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, বন্দিনী তরুণী ফেরারী হয়েছে। তার কক্ষে মৃত পড়ে আছে প্রহরী নারীর লাশ। কক্ষের পেছনে ঝুলে আছে রশি। অন্যান্য নারীদের পুলিশ গ্রেফতার করে। তারা জবানবন্দীতে জানায়, রশির যোগান দিয়েছেন দীক্ষাগুরু তথাকথিত গৃহশিক্ষক। ওই শিক্ষককেও গ্রেফতার করা হোল। তিনি অনুভব করলেন, মেয়েটা যেমনটা নজর কাড়া সুন্দরী এর চেয়েও অধিক ছলনাময়ী। সে তার সাথে প্রেমাভিনয় করে পালানোর পথ সুগম করেছে। কৃতকর্মের অনুতাপানলে অহর্নিশ জ্বলে মরেন তিনি। কখনও উন্মাদনা বশে চুল ছেড়েন; কখনও কাড়েন জামা। তাকে শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটি বদ্ধপাগল করে তোলে। সরকারী রিপোর্ট প্রকাশ করা হলো, ওই তরুণীকে দীক্ষাগুরুই পালাতে সহায়তা করেছে যদ্দরুন একজন অবলা নারীকেও প্রাণ দিতে হয়েছে।

ফ্লোরা যে বাড়ীতে আশ্রয় নেয় সে বাড়ীটি তার অপরিচিত নয়। তখন পর্যন্ত কেউ জানতে পারে নিয়ে এই তরুণীই কর্ডোভায় রক্তসাগরের পয়গাম নিয়ে আসবে এবং মোয়াল্লেদীনের ইতিহাসে নূতন ইতিহাসের জন্ম দেবে। ওদিকে কেউ ধারণাও করতে পারল না যে, যে নয়া উন্মাদ শহরের অলি গলিতে অদ্ভুত কথার গুঞ্জন তুলছে। কখনও অট্টহাসি দিচ্ছে, কখনও আকাশের দিকে তাকাচ্ছে- এক সাধারণ তরুণীই তাকে এ পথে নামিয়েছে। এ পাগল দিনকে দিন বদ্ধ উম্মাদে রূপ নিচ্ছিল। আত্মীয়-স্বজন তার ওপর বিরক্ত হয়ে ঘর থেকে বের করে দিল।

একদিন শহরে তার মতই আরেক পাগলের আবির্ভাব ঘটল। সে কখনও মাঝপথে থেমে পড়ত। বেশ কিছু লোকের সাথে কথা বলত, মানুষের জটলায় সে খাবি খেয়ে ফেলত। এক সময় সে একটি চোরাগলির মোড়ে এসে থেমে গেলো। পরিচিত দরজার ছিটকিনিতে তার হাত উঠে এলো।

বাড়ীর মালিক দৌড়ে এলো এবং পরক্ষণ আগন্তুকের বুকে মিশে লাফিয়ে পড়ল।

এলোগেইছ! বেশ ভাবনায় ফেলেছেন আমাকে। অন্তর্ধানের একটা সীমা থাকা তো দরকার।

খানিকপর।

এলোগেইছের ছদ্মবেশ বদলে গেল। মুখের গালপাট্টা খুলে ফেলল। এলোগেইছ একটু বিশ্রাম নিতেই বাড়ীর ফ্লোরার পুরো কাহিনীও তাকে শুনিয়ে গেল। তার শাস্তি ও ফেরারী বাহিনীও বাদ থাকল না। বলল কাজীর দরবারে বলা ইসলাম বিদ্বেষী কথাগুলোও। এলোগেইছ নিতম্ব চাপড়ে বলল,

আমাকে এখনই তার কাছে নিয়ে চলো। ওকে তো কুমারী মরিয়মের পবিত্ৰাত্মার প্রতিবিম্ব বলে মনে হচ্ছে।

ফ্লোরা ও এলোগেইছের চার চোখের মিলন হতেই একে অপরের রূপসুধা পানে ডুবে গেল। কারো নজর যেন পড়তেই চায় না। ফ্লোরা আস্তে আগে বাড়ল। ইতিপূর্বে সে এলোগেইছের কথা শুনেছে। কদমবুচির জন্য হাঁটু গেড়ে সে বসে পড়লে এলোগেইছ তাকে বুকে তুলে নিল। বলল,

চরণে নয় তোমার স্থান এই বুকে। তুমি নিষ্পাপ তরুণী। বলে তরুণীর নিটোল গালে হস্তপরশ বুলিয়ে নিল। পবক্ষণে বলল, মেরীও এমন নিষ্পপ ছিলেন। হযরত ঈসাও ছিল আমার মত সহজ সরল। এতদসত্ত্বেও তিনি শুলে চড়েছেন তুমিও শূলে চড়বে।

আমি এ জন্যই পয়দা হয়েছি। ফ্লোরা বলল, আমার আমি শুলে মরতে চাই।

তুমি কি আমাকে এই গ্যারান্টি দিতে পারবে যে, আত্মোৎসর্গ আমার আকীদা মাফিক হবে? আমার শিরার খুন আরব থেকে আসলেও তাদেরই দেহে এটা কিরূপে বিষ হিসেবে প্রয়োগ করতে পারি- তাও বলতে হবে তোমাকে।

ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা, অজেয় মনোবল ও অশ্রুতপূর্ব আত্মত্যাগ থাকলে কিই না হতে পারে? ফ্লোরাকে আরো কাছে টেনে বলল এলোগেইছ, কাজীর দরবারে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষোদগার তুলে তুমি আমাকে এক নয়া পথের সন্ধ্যান দিয়েছ। আমার আন্দোলন এক্ষণে তোমার আবেগের সাথে একাকার। এমন কর্মী তৈরী করব যারা জনাকীর্ণ চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে মুসলিম জাতি ও তাদের রাসূলকে গাল দেবে। ওরা হয়ত ধরা পড়বে, শাস্তিও একটু আধটু পাবে না-তাও কিন্তু নয়। একদলের শাস্তি শুরু হলে আরেকদল পূর্বের ন্যায় গালাগালির মহড়া চালিয়ে যাবে।

কিন্তু এতে লাভ? বাড়ী ওয়ালা প্রশ্ন করে।

এরা ধরা পড়লে শাস্তির হাত থেকে রেহাই পাবে না। এতে অন্যান্য কর্মীরা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠবে। ওদিকে আমরা গীর্জা থেকে আওয়াজ ওঠাবো, মুসলিম কারাগারে সংখ্যালঘু খ্রীস্টানদের এমন নৃশংস অত্যাচার চলছে যা ভাষায় বর্ণনা করার মত নয়। গোটা বিশ্ব এতে চমকে উঠবে। স্পেনের আনাচে কানাচের খ্রীস্টজাতি বিদ্রোহে মাঠে নামবে। পড়ে যাবে গোটা দেশে হুলুস্থুল কাণ্ড কারখানা।

কিন্তু প্রশাসনের সাথে টক্কর দেয়া চাট্টিখানি কথা নয়। ফ্লোরা বলল, মাদ্রিদে কি কিয়ামতে ছোগরা কায়েম হয়েছিল, তা তোমার অজানা নয়। খ্রীস্টানদের ঘর বাড়ী জ্বলেছে কি কম! আমরা সেনা ট্রেনিং দিয়ে তারপর কি মাঠে নামতে পারি না?

এ মুহূর্তে নয়। আমাদের অনেক জীবনহানি হয়েছে, তথাপিও বিদ্রোহাগ্নি নেভানোর এতটুকু ইচ্ছা নেই। আমাদের নিশূপ নির্বিকার বসে থাকতে দেখলে ওরা ফ্রান্সে হামলা করে লুই সাম্রাজ্যের ভিতে কাঁপন ধরাবে। পরে ইসলাম গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়বে। কোনো শক্তিবলেই ওই ঢেউকে রুখতে পারব না আমরা। স্পেনের ইতিহাস পড়ে দেখো, বেশ কিছুদিন আগে ফ্রান্সে হামলা হয়েছিল। এর কমান্ডার ছিলেন এই আবদুর রহমানই। তিনি ফ্রান্স বিজয় করেছিলেন। এবার আমরা তা হতে দেব না কিছুতেই।

আপনি কি ফ্রান্স থেকে সাহায্য পাচ্ছেন? প্রশ্ন ফ্লোরার।

বিদ্রোহ সেতো ফ্রান্সেরই মদদের ফসল। বর্তমান গভর্নর যিনি নিজকে স্পেন সম্রাট ঠাওরাচ্ছেন– অচিরেই ফ্রান্সে হামলা করতে যাচ্ছেন। মাদ্রিদে অত্যুত্থান ঘটিয়ে আমরা তাকে ও তার সালারদের ফ্রান্সের অগ্রযাত্রা রুখে দিতে সফল হয়েছিলাম। তারা প্যারিস ছেড়ে মাদ্রিদের পথ ধরেছিল। এভাবেই ফ্রান্স বেঁচে যায়। ফ্রান্স আমাদের চেতনা বিকাশকেন্দ্র, শক্তির প্রাণকেন্দ্র এবং ধর্মের সুতিকাগার।

এক্ষণে পরিকল্পনা কি? বাড়ীওয়ালা প্রশ্ন করে।

এতদুদ্দেশেই আমার কর্ডোভা আগমন। কিছুলোকের সাথে সাক্ষাৎ অভিপ্রায়। এক্ষণে টলেডোয় বিদ্রোহের পাঁয়তারা চলছে। শুধু পাঁয়তারা নয় বরং সাজ সাজ রব। আমাদের গেরিলা বাহিনীর সম্মুখে টলেডো বাহিনী পড়তেই তাদের ওপর অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করতে বলেছি। বলেছি, পরক্ষণে নিবিড় জঙ্গলে গা ঢাকা দিতে। ওখানকার গভর্নর মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম। তিনি এই অগ্নিবাণকে তেমন একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কেননা তিনি এদেরকে ডাকাত ও ছিনতাইকারী মনে করছেন। তবে আমাদের দুর্বলতা যা তা হচ্ছে এই যে, টলেডোবাসী বিদ্রোহের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। এর কারণ মাদ্রিদবাসীকে মুসলিম ফৌজ ঘর থেকে টেনে এনে প্রকাশ্য ময়দানে হত্যা করেছিল। এখানকারই কিছু লোক পলায়ন করে টলেডোয় আশ্রয় নিয়েছিল। তারা বড় ভয়ানক সংবাদ পবিবেশন করেছে। বলেছে, যে কোন পাপ করতে মনে চায় করো– তবে বিদ্রোহ নয়।

মানুষের এই দ্বিধা-ভীতি আমাদের বড় মুশকিলে ফেলে দিয়েছে। আমরা সংখ্যায় তেমন একটা আহামরি নই। এরা টহলদার সাঁজোয়া যান ও সেনাক্যাম্পে অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করছে মাত্র। এক্ষণে দরকার মাদ্রিদের মত গোটা শহরবাসীর একসাথে গা-ঝাড়া দিয়ে ওঠা। ট্যাক্স-কর দিতে অস্বীকার করা। মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিমকে গ্রেফতার করে কোনো খ্রীস্টানকে গভর্নর বানানো। সম্রাট লুই বলেছেন, শহুরেদের ছদ্মাবরণে তিনি বাহিনী পাঠাবেন, কিন্তু এর আগে তাকে এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, মাদ্রিদের মত বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণ করবে না। টলেডোবাসীর এই বিদ্রোহে ঢিমেতাল ভাবই এ মুহূর্তে আমাকে ভাবিয়ে তুলছে। হায় হায়! আমি যদি শহরবাসীকে এই মহতী কাজে স্বতঃস্ফূর্ত করতে পারতাম। আহা! টলেডোবাসী যদি মাদ্রিদের ভূমিকা নিতে পারত।

হাশেম কর্মকার ওখানে চলে গেছে আগেভাগেই। লোকদেরকে সেও কি বুঝিয়ে সুজিয়ে রাজী করতে পারবে না? বাড়ীওয়ালা বলল।

তার বড় কৃতিত্ব এখানেই যে, সে একদল তার মতাদর্শের বানিয়ে ফেলেছে। আমি তাকে নামবদল করতে দেইনি। বলেছি, মুসলমানরা যেন তাকে মুসলিমই মনে করে। আমি অবশ্য ভিন্ন একটি উদ্দেশ্যে এখানে এসেছি। ফ্লোরা আমাকে এক নয়া পথের সন্ধান দিয়েছে। আমি ওর থেকে ফায়দা লুটতে চাই। আর তা এভাবে যে, কর্ডোভার আঃ রহমান সুলতানার মাধ্যমে যে পরিস্থিতির শিকার সে পরিবেশ সৃষ্টি করব টলেডোর আমীরের বেলায়। এলোগেইছ বলে দম নিল।

সন্ধ্যার পর একে একে তিনজন লোক এলো। এলোগেইছ তাদের সাথে দীর্ঘ আলাপে ডুবে থাকল। এক নয়া পরিকল্পনার ক নিয়ে সকলে বেরিয়ে পড়ল।

***

বাড়ীটি প্রাসাদোপম। বাড়ীওয়ালা একটা কক্ষ এলোগেইছ, আরেকটা ফ্লোরার জন্য দিল। পরে সে শুয়ে গেল। ফ্লোরা ও এলোগেই কথা বলছিল। উভয়ে স্বধর্মের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। উভয়েই ইসলাম ও মুসলিম জাতিকে স্পেনছাড়া করতে একপায়ে খাড়া। এক সময় এরা একে অপরের ব্যক্তি জীবন নিয়ে আলাপ শুরু করে। ফ্লোরার এক প্রশ্নের জবাবে এলোগেইছ জানাল, মিশন সফল করতেই তার আজো বিয়ে করার ফুরসত মেলেনি। তবে যোগ্য পাত্রীর অভাবও এক্ষেত্রে কিছুটা অন্তরায় যে হয়নি তাও কিন্তু নয়।

আমি আর যাই হই না কেন মানুষ তো। কেউ তার প্রেম বিলাসকে আবেগের বশে কোরবানী করতে পারে না। এ দাবী এক সময় আমি করতাম। কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক এর উল্টো। তুমি কুমারী ফ্লোরা। আমার এ তাত্ত্বিক কথা তোমার বোধগম্য নাও হতে পারে। আমি জীবনোসর্গ করতে পারি। প্রেম-ভালবাসাও কেউ কেউ দুপায়ে দলতে পারে। সত্যি বলতে কি খ্রীস্টত্বের নামে আমি এতটাই উন্মাদ যে, দুনিয়ার কোনো কিছুই আমার সামনে ভাল লাগে না। সেই উম্মাদনাবশে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিয়ের সিঁড়িতে বসব না জীবনেও। তিনজন তরুণী আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। বিয়ে এক শেকল, যা আমার হাত-পা শৃঙ্খলাবদ্ধ করবে-সাফ জবাব দিয়েছি তাদের। বিয়ে আমার স্বপ্নীল– বর্ণিল রাজপথের কন্টক।

ফ্লোরা ভক্তি-শ্রদ্ধার সবটুকু অনুভূতি দিয়ে তার দিকে তাকায়। সে তাকানোতে করুণা, সে দৃষ্টি এলোগেইছের সন্ন্যাসব্রতের মাঝে লীন করার দৃষ্টি।

আমি মায়াকান্না জুড়ে দিতে চাইছি না ফ্লোরা। এলোগেইছ বলল, অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে আমি এমন আত্মত্যাগ করছি; বলবে, কোনো মানুষ এমনটা করে না। এ ব্রত হাতে জ্বলন্ত অঙ্গার রাখার, এ সাধনা বিষের পেয়ালাকে অম্লত্বের মধু মনে করার, এ প্রতিজ্ঞা নিজের হাতে নিজের গলা টিপে দেয়ার। এ শিক্ষা আমি মুসলমানদের থেকে নিয়েছি। এ উপদেশ আমি ওদের থেকেই শিখেছি। পড়ে দেখেছি ওদের কোরআন। উল্টে দেখেছি তাফসীরেরও দুদশ পৃষ্ঠা। সেগুলো পড়ে আমি ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু ঈশ্বর আমার থেকে অন্য কাজ নিতে চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত আমি ইসলাম গ্রহণের স্থলে ইসলামের সবচেয়ে বড় দুশমন সেজে বসলাম।

আরেকটা কথা তোমাকে বলে রাখি ফ্লোরা, যতক্ষণ মুসলমানরা তাদের স্বধর্মে অটল থাকবে ততক্ষণ এ ধর্মমত গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে থাকবে। ওরা যে দেশেই গেছে সে দেশবাসী ওদের কর্মকাণ্ডে প্রভাবিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে। আমাদের পূর্বসূরিরা ওদের হেরেমে নারী সুষমার ঝিলিক দেখানো শুরু করলে ওরা এর সম্মোহনীতে ডুবে গেল। ওদের পতন কার্যত এখান থেকেই শুরু। কিন্তু কিছু জানবার্য আজো টিকে আছে, কিছু মুসলিম এলোগেইছ এখনো বিচরণ করছে-ইসলাম সে কারণেই টিকে আছে। যেমন স্পেনের কমাণ্ডার-ইন-চীফ আরবের, স্পেন গভর্নরের স্ত্রী আরবের-এতেই রক্ষা; নতুবা স্পেন গভর্নর যেভাবে মুসলিম জাতির ভাগ্য শরাবের মটকায় ঢুকাচ্ছিলেন, যেভাবে নারী বিলাসে গলা অবধি ডুবে ছিলেন তাতে ইসলামের এতোদিনে আটলান্টিকে জলমগ্ন হবার কথা। আমি ওদের থেকে শিখেছি, জীবন ও আবেগ যদি কোরবানী করা যায় তাহলে বিজয়ের সোনার হরিণ পদচুম্বন করবেই করবে।

আমার প্রেমাবেগ ও হৃদ্যিক উত্তাপ ছিল ফ্লোরা। সেই শৈশবের কোনো এক ক্ষণে আমার বাবা-মার তিরোধান। ভালবাসার নির্মল উষ্ণ পরশের থেকে উপেক্ষিত আমি। আশৈশব মাঝে মধ্যে আমার পৌরুষে যৌবনের জয়গান বেজে ওঠে। হয়ে পড়ি তখন তীর্থের কাক। খুব সম্ভব এটি আত্মিক পিয়াসা। ওই সময়টাতে মনে করি! হায় আমাকে যদি কেউ এমন জগতের সন্ধান দিত, যে জগতের বদ্ধদুয়ার খুলিনি আমি। নির্জন কক্ষে বালিশে মাথা খুঁজে মনের সাথে বোঝাপাড়া করি। আমার আবেগ, আমার প্রেম, আমার পরিকল্পনার সামনে মাথা হেঁট করে নুইয়ে পড়ে। ওই সময় কেবল একটা চিন্তাই মাথায় ঘুরপাক খায়, কি করে উৎপাটিত করব গেড়ে বসা মুসলিম জাতির শেকড়। ওহ ফ্লোরা……….তোমার ঘুম আসছে। ওঠো কামরায় যাও। শুয়ে পড়গে।

ফ্লোরা খামোশ কামরা থেকে বেরিয়ে পড়ে।

***

গভীর রাত।

গোটা প্রকৃতি ঘুমের ঘোরে। আচমকা এলোগেইছের ঘুম ভেঙ্গে যায়। ফ্লোরা ঘুমাতে পারেনি। তার হৃদয় ও ঠোঁটে এই গুঞ্জন, এ লোক বড্ড তৃষ্ণাতুন। কি বিশাল ত্যাগ করে যাচ্ছে। প্রেমের উষ্ণ পরশ থেকে বঞ্চিত। ফ্লোরা উঠে বসল। ঘরে-বাইরে জমকালো অন্ধকার। তার জীবনে গভীর রাতের আদিম, অনুভূতি এই প্রথম। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে এলোগেইছের কক্ষ লক্ষ্য করে এগুতে থাকে সে। কামরাটি খুব একটা দূরে নয়। দরজায় হাত রাখতেই তা ফাঁক হয়ে যায়। আস্তে আস্তে সে এলোগেইছের খাটের কাছে এসে দাঁড়ায়। আরেকটু এগুতেই খাটে হোঁচট খায়। তার হাত গিয়ে পড়ে এলোগেইছের শরীরে। ধড়ফড়িয়ে ওঠে এলোগেইছ। ফ্লোরা শতদল সুকোমল দুহাত দ্বারা তার গালে পরম প্রশান্তি বুলায় এবং গণ্ডে গও ঘষে।

কে? অস্ফুট কন্ঠে বলে এলোগেইছ, ফ্লোরা?

হা! আমি ফ্লোরা।

এত রাতে এখানে কেন?

তোমার আত্মোৎসর্গের কিছুটা প্রতিদান দিতে। ফ্লোরার কঠে রাজ্যের কাকুতি, তোমাকে সাহারাম সম পিয়াসা নিয়ে মরতে দেব না এলোগেইছ। প্রেমের জন্য ছটফটিও না প্রিয়। আমি তোমার পায়ের জিঞ্জির হবো না। আপনার গোলাম বানাব না। সাময়িক তৃষ্ণা নিবারক মনে করে গ্রহণ করো।

এলোগেইছ ফ্লোরাকে বুকে চেপে ধরে। যে অনুভূতিকে এতদিন সে কল্পনায় হাতড়েছে ধ্যানঘোরে অনুসন্ধান করেছে সে অনুভূতির জীবন্ত সত্তা তো এই মানবীয় এক দিলাশ গোশতপিণ্ড।

ফ্লোরাকে বাহুবন্ধন থেকে মুক্তি দিয়ে সে বলে, দাঁড়াও। আগুন জ্বালাতে দাও। তোমাকে স্বপ্নীল জীবনের বর্ণিল আলোতে আবিষ্কার করতে দাও।

কামরায় আলো জ্বলে উঠল।

ঐতিহাসিক পি, স্কট বলেছেন, এলোগেইছ ও স্পর্শকাতর ফ্লোরা প্রথম সাক্ষাৎ থেকে একই ছাদের নীচে ঘুমিয়ে আসছিল এবং ফ্লোরা নিজকে এলোগেইছের কাছে সঁপে দিয়েছিল। বিশেষ এক আত্মত্যাগের উদ্দেশে সে এলোগেইছের রুমে গিয়েছিল কিন্তু তার হৃদয়ে এমন এক অনুরাগের সৃষ্টি হয়, ওই যুগে যার নজীর মেলা মুশকিল। ওরা বিয়ে তো করেনি, কিন্তু একে অপরকে ছাড়া চলতে পারেনি কোন দিনও।

ফ্লোরা তার জীবন, যৌবন, সতীত্ব ও খ্রীস্টত্বের সবটুকুই এলোগেইছের কাছে সঁপে দিল।

দুতিন দিন তারা ওই রুমে বাস করল। এ সময় কজন খ্রীস্ট পাদ্রী তাদের কাছে এসে এক নয়া পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এলোগেইছ-ফ্লোরা কোনো এক সুযোগে ছদ্মবেশে কর্ডোভা ছেড়ে যায়।

***

এর পরবর্তী রোববার (খীস্টানদের জুমার দিন) থেকে সমস্ত গীর্জায় পাদ্রীদের মুখে একই কথার পুনরাবৃত্তি শোনা যেতে লাগল। তারা ভাষণে বলল, হযরত ঈসা (আ)-কে শূলে চড়ানো হয়েছে, এক্ষণে এখানকার সমস্ত খ্রীস্টানদের শূলে চড়ানোর পায়তারা চলছে। ফ্লোরা নামী এক নজরকাড়া সুন্দরী তন্বীকে স্রেফ একারণেই মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে যে, সে খ্রীস্টান। প্রকাশ্য জনাকীর্ণ আদালতে সে ইসলাম ও মুসলিম জাতির বিরুদ্ধে কথা বলেছে। কয়েদখানার স্থলে তাকে অজ্ঞাত স্থানে বন্দী করে রাখা হয়। যতদূর সম্ভব জানা গেছে, এ মুহূর্তে মেয়েটি লাপাত্তা। কেউ জানে না কোথায় সে।

এসব ভাষণে সুকৌশলে ধর্মকে টেনে আনা হয়েছে। গীর্জায় যারা প্রার্থনা করতে এসে থাকত তাদেরকে উস্কে দেয়া হত। পাদ্রী বলত, সমগ্র খ্রীস্টজনগণকে ফ্লোরার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে। করতে হবে তথাকথিত সেই অপরাধ যে অপরাধে ফ্লোরাকে বন্দী করে সাজা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবাদ ও ধর্মোদ্দীপনার পথ কেবল এই একটাই।

গীর্জা থেকে ফুলে ফেঁপে ওঠা এই ধূম্রজাল এক সময় গোটা শহরে ছেয়ে যায়। এমনো একটি উদ্ভট কাহিনী প্রচারিত হয় যে,

ফ্লোরার বন্দীখানায় প্রতি রাতে মুসলিম অফিসারের আনাগোনা ছিল। সবচে মারত্মক কথা যা প্রচার হলো তা হলো, খোদ স্পেন গভর্নর আবদুর রহমান পর্যপ্ত তাকে হেরেমে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।

এই অপপ্রচার মোয়াল্লেদীন আন্দোলনে ঘৃতাহুতি দিল। কর্ডোভার ঘরে ঘরে একথা পৌঁছে দেয়া হলো। পাদ্রীরা জনাকীর্ণ বাজারে বলতে লাগল, ইসলামে এমন কোন বিধান নেই যে, কোনো নারীকে বিশেষ কোন কক্ষে আটকে রেখে মুসলিম অফিসাররা তার সাথে রাত কাটাবে।

পাদ্রীরা খ্রীস্টবাদের শিক্ষা ও ইসলাম বিদ্বেষের বিষ ছড়াতে লাগল। বলল, আমরা ঈসা (আ)-কে খোদা ও খোদার পুত্র মনে করি। হযরত ঈসা (আ) বলেছেন, আমার পরে যত নবী আসবে (নাউযুবিল্লাহ) তারা সকলে মিথ্যাবাদী। ওসব পাদ্রীরা হযরত রাসূলে আকরাম (স) সম্পর্কে কুশ্রী মন্তব্যও করে যাচ্ছিল।

সমবেত মুসলমানেরা এই শ্রেণীর ধুরন্ধর পাদ্রীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে বুদ্ধিজীবী শ্ৰেণীর শায়খরা ওদের এই বলে নিবৃত্ত করাতেন, দেখো আইনকে নিজের হাতে তুলে নিও না। ওকে কাজীর দরবারে নিয়ে চলো। একে কাজীর দরবারে হাজির করা হলো। কাজী সাহের তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিলে সে বিলকুল ও কথা পাশ কেটে বলল, না! আমি এ ধরনের একটি শব্দও মুখে আনিনি, কিন্তু সাক্ষীর মাধ্যমে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলো। কাজী সাহেব তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেন। ঈদের নামাযের পর এই পাদ্রীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

এর কিছুদিন পর জান নামী জনৈক ব্যবসায়ী ও পূর্ববর্তী পাদ্রীর মত ওই অপকর্মে লিপ্ত হল। বাজারে রাসূল (স) ও কোরআনের নামে কসম খেতে লাগল। মুসলমানরা তাকে বাধা দিল। যেহেতু যে খ্রীস্টান। আর কোনো খ্রীস্টান ইসলামের নামে কসম খেতে পারে না। ইসলামের নামে সামান্য কিছু কুশ্রী ভাষা ব্যবহার করে মাফ চাইল। কাজীর দরবারেই ওঠানো হলে কাজী তাকে কমাসের জেল দিয়ে দিলেন।

***

সুলতানা বাচ্চা প্রসব করল।

মোবারক হে স্পেনশাহ! যিরাব আবদুর রহমানকে মোবারকবাদ দিতে গিয়ে বলল, বাচ্চাটি আপনার চেহারা পেয়েছে। মায়ের সৌন্দর্য নিয়ে দুনিয়ার মুখ দেখেছে। উ ৎসবের ব্যবস্থা করব কি? উৎসবটা প্রবাদ প্রতীম হওয়া চাই। সুলতানারও ইচ্ছে তার সন্তানের উৎসবটা চির জাগরুক করে রাখা দরকার।

তাতো দরকার। আবদুর রহমান বললেন, তবে আমি চিন্তা-ভাবনা করে তোমাদের বলব।

আমি তাহলে কাজ শুরু করে দেই।

মহলে খবর ছড়িয়ে পড়লো যে, সুলতানার সন্তান উপলক্ষে উৎসব হতে চলেছে। মহলের উৎসব জাকজমকপূর্ণ হবে। দুহাতে এনাম দেয়া হবে। শরাবের বন্যা বইয়ে দেয়া হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাজারঘাট বন্ধ থাকবে দিনের পর দিন।

মোদাচ্ছেরা সালার ও মন্ত্রীকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, আমি যদি আমীরে স্পেনের সাথে কথা বলি, তাহলে তিনি একে প্রতিহিংসা মনে করবেন। সুলতানা পুত্র সন্তান প্রসব করেছে বলে আপনাদের কাছে খবর পৌঁছে থাকবে এজন্য জন্মোৎসব পালনের পায়তারা চলছে। আপনারা এ বিষয়ে তাকে নিবৃত্ত করার পদক্ষেপ নেবেন কি?

আমরা পরস্পরে কথা বলেছি। সেনাপতি বললেন, কেউই জন্মোৎসবের পক্ষে নয়।

জন্মোৎসবের সময়ও তো হাতে নেই। মন্ত্রী বললেন, শহরে অনিরাপত্তা ও থমথমে ভাব বিরাজমান। প্রতিদিনই খ্রীস্টানদের লাশ ঝুলছে দুএকটা।

আপনারা নিজেরা যখন কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন তখন আর দেরী কেন? তাড়াতাড়ি তার কাছে যান। বললেন মোদাচ্ছেরা।

উবায়দুল্লাহ ও হাজে আবদুল করিম যখন দরবারে প্রবেশ করেন তখনও আবদুর রহমানের পার্শ্বে যিরাব বসা। সে তাকে বুঝাচ্ছে, শহরে কোন প্রকার অনিরাপত্তা নেই। সর্বত্রই শাস্তির ফোয়ারা বয়ে চলেছে। সমগ্র প্রদেশের অবস্থাও এমন।

সেনাপতি উবায়দুল্লাহ বললেন, আমীরে মুহতারাম! আমরা অনুষ্ঠিতব্য জানন্মাৎসব সম্পর্কে দুচারটি কথা বলতে এসেছি।

সেনানিবাসে কি জন্মোৎসব পালনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে? প্রশ্ন যিরাবের।

ফৌজ অভিযানে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শহরের ফঁসে ওঠা বিদ্রোহাগ্নি ফৌজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে। বিপ্লবের আগুন এখানেও ধরতে পারে বলে ধারণা। মন্ত্রী বললেন।

আমীরে মুহতারাম। আমরা জানতে চাই ফৌজ জন্মোৎসবের প্রস্তুতি নেবে নাকি নেবে টলেডো যাত্রার প্রস্তুতি? আজ না হোক কাল ওখান থেকে খবর আসবে– কমান্ডো পাঠাও।

কিন্তু উৎসবে সময় নষ্ট হবে কতটুকু? কিছুদিনের প্রস্তুতি, উৎসবে একরাত-এই তো নাকি? যিরাব বলল।

পতাকা ভূলুষ্ঠিত হতেও তো সময় লাগে না খুব একটা যিরাব। সেনাপতি বললেন।

আর ওই দেশের পতাকা ভূলুষ্ঠিত হতে তো এক মুহূর্তও লাগার কথা নয় যে দেশের রাজার উপদেষ্টা এক সঙ্গীতজ্ঞ। কেন তুমি জানো না দেশের মহানগরীগুলোয় কি হচ্ছে?– প্রশ্ন মন্ত্রীর।

আমীর আবদুর রহমানের চেহারায় অস্বস্তির রেখা ফুটে উঠল। তিনি ধড়ফড়িয়ে উঠলেন। বললেন, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি আমাকে জানাও। তিনি রাগতঃকণ্ঠে বললেন, যিরাব তো আমাকে এইমাত্র বলল, দেশে শান্তি বিরাজ করছে।

শহরে এক খ্রীস্টানের লাশ ঝুলছে। ইসলাম বিদ্বেষীর কর্মকাণ্ড তার নিজস্ব নয়- কোন না কোন ষড়যন্ত্রের ফসল এটা যা প্রতিহত করা না গেলে বিপ্লব, অভ্যুত্থান অনিবার্য।

বিদ্রোহ ফওরান আমরা প্রতিহত করব যিরা বলল।

নাচ-গান ও জন্মোৎসব পালনের দ্বারা বিদ্রোহ দমন করা যায় না যিরাব। সেনাপতি বললেন, আর তোমাদের মোটা ব্রেন একথা বুঝতে অপারগ যে, বিদ্রোহ ও সন্ত্রাসের পেছনে কি কারণ থাকতে পারে?

আমীরে মুহতারাম। আমরা কথা বলছি আপনার সাথে। স্পেন ষড়যন্ত্রভূমিতে রূপ নিয়েছে।

আর সেই ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্য, আমাদের সুস্থ থাকতে না দেয়া-এইতো। ফ্রান্সের আক্রমণ মুলতবি রেখে ষড়যন্ত্র শেকড় উপড়ে ফেলা ষড়যন্ত্রের কারণ এটাই বুঝি। মনে রেখ ফ্রান্স আক্রমণ ভূলিনি আমি। ওই দেশে হামলা চালানো আমার জন্য ফরয। এ ফরয আমাকে আদায় করতে হবে………..কিন্তু আমীরে স্পেন খানিক থেমে বললেন, জন্মোৎসব পালন করলে এমন কি আসে যায়।

তেমন কিছু না। খানার কিছু উজাড় হবে মাত্র। জনগণ কদিন জন্মোৎসবে মেতে উঠবে। আমরা বলতে চাই, হেরেমে মানুষ পয়দা হতে থাকবে। উৎসব ও এনামের এই পরম্পরা আমাদের বন্ধ করতেই হবে। এক্ষণে খানার অর্থ যতটা দরকার ততটা দরকার হয়নি ইতিপূর্বে–বললেন মন্ত্রী,

এ উৎসব আমাদের মর্যাদার পরিপন্থী। আগামী বংশধরের জন্য এমন কিছু রেখে যাওয়া দরকার যা স্মরণ করে তারা গর্ববোধ করবে। আমীরে মুহতারাম! এই সন্তান এমন এক নারীর গর্ভজাত যিনি আপনার বিবাহিতা স্ত্রী নন। যেহেতু আমাদের হেরেমে অবিবাহিতাকে রাখার প্রচলন জায়েজ করে নেয়া হয়েছে সেহেতু একে নিখাদ ইসলামী দৃষ্টিকোণে বিচার করলে বলুন তো বিধর্মীরা কি বলবে? বলবে, এক জারজ সন্তানের জন্মোৎসব পালন চলছে স্পেন প্রাসাদে। কি বলবে আমাদের পরবর্তী বংশধর?

আমীরে মুহতারাম! দেশের সঠিক রিপোর্ট আপনাকে দিতে পারি কেবল আমরাই। যাকে তাকে আপনার উপদেষ্টা করলে আমাদেরকে আমাদের কাজ করার স্বাধীনতা দিন। আমরা আমাদের কাজ করে যাব। আমরা ঈমানী দায়িত্ব থেকে এতটুকু বিচ্যুত হব না। আমাদের স্বাধীনতার চেতনা ভিন্ন।

কাঁচা ঘুম ভাঙ্গার মত চমকে উঠলেন সিংহশাবক আবদুর রহমান। দ্বৈত সত্তার অধিকারী এই আবদুর রহমান। তার সত্তার একটা অংশ বিলাসিতার আরেকটা মৃজাহিদীর, বীরত্বের।

সেনাপতি ও মন্ত্রীগণ জানতেন আবদুর রহমানের দ্বৈত সত্তার দিকটি। তাই তারা সুকৌশলে অপূর্ব উপস্থাপনায় তার ভেতরের সিংহকে উজ্জীবিত করেন। তারা বিগত দিনে ভেবেছেন যিরাব ও সুলতানা আপদ দূর করতে, কিন্তু এতে ফল হবে উল্টো। এদের বিরহে আবদুর রহমান মদ নিয়েই কাটাবেন। হয়ে পারবেন নিয়মিত মদসেবী। ফলে নিজেও ডুববেন, জাতিকেও ডুবাবেন।

আমীর আবদুর রহমান উঠে দাঁড়ালেন। টহল দিতে লাগলেন এই বলে, টলেডোর খবর কি। যিরাব! তুমি যেতে পার। জন্মোত্সব হবে না।

টলেডোর পরিস্থিতি ভালো না। এটি মাত্রীদের একটি শহর। আবদুর রহমানের বাবা আল-হাকামের যুগে এখানে একবার বিদ্রোহ হয়েছিল। প্রচুর খ্রীস্টানের হত্যা হয় তখন। হাশেম কর্মকার ছিল টলেডোবাসী। প্রথমে খ্রীস্টান থাকলেও পরে সে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। শহরে বিদ্রোহীদের হত্যাযজ্ঞ শুরু হলে হাশেমের বাড়ীও রক্ষা পায়নি। তার বিবি-বাচ্চা ঘরদোর ছেড়ে পালিয়েছিল কিন্তু পথিমধ্যে ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হয়। পরিবার ছাড়া হাশেম কর্ডোভা এসে কর্মকারের কাজ নেয়। এবং তলে তলে মোয়াল্লেদীন আন্দোলন শুরু করে। ফ্লোরাকে সে-ই আশ্রয় দিয়েছিল। পরে করেছিল জনৈক পাদ্রীর কাছে হাওয়ালা। তার যবানে ছিল যাদু। একবার যে তার কথা শুনত সে পাগল হয়ে যেত।

কর্ডোভা ছেড়ে এক সময় সে টলেডো আসে। টলেডোর খ্রীস্টানদের জড়ো করে। এক মহান আন্দোলনের নেতা বনে বসে।

টলেডোয় ইতিপূর্বেও বিদ্রোহ হয়েছিল। এতে বিদ্রোহীদের প্রচুর জানমালও ক্ষয় হয়েছিল। টলেডোয় আচমকা একদিন আওয়াজ ওঠে যে, কবরস্থানে জনৈক দরবেশের আবির্ভাব ঘটেছে। যিনি হামেশা বলে চলেছেন, ঈসা মসীহের অনুসারী হে জাগো। তোমাদের হাতে ক্ষমতার আসছে। লোকেরা বলাবলি করতে লাগল, এ হয়ত কোনো পাদ্রীর অশরীরী আত্মা। মানুষকে অমীয় বাণী শোনাচ্ছে। ওদিকে গীর্জার পাত্রীদের কাছে এ খবর শোনানো হলে তারা বলল, ওই আওয়াজদাতা অশরীরী আত্মাকে কবরস্থান থেকে তাড়ানো উচিত হবে না। এ ধরনের পুণ্যাত্মা মানুষকে সৎপথ দেখায়।

কদিনের ব্যবধানে জানা গেল কবরস্থান থেকে দিয়াশলাই-এর রশি উঠছে, সেই রশ্মি থেকে ভেসে আসছে, তোমাদের ঘুম হারাম করে দাও। জাগে, অপরকে জাগাও। সেই কেয়ামতকে রুখখা, যা তোমাদের দিকে ধেয়ে আসছে।

খ্রীস্টানরা অশরীরী আত্মা ও প্রেতাত্মায় বিশ্বাস করত। ওযুগে এ বিশ্বাস সবার মনে বদ্ধমূল হত। তারা ধারণা করত প্রেতাত্মা মানুষের ক্ষতি করতে পারে আর পুণ্যাত্মা করতে পারে উপকার। কাজেই দলে দলে সকলে কবরস্থানের উদ্দেশ্যে যেতে থাকে। কবরস্থান খুবই প্রশস্ত। সেখানে রকমারী বৃক্ষ ঠাসা। লোকেরা এর বাইরে দাঁড়িয়ে রূহের আওয়াজ ও দিয়াশলাইয়ের রোশনাই দেখত।

এক রাতে উৎসুক মানুষের ঠাসা ভীড়। জলদগম্ভীর স্বরে ঘোষণা এলো, অশরীরী পুণ্যাত্মা আজ নয়া কোনো পয়গাম নিয়ে হাজির হবে। মানুষের ভীড় আরো তীব্র হলো। মোহাম্মদ ওয়াসিমের বাহিনী চৌকি পাহারায় ছিল। কাজেই তারা ব্যাপারটি আগাগোড়া কিছুই জানতে পারল না।

জমকালো আঁধারে ঢাকা কবরগাহের পরিবেশ। ভীত-স্ত্রস্ত মানবতা চূড়ান্ত মুহূর্তের অপেক্ষায়। সকলের মনে হাতুড়ি পেটা শুরু। আচমকা দেয়ালের ও পাশ থেকে পৌরুষবহুল কণ্ঠ চিড়ে বেরিয়ে এলো একরাশ কথা। ধর্মোদ্দীপনা জাগরুক করে তোল। কল্পনায় কুমারী মরিয়মক আনো এদিকে।

লোকেরা ধর্মসংগীত গাওয়া শুরু করল। সংগীতটি নেহাৎ হৃদয়স্পর্শী। কবরগাহের রশ্মি উপরে উঠতে লাগল। আগুনের আশে পাশে সাদা ধোয়ার আনাগোনা। যেন মেঘ খণ্ড কুন্ডলী পাকিয়ে ওঠা নামা করছে। এতে দেখা যাচ্ছে এক নারী প্রতিকৃতি। আগুনের রশ্মি আরো উঁচুতে উঠতে লাগল। ওতে দেখা গেল নারীর একরাশ চুল কাঁধে ছড়ানো।

সমবেত স্থানে পিন পতন নিস্তব্ধতা। ভক্তিভরে কেউ কেউ হাঁটু গেড়ে হাত জোড় করে বসে গেল। বলতে লাগল, গোনাহের কাফফারা আদায় করো। ওঠো খোদার পুত্রের রাজত্ব কায়েম কর। যদি না করো তাহলে আমি ব-বিজলী হয়ে তোমাদের ওপর আপতিত হবো।

এই কুমারী আত্মা ফ্লোরার।

আগুন এক সময় কমে এলো। কবরগাহে নেমে এলো পূর্বেকার জমকালো পরিবেশ। পরদিন সেটা টলেডোয় বিদ্রোহের ঘনঘটা শুরু হলে।

২.৪ বিষকামড়

সেপ্টেম্বর, ৮২৯ খ্রীস্টাব্দের কোনো এক রাত।

আমীর আবদুর রহমান হেরেমে শায়িত। সঙ্গীতের সুর মূর্ঘনায় তিনি বিমোহিত। এটা যিরাবের কারিশমা। জীবন বীণার সূক্ষ্মতারে তিনি ঝংকার তুলছেন। তিনি স্থান কাল পাত্র বুঝে সংগীতের বোতাম টিপতে পারতেন। আবদুর রহমানের আবেগ ও স্পর্শকাতর দিকটা তার জানা ছিল।

সুলতানা তার পাশে বসা। যেন সে আঃ রহমানকে কোলে করে নেয়া। আমীর চুলু ঢুলু চোখে আবদুর রহমানের দিকে তাকান। সুলতানার মুখে খেলে যায় উচ্ছ্বসিত হাসি। সুলতানার রূপলাবণ্য কমার পরিবর্তে দিন দিন যেন বেড়েই চলছিল।

এ সময় সবাইকে হতবাক করে দিয়ে দরজার কপাট খুলে যায়। বিরক্ত দৃষ্টিতে সেদিকে তাকায় সুলতানা। সে দেখল, দরজায় দারোয়ান দণ্ডায়মান। উঠে দরজার কাছে গেল সুলতানা। আবদুর রহমান জিজ্ঞেস করলেন-দরজায় কে?

দারোয়ানা সুলতানা বলল- টলেডো থেকে এসেছে। জরুরী কোন পয়গাম নিয়ে এসেছে।

সঙ্গীতের রাগ থেমে গেছে। কামরায় রাজ্যের নিস্তব্ধতা। আমীর আবদুর রহমান অঙ্গ মোচড়ান।

আমীরে স্পেন! যিরাব বলল, দূত সকালেও আসতে পারে। পয়গাম অতি জরুরী হলে এক দুদণ্ড পরেও আসা যেতে পারে। আমীরে স্পেন কারো বন্দী নয়তো।

সকালে আসতে বলল। চোখ ঢুলুঢুল অবস্থায় আবদুর রহমান বললেন।

দূতকে বলো সকালে দেখা করতে যিরাব বলল।

দারোয়ান চড়ে গেল। যিরাব ও সুলতানা মুখ চাওয়া-চাউয়ি করল। উভয়ের ওপ্রান্তে ভেসে উঠল অর্থপূর্ণ হাসি। হেরেমে আবার গুঞ্জরিত হলো পিয়ানোর সুর।

খানিকবাদে আবারো দরজা খুলে গেল। উঠে গেল সেই সাথে পর্দাও। আমীরে স্পন, যিরাব ও সুলতানা সকলে চমকে উঠলেন। এবারে সুলতানা ও যিরাবের চেহারার প্রতিক্রিয়া অন্যরকম। কেননা এবারে পূর্বানুমতি ছাড়া যিনি দরজা ঠেলে পর্দা উঁচিয়ে ভেতরে আসছেন তিনি আবদুর রহমানের ২০ বছর বয়স্ক পুত্ৰ উমাইয়া। উপ-সেনাপতি। ফৌজে তার পদমর্যাদা। একরাশ ঘৃণাসুলভ কণ্ঠে সে বললো,

আপনাকে পিতা নাকি আমীরে স্পেন বলব?

কি হলো তোমার উমাইয়া! তোমাকে এতটা অগ্নিমূর্তি দেখাচ্ছে কেন? আবদুর রহমান উঠে বসে বললেন।

টলেডোর বিদ্রোহীদের কি এ খবর দেব যে, তারা যেন কাল সকালে অভ্যুত্থান করে। কেননা, আমীরে স্পেন এক্ষণে সংগীত মোহে আচ্ছন্ন? টলেডোর দূতকে কে বলেছে সকালে দেখা করতে?

আরব দেশে কোন মা এমন সন্তান জন্ম দিয়েছে বলে আমার জানা নেই। তুমি কি আদর-লেহাজ ভুলে গেছো?

এ সময় আপনি আদর-লেহাজের যোগ্য নন। আদব-লেহাজ পাওয়ার যোগ্য তখন আপনি যখন দুশমনের সামনে পিঠটান করে দাঁড়ান। রণাঙ্গনের আদব। আলীজাহ! এতে তোমার কোনো আফসোস নাই যে, আমি বাবার সাথে ঔদ্ধত্যপূর্ণচিত্তে কথা বলছি। কিন্তু ইতিহাস ও স্বাধীনতার চেতনায় ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করলেই কেবল আমার অনুশোচনা। আপনার মৃত্যুর পর জাতি বলবে, এ সেই লোকের সন্তান যিনি স্পেনের জাতিসত্তার শেকড় দুর্বল করে দিয়েছিলেন।

কি বলতে চাও তুমি?

জোয়ান বেটা বেরিয়ে গেল। নিয়ে এলো ছেঁড়াকাটা জামাধারী এক লোককে। তার মাথা ঘুরছে। মনে হচ্ছে টানা সফরের ক্লান্তিতে সে নেতিয়ে গেছে। উমাইয়া যিরাব ও সুলতানাকে কামরা থেকে বেরিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন।

বাবা! এ দূত টলেডোর। বড্ড পেরেশান অবস্থায় আমার কাছে এসেছেন। তিনি আপনার সাথে জরুরী আলাপ করতে চান। এত দ্রুত ছিল তার সফর যে, রাতেও সামান্য বিশ্রাম নেয়ার ফুরসৎ মেলেনি। পথিমধ্যে তার একটা ঘোড়া টানা সফরের ধকল সইতে না পেরে মারা গেছে। জনৈক মুসাফির থেকে ঘোড়া হাওলাত করে কোনক্রমে আপনার বালাখানায় পৌঁছেছেন।

টলেডোয় খ্রীস্টানরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। দূত বললেন, প্রথমদিকে তারা আমাদের সেনাক্যাম্পের ওপর গেরিলা হামলা চালায়। ফৌজি রসদ বহরের ওপরও তারা বারকয়েক হামলা চালিয়েছে। ওদের সন্ধানে বাহিনী পাঠিয়ে কোন ফল হয়নি। কবরস্থানে ভেল্কিবাজি করে নগরবাসীকে বিদ্রোহে নামানো হয়েছে। বিদ্রোহীদের অস্ত্র চালনা দ্বারা বোঝা যাচ্ছে, তাদের কমান্ডার টেনিং-প্রাপ্ত বিদেশী কেউ। তবে মাদ্রিদের মত গণ বিদ্রোহ হয়নি।

যতদূর জানা গেছে, হাশেম কর্মকার এই বিদ্রোহের শিরোমণি, কিন্তু কোন খোঁজ নেই। জানা গেছে, ফ্লোরা নাম্নী এক মেয়ে যাকে সকলে দ্বিতীয় মরিয়ম সাব্যস্ত করেছে এই বিদ্রোহে সে ঘৃতাহুতি দিয়েছে। শহরবাসী রীতিমত সৈনিক সেজেছে। সুযোগ পেলেই তারা হামলা করে বসে।

বিদ্রোহীরা সরকারী কোষাগার লুণ্ঠনের চেষ্টা করছে কি? প্রশ্ন আঃ রহমানের।

আমীরে স্পেন, দূত বললেন।

ওরা কি সৈনিকদের মত সুশৃঙ্খল?

না। ওদের ভাবখানা ডাকাত ও ছিনতাইকারীদের মত। আবদুর রহমান দূতকে আরো কিছু প্রশ্ন করার পর বিদায় করলেন। শাহী প্রহরীকে ডেকে সেনাপতি ও মন্ত্রীকে দেখা করতে বললেন।

***

টলেডোর দুর্গম পাহাড়ী অঞ্চল।

ঘন ঝোঁপ ঝাড়ে স্থানটি ভরা।

এ এলাকা জনশূন্য। পাহাড়ের গায়ে বিশাল বিশাল গর্ত। এসব গর্তে একটা আলো জ্বলছে। এ গুহাই হাশেম কর্মকারের ঘাঁটি। একলোক ওখানে প্রবেশ করল। তাকে দেখে চতুর্দিকের লোক একত্রিত হল। তন্মধ্যে আছে সুন্দরী এক তরুণী। ফ্লোরা যার নাম।

বিদ্রোহীদের মনোবল তুঙ্গে তো? ফ্লোরা জিজ্ঞেস করল, কি সংবাদ এনেছ?

সংবাদ আমাকে শুনতে দাও! তুমি এখনও অপরপি। বিদ্রোহ ও যুদ্ধে আবেগ কাজে আসে না বলে এক লোক আগন্তুককে বললো, হ্যাঁ। বলল খবর কি?

সব কাজই ঠিকঠাকমত চলছে। আগন্তুক বললো, আপনার নির্দেশনা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। তাজা খবর হচ্ছে, জনৈক মুসলিম দূতের কর্ডোভা যাত্রা। ওখান থেকে ফৌজ আসবে। টলেডোর সরকারী বাহিনীকে আমরা অতি দ্রুত শেষ করতে পারব। কিন্তু কর্ডোভা বাহিনী এসে পড়লে পরিস্থিতির মোকাবিলা মুশকিল হয়ে পঁড়াবে।

আমাদেরকে সেনা শৃঙ্খল হতে হবে। সকলকে বাড়ী বাড়ী অস্ত্র রাখতে বলেছি। নির্দেশ পেয়েই যেন সকলে সশস্ত্র নেমে পড়ে। হাশেম বলল।

হাশেম তার আশে পাশের লোকদের বলল, আমাদের কিছু লোক টলেডোর বাইরে থাকবে, তারা যেন কর্ডোভা বাহিনীকে পথিমধ্যেই আটকে দিতে পারে।

কিছুদিনের মধ্যে টলেডোর বাইরে এক বাহিনী গড়ে তোলা হলো। টলেডোর গভর্নর ছিলেন মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম। তার বাহিনী ছিল খুবই নগণ্য। শহরের শান্তি, নিরাপত্তা ছিল এদের হাতে ন্যস্ত। এই বাহিনী গেরিলা বিদ্রোহীদের সন্ধানে থাকত। মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিমের হেড কোয়ার্টার টলেডোর বাইরে একটি সুন্দর শ্যামলিমাময় স্থানে। তার কাছে খবর আসে, টলেডোর দুতিন মাইল দূরে শক্ত বাহিনী গড়ে তোলা হচ্ছে। খুব সম্ভব এরা টলেডোর ওপর হামলা চালাবে। এমনটা হলে এ শহর খীস্ট রাজ্যে রূপান্তরিত হবে।

মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম দ্রত একদল বাহিনীকে প্রস্তুতি নিতে বললেন। বাহিনী প্রস্তুত হলো। এদের নেতৃত্বভার নিজেই নিলেন।

ইবনে ওয়াসিমের আত্মতৃপ্তি ছিল এই ভেবে যে, তিনি অপেশাদার লোকদের বিরুদ্ধে সৈন্য মার্চ করতে যাচ্ছেন। কিন্তু বিদ্রোহীদের মুখোমুখি হলে দেখলেন ওরা সংখ্যায় বেশী। তিনি হুকুম দিলেন ওদের একটাও যেন জীবন্ত ছাড়া না পায়। বিদ্রোহীরা দীর্ঘক্ষণ ধরে লড়াই করে পিছু হটে যায়। আচমকা মুসলমানদেরকে তিনদিকে থেকে একদল সুদক্ষ ফৌজ হামলা করে বসে। মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম অবস্থা বেগতিক দেখে সেনাদের পিছু হটতে বললেন।

তিনি বাহিনীকে ফেরৎ এনে দেখলেন অর্ধেক ফৌজ তার খোয়া গেছে। তিনি সংবাদ পেয়েছিলেন বিদ্রোহীরা ছোট ছোট দলে আক্রমণ করবে কিন্তু এখানকার পরিস্থিতি তাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে তার ভুল ভেঙ্গে দেয়।

***

পলায়নকালে দুমুসলিম সেপাইকে চার বিদ্রোহী পশ্চাদ্ধাবন করছিল। এলাকাটি ঘন পাহাড়ী ঝোপে ঠাসা। তারা ওই ঝোপে আশ্রয় নিল। বিদ্রোহীরা ঘোড়পৃষ্ঠে এদের ওপর এলোপাতাড়ি তীর মেরে যাচ্ছিল, কিন্তু সমস্ত তীর নিশানচ্যুত হলো। মুসলিম সেপাই পাহাড়ের ঝোপে আশ্রয় নিল বটে, কিন্তু তাদের ধারণা এখান থেকে বেরোনো খুব। একটা সহজ নয়। তারাও ঘোড়া ছেড়ে পারলে ছুটতে লাগল। জঙ্গল খুবই ঘন। বিদ্রোহীদের অনুসন্ধানী আওয়াজ তাদের কানে ভেসে আসছে। তারা বেশ ওপরে উঠে গেছে যেখান থেকে অবলীলায় নীচে দেখা যায়।

কিছুক্ষণের মধ্যে বিদ্রোহীরা নীচে এসে গেল। থমকে থমকে চলছিল তারা। তাদের একজনে বলল, ওদের তালাশ করে মারা দরকার। আমাদের মূল ঘাঁটিতে বেটারা যেন পৌঁছে না যায়।

দেখ দেখ! আরেকজনে বলল, ওরা বেশ সামনে অগ্রসর হয়েছে। ঘাঁটি দেখে ফেললে আমাদের অবস্থা শোচনীয় হবে বৈকি।

মুসলিম সেপাহীদ্বয় জীবন বাঁচানোর তাগিদে হন্যে হয়ে ঘুরে ফিরছে। তাদের কানেও বিদ্রোহীদের উপরোক্ত কথা যায়। বলে, খুব সম্ভব ওরা সে জায়গার কথা বলছে যেখানে ওদের নেতারা থাকে এবং যাবতীয় দিক নির্দেশনা দিয়ে থাকে।

শুনেছি যে কুমারী মরিয়মের আর্বিভাব ঘটেছিল কবরস্থানে, সেও এখানে আছে। অপরজনে বলল।

আমাদের কমান্ডার বলেছিল বিদ্রোহী নেতা হাশেম কর্মকার। সে তার সাথে এক তন্বীতরুণীকে রেখেছে। ওই তরুণীকে তারা পবিত্র মনে করে।

আল্লাহর নাম নাও দোন্ত। অপরজনে বললো, ওই স্থান তালাশ করো! মরতে হলে কিছু করেই তবে মরব। ধর্মের নামে ওরা ধোকা দিলে সেই ধোকাকে আমরা ইসলামের নামে খতম করব। ওপরে অবস্থান নেয়া বিদ্রোহীরা বলেছে, আমরা না আবার আগে বেড়ে যাই।

এদের উপরে যারা ছিল তারা আগে বেড়ে গেল। মুসলিম সেপাহীরা পালানোর পথ পেয়ে গিয়েছিল। মুসলমানরা আত্মরক্ষার স্থলে এ মুহূর্তে গেরিলা হামলার চিন্তা করল। কেননা ওই চার বিদ্রোহী সওয়ারদের তারা দেখতে পাচ্ছে। সেপাহীরা চাচ্ছে বিদ্রোহী ছড়িয়ে পড়ুক-তাহলে যুতসই হামলা চালানো সম্ভব।

বাস্তবেও তাই হলো, ওরা আলাদা আলাদা চলতে লাগল। মুসলিম সিপাহীরা যেখানটায় আত্মগোপন করেছিল সেখানটা পাহাড়ের প্রান্ত। তাদের নীচে নামার কথা। বিদ্রোহীরা কেটে পড়ার পর উভয়ে বিদ্রোহীদের অবস্থান নেয়া ওপরের প্রান্তর।

এখান থেকে তারা একটি আলোকোজ্জ্বল গুহা দেখতে পায়। বিদ্রোহীরা ওই গুহার সামনে এসে দাঁড়াল। এ সময় গুহার মুখে এক নজরকাড়া সুন্দরীকে দেখা গেল।

এ সেই মেয়ে বোধ হয়! জঙ্গলে ওই মেয়ে ছাড়া আর কার থাকার কথা? বলল মুসলিম সেপাইয়ের একজন।

***

টলেডোর গভর্নর হাউজ।

বিক্ষিপ্ত পায়চারী করছেন মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম। গোয় হাতের মুঠোয় মুঠো পুরে তিনি বলছেন,

কর্ডোভা থেকে এখনো কমান্ডো আসছে না কেন? দূত এখনো ফিরে আসেনি, বিলাসী আবদুর রহমান বোধ হয় যিরাবের সংগীতে ডুবে আছে, বগলদাবা করে আছে সুলতানকে।

কর্ডোভা থেকে ফৌজ আসার আগে বিদ্রোহী বাহিনীর সাথে আলাপ করলে কেমন হয়। তাদের থেকে জানুন না তাদের দাবী কি? বলল জনৈক ফৌজি কমান্ডার।

ওরা টলেডো লেখে দিতে বললে এই প্রস্তাবনা তুমি মেনে নেবে কি? মনে করছ পরাজিত হবার পর দুশমনের কাছে আমি করুণা ভিক্ষা চাইব? কোরআন বর্ণিত বিধানের বাইরে যাব? জানো কোরআনে পাকের বিধান কি? কোরআনের ভাষণ হচ্ছে, সন্ত্রাসের শেষ ছিটেফোঁটা থাকা পর্যন্ত জেহাদ চালিয়ে যাও। কুফরের ফেত্নাকে আমার আঙ্গিনায় প্রবেশানুমতি দিতে পারি না।

আমার উদ্দেশ্য সেটা নয়। বিদ্রোহীদের সাথে আমি কোন প্রকার সমঝোতার কথা বলছি না। চাচ্ছি আলোচনা চালিয়ে কালক্ষেপণ করতে। কমান্ডো আসতেই আমাদের এমন কোনো প্ল্যান নিতে হবে যাতে ওদের পিলা বিদীর্ণ হয়ে যায়।

সন্ধি-সমঝোতাকে যদিও আমরা একটি চাল হিসেবে নেই তথাপিও আমাদের আবদুর রহমান একে একটা মৌলনীতি হিসেবে গ্রহণ করবেন। বিলাসিতার সাথে দেশ চালানোর সহজ পন্থা হচ্ছে দুশমনকে দোস্ত করে জাতিকে ধাঁধার মধ্যে রাখা এবং আত্মপ্রবঞ্চিত হওয়া। এমন একটা সময় আসবে যখন আমাদের জাতি দুশমনের হুমকিতে ভীত হয়ে জাতির বাদশাহদের বীরত্বপূর্ণ কাহিনীগুলোকে মিথ্যে ঠাওরাবে। এ সময় শাহী প্রহরী এসে বলল, জনৈক কমান্ডার আপনার সাক্ষাপ্রার্থী।

এতে অনুমতির কি দরকার? কাউকে আসতে বাধা দিও না। সবার জন্য আমার দরজা উন্মুক্ত। আমি বাদশাহ কিংবা স্পেনের আমীর নই।

কমান্ডার ভেতরে এলেন। তাজা খুনে তার জামা লালে লাল।

তুমি কি যখমী? প্রশ্ন ইবনে ওয়াসিমের।

আমি আমার যখম দেখতে আসিনি। একশ সৈন্য নিয়ে আমি চৌকি প্রহরায় যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে বিদ্রোহী গেরিলা বাহিনী আমাদের ওপর চড়াও হয়। সংখ্যায় ওরা দুশ এর কম হবে না। আমার বাহিনী যতটা ক্ষিপ্র, চৌকস ও সুদক্ষ ততটা ওরাও। আমি আমার অধীনদের বীরত্বের উপাখ্যানও শোনাতে আসিনি। বলতে এসেছি, আমার একশ-এর ৬১ জনই শাহাদতের শিরীন শরাব পান করেছে। তবে তারাও দুশমনের একশ জনকে জাহান্নামের পথ দেখিয়েছে।

ওই চৌকি বাঁচানো সম্ভব হয়েছে কি?

না। চৌকি প্রহরী সামান্য ছিল। বিদ্রোহীরা ওটি দখল করে নিয়ে গেছে। আমি বলতে এসেছি বিদ্রোহীদের সংখ্যা এত বেশী যে, তাদের মোকাবেলা করার মত সেপাই আমাদের নেই। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে এই যে, দূরের ঘন ঝোঁপ-ঝাড়ে কিছু একটা আছে। বিদ্রোহীদের মদদ ও নির্দেশনা ওখান থেকেই আসছে বোধ হয়। হাশেম কর্মকার ও ফ্লোরা ওদের কাছে সর্বাপেক্ষা প্রিয় নেতাগোছের-এমর্মেও তথ্য আমার কাছে। আমার ধারণা ওরা গভীর ওই অরণ্যের কোথাও ঘাঁটি গেড়ে আছে। কাজেই এ মুহূর্তে আমার পরামর্শ জানবার্য একটা টিম গঠন করে ওদের কলিজায় আঘাত করার ব্যবস্থা করা হোক।

আমি দুর্গম ওই পাহাড়ী অবস্থান সম্পর্কে সর্বশেষ অবহিত। ওখানে কাউকে খুঁজে বের করা চাট্টিখানি কথা নয়। প্রথমত দুএকজন অনুসন্ধানী লোক পাঠানো লাগবে। তারা যুতসই রিপোর্ট দিলেই কেবল জানবার্য টিম পাঠানো যেতে পারে। ইবনে ওয়াসিম বললেন।

আমার গোস্তাকির জন্য আগাম মাফ চেয়ে নিচ্ছি। আপনি সম্ভব-অসম্ভবের দোলাচলের কথা বলছেন। অসম্ভবকে এই মুহূর্তে আমাদের সম্ভব করে দেখাতে হবে। কর্ডোভার কমান্ডো আগমন পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করতে পারব না। উদ্দীপনা ও স্পৃহাকে এ মুহূর্তে কাজে লাগাতে হবে। বিদ্রোহীদের উৎসগিরি খতম না হওয়া পর্যন্ত বিদ্রোহ দমন হবে না। আমাদের কোরবানী দিতে হবে প্রচুর। আমরা জানবাযি রাখতে প্রস্তুত। আমরা বেশী অপেক্ষা……………., কমান্ডার আর কিছু না বলে মূৰ্ছা খেয়ে জমিনে লুটিয়ে পড়ল। মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম ও উপস্থিত উপ-সেনাধ্যক্ষরা তাকে ঘিরে ধরল। তার পেটে কাজ কাপড় মোড়ানো। অধিক রক্তক্ষরণের ফলে তিনি শাহাদত বরণ করলেন। কোনো মোজেযাবলেই এতক্ষণে তিনি কথা বলেছেন। কাপড় সরিয়ে দেখা গেল তার পেট ফাড়া।

এই জানবায যখন এখানে এসেছিল তখন সে জীবিত ছিল না। তার রুহ-ই। এতক্ষণ আমাদের সাথে কথা বলেছে। উহধ্বনি দিয়ে তিনি বলছেন, কওমের কোরবানী ও উদ্দীপনা শাসকদলের দহলিয়ে গিয়ে অর্থহীন ও নিশ্চল হয়ে ফেরে। কর্ডোভার দূত এখনও আসেনি। আমাদের আমীর বোধ হয় টলেডো পরিস্থিতি এখনও ঠাওর করতে পারেন নি। তিনি ঠাওর করতে না পারলেও আমরা পারছি। তিনি রাজত্ব ও ক্ষমতার পূজারী। আমরা স্বাধীনতার অমীয় চেতনায় বিশ্বাসী। স্পেন কারো বাপ-দাদার সম্পত্তি নয়। যতক্ষণ জিন্দা আছি ততক্ষণ আমরা একে বুকের তাজা খুনে রক্ষা করে যাব। মরলেও যার যার দায়িত্ব আদায় করেই তবে মরব। কিন্তু হাশেম কর্মকারের তথ্য কে দেবে আমায়?

মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম দুহাত উঁচিয়ে আসমানের দিকে তাকিয়ে হাউমাউ করে ওঠেন। তোমার নামে…………তোমার সাহায্যে……..আমাদের ভুলে যেও না খোদা……..।

***

খোদাতায়ালা সিংহশাবকদের ভুলতে পারেন না। কর্ডোভাবাসী ভুলে গিয়েছিল যে, মোয়াল্লেদীন আন্দোলন কি। তারা বিশাল চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে মুসলিম জাতির সামনে। এ সেই আবদুর রহমান যিনি ফ্রান্সের ওপর হামলার ছক এঁকেছিলেন, সেই তিনি বিদ্রোহকে খুব আমলে আনছিলেন না। সঙ্গীতজ্ঞ যিরাব ও ছলনাময়ীর কোপানল থেকে বাবাকে ছড়িয়ে আনলেও আবদুর রহমানের ভুল ধারণা ভাঙ্গাতে পারেননি আমীর পুত্ৰ উমাইয়া। আবদুর রহমান সেনাপতিকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাদেরকে বলার সুযোগ দেননি তেমন একটা তিনি। সেনাপতি বলেছিলেন।

আমি মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিমকে চিনি। সামান্য ঘটনায় লোকটা ঘাবড়ে যায়। টলেডোর খ্রীস্টানরা এতটা দুঃসাহসিক নয় যে, তারা বড় মাপের বিদ্রোহ করবে। আমার মন বলছে, ডাকাতরা দুএকটা কাফেলা লুণ্ঠন করেছে। আপনারা কি আমাকে টলেডোয় বিশাল এক বাহিনী পাঠানোর পরামর্শ দেন? আপনারা দেখছেন, কর্ডোভা পরিস্থিতি ক্রমশঃ আমাদের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে।

ডাকাতদের খপ্পরে পড়লে তার ঘাবড়ানো উচিত নয়। তথাপিও আমাদের কোনো খুঁকি নেয়া ঠিক হবে না। এখানকার পরিস্থিতি জানতে লোক পাঠানো যেতে পারে। সেনাপতি বললেন।

মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিমের কক্ষ থেকে কমান্ডারের লাশ উঠানো হলো। তিনি তার সামান্য বাহিনীকে ব্যবহারের প্ল্যান আঁকছিলেন মনে মনে। ইতোমধ্যে তিন-চারটি রিপোর্ট দ্বারা তিনি অবগত হলেন টলেডো নগরী কার্যত বিদ্রোহীদের দখলে। অবস্থা এমন হলে বিদ্রোহীদের দমন তার একার পক্ষে সম্ভব না। তিনি বড় দুশ্চিন্তগ্রস্ত অবস্থায় কামরায় পায়চারী করছিলেন। অপেক্ষা করছিলেন কর্ডোভা দূতের।

ইতিহাস লিখছে, আবদুর রহমান দূতের কাছে পত্র মারফত এই ফরমান লিখেছিলেন, কি হলো তোমার! বিশাল সৈন্যবহর নিয়েও তুমি সামান্য কিছু ডাকাত ও ছিনতাইরীদের রুখতে পারছ না। সামান্য কিছু লোক যদি বিদ্রোহ করেও থাকে তাহলে কেমন কাপুরুষ ও অকর্মা সেপাইদেরকে তাদের দমন করতে প্রেরণ করেছে যারা পা চালিয়ে লড়তে পারে না? খোদ নিজেই ময়দানে নেমে আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের কচুকাটা করো।

মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিমের শিরায় খুন উত্তপ্ত হয়ে উঠল। বিদ্রোহীদের সামনে হাতিয়ার সমর্পণ করলেও ছিল আরেক কথা। আবদুর রহমানের পুত্র তার কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিয়েছিল মাত্র। তিনি চূড়ান্ত লড়াইয়ে আমার প্রস্তুতি নিলেন।

যখন তিনি নয়া ফায়সালা করার চিন্তা করছিলেন তখন সেই দুই সেপাই তার কাছে এলো যারা পাহাড়ে সত্যগোপন করে ফ্লোরার ঘাটি দেখেছিল। তিনি তাদের বললেন; কি সংবাদ এনেছে তোমরা? আমাদের আর কত চৌকি ধ্বংস হয়েছে? বিদ্রোহীদের আর কি কি বিজয় সাধিত হয়েছে?

আমাদের কাছে নতুন কোন সংবাদ নেই। ওদিন আমরা দুজন লড়াই থেকে পলায়নকালে চার বিদ্রোহী আমাদের ঘিরে ফেলে। আমরা পাহাড়ী এলাকায় আপাতত গোপন রইলাম। পশ্চাদ্ধাবনকারীরা আমাদেরকে দেখতে পায়নি। তারা খুঁজতে খুঁজতে নীচে নামছিল। ওদের কথা আমরা শুনেছি। বুঝেছি পাহাড়ে বিশেষ কোনো ঘাঁটি আছে। ওরা এক সময় আমাদের না পেয়ে আগে বাড়ে। আমরা তখন ফিরে আসার প্ল্যান করছিলাম, কিন্তু কেন যেন ওদের ঘাঁটি আবিষ্কারের অদম্য স্পৃহা মনকে উতলা করে তুলল। ওখানেই বসে ওদের সে ঘাঁটি আমাদের দৃষ্টি খুঁজে ফিরল। সত্যিই আমরা সে ঘাঁটি অবলীলায় পেয়ে বসলাম।

কি পেলে তোমরা?

ওখানে একটি গুহা থেকে কিছু মানুষকে বের হতে দেখলাম। দেখলাম ভুবন মোহিনী এক সুন্দরীকেও।

এ তাহলে সে-ই। তোমরা জানো না কি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এটি। ওই মেয়ে-ই বিদ্রোহীদের প্রাণকেন্দ্র। আমি ওর বুকে খঞ্জর ফুলা ঢুকিয়েই তবে ক্লান্ত হব। শেষের দিকের কথা বলতে গিয়ে মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিমের চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠল।

তিনি তখনই তার কমান্ডারদের ডেকে পাঠালেন। বললেন, স্রেফ ১৫ জন সেপাই। যাদের স্পৃহা-উদ্দীপনা অজেয়, ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, তীক্ষ্ণ মেধা, প্রত্যুৎপন্নমতি।

কিছুক্ষণের মধ্যে ইসলামের নামে আত্মোৎসর্গী ১৫ জন জানবার্য তৈরী হয়ে গেল। তিনি সকলকে বলে দিলেন, এরা দুজন তোমাদের পথ প্রদর্শক। রাতের বেলা ওই গুহায় অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করতে হবে। দেখো কেউ যেন পলায়ন করতে না পারে। মেয়েটাকে জীবন্ত গ্রেফতার করো। আমরা খ্রীস্টানদের দেখাতে চাই এ-ই তোমাদের তথাকথিত কুমারী মরিয়ম যার ভেলকি তোমরা কবরস্থানে দেখেছ।

গভর্নর অপর এক হুকুমে বললেন, বাদবাকী ফৌজ এখানে জমায়েত কর। এতে উপকার হবে দুটি– টলেডো বাসী ভাববে, ফৌজ পরাজিত হয়ে পলায়ন করছে। এবং সেক্ষেত্রে বিদ্রোহীরা প্রচণ্ড হামলা চালানোর সাহস পাবে। এতে বিজয়ের দিনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হবে তারা।

গভীর রাতে ১৫ জন জানবা সেপাই দুর্গম টিলায় এসে দাঁড়াল। সাথে দু পথ প্রদর্শক। টিলাটিকে প্রশস্ত এক কেল্লাই বলতে হবে। এরা একসাথে যাচ্ছিল না, যাচ্ছিল দূরত্ব বজায় রেখে।

আচমকা ঘন ঝোঁপ থেকে আওয়াজ এলো– কে? জলদি এসো!

সামনের জানবায সেপাই থমকে দাঁড়াল। আহ্বানকারী তার সামনে এসে দাঁড়াল। আচমকা পেছন থেকে এক মুজাহিদ ওই বিদ্রোহী পাহারাদারের পিঠে খঞ্জর ফলা আমূল ঢুকিয়ে দিল। মুজাহিদরা তাকে সুগভীর ঢালে নিক্ষেপ করল। পরে আবার শুরু হলো দূরত্ব বজায় রেখে তাদের পথচলা। একটি গিরিপথ থেকে চলতে গিয়ে তারা আবার আরেক আওয়াজ পেল। সকলেই পথ ছেড়ে পাশের ঝোপে আত্মগোপন করল। স্রেফ দুমুজাহিদ মূলপথে অগ্রসর হলো।

তোমরা কে গো ভাই! জনৈক সিপাহী জিজ্ঞেস করল, আমি যখমী, আমি পানি তালাশ করে ফিরছি। আহ্বানকারী একেবারে কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। এক বিদ্রোহী এ সময় দূরে আত্মগোপন করে এ দৃশ্য অবলোকন করছিল। অবস্থা বেগতিক দেখে এক লাফে অগ্রসর হলে দুমুজাহিদ তার বুকে খঞ্জর ঢুকিয়ে দিল।

মুসলিম কমান্ডার বললেন, ঘাটির পথে ওদের পাহারা খুবই নিচ্ছিদ্র মনে হচ্ছে।

আরেকটু অগ্রসর হয়ে আমাদের মূলপথ থেকে হটে যেতে হবে। পাড়ি দিতে হবে দুর্গম পথ। মুখে তালা দিতে হবে সকলের।

স্থানটি দুর্গম কেল্লা থেকে কোনো অংশে কম নয়। আরো উঁচু টিলায় চেপে তারা আলোর সন্ধান পেল। দুবিদ্রোহী পাহাড়ের মোড়ে আগুন জ্বেলেছিল। শাঁ করে দুতীর এসে এদের ঘায়েল করল।

প্রাথমিক এই বিজয়ের পর ওই পাহাড় থেকে নেমে আরেকটি পাহাড়ে চড়ল তারা। পনের জন জানবাযের দুজন মূল ঘাটির মূলে এসে দাঁড়াল। আড়ি পেতে তারা গুহার খবরাখবর নিয়ে এলো। এদের দ্বারা জানা গেল, ফ্লোরা এখানে নেই। সন্ধ্যার পূর্বে সে পলায়ন করেছে। ভেতরে আলো জ্বলছে টিমটিম। গুহার অভ্যন্তর বেশ চওড়া।

গুহার ভেতরে অবস্থান করে বিদ্রোহীরা মদের ড্রাম সামনে নিয়ে নেশা করছে। বলে চলেছে বিদ্রোহের আগামী দিনের নানা পরিকল্পনা। শাঁ করে তিনটি তীর তিন বিদ্রোহীর সীনা এফোঁড় ওফোড় করে দিল। ভেতরে এদের সংখ্যা জনাত্রিশেক হবে মাত্র। গুহাটি মসৃণ নয় তবে প্রশস্ত। প্রকাণ্ড পাথরে ঠাসা। এক একটি পাথরের পেছনে এক একজন একে আড়াল করে দাঁড়াতে পারে।

বিদ্রোহীরা হুঁশিয়ার হয়ে গেল। সকলেই ওসব পাথরের আড়ালে গিয়ে তীর নিক্ষেপ শুরু করল। বিদ্রোহীরা এতই দিশেহারা হলো যে, মশল ও প্রদীপ নেভানোর হুঁশটুকু তারা হারিয়ে ফেলল। বেশ খানিকক্ষণ তীর বিনিময় চলল। চার জানবায মুজাহিদ বুকডন করে ভেতরে গেল। তারা ঐ প্রকাণ্ড পাথরের আড়ালে আত্মগোপন করে সরাসরি তীর নিক্ষেপ প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে লাগল। এদের দেখাদেখি আরো চার মুজাহিদ সাহস করে ভেতরে এলো। তলোয়ার ও বর্শা যুদ্ধ শুরু হলো এবার। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এই যুদ্ধ খতম হয়ে গেল। ভেতরের সকল বিদ্রোহীকে জাহান্নামে পৌঁছে দেয়া হলো।

মুজাহিদদের মাত্র তিনজন শহীদ ও দুজন যখমী হলো। মুজাহিদ কমান্ডার যখমী বিদ্রোহীদের জিজ্ঞেস করলেন, হাশেম কর্মকার কৈ। সে এক যখমীর দিকে ইশারা

করলে। দেখা গেল বেটা অক্কা পেয়েছে। তার দেহে দুটি তীর বিদ্ধ। তার লাশ টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে আসা হলো।

শেষ রাত।

ফ্লোরার কোন সন্ধান পাওয়া গেল না।

মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম দুশ্চিন্তা গ্রস্ত। তার চিন্তার ললাটে বেশ কটা ভাজ। বিক্ষিপ্ত পায়চারী করছেন ও দিগন্তে চোখ ফেলছেন। পাশে জনাতিনেক কমান্ডার।

এক সময় অপেক্ষার পালা শেষ। খবর এলো, মুজাহিদবৃন্দ এসে পড়েছে। তিনি দৌড়ে বের হলেন। গেরিলা মুজাহিদ ও ওই দুপথ প্রদর্শক দণ্ডায়মান। সামনে তিন শহীদের তিন লাশ মোবারক ও দুখমী। এ ছাড়া পৃথক একটি লাশও দেখা গেল।

এই কি হাশেম কর্মকার? প্রশ্ন মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিমের।

হ্যাঁ! এ লোকই।

এই লাশ শহরের চৌরাস্তায় লটকে দাও। মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম হুকুম দিলেন, ওকে গোটা খ্রীস্টান সম্প্রদায় ও মোয়াল্লেদীন আন্দোলন কর্মীরা দেখুক। ভোরের আলো ফোঁটার পূর্বেই এ লাশ লটকাও। এরপর দেখা যাবে ফ্লোরা কোথায়।

ফওরান এক লোককে ডেকে তার ঘোড়ার পিঠে হাশেম কর্মকারের লাশ চাপানো হলো। যিনি এই লাশ নিয়ে গেলেন তিনি নামীদামী এক গোয়েন্দা। ছিলেন খ্রীস্টান ছদ্মবেশে। এই বেশে তিনি খ্রীস্টানদের বহু তথ্য উদঘাটন করেছেন। তাকে বলা হলো, শহরে ঘোষণা করা হোক, এ সেই হাশেম যে তোমাদেরকে বিদ্রোহে মদদ করেছে। কর্ডোভা থেকে পিপীলিকার মত বাহিনী আসছে। কারো রক্ষা নেই। বিদ্রোহীদের এমন শাস্তি দেয়া হবে ইতিহাসের কলম যা লিখতে কেঁপে ওঠবে। কর্ডোভা বাহিনী কোথাও তবু গেড়ে আছে, যে কোন সময় টর্নেডো গতিতে এসে পড়বে।

***

বিদ্রোহীরা যে বাহিনী গড়ে তুলেছিল তাদের অর্ধেকটা বাইরে তাঁবু গেড়ে ছিল, বাদ বাকীটা শহরের ভেতরে। এক খবরে জানা গেল, বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য ফ্রান্সের কমান্ডার এসেছে। এ দ্বারাই মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম বাহিনীর পরাজয়ের কারণ অবলীলায় বুঝে আসে। এ বাহিনীর মনোবল তুঙ্গে কেননা ছোটখাট বিজয় তারা অর্জন করে যাচ্ছিলেন। মুসলিম ফৌজ তাদের মোকাবেলায় নগণ্য।

***

পরদিন।

বিদ্রোহী সেনা ছাউনিতে খবর ছড়িয়ে পড়ল যে, তাদের আধ্যাত্ম গুরু ও প্রধান নেতা হাশেম কর্মকারের লাশ শহরের প্রবেশ ফটকের সামনে ঝুলছে। লাশ যারা ঝুলিয়েছিল তারা শহরের প্রধান ফটকে বিদ্রোহীদের প্রহরা দেখেছিল। কাজেই তারা ভেতরে ঢুকতে পারেনি। ফ্লোরার ব্যাপারে রটেছিল, সেও মারা গেছে। ফ্লোরাকে কিডন্যাপ করা হয়েছিল। অবৈধ প্রেমের দরুন তার প্রেমিক ক্ষুব্ধ হয়ে এ কাজ করেছে। আরো ছড়ানো হলো, ফ্লোরা ছিল একটি রহস্য। সে বিবাহ বহির্ভূত এক লোকের সাথে একই ছাদের নীচে শুয়েছে। তার সাবেক প্রেমিকই তাকে হত্যা করেছে।

মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম খ্রীস্টানদের বেশে আজো ছদ্মবেশী গোয়েন্দা ছড়িয়ে দেন। তারা এসে সংবাদ দেয়, মিশন সফল। শহরের বাইরে ছাউনি ফেলা বিদ্রোহী প্রধান ফটকে ভীড় জমায়। হাশেম কর্মকারের শেষ পরিণতি দেখার জন্য হুলুস্থুল বেঁধে যায়।

মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম তার নগণ্য বাহিনী পূর্ব হতেই সতর্ক অবস্থায় রেখেছিলেন। রাতের বেলা তিনি সৈনিকদের উদ্দেশে এক জ্বালাময়ী ভাষণ রেখেছিলেন।

ভোমরা আল্লাহর সৈনিক। দুশমনদের সংখ্যাধিক্যে ঘাবড়ে যেও না। আল্লাহর রাসূল কোনদিনও কাফেরদের সংখ্যাধিক্যের প্রতি ভুক্ষেপ করেননি। তাঁর জীবদ্দশায় প্রতিটি যুদ্ধেই বলতে গেলে কাফেরদের দল ভারী ছিল। কিন্তু বিজয়ের সোনার হরিণ মুসলমানদের পদচুম্বন করছে। আজরাসূলের পবিত্ৰাত্মার চেতনা আমাদের জেহাদী বক্ষে জাগরুক করে তোল। খ্রীস্টানরা তোমাদের ওপর বিজয় লাভ করেছে মনে করো না বরং খ্রীস্ট-ই ইসলামের ওপর বিজয় লাভ করতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। কর্ডোভার বিলাসী আমীরের উদাসীনতা তোমাদের যেন ভাবিয়ে না তোলে। ওরা দুনিয়াদারে। এ জীবনই ওদের কাছে সবকিছু, কিন্তু তোমাদের আসল জীবন মরণের পরে। তোমরা খোদার সৈনিক, খোদার প্রিয় মুজাহিদ। আর কোন মুজাহিদের কাছে জাগতিক জৌলুস প্রাধান্য পেতে পারে না। বিদ্রোহীরা একবার আমাদের পরাভূত করেছে। ঐ পরাজয়ে হতোদ্যম হয়ে একেই আগামী দিনের বিজয়ের মাইল ফলক মনে করে এগিয়ে যাও। টলেডো কাফেরদের কজায়। যে হিংস্রতার শিকারক্ষেত্র বানাতে আদা নুন খেয়ে নেমেছে ওরা– তোমাদের নয় তা, তোমরা কি এই বেইজ্জতির প্রতিশোধ নিতে চাও না?

ফৌজ নারাধ্বনি করে। হ্যাঁ, হা! আমরা প্রতিশোধ নিতে চাই। শহীদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না। কর্ডোভার তখতে তাউস উল্টে আমরা সেখানে বোদার রাজ কায়েম করব। শহীদের ফোঁটা ফোঁটা খুনের বদলা আমরা এক একটা বিলাসীকে হত্যার মাধ্যমে নেব ইনশাআল্লাহ।

এরপর মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিমকে আর বলতে হলো না। তার কাছে হাশেম কর্মকারের নিহত হবার খবর আসা মাত্রই বিদ্রোহীদের তাঁবু গুটানো শুরু হয়ে যায়। তারা সেনা ছাউনি ছেড়ে পালাতে থাকে।

সেনা ছাউনি ওখান থেকে মাইল দুয়েক দূরে। তিনি সুযোগমত তার বাহিনী ছড়িয়ে দিলেন। এবার ফৌজ এক মাইল লম্বা কাতার ধরে কোচ করতে লাগল। মুসলিম ফৌজের চলার পথে বিধস্ত। কিছু তবু দেখা গেল। কমাণ্ডারদের নির্দেশে তাবু ও ডেকচিসহ খড়ের কুটোয় আগুন লাগিয়ে দেয়া হলো। বিদ্রোহী বাহিনী শহরের প্রবেশদ্বারে ভীড় করে দাঁড়ানো ছিল। সেই ভীড় থেকে আর্তনাদ ভেসে এলো, ফৌজ এসে গেছে, কর্ডোভার ফৌজ।

মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম বিপুল বিক্রমে আক্রমণ করতে বললেন। বিক্ষিপ্ত আকারে চারদিক থেকে তার ফৌজ বিদ্রোহীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু পলায়ন করার সুযোগ নেই তাদের। পালাবে কোথায়। পলায়নের তামাম পথ রুদ্ধ। ক্রীড়া ও মহড়ার ময়দানে এটি। যাদের হাতে অস্ত্র ছিল তারা মুসলিম সিপাহীদের মোকাবেলায় নামল। বাদবাকীরা ফটকের ভেতরে চলে গেল। যারা লড়াইতে নেমেছিল তাদের সাথেই মারা পড়ল। ভেতর থেকে বিদ্রোহীরা প্রবেশ দরজা রুদ্ধ করে দিল। ওদিকে মুসলিম বাহিনী দেয়ালের ওপর থেকে তীরবৃষ্টি নিক্ষেপ করছিল।

মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিমের টর্নেডো বাহিনী যে গতিতে এসেছিল সে গতিতেই আবার পিছপা হলো। বিদ্রোহীদের অর্ধেকটা ইতোমধ্যেই শেষ। তাই শহর রক্ষা তাদের জন্য মুশকিল হয়ে দাঁড়াল।

মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম আসমানের দিক দুহাত উঁচিয়ে ফরিয়াদ করলেন। আশু বিজয় কামনায় তার দুচোখ বেয়ে নামল অশ্রর ফোয়ারা। ইতিহাস তার এ বিজয় গাঁথাকে মোজেযা হিসেবেই উল্লেখ করেছে। আল্লাহ তার ফরিয়াদ শুনলেন। পরের দিন খবর এলো, আবদুর রহমানের পুত্র উমাইয়ার নেতৃত্বে কমান্ডো আসছে কর্ডোভা থেকে। মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম ঘোড়ায় চেপে তাকে সংবর্ধনা জানাতে ছুটে গেলেন।

উমাইয়া আবদুর রহমানের কোন স্ত্রীর গর্ভজাত ইতিহাস সে ব্যাপারে খামেশ। মোদাচ্ছেরা তখন যুবতী স্ত্রী। তার গর্ভে ২১/২২ বছরের যুবক পুত্র অসম্ভব।

উমাইয়া বলেন, আমি আব্বজনকে বাধ্য করেছি টলেডোয় একদল ফৌজ পাঠাতে। ইবনে ওয়াসিম তাকে টলেডো পরিস্থিতি জ্ঞাত করলেন। ওই রাতেই টলেডো অবরোধ করা হলো। দরজার ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালানো হয়। কিন্তু বিদ্রোহীরা এতে এতটুকু প্রভাবিত হয়নি।

অবরোধ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলো। কোনো ফল না পেয়ে উমাইয়া অবরোধ তুলে নিতে বললেন। বিদ্রোহীরা তো অবাক। কর্ডোভা বাহিনীর অবরোধ উঠিয়ে নেয়ার কথা নয়। বিদ্রোহীদের কমান্ডার বললো, একজন মুসলিম সেনাও যেন জিন্দা ফিরে যেতে না পারে। তোমরা পশ্চাদ্ধাবন করো, ফরান দরজা খুলে দাও। শহর থেকে হাজার হাজার বিদ্রোহী বেরিয়ে এল। বাধ ভাঙ্গা প্লাবন সে কোন ছার।

ওই সময় কর্ডোভা বাহিনী কালতারাডা পাহাড়ের পাদদেশে উপনীত হয়েছিল। খ্রীস্টবাহিনীর পশ্চাদ্বাবন দেখে উমাইয়া সকলকে আত্মগোপন করতে বললেন। এ দেখে খ্রীস্টানদের হিম্মত বহুগুণে বেড়ে গেল। দ্রুতগতিতে তাদের ঘোড়া পাহাড়ী এলাকায় প্রবেশ করল। সমগ্র বাহিনী পাহাড়ী এলাকায় প্রবেশ করলে মুষলধারে তীর বৃষ্টি শুরু হলো। এ কৌশল উমাইয়ার। উমাইয়া প্ল্যান করেছিলেন, অবরোধ উঠিয়ে নিলে বিদ্রোহীরা একে আমাদের দুর্বল ভাববে। সে সুযোগে তারা আমাদের পশ্চাদ্ধাবন করবে। আমরা পাহাড়ী এলাকায় প্রবেশের আগে ওদের ওপর আক্রমণ চালাবে। না। ওরা সত্যিই বুদ্ধিমান হলে ফটক ছেড়ে বের হবে না। বের হলে কেল্লা ফতেহ।

মৌলবাদী খ্রীস্টানরা বিজয় শেষে বোকামি করল এবং উমাইয়ার পাতা ফাঁদে ফেঁসে গেল। শাঁ শাঁ করে তীর আসতে লাগল। অনিঃশেষ সে ভীর, অব্যর্থ সে টার্গেট। খ্রীস্টানরা টলেডোমুখী হতে গিয়ে দেখল, পেছনে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় দাঁড়িয়ে উমাইয়ার পশ্চাৎ বাহিনী।

কালতারাদা পাহাড় খ্রীস্ট মৌলবাদীদের রক্তে ভেসে গেল। আটকে গেল ঘোড়ার পা। একেই বলে গণহত্যা। প্রাণ নিয়ে পালাতে পারে নি একজনও। জনৈক নও মুসলিম কমান্ডার উমাইয়ার সাথে এসেছিলেন। তিনি দক্ষ কমান্ডার হওয়া সত্ত্বেও খ্রীস্টালাশের পাহাড় ও রক্তকন্যা দেখে বেঁহুশ হয়ে পড়লেন। সেই বেহুঁশী দেখে আর হুশ ফিরে পাননি।

এদিকে মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম তার সাধের টলোডোয় প্রবেশ করেন বিজয়ীর বেশে যেখানে তখন বাধা দেয়ার কেউ নেই।

২.৫ সুলতানা ও যিরাব

এরপরে পেরিয়ে গেছে বেশ কযুগ। ভূমধ্যসাগর গড়িয়ে গেছে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কিউসেক পানি। সময় চলেছে তার আপন গতিতে। সে কত শিশুকে জোয়ান আর জোয়ানকে করেছে বুড়ো। আবদুর রহমানের হেরেমেও সময়ের পরিবর্তন এসেছে। যুবতী সুলতানা আজ ৫০ বছরের মাঝবয়সী। নিটোল গালে পড়েছে তার ভাঁজ বেশ কটা। আবদুর রহমানের বয়স ৬০ এর কোটা অতিক্রম করে গেছে, যিরাব ৭০-এর ঘরে। সুলতানার পুত্র আবদুল্লাহ যৌবনের সিঁড়িতে। বয়স ১৯ কিংবা ২০।

আবদুর রহমানের চিন্তাজগতে আমূল বিপ্লব সাধিত হয়েছে। যিরাবও সেই আগের যিরাব নেই। আমীর আবদুর রহমান থাকলেও বেশ কিছুকাল হুকুমত ছিল যিরাবের। তিনি সুখ ও সংগীতের যাদুতে মাতিয়ে রেখেছিলেন আবদুর রহমানকে। তার দেমাগে রাজত্বের ভূত চেপে বসেছিল। কিছু সিংহশাবক স্পেন অরণ্যে হুংকার মেরেছিল সেদিন, যে হুংকার আবদুর রহমানের আলস্য নিদ ভেঙ্গেছিল, নয়ত দ্বিতীয় আবদুর রহমানের যুগেই স্পেনের পতন ঘটে যেত। প্রতিষ্ঠিত হত খ্রীস্টানদের রাজত্ব।

যিরাব অভাবিতরূপেই অগাধ মেধার অধিকারী। তিনি বেশ কিছুকাল গবেষণার দ্বারা ভেবে দেখেছিলেন যে, আবদুর রউফ, উবায়দুল্লাহ, মূসা ইবনে মূসা, আবদুল করিম, করতুন ও আবদুর রহমানের ভাই মোহাম্মদের উপস্থিতিতে তার সকল প্ল্যান মাথা কুটে মরতে বাধ্য। প্রাসাদে তার যে মর্যাদা বিলক্ষণ তাও হারিয়ে যেতে বসেছে। হৃদয়বীণার তার দিয়ে কাউকে মোহাচ্ছন্ন করা আর ক্ষমতার বাগডোর হাসিল করা এক কথা নয়। কাজেই ক্ষমতালিন্দু মনোভাটি ও ষড়যন্ত্র শব্দটি জীবন ডায়েৰী থাকে এক সময় মুছেই ফেললেন তিনি। তবে সুলতানা প্রেম থেকে বিরত থাকতে পারলেন না। এ এক ধরনের পাগলামি; বয়স, মেধা ও চিন্তা যেখানে খেই হারিয়ে ফেলে।

তিনি সুলতানকে প্রায়ই বলতেন, আমার রাগ-রাগিণীতে সেই প্রতিক্রিয়া আর নেই যা আছে তোমার সৌন্দর্য-সুষমায়। আমার মিউজিক এখনো তোমার মুক্তাসম দণ্ডমালার হাসিবোল ফুটিয়ে তুলতে পারেনি।

সুলতানা তার পার্শ্বে থাকলে উন্মাতাল হয়ে যেতেন। সুলতানা অবস্থা বেগতিক দেখে তাকে বলা শুরু করে, যিাব? এবার আপনি কারো গলে মালা পড়ান।

যিরাব বলে, জীবন একটা। সেখানে অধিকারও একজনের। দ্বিতীয় কারো প্রবেশের সুযোগ নেই। একথা ২০/২৫ বছর আগেকার। তুমি আছো তো সব আছে। তুমি নেই কিছু নেই।

কিন্তু আমি যে আমীরে স্পেনের। সুলতানা বলত, আপনি আমাকে প্রাসাদ থেকে তুলে নিতে পারবেন না। হাত ধরাধরি করে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলে যাব কৈ? সিংহশাবক নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছার পূর্বেই আমরা ধরা খেয়ে যাব। করুণ পরিণতিও আপনার অজানা নয়। কাজেই আমাকে অন্তরঙ্গভাবে পাবার আশা ত্যাগ করুন। তবে আমাকে আপনি মনে করতে পাররেন অধিকার কেবল কথার, দেহের নয়। আমি কী আপনাকে আমার জায়গীরে নিয়ে যাইনি? আমার ও আপনার গভীর সম্পর্কের মাঝে তৃতীয় কাউকে রেখেছি কি কখনো?

সুলতানার এ কথাগুলো সত্য। যিরাব ও তার মাঝে তৃতীয় কেউ থাকত না, কিন্তু সুলতানার এই লুকোচুরির মাঝে একটা স্বার্থ লুকিয়ে ছিল। প্রেমাভিনয়ের মাধ্যমে সে যিরাবকে ব্যবহার করত। সুলতানার ভেতরে ভেতরে সম্পর্ক খ্রীস্ট মৌলবাদীদের সাথে, ধুরন্ধর নীতিজ্ঞানহীন ধর্মান্ধ এলোগেইছের সাথে। সুলতানা এলোগেইকে বলে রেখেছিল, যিরাকে প্রেম মরীচিৎকার মোহে আটকে অবাধে কার্যোদ্ধার করতে চাচ্ছি, কিন্তু ক্রমশসে আমার থেকে সটকে পড়ছে।

প্রেমের আদিম নেশায় সে কেবল ধরা দিয়েছে হেরেমে, আবদুর রহমানের পৌরুষবহুল পেশীতে সে-ই একমাত্র নারী, আবদুর রহমানের মত সিংহশাবক যার ছলনার পড়ে ছাগ শিশুতে পর্যবসিত। কেমন একটা যাদু, একটা অনুরাগে সে আটক ফেলে এক মর্দে মুজাহিদকে। মাঝপথে যিরা তার সান্ত্বনার ধন ও আরাধনার বন্ধুতে রূপান্তরিত হয়। এতে অর আত্মিক প্রশান্তি হয়। এভাবে একই সময়ে সে আমীর স্পেন ও যিরাবের মধ্যে মরীচিকা সৃষ্টি করে। দ্বি-চারিণী আর কাকে বলে।

কিন্তু কালের প্রবাহে সবকিছুতে এসেছে পরিবর্তন। পরিস্থিতি গেছে পাটে। গোটা প্রকৃতিতে পালাবদলের হিড়িক। স্পেনের নদ-নদী এরপর পানি প্রবাহিত করেনি। স্পেনের অলি গলি ও শহর বন্দরে যে রক্ত শুকায়নি, তথাপিও সুলতানার প্রকৃতিতে কোন পরিবর্তন আসেনি। পরিবর্তন যা এসেছে তাহলো, সে এক বাচ্চার মা হয়েছে আর আমীরে স্পেন তার বাচ্চার স্বীকৃতি দিয়েছে। ইতিপূর্বে সে রাণী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল এজন্য ছিল পাগলপারা। সে ঈসায়ীদের সাথে যোগসাজশ করেছে। আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে তখত তাজ উল্টানোর ষড়যন্ত্র করেছে, কিন্তু সাফল্যের সোনার হরিণের নাগাল পায়নি।

প্রথম ও সর্বশেষ সন্তানের মা হয়ে তাই সে তাকে স্পেনের ভাৰী গভর্ণর বানানোর জন্য জন্য আদাজল খেয়ে নামে। তার যৌবন এখন পুরানো দিনের কাহিনী। পুত্র তখন জোয়ান। আমীরে স্পেন বার্ধক্যের বারিধি তীরে উপনীত। বিষধর কালনাগিনীর চরিত্রে সুলতানা, ভরা নাগিন সে। যে কোন নারী-পুরুষকে দংশনে নীল করতে সে বদ্ধপরিকর। যাকে নিয়েই পুত্রের ভবিষ্যৎ-এ সে অন্ধকার দেখেছে তাকেই সে ছোল মেরেছে।

যুগের পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তন এসেছে মানব-সভ্যতায়। কত দোস্ত দুশমনে আর দুন-দোস্তুতে রূপ নিয়েছে, কিন্তু সুলতানা সুলতানাই থেকে গেছে, কালনাগিনী রয়ে গেছে। এক সময়কার যৌবনের রাণী এখন বার্ধক্যের কালসাপ। বয়সের ভারে বুড়ি হয়েও সে নিজকে বিশ্বসুন্দরী ভাবতে থাকে।

***

পঞ্চাশের ঘরে সুলতানার বয়স। মিথ্যা নয়। বাস্তবিকই এ বয়সে তাকে ষোড়ষীই মনে হয়। আমীরে স্পেনের নয়নমণি সে। শাহজাদীর মত ব্রাজকীয় তার জীবন। কোন দুঃখ নেই, ভাবনা নেই। ডালিমের লালদানার মত গণ্ড, মাথায় দীঘল কালো একরাশ চুল, চোখের জ্বর চমক সেই আগের মতই। স্বাস্থ্য সুস্থ্য-লাবণ্যবহুল।

একবার তার চাকরাণী চুল পরিপাটি করছিল। চিরুনি রেখে চাকরাণী তার একটা চুল উপড়াল। সুলতানা আহু করে উঠল। চাকুরাণীকে বলল, কি হলো? সে বলল, পেকে যাওয়া সাদা চুল উপড়ে ফেললাম।

মিথ্যা সুলতানা বলল, এখনই চুল পেকে সাদাঁ?

বৃদ্ধা চাকরাণী হেসে লুটোপুটি খায়। চাঁদের মত সাদা চুল তার সামনে মেলে ধরা হয়।

শুধু একটা নয় মা! চাকরাণী বলল, আরে। আপনার চুল এমন যে, এর থেকে পাকা-কাঁচা চেনা মুশকিল। বেশ কিছু চুলে পাক ধরেছে।

বেশ কিছু! এমনভাবে সুলতানা বললো যেন তার প্রিয়জন মারা গেছে।

হা! বেশ কিছু। কিন্তু আপনি ঘাবড়ে গেলেন যে চুল সেতো পাকবেই। মৃত্যু সেতো একদিন আসবেই। আমিও যুবতী ছিলাম। আমার রূপ লাবণ্যও তো একসময় আমীর-ওমরাহদের চোখ ঝলসে দিত। আমার রূপ লাবণ্যে মুগ্ধ হয়ে বর্তমান আমীরের বাবা আল-হাকাম আমার বাবাকে শাহী আস্তাবলের একটি হীরক খচিত তলোয়ার উপহার দিয়েছিলেন। পরে তাকে দরবারে বিশেষ মর্যাদার আসনে আসীন করেছিলেন। পুরস্কার ও অন্ন-অনুদানে দুহাত ভরে দিয়েছিলেন। আমিও এক সময় ভাবতাম, রূপ-যৌবন বুঝি অম্লান, কিন্তু প্রথম পাকা চুল আমার সেই ভুল চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। সেই চুল আমি উপড়ে ফেলেছিলাম। পরে একদিন ভাবলাম, যে চুলরাজি দ্বারা এক সময় আমীরে স্পেনকে পায়ের জিঞ্জির বানিয়েছিলাম তাতে পাক ধরবেই। আমার ভুবন মোহিনী রূপ-জৌলুসে ভাটা পড়বেই।

সুলতানা মা। আমার কোন আশ্রয় ছিল না তখন। হেরেমের চৌহদ্দি থেকে আমাকে ডাস্টবিনে ফেলে দেবার কথা। আমি দেখেছি পরবর্তীতে শাসক দল তী তরুণী আমদানী করেছে। যাদের ইশারায় এরা নেচেছে। আমার বয়স এখন ৭৫-এর কোঠায়। হেরেমের দাসী-বাদীও রাজ মহিষীদের জীবন্ত দলিল আমি, সূর্য সাক্ষীও বলতে পার। সুলতানা! তোমারে জীবনেও সে পালা এসে গেছে। আবদুর রহমান বুড়িয়ে গেছে। এক্ষণে কোন যুবতী তাকে উন্মাতাল করতে পারবে না, ইতিপূর্বে করা হত যা।

সুলতানা ফেলে আসা সোনালী অতীতে ফিরে গেল। খামোশ দাঁড়িয়ে টহল দিতে লাগল।

সুলতানা। বৃদ্ধা চাকরাণী বলতে লাগল, তুমি এত ভড়কে গেলে যে? তোমার খোশ কিসমত যে, যৌবনের সোনালী দিনগুলোতে যে মর্যাদা ছিল তোমার আমীরে স্পেন এ বয়সেও সে পজিশন থেকে তোমায় নামায় নি, অবমূল্যায়ন করেনি। আমি তোমার হিতাকাঙ্ক্ষী, শুভানুধ্যায়ী। তোমার প্রতিটি রহস্যে আমাকে শরীক করেছে। এজন্য বড় নির্মম বাস্তব কথাটি আজ শোনালাম। তুমি এতে তকলিফ পেয়ে থাকলে আমায় ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখো।

জানি। তোমার সত্য নিয়তে আমার কোন সন্দেহ নেই। আমীরে স্পেন আমার পদমর্যাদায় কোন প্রকার কমতি আনেননি। কিন্তু বছর পেরিয়ে গেল অথচ আমায় একটিবারের জন্যও কাছে ডাকেননি তিনি। স্বেচ্ছায় কখনও কাছে গেলে কর্মব্যস্ততার বাহানায় দূরে ঠেলে দিয়েছেন। নিঃসঙ্গ জীবনের করুণ প্রান্তরে অবস্থান আমার। যিরাব না থাকলে হয়ত মারাই যেতাম।

তোমার পুত্র জোয়ান হয়েছে সুলতানা। খোদা তোমার পুত্রকে দীর্ঘজীবী করুন। এখন থেকে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনায় নিজকে উৎসর্গ করো। তাকে ভাবী আমীর বানানোর কোশেশ করো। আমীরে স্পেন বার্ধক্যে উপনীত। প্রতিটি যুদ্ধে সে অংশ নিচ্ছে। যে কোন সময় মারা যেতে পারেন। তোমার পুত্রের জন্য কিছু একটা করো।

তাতো আমি করবই, কিন্তু ওকে ভাবী আমীর বানানো নিয়ে একটি শব্দও মুখে আনেননি আবদুর রহমান। এরও একটা কারণ আছে। আমার পুত্রই পরিস্থিতি ঘোলা করে তুলেছে। ওকে শাহযাদা বানানোর খেয়াল করেছিলাম, কিন্তু ও আমার হাতছাড়া হয়ে গেছে। বানাতে চেয়েছিলাম শাহ্ সওয়ার, পাঠিয়েছিলাম তেগ-তলোয়ার চালাতে সমরবিদদের কাছে, কিন্তু পালিয়ে এসে আমার সব আশার গুড়েবালি দিয়েছে। হয়ে উঠেছে বিলাসী ও অমিতব্যয়ী।

বিলাসী ও অমিতব্যয়ী হয়েছে তাতে কি! আবদুর রহমানের ৪৫ পুত্রের কে না। বিলাসী ও অমিতব্যয়ী? চাকরাণী বলল।

সুলতানা আয়েনার সামনে গিয়ে বসল। চাকরাণীকে আর কোন কথা বলার সুযোগ দিল না। খোলা চুল পেছন থেকে সামনে এনে দেখল। একগাছি সাদা চুল তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। চেহারা আয়নার একেবারে কাছে নিয়ে গিয়ে দেখল তাতে মসৃণতা নেই, আছে ভাঁজ পড়ার ভূমিকা।

তুমি যাও। চাকরাণীকে বলল সে, যিরাব অবসর থাকলে বলো সুলতানা ডেকে পাঠিয়েছে।

***

চাকরাণী চলে যাবার পর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চেহারা আয়নায় পরখ করল। চোখ দেখল। দেখল চোখের কোণে কালচে সরুরেখা। পরখ করল হাত। উল্টিয়ে পাল্টিয়ে বারবার দেখল। অস্থিৰ্ব্ববে এগিয়ে গেল বেলকনির দিকে। পরে এলো করিডোরে। দরজা ফাঁক করে কারো আগমনের প্রতীক্ষা-মহড়া।

খানিকবাদে কামরায় কারো পদধ্বনি শোনা গেল। মনে মনে যার প্রতীক্ষা সে এলো বুঝি। পেছনে ফিরে তাকাল সুলতানা।

হ্যাঁ, যিরাব এসেছে। প্রেমের ছলনায় যাকে আজীবন উপেক্ষায়ই করে এসেছে সে। ওই চেহারায় কত আকুতি ছিল। ওই মনে কত শত আকাঙ্ক্ষা বাসা বেঁধেছিল। তবে প্রতিবারই সে সুলতানাকে ডেকে পাঠিয়েছে। আজ বোধ হয় এর ব্যতিক্রম। আজ প্রথম সুলতানা তাকে ডাকল। এতে ভো যিরাবের আনন্দে আত্মহারা হবার কথা, কিন্তু একি! যিরাবের সেই অবয়বে কত পরিবর্তন। ভাবনার সাথে আনন্দে ডুবে যায় সে। আচমকা তার ভাবনা জাল স্নি হয় এই ভেবে যে, বেচারা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে অথচ বসতে বলার সৌজন্যটুকু তার লোপ হয়েছে। যিরাবকে বসবার আমন্ত্রণ জানায়। যিরাব বসেন। তার চোখে মুখে সেই স্মৃতি নেই। সুলঅনা বলে,

আমার প্রেম আপনার হৃদয় থেকে মুছতে বসেছে বুঝি?

উঁহু। পূর্বের থেকে সেটা আরো বেড়েছে; কিন্তু সেই সোনালী অতীতে আমরা ফিরে যেতে পারব না, যৌবনের কলকাকলীতে এক সময় মুখরিত ছিল যা। কাজেই অতীত ইতিহাসের স্মৃতিচারণ এক্ষণে নিবুর্পিতাকে খানিক বাড়িয়েই তুলবে। তোমার, পেয়েশানিরও কারণ বোধ হয় সেটা। সময় যত ফুরিয়ে যাচ্ছে-তুমি আলেয়ার আলোর মত এর পেছনে ছুটছ, অতীতকে স্মৃতির এলবামে সযত্ন লালিত্যে রেখে দাও সুলতানা। চলমান সময়কে প্রশান্তির সাথে ব্যয় করার চেষ্টা করো।

হ্যাঁ যিরাব! আমরা বারবার পেছন অতীতে ফিরতে চাচ্ছি। অতীত থেকে আমি মুখ ফেরাতে পারছি না