বিনগাজী থেকে ফেরার সময় আবহাওয়া স্বাভাবিকই ছিলো। কিন্তু মাঝপথে আসার পর হঠাৎ করেই মরুতে ঝড় উঠলো। মনে হচ্ছিলো; সমস্ত মরুর বালু তাদের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। জিপের পেছন দিক ছিলো ত্রিপলে ঢাকা। আর সামনের দিক ছিলো ভোলা। অর্থাৎ সামনের সিট দুটো ছিলো খোলা আকাশের নিচে। আর ঝড় আসছিলো জিপের ডান দিক থেকে। এজন্য বালির স্রোত এমনভাবে ভেতরে এসে মুখে আঘাত করছিলো যেন গতির জানালা দিয়ে পানির উন্মাতাল স্রোত বয়ে যাচ্ছে। সামনের পথ দেখা যাবে তো দূরের কথা জিপের সামনের দিকও দেখা যাচ্ছিলো না।
এ অবস্থায় জিপ নিয়ে কোথাও আশ্রয় নেয়াও সম্ভব ছিলো না। কারণ, গাড়ি থামালে মুহূর্তের মধ্যেই টায়ারগুলোকে বালির ঢিবি অকেজো করে দেবে। তারপর পুরো গাড়ির উপরেই গড়ে উঠবে বড় এক টিলা।
যখন মরু ঝড় শুরু হয় তখন অল্প সময়ের মধ্যেই বড় বড় বালির ঢিবি টিলা ঝুড়ি ঝুড়ি হয়ে হারিয়ে যায়। সমুদ্রের পানির মতো মরু এলাকা যেন স্রোতস্বিনী হয়ে উঠে। যেখানেই সামান্য বাধা পায় সেই স্রোতধারা সেখানেই দাঁড়িয়ে যায় বড় সড় একটা টিলা। এজন্য মরুর এসব টিলাকে বলা হয় চলন্ত টিলা।
মেজর ডাগলাসের মতো বিচক্ষণ এক সেনা অফিসারও নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন। তার জান্তে হোক আর অজান্তে হোক এক ফাঁকে গাড়ির রুট ঘুরে গেলো অন্য দিকে। সেখানে যদি কোন পথ থাকতে সড়ক থাকতো বা চিহ্ন থাকতো তাহলে নিশ্চিত হওয়া যেতো জিপ সোজা রাস্তা ধরে চলছে। সেখানে কিছুই ছেলো না। সেটা ছিলো, নিরেট অন্ধকার। অন্ধের মতো গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে রাখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিলো না মেজর ডাগলাসের।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর ঝড় থেমে গেলো, আশপাশের অবস্থান অস্পষ্ট হয়ে চোখে ধরা দিতে লাগলো। মেজর তবুও গাড়ি থামালেন না। যখন দৃষ্টিসীমা সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে গেলো তখন জিপ থামালেন। নেমে চারদিকে তাকালেন। গালালা তাকে জানালো, মূল পথ থেকে তারা অনেক দূরে চলে এসেছে। এই বেদুইন ছিলো এক অভিজ্ঞ মরু রহস্য ভেদী। সে মেজরকে এক দিক দেখিয়ে বললো।
এদিক দিয়ে পথ চললে তিন ঘণ্টার মধ্যে হেড কোয়ার্টারে পৌঁছা যাবে।
মেজর আবার জিপে স্টার্ট দিলেন। দুই আড়াই মাইল দূরের টিলায় ভরা এলাকা দেখা যেতে লাগলো। বালির ওপর দিয়ে জিপ এগুচ্ছিলো ধীর গতিতে। হঠাৎ মেজর ডাগলাস গাড়ি হাডব্রেক করলেন। সামনে পড়ন্ত এক বস্তুর দিকে তার চোখ। সেটা চকচক করছিলো। এ জিনিস মেজর খুব ভালো করেই চিনেন। এগুলো ভূমি মাইন। এ এলাকা কিছুদিন আগেও উত্তপ্ত রণাঙ্গন ছিলো। এখানে সেনা দলের মোর্চা ছিলো, ক্যাম্প ছিলো, আবার অস্থায়ী চেকপোষ্ট, ছিলো। যেখানে এমন সৈনিকি কেন্দ্র থাকে তার সামনের এলাকায় অবশ্যই মাইন পুঁতে রাখা হয়।
মাইন মাটি চাপা দিয়ে রাখা হয় এবং এর একটা পিন মাটির ওপর আড়াআরিভাবে বিছিয়ে রাখা হয়। এর ওপর হালকা করে মাটি বা বালি ঢেলে দেয়া হয়। এর ওপর পা পড়লেই মাইন বিস্ফোরিত হয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। আর ট্যাংক বা গাড়ি হলে তা ধ্বংস করে দেয়।
জার্মানদের ভূমি মাইন আরো ভয়ংকর। ওরা মাটিতে মাইন পুঁতে একটা তার আরেকটার সঙ্গে জুড়ে দেয়। আর একটা ফুটলে একে একে সবগুলোই কাটতে থাকে। আর সে এলাকায় মুহূর্তের মধ্যে কেয়ামত নেমে আসে।
এটা যুদ্ধবাজ সব ফৌজেরই রীতি। তারা পিছু হটার সময় এভাবে মাইন পুঁতে রেখে যায়। যুদ্ধের পর অনেক মানুষ এসবে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। যে এলাকায় মাইন বিছানো হয় সে এলাকাকে মাইন ফিল্ড বলা হয়।
লিবিয়ার যুদ্ধ আক্রান্ত মরুভূমির বেদুইনরা মাইন ফিল্ড খুঁজে বের করার চমৎকার এক উপায় বের করে। মরুচারী বেদুইনদের প্রধান পেশা উট পালন হলেও গাধাও পালে কেউ কেউ। ওরা যখন যাযাবরি করে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় যায় তখন পথ চলে খুব সাবধানে। যেখানেই সন্দেহ হয় সামনে মাইন ফিল্ড আছে সেখানে একটা গাধাকে মেরে টেরে সামনের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। যদি মাইন চাপা থাকে এবং জোড়া তারের মাইন হয় তখন গাধার পায়ে সংঘর্ষ বেধে একটা মাইন ফাটলেই হলো। এক সাথে সবগুলো ফেটে যায়। এতে গাধার দেহ তো টুকরো টুকরো হয়ে যায়; কিন্তু পুরো বেদুইন দল বেঁচে যায়।
মেজর ডাগলাসের বেদুইনদের এই পদ্ধতি জানা ছিলো। কিন্তু তার কাছে গাধা ছিলো না। ছিলো শুধু তার নওকর আব্দুল্লাহ গালালা। সাধাসিধে মানুষ গালালা পরিশ্রম করতে ভালোবাসতো। নিজের মুনিবের কাজ করতো বড় নিষ্ঠার সঙ্গে। কিন্তু মেজর ডাগলাস তার কাছ থেকেই গাধার কাজটি আদায় করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
তিনি নিশ্চিত ছিলেন, গালালা যেহেতু অনেক দিন ধরে তার নওকরী করে এবং নিজের গোত্র থেকে অনেক দূরে থাকে, এজন্য সে জানা তো দূরের কথা অনুমানও করতে পারবে না, তাকে পাঠানো হচ্ছে গাধার স্থলে মাইন বিস্ফোরণের টার্গেট হওয়ার জন্য। আর এক গালালা মাইনের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলে আরো কত গালালা আসবে। একে তো এরা বেদুইন এবং ইতর জাত। তারপর আবার মুসলমান। দুনিয়াতে এদের সংখ্যা যত কমবে দুনিয়া ততই নিরাপদ হয়ে উঠবে। আর মেজর ডাগলাসের মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ এক মানব সন্তান যদি খামোখা মাইনের আঘাতে মারা যায় তাহলে দুনিয়ার মানুষের আফসোসের শেষ থাকবে না।
