বলছিলাম মেজর ডাগলাসের কথা। তিনি এসেছিলেন বৃটিশ ইন্টেলিজেন্স থেকে। সিগনালারের ভাষা ছিলো আরবী ভাষার অশুদ্ধ রূপ। মেজর ডাগলাস মার এলাকার আরবীটা বেশ বলতে পারতেন। ক্যাম্পের নিম্নশ্রেণীর নওকার কর্মচারী ছিলো সে এলাকার স্থানীয় লোকেরা। এরা জোব্বা পরতো। কথা বলতে আরবীতে। এদের অধিকাংশই ছিলো বেদুইন মূর্খ। এরা ছিল এমন জগতের মানুষ বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যাদের সম্পর্ক ছিলো একেবারেই কম।
এসব এলাকার অধিকাংশের পেশাই হয় লুটপাট আর ডাকাতি। বেদুইনদের মধ্যে ফৌজি অফিসারদের যারা নওকর চাকর ছিলো, তাদের পূর্ব পেশা চুরি, রাহাজানি, ডাকাতি হলেও সেনাক্যাম্পে এসে এসব করতো না। আমাদের অনেক প্রয়োজনীয় জিনিষ বেদুইনদের বড় বাজার বিনগাজী থেকে আনতে হত। ইংরেজদের মদও আসতো ওখান থেকে। এখানে যুদ্ধ মুলতবী হওয়াতে আমরা নিরাপদ ছিলাম। তাই প্রয়োজন পড়লে অফিসাররা জিপ নিয়ে বিনগাজী চলে যেতো। তাদের সঙ্গে তখন একজন বেদুইন নওকর অবশ্যই থাকতো।
এক সকালে মেজর ডগলাস তার নওকর বেদুইন আবদুল্লাহ গালালাকে নিয়ে জিপে চড়েন। অনেক অফিসারই প্রয়োজনীয় নানান জিনিস আনার জন্য তার কাছে পয়সা দিয়ে দেয়। সরকারি কিছু রসদ পত্রও আনার প্রয়োজন ছিলো।
খুব বেশি হলে ফিরতে তাদের চার ঘন্টার ওপরে লাগার কথা না। সকাল সাতটায় বেরিয়ে ছিলো। এখন বারটা বাজে। ফেরার নাম নেই। তবে এনিয়ে কেউ ভাবিত হয়নি। যখন তিনটা বাজলো তখন কেউ কেউ চিন্তিত হয়ে উঠলো। কারণ, আজ দুপুরে মরুতে ঝড় উঠেছিল। মরু ঝড় পথচারীদের জন্য বড়ই ভয়ংকর হয়ে দেখা দেয়। এক হাত সামনের কোন জিনিষও দেখা যায় না। কেউ যদি ভয়ে বসে পড়ে তাহলে কয়েক মিনিটের মধ্যে তার ওপর বালির টিবি দাঁড়িয়ে যাবে এবং এর নিচে সে সমাধিস্থ হয়ে যাবে।
এজন্য ঝড়ের সময় কেউ পথে থেমে থাকে না। যত কষ্টই হোক, দিক হারিয়ে গেলেও মুসাফিররা পথ চলা অব্যাহত রাখে। হিসাব করে দেখা গেছে এগারটার দিকে ঝড় উঠেছিলো। ঘন্টা খানেক ছিলো ঝড়ের তান্ডব। সেনা ক্যাম্প থেকে বিনগাজি পর্যন্ত নিয়মিত কোন রাস্তা না থাকলেও ফৌজি গাড়ির নিয়মিত যাতায়াতের কারণে রাস্তার একটা শক্ত আদল গড়ে উঠেছিলো। তাছাড়া মেজর জগলাস গিয়েছিলেন জিপ নিয়ে। সঙ্গে আছে অভিজ্ঞ মরুচারী বেদুইন। আশংকাজনক কোন কিছু হওয়ার কথা ছিলো না। অবশ্য জিপ নষ্ট হয়ে গেলে ভিন্ন কথা।
চারটা বাজার পর অন্য অফিসাররা ঠিক করলেন মেজরের খোঁজে গাড়ি পাঠাতে হবে। একটা জিপে একজন মোটর মেকানিক, দুই ক্যান পেট্রোল ও প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস দিয়ে আমাকে পাঠানো হলো।
গাড়ি নিয়ে আমি রাস্তায় নামলাম। চারদিকে তীক্ষ্ম চোখ রেখে গাড়ি চালাতে লাগলাম। বিনগাজী পর্যন্ত কোথাও মেজর জগলাসের গাড়ি চোখে পড়লো না। বিনগাজী শহরের কয়েকজন দোকান্দারের সঙ্গে জানাশোনা ছিলো আমার। অধিকাংশ জিনিস ওদের দোকান থেকেই আমি কিনে থাকি। ওরা জানালো, মেজর জগলাস প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নয়টার দিকে বের হয়ে গেছেন।
শহর থেকে বের হয়ে আমি সেনা চেক পোস্টেও খোঁজ নিলাম। জানা গেলো, মেজর সাহেব সেখানে গিয়েছিলেন এবং নয়টার একটু পর চেকপোস্ট থেকে বের হয়েছেন। একথা জানালো সেখানকার এক ইংরেজ মেজর।
তিনি তো একজন ইন্টেলিজিন্সী অফিসার আমি বললাম- অত্যন্ত বিচক্ষণ লোক। এখানকার ভাষাও জানেন। তার তো এভাবে লাপাত্তা হওয়ার কারণ নেই।
তিনি এখানকার ভাষা জানলেও সম্ভবত এখানকার বেদুইনদের স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে জানেন না ঐ ইংরেজ অফিসার বললেন- মরু ঝড়ে যদি তিনি পথ হারিয়ে বেদুইনদের এলাকায় গিয়ে উঠে থাকেন তাহলে তার জন্য আপনাদের করার কিছুই থাকবে না। বেদুইনরা এমনিতেই আমাদের ওপর চটে আছে। আর তাদেরকে শায়েস্তা করার ক্ষমতাও নেই ইংরেজ আর্মির।
আমার মনের আশংকা আরো ঘনীভূত হলো। আমি হেড কোয়ার্টার ক্যাম্পে ফিরে এলাম। বালির সমুদ্রে গাড়ি স্বাভাবিক গতিতে চালানো যাচ্ছিলো না। ২৩ মাইলের দূরত্বে পৌঁছতে দুই ঘণ্টা লেগে গেলো। পৌঁছতে পৌঁছতে রাত হয়ে গেলো। না মেজর ডাগলাস তখনো পৌঁছেনি। তখনই কয়েকটি পার্টি তাকে খোঁজার জন্য গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেলো। প্রতিটি গাড়িতেই ওয়ার্লেস সেট ফিট করা ছিলো।
মাঝ রাতের দিকে একটি পার্টি খবর পাঠালো, মেজর জগলাসকে পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানী একটি দলের নেতৃত্বে ছিলাম আমি। খবর পেয়ে পার্টি নিয়ে হেড কোয়ার্টারে ফিরে এলাম। জানতে পারলাম, মেজর ডগলাসকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। মেজরকে পাওয়া গিয়েছে খুব করুণ অবস্থায়। তৃষ্ণা, ক্লান্তি, ঝড়ের ধকল তাকে অসাড় করে ফেলেছিলো। নড়াচড়া করতেও কষ্ট হচ্ছিলো তার। জিপের বাইরে বালির ওপর পড়ন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় তাকে। জিপ গাড়ির সবগুলো টায়ারের হাওয়া বের হয়ে গিয়েছিলো। পরদিন জিপ উদ্ধার করে আনা হয়। তবে আব্দুল্লাহ গালালাকে কেউ খুঁজে পায়নি।
পরদিন সন্ধায় মেজরকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দেয়া হয়। তার এই অবস্থা এবং সাময়িক অন্তর্ধান কি কারণে হয়েছিলো এটা জানার জন্য সবাই উন্মুখ হয়েছিলাম। তিনি ক্যাম্পে ফিরে এসেই হল রুমে গিয়ে বসলেন। অন্যসব অফিসারও বসলো তাকে ঘিরে। তিনি রহস্য ভাঙ্গতে লাগলেন।
