মুজাহিদদের মোর্চা ও ক্যাম্পের ওপর বিমান থেকে বৃষ্টির মতো বোম্বিং করা হয়। শহর ও আবাদীর কোথাও সন্দেহজনক কিছু দেখলেই সেখানে কয়েক পশলা বোমা বর্ষণ হয়ে যেতো। হাজার হাজার ঘোড় সওয়ার সেই হামলায় শরীক ছিলো। মুজাহিদরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিরোধ করার ও জবাবী হামলার চেষ্টা করে। এমনকি দুশমনদেরও ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। কিন্তু শত্রু পক্ষকে তাদের পরিকল্পনা পাল্টাতে বাধ্য করতে পারলো না।
শত্রুপক্ষ এলো মেলো বোম্বিং অব্যাহত রাখলো। এমনকি ব্যবসায়িদের কোন কাফেলাও যদি পথে পড়েছে বোমার আঘাতে নিমিষেই পুরো কাফেলা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কোন সাধারণ জনগণ এবং নিরপরাধ লোকদেরও ক্ষমা করা হলো না। মুজাহিদদের সংখ্যা কমে যেতে লাগলো খুব দ্রুত। ইমোনেশনও শেষ হয়ে গেলো। তারপর তারা তলোয়ার ও বর্ষা নিয়ে লড়তে লাগলো। কিন্তু আগুন ও রক্তপাতের সেই তুফানের সামনে তারা মুহূর্তের জন্যও দাঁড়াতে পারলো না।
মুজাহিদরা তাদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে, দুশমনের হাতে নিজেদের জান নজরানা দিয়ে লড়ছিলো। কিন্তু এর শাস্তি পাচ্ছিলো শহরবাসীরা। তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছিলো কোন বাছবিচার না করেই। মুজাহিদদের পরাজয়ের সব লক্ষণ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিলো। কোথাও থেকে তৎক্ষণাৎ কোন সাহায্য পাওয়ারও আশা ছিলো না।
আবদুল করিম শহরবাসীকে এই পাইকারী হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ বিরতির সিদ্ধান্ত নিলেন এবং এ মর্মে শত্রু পক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠালেন। কিন্তু দখলদার বাহিনী প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দিলো। আবদুল করিমের কাছে সৈন্যসংখ্যা তখন একেবারেই হাতে গোনা। তারাও প্রায় নিরস্ত্র। অবশেষে ১৯২৬ এর এপ্রিল মাসে আব্দুল করিম ঘোষণা করলেন–
মারাকেশের রক্তপাত একমাত্র আমার কারণেই হচ্ছে। আর রক্ত ঝরছে তাদেরই যারা লড়তে পারছে না। যারা লড়তে জানতো তারা তো লড়তে লড়তে শহীদ হয়ে গিয়েছে। তবে এক দিন না এক দিন মারাকেশ স্বাধীন হবেই। আমি না থাকলেও আরো অনেক আব্দুল করিমের জন্ম হবে।
এই ঘোষণা দিয়ে তিনি ফ্রান্সী ও স্পেনিশদের গঠিত হাইকমাণ্ডের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন। তিনি যখন সেখানে পৌঁছলেন সঙ্গে সঙ্গে তাকে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ বন্দীরূপে গ্রেফতার করা হলো। এবং তাকে তার পরিবারসহ জাযীরা ইউনিয়নের দুর্গম দ্বীপে নির্বাসন দেয়া হলো।
কিন্তু আব্দুল করিমের নির্বাসনের কারণে তার অদম্য চেতনা-জাবাকে কেউ নির্বাসন দিতে পারেনি। তার চেতনাদীপ্ত আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে মারাকেশে আরো হাজার হাজার আবদুল করীমের জন্ম ঘটলো। তারপর ১৯৫৬ এর ৬ই মার্চ দখলদার দুই সাম্রাজ্যবাদীর কবল থেকে মারাকেশ পরিপূর্ণভাবে স্বাধীন হলো। আব্দুল করিম স্বাধীন মারাকেশে প্রবেশ করলেন স্বাধীনতার লাল গোলাপ হাতে নিয়ে।
মেজর ডাগলাস : মানুষ ও গাধা
মেজর ডাগলাস
মানুষ ও গাধা
গাধা তো গাধাই। শুদ্ধ করে বড়জোর তাকে গর্দভ বলা যায়। তাকে সাজিয়ে পরিয়ে আদর করে সোহাগ করে যতই মাথায় তোলা হোক, সে গাধাই থেকে যায়। তার স্বজাত নির্বোধীয় কার্যকলাপের কোন উন্নতি ঘটে না। কিন্তু সুস্থ সুবোধ মানুষকে যখন গাধা বলা হয় বা গাধা বলে মনে করা হয়, তখন ফলাফল হয় ভিন্ন রকমের।
সাদা চামড়ার ইংরেজরা নিজেদের নিবোধীয় কর্মকান্ডকে মহাবুদ্ধি ধরের কীর্তি বলে জাহির করার জন্য কালো চামড়ার লোকদের গাঁধা। ভাবতে পছন্দ করে এবং তাদেরকে ঘৃণাও করে। কালো-শ্যামলা সবই তাদের চোখে অচ্ছুত। যেখানেই তারা তাদের শ্বেত শাসন চালিয়েছে, যে দেশেই জবর-দখল চালিয়েছে; সেখানকার মানুষ তাদের চোখে ছিল গাঁধার মতো নিবোধ।
আমাদের মেজর ছিলো ডগলাস কার। সে নিশ্চয়ই তার সন্তানদের মরার আগে একবার না একবার বলে গেছে, মানুষকে কখনো গাধা মনে করতে নেই।
ঘটনাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের। জার্মান সেনারা তখন উত্তর আফ্রিকার লিবিয়ায় প্রবেশ করেছে। তাদের বিখ্যাত সেনাপতি জেনারেল রোমেল উত্তর আফ্রিকায় হামলা চালিয়ে ইংরেজদের চরমভাবে পিছু হটতে বাধ্য করে। ইংরেজ সেনাবাহিনীতে তখন হিন্দুস্তানী অর্থাৎ উপমহাদেশের সেনারা যোগ দিয়েছিলো। এরপর ইংরেজ বাহিনী আমেরিকা থেকে সেনা সাহায্য নিয়ে জবাবী হামলা চালায় জার্মানদের ওপর। ও দিকে জেনারেল রোমেল নিজের দেশের ডিক্টেটর শাসক হিটলারের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয় এবং তাকে উত্তর আফ্রিকা ছাড়তে হয়। এ সময় সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী লড়াইটি হয় বেনগাজী ও আল আমীন নামক মরু সাহারায়। মরুর ইতিহাসে সেটাই ছিলো গোলা-বারুদের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ।
জার্মানদের পিছু হটার পর দেখা গেলো, সেই মরু অঞ্চলের অবস্থা বড়াই ভয়ঙ্কর। গ্রামের পর গ্রাম উজার হয়ে গিয়েছিলো। মানুষের পরিবর্তে সেখানে রাজত্ব দখল করে মানুষ খেকো হিংস্র প্রাণী। চারদিকে লাশ আর লাশের ছড়াছড়ি। জ্বলে যাওয়া এবং ভেঙ্গে যাওয়া ট্যাঙ্কের ভেতরও মানুষ খেকো প্রাণী দেখা যাচ্ছিলো।
ইংরেজ ফৌজে আমি ছিলাম মেজর পদাধিকারী। তখন ছিলাম বিন গাজী থেকে তেইশ মাইল দূরের এক ফৌজি পোষ্টে। এটা ছিলো লিবিয়ার এক প্রদেশ সিগনালারের হেড কোয়াটার। এ এলাকা থেকে যুদ্ধের উত্তাপ এখন অনেক দূরে সরে গেছে। মিত্র বাহিনী তখন রোম সাগর পাড়ি দিয়ে ইটালি বিজয়ে অগ্রসর হচ্ছিলো। তাই আমরা সিগনালারের হেড কোয়ার্টারে বসে দারুণ আমোদে সময় কাটাচ্ছিলাম।
