পরদিনই সেই সরদারের লাশ পাওয়া গেলো পরিত্যক্ত একটি জলাশায়। লাশের দুই পা উরু থেকে কাটা ও বাহু এবং মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলো। এর পরপরই অন্যান্য সরদারের কাছে কংকালের উল্কিযুক্ত একটি করে খাম বন্ধ চিঠি পৌঁছালো। তাতে লেখা ছিলো
তোমরা তোমাদের এক বন্ধুর বিচারদশা নিশ্চয় দেখেছো। মনে রেখো সে জীবিত থাকতেই তার অঙ্গগুলো বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। অবশ্য মাথা কাটা হয়েছে তার প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার পর। বিশ্বাস করো, দেশের সঙ্গে যারা বেইমানী করবে তাদেরকে এর চেয়ে সহজ বিচার আমরা করতে পারবো না। বিশ্বাস না হলে একবার বেইমানী তো দূরের কথা বেইমানীর চিন্তা করে দেখো না। তোমাদের হৃদ কম্পন ও মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম চিন্তার ধরনও আমরা টের পেয়ে যাবো।
***
ফ্রান্সীরা যখন এ হাল দেখলো তখন স্পেনিশদের কাছে এক মৈত্রেয় চুক্তির প্রস্তাব পাঠালো। তাতে বলা হলো,
মারাকেশে আমাদের ও তোমাদের দখল বজায় রাখার একমাত্র পদ্ধতি হলো বিদ্রোহীদের ধ্বংস করা। এজন্য প্রয়োজন আমাদের পারস্পরিক ঐক্যভিত্তিক পদক্ষেপ। আমাদের ও তোমাদের সৈনিকরা এক পতাকাতলে লড়াই করবে।
স্পেনিশদের জন্য এই প্রস্তাব ছিলো হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো। পরাজয়ের তাজা ক্ষত শুকানোর জন্য এর চেয়ে ভালো কোন পদ্ধতি ছিলো না। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই দুদেশের ফৌজের সম্মিলিত কার্যক্রম শুরু হয়ে গেলো। সেনা পরিচালনা আরো দক্ষ হওয়ার জন্য ফ্রান্সী জেনারেল লাইটেকে সরিয়ে মার্শাল পার্টীনকে জেনারেল করে মারাকেশে পাঠানো হলো। এই বৃদ্ধ মার্শাল ছিলেন যুদ্ধ কৌশলের উস্তাদ। স্পেনও মার্শাল প্রাইমোদীকে জেনারেল করে মারাকেশ পাঠালো। তারা উভয়ে মিলে সম্মিলিত এক হাই কমাণ্ড স্থাপন করলেন।
উভয় দেশের সৈনিকদের এক ছাউনিতে নিয়ে আসা হলো। উভয় দেশই আরো অতিরিক্ত সৈন্য পাঠালো। ফ্রান্স অতিরিক্ত যুদ্ধ বিমান ও কামান মারাকেশে পাঠালো। মুজাহিদদের জন্য কামান ও যুদ্ধ বিমান ছিলো অত্যন্ত ভয়ংকর অস্ত্র।
মুজাহিদরা শত্রুপক্ষের যুদ্ধ কৌশল অনুযায়ি খোলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো। গেরিলা ও কমাণ্ডো অপারেশন অব্যাহত রাখলো। এর মাধ্যমে ফ্রান্সীদের রসদ পৌঁছানোর ব্যবস্থাপনা অকেজো করে দিলো। দূর-দূরান্তের চৌকিগুলোতে মুজাহিদরা প্রয়োজনীয় রসদ পৌঁছাতে দিতো না। ফ্রান্সীরা এবার রসদের কাফেলার সঙ্গে ফৌজি কাফেলাও পাঠাতে লাগলো। মুজাহিদরা এতে দমলো না। তাদের ওপরও হামলা চালিয়ে গেলো মুজাহিদরা। এক এক হামলায় রক্তক্ষয়ী লড়াই হলো এবং শত্রু পক্ষের ক্ষতিও হলো অপূরণীয়।
অবস্থা বেগতিক দেখে ফ্রান্সীরা এবার নিজেদের রসদ হেফাজতের জন্য কাফেলার পেছন পেছন যুদ্ধ বিমান পাঠাতে শুরু করলো। এবার মুজাহিদরা কোণঠাসা হতে লাগলো। মরু অঞ্চলে বিমানের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিজেদেরকে লুকানো অসম্ভব ছিলো। এই বিমান ব্যবস্থা দ্বারা ফ্রান্সীরা দূরদূরান্ত পর্যন্ত নিরাপদে রসদ পৌঁছে দেয়ার সুযোগ পেলো।
আবদুল করিম মুজাহিদদের হামলার পদ্ধতিতে কিছুটা পরিবর্তন আনলেন। ফ্রান্সীরা তাদের প্রতিরক্ষা শক্তি অটুট রাখার জন্য ছোট বড় প্রায় ৬৬টি কেল্লা নির্মাণ করলো। আব্দুল করিমের মুজাহিদরা সেগুলোর ওপর হামলা শুরু করলো। ১৯২৪ সালের শেষ দিকে মুজাহিদরা নয়টি কেল্লা জয় করতে সক্ষম হলো। কিন্তু মুজাহিদদের সবচেয়ে বড় সংকট ছিলো, তাদের লোকসংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছিলো। সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্রের অভাবও বোধ করতে লাগলো মুজাহিদরা। তাদের কাছে তো নির্ধারিত কোন অস্ত্র কারখানা ছিলো না।
ও দিকে শত্রুপক্ষের গোয়েন্দা তৎপরতা অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠলো। গ্রামে শহর উপশহর ও গ্রামে গুপ্তচররা ছড়িয়ে পড়লো। প্রতিদিন শয়ে শয়ে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনকারী লোকরা গ্রেফতার হতে লাগলো। কারো ওপর যদি সামান্য সন্দেহ হতো সে কোন মুজাহিদকে সহযোগিতা করেছে তাহলে তার পুরো খান্দানকে গ্রেফতার করে জেলের কালো কুঠুরীতে নিক্ষেপ করা হতো। ফ্রান্সীদের কোন কেল্লা মুজাহিদরা দখল করলেই সারাদেশের বিভিন্ন শহরের মুসলমানদের ঘর বাড়িতে সৈনিকরা চড়াও হতো। বাড়ি ঘরে আগুন লাগিয়ে দিতো। তারপরও মুজাহিদদের মনোবল অটুট থাকতো। নিজেদের দুর্বলতাকে তারা জযবার দীপ্তি দিয়ে পূরণ করে দিতো।
***
আব্দুল করিম তার উদার মানবিক হৃদয়ের আরেকটি দুর্লভ নজির স্থাপন করলেন। মুজাহিদরা অনেক ফ্রান্সী ও স্পেনীয় সৈনিক গ্রেফতার করেছিলো। তারা ছিলো যুদ্ধবন্দী। আব্দুল করিমের হুকুমে তাদের সঙ্গে এত কোমল আচরণ করা হতো যে, মনে হতো তারা ভিনদেশী অতিথি। ১৯২৫ সালে যুদ্ধ বন্দি শত শত কয়দীকে আবদুল করীম ছেড়ে দিলেন। শুধু তাই নয়, বড় বড় ট্রলারে করে তাদের সাগর পাড়ি দেয়ারও ব্যবস্থা করে দিলেন। বন্দিরা এই অপ্রত্যাশি মুক্তি পেয়ে বিস্মিত না হয়ে পারেনি। এজন্য অধিকাংশ বন্দিই মুসলমানদের এই আচরণে মুগ্ধ হয়ে বাড়ি ফিরে না গিয়ে মুজাহিদদের দলে যোগ দেয় এবং নিজেদের ফ্রান্সী বা স্পেনিশ সৈনিকদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
১৯২৫ এর সেপ্টেম্বরে ফ্রান্স ও স্পেনিশদের সম্মিলিত হাই কমাণ্ড মুজাহিদদের ওপর চূড়ান্ত এক হামলা চালায়। হামলায় তোপ, কামান ও যুদ্ধ বিমানের সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগ করা হয়। ইতিহাসে একে এক অমানবিক হামলা বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে।
