তখন এক ইলেট্রিক ইঞ্জিনিয়ারের দারুণ মেধাবী ছেলে আফফান এগুলো কাজে লাগায়। আব্দুল করিমের জানবার্য বাহিনীর অসংখ্য ক্যাম্পে টেলিফোন সুবিধা পৌঁছে দেয়া হয়। ক্যবল, ইকুইপমেন্টসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস মাটির নিচ দিয়ে ফিট করা হয়। মুজাহিদদের এজন্য অনেক পরিশ্রম করতে হয়। টেলিফোন সুবিধার কারণে যোগাযোগসহ হামলার সময় ক্ষণ ও দুশমনের গতিবিধি ইত্যাদি জানা মুজাহিদদের জন্য অনেক সহজ হয়ে যায়। শত্রুপক্ষও বিস্মিত হয়, মুজাহিদরা কি করে এত দ্রুত তাদের গতিবিধি সম্পর্কে জেনে যায়।
***
মুজাহিদদের হামলা ও নৈশ হামলা এত পরিমাণে বেড়ে গেলো যে, শহর থেকে দূরের স্পেনিশ ফৌজের চৌকিগুলো খালি হয়ে গেলো। এতে অধিকাংশ চৌকির সৈনিকরাই নিহত বা আহত হলো। শত্রুপক্ষের জন্য দূরদূরান্ত পর্যন্ত রসদ পৌঁছে দেয়ার পথ বন্ধ করে দিলো মুজাহিদরা। তাদের রসদের গাড়ি ও গাড়িসহ মালামাল মুজাহিদরা লুট করে নিতে লাগলো।
শহরের বাইরে যেমন স্পেনিশদের পা রাখার জায়গা ছিলো না শহরের ভেতরও তাদের পক্ষে টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়লো। শহরের বিধর্মী নগরিকরাও মুজাহিদদের পক্ষ নিতে শুরু করে দিলো। শহরের লোকেরা স্পেনিশ ফৌজদেরকে সবরকম নাগরিক সহযোগিতা বন্ধ করে দিলো। সঙ্গে সঙ্গে সরকারি আইনের বিরুদ্ধাচরণও শুরু করে দিলো।
দেখতে দেখতে এক সময় অবস্থা এমন হলো যে, কার্যত স্পেনিশ শাসন প্রক্রিয়া এক প্রকার অকেজো হয়ে গেলো। স্পেনিশদের রাজত্ব ছিলো নামমাত্র। কার্যত শাসন কার্য শুরু হয়ে গেলো মুজাহিদদের। সন্দেহ নেই,আসলে এটা ছিলো মুজাহিদদের বিজয়। যা অর্জন করতে গিয়ে তাদের বিশাল রক্ত নদী পাড়ি দিতে হয়েছে। হাজারো মুজাহিদকে জান কুরবানী দিতে হয়েছে। নৈশ হামলা চালাতে গিয়ে কত মুজাহিদ শহীদ হয়েছে। আরো কত হয়েছে যখমী। অঙ্গ বঞ্চিত হয়েছে আরো কত টগবগে মুজাহিদ।
মুজাহিদ দলে অল্প বয়স্ক কিশোর কিশোরীও ছিলো। তাদের কেউ ধরা পড়লে এমন ভয়ংকর শাস্তি দেয়া হতো যে, তা দেখে কয়েকজন স্পেনিশ সৈনিক অজ্ঞান হয়ে পড়ে। জ্ঞান ফেরার পর তারা ফৌজি চাকরি তো ছাড়েই, তারপর নিজেদের খ্রিস্টান ধর্ম ও পরিত্যাগ করে। গ্রেফতারকৃতদের পরিবার পরিজনদেরকে নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হতো। ঘরের শিশু বাচ্চাদেরকেও রেহাই দিতো না ওরা। তাদের শরীর থেকে এক এক ফোঁটা করে রক্ত বের করে তাদেরকে মারা হতো। সারা দেশের ধূলিকণার প্রতিটি ইঞ্চি মুজাহিদদের রক্তের রঞ্জিত হয়েছে। এর বিনিময়ে মারাকেশের হারানো অংশের কিছুটা হলেও মুজাহিদরা উদ্ধার করতে পেরেছে। অবশ্য এজন্য হাজার হাজার স্পেনিশ সৈনিকের হাড় গোড় মাটির সঙ্গে মেশাতে হয়েছে।
***
এখানে আব্দুল করিম কৌশলগত একটা ভুল করলেন। তার উচিত ছিলো মারাকেশের যতটুকু অংশ জয় করতে পেরেছেন সেখানে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করা। সঙ্গে সঙ্গে একটি রাষ্ট্রের ও স্বাধীন জাতির অবকাঠামো ঠিক করে নিজেদের ভিত্তিভূমি আরো স্থায়ী করা উচিত ছিলো।
কিন্তু স্পেনিশদের পিছু হটা ও কোনঠাসা অবস্থা আব্দুল করিমের আত্মবিশ্বাস এত বাড়িয়ে দিলো যে, তিনি অনেক বাস্তব পদক্ষেপকে এড়িয়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে মুজাহিদরাও আরো আবেগী হয়ে উঠলো। স্পেনিশদের চিন্তা বাদ রেখে ফ্রান্সী ফৌজের ওপর হামলা শুরু করে দিলো। এসব হামলার অধিকাংশই ছিলো নৈশ হামলার আকারে। যেগুলো ফ্রান্সী চৌকিগুলোর ওপর হচ্ছিলো। এই পদ্ধতিতেই মুজাহিদরা স্পেনিশদের বিরুদ্ধে সফল হয়েছিলো।
ওদিকে ফ্রান্সী জেনারেল লাইটে স্পেনিশ বাহিনীর শোচনীয় অবস্থা দেখে প্রতিরোধ ও জবাবী হামলার ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন আগ থেকেই। জেনারেল লাইটে জেনারেল স্লেষ্টারের চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞ ও দূরদর্শী জেনারেল ছিলো। তাই তিনি রণকৌশল আগ থেকেই সাজিয়ে রেখেছিলেন। তা ছাড়া ফ্রান্সী ফৌজের সংখ্যা, অস্ত্র শক্তি এবং দখলকৃত অংশও বেশি ছিলো। এর বিপরিতে মুজাহিদরদের সংখ্যা ছিলো অনেক কম, অস্ত্র-শস্ত্রসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদিও ছিলো হাতে গোনা।
এরপরও মুজাহিদদের গেরিলা অপারেশন এতখানি সফল ছিলো যে, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ফ্রান্সীদের গভীর চিন্তায় পড়তে হলো। অনেক ফৌজি ক্যাম্প ও চৌকি তাদের হাত থেকে ছুটে গেলো। কয়েক জায়গায় সরাসরি লড়াই হলো। সামান্য সংখ্যক মুজাহিদদের সামনেও বিশাল বাহিনীর ফ্রান্সী ফৌজ টিকতে পারলো না। মুজাহিদদের চরম ক্রোধ আর নারায়ে তাকবীরের বজ্র হুংকারে সামনে ফ্রান্সীরা হতবিহ্বল হয়ে পড়লো।
তবে জেনারেল লাইটে আরেকটা চাল চালার চেষ্টা করলো। সেটা হলো সারাদেশের প্রভাবশালী মুসলিম গোত্র সরদারদের ব্যবহার করার পরিকল্পনা নিলো। তাদেরকে বড় বড় উপহার উপঢৌকন ও জায়গীয় দিয়ে ফ্রান্সীদের ওয়াফাদার বানাতে চেষ্টা চালাতে লাগলো। কমপক্ষে ফ্রান্সীদের দলে না ভিড়লেও যেন সরদাররা মুজাহিদদের কোন রকম সহযোগিতা না করে। এটাও ফ্রান্সীদের জন্য কম স্বস্তিদায়ক বিষয় না। একদিন এক প্রভাবশালী গোত্রের সরদার তার গোত্রের সবাইকে এক সমাবেশে একত্রিত করে ভাষণ দিলো,
বন্ধুরা আমার! দেশে স্বাধীনতা ও মুক্তির নামে যারা ফ্রান্সীদের সঙ্গে অন্যায়ভাবে যুদ্ধ করছে তারা আসলে ডাকাত-সন্ত্রাসী ও ছিনতাইকারী। তারা এদেশকে ধ্বংস করতে চায়। ফ্রান্সীরা আমাদের বন্ধু। তাই তোমাদের উচিত ফ্রান্সীদের সহযোগিতা করা। আর মুজাহিদদেরকে সব রকম সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত করা। শুধু তাই নয়, আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে ফ্রান্সীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঐ মুজাহিদদের রুখতে হবে।
