বহু কষ্টে জানতে পেরেছি আপনারা এ এলাকায় আছেন, আমি পায়দল এখানে পৌঁছেছি। আমার রক্ত মাংসও পাপে নিমজ্জিত, পাপের বিরাট এক বোঝা আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। সেটা থেকে মুক্তির জন্য আমি এখানে এসেছি। আমাকে সেই আলো দেখান যা আমার অন্তরাত্মাকে আলোকিত করবে …।
আর যদি গুপ্তচর মনে করে আমাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে চান তাহলে কমপক্ষে মুসলমান বানিয়ে আমাকে হত্যা করুন। যাতে আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে এমনভাবে হাজির হতে পারি যে, আমি পাপ থেকে ধুয়ে মুছে পবিত্র হয়ে যাওয়া একজন মানুষ। যে মানুষটি পাপ থেকে সত্যিকারের তাওবা করেছে।
***
সার্জেন্ট কালাইমাসের কথায় বেশ প্রভাব ছিলো। কিন্তু আব্দুল করিমের মতো দূরদর্শী এক কমাণ্ডার এ ফয়সালা দিতে পারছিলো না যে, এ লোক গুপ্তচর নয়। তার জন্য তখনই কোন শাস্তি ফয়সালা করা হলো না। আব্দুল করিম তাকে নিজের সঙ্গে রাখলেন। সঙ্গে সঙ্গে সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য কয়েকটি তীক্ষ্ম চোখও তাকে অনুসরণ করে গেলো। যদি এ লোক গুপ্তচর না হয় তাহলে মুজাহিদরা এর মাধ্যমে দারুণভাবে উপকৃত হবে এবং অনেক মূল্যবান তথ্যও পাবে।
কয়েক দিনের মধ্যেই এটা প্রমাণ হয়ে গেলো যে, তিনি গুপ্তচর নন। স্পেনিশ ও ফ্রান্সী ফৌজের অনেক গোপন তথ্য ও ফৌজের প্রধান প্রধান যুদ্ধ কৌশলগুলো জানিয়ে দিলেন। তারপর তাকে মুজাহিদদের গোয়েন্দাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ এক পদাধিকার দেয়া হলো। চমৎকার কাজ দেখালেন তিনি।
কালাইমাস খুব হাস্যরসিকতা পছন্দ করতেন। ক্রমেই তিনি ক্যাম্পের সবার প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন। তারপরই গ্রহণ করলেন ইসলাম। আব্দুল করিম তার কালাইমাস নাম পাল্টে রাখলেন হুজ্জুল আয়মান।
তত দিনে মারাকেশের পাহাড়ি অঞ্চলের বেশ কিছু গোত্র সরদার আবদুল করিমের মুক্তিযুদ্ধ দলে যোগ দিয়ে ফেলেছে। এক সরদার তার পুরো খান্দান নিয়ে এবং কোটি কোটি টাকার সম্পদসহ জিহাদে শরীক হয়ে গেলেন। সে সরদার আল আয়মানকে এতই পছন্দ করলেন যে, তার নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তার জন্য আলাদা থাকার ব্যবস্থা করলেন। আল আয়মানের সঙ্গে এই পরিবারের এমনই ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠলো যে সে সরদার তার একমাত্র অতি রূপসী মেয়েকে তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিলেন।
স্পেনিশরা সার্জেন্ট কালাইমাসকে গ্রেফতার করতে সবরকম চেষ্টা চালায়। যখন তারা জানতে পারে, কালামইমাস মুসলমান হয়ে গেছে এবং এক গোত্র সরদারের মেয়েকে বিয়ে করেছে তখন জীবিত বা মৃত ধরিয়ে দেয়ার বিনিময়ে পুরস্কারও ঘোষণা করে। বেশ মোটা অংকের টাকা ও এক শ ভরি সোনা দেয়া হবে এই ঘোষণাও করে। কিন্তু কেউ তাকে পাকড়াও তো দূরের কথা তার খোঁজও তারা বের করতে পারেনি।
হুজ্জুল আয়মান অল্প দিনের মধ্যেই আব্দুল করিমের ডান হাত হয়ে যান। ইতিমধ্যে আব্দুল করিমের নাম ইউরোপের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। বৃটিশরা গোপনে তার মিত্র হওয়ার প্রস্তাব পেশ করে। জার্মানীরা অস্ত্র সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু আব্দুল করিম সেসব প্রস্তাব সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি জানতেন, যে, দেশই সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিক না কেন এদের আসল উদ্দেশ্য হলো শুভাকাংখী সেজে ভূমিকাংখী হওয়া তারপর এদেশ দখল করা।
সারা দেশের মুজাহিদদের এক মাত্র হাতিয়ার হলো আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস এবং আত্মপ্রত্যয়ী জযবা। মুজাহিদদের মধ্যে যারা সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করছে তাদের একটা তালিকা তৈরী করে ফেলা হলো। আব্দুল করিম তাদেরকে গ্রেনেড, রাইফেল ও রিভলভার তৈরীর কারিগরী প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করলেন। দেখতে দেখতে দুর্গম পাহাড়ের বিভিন্ন গুহা অস্ত্র কারখানায় পরিণত হলো। অস্ত্র তৈরীর নিজস্ব ব্যবস্থাপনা মুজাহিদদের জন্য বেশ সুবিধা এনে দিলো। তবে মুজাহিদরা বেশিরভাগ যে অস্ত্রের ব্যবহার করতো সেগুলো স্পেনিশ ফৌজ থেকে ছিনিয়ে নেয়া অস্ত্র।
মুজাহিদদের মধ্যে কিছু এমন মেধাবী সদস্য ছিলো যারা লড়াইয়ের সময়ও অসম্ভব ক্ষিপ্র ও দুঃসাহসী ছিলো। লড়াইয়ের বাইরেও অলস সময় কাটানোর পক্ষে ছিলো না। তারা অস্ত্র তৈরীর কোন রকম প্রশিক্ষণ না নিয়েও অন্যদের দেখাদেখি নিজেদের ঘরে বসে অস্ত্র তৈরী করতে লাগলো। একমাত্র উদ্দেশ্য ভিন দেশের কারো কাছে যাতে হাত পাততে না হয়। সাহায্যের জন্য ছোট হতে না হয়। সাহায্য নেয়ার বিনিময়ে বিক্রি হতে না হয়। আব্দুল করিম মুজাহিদদেরকে বলতেন
যারা তোমাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করবে বা তোমাদের মিত্র হতে চাইবে একদিন না একদিন তারা যে কোন উপায়ে যেকোন বাহানায় যেকোন রঙে এর বিনিময় আদায় করে নেবে। হতে পারে বিনিময়স্বরূপ তোমাদের অস্তিত্বের একমাত্র প্রতীক ঈমানী জবাটাই ছিনিয়ে নেবে। তাই নিজেদেরকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে গড়ে তোলার চেষ্টা করো।
আব্দুল করিমের এ কথাগুলো মুজাহিদদেরকে বেশ নাড়া দিলো। মাত্র চৌদ্দ বছরের কিশোর যোদ্ধা আফফান মুজাহিদদের যোগাযোগের সুবিধার জন্য টেলিফোন লাইনের ব্যবস্থা করলো। মুজাহিদরা দুশমনের বিভিন্ন চৌকি ও ফৌজি কাফেলার ওপর হামলা করে অনেক কিছুই লাভ করে। এর মধ্যে অসংখ্য টেলিফোন সেট ইকুইপমেন্ট ও কেবলও ছিলো। প্রথমে তো এসব জিনিস মুজাহিদদের জন্য ছিলো অর্থহীন। কারণ, মুজাহিদরা এগুলোর ব্যবহার জানতো না।
