এতে যে কাজটা হলো সেটা হলো, যে চৌকিতেই রাতে গিয়ে মুজাহিদরা হুমকি দিতো সে চৌকি সকাল পর্যন্ত খালি হয়ে যেতো। এভাবে বেশ কয়েকটি চৌকি খালি হয়ে গেলো। কিছু কিছু চৌকিতে মুজাহিদদের নৈশ হামলাও করতে হলো।
আব্দুল করিম এরপর মুজাহিদদের ফৌজি কায়দায় বিন্যাস করে সে ফৌজ নিয়ে রীতি মতো সামনে এগুতে লাগলেন। এখন তার হেড কোয়ার্টার রীফ পাহাড় সারির কোন কন্দরে স্থানান্তর করা হয়েছে। এরপর আবদুল করিম মারাকেশের মীলীলা নামক বড় এক শহরের ওপর হামলা করলেন। এই শহরে ফ্রান্সী, স্পেনিশ ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের লোকজন মিলিয়ে প্রায় চল্লিশ হাজার লোক ছিলো। আব্দুল করীম শহর অবরোধ করলেন।
অবরোধ চলছে নির্বিঘ্নে। কোন ধরনের রক্তপাত হচ্ছে না কোথাও। তবে মুজাহিদরা প্রতিশোধ স্পৃহায় এধরনের মানসিকতা প্রকাশ করে বসলো যে, এই শহরের সমস্ত নাগরিককে হত্যা করে সব ধন-সম্পদ নিয়ে নেয়া হবে। তারপর সেগুলো মুক্তিযুদ্ধের লড়াইয়ে কাজে লাগানো হবে।
আমার দৃষ্টি শহরের ওপর শহর বাসীর ওপরো নয়- আব্দুল করিম একদিন মুজাহিদদের বললেন- এটা ঠিক যে, এই কাফেরের দলই নিরপরাধ মুসলমানদের পাইকারী দরে হত্যা করেছে এবং নারীদের ইজ্জত নষ্ট করেছে যত্রতত্র। তারপরও আমি শহরবাসীর ওপর হাত উঠাবো না। নিরস্ত্র করা রক্তপাত করা মুজাহিদদের ব্যক্তিত্বের পরিপন্থী কাজ।
তারপরও মুজাহিদরা মাত্রাতিরিক্ত জবাও আবেগী হয়ে যাচ্ছিলো। এটাই ছিলো প্রথম ঘটনা যেখানে মুজাহিদরা আবদুল করিমের আনুগত্যে শিথিলতা দেখায় এবং শহরবাসীদের হত্যার ব্যাপারে অনঢ় মনোভাব দেখাতে থাকে। আব্দুল করিম ভেবে দেখলেন, শহরে অনেক যুবতী মেয়ে আছে যারা মুজাহিদদের ঈমান দুর্বল করে দিতে পারে। তারপর আছে অঢেল ধন-সম্পদ যা তাদেরকে লোভাতুর করে পদস্খলন ঘটাতে পারে। অবরোধ বেশি দিন ধরে রাখলে মুজাহিদদের পক্ষে তা বুমেরাং হয়ে দেখা দিতে পারে। তাই আব্দুল করিম অবরোধ উঠিয়ে নিয়ে তার ক্যাম্পে চলে গেলেন।
এই একটি ঘটনার মাধ্যমেই আব্দুল করিমের চারিত্রিক দৃঢ়তার প্রমাণ মেলে, যা অনেক ইউরোপীয়কে মুগ্ধ করে। এমনকি স্পেনিশ সেনাবাহিনীর কালাইমাস নামক এক সার্জেন্টকেও তা দারুণভাবে আলোড়িত করে। কালাইমাস মূলত স্পেনীয় ছিলেননা। ইউরোপের অন্য এক রাষ্ট্রের লোক ছিলেন। তিনি এক দিন লুকিয়ে ছাপিয়ে ঐ পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছে গেলেন, যেখানে মুজাহিদদের ক্যাম্প রয়েছে। তাকে একা একা দিক ভ্রান্ত হয়ে ঘুরতে দেখে মুজাহিদরা তাকে গ্রেফতার করলো। গ্রেফতারকারী মুজাহিদরা নিশ্চিত ছিলো যে, এ লোক স্পেনিশ ফৌজের গুপ্তচর।
কিন্তু সার্জেন্ট কালাইমাস আমীরে মুজাহিদ আব্দুল করিমের সঙ্গে সাক্ষাতের মনোবাসনা ব্যক্ত করলেন। আর এও বললেন, তিনি মুজাহিদদের দলে যোগ দিয়ে স্পেনিশদের বিরুদ্ধে লড়তে চান। মুজাহিদরা তার কথা মোটেও বিশ্বাস করলো না। এখানে রীতি হলো, তাদের এলাকায় কোন গাদ্দার বা দুশমনের কোন গুপ্তচর নজরে পড়লে তাকে সেখানেই জীবন্ত দাফন করে দেয়া। ক্যাম্পের কমাণ্ডার থেকে অনুমতি নেয়ারও প্রয়োজন নেই।
সার্জেন্ট কালাইমাসও যেহেতু গুপ্তচর সন্দেহে গ্রেফতার হয়েছে এজন্য তার জন্য একটা গর্ত খোদাই করা হলো। মূল হেড কোয়ার্টার অর্থাৎ আব্দুল করিমের ক্যাম্প সেখান থেকে একটু দূরে ছিলো। ঘটনাক্রমে আব্দুল করিমের ক্যাম্পের এক লোক সেখানে কি এক কাজে এসে এ দৃশ্য দেখে ফেললো। সে সার্জেন্টের কথা শুনে তাকে আব্দুল করিমের কাছে নিয়ে যাওয়াটা জরুরী মনে করলো। ক্যাম্প কমাণ্ডারের কাছে সে একথা বললো
যদি এই লোক ইউরোপীয় গুপ্তচর হয়ে থাকে তাহলে তো তাকে ওখানেও শাস্তি দেয়া যাবে। আমীরুল মুজাহিদীনের সঙ্গে তার সাক্ষাতের ইচ্ছের মধ্যে নিশ্চয় কোন বিষয়ও তো থাকতে পারে।
সার্জেন্ট কালাইমাসকে আব্দুল করীমের সামনে উপস্থিত করা হলো। আব্দুল করিমের সঙ্গে সার্জেন্ট স্বাভাবিক আচরণ করলেন। নির্ভয়ে তিনি বললেন
সত্যি কথা বলতে কি আমাদের ফৌজ এখানকার মুসলমানদের ওপর যে জুলুম নির্যাতন চালাচ্ছে তা আমার ভেতর আশ্চর্য রকম এক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। ছোট ছোট মুসলমান বাচ্চাদেরকে স্পেনীয় অফিসারদের ওখানে বেগার খাটতে দেখেছি। দেখেছি, ওদেরকে একটি রুটির বিনিময়ে কি যন্ত্রণাই দেয়া হয়। তবুও ওদের ক্ষুধার্তই থাকতে হয়। এসব আমি সহ্য করতে পারতাম না। আবার যাকে খুশি তাকেই সামান্য ছুতোয় গুলি করে মেরে ফেলতো। ছোট ছোট নিষ্পাপ বাচ্চাদের ওপর, নিরপরাধ কিশোরীদের ওপর মোংরা ক্ষুধা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তো এক সঙ্গে কয়েকজন অফিসার। তারপর তাকে মেরে ফেলতো বা সে এমনিই মরে যেতো। আর ওরা তাদের ছিন্নভিন্ন লাশের পাশে বসে হো হো করে হাসতো …
মুসলমানদেরকে ওরা মানুষ মনে করে না। স্পেনীয়দের যে হিংস্রতা আমি দেখেছি সেটা আপনারা শুধু শুনেছেন। আমার দ্বারাও ওরা অনেক হিংস্র কর্মকাণ্ড করিয়েছে। এজন্য অনেক রাত আমার নির্মুম কাটতো। আমার বিবেক-মন আমাকে অভিশাপ দিচ্ছিলো …
অবশেষে আমি এ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলাম যে, যে ধর্ম তার পূজারীকেও মানুষকে ভালোবাসতে শেখায় না, মানবতার পথ দেখায় না সেটা সত্য ধর্ম হতে পারে না। আমি জানতে পেরেছি আপনারা নাকি মিসীলা থেকে এজন্য অবরোধ উঠিয়ে নিয়েছেন যে, ওখানে আপনাদের মুজাহিদরা ইউরোপীয়দের পাইকারী দরে হত্যা করবে এমন আশংকা করছিলেন। আর আপনাদের ধর্মে এটা মহা গাপ। এটা শুনতেই আমি আমাদের ক্যাম্প থেকে পালিয়েছি …।
