মুজাহিদরা তো এই হুকুমেরই অপেক্ষায় ছিলো। জান কুরবান করা তো তাদের কাছে এখন বড় আগ্রহের এক মিশন। হামলার জন্য তৈরী হয়ে গেলো তারা। সংখ্যায় তারা অনেক কম ছিলো। তাদের ট্রেনিংই দেয়া হয়েছিলো এমনভাবে যে অল্প সংখ্যক সৈন্য অধিক সংখ্যক বাহিনীর ওপর হামলা করে পযুদস্ত করে দেবে।
নির্ধারিত দিনে জেনারেল স্লেষ্টার ফৌজি ক্যাম্পে পৌঁছলেন। ওদিকে আব্দুল করিমের নেতৃত্বে ছোট একটা মুজাহিদ দল ক্যাম্পের কাছাকাছি এমন এক জায়গায় অবস্থান নিলো যেখানে কেউ তাদের দেখার কথা নয়। জেনারেল এসে মাত্র পরিদর্শন শুরু করেছেন এসময় মুজাহিদরা তলোয়ার, বর্শা, খঞ্জর ও ভারি পাখর নিয়ে ক্যাম্পের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।
এমন আচমকা ও ক্ষিপ্র হামলায় স্পেনীরা দিশেহারা হয়ে উঠলো। তারা পাল্টা প্রতিরোধ করার অনেক চেষ্টা করলো। কিন্তু মুজাহিদরা সামলে উঠার সে সুযোগ তাদেরকে দিলো না। আবদুল করীম জেনারেল ষ্টোরকে খুঁজছিলেন। জেনারেল তার অফিসার ও বডিগার্ডদের নিয়ে পালাতে চেষ্টা করছিলেন।
***
আবদুল করীম তাকে দেখে ফেললেন, অফিসার ও বডি গার্ডদের বেষ্টনীতে রয়েছেন জেনারেল। তাদের মেশিনগানগুলো অবিরাম গুলি বর্ষণ করতে লাগলো। মুজাহিদরাও যখমী ও শহীদ হতে লাগলো। সঙ্গে সঙ্গে আব্দুল করীমের গর্জনও শোনা যেতে লাগলো- আমি জেনারেল স্লেষ্টারকে জীবিত বা মৃত নিয়ে যেতে চাই।
এ ছিলো বিস্ময়ে হতভম্ব হওয়ার মতো এক লড়াই। লাঠি তলোয়ার বর্ষা মোকাবেলা করছিলো স্টেনগান ও রিভলবারের। এক দিকে ছিলো অভিজ্ঞ সেনা দল ও সেনাদল থেকে বাছাই করা বডিগার্ডরা। আরেক দিকে ছিলো সৈনিকী অভিজ্ঞতাহীন মুজাহিদ দল। যাদের কাছে জযবা ও নারায়ে তাকবীর ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। মুজাহিদ বাহিনী জযবাদীপ্ত হয়ে রক্তাক্ত অবস্থাতেই জেনারেলের ফৌজি বেষ্টনী ভেঙ্গে ফেললো। ইতিমধ্যে মুজাহিদদের হাতে মৃত স্পেনিদের অনেক অস্ত্রই উঠে এসেছে। সেগুলো দিয়েই তারা রক্ষি বাহিনীর ওপর হামলে পড়লো এবং হেফাজত বেষ্টনী ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেলো।
একটু পর স্পেনীশদের প্রধান জেনারেল স্লেষ্টার আবদুল করীমের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। জেনারেল প্রাণ ভয়ে কাপ ছিলেন। আব্দুল করীম প্রতিশোধের আগুনে উন্মত্ত হয়ে বললেন
আমি তোমাকে বলে ছিলাম না যে মারাকেশ মুসলমানদের? তোমাদেরকে এখান থেকে বের হয়ে যেতে হবে। কিন্তু তুমি জঙ্গি শক্তির নেশায় পড়ে আমাকে জেলে ছুঁড়ে মারতেও দ্বিধা করলে না।
শোন আব্দুল করীম, জেনারেল গলায় জোর দিয়ে বললেন- তোমরা স্বাধীনতার স্বাদ পাবে না কখনো। আর মনে রেখো, আমাকে হত্যার প্রতিশোেধ সারা দেশের প্রতিটি মুসলমানের কাছ থেকে নেয়া হবে। কারণ, তোমাদের কাছে কোন শক্তি নেই।
আমাদের শক্তি হলো আমাদের আল্লাহ ও তার প্রতি আনীত ঈমান। আব্দুল করীম নিজের বুকে চাপড় মেরে বললো- তোমাদের কল্পিত খোদার অস্তিত্ব যদি সত্যিই থেকে থাকে তাকে বলো আমার ও আমার মুজাহিদদের হাত থেকে তোমাকে জীবিত মুক্ত করে নিয়ে যেতে।
জেনারেল স্লেষ্টার প্রথমে কিছু হুমকি দিলো। যখন দেখলো, এসব হুমকিকে তারা মশা মাছির সমানও পাত্তা দিচ্ছে না তখন কোটি কোটি টাকার লোভ দেখালো। বন্ধুত্ব ও সান্ধির প্রস্তাব দিলো। ওয়াদা করলো মারাকেশ থেকে স্পেনিশ বাহিনীকে নিয়ে বেরিয়ে যাবেন। কিন্তু আব্দুল করীমের অনঢ় কণ্ঠ নির্দেশ দিলেন
হে মুজাহিদরা! মারাকেশের সেই অসংখ্য নিরপরাধ মুসলমানদের হত্যার প্রতিশোধ নাও, যারা এই কাফের রক্ত চেষ্টা পিশাচের হুকুমে নিহত হয়েছে।
মুহূর্তের মধ্যে একই সঙ্গে কয়েকটি বর্শা ও তলোয়ার জেনারেলের দেহ ছিন্নভিন্ন করে ফেললো।
লড়াইয়ের ময়দান ততক্ষণে মুজাহিদদের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। উপরন্তু সারা ক্যাম্পে যখন এ খবর ছড়িয়ে পড়লো যে, তাদের জেনারেল মারা গেছে তখন তো স্পেনিশদের অবশিষ্ট মনোবলও ভেঙ্গে পড়লো। ক্যাম্পের চার দিকে রক্ত আর রক্ত। এ অবস্থা দেখে দুশমন হাতিয়ার ফেলে পালাতে শুরু করলো। অনেক সৈনিক পালাতে গিয়ে মারা পড়লো। যারা ক্যাম্পে রইলো তারা হলো ভীষণভাবে আহত। বাঁচতে পারলে তারাই যারা নিরাপদে পালাতে পারলো।
মুজাহিদরা বিপুল পরিমাণে অস্ত্র ও অন্যান্য রসদপত্র উঠাতে লাগলো। শহীদদের লাশেরও ব্যবস্থা করে ফেললো অল্প সময়ের মধ্যে। মুজাহিদদের বাহন ছিলো প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম। ক্যাম্প থেকেই অনেক উট, গাধাও পেয়ে গেলো মুজাহিদরা। স্পেনিশ হেড কোয়ার্টারে এই সংবাদ পৌঁছার আগেই মুজাহিদরা নিজেদের গোপন ক্যাম্পে ফিরে গেলো। মুজাহিদদের চলে যাওয়ার পর স্পেনিশ ক্যাম্পে লাশ ও আহত সৈনিকরা ছাড়া আর কিছুই ছিলো না।
***
স্পেনিশরা তাদের দখলকৃত মারাকেশের অংশে জায়গায় জায়গায় বহু ছোট বড় ফৌজি চৌকি বসায়। আবদুল করিমের মুজাহিদ বাহিনী সে সব চৌকিতে গিয়ে বেশ কয়েকবার এধরনের হুমকি সহ ঘোষণা দিলো
ঐ সাদা চামড়াওয়ালারা! হাতিয়ার দিয়ে দাও এবং আমাদের কাছে এসে আত্ম সমর্পণ করো। না হয় এখান থেকে একজনও প্রাণ নিয়ে পালাতে পারবে না।
প্রতি রাতেই কোন না কোন চৌকির আশেপাশে এধরনের ঘোষণা শোনা যেতে লাগলো। মরুর নিঃশব্দ রাতে এ ধরনের গর্জন স্পেনীয়দের কলজে কাঁপিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিলো। মনে হতো এ কোন ভূত প্রেত বা অশারীরিক আওয়াজ। সহস্রাধিক সৈন্যের ক্যাম্পে মুজাহিদদের সফল আক্রমণ এবং জেনারেল ষ্টোরের মতো প্রকাশনী এক জেনারেলের মৃত্যু স্পেনিশদের মধ্যে দারুণ আতংক সৃষ্টি করে।
